সে এক নিঃসঙ্গ জাগলার :: আজমাঈন তূর হক

Razu1-1425969207

 পঞ্চাশ-ষাটের দশকের সোনালি সুন্দর সময়ে কলকাতা নগরীকে শাসন করতেন তারা, ঘোরগ্রস্ততায় তাদের ফুটপাত বদল হয়ে যেত, পুলিশের সাথে গোল্লাছুট ছিল মামুলি কারবার। নতুন সাহিত্যকে যাপন করতেন নিজেদের জীবন দিয়ে, মদ আর মগজের জ্বালানিতে নিজেদের পুড়িয়ে তৈরি করতেন নতুন কবিতা। মধ্যরাতে কলকাতা শহর শাসিত হত চার যুবকের চোখের ইশারাপ্রবণতায়। সুনীল- শক্তি-উৎপল-শরৎ! সেসবই আজকে ঐতিহাসিক ঘটনা। সেই রূপালি ঋতুসকলের এক পাতাই শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা।

কে একজন একবার বলেছিলেন “শক্তির শক্তি আছে”। কলমকে যথার্থ শারীরিক অঙ্গ করে নিয়ে খুব কম মানুষই লিখতে আসেন এই ভূখণ্ডে, খুব কম কবিই কবিতা করতে আসেন যাদের আঙুলের ফাঁক ঘেঁষে সহজ কৌশলে বেরিয়ে আসে ছন্দের তন্তুজাল, উপমা, ইমেজিং-এর শুভ্র খরগোশ। বাংলা কবিতায় মাত্রাবৃত্তে এরকম খেলা দেখা গেছে কম, কবিতার গীতলতা গদ্যের শরীরে নিপুণভাবে ইঞ্জেক্ট করার হাতও দুর্লভ। ছন্দ তার স্মুথ কলমের কালির মত বেরিয়ে এসে খাপে খাপে মিশে গেছে লাইনে লাইনে; বাংলা কবিতায় প্রায় শুরু থেকে ঈষদচ্ছভাবে, মূলত ষাটের দশক থেকে প্রধান দুটি প্রবণতা চিহ্নিত করা যায়। একটিতে সুরের প্রকাশ, বিচিত্রমুখী উন্মীলন, শব্দের গিমিকপ্রবণতা পরিহার করে অনেক ছড়িয়ে ছিটিয়ে একটি এক্সপ্রেশনের সূচনা, বিকাশ ও পরিণতি; অনেকটা মনোলগের ফর্মে কথা বলা।অপরটি বড় দাগে ছন্দের খেলা, অধিকতর চিত্রকল্প এবং চমক-প্রকাশক, কখনো খুব বেশি আরোপিত।এই দুই স্রোতের মিলনক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে লাইনের পর লাইন লিখে গেছেন শক্তি। শক্তি প্রেমধরা কবি, কখনো বৈষ্ণব-সরল, তবে তিনি পৃথক তার সুর সৃষ্টির প্রায় ঐশ্বরিক ক্ষমতার বলে, মিউজিক যেভাবে সহজে আক্রান্ত করার ক্ষমতা রাখে, শিল্পের অন্যান্য স্রোতের সাথে তার পার্থক্য করে দেয় মিউজিক-এর এই আবিষ্ট করে ফেলার ক্ষমতা, খুব স্বল্প সময়ের ব্যবধানে। শক্তির পদে এই বিরল প্রতিভা দেখেছি আমরা, অন্তত এই কবিত্ব অপরাপর বহু শিল্পীর কাছে আরাধ্য হতে পারে।

কবিতার শব্দেই কবির জিনোম সিক্যুএন্স চেনা যায়, প্রাণ আর প্রাণহীনতার পার্থক্য পরিষ্কার করে। যে কবি ‘অনন্ত কুয়ার জলে চাঁদ পড়ে আছে’-এর মত প্রতিরিয়েলিটি তৈরি করেছেন কবিতায়, শব্দের প্রতি তার দায়িত্ব থাকে কিছু, এ কর্মে অবহেলায় শব্দের ঋণ ক্রমশ বোঝা হয়ে চলে। শব্দের প্রশ্নে শক্তি ঠিক কতটা সৎ, পাঠক? আমরা পড়ি-

“আপনারে খুঁজি আর খুঁজি তারে সঞ্চারে আমারে
পুরানো স্পর্শের মগ্ন কোথা আছো? বুঝি ভুলে গেলে
নীলিমা-ঔদাস্যে মনে পড়ে নাকো গোষ্ঠের সংকেত
দেবতা, সুদূর বৃক্ষে, পাবো প্রেম কান পেতে রেখে”

(পাবো প্রেম কান পেতে রেখে, হে প্রেম হে নৈঃশব্দ)

– প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ’ (১৯৬২), শক্তি যখন করেন, তখন তিনি ২৮। শক্তি তো কিশোরবেলা থেকে কবিতা লিখছেন, তবে এই দেরি ক্যানো? ক্যানো আরো আগে নয়। ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ’-এর কবিতাগুলোতে এর কিছুটা হদিস প্রাপ্তি ঘটে। এই গ্রন্থের কোন কবিতা চট করে দেয়া নয়, কফিহাউসের চিল্লাচিল্লির প্রভাবে ঘামের গন্ধবহুল নয়, শক্তি খুব পরিশ্রমী এখানে। বেশ সুচিন্তিত নির্বাচনের ফলাফল বুঝা যায়, গ্রন্থের প্রায় প্রতিটি কবিতা স্বাধীন এবং একান্তে সার্বভৌম। প্রথম কবিতাটি টানা গদ্যে লেখা, এবং শুধু তাই নয়, ‘আমাকে তুই আনলি কেন, ফিরিয়ে নে’- এই লাইন দিয়ে শক্তি নিজের আঁচড় চিনিয়েছেন পাঠককে। এই পর্যায়ে কবিকে পাঠক শব্দের স্তাবক হিসেবেই শনাক্ত করেন।

এরপর শক্তি ছুটলেন ধর্ম থেকে ক্রমাগত জিরাফে। ‘আনন্দ ভৈরবী’ থেকে পাঠকের খটকা লাগে-

“আজ সেই গোঠে আসে না রাখালছেলে
কাঁদে না মোহনবাঁশিতে বটের মূল…”

-এহেন লাইন পড়তে পড়তে। আমৃত্যু শহুরে শক্তি-কে বটের মূল নিয়ে পল্লীকবিদের মতো মাত্রাবৃত্তে বিলাপ করতে দেখতে দেখতে পাঠক ক্রমশ ধন্দে পড়ে। কিছুটা কুয়াশা কাটে ‘যখন বৃষ্টি নামলো’ পড়তে গিয়ে-

“হয়তো মেঘে বৃষ্টিতে বা শিউলিগাছের তলে
আজানুকেশ ভিজিয়ে নিচ্ছো আকাশ-ছেঁচা জলে”

-শক্তির সেই মিউজিশিয়ানসত্তা প্রকট এই কবিতায়। ইমেজিং- এর বাহাদুরিহীন, আপাত সাধারণ এই কবিতাটি মুহূর্তে ট্রেডমার্ক ধরণে পাঠককে আক্রমণ করে বসে, এ যেন খালি ঘরে হঠাৎ পিয়ানো বেজে উঠা, অতর্কিতে আক্রমণ!

এরপর শক্তি পরপর দুই বছরে দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন- ‘সোনার মাছি খুন করেছি’ আর ‘হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান’; কাব্যগ্রন্থদ্বয়ের অধিকাংশ কবিতা খুব দুর্বল, এবং অনেকসময় শক্তিসুলভ-ও নয়। ‘ধর্মেও আছো জিরাফেও আছো’-তে শক্তির পাঠকদের মনে একটি সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করে, শক্তি হয়তো-বা ঠিক আগের মতো সাহসী নন, শব্দের সাথে পুরোপুরি সৎ নন; সাধারণ অন্ত্যমিল আর প্রথাগত কবিতার কাছে তার হতাশাজনক সমর্পণ দেখতে থাকি আমরা। শক্তি যখন লেখেন-‘পাখি আমার একলা পাখি, একলা-ফেকলা দুজন পাখি’, এই ‘একলা-ফেকলা’ শব্দবন্ধটিতে তিনি নিজেকে পতনের পথে প্রথম দাঁড় করালেন। তবে সোনার মাছি খুন করেছি–এর ‘সে বড়ো সুখের সময় নয়, সে বড়ো আনন্দের সময় নয়’ একটি অন্যরকম কবিতা, প্রতিদিনের যাপিত জীবন নিয়ে দৃশ্যের পর দৃশ্যে পাঠক চার তরুণ কবির কলকাতাশাসনের খণ্ডচিত্র দেখেন ঠিক ফিল্মের মতো একাদিক্রমে-‘বাড়ি ফেরার সময়, বাড়ির ভিতর বাড়ি, পায়ের ভিতর পা, বুকের ভিতর বুক, আর কিছু নয়’

‘পাড়ের কাঁথা মাটির বাড়ি’-তে শক্তি যখন মাটির প্রায় শেষ কোণায় পৌঁছে গেছেন, ঠিক সে সময় ১৯৭২ সালে বের হয় শক্তির ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’, একগুচ্ছ সুর-ছন্দে-ইমেজের মাস্তানিতে ডুবুডুবু সনেট, যেখানে শক্তি আবার নিজেকে চেনালেন নতুন করে, ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ’ প্রকাশের দশ বছর পর, এ যেন নতুন করে শক্তির কবিত্বের সাথে বোঝাপড়া হচ্ছে পাঠকের, ভালোবাসা আর ঘৃণার মন্ত্রে মন্ত্রে-

‘ ভালোবাসা ছাড়া কোনো যোগ্যতাই নাই এ-দীনের
দয়াময়ি, দয়া করো, ভিখারিরে অন্নবস্ত্র দাও…
……ওঠো, ক্ষুর গাঁথি সব ব্যর্থতার বিরুদ্ধে দাঁড়াও
হাস্যকরভাবে, বলোঃ দয়াময়ি, দয়া করী চিতে’

(৯ সংখ্যক কবিতা, চতুর্দশপদী কবিতাবলী)

কখনো বন্ধু, কখনো সহোদর, কখনো প্রেম হিসেবে এ কবিতাগুলোয় প্লাতেরো ঘুরেফিরে আছে। স্পেনের এই বাচ্চা গাধার প্রকৃত মালিক হিমেনেথও কখনো টুকরোভাবে প্রতিসরিত এই সনেটগুলোতে। কিছুটা বাহুল্য এসেছে, কিন্তু শুরু থেকে শেষ অবধি প্লাতেরো কবির বুকের পাশে ঘুমায়েছে পিঠের উপরে। প্লাতেরোর পিঠে সওয়ার হয়েই কবি শক্তি চট্যোপাধ্যায় আবার ফিরেছিলেন শব্দের ঝর্ণার নিচে- ‘অথচ প্লাতেরো বলে-প্রতিসন্ধ্যা শব্দরূপ পড়ো’… শব্দের জাদু তাকে উপঢৌকন দিয়েছিলো একগুচ্ছ স্বরাট সনেট, সমগ্র বাংলা কবিতায় যার সমতুল্যতা বিরল। এখানে পাঠকের কাছে শক্তি আবার ফিরছিলেন শিল্পিত শুভ্রতার দিকে, সস্তা প্রথার আবর্জনার উল্টোদিকে। ‘শুভ্রতাই শুধু জানি পবিত্র ও অতিব্যক্তিগত’

৯৬ সংখ্যক সনেটে শব্দবোধের সাথে শক্তির বোঝাপড়া দেখলো পাঠক-

“শব্দ গুলিসুতো, তাকে সীমাবদ্ধ আকাশে ভাসাতে
আমার পেটকাটি চাই, কিংবা কাঁথা, মায়াভরা পাড়
কিংবা গেরস্ত-মেজে জুড়ে থাকবে মাটির উপরে-
এরই নাম ভালোবাসা, এরই নাম চড়ুই মুখর
কাঁচা কিছু মানুষের বেঁচে থাকা…’’

শক্তির অন্য এক গতিপথের রেখাপ্রাপ্তির সম্ভাবনা জোরদার হয়েছিলো ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’-এর প্রকাশের পর, কিন্তু ‘প্রভু,নষ্ট হয়ে যাই’ দিয়ে শক্তি নিজের পতন নিশ্চিত করলেন। এই পতনে বেদনা তো ছিলোই, কবিত্বের অলিম্পাসে আরোহণের পর ভূপাতিত হওয়ার বেদনা, পাঠকদের জলে নামিয়ে একাকী হারিয়ে যাবার বেদনা। তার পতন প্রকশিত হয়ে গিয়েছিলো ‘একটি পরমাদ’ দিয়েই-

“ বহুকালের সাধ ছিলো তাই কইতে কথা বাধছিলো
দুয়ার খুলে দেখিনি- ওই একটি পরমাদ ছিলো” অথবা-

“ও মন দরদ দিয়েছো তায়
রাত-ভেজানো বনের লতায়
একদিবসের প্রেমে প্রখর স্মরবিরহ বাদ ছিলো”

‘আমি ভাঙা গড়ায় মানুষ’ কবিতায় শক্তি লিখলেন-

“মানুষ কাকে বাঁচায়?
যদি এমনি করে খাঁচায়
পোরে পাখির চেয়েও খালি
নিবিড়, নরম গেরস্থালি?”

-তখন পাঠককে চোখে অভিমানের জল নিয়ে শক্তির ছন্দবিধৌত উপত্যকায় নীরব বসে থাকতে হয়, পাঠক চোখের সামনে দেখে শাশ্বত অশ্বত্থের পতন। মর্মর কান্না তোলে, কারণ ‘ভুল থেকে গেছে’…

শক্তি লিখতে থাকেন একের পর এক ‘পদ্য’, আর ক্রমশ বেড়ে চলে বোঝা, কবিত্বকে ন্যুব্জ করে দিয়ে। শত মলাটের নিচে চাপা পড়ে কাঁপতে থাকে ‘কারনেশন’, ‘অন্ধকার শালবন’, ‘কখনো বুকের মাঝে ওঠে গ্রীস’, ‘ছায়ামারীচের বনে’ এবং আরো প্রভূত রংবাজি। ‘অঙ্গুলি তোর হিরণ্য জল’ গ্রন্থের অধিকাংশ কবিতায় পাঠক পড়তে থাকেন এক মৃত শক্তিকে, এক পুঁথিপাঠক কবিয়ালকে, যিনি সুর করে সুর করে পড়েন আর বাড়ে রাত্রি; যে ভয় পাঠককে ধরেছিলো শক্তির তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ থেকেই, তাই এতোদিনে সত্য হয়ে যায়, অতিজনপ্রিয়তা আর প্রতিষ্ঠানের নিকষ হাঁ তাকে আশিরনখ গ্রাস করে, তিনি এমন কিছু দুর্বহ চরণ বলে ফেলেন কিছু মায়ার লোভে, যা তাকে অনন্ত কবিজনম ধরে বয়ে যেতে হচ্ছে, হবে।

 2415787265_37d7ec42e6শক্তি চট্টোপাধ্যায় বাংলা কবিতার প্রথম এবং আজ পর্যন্ত, খুব সম্ভবতঃ একমাত্র রকস্টার, এবং অধিকাংশ রকস্টারের মতো তার অনুকারকের অভাব ছিলো না কখনোই। এসব ক্ষেত্রে, সাধারনতঃ অনুকারকেরাই আততায়ী। কবি শক্তির অকালমৃত্যু হয়েছে এদের হাতেই, অন্ত্যমিলের সহজতায়, শব্দের পাপে।

পরবর্তী কবিদের কি কিছুই ঋণ নেই শক্তির কাছে? শক্তির ঝোলায় ছিলো ম্যাডনেস, জীবনকে, বাস্তবতাকে দুই তুড়িতে বেপরোয়া উড়িয়ে নৈঃশব্দের কাছে ফিরে যাবার ক্ষমতা। গীতল কবিতায়, কথার যাদুতে মগজের মদে কবিতাকে নেশাতুর করে ফেলার বিরল প্রতিভা, আর সে বিরল সুরসৃষ্টির প্রতিভা, যা একটি কবিতাজেনারেশনকে ছন্দোমুগ্ধ করে রাখতে পারে, নিমজ্জিত করতে পারে, ডুবিয়ে ভাসিয়ে তুলতে পারে।খেলা হয়তো শেষ, কিন্তু বিষণ্ণ জাগলার ব্যাকস্টেজে শান্ত দাঁড়িয়ে, নতুন করে আবিষ্কৃত হওয়ার জন্য, তার দুহাতে ঘুরছে ছন্দ, উপমা, সুর- লাল, নীল, সবুজ বল, ঘুরছে তো ঘুরছেই, শুধু খেলা দেখার অপেক্ষা…শক্তির কাছে তার পরবর্তী কবিদের বারবারে ফিরে যেতে হবে, আজ আশিবছরের ব্যবধান থেকে দাঁড়িয়েও একথা বলা যায়, তার সুরাক্রান্ত পঙক্তিগুচ্ছ পাঠকমনের কুয়াশাচ্ছন্ন জলাভূমিতে চর তুলবে, ফের ডোবাবে, এভাবেই বাঁচবেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, কবি।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s