Gaddar_in_a_meeting_in_Nizam_College_Grounds-_2005গদরকে সামনা সামনি দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার মুম্বাইয়ে। ২০০৪ সালের ১৮ থেকে ২০ জানুয়ারি ‘মুম্বাই রেজিস্টেন্স’ সম্মেলনের মূল মঞ্চের তিনিই ছিলেন প্রধান সঞ্চালক। যাওয়ার আগেই শুনেছিলাম তিনি অন্ধ্রের  কিংবদন্তী সমতূল্য গণসংগীত শিল্পী। যার গান শুনতে লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশ হয়ে যায়। ফলে আমার বিশেষ আগ্রহ ছিলো গদরের পরিবেশনা দেখার। কি এমন যাদু আছে তাদের গানে!  আমাদের এখানে গণসংগীত তো প্রায় জাদুঘরে ঠাঁই করে নিয়েছে।

১৯ জানুয়ারি সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন ছিল বিভিন্ন অঞ্চল থেকে, দেশ থেকে আসা দলগুলোর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। সেদিন সকাল থেকে গদর উপস্থাপনার দায়িত্ব নিলেন এবং চালিয়ে গেলেন রাত নয়টা দশটা পর্যন্ত। জননাট্য মন্ডলীর হয়ে নিজেও গান গাইলেন। কিন্তু সেকি গান গাওয়া! এতো আমাদের গম্ভীরা গানের সাথে মিলে যাচ্ছে। আবার যখন হাসি ঠাট্টা কৌতুক করছেন তখন আমাদের সঙপালার কথাও মনে হচ্ছে। গদর হচ্ছেন মূল শিল্পী, তার সাথে আরো কয়েকজন আছেন, যারা কোরাসে অংশগ্রহণ করছেন, নৃত্য করছেন এবং গদরের সাথে অভিনয়ে অংশগ্রহণ করছেন। অভিনয় বলতে, মূলত কোন একটা বিষয়ে কেউ হয়তো জোতদারের চরিত্রে ডায়লগ দিচ্ছেন, গদর মজদুরের চরিত্রে উত্তর দিচ্ছেন। সে সময়কার শারীরিক অভিব্যক্তি তারা অভিনয়ের আঙ্গিকে পরিবেশন করছেন। আবার গদর গানের ফাঁকে ফাঁকে বিষয়ের সাথে সঙ্গতি রেখে দর্শকের মুখ থেকে কোন একটি প্রশ্নের উত্তর বের করে নেবার চেষ্টা করছেন। অথবা কোন একটা সুর হাজার হাজার দর্শক একসাথে গদরের কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে নিচ্ছেন।  

জননাট্য মন্ডলীর শিল্পীদের মঞ্চের পোশাকও মনে হয়েছে পরিকল্পিত। হাতে লাল পতাকা বাধা লাঠি, কাঁধের এক পাশে ঝুলিয়ে রাখা একটা  কম্বল, খালি গা, হাটু এবটু নিচ থেকে পড়া সাধারণ ধূতি। অবশ্য যন্ত্রীরা (প্রধানত নাল আর ডাফলি বাদক তাদের দলীয় পরিবেশনায় গীটার বা স্থানীয় কোন তারযন্ত্র ব্যবহার করতে দেখলাম না) পরিকল্পিত কোন পোশাক পড়েনা। তাদের দৈনন্দিন পরিহিত পোশাকেই মঞ্চে হাজির  হন। আমি মুগ্ধ হচ্ছিলাম গদরের  উপস্থাপনায়, কারণ তিনি বিভিন্ন দলের পরিবেশনার ফাঁকে ফাঁকে প্রায় ছোটখাট ফুটবল খেলার মাঠের মতো মঞ্চটার এ মাথা থেকে ও মাথা লাফিয়ে, দাপিয়ে নেচে গেয়ে বাক পটুতায়, রঙ্গ তামাশায় সবাইকে যেন সম্মোহিত করে রেখেছিলেন। পঞ্চান্ন বছরের একটা লোক যার পেট থেকে বুক অব্দি সেলাইয়ের চিহ্ন, মাত্র ষোল দিন আগে যার সৌমত্ত ছেলেটি মারা গেছে সেই লোকটা কি করে এসব করছে। কোথা থেকে পান এমন মানসিক শক্তি? শারীরিক শক্তিইবা কম কিসে! ভাবছিলাম গদর যখন নাচের ফাঁকে ফাঁকে লাফ দিয়ে আসমানের দিকে চলে যাচ্ছিলেন, ঐ রকম কিছু করতে হলে আমি বড়জোর ঘন্টা খানেক টিকে থাকবো। অথচ লোকটা চালিয়ে গেলেন সারাটা দিন! স্যালুট গদর। আমার প্রথম স্যালুট তাকে জানিয়ে ছিলাম সেই মঞ্চের সামনে পঁচিশ হাজার দর্শকের সাথে দাঁড়িয়ে।

২.

 যে বছর গান্ধীর মৃত্যু হলো সে বছর গুমড়ি ভিট্‌ঠল রাও (গদর) এর জন্ম-এভাবেই ছেলের জন্ম সালের স্মৃতি মনে ধরে রেখেছেন তাঁর মা লচ্চু মাম্মা। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় পাঞ্জাবের কয়েকজন বিপ্লবী একটি দল গড়ে তোলেন সুদূর সানফ্রান্সিসকোতে। যার নাম ছিলো ‘গদর’। তারা যে সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করতেন তারও নাম ছিলো ‘গদর’। সেই ‘গদর’-এর অনুপ্রেরণায় জননাট্য মন্ডলী তাদের গানের রচয়িতা হিসেবে একটাই নাম ব্যবহার করতেন ‘গদর’। কিন্তু গুমড়ি ভিটঠল রাও যেহেতু অধিকাংশ গানের নেতৃত্ব দিতেন ফলে দিনে দিনে সকলে তাকেই গদর বলে চিহ্নিত করতে থাকলো। এভাবে ভিট্ঠল রাও হয়ে ওঠলেন ‘গদর’।

অন্ধ্রপ্রদেশের মেদক জেলার তুপ্রাণ গ্রামে এক দলিত পরিবারে গদরের জন্ম। মা লচ্চুমাম্বা ভূমিহীন খেতমজুরের মেয়ে। দারিদ্র তার নিত্যসঙ্গী হলেও গদরের ভাষায় তাঁর ছিল সীমাহীন গানের খনি। গাঁয়ের নানা আচার অনুষ্ঠানে তাঁর গান গাওয়ার ডাক পরতো। ছোট্টবেলায় গদর ভিষণ মা  নেওটা ছিল। আঁচল ধরে ধরে মায়ের সাথে চলে যেতো নানা অনুষ্ঠানে। মায়ের কণ্ঠ থেকে তুলে নিত লোকগান। তার মা ছিলো তাঁর গানের ইশকুল, প্রথম প্রেরণা। বাবা শেষাইয়া মহারাষ্ট্রে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। তিনি ছিলেন আম্বেদকরের চিন্তাধারার অনুসারি। প্রথম জীবনে গদরের উপরেও আম্বেদকার চিন্তাধারা প্রবল প্রভাব ফেলে। গদরের বাবা রাজনৈতিকভাবে দলিতদের অধিকার প্রশ্নে সচেতনতার কারণে চাইতেন ছেলে মেয়েরা পড়াশোনা করে শিক্ষিত হোক। শেষাইয়া অন্য দলিতদের মতো ছেলে মেয়েদের দলিত নাম রাখতে চাননি। ছেলে মেয়ের নাম রেখেছেন স্বরস্বতী, শান্তাবাঈ, বালামুনি, নরসিংহ রাও এবং ভিটঠল রাও।

গ্রামের প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক কিন্ত এই পরিবর্তন মেনে নিলেন না। গুমড়ি ভিটঠল রাও স্কুলে ভর্তি হতে গেলে তাকে রাও পদবি বাদ দিয়ে শুধু ভিটঠল নামে ভর্তি হতে হলো। বর্ণ প্রথার তীব্র বৈষম্যপূর্ণ সমাজের মধ্য থেকেই দলিত জীবনকে দেখেছেন ভিটঠল। ছোটবেলায় দেখতেন ভালো শাড়ী পড়ে তাদের ঘরের মেয়েরা জমিদারের জমিতে কাজ করতে যেতে চাইতো না। সাহেব বাবুদের ছেলেদের ভুল করে ‘আরে’ ‘তুমি’ বলে ফেললে, হরিজন ছেলেদের জরিমানা হতো বা পা ধরে ক্ষম চাইতে হতো।

এমন সামন্ত সমাজেই ভিটঠলের শৈশব কাটে। তবে পড়াশুনায় ভালো ছিলেন বলে সে অঞ্চলে তিনিই প্রথম কোন দলিত ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ পর্যন্ত যেতে পেরেছেন। তবে পুরোটা পথ তাকে চরম দারিদ্রতার মধ্য দিয়ে পারি দিতে হয়েছে। হাই স্কুলে পড়াকালীনই বাবা মারা গিয়েছিলেন। যাই হোক, শেষাবধি তাকে যখন তপশিলী জাতির সংরক্ষিত আসনে হায়দ্রাবাদের ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হতে হলো তখনো তাকে পিছু ধাওয়া করে বেরিয়েছে বর্ণ প্রথার অপমান। তাকে প্রায়ই উচ্চ বর্ণের ছাত্রদের কাছ থেকে শুনতে হতো, ‘তুমি তো সরকারের জামাই’। অথচ ভর্তি পরীক্ষায় ভিটঠল সাতাত্তর শতাংশ পেয়েছিল। অবশ্য কয়েক বছর পর ভিটঠলের নিজেরই মনে হলো গরীব দলিত ছেলের পক্ষে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া বিলাসিতা মাত্র। তাছাড়া পরিবারের অবস্থাও ছিল খুব শোচনীয়। প্রয়োজন খুব দ্রুত কোন আয় রোজগারে ঢোকা।

এই সময় তিনি ‘বাপুজী বুরা কথা পার্টি’ নামে একটি গানের দল গঠন করেন। সরকারের সংস্কৃতি বিভাগের অনুষ্ঠান করলে তারা ৭৫ টাকা সম্মানি পেতেন এবং দলের সবাই ভাগ করে নিতেন। এরপর ভিটঠল শ্রমিক হিসাবে ১ বছর কাজ করলেন হায়দ্রাবাদে বালানগরের একটা কেমিক্যাল ফ্যাক্টরিতে। আর বিমলার সঙ্গে বিয়ের আগেই কানাড়া ব্যাংকে যোগ দিলেন করণিক হিসাবে। তবে এ চাকুরিও তিনি খুব শান্তিতে করতে পারেন নি। ’৭৫-এ তিনি চাকরিতে ঢুকেছিলেন। ’৭৬-এ জরুরি অবস্থায় গদরকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো। তাকে শারীরিক মানসিক নির্যাতনের পর ছেড়েও দেয়া হয় কয়েকদিনের মধ্যে। কেননা ইতিমধ্যে গদর একজন প্রতিষ্ঠিত জনপ্রিয় শিল্পী হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। এ ঘটনার জের ধরে সাময়িক অব্যাহতির পরে তিনি আবার চাকরিতে ফিরে আসতে পারলেন ’৭৭ সালে। তবে ’৮৪ সাল নাগাদ আর পেরে উঠলেন না গদর। তার গানের যাত্রা আর সরকারি চাকরির দায়িত্ব সমান তালে চালানো গেলনা। তিনি চূড়ান্তভাবে চাকরিটা ছাড়লেন।

hqdefault

৩. গ্রাম থেকে ওঠে আসা দলিত সন্তান ভিটঠলকে কিন্তু হায়দ্রাবাদের ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ আমুল পাল্টে দিয়েছিল। ’৬৯-এ গদর যখন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রথম বর্ষের ছাত্র, সেই সময় তিনি পেলেন পৃথক তেলেঙ্গানা আন্দোলনের ঢেউ। যোগ দিলেন তাতে, আন্দোলনকে  বেগবান করতে তৈরি করলেন গানের দল ‘বুর্রা কথা দল’। এ দল থেকেই তিনি লিখেছিলেন প্রাচীন লোকশৈলীর আঙ্গিকে ‘তেলেঙ্গানা গোল্লা সুদুল’। কিন্তু খুব বেশিদিন গদর এই আন্দোলনের চরিত্র, নেতৃত্ব্রে উপর আস্থা রাখতে পারেননি। পরবর্তীতে তিনি ‘বাপুজী বুর্রা কথা পার্টি’ নামে গানের দল করে নেতাদের ব্যঙ্গ করে গান লিখেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন গদর পরিচিত হলেন মার্কসবাদ-মার্কসবাদী লেখকদের সাথে। শ্রী শ্রী চেরাবান্দারাজু তাকে ভীষণ আর্কষণ করলো। তাঁর জীবনের এ সময়টা নিয়ে গদর নিজে একটা সাক্ষাৎকারের বলেছেন ‘১৯৬৮-৬৯-এ তখন আমি ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, নকশালবাড়ি আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। শ্রীকাকুলামের কৃষকবিদ্রোহও তখন তুঙ্গে। সুব্বারাও পাণিগ্রাহীর মতো বিখ্যাত বুদ্ধিজীবীরাও এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। এই এলাকায় আদিবাসীরা, যারা শত শত বছর ধরেই ঐখানে বাস করছেন, তারা তাদের জমি দাবি করলেন। তৎকালীন সিপিএম থেকে বিভক্ত সিপিআই (এমএল)-কে সমর্থন জানালেন। এই ঘটনায় দারুনভাবে প্রভাবিত হলাম। একজন ছাত্র এবং একজন বুদ্ধিজীবী হিসাবে আমিও উন্মুখ ছিলাম শোষিত মানুষের মুক্তির জন্য কিছু করতে; শ্রীকাকুলামের আন্দোলনের ফলে আমার আকাক্সক্ষা তীব্র হয়ে উঠল। এই সময়ের ছাত্র এবং বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও এই আন্দোলন ব্যাপক প্রভাব ফেলে। আমিও তাতে অংশগ্রহণ করি; ক্রমে এই প্রবাহের মধ্যে মিশে যাই।’

১৯৬৮ তে সেকেন্দ্রবাদের চলচ্চিত্র নির্মাতা নরসিংহ রাও ‘আর্ট লাভার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। গদর যোগ দেন এই ‘আর্ট লাভার্স’-এ এবং ‘মা ভূমি’ নামে তেলেঙ্গানার সশস্ত্র সংগ্রামের উপর নির্মিত চলচ্চিত্রে একটি চরিত্রে অভিনয়ও করেন। নরসিংহ রাও-এর ‘রঙ্গলকলা’ চলচ্চিত্রেও তিনি অভিনয় করেন। ‘ওরি রিক্সা’ নামক চলচ্চিত্রের গীতিকার হিসেবে তিনি ‘নন্দী পুরষ্কার’ও পেয়েছিলেন। সে যাই হোক চলচ্চিত্র তাঁর মূল কর্মক্ষেত্র ছিলো না, ফলে তারই উদ্যোগে ‘আর্ট লাভার্স’ অ্যাসোসিয়েশন রুপান্তিরি হলো ‘জননাট্য মন্ডলী’তে এই সংস্থা গঠিত হবার পরেই ভিটঠল জননাট্য মন্ডলীর মুখ্য শিল্পী হসেবে গান করে চলেছেন আজ পর্যন্ত। ইতিমধ্যে তিনি সিপিআই(এমএল) পিপলস ওয়ার এর সাথে যুক্ত হয়েছেন। বলা চলে ‘জননাট্য মন্ডলী’ গড়ে ওঠেছিলো ‘গণনাট্য সংঘের কনসেপ্টকে মাথায় রেখেই। জনযুদ্ধের সাংস্কৃতিক মুখপাত্র হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন ‘জনাম (জননাট্য মন্ডলী)-এর শিল্পী সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা।

গদর-এর সংগ্রামী জীবনের কিছু ঘটনা:

১৯৮৫-এর ১৭ জুলাই অন্ধ্রের সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চল করম চেডুকে ছয়জন দলিতকে হত্যার ঘটনা কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ‘করমচেডু আন্দোলন’। এ আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল শিবির থেকে দলিতদের নির্ভয়ে নিজ বাসস্থান করমচেডু ফেরৎ পাঠানো এবং অপরাধীদের শাস্তির দাবি আদায়। গদরসহ পুরো ‘জননাট্য মন্ডলী’ এ আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। ১লা সেপ্টেম্বর চিরালীতে সারাজ্যের দলিতরা যোগ দিলেন সমাবেশে, যার উদ্বোধক ছিলেন গদর। রাজ্য সরকার গদরকে কোন অনুষ্ঠান করতে দেবেনা বলে সাফ জানিয়ে দিলো। এমনকি তার বাড়িতেও পুলিশ ঘণঘণ হেনস্থা করতে থাকলো। সেকেন্দ্রবাদ বেন্ধটাপুরানের বাড়ি থেকে তার ঢোল, নুপুর, কাঠের বন্দুক ( যা জনামের অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হতো), তার বইপত্র সব নিয়ে যায় পুলিশ। শুধু গদর কেন, মাওবাদী সকল লেখক-বুদ্ধিজীবীদের ধরে ধরে অত্যাচার করতে লাগলো সরকার। এমনকি অন্ধ্রে সিভিল লিবার্টিজ এর সহ সভাপতি ড. রমানাথনকে প্রকাশ্যে খুন করা হলো। এ বিশেষ পরিস্থিতিতে গদর আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হলেন। তাঁকে ধরতে না পেরে সরকার তাঁকে রামনগর কেসের আসামী করে দিলো। গদরের অপরাধ কি? জানা গেল, পুলিশ বলছে, ‘রামনগরে সিপিআই (এমএল)-র যে সব লুকানো আস্তানা তারা খুঁজে পেয়েছে, তার সবখানেই পাওয়া গেছে গদরের গানের বইয়ের কপি। পুলিশ মনে করে ওর গানের প্রতিটি শব্দই বোমার মতো বিপদজ্জনক। ফলে রাষ্ট্রদ্রোহিতার এই মামলায় অবশ্যই গদরকে শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু গদর ততক্ষণে চলে গেছেন জঙ্গলে-আত্মগোপনে। এবং ’৯০-এ অন্ধ্রে সরকার পরিবর্তনের আগ পর্যন্ত আত্মগোপনে হেটেছেন প্রায় চল্লিশ হাজার মাইল। কখনোবা জেলে সেজে, কখনোবা মেষ পালকের বেশে অন্ধের বিভিন্ন প্রান্তে, দন্ডকরণ্যে। বিভিন্ন পেশাজীবীদের সাথে থেকে থেকে তাদের জীবন সংগ্রাম নিয়ে বেঁধেছেন প্রতিবাদী গান।

১৯৯০ সালের অন্ধ্রের সরকার পরিবর্তনের পর গদর যখন পুনরায় ফিরে আসলেন প্রকাশ্য কর্মকান্ডে তখন জননাট্য মন্ডলীর উনিশ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এ উপলক্ষ্যে হায়দ্রাবাদের নিজাম কলেজ মাঠে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিলো। ২০ ফেব্রুয়ারির সেই অনুষ্ঠানে প্রায় দুলক্ষ মানুষের জমায়েত হয়েছিলো গদরের গান শুনবার জন্য। সাড়ে চার বছর বাদে জননাট্য মন্ডলীর প্রকাশ্য অনুষ্ঠান, ফলে প্রতিটি অনুষ্ঠানেই লোকে লোকরণ্য হয়ে ওঠতো গদরের গানের টানে।

কিন্তু নতুন সরকারও গদরের গানের তুমুল জনপ্রিয়তায় এবং তার রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনায় অতি শীঘ্রই চিন্তিত হয়ে পরেন। ’৯০-এ সারা ভারত সাংস্কৃতিক লীগের অংশ হিসেবে জননাট্য মন্ডলী সারাদেশব্যাপী সাংস্কৃতিক প্রচারণার কর্মসূচি হাতে নেয়। কর্ণাটক সরকার তাদের অঞ্চলে ‘জননাট্য মন্ডলীর অনুষ্ঠানের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে, ৬ অক্টোবর মধ্য প্রদেশের ভিলাইতে পুলিশ গদরসহ জনম-এর ২৫ জন এবং কবি ওয়র ওয়র রাওকে বারো ঘন্টা আটকে রেখে পুলিশ ভ্যানে করে অন্ধ্রের সীমানায় ছেড়ে দিয়ে আসে। মুম্বাই নাগপুরে গদরের অনুষ্ঠানের উপর প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা জারী করে। এরপর মুম্বাই হাইকোর্ট সে নিষেধাজ্ঞা খারিজ করে দিলেও ১৩ই ফেব্রুয়ারি যখন অনুষ্ঠান করতে যায় তখন জনামের শিল্পীদের উপর পুলিশ এলাপাথারি লাঠি চালায় এবং তাদের ধরে জোর করে অন্ধের ট্রেনে তুলে দেয়।

১৯৯৫-৯৬ সাল নাগাদ গদরের জীবনে ঘটে একটি দুক্ষজনক ঘটনা। গদরকে পার্টি থেকে সাসপেন্ড করা হয়। কারণ হিসাবে শুধু জানা যায়, বেশ কিছু বিষয়ে সিপিআই(এমএল) পিপলস ওয়ারের সঙ্গে গদরের মত বিরোধ চলছিলো। তবে খুব দ্রুতই গদর আত্মসমালোচনা করেন এবং দলও গদরের ব্যাখ্যা মেনে নেয়। তিনি পুনরায় সদস্যপদ ফিরে পান। তবে এতো বড় ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত বিশেষকিছু জানা যায় না।

2010052254020802_253583g

এ ঘটনার রেস চলতে চলতে রাজনৈতিক মহলে ঘটে যায় আরো একটি বড় ঘটনা। ১৯৯৬- তিরুপতি মন্দিরে পূজা দিতে যাওয়ার সময় মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুর ওপর হামলা হয়। মন্ত্রী প্রাণে বেচে যান। কিন্তু অনেকের মতো গদরের উপর শুরু হয় লাগাতার মানসিক নির্যাতন। তাকে দিনের পর দিন টেলিফোনে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে চললো কখনো ‘গ্রীন টাইগার’ নামে কখনোবা অজ্ঞাত পরিচয়ে। এমনকি সংবাদ মাধ্যমও এ হামলার কারণ জানতে গদরকে জেরা করতে ছাড়েনি। গদর উত্তরে বলেছেন, ‘ পিপলস ওয়ারের সাথে শান্তি প্রতিষ্ঠার কথাবার্তা বন্ধ হওয়াই এরকম অঘটনের কারণ।’ ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা চললো পুরো বছর জুরেই। এবং ৯৭-এর ৬ এপ্রিল সত্যি সত্যিই সেইদিনটি উপস্থিত হয়েছিলে গদরের জীবনে। কিন্তু তার আগে অসংখ্য জায়গায় গদর প্রাণনাশের হুমকির প্রতিবাদে চিঠি দিয়েছিলেন। বিধান সভার নির্বাচিত সব প্রতিনিধিকে তিনি চিঠিতে জানিয়েছিলেন, একাধিকবার সংবাদ মাধ্যমকে এমনকি মুখ্য মন্ত্রীর সাথে আলোচনা করেছিলেন। তিনি ও তার স্ত্রী বিমলা টেলিফোনে সেই সব হুমকির রেকর্ড সংবাদ মাধ্যমকে দিয়েছিলেন। সে সমস্ত হুমকির একটা নমুনা উল্লেখ করা যেতে পারে এখানে,‘ অক্টোবর ৫ গদওয়াল থেকে টেলিফোনে ভীতি প্রদর্শন। খবর দেয়া হলো যে গদরকে হত্যার জন্য দল তৈরি হচ্ছে। অক্টোবর ৬ ওয়ারঙ্গল থেকে ভীতি প্রদর্শন.. শেষ, মৃত্যু হতে যাচ্ছে তোমার।’ এভাবে তথাকথিত সবুজ বাঘেরা ভয় দেখালো প্রতিদিন।

১৯৯৭-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি পিডব্লুজির হয়ে হায়দ্রাবাদ শহর কমিটির সম্পাদাক সুরেশ ও সদস্য রাজুকে পুলিশ গুলি করে মারে। তারপরে নরসাপুরের জঙ্গলে ফেলে দিয়ে তথাকথিত ‘এনকাউন্টার’এ মৃত্যুর গল্প প্রচার করে। খবর পেয়ে গদরসহ গনসংগঠনের কর্মীরা দ্রুত সেখানে পৌঁছান। তারা যেয়ে পুলিশের কাছে দাবি জানান পোস্ট মর্টেম ছাড়া লাশ কিছুতেই পোড়াতে দেবে না। এবং আশে পাশের গ্রাম থেকে হাজার হাজার গ্রামবাসীরা পুলিশকে ঘিরে ফেলে। অবশেষে পুলিশ বাধ্য হয়ে তৃতীয় দিনে লাশ গদরের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়।

এরপরের মাসেই পুলিশ পিপলস ওয়ার এর ডেপুটি স্কোয়াড লিডার এলাঙ্কী মারৈয়াকে খুন করে রচকান্ডা পাহাড়ে ফেলে রাখে। সেখানেও গদর ছুটে যান। জড়ো হয় হাজার হাজার গ্রামবাসী। কিন্তু এবার পুলিশ আগে ভাগেই গদর ও তার সাত সহযোদ্ধাকে গ্রেফতার করে ফেলে পুলিশ হেফাজতে রাখে। যাতে গতবারের মতো ঘটনার পুণরাবৃত্তি ঘটাতে না পারে তারা। যা হোক ২৮ শে মার্চ নালগোন্ডা আদালত গদর ও তার সঙ্গীকে জামিন দেয়। কিন্তু গদর জামিন নিতে অস্বীকার করেন। তিনি দাবি জানান গণতান্ত্রিক রীতি বিরোধী এই মিথ্যা মামলা থেকে তাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। অবশেষে গদরের দানি না মেনে তাকে হায়দ্রাবাদের কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দিলে, তাঁর মুক্তির দাবিতে ব্যাপক গণ আন্দোলন শুরু হয়। এবং আন্দোলন অবশেষে জয়ের মুখ দেখে। গদরকে সরকার নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। আর জেল থেকে বেরিয়ে কয়েকটি গণসংগঠনকে নিয়ে ‘এনকাউন্টার’এ মৃত শহীদদের পোস্ট মর্টেম এবং লাশ আত্মীয় স্বজনদের হাতে নিয়মমত তুলে দেয়ার জন্য একটি সমিতি গঠন করেন। যার আহ্বায়ক হন তিনি নিজেই।

১৯৯৭ সালের ৬ এপ্রিল, অবশেষে আসলো সেই দিন, যে দিনটির জন্য সবুজ বাঘেরা লাগাতার হুমকি দিয়ে আসছিলো। গদর ঘরে বসে টিভি দেখছিলেন, তখন সন্ধ্যা ছয়টা-সাড়ে ছয়টা, বাড়ির বাইরে একটা গাড়ি এসে থামলো, চারজন নেমে এলেন। এদের মধ্যে থেকে একজন এগিয়ে এসে কথা বললেন গদরের স্ত্রী বিমলার সাথে। জানালে ওয়ারঙ্গল থেকে এসেছেন, নকশালরা তাকে পুলিশের চর সন্দেহে চাষবাস করতে দিচ্ছে না। এ ব্যাপারে গদরের সহায়তা চায়। এ আলাপ চলতে চলতে বাকী তিনজন কিন্তু ঢুকে পড়েছে ঘরের ভিতরে। ঢুকেই তাদের একজন গদরকে লক্ষ্য করে দুই রাউন্ড গুলি ছুড়লো। ঘটনার এমন আকস্মিতায় চিৎকার করে ওঠে স্ত্রী বিমলা। গদরের ছেলে মেয়েরা অন্য ঘর থেকে বেড়িয়ে আসলে আততায়ীরা আবার গদরকে লক্ষ্য করে গুলি করে দৌড়ে পালিয়ে যায়। মোট পাঁচটা গুলি লাগে গদরের শরীরে একটা বুকের ডান দিকে, দ্বিতীয়টি বাম জঙ্গার সন্ধিস্থলে, তৃতীয়টি পেটে, চতুর্থটি ডান কাধের পেছন দিকে আর পঞ্চমটি মেরুদন্ডের কাছাকাছি। কিছুটা সৌভাগ্য বলতেই হবে গদরের যে একটা গুলি হৃদপিন্ড ঘেষে বেরিয়ে যায় অন্যটি ফুসফুসের পাশ দিয়ে আর একটি মেরুদন্ডের পাশে। এর যে কোন একটা গুলিই যথেষ্ট ছিলো তাৎক্ষণিক গদরের জীবন কেড়ে নেবার জন্য। কিন্তু শেষপর্যন্ত গদর বেঁচে গেলেন। কিন্তু ডাক্তাররা মেরুদন্ডের কাছে আটকেপরা  গুলিটি বের করে আনাটা বিপজ্জনক বলে সেটিকে অপসারণ করেননি। যে গুলিটি দেহের ভেতর বহন করে এখনো বেঁচে আছেন, গান গাইছেন গদর। গদর যখন হাসপাতালের ওটিতে জীবন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন, হাসপাতালের বাইরে তখর তাবু খাটিয়ে আস্তানা গেড়েছে সমর্থকরা । সারা শহরে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতিবাদের ঝড় ওঠলো। সকলরেই অভিযোগের তীর ছিল পুলিশ তথা মুখ্যমন্ত্রীর দিকে। ওদিকে হাসপাতালের দেয়ালে শ্লোগান চলছে , ‘বুলেট দিয়ে কণ্ঠ রোধ করা যাবে না। গানের হৃদয় বুলেটে বিদ্ধ করা যায় না।’

অবশেষে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে বিজয়ী হয়ে, আততায়ীদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হাসপাতাল থেকে ফিরে আসলেন গদর।

ইতিমধ্যে আবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলো অন্ধ্রের। এবার মুখ্যমন্ত্রী হলেন কংগ্রেসের ওয়াই এস রাজশেখর রেড্ডী। তিনি ক্ষমতায় এসে আবার উদ্যোগ নিলেন পিপলস ওয়ার-এর সাথে শান্তি আলোচনায় বসতে। অবশেষে ২০০৪-এর সেপ্টেম্বরে সিপিআই (এমএল) পিপলস ওয়ারের উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলো। পিপলস ওয়ারও কোন আক্রমণ করলো না। অন্তত ছয় মাস অন্ধ্রে কোন আক্রমন প্রতি আক্রমনের ঘটনা ঘটলো না যা অন্ধ্রে গত পনের বছরের ইতিহাসে ছিলো বিরল।

Untitled

২০০৪-এর ২১শে সেপ্টেম্বর সিপিআই (এমএল) পিপলস ওয়ার এবং এমসিসিআই একত্রিত হয়ে তৈরি হলো সিপিআই ( মাওবাদী)। এই দলের পক্ষ থেকে সরকারের সাথে আলোচনায় বসার জন্য যে প্রতিনিধি দল গঠন করা হয়, সেখানে ওয়র ওয়র রাও, জি কল্যাণ রাও-এর সাথে গদরও ছিলেন। কিন্ত সে শান্তি আলোচনা আবার ভেসতে যায়। ফলে সরকার ২০০৫-এর আগস্টে দলটিকে আবার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ১৯ আগস্ট সরকার বাকী দু’জনকে গ্রেফতার করলেও গদরকে গ্রেফতার করলো না কিন্তু তার বিরুদ্ধে ৪টি মামলা ঠুকে দেয়া হলো। শুধু তাই নয়, তাকে অবিরাম টেলিফোনে প্রাণ নাশের হুমকি শুরু হলো আবার। বাড়ির চারদিকে পুলিশ পাহারা বসলো। তার স্বাভাবিক চলা ফেরা হয়ে ওঠলো দুর্বিসহ। এমনকি অতিষ্ঠ হয়ে বাড়ির টেলিফোন বন্ধ করে দিলেন তিনি, কেননা ফোন মানেই মৃত্যুর হুমকি। তবে এর কোন কিছুই গদরকে দমাতে পারেনি। যেখানেই ‘এনকাউন্টার’ হয়েছে তিনি ছুটে গিয়েছেন সহকর্মীর লাশ উদ্ধারের জন্য। প্রতিবাদ করেছেন। পত্রিকায় লিখেছেন, টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, গান করেছেন গেরিলা কায়দায়। এমনো হয়েছে কোন কোন গণসংগঠনের সভায় কেউ জানতো না গদর গান গাইতে আসবে। তিনি হঠাৎ মঞ্চে এসে গান করে আবার পুলিশ ফোর্সের উপস্থিতির আগেই চলে গেছেন অন্য কোথাও।

প্রথম প্রকাশ: সর্বজনকথা

1374986_10202067716374067_1397957678435341008_n

অমল আকাশ

Advertisements