বাহ্যিক নীরবতা শোনা

শব্দ, ধ্বনি, নাদ, নিনাদ, স্বন, আওয়াজ ইত্যাদি শব্দেরা সাধারণভাবে অভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে এবং নানা জায়গায় নানা অর্থও ধরে। নানা অর্থ মানে আওয়াজের নানা মাত্রা, নানা রূপ। কোনো ধ্বনি মানে আমাদের শ্রবণেন্দ্রীয়ের মাধ্যমে যার সাধারণ পরিচয় পাই, নাম পরিচয় পাই- বিশেষ পরিচয় পাই। ধ্বনি আর নীরবতা পরস্পরের বিপরীত হলেও, এই দুইয়ের একটা অভিন্ন ব্যাপার আছে- ধ্বনি ও নীরবতা দুইই সাধারণ অর্থে দর্শনেন্দ্রীয় দিয়ে দেখবার না, জিহ্বা দিয়ে স্বাদ নেবার না, নাক দিয়ে ঘ্রাণ নেয়ারও না। ধ্বনি শ্রবণের, তারে শোনা যায়। সাধারণত এর বিপরীতে থাকা সাইলেন্স কি শোনা যায়? যায়। কেমনে? আমরা সেটা দেখবো নানা পথে ঘুরতে ঘুরতে। ওই যে ধ্বনির অনুপস্থিত অবস্থা কান সত্যায়ন করে সেইটাও কি নীরবতা শোনা? আর কতোভাবে শোনা যায়? নীরবতাও কি কানের মাধ্যমে প্রাপ্ত একটা অবস্থার জ্ঞান? পাইলট যদি মাইক্রোফোন খুলে রাখেন, ফ্লাইট কন্ট্রলার শুনতে পান নীরবতা ককপিটে। আর, ঘরের ভেতর তিনি আছেন জানতেন, ডাকলেন আপনি, কোনো সাড়া শব্দ নাই। আপনার কান জানালো ওখানে নীরবতা আছে। উনি থাকলেও নীরবতা, না-থাকলেও নীরবতা; কারণ নো সাউন্ড। এই এক প্রকারের সাইলেন্স অবতরণ দেখা ইন্দ্রীয়লব্ধজ্ঞান-চোখে। যিনি কানে শোনেন না, কালা, তিনি আওয়াজ শোনেন না, নীরবতাও শোনেন না। ঠিক যেমন অন্ধ কেউ আলো দেখেন না, অন্ধকার অবস্থাও দেখেন না। যাদের চোখ আছে তারা আলো দেখেন, আলোকিত কিছু দেখেন, অন্ধকারে অন্ধকারকে দেখতে পান, অন্ধকারাচ্ছন্ন কিছুও দেখেন। চোখ দিয়ে দেখা বলতে আমরা যা বুঝি। কাব্য ব্যঞ্জনাতে কবি নীরবতার ঘ্রাণ পাওয়ার কথা বলতে পারেন, তা ভিন্ন অর্থের। কবি সিগনিফায়ার বানাতেই পারেন। তাতে সিগনিফায়েডস ঢালতে পারেন? ঘ্রাণ শুধু ঘ্রাণ না, ঘ্রাণ পাওয়া মানে মর্মের সাক্ষাত পাওয়াও হয়। অন্যতরফে তাইলে সাউন্ডপ্রুফ চেম্বারে কি ধ্বনি পাওয়া যায়? দেখা যাক-

সাউন্ডপ্রুফ চেম্বারে ধ্বনি

ধ্বনিতত্বের বিজ্ঞানী Audrey নীরবতা বুঝবার পরীক্ষায় লাগলেন। সাউন্ডপ্রুফ চেম্বার বানিয়ে তাতে ঢুকলেন। চোখ বুঝলেন ভালোভাবে নীরবতা শুনতে। ওরে বাহ! তিনি উপভোগ করলেন এমন কিছু যেনো অন্য কেউ উপভোগ করে ছোট নদীর বার্বল বা এক ধরনের ব্যাঙের ডাক। তিনি বুঝতে পারছিলেন অন্তরের নজরের দ্বারা (introspection) কোনো auditory sensation of silence ওখানে ঠিক নাই। ব্যাপারটা খুলে দেখানো হয়েছে এভাবে- একটি বাক্যের শব্দদের মাঝে মাঝে ফাঁকা জায়গা আছে। অডিও রেকর্ডে শুনছেন একটি গানের মাঝে মাঝে নীরবতা আছে। এই নীরবতা আর শব্দদের গ্যাপ এই দুই অবস্থা মনোজাগতিক। কারণ আমাদের শ্রবণেন্দ্রীয় দেয়া হয়েছে জন্মগত তাই এর সাথে রিলেটেড নীরবতাকে ধরতে পারি।

শ্রবণেন্দ্রীয় না থাকলে নীরবতা বুঝবারও প্রাসঙ্গিকতা নাই। অক্ষর শব্দ দেখতে পারছি বলেই গ্যাপটা পারসেপশনে প্রাসঙ্গিক। মানে ‘Absences are relative.’ মানে সম্পর্কসূত্রে তারা হাজির। এ্যাবসেন্স অব সাউন্ডস বোধগম্য। এই বোধগম্যতা নীরবতা বুঝবার অনেক ধরনের মধ্যে একটা ধরন। ওদিকে আবার হারভার্ড ইউনিভাসর্িটিতে কমপোজার জন কেইজ সাউন্ডপ্রুফ এ্যানেকোয়িক চেম্বারে ঢুকে উচ্চ ধ্বনি আর নিম্ন ধ্বনি পেলেন। প্রকৌশলী জানালেন উচ্চ ধ্বনি কেইজেরই নাভর্াস সিস্টেমের আর নিম্ন ধ্বনি তার রক্ত চলাচলের। কেইজের দাবী আওয়াজ অমনিপ্রেজেন্ট। কিন্তু কথা আছে, তর্ক আছে। পরে আবার কেইজের চিন্তাতে যাবো। তার আগে দেখে নেই নীরবতা ও ধ্বনি, কার বয়স কত।

ধ্বনি ও নীরবতার বয়স

নীরবতা নিরবধি কীনা ভাবতে যেয়ে বিজ্ঞানী ভাবলেন ধ্বনির স্থায়িত্ব নিয়ে। আওয়াজের বয়সের সাথে এর উৎপত্তিস্থলের রিশতা লাগানো কীনা? মৌচাকে মৌমাছির গুঞ্জরণ মেটাফিজিক্সের পাঠ দিতে এলো। দেখা যায়, একটা মৌমাছির চলে যাওয়াতে গুঞ্জরণ থামে না, সম্মিলিত ধ্বনিপুঞ্জ টিকে থাকে। মানে একে একে একক মৌমাছি সৌর্সের আবশ্যকতা থাকছে না। মানে, যেকোনো একটা চলে গেলে, মানে, যেকোনো একটা প্রত্যেকটিকেই ধরে, ফলে প্রত্যেকটির এ্যাসেনশিয়ালিটি নাই হয়। এখন এই গুঞ্জরণ-ধ্বনির বয়স নির্ধারণ করতে গেলে পাওয়া যায়, নির্দিষ্ট ধ্বনি নির্দিষ্ট সৌর্স নির্ভর হওয়া সত্বেও একক মৌমাছির বয়সের চেয়ে কালেক্টিভ এ্যাফেক্টের ধ্বনির বয়স অধিক। তারা বললেন, ‘And there could be silences older than any sound. A pause can take place between distinct sounds.’

হ্যাঁ, থামতে হয়, থামলে ছন্দ সৃজন, না থামলে অকারেন্স রিকারেন্স জুতসই হয় না, মজা আনতে পারে না জীব ও বস্তুপ্রাণ। অর্থবোধকও হয় না। একটা অর্থ চাইই চাই। অর্থের সাথে মজাও চাই। শক্তি সাথে নিয়ে আসে মজা। মজাতে মজতে মানে ডুবতে পজ লাগে। পজ বা থামা হলো এনার্জি সৌর্স। থামলে নীরবতা না-থামলেও ধ্বনিহীনতা হয়? কেমনে?

ধ্বনিপুঞ্জের ধ্বনিহীনতা

আমরা পাই কখনো ধ্বনিপুঞ্জের মাঝে ফোটে নীরবতা। জমাট একিভূত ধ্বনিসমষ্টি। আলাদাভাবে অর্থবহ না এমন ধ্বনিগুলোকে কান পরিচয় করাতে পারে না আলাদাভাবে। যেমন পাশের ঘর থেকে কিছু মানুষের কথার সম্মিলিত ধ্বনি। কথা পরিস্কার বুঝা যায় না কিন্তু আওয়াজ আসছে কথাপুঞ্জের। এই কথাপুঞ্জের শব্দের ভিতর আপনি নিরাই। মানে, নিভৃতে নীরবতার একটা গমগম রূপের ভেতর। কখনো কোনো সংগীতের সুর ও শব্দের ভেতর থেকে একটা সাইলেন্স বোধ এসে আচ্ছন্ন করে। চারপাশের বহুবিধ নিস্বনের মাঝেও নীরবতার স্বাদ। শাদা আলোর মাঝে যেমন অনেক আলোর ফ্রিকোয়েন্সি একাকার দেখা যায়। যেনো তেমনই এই শাদা ধ্বনিপুঞ্জ? যেনো ধ্বনি সব মিলে এক ধ্বনিহীনতা নির্মাণ করবার ফলে ধ্বনির ভেতরে নীরবতার জন্ম নিলো। শব্দপুঞ্জ নাই-নাই আকারে বিদ্যমান। ধ্বনি আর নীরবতা মিলেমিশে একাকার হওয়া আরেকটু ভেতরে গিয়ে দেখা যাক-

ধ্বনি ও নীরবতার মিলমিশ

সংগীতশিল্পী মঞ্চ থেকে বললেন, ‘নীরবতা দিবেন আমাকে, আমি দিবো সুরধ্বনি’। আডিয়েন্স চুপচাপ, নীরব। তার মানে কিন্তু অডিটোরিয়ামের ভেতর নীরবতা না। সেখানে সুরধ্বনির মৌজ বিদ্যমান। নীরবতা আর ধ্বনির মিলমিশ অবস্থা। কবি বলতে পারেন আওয়াজ আর খামোশির মনোহর মিথস্ক্রিয়া অডিটোরিয়ামে। বুঝতে পারা যায় সেখানে ধ্বনি আছে আর তার মাঝে নীরবতাও আছে। ধ্বনি গ্রহণ করছে নীরবতা। এবং সংগীতের, মিউজিকের শিল্প নীরবতার মাধ্যমে আডিয়েন্সের চেতনা ছুঁয়ে ফেলছে। কেমন-যেনো এক মজাদার বুঝ পেলাম? তাইলে বুঝ পাওয়া কেমনে হয় তা কিঞ্চিৎ দেখে নিতে পারি।

বুঝ পাওয়া না-পাওয়া

সাইলেন্স অবতরণ করে যখন আপনার প্রিয় মুখটিতে, দেখেন ভালো করে আপনি? সাইলেন্স এর রূপ বিন্যাস দেখেন? সব রূপ অর্থবহ আপনার কাছে? বোধগম্য? জগতের সব ঘটনার সারমর্ম বুঝেন? (আমি যেনো তা ঠিক-ঠিক বুঝি না মনে হয়।) বুঝ পাওয়া মানে জানা বা জ্ঞাত হওয়া। understand মানে know, know মানে catch, catch মানে grasp ইত্যাদি এভাবে এক শব্দের সাথে ভাব হয় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শত শব্দের। উপরে-উপরে বুঝ পাওয়া আর গভীরভাবে সামগ্রিক ব্যাপারটার মর্ম বুঝে ফেলা এক না। জীবনকে ঘিরে সংঘটিত স্ববিরোধ উন্মোচক ঘটনাবলী মানুষ ঠিক-ঠিক ধরতে পারে না। যুক্তির হিসাব কষে, অভিজ্ঞতা দিয়ে বরাবর মিলাতে পারে না। হতবাক হয়, নীরব হয়। বুঝতে বুঝতে অবশেষে এ্যাজরা পাউন্ড বুঝলেন বুঝেন নি কিছুই। বললেন এভাবে- ‘All my life I believed I knew something. But then one strange day came when I realized that I knew nothing, yes, I knew nothing. And so words became void of meaning. I have arrived too late at ultimate uncertainty.’

 11295631_10206841471545937_1344500895939137985_n

সক্রাতেসও জানিয়েছিলেন, একটা ব্যাপারই তিনি জানেন যে তিনি কিছুই জানেন না। ল্যাটিন জবানে কথাটা – scio me nihil scire. ভাষার দৌলতে জানা বা বুঝ পাওয়ার এমনতরো উপসংহার মানুষ পায় বিশেষ বোধের অবস্থাতে। মেটা-লেবেলের বোধ। ব্যাপারটা সহজ না। বুঝ পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে গভীরভাবে দেখলে বিষয়, দেখা যায়, সেন্সিং মানেই ডিটেক্টিং না। প্রবহমান বাস্তবতা এক জায়গায় ধরে রাখবার জিনিস না। প্রতিক্ষণে নূতন আবাহন, নব নব উন্মোচন। শিকারীর নীরবতা আর শিকারের নীরবতা দুইটাই নীরবতা কিন্তু অভিন্ন অর্থের না। একটা ধরবার অন্যটা ধরা খাওয়া থেকে বাঁচবার। দুই নীরবতার বুঝ। সফিসটিকেটেড প্রাণীরা নীরবতার মাধ্যমে মেটা-লেবেলের ইন্সট্রাকশন দিতে পারে স্বগোত্রকে। নীরবতার মাধ্যমে বিপদের বার্তাও বুঝিয়ে দিতে পারে সময় বিশেষে মানুষসহ অনেক প্রাণী। তবু বুঝ পেতে গড়বড় হতেই পারে।

বুঝ পাওয়াতে যদি গড়বড়

কী দিয়ে বুঝি? নানাভাবে পাওয়া জ্ঞানের বুঝ দিয়েই তো বুঝি, তাই না? একটা বুঝ দ্বারা আরেকটা বুঝ চেনা জানা। যে-বুঝ দিয়ে অন্য বুঝটা ধরা হয়, সেই বুঝ বা জ্ঞানের মধ্যেই যদি গড়বড় বা আসল ব্যাপারটার ধারণা না থাকে তাইলে যে-বুঝ দিয়ে আপনি বুঝে নিলেন ঘটনাটি সেটা যথাযথ না। এই রকম একটা বিবেচনা আছে। যেমনঃ পলিটিশিয়ানদের দ্বারা ঘটানো একটি false flag ঘটনা। যদি আপনি ফলস ফ্ল্যাগ বজ্জাতি সম্পর্কে জানেন না। গলত বুঝতে পারেন। ক ব্যবহার করেছে গ এর বিরুদ্ধে খ-কে, পাবলিক খ-কে দোষী ভাবে আড়ালে থাকা ক এর বজ্জাতি ধরতে পারে না। নানা মিডিয়ায় ‘বুদ্ধিজীবী’রা খ এর দোষ বাইর করে দুনিয়া ঘেটে। খ অই ঘটনার ধারেকাছেও নাই। ক আগে বেড়ে গ-কে বুঝ দ্যায়, এ্যাভিডেন্স হাজির ক’রে ড্যান্স করে, খ এর বিরুদ্ধে ভীষণ চেতায় গ-কে। এ্যাভিডেন্স দেখে গ ক্রেজি হয়ে খ এর বিরুদ্ধে ধুমাধুম এ্যাকশনে। অথচ অই এ্যাভিডেন্স ফল্স, কেবল তাদের ফুর্তির ড্যান্সটা খাঁটি। নীরবে খুব গোপনে ফল্স ফ্ল্যাগ ঘটাবার পরিকল্পনা খাঁটি। মোসাদের মাস্টারপিস ৯/১১ একটি দুর্দান্ত ফলস ফ্ল্যাগ ঘটনা। অই ধ্বংসলীলার মাধ্যমে ইসরাইলি ইনভেস্টরগণ বিস্তর মুনাফা পেয়েছেন। (চুপ চুপ! দূরবর্তী নক্ষত্রের নীরবতা সাক্ষী, সাধু Thich nhat hanh এসে দেখিয়ে দিবেন সন্ত্রাসীর সাথে নানাভাবে সন্ত্রাসবিরোধী এবং সন্ত্রাসদমনকারী জড়িত।) ওদিকে ওই ধ্বংসযজ্ঞের কারণে যারা তাদের প্রিয়জন হারালো, তারা ভাষাহারা, বেদনাক্রান্ত নীরব। নীরবতা ত্রাসও ঢুকায় মনে।

 

নীরবতা ভয়ংকরও

Blaise Pascal ভয় পেয়ে লেখছেন ‘The eternal silence of these infinite spaces frightens me.’ কেন? কারণ নীরবতার অনুষঙ্গী বিচ্ছেদ/ছাড়াছাড়ি (এ্যাসট্রেঞ্জমেন্ট)। সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হলে যা থাকে তা নীরবতা। সবকিছু ছেড়ে নীরবতার কাছে সমর্পিত হতে হয়। কখনো নীরবতা মানে হ্যাঁ, কখনো না, কখনো না-হ্যাঁ এবং না-না। কখনো রাগ গোস্বা, কখনো ভালোবাসা শ্রদ্ধা। কখনো শোক সন্তপ্ত পরিবারে গাঢ়তর দুঃখবোধ এনে দিতে অবতরণ করে নীরবতা। কখনো নীরবতা আদর ছড়ায়, কাছে টানে; কখনো নীরবতা এসে বহুদূর সরিয়ে দ্যায়। কখনো একটা স্পাইরাল অবস্থা সামনে আনে।

স্পাইরাল অব সাইলেন্স

নাহ, কিচ্ছু বলেন না, চুপ থাকেন। চুপচাপ করেন তিনি অন্য অর্থের চুপচাপতা চর্চা। নো লাইক নো কমেন্ট, যদিও তার বা তাদের ভিন্নমত আছে। বলেন না একঘরে হওয়ার ভয়ে; গ্রুপের লোকদের, দলের লোকদের, গোষ্ঠীর লোকদের, খাতিরের লোকদের বিরাগভাজন হবেন, বিচ্ছিন্ন হবেন, এই ভয়ে নীরব থাকেন। রাজনীতি বিজ্ঞানে, গণসংযোগে, সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটা একটি তত্ত্ব, নাম স্পাইরাল অব সাইলেন্স। জার্মান রাস্ট্রবিজ্ঞানী Elisabeth Noelle-Neumann (বার্লিনার উচ্চারণ বাংলায় এভাবে লেখা যায়- এ্যালিজাবেথ নোলো নয়মান) এই তত্ত্ব উন্মোচন করেন। মানুষের সমাজে, পলিটিক্যাল স্পেকট্রামে, সামাজিক মাধ্যমে এটা আছে। মাইক্রো ও ম্যাক্রো লেবেলে আছে। কোথাও-না-কোথাও, এইধারে নয় ওইধারে, ঘরে বা বাইরে ব্যাক্তির ওপর নেমে আসে স্পাইরাল অব সাইলেন্স। (এই সাইলেন্ট থাকা ভালো না মন্দ সেটা অন্য বিবেচনা। একটা কিছু বুঝতে যেয়ে কেবল ভালো না মন্দ বার করবার প্রবণতা ঠিক না বোধ হয়। যা আছে, যা থাকছে, যা থাকতে পারছে, তা দেখবার, তা বুঝবার চেষ্টা তো করা যায়। দেহ আছে, চেতনা আছে। অর্থ আছে, অর্থহীনতা আছে। অর্থহীনতার অর্থ আছে। নেন বা না নেন ওসব আছে।) ফলে নীরব থাকবার অধিকার প্রাসঙ্গিক হয়ে যায়।

 11018344_10206841466065800_9170028266252622030_n

অভিযুক্ত নীরব থাকার অধিকার

 প্রসিকিউটর বা পুলিশ ইন্টারোগেশনের সময় অভিযুক্ত ব্যাক্তি ‘নীরব থাকার অধিকার’ (right to remain silent) চর্চা করতে পারে পৃথিবীর বহু দেশের বিচার ব্যবস্থাতে। এর ফলে অভিযুক্ত সেলফ-ইনক্রিমিনেশন থেকে নিজেকে রক্ষা করে। কোনো কোনো দেশে সেটা সাংবিধানিক অধিকার। কোনো দেশে সংবিধানে নাই, সাধারণ আইনে আছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, পাকিস্তান প্রভৃতি দেশের সংবিধানে এ অধিকার স্বীকৃত। ইউরোপিয়ান কোর্ট অব হিউম্যান রাইটস-এ উল্লেখ আছে, ‘the right to remain silent under police questioning and the privilege against self-incrimination are generally recognized international standards which lie at the heart of the notion of a fair procedure under Article 6.[15]’ এছাড়া

 অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, হংকং, চেক রিপাবলিক, ইংল্যান্ড ও ওয়েলস, উত্তর আয়ারল্যান্ড, ন্যাদারল্যান্ড, নরওয়ে প্রভৃতি দেশে আইনের মাধ্যমে right to silence চর্চার সুযোগ আছে। উইকিপেডিয়াতে বাংলাদেশ উপশিরোনামে একটি অনুচ্ছেদ আছে। সেখানে অধিকারটা কীভাবে আছে না-আছে তা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে আছে ‘in Article 35(4) of the Constitution, which protects individuals from self-implication.[6][8]’।

 তা যাই হোক এক নজর কূটনীতিক কবি নীরবে কী দেখেন আমরা দেখতে পারি।

কূটনীতিক কবি-র নীরবতা

জগতের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর (ইতিবাচক বা নেতিবাচক) সাথে নীরবতার রিশতা বেশ গাঢ়তর। গুপ্তচর নেতা নীরবে নিভৃতে হিসাব কষেন এসপিওনেজ তৎপরতার। কূটনীতিক গুপ্তচর টু ইন ওয়ান। তার কথা কম কাজ বেশী। দেখেন সাধারণের চাইতে অধিক কিছু। ইনটেলিজেন্স-র চোখ। কখনো ল্যাং মারেন লেংগুয়েজ দিয়ে সরবে না, নীরবে। কূটনীতিকের নীরবতা পাঠ করা ইন্টারেস্টিং তাই। আর কূটনীতিক কবি ও রাজনীতিক পাবলো নেরুদা কর্তৃক নীরবতা পাঠও ইন্টারেস্টিং। তিনি চেয়েছেন ‘Let me commune, then, commune with your silence,’ কারো নীরবতার সাথে খুব আন্তরিক কমমিউন, সহজ ব্যাপার না। তিনি সহজেই পারবার কারণ, তার আগে তিনি ‘calmed by your silence.’। ডিপ্লমেট হয়েও, রাজনীতিক হয়েও তিনি দেখেছেন নীল সৈকতের নীরবতা। তার মনে হতো তিনি the voice of the rain crying শুনতে পাচ্ছেন। নীরবতার কতোটা গভীরে গেলে বৃষ্টির কান্না শুনতে পাওয়া যায় আমরা বরাবর ধরতে পারি কি? আমরা কি হৃদয় দিয়ে হৃদয়ের কথা শুনি না?

 সকল কথার মরণ হলে হৃদয় কথা বলে

 কবি কি নীরবতা দেখেন? হ্যাঁ, কবি দেখেন সহস্র রূপে। নানা কবিতায় নানা রূপ। নীরবে দেখেন নীরবতার রূপবৈচিত্র।

ফুলগুলি যেন কথা/পাতাগুলি যেন চারি দিকে তার/পুঞ্জিত নীরবতা। (শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘লেখন’)

 বাংলা ভাষার সংস্কৃতির নবতর আদল এনে দিয়েছিলেন তেজদীপ্ত উচ্চারণে দ্রোহ ও প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। নীরবে নিভৃতে লিখছেন কিন্তু যুগসংস্কারক কবির নীরবতাতে গর্জে উঠছে শব্দেরা, তিনি শুনছেন, তাঁর কানে এসে উদ্দীপনা দিলো রণহুংকার, বিষের বাঁশির সুর, তিনি ভাষাতে আনবার জন্যে মগ্ন হয়েছেন, সে-এক নীরবতা, মুলত যুগ যুগ ধরে পুঞ্জিভূত অন্যতর নীরবতা ভাঙবার প্রয়োজনে। হুগলি কারাগারে কয়েদীদের নীরবতা ভাঙলেন, দিশাহীন নিশ্চুপ জাতির নীরবতা ভাঙলেন ‘কারার ঐ লৌহ কপাট ভেঙে ফেল কর রে লোপাট’ গেয়ে। লোহার গারদে শিকল পরা কবি শিকল দিয়েই ঝনঝনিয়ে গাইলেন ‘এই শিকল পরেই শিকল তোদের করবো রে বিকল।’ করলেন বিকল বরাবর। ওদিকে আমরা দেখি, আলোকিত পৃথিবীতে যখন কদর্যতা প্রাধান্য পায়, লুসিফারের খবরদারী সবখানে, বৈরিভাবাগুনে দগ্ধ অভিমানভেজা কবি তখন চাইতেই পারেন- “All I want is blackness. Blackness and silence.” (Sylvia Plath)

হতে পারে তাঁর কষ্টের রঙ একান্ত তাঁরই বিবেচনাপ্রসূত। তবু কেন ব্ল্যাকনেস চান? বিতৃষ্ণ ব’লে? তিনি আনন্দ চান? নীরবতায় আনন্দ থাকে?

শেক্সপিয়র বলছেন- ‘Silence is the perfect herald of joy.’

সাইলেন্স আশ্রয় দ্যায় ক্লান্ত পথিকেরে? কখনো বহুবিধ নীরবতাই বহু আদলের মিউজিকরুম হতে পারে না? নীরব আকাশ, দালান, মৌচাক, গাছ যেমন মিউজিকরুম হয়। আমরা পড়ি-

এই আকাশ, মেঘেদের মিউজিকরুম/এই দালান, মাকড়সার মিউজিকরুম/এই মৌচাক, মাছিদের মিউজিকরুম/এই গাছ, পাখিদের মিউজিকরুম। (বৃষ্টি ও আগুনের মিউজিকরুম, জহর সেনমজুমদার)

মিউজিকে হর্ষ বিষাদের বাড়ী-ঘরে নীরবতা দুয়ার খোলে। ছন্দোময় এক ভিন্নতর নভোমন্ডলে যেনো নৈঃশব্দই রাজাধিরাজ। আওয়াজের অভ্যন্তরে খামোশিই প্রভাবশালী মায়াবনবিহারিনী। কথাদের উপস্থিতিতে কথাহীনতার আবহ। কথা আছে কথা নাই। কথাদের ইন্তেকাল হলে তো আর কথাই নাই-

সমস্ত শব্দের মৃত্যু হলে পর শুরু হয় নৈঃশব্দে্যর বাদশাহি‘ (-মাসুদ খান, প্রেম, আঁধারতমা আলোকরূপে তোমায় আমি জানি)

বলা হয়েছে তাঁর প্রিয়তমার তিরোধানের কিছু দিন পর এ্যাডগার এ্যালান পো নিজেকেই বললেন ‘হি ইজ দি করপোরেট সাইলেন্স’ তাঁর ‘সাইলেন্স’ কবিতায়। দুই ভাঁজের নীরবতা- সমুদ্র আর সমুদ্রসৈকত- দেহ আর আত্মা, দেখতে পেলেন।

কবি জীবনানন্দ দাশের অনেক কবিতায় আমরা পাই ঝলমলে এ্যালোকোয়েন্ট সাইলেন্স। ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থের ‘বনলতা সেন’ কবিতাটিসহ ‘হাওয়ার রাত’ ‘শঙ্খমালা’ একেকটি যেনো গাঢ়তর সাইলেন্স থেকে উন্মোচিত বিস্ময়কর সুন্দর মনছোঁয়া কবিতা ও কবিতার অপূর্ব ইনটোনেশন।

আমরা পাই, কাব্যভাষাতে নীরবতার অন্তর্নিহিত নিস্বন বাঙময় হয়। নৈঃশব্দের মাঝে কবি শুনতে পারেন ঋতুবিহারী পাখির চিৎকার। দেখেন শঙ্খ ঘোষ- বুকের উপর দিয়ে গলে যাওয়া শব্দহীন দিন।

তিনি আরো দেখেন, চুম্বন করেছ তাকে শঙ্খের ফুৎকারের মতো, আর/ধ্বনি তার আলো হয়ে গড়িয়ে পড়েছে দিকে দিকে। (গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ – শঙ্খ ঘোষ)

খুব চুপচাপ ডুব দিয়ে আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ দেখেন- হলুদ খড়ের দেশে প্রাণগর্ভে বেজে ওঠে আগুনের বেহালা‘ (চিঠিভূমি, নো ম্যানস জোন পেরিয়ে)

আগুনের বেহালার সুরধ্বনি এক অভিনব মাত্রার জানালা খোলে। আর যে-মাত্রার জীবনে আমাদের জীবন বোঝাপড়া, এই মাত্রার জীবন নীরব হয়, সহস্র প্রকার আওয়াজের উৎস থামে, নিথর হয় দেহপিঞ্জর। মুজিব মেহদী দেখেন- জীবনের ভিতরে আজ মৃত্যুর লোমশ একটা হাত ঢুকে গেছে/আনাচে কানাচে তার জন্মেছে পাথরকুচি।‘ (মৃত্যু, চির পুষ্প একাকী ফুটেছে)

বিশেষ ধ্বনি আর ধ্বনিহীনতার মাঝখানে মজনু শাহ যা পেতে চান তা স্ফুট এভাবে- ‘…এই লালপর্ব কেটে গেলে, যদি শুনতে পাই অসীমের রণন ! হাসি আর নীরবতার মাঝামাঝি এক ধূধূ বালুকাবেলা খুঁজে পেতে চাই আমি তার আগে‘ (ব্রহ্মান্ডের গোপন আয়না)।

ধূধূ বালুকাবেলা বড় গাঢ়তর নীরবতার উন্মোচক। আর অইযে নীরব খুশবো – ইনসেন্স – ধুমায়িত চুপচুপ ঘ্রাণ, শক্তি দেখেছেন ধূপের? থেরাপিউটিক শিল্প এক। পরাও নীরব ধূপ অধমেরে, বেদনারে পর করে দেই….‘ (মুজিব ইরম, পানিনিদ্রা, আদিপুস্তক)

কবি কখনো ডিটেক্ট করেন- থেমে গেছে গুজবে-ভরা জঙ্গলের ফিসফিস-ধ্বনি‘ (মাসুদ খান, কবি – এই ধীর কমলাপ্রবণ সন্ধ্যায়)

থামার পর নতুন মেটাফরে ধ্বনিবৈচিত্র ফোটে। কবি ধরেন সেসব মেটাফর। কোনো বিশেষ নীরবতাতে প্যাশন বর্ষণ হলে কবি তা ভাষাতে আনেন এভাবে: তবু, তোমারই নীরবতা থেকে বাক্য কুড়িয়ে দূরে এতদূরে আসা, বিস্মৃতি ঠেলে ঠেলে স্মৃতির ভিতর।‘ (হিজল জোবায়ের, সৌপ্তিক – আদিম পুস্তকে এইরূপে লেখা হয়েছিল)

11058488_10206841470785918_4399872073268269164_n

জাপানি হাইকু মাস্টার মাৎসুয়ো বাশো দেখাচ্ছেন: ‘কী গভীর সে নৈঃশব্দ্য/মনে হয় যেন ঝিঁঝিঁর ডাককেও/ধীরে ধীরে শুষে নিচ্ছে শিলাখণ্ডগুলি। (অনুবাদ: গৌরী আইয়ুব। মুজিব মেহদী-র কাছ থেকে পাওয়া)

এইভাবে দেশে দেশে কবিদের চোখে ধরা পড়ে, অর্থবহ প্রণোদনা দিতে অবতরণ করে নীরবতার বেশুমার রূপ রঙ। আর বোধ হয় বড় মাপের সাধক কবি পর্যায়ক্রমে নৈরর্থের বাড়ীর খোঁজ পান নীরবতার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে। এবার অন্তর্দেশের নীরবতার অবতরণ দেখি:

অন্তর্দেশের নীরবতাও বাহ্যিক ধ্বনিহীনতা

জালালউদ্দীন রুমী বললেন, ‘In Silence there is eloquence. Stop weaving and see how the pattern improves.’

স্টপ উইভিং ক’রে একাকিত্বের গভীরতর গহীনে গেলে নীরবতার মিনিংফুলনেস-র প্যাটার্ন দেখা যাবে। আরশিতে আপন মুখ দেখবার পথের ইশারা বা প্রস্তুতির কথা? সূফি ভাবনাতে অন্তর্দেশের নীরবতাবাহ্যিক ধ্বনির অনুপস্থিতি বিষয়ক না। সেটা যাবতীয় চিন্তামুক্ত অধ্যায়ে যাবার পাঠ। নীরবে মগ্ন হয়ে সূফি দেখেন, ‘মানুষের বস্তুগত আর জৈবিক মাধ্যমের সীমাবদ্ধতা এবং নফসের অপবিত্রতার কারণে অধিকাংশ মানুষ মৌলিক ঐক্য বুঝতে পারে না। মানুষ যদি বস্তুগত সীমার বাঁধন মুক্ত হতো সে নিশ্চিত অবলোকন করতো প্রকৃত সত্যের অপরিসীম শাশ্বত ঐক্য।‘ (ড. সাইয়েদা নাহিদ আনগা, অনুবাদ: সারওয়ার চৌধুরী)

বৌদ্ধ ধর্মের নবোল এইটফল্ড পাথ নবোল সাইলেন্স হিসাবে সমাদৃত। সব প্রধান ধর্মে নীরবতা গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া নীরবতার অজস্র অর্থ আমাদের চোখের সামনে আসে। চিত্রশিল্পগুলো নীরব কিন্তু এ্যালোকোয়েন্ট। অগণন প্রশ্নোত্তরে ভরা, বহুবিধ তথ্যে ঠাসা। পথের পাশে অসহায় ভিক্ষুক মানুষটি চুপচাপ হাত পেতে বসে আছেন। তার নীরবতা কি কথা বলছে না? আমাদের সেন্স অব পারসেপশন তার নীরবতার সাথে কমিউনিকেট করতে পারছে। আমরা দেখি, ‘There is meaningless speech and meaningful silence’। নীরবেই আমরা বুঝে নিতে পার অজস্র নৈঃশব্দের অর্থ। নীরবতার ভূমিকা জগতে খুব গুরুত্বপূর্ণ দেখাতে জগদ্বিখ্যাত মূক অভিনেতা Marcel Marceau প্রশ্নাকারে উত্তর দিলেন ‘Do not the most moving moments of our lives find us all without words?’ খুব আনন্দে খুব দুঃখে, খুব আগ্রহে, খুব জোশে, খুব গভীরে খুব গোপনে, খুব চাওয়াতে এবং পাওয়াতে মানুষ ভাষাহারা হয়, হয়ে কি-করে, এ্যালোকোয়েন্ট সাইলেন্স-এ নিমগ্ন হয়। মগ্ন হলে শ্রবণেন্দ্রীয় যা ধরতে পারে না, তা ধরা যায় এইভাবে- যে গান কানে যায় না শোনা/সে গান সেথায় নিত্য বাজে,/প্রাণের বীণা নিয়ে যাবো/সেই অতলের সভামাঝে।‘ (শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

সেই মগ্ন অবস্থাতে, বাহ্যিক ধ্বনিহীনতার তলদেশ থেকে বুঝিবা মনশ্চক্ষে দেখা যায়- আঁধার ঘরে জ্বলছে বাতি/দিবারাতি নাই সেখানে‘ (ফকির লালন শাহ)

এবং নীরবতার ফজিলত দেখতে আমরা ইশকের দৌলতে বিন্দু হতে হতে সিন্ধু হয়ে যাওয়া দরবেশ শামস তাবরেজি এর কিছু কথা এ্যালিফ শাফাক এর জবানে পড়তে পারি। বলেছেন, ‘Most of problems of the world stem from linguistic mistakes and simple misunderstanding. Don’t ever take words at face value. When you step into the zone of love, language, as we know it becomes obsolete. That which cannot be put into words can only be grasped through silence.’

মানে, ‘দুনিয়ার বেশিরভাগ সমস্যাগুলো জটিল হয়ে যায় ভাষার ভুলে আর ভুল বুঝাবুঝির কারণে। ভাষার উপরি-উপরি রূপে মন মজাইও না। ভালোবাসার দেশে ঢুকে যাও যদি দেখবে, ওখানে ভাষা অচল। মানে বিশুদ্ধ ভালোবাসাকে ভাষায় ধরা যায় না, শুধু নিরবে অনুভবে বুঝে নেয়া যায়।’

সাধারণ অর্থের নীরবতা আসলেই অরবতা কীনা

সাইলেন্স শব্দটি পুরাতন ফরাসি সীলন্স, ল্যাটিন সিলেনটিউম্মা, ইস্পানিওল সিলেনসিও আর ইংরেজিতে সাইলেন্স। হিন্দিতে মৌনা, নিরাবাতা। বাংলায় নৈঃশব্দ, নীরবতা।

ওই যে জন কেইজ দাবী করলেন আওয়াজ অমনিপ্রেজেন্ট । আসলেই কি? এ্যানেকোয়িক চেম্বারের শব্দ তো অবজার্ভার নির্ভর। ওটার ভিতর কেউ না থাকলে থাকবে নৈঃশব্দ। একটা মাইক্রোফোন চেম্বারের ভেতরে রেখে টেকনোলজির সহায়তায় ছিদ্র করে চেম্বারের বাইরে থেকে কান পাতলে কারো ফিসফিস শোনা যাবে? কিছু কি শোনা যাবে? জন কেইজের দাবীকে কাইত করতে থার্মোডাইনামিক্স ল হাজির। কারণ ‘The laws of thermodynamics doom the universe to heat death. Everything, everywhere, will end in silence.’

এই সাইলেন্স-টা কোন সাইলেন্স? আমাদের শ্রবণেন্দ্রীয় যা ধরতে পারে সে-অর্থের সাইলেন্স হয়তবা।

~ ~ আমি এই লেখাটির অনেকাংশ যখন লিখছিলাম মধ্যরাতে সাগর পারের পার্কে বসে, তখন চারপাশে বিবিধ অনুচ্চ শব্দপুঞ্জ বিদ্যমান- কখনো রাস্তায় গাড়ী যায় শা শা, খেলায় মগ্ন মানুষের হর্ষধ্বনি, বার্সেলোনা গোল দিয়েছে রিয়েল মাদ্রিদকে তাই বহু জাতির টিভিদর্শকদের সমস্বর বিজয়োল্লাস, কখনো একটি রাতপাখি ডেকে ডেকে উড়ে গেল, আকাশে উড়োজাহাজের আওয়াজ ইত্যাদি ধ্বনিপুঞ্জের ভেতর আমি যেনবা নীরবতার মাঝেই লিখছিলাম। মনোযোগ সহায়ক (কনডিউসিভ টু কনসেনট্রেশন) নীরবতার মাঝে বসেই লেখলাম।

 230505_226712674011902_2306499_nসারওয়ার চৌধুরী

তথ্যসূত্রঃ

  1. Matthew Nudds and Casey O’Callaghan সম্পাদিত বই Sounds and Perception: New Philosophical Essays, New York: Oxford University Press.
  2. A Theory of Sentience by Austen Clark (2000), Oxford University Press.
  3. The functions of silence by Michal Ephratt
  4. No death No fear by Thich Nhat Hahn
  5. বনলতা সেন – জীবনানন্দ দাশ
  6. গীতাঞ্জলী – শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
  7. The meanings of silence: Wittgensteinian contextualism and polyphony by Jose Medina, Vanderbilt University.
  8. ড. সাইয়েদা নাহিদ আনগাঅ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু সুফিজম’ ~ ভাষান্তর: সারওয়ার চৌধূরী
  9. দ্য বাস্টার্ড অব ইস্তানবুলএর খ্যাতনামা কথাশিল্পী এ্যালিফ শাফাক বিরচিত উপন্যাস The Forty rules of Love – A novel of Rumi.
Advertisements