Nocturneঅতঃপর এক দীর্ঘসূত্রতার শেষে প্রকাশিত হলো “নকটার্ন”। প্রথমে আমাদের ইচ্ছা ছিলো, ওয়েব পোর্টাল নয়, ওয়েব ম্যাগ হিসেবে নকটার্নকে হাজির করার। একটি বিশেষ সময় অন্তর-অন্তর লিটল ম্যাগের মতন করে সংখ্যা করা। সেই বাবদ নকটার্নের জন্য ওয়েব স্পেসও কেনা হয়। কিন্তু ওয়েব ম্যাগ করতে গিয়ে শুরুতেই আমরা যে বিপত্তির মুখে পড়ি তা হলো, সব লেখকের কাছ থেকে একই সময়ের ভেতর লেখা জোগাড় করা। ফলে বারবার পেছাতে শুরু করে এর প্রকাশ। আর আমরা ভাবতে থাকি অন্য কোনো উপায়। দীর্ঘদিন ভার্চুয়াল পত্রপত্রিকা, লেখক- পাঠকের ভার্চুয়াল মিথস্ক্রিয়া, এর নব্য নব্য উপযোগ সৃষ্টির নানান মাত্রা পর্যবেক্ষণের পর আমরা শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিই “নকটার্ন”- কে এমন একটা ওয়েব পোর্টালে পরিণত করতে, যাতে লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে আর নিয়মিত সময়ান্তর গুনতে হবে না, যখন যে সংখ্যক লেখা আমরা হাতে পাবো, তৎক্ষণাৎ তা প্রকাশ করা হবে। তাতে করে মুক্তি মিললো এক সাথে সব লেখকের লেখা জোগাড় করার টানাপোড়েনের হাত থেকে, এবং একই সাথে একগাদা লেখা একই সময়ে পাঠকের সামনে হাজির করে পড়ানোর চাপ তৈরি করা থেকেও। ততদিনে আমরা তত্ত্বগত জায়গাতেই ভার্চুয়ালে বিশেষ করে, পাক্ষিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষাণ্মাসিক সময়কাল নির্ভর ইত্যকার ওয়েব পত্রিকার ড্র-ব্যাকস আবিষ্কার করতে শুরু করেছি। ফলে পূর্বসিদ্ধান্ত বাতিল। বরং নিয়মানুবর্তিতার একঘেঁয়েমি থেকে এবারে অনেক বশিঁ গঠনমূলক প্রক্রিয়ায় কাজ করার পরিধি বিস্তৃত হলো, কাঁধ থেকে নেমে গেলো নিয়মিতির পাথর। চলমান দুনিয়ার, বিশেষ করে ভার্চুয়াল দুনিয়ার, ব্যস্ত-সমস্ত লেখকদের-পাঠকদের এক বসায় অনেক সময় খেয়ে ফেলা রাক্ষস আমরা আর হলাম না। এক নাগাড়ে দীর্ঘ সময় ব্যয়ের যে মনস্তত্ত্ব তার বিরোধী মনস্তত্ত্বেই ভার্চুয়াল দুনিয়ার লেখক-পাঠকের বাস। এখানে শিল্প- সাহিত্য চর্চার সম্ভাবনা, উপযোগ খুব সম্ভবত এই চাওয়ার সাথেই সূত্রবদ্ধ বেশি, অন্তত এখন পর্যন্ত। ফলে এবারে এক অর্থে নিয়ম-ভাঙা, হুটহাট-অনিয়মিত ওয়েব পোর্টাল “নকটার্ন”।

কেনো শিল্প-সাহিত্যের বিকল্প প্রকাশ- মাধ্যম হিসেবে ওয়েব পত্রপত্রিকাকেন্দ্রিক কার্যক্রমের ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে? এর উত্তরে বলা যায়, আগামী দিনের সিরিয়াস চিন্তাচর্চার সবচেয়ে প্রভাবশালী ক্ষেত্র হিসেবে ওয়েব দিনে দিনে আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবে। শিল্প-সাহিত্যচিন্তার আর যেসব মাধ্যম আছে সেগুলোর নানামুখি সীমাবদ্ধতাই উন্মোচিত করেছে, করবে এর পরিধি। প্রেজেন্টেশনের ভিন্নতাই এর মূল কারণ, কারণ এর বিপুল ধারণ-সক্ষমতা। ছোট কাগজ যা কিনা এতোকাল এইসব চর্চার কেন্দ্রবিন্দু ছিলো, তার ক্ষেত্রে যেমন আছে ঐ নিয়মিত সময়কালে লেখাপত্র জোগাড় করে প্রকাশের সীমাবদ্ধতা। সময়ের দাসত্ব আর প্রকাশের সিনসিয়ারিটি রক্ষা করতে গিয়ে যাচ্ছেতাই অজস্র ছোট কাগজ বেরোচ্ছে; অভিঘাতহীন। এর সাথে যুক্ত আছে অর্থ সংস্থানের পারম্পর্য। আর হাজার হলেও লেখার দৈর্ঘ্য এখানে অতটা বিবেচ্য না হলেও শেষমেশ বিবেচনাধীন তো থাকেই, সেটা প্রকাশকের, সম্পাদকের আর্থিক সক্ষমতা-ফর্মাভিত্তিক যা, ফর্মা বাড়লে দাম বাড়ে। পাঠকের কেনার সক্ষমতার সাথে এর যুক্ততাও আছে। সহজে আদানপ্রদানের সীমাবদ্ধতা, আর্কাইভিং এর অপ্রতুলতা। যার ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছোট কাগজের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ইস্যু আজ ডায়নোসরের মতন বিলুপ্ত, কিছুবা ফসিল-জীর্ণ। আর সর্বোপরি যেটা কারণ সেটা হলো এর মার্কেটিং, একে নিজে নিজে পাঠকের কাছে পৌঁছাতে হয় নিজস্ব মার্কেটিং পলিসিতে। অন্যদিকে ওয়েব পত্রিকা কাজ করে স্বয়ং লেখক-পাঠকের ভার্চুয়াল দুনিয়ার এক মার্কেটিং অন্তর্জালের নাভির মধ্যে বসে। তাকে ছোটকাগজ, বড় কাগজ কারো মতোই অতটা শ্রমসাধ্য উপায়ে নিজেকে পাঠকের কাছে পৌঁছাতে হয় না। আর তার সাথে আছে ওয়েবের বিপুল পাঠক- সম্ভাবনা। ছোটো কাগজের যা নাই। এবারে অন্য প্রকাশমাধ্যম যাদের আছে বিপুল অর্থ-লগ্নির ক্ষমতা, দৈনিকে কিংবা অপরাপর সাহিত্যশিল্পচিন্তা বিষয়ক পত্রিকা, এগুলোতে সৎ, সিরিয়াস চর্চার সীমাবদ্ধতার কথা সর্বজনবিদিত।

এদের যেমন আছে শব্দসংখ্যা ধরে লেখা প্রকাশ বিষয়ক দু:শাসনের বাসনা, তেমনি কর্পোরেট মূল্যবোধ, ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক সংকীর্ণ মূল্যবোধের গণ্ডির ভেতরে কাজ করা ও পারপাস সার্ভ করার বাধ্যবাধকতা। লেখক এখানে তার স্বাধীন চিন্তা, কিংবা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, দীর্ঘ লেখা প্রকাশে অপারগ, ফলে কালে কালে এগুলো প্রায় সবসময়ই শিল্পসাহিত্যচিন্তা বিষয়ক একটা প্রতিষ্ঠিত মামুলি দৃষ্টিভঙ্গির পালক ও পোষক; যদিও তাদের পাঠকসংখ্যা এন্তার কিন্তু গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ চর্চার রিচুয়াল তারা গড়ে তুলতে পারে না। তাতেই তাদের ধর্ম রক্ষা হয়। ফলে চর্চার ক্ষেত্র হিসাবে এর সম্ভাবনা শুরুতেই মাঠে মারা পড়ে।

ত্রিমাত্রিক এইসব প্রকাশ মাধ্যমের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে ভার্চুয়াল দুনিয়া। এখানেও কালে কালে প্রকাশের ধরন বদলাচ্ছে। ব্লগ, ফেসবুক ইত্যাদি। এসব থাকতেও এই দুনিয়াতে ওয়েব পত্রিকার আরেকটা স্পেসের ধারণা তৈরি করা কেন দরকার, তার কারণ হিসেবে বলা যায়, ব্লগ বা ফেসবুক ব্যক্তির, লেখক-পাঠকের একক প্রকাশের ক্ষেত্র, একক চিন্তা, একই সাথে রঙ্গতামাশার ক্ষেত্র, গুরুত্ব অগুরুত্ব এইখানে পাশাপাশি বয়, যার যার মতো, যার যার খুশির বাহন। ফলে এখানেও গুরুত্বপূর্ণ চর্চার রিচুয়াল সেভাবে গড়ে ওঠে না। অনির্ধারিত অথচ স্পেসিফিক পাঠকরা এই মাধ্যমের ভেতর আলাদা করে চিন্তার অংশগুলি চিহ্নিত করতে অপারগ, তা সময়সাপেক্ষও, আর একালে তো সময়েরই বড় অভাব। তাছাড়া এগুলোতে আছে নানানরকমের অপ্রয়োজনীয় হেজিমনি, যা পাঠককে অনেক গুরুত্বপূর্ণ টেক্সটে যাবার আগেই খেয়ে ফেলে রাক্ষসের মতন, কিংবা পাঠকঅব্দি পৌঁছায় না অনেক গুরুত্বপূর্ণ টেক্সটের আহ্বান। এসব সমস্যা পাশ কাটিয়ে যদি অন্য কোনও উপায়ে একটা ফিল্টার করে লেখালেখি, পাঠ, প্রতিক্রিয়া, আলোচনা, সমালোচনার স্পেস তৈরি করা যায়, সেটা নিঃসন্দেহে অনেক ফলদায়ী। মত, পথ, রুচি গ্রহণ বর্জনের এক নির্বাচিত প্রক্রিয়ায় এটা কাজ করতে পারে। ওয়েব পোর্টালের জন্মের বীজ বোঝা যায় এই প্রত্যাশা থেকে নির্গত, প্রত্যাশাই এর জনক, ওয়েব স্পেস যার জননী। হাতের কাছে এতো বড় সুযোগ থাকতে কেন আমরা এর দ্বারস্থ হবো না। অন্য সকল প্রকাশমাধ্যমের সকল সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার অমিত সম্ভাবনা এর আছে। এর আছে বিপুল ধারণক্ষমতা, সিরিয়াস লেখককে আর শব্দ গুনে, পশ্চাৎপদ নানান মূল্যবোধ গুনে লিখতে হবে না। আগামীর চিন্তার চর্চা তাই ওয়ববেজ্ড। আগামীর সিরিয়াস লেখক পাঠকের জায়গা তাই ওয়েবে। এই সম্ভাবনার কাতারে তাই নিঃসংকোচে দাঁড়িয়ে, একাত্মতা ঘোষণা করলো “নকটার্ন”।

নকটার্ন হতে চায় সমসময়ের শিল্প-সাহিত্য- দর্শন-চিন্তা চর্চার একটা স্কুল অব থট। আমাদের দৃষ্টি বহুদূর, আমরা পৌঁছাতে পারবো কি না জানি না, চেষ্টা থাকবে শতভাগ। নকটার্ন গভীর মনোযোগের সাথে চেষ্টা করবে আলোচিতের পাশাপাশি, তুলনামূলক কম আলোচিত, অনালোচিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ, কার্যকরী নানান ক্ষেত্রে তাদের প্যারালাল এক্সপ্লোরেশনের। আমরা চিন্তাকে, ক্রিটিক্যাল অ্যানালিসিস কে গুরুত্ব দেবো। ক্ল্যাসিক, নন্দন, নন্দনের উৎকর্ষ আমাদের আগ্রহের বিষয়। নানান-মতের পথের ঘরানার একটা সন্নিবেশ ঘটিয়ে আমরা পাঠকের সামনেই হাজির করতে চাই চিন্তার বাজার। পাঠক তার পছন্দ অনুযায়ী বাজার করুন। তুলনা-প্রতিতুলনায় যাচাই করুন বাজার ঘুরে। চলমান, সম্ভাব্য সকল চর্চার ক্ষেত্র নকটার্নের আকাঙ্ক্ষার আওতাভুক্ত। সব চিন্তা গুছিয়ে এবারে আমরা যখন আমাদের নিজেদের ওয়েব স্পেসে নকটার্নের যাত্রা শুরুর জাহাজ খাটাতে ব্যস্ত, জানা গেলো দীর্ঘ বিরতিতে আমাদের কিনে রাখা ডোমেইন ইনভ্যালিড হয়ে গেছে। ক্ষুধার্তের চোখের সামনে নদীতে ডুবে গেলো গাছপাকা ফল। কেমন লাগে! আবার এর ব্যবস্থাপত্র করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকলে এর চেয়ে দীর্ঘসূত্রতা আর হয় না। কী আর করা, শেষমেশ সিদ্ধান্ত হলো নতুন করে ডোমেইন ইস্যু করার আগ পর্যন্ত নকটার্ন শুরু হবে ওয়ার্ড প্রেসে। আপাতত ওয়ার্ড প্রেসেই প্রকাশিত হল নকটার্ন। আমরা যাত্রাটা শুরু করে দিতে চাই। তাই করা হলো। যৎসামান্য লেখা দিয়ে আমরা শুরু করলাম। এই শুরুই আমাদের নিয়ে যাক পরের পর্যায়গুলোতে। ক্রমাগত নকটার্ন আরও উৎকর্ষ সাধন করবে, লেখায়, প্রেজেন্টেশনে, গভীরতায়। আমরা আত্যন্তিক চেষ্টা করবো প্রত্যাশানুযায়ী কাজ করার। এই যাত্রায় সবাই আমাদের সঙ্গে থাকুন কামনা করি। সবাইকে শুভেচ্ছা, অভিনন্দন!!! সবাইকে “নকটার্ন”‘র দুনিয়ায় স্বাগতম…

নামলিপিঃ নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

বিশেষ কৃতজ্ঞতাঃ অর্পণ দেব, বিজয় আহমেদ, গ্যাব্রিয়েল সুমন

 

সম্পাদকঃ

অমিত চক্রবর্তী

আল ইমরান সিদ্দিকী

হিজল জোবায়ের

…………………………………………………………………………………………………….

‘নকটার্ন’   – এ লেখা পাঠানোর ঠিকানা:

অমিত চক্রবর্তী:  ac05074@gmail.com

আল ইমরান সিদ্দিকী:  imran831002@gmail.com

হিজল জোবায়ের:  hijoljobayer@yahoo.com

…………………………………………………………………………………………………

Advertisements