ঝুম্পা লাহিড়ি’র ইন্টারপ্রেটার অব ম্যালাডিজ :: মৃদুল মাহবুব

INTERPRETER OF MALADIES/ Jhumpa Lahiri ১৯৯৯ সালের ছোট গল্পের বই। স্মলনেসের বিগভার্সন হলো সর্ট স্টোরি। অন্তত অস্তিত্বের ব্যাপ্তি প্রকাশের দিক থেকে আড়াই টু দশ পৃষ্ঠার মাত্র টেলিং এ্য টেল মানে কিন্তু আর ছোটগল্প না। “আমাদের অনাবিস্কৃত অস্বিত্ত্বকে উন্মোচন করে ”, এমনই বলেছিলেন মিলান কুণ্ডেরা কোন এক ইন্টারভিউয়ে। সর্ট স্টোরি, ফিকশন, ননফিকশন, পোয়েট্রি বা সাহিত্য মাধ্যমে সৃষ্ট বহু ক্ষেত্রেই কথাটা খাটে। শিল্পীরা নিউটনের আপেল বাগানে জীবনের চলমানতার সূত্র আবিস্কারে ধ্যানগ্রস্থ, যেন চিরকালীনতার মধ্যাকর্ষণ এখনই খুঁজে পাবেন। সবাই পায় না, কেউ কেউ পায়। মানব জীবনের সত্য প্রতিনিয়ত তৈরি হয়। সেই প্রতিক্ষণে তৈরিকৃত  সত্য উন্মোচনই মহৎ লেখক বা শিল্পীর কাজ। কত ভাবেই না এই সামাজিক সত্য বদলায়।

 

 মাঝে মাঝে ভাবি ইমিগ্রান্টরা সবচেয়ে সংখ্যালঘুতায় আক্রান্ত। তারা সবসময় বসবাস করে ইন-বিটুইন মানসিক অবস্থায়। সামাজিক, রাজনৈতিক আর  ভৌগলিক চাপ সহ্য করেই তাকে বেঁচে থাকতে হয়। বলা হয় ঝুম্পা লাহিড়ী’র গল্প এই সব ইন-বিটুইন জনগোষ্ঠীকে নিয়েই। হয়ত তা নয়। ঝুম্পার গল্প আরও অধিক। সমগ্র মহাদেশের উপর নেমে আসা স্পিরিচুয়াল এম্পটিনেসকে ‍তিনি অনুবাদ করেছেন। একই সমাজে বসবাসরত একই ভাষাভাষী মানুষ যেমন পরস্পরকে বুঝতে পারে না, তেমনি একই সমাজে বসবাসরত অথচ তাদের ভাষা ভিন্ন, তারা পরস্পর দোভাষী সাহায্যে কথা বলে সুস্থতা চাচ্ছে। সমাজ সর্বদা যৌথ বসবাসই না, সমাজ মানে খালি সুস্থতাই না, ভালো থাকাও না, সমাজ মানে একটা স্পেসের মধ্যে নিজের ছেড়ে দিয়ে মাত্র বেঁচে থাকা, পরজীবীর মতো, এর অধিক হয়তো  কোন চেতনা-টেতনা সমাজে বসবাসরত অধিকাংশের থাকে না এবং তারা ভাবে না। ফলে, মানুষ সমাজিক হয়েও ভিনগ্রহী। আর সেই সমাজ ব্যবস্থা যদি হয় মান্টি-কালচারাল, তবে শুধু ব্যক্তি না, পরিবারও হয়ে ওঠে এলিয়েন। এমন এলিয়েন ব্যক্তি বা পরিবারের গল্পই ঝুম্পা লিখেছেন।

ভাষা তো একটা সমাজিক অনুসঙ্গ, মানে সমাজের বহু মানুষ মিলে বহুদির ধরে একটা শব্দানুভূতিময় ভাষা তৈরি করে, প্রতিটা মানুষের সাথে প্রতিটা মানুষের যোগাযোগের নেটওর্য়াক গড়ে ওঠে। মানুষে মানুষে অনুভূতি আর প্রত্যাশার আদান-প্রদানের সূচনা হয় ভাষা দিয়েই। যৌথভাবেই এর গড়ে ওঠা আর ব্যাপ্তি। ফলে ব্যক্তি একা একা ভাষার ধারণা তৈরির সক্ষমতা রাখে না। আর এই যৌথের তৈরিকৃত ভাষার সাথে যখন একক ব্যক্তির ডিলিং, অপরের সাথে সংযোগ প্রত্যাশা, তখন সবশেষে আধুনিকতার লাভ প্রান্তিক মানুষের ল্যাংগুয়েজ ব্রেক ডাউন। ল্যাংগুয়েজ ব্রেক ডাউনে ভাষা হয়ে ওঠে ইনফরমেটিক। জাস্ট ইনফরমেশনের বাইরে আর কোর অনুভূতিই কাজ করে না। অনুভবটা উবে যায়। শব্দানুভূতিময়তার জায়গায় গড়ে ওঠে মাত্র শব্দের কম্বিনিশেন আর পারমুটেশন। আমাদের মাল্টিকালচারাল সোসাইটির এইটা হলো যৌথভাবে গড়ে তোলা নতুন ভাষা, শব্দময়, অনুভূতিহীন, রাফ, মার্সিলেস। পুরাতন ভাষা থেকে এই যে নতুনের ভাষার উত্তরণ, নতুন সময়, নয়া-মানব, নব-প্রাণাত্মা, তাদের সমস্যা-সংকুল জীবন সমুদ্রে সফেনতাই আঁকা আছে INTERPRETER OF MALADIES. তাই আমার তো মনে হয় এইটা ছোট গল্পেরও অধিক। মাল্টিকালচারে ইনফরমেটিক ভাষাবিশ্ব বিগত একশ থেকে দেড়শ বছরের ইতিহাস। বিশ্বের বড় বড় নগরগুলোতে নানা দেশের মানুষ একত্রিত হচ্ছে। গড়ে উঠছে মেগা-মাল্টি-কালচার সিটি, ইমগ্র্যান্টরা এই মহানগরের নাগরিক। কমন ভাষায় তারা পরস্পরকে শুধু ইনফরমেশন দিয়েই বেঁচে থাকাটাকে অর্থময় করছে বিগত একশ থেকে দেড়শ বছর। দাশ প্রথা সমাপ্তির পর ভালো খাওয়া আর পরার জন্য ইমিগ্রেশন স্বতস্ফূর্ত একটা  বিষয় হয়ে উঠেছে। এর সাথে সাথে গড়ে উঠেছে নতুন ভাষা আর নতুন যাপন।এই সমস্ত মহানগরে বসবাসরত ইমিগ্র্যান্টদের উন্নত জীবনের মানবিক সার্ভাইভারের যুদ্ধটা আমাদের মত হাই কনটেক্স কালচারালদের বোঝটা জরুরী। সমাজ তো আমাদেরও পালটাচ্ছে।আপনার ভাষা ততক্ষণই আপনার সাথে কথা বলবে না, যতক্ষণ না আপনি আত্মিক কোন টান অনুভব করছেন আপনার সামনে দাঁড়ানো মানুষটার প্রতি। টান অনুভূত না হাওয়াটাই স্পিরিচ্যুয়াল এম্পটিনেস। এই স্পিরিচ্যুয়াল এম্পটিনেস ভাষা সংযোগের বাঁধা। স্পিরিচ্যুয়াল এম্পটিনেস ব্যক্তির ব্যর্থতায় তৈরি হয় না। আমাদের সমগ্র জীবন যাপন আমদের ভেতরটা তৈরি করে। সো, আপনার সমাজ, সামজিকতা, শিক্ষা, পরিবার, রাষ্ট্র, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, ফ্যাশন কারখানা , মিডিয়া আপনার আত্মার ভেতর কি প্রতিস্থাপন করবে তার উপর নির্ভর করছে আপনার স্পিরিটটা কেমন হবে।  ভাষার কাজ তো শুধু যোগাযোগ স্থাপন নয়, এটা একটা চাহিদাও বটে। ভাষা দিয়ে আমার অপরের নার্সিং ও রিকগনিশন চাই, সো ভাষা তখনই অ্যাক্ট করে যখন যোগাযোগ,  নার্সিং ও রিকগনিশন হয়। ভাষাকে আমরা জানতাম যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে। আসলে ভাষা কম্যুনিকেশনের অধিক কিছু। ভাষা লিপ্ত হবার ব্যাপার।

a12056

ঝুম্পার INTERPRETER OF MALADIESকেমন গল্প? স্ট্রাকচার, প্লট, বর্ণনা, টু্ইস্ট বা ভাষা অতি সাধারণ। বাট, ঝুম্পার আবিস্কার অতি বিপ্লবী। একটা গল্প দিয়েই আসুন চেষ্টা করি ঝুম্পাকে বোঝার। গল্পের চরিত্রহুলোর মধ্যে মি. এণ্ড মিসেস দাশ ও তাদের তিন সন্তার টিনা, রনি ও ববি ভারত সফরে এসেছেন ট্যুরিষ্টের মত।  জন্মগত ভাবে সস্পর্কিত হলেও এটা ভিন্নভাষার অপর এক মহাদেশ তাদের কাছে। আর তাদের সন্তানদের কাছে শতভাগ ভিন্ন দেশ তো বটেই। মি. এণ্ড মিসেস. দাশ সানটেম্পল দেখতে যাচ্ছেন তাদের সন্তানদের নিয়ে। আর্থসামজিক ভাবে উন্নত জীবন যাপন করেন তারা। দেখা যায় মি এণ্ড মিসেস দাশের বেড়ে ওঠা একই রকম।  তাদের বাবারা  পরস্পরের বন্ধু, প্রেমের বিয়ে। সামাজিক আইডেনটিটি হিসাবে তারা একই, সন্তানদের বেড়ে ওঠা নিউওর্য়াকের ব্রানসউইকে তাদের সাথেই । তবু কী নিদারুণ ভিন্নতা পরস্পরের। একই ভাষায় কথা বলা মানুষগুলো বয়ে নিয়ে চলেছে না-বোঝা আর না-বলা ভাষা। মি. দাশ বিজ্ঞানের শিক্ষক,  নিউওর্য়াকের তিনি তার ছাত্রদের দিয়ে ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়া ঘুরতে যান প্রতি বছর, ভারতে তিনি লেন্স, ক্যামেরা নিয়ে ঘুরছে, ‘ইন্ডিয়া’ নামক ভ্রমণ সংক্রান্ত বইয়ের পাতার ভাষায় তিনি দেখছেন ভারতবিশ্ব, নিজেদের  হ্যাপি ফ্যামিলি ছবি তুলতে চান, আগামী ক্রিসমাসে এই ছবি তিনি পাঠাতে চান বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়দের। তিনি ছবি তুলতেই থাকেন, ফিল্ম বদলে নেন। আর মিসেস দাশ গৃহিনী, রোদচশমা খোলেন না, তাদের ভাড়াটে গাড়ির একটা গ্লাস ওঠে না, তার আড়াল চাওয়ার প্রবনতা, অপরকে বুঝতে না চাওয়ার গৌরব নিয়ে তিনি ভারতীয় ঝালমুড়ি খেতে থাকেন, পরিবার, সন্তান ভালো না লাগা, নিজের ভেতর নিজেই নিখোঁজ তিনি। এরপরও পুরো ফ্যামিলির যোগাযোগ সংযোগ রক্ষা করে ভাষা। তারা দু’একটা কথা বলে পরস্পরের সাথে। যেটুকু কথা না হলেই নয়। মাত্র বেঁচে থাকার জন্য, মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য তাদের এই ভাষার ব্যবহার আলোড়নহীন, তৃতীয় ব্যক্তির কাছে মনোমুগ্ধকর। কোন অভিযোগ নাই কারও প্রতি কারও। অতি ভদ্রতায় ক্যামেরা আর রোদচশমা দিয়ে তাদের মনের কথাগুলো অবদমিত। মাত্র যাপন সচল। ভাষা ‍আদিম মাধ্যাকর্ষণ যেনো, অদৃশ্য সুতোয় সে বেঁধে রেখেছে সব ভার, পৃথিবীর বুক থেকে কোন কিছুকেই এই আকর্ষণ ছুটে যেতে দিতে চায় না। কেন্দ্রবিমুখী বল বস্তুর নিজস্ব ধর্ম নয়, আরোপিত,  পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে উৎসারিত।

মি. এণ্ড মিসেস দাশ তাদের সন্তানেরা সবাই ভাষার অভিকর্ষে সম্পর্কিত, এর বেশি কোন সম্পর্কের আনন্দ নেই সেখানে। আর মি. কাপাসি ট্যুরিস্ট কাম ড্রাইভার, ভারতীয়, তিনিই সাদা বড় অ্যাম্বাসেডরে এই পরিবারটিকে  নিয়ে যাচ্ছেন সানটেম্পল। তিনি ইংরেজি সহ স্বচেষ্টায় আরও কয়েকটি ভাষা শিখেছেন। তার সংগ্রহে আছে দুর্লভ সব ডিকশনারি, প্রথম জীবনে স্কুল শিক্ষক, পরবর্তীতে বেশি রোজগারের শর্তে একজন ডাক্তারের গুজরাটি  ভাষার দোভাষী, তিনি অনুভব করেন তার সন্তান হয়তো শুধু টেলিভিশন দেখেই তার থেকেও ভালো ইংরেজি শিখে যাবে, যে ডাক্তারের চেম্বারে তিনি দোভাষী সেই ডাক্তারের অনেক গুজরাটি রুগী, মি. কাপাসি গুজরাটভাষী রোগীদের রোগ-বৃত্তান্ত শুনে ডাক্তারের কাছে অনুবাদ করে দেন। এই ডাক্তারের সাথে তার পরিচয়ও বেশ আয়রনি। মি. কাপাসির প্রথম সন্তান টাইফয়েড আক্রান্ত হলে ডাক্তারের সাথে তার পরিচয় হয়। শেষ অব্ধি তার প্রথম সন্তার বাঁচেনি। কাপাসি সাথে তার স্ত্রীরে সম্পর্ক দুর্বোধ্য, যৌনজীবন নগ্নতাহীন, তিনি মনেই করতে পারে না তার স্ত্রীর নগ্নদেহ, জীবনযাপনের দুরত্ব সত্ত্বেও তিনি ভেতরে ভেতরে মিসেস দাশের নৈকট্য চান, তিনি মিসেসে দাশের চিঠির অপেক্ষায় থাকতে চান। কারণ?  মি. কাপাসি পারিবারিক ভাবে ভুলভাবে অনুদিত এক ব্যক্তি বা তিনিও চারপাশটাকে ভুল ভাবেই অনুবাদ করেছেন।  যোগাযোগের প্রতিষ্ঠার চেষ্টার আজন্ম ব্যর্থতার অসুখের উপর যখন মিসেস দাশের অনুকম্পার সেবা, রিকগনিশন তিনি পান তখন তিনি নিজেকে ভিন্নভাবে আবিস্কার করেন। ফলে, এই পরিবারের সাথে আরও সময় কাটানোর আশায় তিনি তাদেরকে প্ররোচিত করেন ঐদিনই আরও একটা দর্শনীয় স্খান পরিদর্শনের। এতে মি. কাপাসি আরও একটু সময় পাবেন মিসেসে দাশের। এইখানে এসে মিসেস দাশ নির্জনতায় মি কাপাসি কে জানন যে, ববি আসলে তার স্বামী বন্ধুর ঔরসজাত। দীর্ঘ আট বছর পর এই প্রথম তিনি  কারও কাছে এই কথা স্বীকার করছেন। একে বলে ইনফেডালিটি। হয়তো মিসেস দাশ ছিলেন পরিস্থিতির স্বীকার। তবু এটা ইনফেডালিটি মিসেস দাশের কাছে। এই ইনফেডালিটি তারে যুক্ত হতে দেয় না পরিবারের সাথে। বা মিসেস দাশ জানেন ইনফেডালের প্রতি সামাজিক প্রথাগত আচরণ কেমন। ফলে, তিনি লিপ্ত হতে পারেন না।  বানরের আক্রমনে আক্রান্ত ববিকে বাঁচানোর তেমন কোন প্রচেষ্টাই দেখা যায় না তার মধ্যে। প্রতিটি মানুষই কথা বলতে পারে যে যার ভাষায়। কিন্তু লিপ্ত হতে পারে না কেউ কারও সাথে।

ফলে, ভাষার বোম বুকে এমন দাশ পরিবার বা কাপাসি বা আমরা সবাই বসে আছি যে যার মত ভিন্নতায়। ভাষা মানেই সংযোগ নয়, আরও অধিক কিছু। ভাষা মানে মানুষে মানুষে নার্সিং, যুক্ত হওয়া। এই পরস্পর উপলব্ধিহীনতার গল্পই ইন্টারেপ্রেটার অব ম্যালাডিজ। অন্যান্য গল্পগুলোও কোন না কোন ভাবে মানবের নতুন অস্তিত্বটাকেই মূর্ত করেছে।

যুক্ত হতে না পারার সামাজিক বৈশিষ্ট্য, ভাষার ব্যর্থতার সরূপ ঝুম্পা লাহিড়ী আবিস্কার করেছেন, দেখিয়েছেন। আর এর সুচিকিৎসার দায় মনোবিজ্ঞানীর, শিক্ষায়াতনের।

945138_10151618637064869_1881766900_n
মৃদুল মাহবুব (কবি, গদ্যকার)
Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s