পরমার্থের ভিড়ে নিঃসঙ্গ রসাতল :: পিয়াস মজিদ

5958704672_80204059af_z
 প্রেম এসেছিল জাহাজে চড়ে জাহাজের গায়ে আঁকা ছিল
বিচিত্র বর্ণের পরাবাস্তব ছবি রূপকথার যত্তেসব মিথ্যে কথার আতসবাজি
মায়াবিনী পরীর বরফের ডানা মুখোশ পড়া ডাকাতের দল বাহিনী শুকনো
সৌরভ ভরা ছিল মুখ- বাঁধা চটের বস্তায়।

(অথঃপ্রেম কাহিনী)

ব্যবহারে ব্যবহারে শুয়োরের মাংস হয়ে যাওয়া ‘তুমি, আমি’ সর্বস্ব প্রেমকাব্যের প্লাবনের বিপ্রতীপে যে কবি এমন হিংস্র- ভয়াল স্বরূপে আঁকতে পারেন প্রেমের ছবি, বাংলা কবিতায় তাকে একটু ফিরে দেখার অবকাশ আছে। তিনি মুস্তফা আনোয়ার (১৯৪০-২০০৬)। আমাদের কবিতাসমুদ্রে তুঁত, রসাতল ও মরিয়ম, পরবাসে বসবাস, কোনো ডাকঘর নেই, কী করি কোথায় যাই ইত্যাদি বদ্বীপের সত্ত্বাধিকারী। পরবাসে বসবাস, কোনো ডাকঘর নেই যদিও কাব্যনাট্যের বই তবু তা যেমন মুস্তফা আনোয়ারের কবিস্বভাবের বিভাযুক্ত তেমনি তাঁর ভয়ঙ্কর অভিনতুন গল্পের গাঁথা ক্ষুর-এর গাত্রবর্ণেও লেপটে আছে কবিতার সফল রঞ্জন। ষাটের জাতক মুস্তফা আনোয়ার কিন্তু আদতে দশকাতীত বিচিত্রবর্ণিল ঋতুর উদ্গম ফুটে আছে তাঁর কবিতাবিশ্বে; প্রকৃত কবির লক্ষণ তো তাই। প্রসাধিত কলাকুসুমের তুড়ি মেরে এই কবি যেন মানুষের ত্বকের গভীর-নিগূঢ় মৌলসত্তার ভেতরমহলে হানা দেন। ফলত মধুর- স্নিগ্ধ উপচারও তার কবিতায় এসে রূপ নেয় বিধুরে। জ্যোৎস্নালোকে আমরা চলি গোরস্থানে, প্রেম রূপ নেয় কয়লায়, ঝরা পাতার বদলে দেখি মরা পাতার নাচ, রঙধনু হয় রক্তের ছোপ আঁটা, জতুগৃহে দাউ দাউ জ্বলতে দেখি প্রমীলার চিতা আর নিরঞ্জন সৌন্দর্যসমুচ্চয়কে ধিক্কার দিয়ে আমরা শতকণ্ঠে বলে ওঠি ‘হে আমার কুৎসিত, তোমাকে ভালোবাসি’।

পূর্বসূরি শিল্পপুরুষদের এই কবি নিজ আত্মার ভেতর আবাহন করে ওঠেন এমত ভঙ্গিতে-

কাফকা, পোড়া মুরগির চেরা পা খেলো,
তার হাতে উড়ছে মুখ মোছার মোষলড়াই,
আঙুলের ফাঁকে দুখণ্ড চাঁদের এক চিলতে ঢেলা
মুখে দিতেই, হাততালি বেজে চলল,
অন্তবিহীন পথের মোড়ে।

(কাফকা )

জয়েস কবিতা বেচে কিছু টাকা পেয়ে
সাদা মদের দোকানে গেল
এক পা ডুবিয়ে দিল পিপেতে
ঈশ্বরের দিকে অন্য পা।

(জেমস জয়েস)

কার্তিকের চাঁদ দেখ্তে দেখ্তে
কেনো যে জীবনানন্দ বাবু
আহাড়ীটোলায় গিয়ে
থেঁতলানো ভাঁটফুল কুড়োলেন।
হা হাইড্রান্ট
কবিতার ময়লা দাও খুলে।

(জীবনানন্দ বাবু)

দেশকাল-নামগোত্রভেদ ভুলে জয়েস- কাফকা- জীবনানন্দ প্রমুখ মুস্তফা আনোয়ারের চৈতন্যে অঙ্গীভূত হয়ে যায় এক অভূত রসায়নে। মানুষমনের অনন্ত- উন্মূল গলিপথে হাঁটাচলার অভিন্নসূত্রে এদেরকে কবি তার নিজ রাজপথে অস্তিত্বমান দেখতে পান। অতঃপর কাফকাপথ, জয়েসপথ কিংবা জীবনানন্দপথের মতোই আমরা আবিষ্কার করে ওঠি মুস্তফা আনোয়ার কবিতাপথ। আর এই পথে হেঁটে যেতে গিয়ে পথে পথে খাব হোঁচট কারণ চেনাজানা ধূসর পরমার্থ তো নয়, এ হচ্ছে সমুজ্জ্বল রসাতলের সড়ক। এর দু’পাশে কালো কালো আফিমগাছের সারি। ফাঁক গলে বেরিয়ে আসে বুড়োহাবড়া তুঁত। অনতি-সত্তরে জীবন থেকে পলায়মান কান্তবাবু এভাবে বিচিত্রবিধ ছদ্মবেশে প্রকাশমান করে তোলেন ‘অনার্য সত্তার জ্বালামুখ’।

হ্যাঁ, এক বৃহৎ জ্বালামুখকেই যেন ভেঙে ভেঙে একেকটা কবিতার কাঠামো দিয়েছেন তিনি। কবিতা তো নয় যেন কবিতার ছলে মানুষী অস্তিত্বের খা খা জায়গাগুলো সংকলিত হয়ে ওঠেছে। নিসর্গ আসে এইসব কবিতায় তবে হরিৎ অনুষঙ্গে নয়, যেনবা নিসর্গেও তিনি চারিয়ে দেন তার অমোচ্য জখমের দাগ। কারণ কবি মুস্তফা আনোয়ার সামগ্রতাবাদী; কোন আলাদা অংশের বিশেষ লালিত্যে আস্থা নেই তার, কবিতার গোটা পরিপ্রেক্ষিতকে নির্মাণ করেন এক অভিন্ন অভিজ্ঞানে ধাবনের উদ্দেশে। এই যেমন-

তোমার মালঞ্চে আমি উটকো লোক
এসে গেছি,
পাতার ঝুনঝুনি কুড়িয়ে অর্কেস্ট্রা বানিয়ে দেব, তোমার
ডালে ঝরে যায় পাতা, ঝরে যায়।

(মালঞ্চ)

তরুর তুলনায় বাঁধা পড়ে প্রিয়। অতঃপর মিলনের সংরাগে খসে পড়ে বিরহী সব শেকল। সব পুরাতন পত্রালি ঝরে পড়ে নতুনের সম্মোহে তবে ঝরা পাতাকে মুস্তফা কি নেহায়েত ঝরা-ই ভাবেন? না, ‘কুঞ্জবনে’ কবিতায় দেখছি তিনি কুড়োতে চান স্বপ্নের ডালপালা। পাঠক লক্ষ করুন, ফুল নয় ফল নয়; ডালপালা। প্রথাসিদ্ধ চোখে তো চলে কেবল প্রসূনের চকমকি কিন্তু এতো মুস্তফা আনোয়ার ; বাতিল, উটকো, ঝরা-পরা-মরা সব তার কাছে উদ্যাপনীয় তবে এ নেহায়েত পারম্পর্যরহিত নয় কারণ পাঠ করি-

জয়ধ্বনি মরা পাতা, জিন্দাবাদ মরা পাতা,
জয়ধ্বনি অপমৃত্যুর মৃত্যুর।

(মরা পাতার দলেই আছি)

Mastafa Anawarবোঝা যাচ্ছে, বিবমিষার ভেতরে পাঠককে পরিব্রাজন করিয়ে শেষত কবিতাসুড়ঙ্গের প্রকৃত দরোজায় প্রবেশের আকাক্সক্ষা ছিল তার। তারই কবিতার ভাষায় চারপাশে মরা নৌকার মরা বৈঠার মতোই কবিতার মরা শব্দ কিংবা মরা শব্দের কবিতা। নীরক্ত-নিরনুভব শব্দকল্পদ্রুমের পানে ভেংচি কেটে তিনি স্বল্পতম সৃষ্টির ভেতরেই জাগাতেই চেয়েছেন কবিতার প্রকৃত ব্রহ্মা। আমাদের প্রভাষকীয়-অধ্যাপকীয় কাব্যালোচনার পরিসরে একজন মুস্তফা আনোয়ারকে খুঁজে পাওয়া ভার কেননা পৃথিবীময় স্তূপীকৃত গোলাপের মৃত সুগন্ধে খুব কম কারোরই শ্বাসকষ্ট হয় যার হয় শুধু সেই তো বুঝে-

রসাতল দূর তবু আজো-
ভালোবাসা কি কঠিন ব্যাপার,
পরমাণু টুকরো করা তো সহজ কাজ
ভালোবাসা সে অসম্ভব, সে অসম্ভব।
Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s