marx_1272963216_1-bid

 ১.

বাংলার জাতীয়-কবি নির্বাচনে রবীন্দ্রনাথের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন চণ্ডীদাস; আর, ভোটাধিকার সর্বজনীন হ’লে, আমার বিশ্বাস, চণ্ডীদাসই হবেন নির্বাচিত। অবশ্য এই সর্বব্যাপী জনপ্রিয়তাকে অধিকাংশ সাহিত্যালোচকই একটা ঋণাত্মক গমনবিন্দু বিবেচনা করতে পারেন, এবং তা, অনেকটাই, সঙ্গত কারণেই। কেননা, আমাদের হয়তো অবিদিত নয় যে, আজও ‘আপামর’ বাঙালি কাব্যভোক্তৃসমাজে গীতাঞ্জলি  অপেক্ষা “মনসার ভাসান” অনেক বেশি জনপ্রিয়; জনপ্রিয় জীবনানন্দের চেয়ে নজরুল। এ-ধরনের উদাহরণে অন্ততঃ এটা প্রমাণিত হয় যে লোকপ্রিয়তাই কবিতার উৎকর্ষের মানদণ্ড নয়— বরং, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, উল্টাটাই বেশি সত্য। পারতপক্ষে প্রায় কোনো লোকপ্রিয় কবিতাকেই আমরা সন্দেহমুক্ত দৃষ্টিতে দেখতে পারি না। কিন্তু এমতো নজিরও বাড়ন্ত নয় যে একই কবিতা একাধারে লোকপ্রিয় ও উৎকৃষ্ট; এবং এর উল্টাটা, অর্থাৎ একাধারে লোক-অপ্রিয় ও অপকৃষ্ট কবিতার নমুনা তো, বলা বাহুল্য, ভূরিভূরি। মানে, কবিতার উৎকর্ষের নিরিখ লোকপ্রিয়তা যদিচ নয়, তবু, মাঝেসাঝে কোনো-কোনো উৎকৃষ্ট কবিতাকেও লোকপ্রিয় হ’তে দেখা যায়, এবং সাহিত্যের ব্যাকরণে সেটা স্বতঃসিদ্ধ না-হ’লেও, নিপাতনে সিদ্ধ তো বটেই। প্রায় সমগ্র বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্যই এর পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। ন্যূনাধিক পাঁচ-শতাব্দী-ব্যাপ্ত বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্যের ধারায় এ-ব্যতিক্রম প্রায় একটা নিয়মেই পরিণত হ’য়ে গিয়েছে বলা যায়। বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, যদুনন্দন, মাধব দাস, লোচন দাস, রায় শেখর, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস, বৃন্দাবন দাস, নরোত্তম দাস, বলরাম দাস, নরহরি, জগদানন্দ, রাধামোহন, সৈয়দ মর্তুজা— এই তালিকাকে আরও অনেক লম্বা করা সম্ভব— এঁরা সবাই, পর্যায়ক্রমে, উপর্যুক্ত ব্যতিক্রমের অঙ্কগত। বস্তুতঃ আর-কোনো ধারাতেই এতদধিক জনপ্রিয় এবং উৎকৃষ্ট কবি মিলবে কীনা সন্দেহ। এঁদের মধ্যে চণ্ডীদাস আবার বৃহত্তম ব্যতিক্রম।

কবিতার উৎকর্ষ কী বা কীসে, এ-নিয়ে যেমন বিস্তৃত ও বিস্তর আলোচনা হয়েছে, হচ্ছে, এবং আরও হওয়াও সম্ভব— তেমনই, কোন্ বা কোন্-কোন্ গুণে (বা দোষে) কোনো কবি জনপ্রিয় হ’ন তা-নিয়েও আলোচনা অবান্তর নয়। এবং এ-দুই বিষয়ে একটা-কোনো মোটামুটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে উপনীত হ’তে পারলে, কোন্ গুণ বা গুণসমূহের কী-প্রকার অন্বয়নসাপেক্ষে কোনো কবি যুগপৎ উৎকৃষ্ট এবং জনপ্রিয় হ’তে পারেন তারও একটা আন্দাজা পাওয়া বোধ করি একেবারে অসম্ভব হবে না। বিষয়টি এ-কালের কবিদের পক্ষে বিশেষতঃ অনুসন্ধেয় ব’লে মনে হয়। ইদানীং কবিতা লোকপ্রিয়তা থেকে যতটা স’রে এসেছে, তাতে, “এ-অবস্থা চলতে থাকলে”, কবিতার পাঠকত্ব কোনোদিন শূন্যাঙ্কে নেমে যাওয়া বিচিত্র হবে না। অবশ্য, এ-ও আমি অবশ্যই অনুমোদন করি না যে “সস্তা” জনপ্রিয়তার মায়ামৃগের পশ্চাদ্ধাবন ক’রে ক’রে কবিতা শিল্প থেকে পণ্যে পর্যবসিত হোক।

তবু, কবিতা তার স্বাসনচ্যুত না-হ’য়েও লোকপ্রিয় হ’তে পারে কীনা, কিংবা পারে না কীনা, অদ্যতন কবিদের এটা অবশ্য-ভাবনীয় মনে হয়। সুবিধার্থে, ক’জন জনপ্রিয় কবিকে আমরা বাজিয়ে দেখতে পারি : ভারতচন্দ্র কেন জনপ্রিয়, ঈশ্বরগুপ্ত কেন, কেন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল; কেন শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সুকান্ত, শক্তি, শঙ্খ, জয়— বিপরীতক্রমে, মাইকেল কেন জনপ্রিয় ন’ন, কেন ন’ন মোহিতলাল, সুধীন্দ্রনাথ, অমিয় চক্রবর্তী, ফরহাদ মজহার, কালীকৃষ্ণ গুহ— ইত্যাদি নানা প্রশ্নের উত্তর পেতে থাকলেই হয়তো কবিতার জনপ্রিয়তার কারণগুলি অল্পবিস্তর বোঝা যাবে (এ-ফর্দ দেখে অনেকেই খেপে উঠতে পারেন; কিন্তু জনপ্রিয়তা বলতে এখানে সর্বসাধারণ্যে জনপ্রিয়তাই বোঝানো হচ্ছে— অতিসীমিত “বিদগ্ধ” পাঠকদেরকে বাইরে রেখে; এবং পরে জনপ্রিয়তার যে-বিভাজনটি আছে, সেটাও, আম-পাঠকের দৃষ্টিকোণ থেকেই)। অবশ্য একমেবাদ্বিতীয়ম্ কোনো “কারণ” এর থেকে নিঃসৃত হবে না। কারণ, যে-কারণে ভারতচন্দ্র জনপ্রিয়, ঠিক সেই কারণেই রবীন্দ্রনাথ জনপ্রিয় ন’ন (এই কথাটার দ্ব্যর্থকতা আমি কিছুতেই এড়াতে পারলাম না! আমার বলার উদ্দেশ্য : কবিগুণাকর ও কবিগুরু একই কারণে জনপ্রিয় ন’ন, তাঁদের জনপ্রিয়তা ভিন্ন-ভিন্ন কারণে; কিন্তু দেখুন বাংলা ভাষার প্যাঁচ : বাক্যটির দ্বিতীয় অংশের এমনও মানে সহজেই হয় যে যে-কারণের দ্বারা ভারত জনপ্রিয়, সেই একই কারণের দ্বারা রবি “অ-জনপ্রিয়”!); তেমনি, জীবনানন্দ ও নজরুলও, একই কারণে (এবং একই পাঠকগোষ্ঠির মধ্যে) জনপ্রিয় ন’ন। পক্ষান্তরে, একই কারণে মোহিতলাল ও সুধীন্দ্রনাথ অ-জনপ্রিয় ন’ন।

তাহলে জনপ্রিয়তাকে বহু ভাগে ভাগ করা সম্ভব। যেমন, গীতিকাব্যিক জনপ্রিয়তা (বিহারীলাল চক্রবর্তী, গোবিন্দচন্দ্র দাস, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, নজরুল), রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা (নজরুল, সমর সেন, সুভাষ, সুকান্ত), গ্রাম্য জনপ্রিয়তা (জসীম উদদীন, বন্দে আলী মিয়া), যুগীয় জনপ্রিয়তা (শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সুনীল, শক্তি, রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ) ইত্যাদি। কিন্তু এহ বাহ্য। আসলে জনপ্রিয়তাকে কালিক এবং কালোত্তীর্ণ বিভাজনে দ্বিধা করলে সেটাই হবে সবচেয়ে নির্ভুল বিভাজন, এবং তা আবার জনপ্রিয় কবির উৎকর্ষ-বিচারেও কাজে লাগবে। আপন যুগকে কবিতার উপজীব্য করেন প্রায় সব কবিই, কিন্তু অত্যল্পই তাঁর কাব্যে যুগোত্তীর্ণ আবেদন সঞ্চার ক’রে আপন যুগের পরেও জনপ্রিয় হ’তে পারেন। যাঁরা পারেন, তাঁরা প্রায় কোনো বিচার ছাড়াই বড় কবি। এ-ক্ষেত্রে কালোত্তীর্ণ জনপ্রিয়তাই তাঁদের উৎকর্ষের একটা নিরিখ। এই কষ্টিপাথরের নীচে, মনে হয়, চণ্ডীদাসই বাংলার সবচেয়ে খাঁটি সোনা।

২.

একজন বড় কবির একটা বড় পরিচয়চিহ্ন হ’ল, অনুবর্তী সাহিত্যে তাঁর প্রভাব। অবশ্য যাঁরা স্রেফ উল্লিখনকে (বা অনুকরণ-হনূকরণকে) প্রভাব ব’লে বোঝেন, তাঁদের উদ্দেশে এসব বলা হচ্ছে না। কিন্তু আমার বিশ্বাস যে অধিকাংশ সাহিত্যরসিক বা সমালোচকই “ও”-শ্রেণির ন’ন। অবশ্য প্রভাব ব্যাপারটা সাহিত্যের অপরাপর বহু সংজ্ঞাপকের মতোই, বিমূর্তপ্রায়; কাজেই, দুর্বোধ্যপ্রায়। এক কবির ঠিক কোন্ লক্ষণগুলি আরেক কবিতে পেলে তাকে প্রভাব বলা যাবে, তা নিরূপণ করা দুরূহ। তবে ব্যাপারটা যেহেতু গণিত নয়, তাই, তার সংজ্ঞার্থ উদ্ভাবনে বুদ্ধিবৃত্তি হিমশিম খেলেও, অনুভব তার একটা আপাত ধারণা দিতে পারতেও হয়তো পারে। বস্তুতঃ প্রভাবের পরিসর অপরিসীম ব’লেই আমার বিশ্বাস— তবে, বিশেষ সুবিধার্থে আমরা তাকে সঙ্কোচিত ক’রে আনলে, উপলব্ধি ও প্রকাশ (অর্থাৎ প্রকাশভঙ্গি বা প্রকরণ), এই দুই বিষয়ে আমাদের লক্ষ্য স্থির করতে পারব, এবং তখন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ-ভেদে আরও এক ভিন্ন বিভাজনেও প্রভাবকে ভাগ করা সম্ভব হবে।

উপলব্ধি কিংবা/এবং প্রকাশভঙ্গি এক কবি থেকে আরেক কবিতে সঞ্চারিত হ’লে তাকে বলব প্রভাব, এবং এই সঞ্চার-প্রক্রিয়ায় অধমর্ণ কবি যদি সচেতনভাবে প্রভাবিত হ’ন, তাকে প্রত্যক্ষ, এবং অবচেতনভাবে হ’লে তাকে পরোক্ষ প্রভাব বলব। অবশ্য পরোক্ষ কথাটার মধ্যে যে একটা তৃতীয় পাক্ষিক ব্যঞ্জনা রয়েছে, তাকে বাদ দিয়েই নিতে হবে কথাটাকে। অনুবর্তী কবি সাঙ্ঘাতিকভাবে সমাবর্তনপ্রবণ না-হ’লে, প্রত্যক্ষ প্রভাবের গণ্ডি সাধারণতঃ দু’-তিন দশকের মধ্যেই সীমিত। কিন্তু পরোক্ষ প্রভাবের বিস্তার আক্ষরিক অর্থেই অসীম। য়ুরোপায়ণ হ’লে বলতে হ’ত “ফ্রম হোমার অনওয়র্ড্‌জ্”। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে বলা যায় “চর্যাপদ (বা গীতগোবিন্দ বা…) থেকে আজতক”।

চণ্ডীদাসের প্রত্যক্ষ প্রভাব, বলা বাহুল্য, বৈষ্ণব পদাবলি ধারাতেই সীমাবদ্ধ, যদিও তার কালপরিধি, একটু আগেই বলা, দু’-তিন দশকের স্থলে চার-পাঁচ শতক হবে। এরকম সুদীর্ঘ সময় ধ’রে অনুবর্তী সাহিত্যকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করতে পেরেছেন শুধুমাত্র চণ্ডীদাস এবং বিদ্যাপতি। পৃথিবীর ইতিহাসেই এ-ঘটনা অতুলান। আসলে গোটা বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্যই এই দুই মহাজনের কাছে কমবেশি দায়বদ্ধ। এ-দু’জনের প্রভাবে বৈষ্ণব সাহিত্য দু’টি আলাদা ধারায় সমান্তরালভাবে প্রবাহিত হ’য়ে গিয়েছে। এদের যে-প্রভেদ তা শুধু ভাষাগত, অর্থাৎ বাংলা— ও ব্রজবুলিগত, নয়; তা ব্যাপকভাবে আদৌ উপলব্ধি- ও প্রকাশগত। পরে হামেহাল দেখা যায় যে একই কবি উভয় ধারাতেই পদ রচনা করছেন (যেমন বলরাম দাস), কিন্তু দু’টি ধারাকে মিশিয়ে দেবার কোনো তাগিদ বোধ করছেন না (বলরাম দাসের ব্রজবুলি পদগুলায় যে-পরিমাণ চণ্ডীদাসত্ব আছে তাকে বলরাম দাসত্ব বলা-ই বেহ্‌তর। কিংবা তাকে চণ্ডীদাসের প্রত্যক্ষ না-ব’লে পরোক্ষ প্রভাব বলা যায়)। আবার প্রত্যক্ষ প্রভাবের ক্ষেত্রে চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতিকে মেলা-মাইল ছাড়িয়ে গেছেন। দেখতে পাচ্ছি যে বিদ্যাপতির ধারার কবি হ’লেও, গোবিন্দদাস বহুক্ষেত্রেই স্বকীয়তার পরিচয় দিতে সমর্থ হয়েছেন। সমর্থ হয়েছেন কোনো-কোনো ক্ষেত্রে আদিপিতাকে ম্লান ক’রে দিতেও :

            যাঁহা পহুঁ অরুণচরণে চলি যাত।

            তাঁহা তাঁহা ধরণী হোই এ মঝু গাত॥

            (যেথায় যেথায় অরুণচরণে হেঁটে যায় প্রভু মম

            সেথায় সেথায় এ-শরীর শুয়ে থাকে ধরণির সম। — সু. অ. গো.)

এ-উচ্চারণ গোবিন্দদাসেরই, বিদ্যাপতির নয়। স্মরণ করা যাক কবিবল্লভের সেই অনন্যসাধারণ পদটি :

                           সখি হে কি পুছসি অনুভব মোয়।

                সোই পিরীতি                           অনুভব বখানিতে

                                তিলে তিলে নৌতুন হোয়॥

এ-পদে বিদ্যাপতির সুর আমরা শুনতে পাই বটে, কিন্তু তাকে ছাপিয়ে উঠতে দেখি কবিবল্লভের অসাধারণ কবিত্বকে :

            জনম অবধি হাম                       রূপ নেহারলুঁ

                             নয়ন না তিরপিত ভেল।

            লাখ লাখ যুগ                          হিয়ে হিয়ে মুখে মুখে

                        তব হিয়ে জুড়ন না গেল॥

 আবার, হুবহু বিদ্যাপতির অনুলিখন একেবারে অপ্রাপ্তব্য নয়— যেমন, রায় শেখরের অনেক পদকেই ব’লে না-দিলে বিদ্যাপতির ব’লেই মনে হবে। বস্তুতঃ, তাঁর (রায় শেখরের) কিছু পদকে বহুদিন যাবৎ বিদ্যাপতির ব’লেই মনে করা হ’ত, যেমন এই অতি উমদা পদটিকে :

                  সখি হে হামারি দুখের নাহি ওর।

            ই ভর বাদর                         মাহ ভাদর

                        শূন্য মন্দির মোর॥

 কিন্তু চণ্ডীদাসের ধারায় আরও অধিকসঙ্খ্যক উৎকৃষ্ট কবি থাকলেও, তাঁরা প্রায় কখনোই চণ্ডীদাসকে অতিক্রম করতে পারেন নি। এ-কথা সত্য এমনকি জ্ঞানদাস, বলরাম দাসেরও ক্ষেত্রে। বলরাম দাসের :

            তুমি মোর নিধি রাই তুমি মোর নিধি।

            না জানি কী দিয়া তোমা নিরমিল বিধি॥

 এই পদটির মতো সুন্দর কবিতা গোটা বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্যে (বা সাহস দিলে বলি, গোটা বাংলা সাহিত্যে) বিরল :

            যতনে আনিয়া যদি ছানিয়ে বিজুলি।

            অমিয়ার সাঁচে যদি রচিয়ে পুতুলি॥

            রসের সায়র মাঝে করাই সিনান।

            তভু তো না হয় তোমার নিছনি সমান॥

 অপিচ :

            হিয়ার ভিতরে থুইতে নাহি পরতীত।

            হারাঙ্ হারাঙ্ হেন সদা করে চিত॥

            হিয়ার ভিতর হৈতে কে কৈল বাহির।

            তেঁই বলরামের পঁহুর হিয়া নহে থির॥

 কিন্তু তা-সত্ত্বেও, এই পদের কোনো শ্রেষ্ঠ পঙ্‌ক্তিতেও (উঁহু, ভুল বললাম, এই পদের সবগুলি পঙ্‌ক্তিই শ্রেষ্ঠ) চণ্ডীদাসকে বিস্মৃত হওয়া যায় না। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, চণ্ডীদাস-পরবর্তী যে-কোনো উত্তম বাংলা বৈষ্ণব পদকেই চণ্ডীদাসের ব’লে ভাবতে পারা অসম্ভব নয়। বরং চণ্ডীদাসত্বই তাদের উৎকর্ষের নিরিখ হ’য়ে দাঁড়িয়েছে। মানে, পরবর্তী কালে যে যত-বেশি চণ্ডীদাসকে ছুঁয়ে যেতে পেরেছে সে তত-বড় কবি বিবেচিত হয়েছে। জ্ঞানদাসে কবির নামটুকু ছাড়া প্রায় সবকিছুই চণ্ডীদাসের, এবং প্রায় এ-জন্যেই, জ্ঞানদাস বড় কবি। (প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ করি, সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর প্রবন্ধবিশেষে, “সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিলুঁ আনলে পুড়িয়া গেল”— জ্ঞানদাসের এই পদটিকে চণ্ডীদাসের ব’লে উল্লেখ করেছিলেন। বিষয়টি উল্লিখনীয় এ-কারণেই যে, পদটিতে চণ্ডীদাসত্ব এতই প্রকট যে ডঃ আলীর মতো পণ্ডিত ব্যক্তিও এমন অসাবধানী ভুল ক’রে ফেলতে বাধ্য হয়েছিলেন, এবং চণ্ডীদাস-পরবর্তী বহু শ্রেষ্ঠ পদ বিষয়ে একই রকমের ভুল একই কারণে বহু পণ্ডিতেরই করা সম্ভব, আমার মতো পামর জনগণের তো কথাই নাই।) বিদ্যাপতির ঘরানায় এটি সত্য নয়, তা আগেই বলা হয়েছে।

কিন্তু চণ্ডীদাসের কবিতা প’ড়ে আমাদের চোখ টাটায় না। তার মানে, চণ্ডীদাসের কবিতাকে আমাদের পুরাদূর সংস্কার-বিরোধী বা স্বয়ম্ভুপ্রকাশ ব’লে মনে হয় না। মনে হয়, একটি বিশিষ্ট ধারার প্রবর্তক তিনি ন’ন; বরং, একটি প্রচলিত ধারার সবচেয়ে বিশিষ্ট কবি তিনি। অর্থাৎ, “নূতনতা” (এ-শব্দের চিরন্তন অর্থের চেয়ে, সাম্প্রতিক “চমৎকারিতা”-ই বুঝতে হবে) তাঁর কবিতায় বিশেষ নাই। আসলেই কি তাই? চণ্ডীদাসের পূর্বসূরিরা কাঁরা? এ-ক্ষেত্রে জয়দেবের নাম অনেকেই নিতে পারেন, কারণ, বৈষ্ণব কবিতা-ধারার জয়দেবই প্রবর্তক, এটা একটা প্রতিষ্ঠিত মত। কিন্তু জয়দেব ও চণ্ডীদাস (শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-কে বাদ দিয়ে বলা হচ্ছে) একত্রে পাঠ করলে পাঠক দেখতে পাবেন যে, যতখানি আত্মীয়তাকে প্রভাব বলা যায়, তার একরতি জয়দেবে-চণ্ডীদাসে নাই। ‘চর্যাপদ’?— শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-কে চণ্ডীদাসস্য মেনে নেওয়ায় আপত্তি না-থাকলে, চর্যাপদের কিছু প্রভাব চণ্ডীদাসে আছে মনে করা যায়। অবশ্য সেটি সরাসরি না লোকায়ত সহজিয়া ধর্ম-সাহিত্য মারফত, তা নিশ্চিত ক’রে বলা যায় না। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ হামেশাই “অষ্ট মহাসিদ্ধি”, “ত্রিদশ”, “আষ্ট ধাতু” প্রভৃতি চার্যাপদিক অনুষঙ্গাদির উল্লেখ পাই। চর্যাপদের দু’-একটি প্রবাদপ্রতিম চরণেরও অনুবাদ দেখি, যেমন, ভুসুকুর “অপণা মাংসেঁ হরিণা বৈরী”-কে “আপনার মাংসে হরিণী জগতের বৈরী”-রূপে দেখি। চর্যাপদের প্রভাব বোঝাবার জন্য একটা গোটা পদ উদ্ধার করছি, এবং একেবারে অনুবাদের মতো অংশগুলিকে নিম্নরেখাঙ্কিত করলাম :

            আহোনিশি যোগ ধেয়াই।

            মনপবন গগনে রহাই॥

            মূল কমলে কয়িলে মধুপান

            এবেঁ পাইঞা আহ্মে ব্রহ্মগেয়ান॥

            দূর আনুসর সুন্দরি রাহী।

            মিছা লোভ কর পায়িতেঁ কাহ্নাঞি॥

            ইড়া পিঙ্গলা সুসমনা সন্ধি

            মনপবন তাত কৈল বন্দী

            দশমী দুয়ারে দিলোঁ কপাট

            এবেঁ চঢ়িলোঁ মো সে যোগবাট॥

            গেয়ানবাণেঁ ছেদিলোঁ মদনবাণ।

            তে আর না ভোলোঁ তোহ্মার যৌবন॥

            এবেঁ দেহে মোর নাহি বিকার।

            আসার দেখীলোঁ সব সংসার॥

            রাধাক বুলিল নিঠুর বাণী।

            নাগরবর দেব চক্রপাণি॥

            ধেয়ানে থাকিল নিশ্চল মনে।

            গায়িল বড়ু চণ্ডীদাস বাসলীগণে॥

অবশ্য, এ-ও লক্ষ করা যাচ্ছে যে উপর্যুল্লিখিত উদাহরণনিচয় আসলে উল্লিখন, ঠিক প্রভাব নয়।

krishna-blue

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর কবির সঙ্গে পদাবলির চণ্ডীদাসের বিভেদ নিয়ে পণ্ডিতমহলে যে-হৈচৈ, তাতে অসমর্থ পদক্ষেপ না-ক’রেও, আমি এযাবৎ বিশ্বাস করি যে, উভয় রচনাই একই কবির। কারণ, (দীনেশচন্দ্র যেমন বলেন) নামের আগে বড়ু, দ্বিজ, দীন প্রভৃতির ব্যবহার (স্বদত্ত বা পরদত্ত) উপাধি হ’তেই পারে। দীন, দ্বিজ ইত্যাদি অন্য আরও কবিদের ভণিতায় আমরা দেখেছি। সুতরাং, শুধু এ-সবের দ্বারাই চণ্ডীদাসের একাধিকতা প্রমাণ করা অসম্ভব। দ্বিতীয়তঃ, উভয় রচনার ভাষাগত যে-ভিন্নতা, অর্থাৎ ‘কীর্তনের’ ভাষার, পদাবলি অপেক্ষা নিঃসন্দেহজনক প্রাচীনতা, সে-বিষয়ে দীনেশচন্দ্রের মত হচ্ছে যে পদাবলি অধিক প্রচলিত থাকায়, তার ভাষা যুগে-যুগে লিপিকর ও গায়েনদের হাতে-মুখে বদ্‌লে বদ্‌লে গেছে, আধুনিকায়িত হয়েছে। মূলে হয়তো উভয় রচনার ভাষা একই রকমের ছিল। তাছাড়া, উভয় রচনার কবিই বাশলী-বন্দক (বাশলী বা বাশুলী বা বাসলী দেবীর বন্দনা চণ্ডীদাসে যেমন, আর কোথায় তেমন দেখি নি। এ-দেবীর একটা মন্দির ছিল চণ্ডীদাসের নিবাসগ্রাম নান্নুরে। নান্নুর গ্রাম এখনও আছে, মন্দিরটিও সম্ভবতঃ। পদবিশেষে এ-দুইয়ের একত্র উল্লেখ পাই, “নানুরের মাঠে গ্রামের নিকটে বাশুলী আছয়ে যথা” ইত্যাদি)।

কিন্তু, উভয় রচনার কবিকে আলাদা ব্যক্তি মনে করবার যেটি সবচেয়ে সখ্‌ৎ বাজা, তা হ’ল এই যে, এ-দুই রচনার সুর একেবারে আলাদা। ‘কীর্তন’ প্রায় পুরাপুরি জয়দেবের অনুসারী (“তোর রতি আশোয়াসে গেলা অভিসারে” পদটি তো স্পষ্টতঃ জয়দেবের “রতিসুখসারে গতমভিসারে” পদের অনুলিখন), প্রায় আগাপাস্তলা শৃঙ্গাররসাত্মক। পক্ষান্তরে পদাবলি প্রায় আপাদমস্তক কামগন্ধহীন। ‘কীর্তনে’ সামান্যতম সুযোগে কামকেলির রগরগে বর্ণনা; পদাবলিতে একেবারে নাচার না-হ’লে তার প্রায় উল্লেখই নাই। “এক তনু হৈয়া মোরা রজনি গোঁয়াই”-ই বোধ হয় চণ্ডীদাসের পদাবলির সর্বাপেক্ষা আদিরসাত্মক বাক্য। একটি পদের উদ্ধার করছি, যাকে বেখেয়াল পাঠক কামগন্ধী মনে করতে পারতেও পারেন, কিন্তু একটু অভিনিবিষ্ট হ’লেই, সেইজন্যেই তাঁকে লজ্জিত হ’তে হবে :

            আমি যাই যাই বলি বোলে তিন বোল।

            কত না চুম্বন করে কত দেই কোল॥

            করে কর ধরিয়া শপথি দেয় মোরে।

            পুনঃ দরশন মাগি কত চাপে কোরে॥

            পদ আধ যায় পিয়া চায় পালটিয়া।

            বয়ান নিরখে কত কাতর হইয়া॥

            নিগূঢ় পিয়ার প্রেম আরতি করু বহু।

            চণ্ডীদাস কহে প্রেম হিয়ার মাঝে রহু॥

কামের পঙ্ক নয়, প্রেমের পঙ্কজ এর লব্জে লব্জে। অথচ ‘কীর্তনে’ অবস্থা প্রায় সর্বদাই বিপরীত। পদবিশেষে রাধা যখন কৃষ্ণকে অনুরোধ করছেন :

            প্রাণ কাহ্নাঞি ল

            আহ্মাসম না করিহ আনে।

তখন আমরা চমৎকৃত হই। কিন্তু এই পঙ্‌ক্তিটির আগে-পরে প’ড়ে যবে বুঝি যে অনুরোধটা করা আসলে হচ্ছে যাতে শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে (রাধাকে) ছাড়া অন্য কোনো নারীর সঙ্গে কামকেলিতে লিপ্ত না-হ’ন সেজন্য, তখন মনটা স্বতই খারাপ হ’য়ে যায়।

তো দু’টি রচনা, এ-কারণেই দ্বিমেরুপ্রান্তিক, এবং একই কবির এহেন স্ববিরোধ সুবিরল। তবে দীনেশচন্দ্র মনে করেন, ‘কীর্তন’ কবির প্রথম যৌবনের রচনা, যখন-অব্দি তাঁর অনুভূতি ও প্রকাশ আদৌ নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে নি; গীতগোবিন্দম্ প্রভৃতি কাব্য ছিল তাদের মডেল। তাছাড়া ‘ধামালি’ নামক তৎকালে প্রচলিত এক ধরনের কদর্য নৃত্যগীতিনাট্যের কথা বলেছেন দীনেশচন্দ্র, বলেছেন, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন আদতে সেই জাতীয়ই রচনা, ফরমাশি, বাজারে। অবশ্য এই ‘কীর্তনেও’ এমন বহু পদবন্ধ পাই, যা আমাদের চির-পরিচিত চণ্ডীদাসকেই বার বার মনে করিয়ে দেয়, যেমন :

            আছুক পরশরস দরশন নাহি।

            যে ডালে করোঁ মো ভরে।

            সে ডাল ভাঙ্গিয়া পড়ে॥

            মাকড়ের হাতে নারিকল।

            খাইতে সাধ ভাঙ্গিতে নাহি বল॥

            বড়ু কহে বাসলীর বরে।

            বাঙন কি চাঁদ ধরে করে॥

            পাখি নহোঁ তার ঠাঞি উড়ী পড়ি যাওঁ।

            মেদেনী বিদার দেউ পসিআঁ লুকাওঁ॥

            সুন্দরি রাধা ল সরোঅরময়ী।

            দুসহ বিরহজরে জরিলা কাহ্নাঞি॥

            দহ বুলি ঝাঁপ দিলোঁ

            সে মোর সুখাইল ল।

ইত্যাদি।

আবার পদাবলির চণ্ডীদাসকেও অনেক পণ্ডিত একজন মনে করেন না। দ্বিজ, দীন, সহজিয়া, ইত্যাদি-ভেদে প্রায় আরও অন্ততঃ তিনজন চণ্ডীদাসের কথা তাঁরা বলেন। আগেই বলেছি যে ওগুলা ভণিতায় উপাধি হিসাবে ব্যবহৃত হ’তে পারে, এবং একই কবির পক্ষে একাধিক উপাধির ব্যবহার অসম্ভব নয়, বিশেষতঃ সেই আদিযুগে, তখনও, উপাধিকে একেবারে নামের অচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে ব্যবহারের রেওয়াজ চালু ছিল বা হয়েছিল কীনা তা-ও জানা যায় না। অবশ্য স্বীকার পেতে হয় যে দীন চণ্ডীদাসের পদ ব’লে যে-পদগুলি চিহ্নিত, তার অধিকাংশ কাব্যগুণে কিছু দীন। তবে, কোনো কবির সকল রচনাই একই মানের হবে, এরকমটাই তো অস্বাভাবিক। তা-সত্ত্বেও, এ-ও খুবই সম্ভব যে, যে-সকল রচনাকে আমরা চণ্ডীদাসের ব’লে পাঠ করছি, তার সবগুলাই, সর্বাংশে, চণ্ডীদাস-রচিত নয়। এতে আহাজারি করবারও কিছু নাই। আজ আমরা জানি যে, মহাভারত কাব্যের এক লক্ষ শ্লোকের সিংহভাগ, প্রায় আশি হাজার শ্লোকই, প্রক্ষিপ্ত। আগে অনেক লিপিকরই, অমরত্বের শর্টকাট হিসাবে, মহাকবিদের রচনাভ্যন্তরে সঙ্গোপনে আপনাপন রচনা ঢুকিয়ে দিয়ে রাজেন্দ্রসঙ্গমে তীর্থদর্শনের সুযোগ নিতেন। কিন্তু তাতে কী? চণ্ডীদাসের রচনায় ঢুকিয়ে-দেওয়া অন্যের রচনা তাঁর তুল্যমূল্য হ’য়ে উঠলে তা নিতে বাধা কোথায়? শেষ বিচারে যা আমাদের কাছে মুখ্য তা শিল্পকর্ম, শিল্পী নয়। কবিতা, কবি নয়। হোমারিক রচনাবলির রচয়িতা হোমার ব’লে সত্যিকারের কেউ হোক, বা নাম ভাঁড়িয়ে হেসিয়দ বা আর-কেউও হোক, তা নিয়ে মাথাব্যথা রসিকের একদমই নাই, গবেষকের থাকলে থাকুক। এই ফ্যাঁকড়াটি এড়িয়ে যেতেই “সাইকল” বা চক্র কথাটি চালু আছে। হোমারিক সাইকল, রোমান্টিক সাইকল (মেডিয়িভাল য়ুরোপে রচিত প্রধানতঃ আর্থার ও তাঁর গোলটেবিল নাইটদের বা শার্লেমান ও তার নাইটদের নিয়ে রচিত বহুসঙ্খ্যক রোমান্স্ কাব্য বিষয়ে), খৈয়াম সাইকলের মতো চণ্ডীদাস চক্রও আমরা বলতে পারি। তাতে তাঁর প্রতি অণুমাত্র অন্যায় করা হবে না। অর্থাৎ চণ্ডীদাসের মাপের কোনো বড় কবির ক্ষেত্রে এক্সক্লুসিভ হবার চেয়ে ইনক্লুসিভ হওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

 ৪.

কিন্তু ইতোমধ্যে উল্লিখিত চণ্ডীদাসের পূর্বজ, অর্থাৎ গীতগোবিন্দম্ বা চর্যাপদের তেমন কোনো প্রভাব পদাবলির চণ্ডীদাসে লক্ষণীয় নয়। তাহলে চণ্ডীদাসের পদাবলি নোতুন কেন মনে হয় না? কেন মনে হয় না চমকপ্রদ? এখানেই চণ্ডীদাসের শ্রেষ্ঠত্বের বীজ নিহিত, নিহিত জনপ্রিয়তারও মূল। বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের মধ্যে কে বেশি নোতুন?— প্রশ্ন করলে অনেকেই বলবেন, বিদ্যাপতি।— কেন? — কারণ, তিনি আমাদের মুহুর্মুহুঃ চম্‌কে দেন। আবার কেউ-বা কইবেন, চণ্ডীদাস।— কেন?— না, কারণ, তিনি প্রায় কখনোই আমাদের ভড়কান না। অনেকে কহেন আল মাহমুদ জীবনানন্দ-ধারার কবি। কিন্তু জীবনানন্দের সঙ্গে তাঁর মৌলিক পার্থক্য বিদ্যাপতি-চণ্ডীদাসের পার্থক্যের প্রায় সগোত্র।

দেখে-শুনে মনে প্রশ্ন জাগে, নূতনতা কী, বা নূতনত্বের এই বিপরীতমুখী ধারণাদ্বয়ের মধ্যে কোন্‌টি অধিকতর গ্রহণযোগ্য। এ-প্রশ্নের যে-কোনো উত্তরেরই বিরুদ্ধে সাধারণীকরণের অভিযোগ উত্থাপিত হ’তে পারে। তারচেয়ে অন্যভাবে বিবেচনা করা যাক বিষয়টাকে। অর্থ ও শব্দালঙ্কারের মধ্যে কোন্‌টি অধিক আদরণীয়? আমি যদি বলি অর্থ-, তার মানে এ নয় যে শব্দালঙ্কারকে পুরাপুরি বর্জ্য বলা আমার উদ্দেশ্য। আবার, সালঙ্কার ও নিরলঙ্কার সৌন্দর্যের মধ্যে কে বেশি সুখপ্রেক্ষণীয়? এ-কথার উত্তর আপনি যা-ই দিন, আপনাকে মানতেই হবে যে, সৌন্দর্য খাঁটি হ’লে জেয়র না-পরালে ক্ষতি হয় না যদিও, পরালেও, সৌন্দর্যহানির সম্ভাবনা সামান্যই, যদি সে-জেয়র হয় প্রকৃতই অলঙ্কার। হাতের বালা এক ভরি হ’লে তাকে অলঙ্কার বলা যায়, এক সের হ’লে তাকে বলতে হয় জিঞ্জির। অবশ্য, দোহাই লাগে, পাঠক, আমায় ভুল বুঝবেন না। আমি বিদ্যাপতি বা আল মাহমুদকে জিঞ্জির-সরবরাহক বলছি না। দু’জনেই আমার অতীব প্রিয় কবি। এ-প্রতিতুলনা ভালো-মন্দের নয়, বরং দু’-রকম ভালো-র, বা শ্রেয়ঃ ও শ্রেষ্ঠ-র।

আবার, শেক্সপিয়ার কেন নোতুন?— আজও তাঁকে পড়ছি ব’লে।— কেন পড়ছি?— কারণ, তিনি এতএতদিন বাদেও আমার সঙ্গে কথা বলতে পারেন, বোঝাতে পারেন, ভালো লাগাতে পারেন।— কীভাবে পারেন?— আমার উপলব্ধি, আমার দুর্দশা, আমার বীক্ষাকে তাঁর রচনায় প্রতিবিম্বিত ক’রে।— অ্যাদ্দিন আগে কীভাবে তিনি তা পারলেন?— সেটাই, শেক্সপিয়ার, হোমার, বাল্মীকি, গ্যোটে, রবীন্দ্রনাথ, চণ্ডীদাসের অমরতার গুহ্যসূত্র।

মানুষের কতকগুলি চারিত্রিক উত্তরাধিকার থাকে যা প্রায় জীনীয় উত্তরাধিকারের মতোই অমোঘ। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে, মানুষের জীবনযাত্রার, এমনকি, চিন্তাধারার পরিবর্তনের সঙ্গেও, এরা খুব কমই তাল মেলায়। এই উত্তরাধিকারের আবার জাতীয় ও আন্তর্জাতিকতার মাত্রাভেদ আছে। এই উভয়প্রকার উত্তরাধিকার, বিভিন্ন মাত্রায় সর্বজাতিতেই বিরাজমান। কিন্তু এসব-সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের কোনো সম্যক্ ধারণা থাকে না। রোদজলের মতো এদের তারা পায়, এবং রোদজলেরই মতো ব্যবহার করে। মহাকবিরা অণুবীক্ষণ-দৃষ্টিতে এদের নিরীক্ষণ করেন, এবং রোদজলেরই মতো সরলভাবে “দেখিয়ে” দেন। এবং যেহেতু নিত্যপরিবর্তনীয়ের চেয়ে চিরন্তনের প্রতিই তাঁদের মোহ সমধিক, তাই তাঁরা স্বীয় যুগ অতিক্রম ক’রে বহু-পরবর্তীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে সমর্থ হ’ন। এ-ই হচ্ছে তাঁদের “আধুনিকতা”, যা কোনোকালেই পুরানো হয় না। অথচ যাঁরা অতিসাম্প্রতে শ্যেনাক্ষ, নোতুন ঘটনা বলতে যাঁরা সবচেয়ে-পরে-ঘ’টে-যাওয়া ঘটনাটি বোঝেন, তাঁরা পুরানো হ’য়ে যান পত্রপাঠ। ধরা যাক প্রেম। প্রেমের অনুভূতি মানুষের একটা শাশ্বত উত্তরাধিকার। মনোবিজ্ঞানীরা কী বলেন জানি না, তবে, মনে হয়, মানুষ “মানুষ” হবার পর থেকে আজ পর্যন্ত সে-অনুভূতির তরবেতর বড়বেশি হয় নি। কিন্তু প্রেম নিবেদনের তরিকা পাল্টেছে যুগে-যুগে। এক্ষেত্রে, অনুভূতিটা নিয়ে যে-কবির কারবার, মহাকবিত্বের সম্ভাবনা তাঁরই বেশি। প্রেম-নিবেদনের পদ্ধতির যিনি কারবারি, তাঁর পক্ষে অমরতালাভ, সূচিবিবরে করী-প্রবেশের মতোই না-মুমকিন।

পরন্তু, মানবাত্মার রয়েছে কিছু চিরায়ত জিজ্ঞাসা, সন্দেহ, আর্তি— যারা নৈমিত্তিকতার নিত্যশঃ চাপে, ধোঁয়াশার মতো অবচেতনার গুমটি ঘরে ঘাপটি মেরে ব’সে থাকে। মহাকবিরা সেখান থেকে তাদের তুলে এনে সূর্যের মতো তাদের প্রকাশ ক’রে দেন, যার আলোকে মানুষের আভ্যন্তরিক অনুভূতিগুলি লহমায় কনকমুকুরের মতো ঝিকমিকিয়ে ওঠে। মানুষ নিজেকে চিনতে পারে সেই আলোয়— আপন আনন্দ বেদনা প্রেম বিস্ময় বিবমিষার মুখোমুখি হ’য়ে অভিভূত, মন্ত্রমুগ্ধ হ’য়ে যায়। বাইবেলে মৃত্যুপূর্বে ক্রুশবিদ্ধ যিশু যখন চিৎকার ক’রে ওঠেন : “পিতা! পিতা! কেন আমায় ত্যাগ করছ?” (এলিয়! এলিয়! লামা সাবাক্তানি?) সেই লা-জবাব চিরন্তন প্রশ্নটি প্রতিধ্বনিত হয় আমাদের আত্মায়। আমরা তাকে চিনতে পারি নিজের প্রশ্ন বলে, চিনতে পারি, নোতুন ক’রে, নিজেদেরও।

            বিষের গাগরী                          ক্ষীরে মুখ ভরি

                        কে না আনি দিল আগে।

            করিনু আহার                          না করি বিচার

                        এ বধ কাহারে লাগে॥

 চণ্ডীদাসের রাধার এ-প্রশ্নও মানবাত্মার একটা চিরন্তন জিজ্ঞাসা (তুলনা করুন এর সাথে, বাইবেলে যিশুর উপর্যুদ্ধৃত চিৎকারটির পূর্বরাত্রে, গেথসিমানি উদ্যানে, নিজ-আসন্ন মৃত্যুর চিন্তা ক’রে বলা : “এই বিষের পানপাত্র আমার সামনে থেকে সরিয়ে নাও,” -এর)। “এ বধ কাহারে লাগে” মানুষ জানে না, জানেন না নিশ্চয়ই চণ্ডীদাসও— জানলে তিনি নবি হতেন, কবি নয়। উত্তর না-জানলেও, মহাকবি তিনি এ-জন্যেই যে, মানুষের নিগূঢ়তম, গভীরতম আর্তিটিকে তিনি সরলতম, নিখুঁততম ভাষায় প্রকাশ করতে পেরেছেন। মানুষ তাঁকে অগ্রাহ্য করবে কীভাবে? এ তো কাটা-ঘায়ে নুনের ছিটা শুধু নয়, এ যে গর্ত থেকে ঘুমন্ত কেউটেকে খুঁচিয়ে বা’র করা! “কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে?”— জীবনানন্দের এই প্রশ্নের সর্বাপেক্ষা সদুত্তর হচ্ছে : মহাকবি।

panihati_festival_rtp_final

৫. “কাব্যং গ্রাহ্যমলঙ্কারাৎ”— বামনের এই কট্টর এবং দুর্গ্রাহ্য মতকেও একালে একটা ধনাত্মক অর্থ দেওয়া অসম্ভব নয়। বস্তুতঃ, “উপমা-ই কবিতার ভাষা” একালেরই একটা সংজ্ঞা, এবং এর নানা রকিতমার ব্যাখ্যা-ভাষ্য-তফসিরে, কালিদাসের সেই বিখ্যাত “কৃষ্ণসারের কণ্ডূয়ন”-ও উপমিত বলে সাব্যস্ত হ’তে পারে। উপমা (এখানে উপমা বলতে সমস্ত সাদৃশ্যমূলক অলঙ্কার, বা ইংরেজি মেটাফর বোঝাচ্ছি) কেন— এর উত্তরে দু’টি প্রতিষ্ঠিত বা প্রাতিষ্ঠানিক জবাব আছে : ক. অলঙ্করণের স্বার্থে, খ. পরিস্ফুটনের স্বার্থে। এককভাবে প্রথম কারণটির যাথার্থ্যরে বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো কঠিন, কিন্তু কবিতার ভাষার অন্যতম প্রধান যে-উদ্দিষ্ট, অর্থাৎ সৌন্দর্যবর্ধন, তাতে সে কামিয়াব হ’লে, তা স্বতই একটা কার্যকারণ পেয়ে যায়। কবিতার একমাত্র অন্বিষ্ট সৌন্দর্যসৃষ্টি না-হ’লেও, সেটি যে তার অন্যতম মোক্ষ তা মানতেই হবে। সেই দিকে যদি সত্যসত্যই কবিতাকে এগিয়ে দিতে পারে অলঙ্কার (বা উপমা), তবে সে তার অলঙ্কারত্ব হারায়, মানে, কাব্যাঙ্গে পরিণত হয়।

দ্বিতীয় কারণটি সম্পর্কে বলবার বিশেষ কিছু নাই। পরিস্ফুটনের স্বার্থে উপমার ইস্তামাল শুধু বৈধ নয়, সেটাই বিধি। এ-অর্থে অবশ্য গোটা কবিতাটাই উপমা। কারণ, কবিতামাত্রই একটা কিছু ফুটিয়ে তুলতে চায়, ভাষা দিয়ে, যা আসলে অনির্বচনীয়। এক্ষেত্রে ভাষা জিনিসটাই কার্যতঃ উপমা। উপমা-প্রয়োগে মুনশিয়ানা তাই হামেশা কাব্যসৃষ্টিতে সাফল্যের একটা মাপকাঠি। আবার কোনো কবির কল্পনার শক্তি ও স্বাতন্ত্র্যও নির্ণয় করা যেতে পারে তাঁর প্রয়োজিত উপমায়। বিদ্যাপতি অন্ধকার রাত-কে যখন বলেন “রয়নি কাজরবম” (কাজল-বমনকারী রাত), তখন তাঁর প্রেক্ষা ও কল্পনাশক্তির অসামান্য ভারসাম্যে আমরা মুগ্ধ হই। আবার যখন তিনি বলেন :

            বদন চাঁদ তোর              নয়ন চকোর মোর

                        রূপ অমিয়ারস পীবে।

কিংবা

            শীতের ওঢ়নি পিয়া গিরিসের বাও।

            বরিখার ছত্র পিয়া দরিয়ার নাও॥

কিংবা

            হাথক দরপন মাথক ফুল।

            নয়নক অঞ্জন মুহক তাম্বূল॥

            হৃদয়ক মৃগমদ গীমক হার।

            দেহক সরবস গেহক সার॥

তখন বুঝি যে অলঙ্কারশাস্ত্রে তিনি সুপণ্ডিত শুধু ন’ন, উপমা-প্রয়োগে তিনি যে-কোনো শ্রেষ্ঠ কবির সমতুলনীয়। তা-সত্ত্বেও, এহেন উপমার আবেদন শুধু আমাদের চোখের কাছেই। প্রসঙ্গতঃ জীবনানন্দের দু’টি চমৎকার (এবং বহু-আলোচিত) উপমা মনে পড়ছে; দু’টিরই উপমেয় চোখ : যাকে এক জায়গায় তিনি বলছেন, “বেতের ফলের মতো”, এবং স্থানান্তরে, “পাখির নীড়ের মতো”। (পাকা) বেতের ফলের খোশা ছাড়ালে তাকে ম্লান চোখের মতো দেখায় বৈকি। এটা জীবনানন্দ দেখিয়ে না-দিলে আমাদের হয়তো নজরেই পড়ত না। তো, সেটি “আবিষ্কার” করবার কৃতিত্ব তাঁকে দিতেই হবে। কিন্তু, কাক, বাবুই, কি অন্য কোনো পরিচিত পাখির বাসাকেই কোনো মানুষের চোখের মতো দেখায় কীনা সন্দেহ। এখানে উপমার কার্যকারণ-নির্ণয় চোখের অসাধ্য। দরকার আমাদের বোধের শুধু নয়, বোধির। উপমাটি এক্ষেত্রে “আবিষ্কৃত” নয়, “উদ্ভাবিত”।

বিদ্যাপতির বেশিরভাগ উপমা বেতের-ফল গোছের, এবং সেই গোছে যতটা উৎকর্ষ সম্ভব, বিদ্যাপতিতে তা আছে; তা আছে আমাদের কালিদাস-আদি প্রায় সমস্ত উত্তম সংস্কৃত পূর্বপুরুষে। কিন্তু পাখির নীড় সেখানে মাগগি; এবং তারই অজস্র সুলভতা চণ্ডীদাসে। “উপমা কালিদাসস্য” প্রবচনটিতে বোঝা যায় যে চমৎকার উপমা-প্রয়োগে কালিদাস সিদ্ধ-হাত। কিন্তু আমাদের বিচারে তাঁর (কালিদাসের) অধিকাংশ উপমা সেই অর্থেই উপমা, যে-অর্থে নারীর অলঙ্কার হাঁসুলি টিকলি রুলি। কিন্তু চণ্ডীদাসের উপমা সেই অর্থে অলঙ্কার যে-অর্থে “অলঙ্কারোহি নারীনাং ক্ষমাঃ”। এবং এ-কালে আমরা অনায়াসে বলতে পারি : উপমা চণ্ডীদাসস্য। তাতে মহাপাতক হবে না।

“কোন্ বিধি সিরজিল সোতের শেওলি” বাক্যে প্রথমতঃ উপমেয় খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। তারপর উপমেয় হিসাবে রাধাকেই যদিও কল্পনা ক’রে নে’য়া যায়, তবু তাঁর সঙ্গে “সোতের শেওলি”-র কোনো চাক্ষুষ মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এ-রকম উপমায় চট ক’রে হাতে মোয়াটি পাওয়া যাবে না— যথেষ্ট কষ্ট করলেই কেষ্টঠাকুর হাজির হবেন। একটা ছোট্ট ফর্দ দেওয়া যাচ্ছে :

            পরবশ পিরীতি আঁধার ঘরে সাপ।

            লোহার পিঞ্জরে থাকি

            বাহির হৈতে চাহে পাখি।

            পিরীতি বেয়াধি যদি অন্তরে সাম্ভাইল।

            ঔষধ খাইতে তবে পরান জড়ি গেল॥

বলা বাহুল্য, প্রেমের দাওয়াই প্রেম-ই, যেরকম হেরয়িনের দাওয়াই হেরয়িন। ফলে :

            পিরীতি অমিয়ারসে বধয়ে পরান।

অভিসারান্তে দয়িত বিদায় নিলে :

            দেহ ছাড়ি যেন মোর প্রাণ চলি যায়।

ননদিনির সঙ্গে একই শয্যায় শায়িতা রাধা, যেন :

            বনের হরিণী থাকে কিরাতীর সাথে।

কৃষ্ণের বাঁশি :

            পিবয়ে অধরসুধা উগারে গরল।

কানুর “পিরীতি” :

            …                             কহিতে শুনিতে

                        পাঁজর ফুটিয়া উঠে।

            শঙ্খবণিকের                  করাত যেমন

                        আসিতে যাইতে কাটে॥

কোপনা শাশুড়ি-ননদি যাঁর নিত্য-পাহারাদার, সেই রাধার :

            ঘর হৈতে আঙ্গিনা বিদেশ।

তুলনায়, চর্যাপদের অভিসারিকার “আঙ্গন ঘরপন”। কিন্তু, তবুও, এসব উদাহরণে উপমাকে আমরা উপমার চেহারাতেই পাই। মন্ত্রমুগ্ধ অবস্থাতেও আমাদের আকছার মনে প’ড়ে যায় যে কোনোকিছুকে “উপমিত” করবারই জন্য এদের অবতারণা। কিন্তু কোনো কোনো স্থলে সেটাও আমাদের ভুলিয়ে মারেন চণ্ডীদাস। মিলনমুহূর্তে প্রেমিকযুগল :

            নিমিখে মানয়ে যুগ কোরে দূর মানি।

এ কি উপমা? এ কি উপমা নয়? রাধা যখন বলছেন :

            তোমার চরণে                আমার পরানে

                        বাঁধিল প্রেমের ফাঁসি।

তখন প্রথমদৃষ্টে আমাদের একে “বানিয়ে-তোলা” মনে হ’তেও পারে, কিন্তু যখনই মনে পড়ে যে রাধা-কৃষ্ণ পার্থিব প্রেমিক-প্রেমিকা শুধু ন’ন, রাধা জীবাত্মা ও কৃষ্ণ পরমাত্মার প্রতীকও বটেন, ব্যাপারটা তখনই সহজ হ’য়ে যায়, অর্থাৎ কঠিন হ’য়ে যায়। এখানে চণ্ডীদাসকে মনে হয় না যে নিজের হ’য়ে, একজন কবিমাত্র, কবিমাত্রের, হ’য়ে কথা কইছেন; বরং একটা গোটা জাতির হ’য়ে, তাদের চিরকালের সাধনার, কল্পনার প্রতীকায়িত সারাৎসারের উৎসারণ করছেন তিনি।

অন্যত্র বিহ্বলা রাধা বলছেন, “সজনি ও না মোর কে।” প্রেমে পতিত হতভাগ্যদের এ একটা চিরকেলে সঙ্কট। ফুলশরের আঘাতে যে আত্মবিস্মৃত সে কীভাবে ক’বে, “ও না মোর কে”। প্রেমাস্পদের সঙ্গে তার সম্পর্কটিও বোঝার শক্তি সে হারিয়ে ফ্যালে :

            লখিতে নারিনু               কেমন বন্ধান

                        লখিয়া নাহিক লখি।

এহেন প্রেমাস্পদের পায়ে একশ’টা পৃথিবী ডালি দিলেও “মনে না জুয়ায়”। জুয়ায় না, কেননা একশ’ পৃথিবীও তো আসলে মাটির ডেলা বৈ নয়। যাকে ভালবাসি, সে-ছাড়া আর সবই তো মূল্যহীন। তো একে কী দেওয়া যায়? রাধা বলছেন :

            যে ধন তোমারে দিব সেই ধন তুমি।

এ কী জিনিস! এ তো পৃথিবীর সমস্ত কবিতা, সব ছবি, সব গান— সব প্রেমের অন্বিষ্টসার! কী সহজে, কী অনায়াস নির্ভুলতায়, অনাড়ম্বরে, এমনকি অলক্ষিতে, উচ্চারিত হ’য়ে গেল! এবং যেখানে এসে যে-কোনো শ্রেষ্ঠ কবিতাই থেমে যেতে বাধ্য হ’ত, সেখানে এই কবিতা থামল না। আরও অনায়াসে তিনি ব’লে যেতে পারলেন :

            তুমি আমার প্রাণবঁধু আমি হে তোমার।

            তোমার ধন তোমারে দিতে ক্ষতি কি আমার॥

 “যে ধন তোমারে দিব সেই ধন তুমি” আর রবীন্দ্রনাথের “তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান” একরকম শোনালেও, ভীষণরকম আলাদা। প্রথমোক্ত বাক্যে গজিয়ে-ওঠা ঘাসের প্রাকৃত সহজতার ছবি দেখি, পরোক্তে দেখি সযত্ন-অঙ্কিত পটে বুদ্ধিমত্তার তুলির টান। চণ্ডীদাসের এই উপমা প্রসঙ্গে একটা শ্লোক মনে পড়ছে :

            ত্বমেব মাতা চ পিতা ত্বমেব

            ত্বমেব বন্ধুশ্চ সখা ত্বমেব।

            ত্বমেব বিদ্যা দ্রবিণং ত্বমেব

            ত্বমেব সর্বং মম দেবদেব॥

ভক্ত তার দেবতাকে বিশেষণ দিতে চাইছে, “অলঙ্কৃত” করতে চাইছে, তার যে-সব বিষয়কে এই পৃথিবীতে সবচেয়ে মহার্ঘ্য মনে হচ্ছে, একে একে তা-সবকে সে দেবতার বিশেষণ বানিয়ে চলেছে, বলছে, “তুমি মা আমার, বাবা-ও তুমিই আমার, আমার বন্ধু, আমার পরম মিতা, বিদ্যা আমার, সম্পদ্ আমার তুমিই,”— ইস্তক গিয়ে নিরস্ত সে হয়, বুঝতে পারে যে এমন উপমায় এক-মহাভারত ভ’রে ফেললেও আসলে কিছুই বলা হবে না। অগত্যা হাল ছেড়ে দিয়ে চাঁচাছোলা ব’লে ফেলে সে গভীরতম সত্যটি : “আমার সকল তুমি! দেবতার দেবতা!”

“কামার্তা হি প্রকৃতি কৃপণাশ্চেতনাচেতনেষু”— কালিদাসের এই চরণটি যে-কোনো ভাষার জন্যই গৌরবজনক হ’তে পারত, যদি কেবল “কামার্তা” শব্দের স্থলে “প্রেমার্তা” শব্দ বসানো হ’ত। কিন্তু কালিদাসকে তা জানালে তিনি সেটা আদৌ বুঝতেন ব’লে মনে হয় না। আসলে কালিদাস কিংবা তাঁর সগোত্র কবিদের কাছে কাম এবং প্রেমের আদতে কোনোই ফারাক নাই। তাঁদের কাছে প্রেমপীড়িত মানেই কামতাড়িত, বিরহজ্বালা মানেই মদনজ্বর, প্রেমালাপ হচ্ছে যৌনমিলনের সঙ্কেত। জয়দেবও এর ব্যত্যয় ন’ন। এমনকি, বিদ্যাপতিও এই দৃষ্টিভঙ্গি বার বার প্রদর্শন ক’রে তাঁর ভক্তদের আহত করেন। পণ্ডিতদের মতে শ্রীচৈতন্যদেবের সময় থেকেই কাম এবং প্রেম দ্বিধা হ’য়ে যায়। শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত-এ কৃষ্ণদাস কবিরাজ বলছেন :

            আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি-ইচ্ছা তারে বলি কাম।

            কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি-ইচ্ছা ধরে প্রেম নাম॥

কিন্তু প্রেম ও কামকে একেবারে বিচ্ছিন্ন না-ক’রেও, তাদেরকে আলাদা দৃষ্টিতে দেখবার যে-চোখ, তা চণ্ডীদাসকেই প্রথম আলো দেখিয়েছিল, এবং তা চৈতন্য-পরবর্তী কবিদের থেকে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রায় :

            আপনার দুখ                          সুখ করি মানে

                        আমার দুখেতে দুখী।

এ-ই হচ্ছে চণ্ডীদাসের প্রেমের সংজ্ঞা। এক্ষেত্রে রাধায়-কৃষ্ণে বিভেদ নাই। উভয় তরফেই একই সংজ্ঞা প্রযোজ্য। কিন্তু চৈতন্য-পরবর্তীদের কাছে কৃষ্ণ ও রাধার প্রেমে যথেষ্ট ফারাক আছে। চৈতন্য-পরবর্তীরা কৃষ্ণের ঈশ্বরত্বে সর্বদা অতিসচেতন। চণ্ডীদাসও এ-বাবদে অচেতন ন’ন, কিন্তু বিষয়টি তাঁর কাছে গৌণ, কিংবা, অন্ততঃপক্ষে, প্রচ্ছন্ন। দু’টি পরিপূরক সত্তা— তা তারা পুরুষ-প্রকৃতি হোক, ঈশ্বর-মানুষ হোক, বা মানব-মানবীই হোক— পরস্পরে ফানা হ’য়ে গেলে যে-স্বর্গীয় সাযুজ্যের উদ্ভব হয়, তা-ই চণ্ডীদাসের “পিরীতি”। এখানে দু’পক্ষের চূড়ান্ত আত্মোৎসর্জনই প্রেমের উপায়। এই যে পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার ক্ষীরে-নীর-বৎ মিশে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, এটাই ভারতীয় অধ্যাত্মবাদের একটা গোড়ার কথা। সাধক তুকারামের অভঙ্গ-তে দেখতে পাচ্ছি :

            উদকা বেগলা।

            নদ্বে তরঙ্গ নিরালা॥

            হেম অলঙ্কারা নামী।

            তুকা ক্ষণে তৈসে আম্হী॥

অর্থাৎ, পানি আর ঢেউ আলাদা নয়; অলঙ্কার নাম, স্বর্ণ নামী; তুকা বলছেন, সেইরকম আমিও। কৃষ্ণদাস কবিরাজও বলছেন :

            মৃগমদ তার গন্ধ যৈছে অবিচ্ছেদ।

            অগ্নিএ জ্বালাএ যৈছে নাহি কভু ভেদ॥

            রাধাকৃষ্ণ ঐছে সদা একই স্বরূপ।

            লীলারস আস্বাদিতে ধরে দুই রূপ॥

চণ্ডীদাসের “এরকম প্রেম কভু দেখি নাই শুনি। / পরানে পরান বাঁধা আপনা আপনি॥” ইত্যাদি পদেও এই সংহিতির পরিচয় পাই।

এক জায়গায় চণ্ডীদাস আবার বলছেন :

            পিরীতি লাগিয়া              পরান ছাড়িলে

                        পিরীতি মিলয়ে তথা।

অর্থাৎ রাধা তাঁর দশম দশায় উপনীতা হ’লে তবেই প্রেমের সন্ধান পান, এর আগে যা পেয়েছেন তা তার মৃগমায়িক প্রতিভাস-মাত্র। মনে পড়ে জন ডান-এর :

                If ever any beauty I did see

                Which I desired and got, ’twas but a dream of thee.

                            (The Good Morrow)

কিন্তু সেই একই চণ্ডীদাস যখন বলেন : “শরীর ছাড়িলে পিরীতি রহিবেক কোথা”, তখন প্রথম-প্রথম একটুবা ধন্ধেই পড়ি; একবার তিনি বলছেন, প্রাণত্যাগ-ব্যতীত প্রেম অলভ্য, আবার তিনিই বলছেন, শরীরই প্রেমের আধার! কিন্তু একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায় যে প্রাণত্যাগ বলতে কবি আত্মহত্যা বোঝাচ্ছেন না। এখানে প্রাণত্যাগ মানে সর্বস্বত্বত্যাগ, সর্বসত্তা সমর্পণ— এর জন্যে দেহত্যাগের জরুরত নাই। বরং দেহত্যাগ করলে প্রেম উদ্বাস্তু হবে, এই প্রতীতির কারণে চণ্ডীদাসকে দেহাত্মবাদী মনে করা যায়। এতে অবশ্য তাঁর গৌরব ক’মে যায় না, বরং, আমাদের কাছে অন্ততঃ, বাড়ে।

অবশ্য এই দেহাত্মবাদের সঙ্গে বার্হস্পত্য দেহাত্মবাদের কোনো সম্পর্ক নাই। বৃহদারণ্যক উপনিষদে যাজ্ঞবল্ক্য, পত্নী গার্গী (মৈত্রেয়ী) -কে বলছেন :

            ন বা অরে পত্যুঃ কামায় পতিঃ প্রিয়ো ভবতি।

                    আত্মনস্তু কামায় পতিঃ প্রিয়ো ভবতি॥

            ন বা অরে জায়ায়ৈ কামায় জায়া প্রিয়া ভবতি।

                    আত্মনস্তু কামায় জায়া প্রিয়া ভবতি॥

            ন বা অরে পুত্রাণাং কামায় পুত্রাঃ প্রিয়ার্ভবন্তি।

                    আত্মনস্তু কামায় পুত্রাঃ প্রিয়ার্ভবন্তি॥

            ন বা অরে বিত্তস্য কামায় বিত্তং প্রিয়ং ভবতি।

                    আত্মনস্তু কামায় বিত্তং প্রিয়ং ভবতি॥

            ন বা অরে সর্বস্য কামায় সর্বং প্রিয়ং ভবতি।

                    আত্মনস্তু কামায় সর্বং প্রিয়ং ভবতি॥

ইত্যাদি। আত্মপ্রেম-সূত্রে বিশ্বপ্রেমের এই দীক্ষায় চণ্ডীদাস অন্ততঃ দীক্ষিত ন’ন। পরাত্মপ্রেমে সর্বস্ব উৎসর্জনেই তাঁর আত্মপ্রেমের সমুদ্ভব। কিংবা, এ-কথাটাও নেহাত ভুল হ’ল। আত্মপ্রেম জিনিসটাই চণ্ডীদাসে অনাপ্য। তাঁর দেহাত্মবাদে দেহ আত্মার আধার, যে-আত্মা পরমাত্মা-সম্মিলনে উন্মুখ। এই বিশেষ ধারাটিই সর্বভারতীয় সহজিয়া ধারা। কোনো বিশেষ ধর্মমত-মুখাপেক্ষা না-থাকাই এর সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। বৌদ্ধ সহজিয়া তন্ত্রের সঙ্গে, বৈষ্ণব সহজিয়া মতের সঙ্গে এর যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ হ’লেও, এ প্রকৃতপক্ষেই স্বয়ং-নির্ভর। ভক্ত কবির বলছেন :

            মো-কো কহাঁ ঢুঁড়ো বন্দে

            মৈঁ তো তেরে পাস-মেঁ।

            না মৈঁ দেবল না মৈঁ মসজিদ

            না কাবে কৈলাস-মেঁ॥

            (আমাকে কোথায় খুঁজছ, ভক্ত,

            আমি তো তোমার পাশে,

            মন্দিরে নয়, মসজিদে নয়,

            না কাবা’য়, কৈলাসে। — সু. অ. গো.)

এই মনের মানুষকে পাবার জন্য বানপ্রস্থের দরকার নাই, দরকার নাই “আগম পুথি, ইষ্টমালা” (চর্যাপদ), দরকার শুধু ধ্রুবতারকার চেয়ে স্থির এক ঋজুগ এবং অন্ধ প্রেমশক্তির :

            উজু রে উজু ছাড়ি মা লেহু রে বাঙ্ক।

            নিঅড়ি বোহি মা জাহু রে লাঙ্ক॥

সরহপাদ বলেন, সোজা পথটা ছেড়ে বাঁকা পথ ধোরো না, বোধি আছে নিকটেই, লঙ্কা যেয়ো না। প্রায় একই কথা বলছেন চণ্ডীদাস :

            আকাশ জুড়িয়া ফাঁদ যাইতে পথ নাই।

            কহে বড়ু চণ্ডীদাস ‘মিলিবে হেথাই’॥

এই হচ্ছে সঙ্ক্ষেপে, সহজিয়া দেহাত্মবাদ। এই ধারাটিই নানাভাবে নানারূপে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলমান-শিখ-নির্বিশেষে ভারতীয়-মাত্রেরই হৃদয়ে বহমান ফল্গুবসুধারা। এবং এই ধর্মগুলির সবচেয়ে বেশি মেলামেশার স্থান হিসাবে বাংলাদেশে এ-ধারা তো রীতিমতো মন্দাকিনী-প্রবাহ। এই ধারাটিই বৈষ্ণব হ’য়ে, বাউল হ’য়ে, যুক্তবেণিসঙ্গমে মিলেছে লালনে, রবীন্দ্রনাথে, ফলিয়েছে তার সর্বোৎকৃষ্ট সুফল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথে যেমন একটা পরিগ্রহণের ভাব প্রতিভাত হ’য়ে প্রায়শঃ ওঠে, চণ্ডীদাসে তা দুর্লক্ষ্য। আমি অবশ্যই বলি না যে চণ্ডীদাসই এর মূল উৎস— এ হয়তো বাঙালি মানসেরই এক চিরন্তন বৈশিষ্ট্য। কিন্তু চণ্ডীদাসে এর বিকাশ অনেক বেশি প্রাকৃতিক তথা স্বাভাবিক। যেসব ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথকে অধমর্ণ মনে হয়, সেখানে চণ্ডীদাসকে উত্তমর্ণ ভাবতে দ্বিধা হয় না আমাদের।

এই প্রাকৃত সহজিয়া মতের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গ জড়াজড়ি ক’রে রয়েছে সুফিবাদ, এরা একে অপরকে, অন্ততঃ এই বাংলাদেশে, ক্রমাগত প্রভাবিত করেছে, পুনর্গঠিত করেছে। ইরানের সুফিবাদের সাথে বাংলাদেশের সুফিবাদের এ-কারণেই বেশ খানিকটা ব্যবধান তৈরি হ’য়ে গিয়েছে, একইভাবে এদেশীয় বৈষ্ণব ধর্মের সঙ্গে সর্বভারতীয় বৈষ্ণব ধর্মেরও প্রভেদ হ’য়ে গেছে। এই দুই ধারার মিলনই এদেশে একদা, অন্ততঃ কৃষ্টির জমিতে, হিন্দু-মুসলমানের সৌহার্দ্যকে সম্ভব করেছিল, যার অন্তিম একটা মরাসোঁতা ধারা এখনও বাংলার প্রাকৃত ভূমিতে বহতা— যা রক্তচক্ষু ধর্মান্ধদের অবিরত অসি-চালনায় শনৈঃ শনৈঃ ক্ষীয়মাণ। এই “ধর্মযোদ্ধাদের” লক্ষ্য ক’রেই, চণ্ডীদাসের টিপ্পনি :

            মরম না জানে               ধরম বাখানে

                        এমন আছয়ে যারা।

            কাজ নাই সখী               তাদের কথায়

                        বাহিরে রহুন তারা॥

চণ্ডীদাসের কবিতার এক উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য তাঁর ভণিতা (মানে শেষের চরণযুগলে, যেখানে সাধারণতঃ কবির নাম বলা হয়)। তাঁর অধিকাংশ পদের শেষে গিয়ে একটা বিশেষ, এপিগ্র্যামাটিক, চমক পাবেন পাঠক। কবির অতি সরস, সজীব ব্যক্তিগত মন্তব্য বা টিপ্পনিতে তাঁর প্রায় সবগুলি পদই মধুরেণ সমাপ্ত হয়েছে। যেমন, কৃষ্ণের বাঁশি প্রসঙ্গে বলছেন :

            মুরলী সরল হয়ে             কালার মুখেতে র’য়ে

                        শিখিয়াছে কালার স্বভাব।

            দ্বিজ চণ্ডীদাসে কয়           ‘সঙ্গদোষে কি না হয়’

                        ‘রাহুমুখে শশী মসিলাভ’॥

এই ভণিতাগুলিকে আবার কয়েকটা বিশেষ শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। কখনও এরা একেবারে প্রবাদবাক্যের আকারে প্রকাশিত (অনেকগুলি তো আদৌ প্রবাদবাক্যে পরিণত হয়েছে), যেমন :

            চণ্ডীদাস বাণী                শুন বিনোদিনী

                        ‘সুখ দুখ দুটি ভাই।

            সুখলাভ তরে                 পিরীতি যে করে

                        দুখ যায় তারি ঠাঁই’॥

এ-রকম আরও একটি ভণিতা :

            চণ্ডীদাস বলে শুন আমার যুকতি।

            অধিক যাতনা যার অধিক পিরীতি॥

এমন ভণিতা অসঙ্খ্য।

আরেক রকমের ভণিতা আছে, যেখানে রাধা-কৃষ্ণের মাঝখানে কবি তাঁর ব্যক্তিগত গলা বাড়িয়ে দিয়েছেন এমনভাবে যে তাঁকেই সেই প্রেক্ষাপটে একটা চরিত্র মনে হচ্ছে। যেমন, কৃষ্ণের শরীরে অন্য নারী-সম্ভোগের চিহ্ন দেখে রাধা যখন তাঁকে বাক্যবাণে জর্জর করছেন, রাধাকে তিরস্কার ক’রে কবি বলছেন :

            চণ্ডীদাস বলে ইহা বলিলা কেমনে।

            চোর ধরিলেও এত না কহে বচনে॥

পদান্তরে সেই রাধারই কাছে আবার কৃষ্ণের বদনাম গাইছেন তিনি : “আমি ইহার সব রঙ্গ জানি” কিংবা “সব নাটের গুরু কালা” ইত্যাদি। কিন্তু সবচেয়ে চমৎকার হয় তখন, যখন তিনি আরও ব্যক্তিগত— রাধা-কৃষ্ণের বলয় থেকে বেলমোক্তা বেরিয়ে গিয়ে আত্মগতভাবে একান্ত নিজস্ব কথা ব’লে ফেলছেন; যেমন, “পরশরতন গলায় গাঁথিয়া পরি”। এই পরশরতন আপাতদৃষ্টে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম, কিন্তু নিগূঢ়তঃ চণ্ডীদাসের নিজেরই প্রেম। পদান্তরে :

            চণ্ডীদাস বলে রামী ইহার গুরু তুমি।

চণ্ডীদাস-রামী উপাখ্যান নিশ্চয়ই অজানা নয় কারও।

            মরণের সাথি যেই সে কি ছাড়ে পাশ।

এখানেও, রাধার প্রসঙ্গে আসলে নিজেরই কথা বলা হচ্ছে।

আবার প্রায়শঃ, ভণিতার বাইরেও, তাঁর চরিত্রের মুখ দিয়েও, চণ্ডীদাস একান্ত ব্যক্তিগত কথাটি বলেন, বলিয়ে নেন :

            গড়ন ভাঙ্গিতে সই আছে কত খল।

            ভাঙ্গিয়া গড়িতে পারে সে বড় বিরল॥

            ধিক্ রহু জীবনে পরাধীন যেহ।

            নিশিদিন কান্দি সই হাসি লোকলাজে।

শেষ উদ্ধৃতিটির প্রসঙ্গে একটা জনশ্রুতির উল্লেখ করি। চণ্ডীদাসের সঙ্গে নীচকুলোদ্ভবা রজকিনী রামীর মোহব্বতের বিষয়টা জানাজানি হ’য়ে পড়লে তিনি (চণ্ডীদাস) জাতিচ্যুত হ’ন, এবং প্রায়শ্চিত্ত করতে বাধ্য হ’ন (সেকালেও এসব ছিল! মোল্লামি-বাম্নামির জন্ম আমরা দিই নি, মন্দের ভালো), এবং জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত এই মর্মজ্বালায় তিনি জ্বলেছিলেন। কিন্তু প্রায়শ্চিত্ত করার পরেও, রামীর সঙ্গে সম্পর্ক সম্ভবতঃ পুরাপুরি ছিন্ন তিনি করেন নি, অন্ততঃ মানসিকভাবে তো নয়ই :

            দ্বিজ চণ্ডীদাসে পুনঃ কয়।

            পরের বচনে কি আপন পর হয়॥

চণ্ডীদাসের আরেকটা মহদ্গুণ হচ্ছে, তিনি খুব কম কথায় কাজ সারেন। যেটুকু একেবারে না-বললে নয়, তার বেশি একটা আখর তিনি ব্যয় করেন না। এই বাগ্বিস্তারের প্রতি অপক্ষপাত চণ্ডীদাসের রচনাকে একটা ধ্রুপদি সুমিতি দান করে, তাঁর কবিতার প্রতিটি শব্দকেই অনিবার্য ক’রে তোলে। কিন্তু আবার সেইসব শব্দের পরিবর্তে তাদের প্রতিশব্দ বসিয়ে দিলেও, তাঁর কবিতার তেমন খুব ক্ষতির সম্ভাবনা নাই (এই কারণে আমার মনে হয়, চণ্ডীদাসের বেশ ভালো অনুবাদ অন্য ভাষায় সহজেই হ’তে পারে, মানে তাঁর কবিতার, সেফেরিস-কথিত, অনুবাদ-যোগ্যতা আছে)। অথচ একই কাজ বিদ্যাপতি, গোবিন্দদাস, বা এমনকি মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দের কবিতার ক্ষেত্রে করলে তাঁদের সর্বনাশ হ’য়ে যেতে পারে। চণ্ডীদাসের প্রচলতা বেশি হবার এটাও একটা কারণ (এবং কার্যও?) হ’তে পারে। চণ্ডীদাস মরম-কথা মরমে রেখে যেটুকু শোনাতে চান, পরমযত্নে শুধুমাত্র সেটুকুই শোনান। সেই কথার মধ্যে তাঁর মনের কথার প্রতিভাসটুকু যা থাকে তা আমাদের নিজেদের মনের চোখে খুঁজে নিতে হয়। সচেতন এবং মহান্ শিল্পীরই বৈশিষ্ট্য এটি। চণ্ডীদাস নিজেই বলেন :

            হিয়ার মাঝারে               যতনে রাখিব

                        বিরল মনের কথা।

তাঁর সেই বিরল মনের কথা আমরা লিপিবদ্ধ দেখি না তাঁর কবিতায়, তা আমাদের শুনতে হয় আপনাপন হিয়ায়। এভাবেই, চণ্ডীদাস তাঁর পাঠকের জন্য অনেকটা কাজ ফেলে রাখেন, ফেলে রেখে তাকে তার কবিতায় সক্রিয় রাখেন, যেভাবে রাখে সব বড় শিল্পী। মহৎ শিল্পে এই অব্যক্ত, অনির্বচনীয়ের ভাগটুকুই মুখ্যতঃ রসের সামগ্রী; আর, কাঠখোট্টা (কথার কথা বললাম) আলঙ্কারিকেরাও বলেন যে, এই রসের জন্ম শিল্পকর্মে নয়, বরং শিল্পভোক্তার মনে; শিল্পীর দায় শুধুমাত্র ভোক্তাকে তার জনকত্বে উদ্বুদ্ধ, প্রলুব্ধ করা। উপমা দিয়ে বলা যায়, শিল্পী আয়না নিয়ে হাজির হ’ন মানুষের সামনে, যে-আয়নায়, মানুষ নিজেকে দেখতে পেয়েই মুগ্ধ হয়। কিংবা একটা ছাইচাপা আগুন রয়েছে যেন মানুষের চেতনার আড়ালে, শিল্পী মাঝে মাঝে সেটা উস্কে দেন। এই উস্কানিমূলক কাজে চণ্ডীদাস জুড়িরহিত। চণ্ডীদাস বড় শিল্পী।

634655355307925794-radha-krishna-grass-painting

৮. কিন্তু, বিশেষতঃ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজে, চণ্ডীদাস আজকাল কেবল একটা নামে পরিণত হয়েছেন— যা-ও আবার ক্রমেই ধূসরতর হ’য়ে চলেছে। শিক্ষিত বাঙালির বিস্মরণশক্তি সাঙ্ঘাতিক— প্রায় আত্মঘাতী মাত্রায়। অনেক নিকটবর্তী কবিকেই (যেমন মোহিতলাল) যখন তাঁরা ভুলতে পেরেছেন, তখন চণ্ডীদাসের মতো একজন “প্রত্নযুগের” কবিকে তাঁরা কেন বা কীভাবে মনে রাখবেন। এতে অবশ্য চণ্ডীদাসের কোনোই ক্ষতি নাই। সন্তান পিতৃপরিচয় বিস্মৃত হ’লে সেটা পিতার নয়, সন্তানেরই লজ্জার কথা। আবার সন্তান যদি পিতৃপরিচয় অস্বীকারও করে, তাহলেও, আত্মহত্যা-ব্যতিরেকে পিতৃঋণ নিজ-শরীর থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারে না।

তা, বাংলা সাহিত্য কি ক্রমশঃ সেদিকেই, মানে আত্মহননের দিকেই ধাবমান? আজ পর্যন্ত বাংলা কবিতায় যে সহজতার প্রতি একটা প্রবণতা কারু-কারু লেখায় ক্ষীণভাবে হ’লেও জিয়ে আছে, তাকে পরোক্ষভাবে চণ্ডীদাসেরই প্রভাব বলা যায়। কিন্তু অদ্যকল্য যে-কোনো কবিই, স্বীয় কবিতায় চণ্ডীদাসের প্রভাব আছে ভাবতে বিস্মিত যদি একান্তই না-হ’ন, বিরক্ত হবেনই হবেন। কারণ, এক ঐতিহাসিক মূল্য ছাড়া চণ্ডীদাসের আর প্রায় কোনোও মূল্য তাঁদের কাছে নাই। সবচাইতে ব্যথিত হই যখন দেখি যে কোনো একজন “শিক্ষিত” মানুষ চণ্ডীদাস পড়েন নি, অথচ নেহাত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার-সূত্রে তাঁর (চণ্ডীদাসের) অনেক প্রবচন জানেন। সে-ক্ষেত্রে সেই শিক্ষিতের সঙ্গে অশিক্ষিত দেহাতির কোনো পার্থক্য করা যায় না, কারণ তাঁরাও ঐ একই সূত্রে অনেকটা চণ্ডীদাস জানেন, এবং তাঁদের এই জানার পরিমাণ পূর্বোক্ত “শিক্ষিত্” মানুষটার থেকে ঢের বেশি। আর তাঁদের জানার মূল্যও অনেক-অনেক বেশি, কেননা, প্রবচনগুলি যে তাঁদের ধূসর স্মৃতিলোকের বাসিন্দা তা নয়, বরং তাঁদের চৈতন্যের অংশ, তাঁদের বাস্তব, প্রাত্যহিক জীবনে এদের সক্রিয় অংশগ্রহণ আছে।

শিক্ষিত বাঙালির মতো আত্মবিমুখ প্রজাতি মানুষের মধ্যে কমই দেখা যায়, বলতেকি। “আত্মনং বিদ্ধি” পারতপক্ষে তাদের মন্ত্র নয়। বিশেষ-বিশেষ ক্ষেত্রে এ একটি সদ্গুণ সন্দেহ নাই, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি আত্মহত্যার শামিল। কাকের মতো চোখ বন্ধ ক’রে আকাম-কুকাম করবার অভ্যাস আমাদের একটা প্রধান নৈতিক দিক্, এবং আমরা যে খুব বেশি এগিয়ে যেতে পারছি না তার একটা বড় কারণ এই যে আমরা কোথায় আছি, কোথা হ’তে আমাদের আগানো দরকার, সে-সম্বন্ধে আমাদের ধারণা স্বচ্ছ নয়।

উল্লম্ফনবৃত্তিতে সত্যিকারের প্রগতি আসে না। সেটা একটা তাৎক্ষণিক “গতি” দেয়। কিন্তু তাতে একসময় ঠ্যাং ভেঙে ন যযৌ ন তস্থৌ হওয়া বিচিত্র নয়। নিজেদের জানতে হ’লে আমাদের ফিরে যেতে হবে চণ্ডীদাসের কাছে— এবং শুধু চণ্ডীদাসেরই কাছে নয়, আমাদের সমস্ত অতীত ঐশ্বর্যেরই কাছে; অবচয়ন করতে হবে আমাদের ভবিষ্যতের পাথেয়, অতীত থেকে : লুই, কানু, কুক্কুরী, শবর থেকে; চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, গোবিন্দদাস, বলরাম দাস থেকে; শাহ্ সগির, কৃত্তিবাস, বিপ্রদাস, নারায়ণদেব, কেতকাদাস, কবিকঙ্কণ, আলাওল, সৈয়দ সুলতান, ভারতচন্দ্র, রামপ্রসাদ, লালন, এবং আরও অসঙ্খ্য জ্যোতিষ্কমণ্ডলের দিব্যজ্যোতিরুদ্ভাস থেকে।

(প্রথম প্রকাশ: প্রসূন ১৯৯১)

সংযোজিত চিত্রসমূহ: গুগল আর্কাইভ

1923616_8331835228_5637_n
।।সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ।। কবি
Advertisements