1304977230568.cached[মারিও ভার্গাস ইয়োসা ১৯৩৬ সালে পেরুতে জন্মগ্রহণ করেন। তাকে লাতিন আমেরিকার ও তার প্রজন্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিকদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হচ্ছে ‘দ্য টাইম অফ দ্য হিরো’, ‘কনভার্সেশান ইন দ্য ক্যাথেড্রাল’, ‘দ্য গ্রিন হাউজ’ ইত্যাদি। ১৯৯০ এর হেমন্তে প্যারিস রিভিউ’কে দেয়া এই সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তার কর্মপদ্ধতি, লাতিন আমেরিকান সমসাময়িক সাহিত্যিকদের সাথে সম্পর্ক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবেচনাসমূহ আর উপন্যাসের পেছনের কাহিনী। মূল সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন সুজানা হানেয়েল ও রিকার্ডো অগাস্তো সেত্তি।]

প্যারিস রিভিউঃ আপনি একজন বহুল পরিচিত লেখক এবং পাঠকেরা আপনার লেখা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। আজ আপনার পাঠ সম্পর্কে কি আমাদের কিছু বলবেন?

ইয়োসাঃ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটা মজার ব্যাপার ঘটেছে। আমি দেখলাম ইদানিং আমি সমসাময়িকদের পড়ছি কম এবং অতীতের লেখকদের দিকেই ঝুঁকে যাচ্ছি ক্রমশ। বিংশ শতাব্দীর চাইতে উনিশের লেখাই পড়া হচ্ছে বেশি। সম্প্রতি আমি যেন সাহিত্যের চাইতে ইতিহাস আর প্রবন্ধ পাঠেই বেশি আগ্রহী। পাঠাভ্যাসের ব্যাপারটা কেন বা কিভাবে চালিত হয় সেটা নিয়ে খুব একটা ভাবি নি… কখনো নেহাৎ পেশাদারী কারণ কাজ করে। আমার সাহিত্যের প্রোজেক্টগুলো উনিশ-সম্পর্কিতঃ ভিক্টর হুগো’র ‘লা-মিসারেবল’ নিয়ে একটা প্রবন্ধ, কিম্বা ফ্লোরা ত্রিস্তানের জীবনী থেকে অনুপ্রাণিত একটা উপন্যাস অথবা ফ্রাঙ্কো-পেরুভিয়ান সমাজ সংস্কারক ও নারীবাদী আভাঁ লা ল্যাত্রঁ। কিন্তু তারপর আমি এটাও ভাবি যে, পনেরো বা আঠারো বছর বয়সে একজন মনে করে তার সামনে এক অনন্ত সময় রয়েছে। কিন্তু বয়স পঞ্চাশে গড়ালে উপলব্ধি আসে যে সামনের সময়রেখা সীমিত এবং পাঠের ক্ষেত্রে সিলেক্টিভ হওয়া প্রয়োজন। বোধ হয় এইজন্যই সমসময়ের লেখা কম পড়া হয়।

কিন্তু সমসাময়িকদের মধ্যে যাদের লেখা পড়েন, তাদের মধ্যে কারা আপনার পছন্দের?

তারুণ্যে সার্ত্র-এর নিবিষ্ট পাঠক ছিলাম। মার্কিন উপন্যাসিকদেরও পড়েছি। প্রধানতঃ হারানো প্রজন্ম- ফকনার, হেমিংওয়ে, ফিটজেরাল্ড, দোস পাসোস- বিশেষ করে ফকনার। তরুণ বয়েসে যাদের পড়েছিলাম তাদের মধ্যে উনি অল্প কয়েকজনের অন্যতম যিনি আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাকে পুনঃপাঠ করতে গিয়ে কখনো হতাশ হতে হয় নি, যেমনটা কখনো হয়েছে হেমিংওয়ের ক্ষেত্রে। এখন আমি হয়তো আর সার্ত্র পুনরায় পড়ব না। যদি অন্য যা-কিছু এ পর্যন্ত পড়া হয়েছে তার সাথে তুলনা করি, তার লেখাকে পুরোনো মনে হয়; মনে হয় যেন মূল্য অনেকখানিই হারিয়ে ফেলেছে। তার প্রবন্ধ নিয়ে বলতে গেলে, আমার কাছে ওদের অধিকাংশই কম গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়; একমাত্র ব্যতিক্রম সম্ভবত- “ সন্ত জেনোঃ কৌতুকাভিনেতা না শহীদ”- যা আমার এখনো ভালো লাগে। এগুলো স্ববিরোধিতা, অস্পষ্টতা, ভুল আর অসংগঠনে ভর্তি- যেটা ফকনারের ক্ষেত্রে কখনোই প্রযোজ্য নয়। ফকনার-ই প্রথম উপন্যাসিক, যার বই আমি হাতে কাগজ কলম নিয়ে পড়েছি- কারণ তার টেকনিক আমাকে অভিভূত করেছিল। সে ছিল প্রথম উপন্যাসিক যার লেখা আমি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পুনর্গঠন করতে চেয়েছি- ট্রেইস করার জন্য, যেমন উদাহরণ হিসেবে বললে- সময়ের সংগঠন, কাল ও স্থানের ইন্টারসেকশান, বর্ণনার মধ্যেকার বিরতি, আর ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গল্প বলার তার এই ক্ষমতাটা যেটা এক ধরণের অনির্দিষ্টতা তৈরি করার পাশাপাশি আলাদা গভীরতা যোগ করে তার লেখায়। একজন লাতিন আমেরিকান হিসেবে আমার মনে হয় তার বইগুলো যখন আমি পড়েছি সেটা আমার জন্য খুব প্রয়োজনীয় ছিলো কারণ এইগুলো বর্ণনামূলক টেকনিকের এক অমূল্য উৎস যা আমার পৃথিবীর উপর সহজেই প্রয়োগ করা যায়, কারণ একভাবে ভাবলে ফকনারের বর্ণিত পৃথিবীর সাথে আমার পৃথিবীর খুব বেশি ফারাক নেই। পরবর্তীতে, গভীর অভিনিবেশে আমি উনবিংশের উপন্যাসিকদের পড়েছিঃ ফ্লোবার্ট, বালজাক, দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, স্টেনডাল, হওথর্ন, ডিকেন্স, মেল্ভিল। আমি এখনো উনবিংশের লেখকদের মনোযোগী পাঠক।

লাতিন সাহিত্যের ক্ষেত্রে, বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, ইউরোপে বসবাসের সময় আমি লাতিন সাহিত্যকে আবিষ্কার করি এবং গভীর আগ্রহে পড়তে শুরু করি। লন্ডনের বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিষয়ে আমাকে পড়াতে হত, যেটা লাতিন সাহিত্যকে সামগ্রিকভাবে বিচার করতে আমাকে দারুণ সহায়তা করেছে। সেইসময় আমি পড়লাম বোর্হেস, যার সাথে আমার মৃদু পরিচিতি ছিল, কার্পেন্তিয়ার, কর্তাহার, গুইমারেস রোসা, লেজামা লিমা- পুরো প্রজন্মটাই কেবল মার্কেজ বাদে। আমি তাকে আরো পরে আবিষ্কার করি এবং তাকে নিয়ে একটি পুরো বই লিখিঃ গার্সিয়া মার্কেজ- হিস্তোরিয়া দে উন দেসিদিও। আমি উনবিংশ শতাব্দীর লাতিন সাহিত্যও পাঠ করা শুরু করি কারণ এটা আমাকে পড়াতে হত। তখন অনুভব করলাম, আমাদের লেখকেরা খুবি ইন্টারেস্টিং- উপন্যাসিকদের চাইতে সম্ভবত কবি ও প্রবন্ধকারেরা বেশি। উদাহরণ হিসেবে- সারমিয়েন্তো, যে কখনো একটা উপন্যাসও লিখে নাই, সমগ্র লাতিন আমেরিকার সেরা গল্পবলিয়েদের অন্যতম। তার “ফাকুন্দো” একটা মাস্টারপিস। কিন্তু আমাকে যদি একজনের নামই বলতে বলা হয় আমি বলব বোর্হেস- কারণ যে পৃথিবী সে সৃষ্টি করে তা একদম স্বকীয়। এই সুবিশাল স্বকীয়তার পাশাপাশি উত্তুঙ্গ কল্পনা ও সংস্কৃতি তাকে জড়িয়ে আছে যা সর্বৈব কেবলি তার। এবং অবশ্যই তারপর রইল বোর্হেসের ভাষা, যা একভাবে আমাদের ঐতিহ্য থেকে সরে গিয়ে এক নিজস্ব পরম্পরা সৃষ্টি করল। স্প্যানিশ হচ্ছে এমন একটি ভাষা যা উচ্ছ্বাস, বিস্তৃতি আর “অতি” তে পরিপূর্ণ। আমাদের সব শ্রেষ্ঠ লেখকেরাই এই “অতি”-প্রবণতায় আক্রান্তঃ কারভান্তেস থেকে অরতেগা, ভ্যালে- ইঙ্কায়ান এমনকি আলফোনসো রেয়েস। বোর্হেস তার বিপরীত- নির্মেদ, মিত আর প্রেসাইস। সে স্প্যানিশ ভাষার একমাত্র লেখক যার যতোগুলো শব্দ আছে ততখানিই আইডিয়া। সে আমাদের সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক।

বোর্হেসের সাথে আপনার সম্পর্কটা কিরকম ছিল?

তাকে প্রথমবারের মতো দেখি প্যারিসে, ষাটের প্রথম দিকে আমি সেখানেই থাকতাম। ওখানে সে চমকপ্রদ সাহিত্য আর গাউচো সাহিত্যের উপর বিবিধ সম্মেলনে অংশ নিচ্ছিল। পরে আমি অফিস দে রেডিও টেলিভিশন ফ্রাঞ্চাইস-এর পক্ষ থেকে ওর সাক্ষাৎকার নেই, যেখানে তখন কাজ করছিলাম। আমি সেই ঘটনাটা এখনো রোমন্থন করি। এরপর আমাদের নানা সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে দেখা হয়েছে, এমনকি লিমা’য় ও, যেখানে তার সম্মানার্থে আমি একটা নৈশভোজের আয়োজন করেছিলাম। সবশেষ হলে সে আমাকে টয়লেটে নিয়ে যেতে বলল। অইখানে প্রশ্রাব করতে করতে সে আমাকে হঠাত জিজ্ঞেস করল- “ ক্যাথোলিকেরা, তোমার কি মনে হয় ওরা সিরিয়াস? মনে হয় না।”

শেষবারের মতো ওর সাথে দেখা বুয়েনোস এইরেসে, ওর বাসায়। পেরুর একটি টেলিভিশন শো-এর জন্য ওর সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলাম এবং আমার মনে হল আমার করা কিছু প্রশ্ন তাকে খুব অসন্তুষ্ট করেছিল। বিস্ময়কর হলেও সত্যি, সে রেগে গিয়েছিল কারণ সাক্ষাৎকারের পর- যা চলাকালীন আমি খুব মনোযোগী , আমার ভেতরে তার জন্য যে প্রশংসার জায়গাটি ছিল শুধু তার জন্য নয়, বরং তার নান্দনিক আর নম্র ব্যক্তিত্বও ছিলো আমার খুব পছন্দ- আমি ওকে বলেছিলাম যে তার ঘরের সাধারনত্ব আমাকে অবাক করেছিল যার ছিল রঙ উঠে যাওয়া দেয়াল আর ফুটোওয়ালা ছাদ। এটা তাকে আহত করেছিল। এরপর আরেকবার ওর সাথে আমার দেখা হয় কিন্তু তখন সে খুব দূরত্ব বজায় রাখে। পরে অক্টাভিও পাজ আমাকে জানায় যে তার বাড়ি নিয়ে বলা কথায় তার খুব লেগেছিল। সম্ভবত এটাই আমার একমাত্র আচরণ যা ওকে আহত করেছিল। কারণ এছাড়া ওর প্রশংসা ভিন্ন আমি অন্য কিছু করি নি কখনো। আমার মনে হয় না সে আমার কোনো বই পড়েছে। সে বলেছিল যে চল্লিশের পর জীবিত কোনো লেখকের বই পড়ে নাই। শুধু একই বইগুলা বারবার পড়েছে। কিন্তু সে এমন একজন লেখক যাকে আমি খুব পছন্দ করি। তবু সে একমাত্র নয় ,অবশ্যই। পাবলো নেরুদা একজন অসাধারণ কবি। আর অক্টাভিও পাজ- শুধু একজন অসামান্য কবিই নয়, দারুণ একজন প্রবন্ধকার- শিল্প, সাহিত্য ও রাজনীতিতে তার দখল চমৎকার। আমি এখনো আনন্দ নিয়ে তাকে পড়ি। তার রাজনৈতিক চিন্তা ও দর্শনের সাথেও আমার চিন্তাধারার নৈকট্য আছে।

প্রিয় লেখকদের মধ্যে আপনি নেরুদাকে উল্লেখ করেছেন। তিনি তো আপনার বন্ধু। কেমন ছিলেন তিনি?

নেরুদা ছিলো জীবনপিপাসু। সবকিছু নিয়ে তার এক বন্যতা ছিলো- পেইন্টিং, শিল্প, বই, খাবার, দুর্লভ সংস্করণ, পানীয়। খাওয়া আর পান করাও ওর কাছে ছিলো এক মিস্টিক্যাল অভিজ্ঞতা। একটা খুব পছন্দনীয় মানুষ, জীবনে পরিপূর্ণ- অবশ্য যদি আপনি ওর লেখা স্তালিন-এর প্রশংসামূলক কবিতাগুলো ভুলে যেতে পারেন। সে এক প্রায় ফিউডাল পৃথিবীতে বসবাস করত, যেখানে প্রতিটি ব্যাপারকেই সে তার আনন্দের দিকে, তার অফুরান জীবনপ্রাচুর্যের দিকে নিয়ে যেত। আমার ইলা নেগ্রাতে একটা চমৎকার উইকেন্ড কাটানোর সৌভাগ্য হয়েছিল। আহা! চমৎকার সেই অভিজ্ঞতা। তার চারপাশে এক সামাজিক যন্ত্রব্যবস্থা ছড়িয়ে থাকত- এক দঙ্গল মানুষ যারা রান্না আর অন্যান্য কাজকর্ম করত। আর অবশ্যই অসংখ্য অতিথি। এটা ছিল এক মজার সমাজ- খুব জীবন্ত আর বুদ্ধিজীবিতার একদম বাইরে। নেরুদা ছিল বোর্হেসের একদম বিপরীত। বোর্হেস, যাকে কখনো খেতে, পান করতে কিম্বা ধূমপানরত অবস্থায় কেউ দেখে নাই। এমনকি, সে কখনো কোনো নারীর সাথে শারীরিকভাবে সম্পৃক্ত হয় নাই এমন বলারও অনেককে পাওয়া যাবে।

আমার মনে আছে লন্ডনে নেরুদা’র জন্মদিন উদযাপনের দিনটিকে। সে টেমসের ওপোর একটা নৌকায় পার্টি করতে চেয়েছিল। সৌভাগ্যবশত ইংলিশ কবি আলিস্টেয়ার রিড, যে নেরুদাকে খুব পছন্দ করতো, টেমসে একটা নৌকায় বসবাস করতো। তাই আমরা ওর জন্য একটা পার্টির আয়োজন করতে পারলাম। হঠাৎ সে ঘোষনা করল সে এখন একটা ককটেল বানাবে। ওটা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল পানীয় যাতে না জানি কতোখানি ডোম পেরিনিওন, ফলের রস আর ঈশ্বর জানেন অন কতোকিছু মেশানো হয়েছিল। পানীয়টা অবশ্যই ছিল চমৎকার, কিন্তু এর এক গ্লাসই আপনাকে মাতাল করতে যথেষ্ট। তো আমরা সবাই মাতাল হয়ে পড়লাম। অই অবস্থায়ও, আমার মনে আছে সে আমাকে একটা কথা বলেছিল, যা পরবর্তী সময়ে এক পরম সত্য হয়ে গিয়েছিলো আমার জীবনে। অই সময়কার একটা প্রবন্ধ- আমার ঠিক মনে নেই কি নিয়ে- আমাকে খুব আহত করেছিল, কারণ অইখানে আমাকে অপমান করা হয়েছিল প্রচুর মিথ্যে উল্লেখসমেত। আমি এটা নেরুদা’কে দেখালাম। সেই পার্টির মাঝখানে, সে বলল, যেন প্রোফেসিঃ তুমি বিখ্যাত হচ্ছো। আমি তোমাকে সামনে তোমার জন্য কি অপেক্ষা করছে তা জানাতে চাইঃ যতোই তুমি বিখ্যাত হবে ততোই তুমি এরকম আরো ঘটনার মুখোমুখি হবে। একটা প্রশংসার বিপরীতে দুই থেকে তিনটা অপমান জুটবে কপালে। একজন মানুষের পক্ষে যতো কুৎসা আর অপমান সহ্য করা সম্ভব সবি আমি পেয়েছি। চোর, বিশ্বাসঘাতক, ধর্ষকামী, অপরাধী- এমন কোনো উপাধি নাই যা আমি পাই নি। যদি তুমি বিখ্যাত হয়ে ওঠো তোমাকে এর ভেতর দিয়ে যেতে হবেই।
নেরুদার বক্তব্যের সত্যতা পরে তিলে তিলে টের পেয়েছি। আমার শুধু একটা ড্রয়ার নয়, বরং কয়েকটা স্যুটকেস ভর্তি প্রবন্ধ আছে, যা যতো ধরণের সম্ভব অপমানে ভর্তি।

Mario-Vargas-Llosa-Washington-DC-1980-copia2আর মার্কেজ?

আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল; বার্সেলোনায় দুই বছর আমরা প্রতিবেশী ছিলাম। পরবর্তী আমরা আলাদা হয়ে পড়ি ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক কিছু কারণে। কিন্তু মূল কারণটা ছিল ব্যক্তিগত, যার সাথে ওর দর্শন বা বিশ্বাসের কোন সম্পর্ক নেই- যেটার সাথে আমার মতামতের সঙ্গতি নেই অবশ্য। আমার মতে ওর লেখনী আর রাজনীতি সমমানের নয়। আমি তার লেখনীর ভক্ত- আগেই বলেছিলাম আমি ৬০০ পৃষ্টার বই লিখেছি ওকে নিয়ে। কিন্তু ব্যক্তিগতক্ষেত্রে ওর প্রতি আমার তেমন শ্রদ্ধা নেই, ওর রাজনৈতিক বিশ্বাসের প্রতিও, যেটা আমার কাছে সিরিয়াস মনে হয় না। আমার মনে হয় সেটা সুযোগসন্ধানী আর পাবলিসিটি-কেন্দ্রিক।

যে ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বললেন সেটা কি মেক্সিকোর সিনেমাহলে ঘটা সেই ব্যাপারটার সাথে সম্পর্কিত? কথিত আছে সেখানে আপনারা এক ধরণের হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন?

মেক্সিকোয় কিছু ঘটেছিল। তবে আমি এ নিয়ে কিছু বলার আগ্রহ রাখি না আর। এটা নিয়ে নানা কথাবার্তা হয়েছিল আর এখন কিছু বললে আমি মন্তব্যকারীদের নতুন রসদ জোগাতে চাচ্ছি না। কখনো আত্মজীবনী লিখলে হয়তো সে গল্পও করা যাবে।

আপনার বইয়ের বিষয় কি আপনি নির্বাচন করেন না সেটাই আপনাকে নির্বাচন করে?

নিজের ধারণাগত জায়গা থেকে, আমার মনে হয় বই-ই তার লেখককে নির্বাচন করে। আমার সবসময়ই মনে হয়েছে কিছু গল্প যেন আমার উপর এসে পড়েছে, আমি এড়াতে পারি নাই, কারণ কোনো এক অস্পষ্ট উপায়ে তারা ছিল আমার মৌলিক অভিজ্ঞতার সাথে সম্পর্কিত- ঠিক কীভাবে, তা বলতে পারব না। উদাহরণ হিসেবে- বালকবয়সে লিমার লিওনিকো প্রাদো মিলিটারি একাডেমি’তে কাটানো সময় আমাকে এক ভয়াবহ তাড়না দিয়েছে লেখার। আমার জন্য এটা ছিল একটা ট্রমাটিক অভিজ্ঞতা, যা আমার শৈশবের সমাপ্তির সাথে মিশে আছে- নিজের দেশকে একটা সহিংস সমাজ হিসেবে পুনঃআবিস্কার করা, যা তিক্ততায় পরিপূর্ণ; সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগলিক দিক দিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত কিছু জনগোষ্ঠী নিয়ে গড়ে ওঠা; আর কখনো হিংস্র সব যুদ্ধে লিপ্ত। আমার মনে হয় এই অভিজ্ঞতার দীর্ঘ প্রভাব আমার উপর পড়েছে; একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত- এটা আমাকে সৃষ্টি আর আবিস্কারের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছিল।

এখন পর্যন্ত, আমার সব বইয়ের ক্ষেত্রেই একইরকম ঘটেছে। আমার মনে হয় না কখনোই খুব ঠান্ডা মাথায় আমি কোনো গল্প লিখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বরং কিছু ঘটনা বা মানুষ, এমনকি স্বপ্ন বা পাঠাভিজ্ঞতা যেন আমার উপর নিজেদের ইম্পোজ করেছে; আমার মনোযোগ দাবি করেছে। এইজন্যই আমি সাহিত্যসৃষ্টির সম্পূর্ণ অযৌক্তিক উপাদানগুলো নিয়ে এত গুরুত্ব নিয়ে কথা বলি। এই অযৌক্তিকতাকে , আমি বিশ্বাস করি, অবশ্যই পাঠককেও স্পর্শ করতে হয়। আমার প্রিয় উপন্যাসগুলো আমি যেভাবে পড়ি, মানুষ যদি সেরকমভাবে আমার উপন্যাস পড়ে তখন আমি সেটা পছন্দ করব। যেসব উপন্যাস আমার কাছে ফ্যাসিনেটিং তাদের অধিকাংশই আমাকে ওদের বুদ্ধিবৃত্তি বা যৌক্তিকতা দিয়ে স্পর্শ করে নাই, বরং সম্পূর্নরূপে সম্মোহিত করে ফেলেছে। এইসব গল্প আমার সমালোচক সত্তাকে সম্পূর্ণরূপে নিস্ক্রিয় করে ফেলতে সক্ষম, যাতে আমি স্রেফ এক সাসপেন্সের ভেতর আটকা পড়ি। এইসব উপন্যাসই আমি পড়তে ও লিখতে পছন্দ করি। আমি মনে করি একটা উপন্যাসের বুদ্ধিবৃত্তিক উপাদানগুলির, যাদের উপস্থিতি অবশ্যসম্ভাবী, তার ক্রিয়ার ভেতর গল্পের ভেতর মিশে যাওয়া জরুরি যা পাঠককে সিডিউস করবে তার আইডিয়া দিয়ে নয় বরং রঙ দিয়ে, আবেগ দিয়ে, বিস্ময়ের উপাদানগুলি দিয়ে আর তাঁর রহস্য আর সাসপেন্স দিয়ে। আমার মতে, এই ব্যাপারটাই হচ্ছে উপন্যাসের টেকনিক- যা পাঠক আর গল্পের দূরত্ব কমিয়ে আনবে, যদি সম্ভব একদম নাই করে দিবে।
সেইদিক থেকে ভাবলে, আমি উনবিংশ শতাব্দীর লেখক। আমার জন্য উপন্যাস হলো এডভ্যাঞ্চারের উপন্যাস, যা আমার বর্ণিত উপায়ে পাঠ করতে হয়।

আপনার উপন্যাসের হিউমার প্রসঙ্গে। সাম্প্রতিক উপন্যাসগুলোর দিকে নজর দিলে দেখা যাচ্ছে “ আন্ট জুলিয়া এন্ড স্ক্রিপরাইটার” এর যে হিউমার তা থেকে আপনি সরে এসেছেন। এখন হিউমারের চর্চা করাটা কি কঠিন খুব?

আমার কখনোই নিজেকে জিজ্ঞাসা করার ব্যাপারটা মাথায় আসে নি যে আজ আমি যা লিখব তা কি মজার কোনো বই হবে নাকি সিরিয়াস। সম্প্রতি যে বইগুলো লিখেছি, তা কেনো যেন অই ব্লেন্ডের মধ্যেই পড়ে নাই। আমি মনে করি না “ওয়ার অফ দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড” আর “দ্য রিয়াল লাইফ অফ আলেহান্দ্র মায়েতা” কিম্বা যে নাটকগুলো লিখেছি থিমেটিক কারণে এসবকে হিউমারাস কোনো পদ্ধতিতে কার্যকর করে তোলা সম্ভব। কিন্তু “ইন প্রেইজ অফ দ্য স্টেপ-মাদার ” নিয়ে আপনার অভিমত কি? ওটাতে যথেষ্ট হিউমার আছে, নয় কি?

হিউমারের ব্যাপারে আমার এলার্জি ছিল, কারণ সত্যি কথা বলতে আমি মনে করতাম সিরিয়াস সাহিত্যে এটার কোনো জায়গা নেই; উপরন্তু আমার ধারণা ছিলো আমি যদি সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক কোনো সমস্যাকে চিহ্নিত করতে চাই লেখায়, সেইখানে হিউমারের অবস্থান খুবই বিপদজনক হতে পারে। মনে করতাম এটা আমার গল্পকে অগভীর করে তুলবে আর পাঠকের কাছে মনে এ স্রেফ হালকা বিনোদন ছাড়া আর কিছুই নয়। এই কারণে আমি হিউমার থেকে দূরে থেকেছি, সম্ভবত সার্ত্র এর প্রভাবও এইখানে দায়ী, তিনি ছিলেন কট্টর হিউমারবিরোধী, অন্তত তার নিজের লেখায়। কিন্তু একদিন আমি আবিষ্কার করলাম যে জীবনের কিছু অভিজ্ঞতা সাহিত্যে ফুটিয়ে তুলতে হিউমার খুবই মূল্যবান টুল। এবং এটাই হয়েছিল “প্যান্টালিওন এন্ড দ্য স্পেশাল সার্ভিস” এর ক্ষেত্রে। এরপর থেকে আমি হিউমার নিয়ে খুব সচেতন ছিলাম। এটা জীবনের একটা মৌলিক উপাদান, ফলে সাহিত্যেরও। আর আমি মনে করি আমার সামনের লেখালেখিতেও এটা গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখতে পারে। সত্যি বলতে- রাখছে। এটা আমার নাটকের ক্ষেত্রেও সত্য- বিশেষ করে “ক্যাথি এন্ড দ্য হিপোপটেমাস”।

আপনি আমাদের আপনার কর্মপন্থা সম্পর্কে বলবেন? আপনি কিভাবে কাজ করেন? একটা উপন্যাসের উৎপত্তি কিভাবে হয়?

প্রথমত, এটা দিবাস্বপ্নের মতো, ধীরে কোনো ব্যক্তি, পরিস্থিতি বা এমন কিছু যা মনের ভেতরে ঘটে তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। তারপর আমি নোট নেয়া শুরু করি, একটা বর্ণনামূলক সিকোয়েন্স এর সারাংশ দাঁড় করাই; যেমন- কে কোন দৃশ্যে প্রবেশ করল, কে কখন দৃশ্যটি থেকে বেড়িয়ে গেল, এটা-ওটা করল। তারপর যখন একেবারে উপন্যাস নিয়ে কাজ করা শুরু করি, তখন প্লটের একটা সাধারণ সীমারেখা বানানো শুরু করি- যেটা হয়তো শেষে একদমই আলাদা হয়ে যায়, যেহেতু আমি ক্রমশ পরিবর্তন করতে থাকি, কিন্তু সূচনাবিন্দু হিসেবে এটা কাজ করে। তারপর আমি সবকিছু একত্র করা শুরু করি- স্টাইলের কথা একেবারে মাথায় না রেখে- একই দৃশ্যের লিখন ও পুনঃলিখন চলতে থাকে, সম্পূর্ণ স্ববিরোধী সব পরিস্থিতির জন্ম হতে থাকে…

লেখার কাঁচামাল আমাকে সাহায্য করে, নিশ্চিতি দেয়। কিন্তু লেখার কাজটাই সবচেয়ে কঠিন। যখন আমি অই ধাপে, তখন খুব সতর্কতার সাথে এগোই, ফলাফল সম্পর্কে সম্পূর্ন অনিশ্চিত হয়ে। প্রথম সংস্করণ যেন এক আতঙ্কের মধ্য দিয়ে লেখা হয়। তারপর যখন আমি প্রথম খসড়া শেষ করি- যেটা সাধারণত অনেক লম্বা সময়ে নেয়; “দ্য ওয়ার অফ দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড” এর জন্য আমার প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল- সবকিছু বদলে যায়। তবে ততোক্ষণে আমি নিশ্চিত হই গল্পটা এখানেই কোথাও আছে, আমার ম্যাগমার মধ্যে, লুকিয়ে। এটা বিশাল ক্যাওটিক একটা অবস্থা, কিন্তু এর মধ্যেই আমার উপন্যাসটা আছে, অজস্র মৃত উপাদানের ভেতর, অদরকারি দৃশ্যের ভেতর, যা বাদ পড়ে যাবে বা ভিন্ন পারস্পেক্টিভ থেকে লেখা একই দৃশ্যের বিবিধ সংস্করণ। কিন্তু এসবের ভেতরেই গল্পটার জন্ম। তোমাকে সেটা খুঁজে বের করতে হবে, পরিস্কার করতে হবে এবং এটাই কাজের সবচেয়ে উপভোগ্য অংশ। সেইখান থেকে আমি একটানা কোনো শঙ্কা ছাড়াই দীর্ঘসময় একটানা কাজ করতে পারি, যা প্রথম খসড়া করার সময়ে সম্ভব না একেবারেই। আমার মনে হয় লেখার চাইতে পুনঃলিখন, সম্পাদনা ও সংশোধনের কাজটাই আমি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি… আমার মতে লেখালেখির সবচেয়ে সৃজনশীল অংশ সেটাই। কখন গল্পটি শেষ হবে তা আমার কাছে সবসময়ই অজানা। একটা লেখা, প্রথমে আমার মনে হয়েছে কয়েকমাসে শেষ করা সম্ভব, পরে তা শেষ করতে লেগেছে কয়েক বছর। একটা উপন্যাসকে আমার সমাপ্ত মনে হওয়া শুরু হয় যখন অনুভব করি যদি দ্রুত এটা শেষ করে না ফেলি তবে তা আমাকে পেয়ে বসবে। যখন আমি স্যাচুরেশানে পৌঁছে যাই, যখন মনে হয় যথেষ্ট হয়েছে, যখন মনে হয় আমার পক্ষে এটা আর নেয়া সম্ভব না, তখন গল্প শেষ।

আপনি কি হাতে লিখেন, না টাইপরাইটারে নাকি অন্য কোনো বিকল্পে?

প্রথমে আমি হাতে লিখি। আমি সবসময়ই সকালে কাজ করি, আর দিনের শুরুর ঘন্টাগুলোতে আমি সর্বদা হাতে লিখি। অইটা সবচেয়ে সৃজনশীল সময়। এইভাবে আমি ঘন্টাদুয়েকের বেশি কাজ করি না, হাত লেগে আসে। তারপর যা লিখেছি তাই টাইপ করি, সম্পাদনা করতে করতে; এটাই সম্ভবত প্রথম পর্যায়ের পুনঃলিখন। তবে আমি সবসময়ই অল্প কিছু লাইন টাইপ না করে রেখে দেই, যাতে পরের দিন অইখান থেকে আবার টাইপ করা শুরু করতে পারি। টাইপরাইটারটা চালু করার ব্যাপারটা কেমন ডায়নামিক- যেন ওয়ার্ম-আপ।

হেমিংওয়েও এই কাজ করতেন, কোনো বাক্যকে অর্ধসমাপ্ত রেখে দেয়া, যাতে পরেরদিন আবার সহজে শুরু করা যায়…

হ্যাঁ, উনি ভাবতেন মনের মধ্যে যা আছে তার সব লিখে ফেলা ঠিক না, এর ফলে পরের দিন সেই জায়গা থেকে আবার সহজে শুরু করা যায়। ব্যক্তিগতভাবে আমার সবসময় মনে হয় সূচনাবিন্দুটি খুঁজে পাওয়াই সবচেয়ে কঠিন। সকালে ওঠে, নিজেকে প্রস্তুত করা, ভেতরের আশঙ্কাগুলো… কিন্তু যদি যদি আপনাকে যান্ত্রিক কিছু করতে হয় তারমানে কাজ তো ততোক্ষনে শুরু হয়ে গেছে। যন্ত্র কাজ করা শুরু করে। যাই হোক, আমার কাজের শিডিউল খুবই নিয়মমাফিক। সকাল থেকে দুপুর দুটো পর্যন্ত, প্রতিদিন, আমি আমার দপ্তরে থাকি। এই সময়টুকু আমার কাছে পবিত্র। তবে তারমানে এই না যে আমি এর পুরোটাই লিখে কাটাচ্ছি; কখনো পুনঃপাঠ করছি বা নোটগুলো টুকে নিচ্ছি। কিন্তু স্বভাবত অই সময়টা আমি কাজই করছি। আর অবশ্যই, সৃজনশীলতা উপ ও অনুপযোগী উভয় প্রকার দিনই আছে। কিন্তু আমি প্রতিদিন কাজ করি কারণ যদি আমার মাথায় নতুন কোনো আইডিয়া নাও আসে সময়টা আমি নোট নেয়া, রিভাইস দেয়া বা সম্পাদনা করা ইত্যাদি করে কাটাতে পারি। কখনো আমি একটা শেষ হওয়া কাজকেও আবার লিখি- শুধু বিরামচিহ্নগুলো ঠিকঠাক করার জন্য হলেও।
সোম থেকে শনিবার আমি সাধারণত চলমান উপন্যাসের উপর কাজ করি। আর রবিবারে আমি মূলত করি সাংবাদিকতা গোছের কাজগুলি- প্রবন্ধ ও রচনা। আমি এই কাজগুলি শুধু রবিবারেই করার চেষ্টা করি যাতে এটা সপ্তাহের বাকি দিনগুলো সৃজনশীল কাজে কোনো বাঁধা না হয়ে দাঁড়ায়। কখনো নোট টুকে রাখতে রাখতে আমি ধ্রুপদী সংগীত শুনি, যতক্ষন পর্যন্ত এর মধ্যে কোনো গায়কী নেই। একটা খুব শব্দবহুল বাসায় থাকার সময় আমি এই কাজটা করা শুরু করি। সকালে আমি একা কাজ করি, দপ্তরে কেউ আসে না। তখন কোনো ফোনও ধরি না। যদি এটা করতাম তবে সে এক নরকযন্ত্রণা হয়ে দাঁড়াত। চিন্তাও করতে পারবেন না কতো ফোন আর দর্শনপ্রার্থী! সবাই আমার বাসা চিনে। আমার ঠিকানাটি দুর্ভাগ্যবশত পাবলিক ডোমেইনে পড়ে গেছে।

এই কঠোর নিয়মের বাইরে আপনি কখনো যান না?

আমার মনে হয় না, এছাড়া অন্য কিভাবে কাজ করা সম্ভব সেটাই আমার অজানা। যদি আমি মোমেন্ট অফ ইন্সপায়রেশানের জন্য অপেক্ষা করা শুরু করি কখনো কোনো বই শেষ করতে পারব না। আমার জন্য অনুপ্রেরণা যেন প্রাত্যাহিক চেষ্টারই ফসল। এই নিয়ম আমাকে পরম হর্ষ বা বিমুঢ়তার সাথে কাজ করতে দেয়, দিনের প্রকৃতি অনুযায়ী।

ভিক্টর হুগো, অনেক লেখকের মধ্যে একজন, যিনি অনুপ্রেরণার যাদুবলে বিশ্বাসী ছিলেন। গার্সিয়া মার্কেজ বলেছিলেন অনেক বছর ধরে “ ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিটিউড” নিয়ে আটকে থাকার পর মোটরকারে করে আকাপুল্কো ভ্রমণের পথে তিনি পুরো উপন্যাসটা মনে মনে লিখে ফেলেন। আপনি এইমাত্র বললেন অনুপ্রেরণা আপনার কাছে অধ্যাবসায়ের ফলাফল, কিন্তু আপনি কখনো সেই বিখ্যাত “ইলুমিনেশান” এর মুখোমুখি হয়েছেন?

আমার ক্ষেত্রে এটা কক্ষনো হয় নাই। এটা খুব ধীর এক প্রসেস। শুরুতে এটা এমন কিছু, যা কেবল মস্তিস্কের সূক্ষ্ম অনুরণন, এক ধরণের সতর্কতা, একটা কৌতুহল। এমন একটা কিছু, যা একটা কুয়াশা বা অনির্দিষ্টতা থেকে আমার ভেতরে প্রবেশ করে, আমার আগ্রহ, কৌতুহল আর উত্তেজনাকে নাড়িয়ে দেয়। আর তারপর নিজেকেই বিবিধ নোট বা প্লটের সারাংশ হিসেবে অনূদিত করে। তারপর যখন আমি বিভিন্ন সীমানা টানা শুরু করি আর জিনিসগুলোকে বিভিন্ন পর্যায়ে ফেলতে থাকি তখনো অস্পষ্ট কিছু একটা মাথায় থেকে যায়। এই “ইলুমিনেশান” ব্যাপারটা আসলে ঘটে কাজের সময়। এই ব্যাপারটাকে বাস্তবায়িত করাই হচ্ছে কঠিন কাজ… সেই উত্তেজনা যা তাকে জারিত করে, উদঘাটন, সমাধান আর আলোর দিকে নিয়ে যায়। যখন আমি গল্পের হৃৎক্ষেত্রে পৌঁছাই, বেশ কিছুদিন কাজ করার পরে, তখন হ্যাঁ কিছু একটা অবশ্যই ঘটে। আমার সাথে এর সম্পর্ক শীতল হতে থাকে। বরং উল্টো, এটা এতো জীবন্ত হয়ে ওঠে, এতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যে যাকিছুই আমি তখন অনুভব করি সব শুধু আমার লেখার সাথে সম্পর্কিত। যাই আমি শুনি, দেখি বা পড়ি কেন তখন আমার লেখাকে কোনো এক ভাবে সাহায্য করতে থাকে। আমি তখন কেমন এক বাস্তবতার ক্যানিব্যাল হয়ে উঠি। কিন্তু অই পর্যায়ে পৌঁছাতে আমাকে দীর্ঘ পরিশ্রম করতে হয়। আমি একধরণের স্থায়ী দ্বি-জীবনে বসবাস করি। যত হাজারটা কাজই করি না কেন আমার মন সবসময়েই আমার লেখাতেই নিবিষ্ট। অবশ্যই কখনো তা অবসেশানের মতো হয়ে যায়। তখন একটা সিনেমা আমাকে শান্ত হতে সাহায্য করে। সারাদিনের কাজের শেষে, যখন নিজের ভেতরে গভীর এক অন্তর্দন্দ্ব অনুভব করি, তখন একটা সিনেমা আমাকে দারুণ সাহায্য করে।

Entrega_premioপেদ্রো নাভা তো তার কিছু চরিত্রকে রীতিমত এঁকেছেন- তাদের চেহারা, চুল, পরিধেয়। আপনার ক্ষেত্রে কখনো এমন হয়েছে?

না। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে আমি জীবনীমূলক কিছু কাগজ বানাই। এটা নির্ভর করে চরিত্রটি আমার ইন্দ্রিয়ে কিভাবে কাজ করছে তার উপর। যদিও কখনো কখনো চরিত্ররা একদম ভিজুয়ালি সামনে এসে দাঁড়ায়, তথাপি তারা কিভাবে নিজেকে অভিব্যক্ত করছে বা তাদের পরিপার্শ্ব- এসবও আমাকে চরিত্রদের সনাক্ত করতে সাহায্য করে। তারপরো এমন হয়, যেমন একটা চরিত্রকে তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য দিয়েই বিশিষ্ট করে তোলা যাচ্ছে- তখন এটাকে আমার কাগজ কলমেও ধরতে হয়। কিন্তু একটা উপন্যাসের জন্য যত নোটই নেয়া হোক না কেন, আমার মনে হয় শেষমেশ সবকিছু হল স্মৃতি কোনটা গ্রহণ করল। যা থেকে যায় তাই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমি যখন রিসার্চ করতে কোথাও যাই, কখনো ক্যামেরা সাথে নেই না।

তো একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আপনার চরিত্রেরা এক অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়? সবারই নিজস্ব একটা ইতিহাস থাকে?

শুরুতে সবকিছু খুব শীতল, কৃত্রিম ও মৃত! ধীরে ধীরে সবকিছু প্রাণ পেতে থাকে, যখন চরিত্রেরা বিভিন্ন ঘটনা ও সম্পর্কে যুক্ত হতে থাকে। যখন বোঝা যায় গল্পের ভেতরের এক অন্তঃস্থ শক্তি নিজে থেকেই বিদ্যমান। কিন্তু অই পর্যায়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত শুধু কাজ, কাজ আর কাজ ছাড়া কিছুই থাকে না। আমাদের প্রতিদিনের জীবনে তাকালে বোঝা যায়, এমন কিছু ঘটনা বা মানুষ আছে যেগুলা/যারা কোনো একটা প্রয়োজনকে মেটায় যেন। হঠাৎ আপনি বুঝে ফেলবেন ঠিক কোন জিনিসটা আপনার জানা প্রয়োজন, যে প্রোজেক্টে আপনি কাজ করছেন সেটার জন্য। আপনি যেভাবে উপস্থাপন করেন তা কখনোই আসল মানুষটা না- এটাকে গড়ে তুলতে হয়, বানাতে হয়। তবে এটা কেবল গল্পের খুব এডভান্স পর্যায়েই হয়, যখন মনে হয় সবকিছুই এটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কখনো এটা হুট করে চিনে ফেলার মতোঃ অহ, এই চেহারাটাই তো আমি খুঁজছি! এই স্বর, এই কথা বলার ভঙ্গি। আবার কখনো আপনি আপনার চরিত্রগুলোর নিয়ন্ত্রন একদম হারিয়ে ফেলতে পারেন, যেটা আমার ক্ষেত্রে প্রায়শই ঘটে, কারণ আমার চরিত্রেরা যৌক্তিক বিবেচনা থেকে জন্মায় না। বরং আমার কাজের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিই এদের গড়ে তোলে। এইজন্যই এদের কেউ কেউ খুব দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বা আত্মনিয়ন্তা হয়ে ওঠে এমনকি। অন্যরা কিছু পশ্চাৎপটে চলে যায়, হয়তো এটা প্রথমে এরকম সাজানো ছিলো না লেখকের মনে। বোঝা যায় যে লেখক নিজের খেয়ালখুশিমতো চরিত্র বানাতে পারেন না, তারা কখনো অটোনমাস। খুবি অভিনব মুহূর্ত যখন বুঝতে পারা যায় যা আপনি সৃষ্টি করেছেন তার ভেতরেও প্রাণ আছে। প্রাণ, যেটাকে আপনার সম্মান করতে হবে।

আপনার অনেক লেখাই পেরুর বাইরে করা, যাকে বলা যায় এক স্বতঃপ্রণোদিত প্রবাস। আপনি একবার বলেছিলেন যে ভিক্টর হুগো’র নিজের দেশের বাইরে বসে লেখার ব্যাপারটাই “লেস মিসারেবলস” কে অসাধারণত্ব দিয়েছে। বাস্তবতার ভার্টিগোর বাইরে নিজেকে আবিষ্কার করাই একটা বাস্তবতাকে পুনঃগঠন করার জারক। বাস্তবতাকে কি আপনার ভার্টিগোর উৎস বলে মনে হয়?

হ্যাঁ, একভাবে ভাবতে গেলে আমি কখনোই নিজের কাছাকাছি থাকা ব্যাপারগুলো নিয়ে লিখতে পারি নাই। সান্নিধ্য ইন্দ্রিয়ের দখল এমন নিয়ে নেয় যে মুক্ত হয়ে কাজ করা সম্ভব হয় না। কাজের ক্ষেত্রে স্বাধীনতাটা খুবি গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় যা আপনাকে বাস্তবতাকে রুপান্তর করতে, মানুষগুলোকে বা তাদের আচরণগুলোকে বদলে দিতে কিম্বা প্রসঙ্গের ভেতর স্বকীয় কিছু উপাদান যোগ করতে সাহায্য করে। এটা একদম অবধারিত। এটাই সৃজনশীলতা। যদি বাস্তবতা একদম আপনার সামনে থাকে তখন আমার মনে হয় সেটা নিজেই একটা উপাদান হয়ে ওঠে। আমার সবসময়েই একটু দূরত্বের প্রয়োজন, সময়ের স্বাপেক্ষে, কিম্বা আরো ভালো হয় সময় ও স্থানের স্বাপেক্ষে হলে। এই সেন্সে প্রবাস আমার জন্য খুব উপকারী ছিল। এর কারণে আমি নিয়মানুবর্তিতা আত্মস্থ করেছি। আমি আবিষ্কার করেছি লেখালিখিও একটা কাজ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটা দায়। দূরত্ব খুব সহায়ক কারণ লেখকের জন্য নস্টালজিয়াকে আমি খুব দরকারি মনে করি। সাধারণভাবে বলছি, বিষয়ের অনুপস্থিতি স্মৃতিকে উর্বর করে। উদাহরণ হিসেবে “দ্য গ্রিন হাউস” এর পেরু শুধু বাস্তবতার ডেপিকশান নয়, বরং একজন মানুষ যে এইখান থেকে দূরে আছে তার নস্টালজিয়া ও ফেরার তীব্র কামনা, বিষাদ। তাছাড়া দূরত্ব একটা উপকারী পারস্পেক্টিভ তৈরি করে। এটা বাস্তবতা থেকে জটিল বিষয়গুলো প্রশমিত করে যা কেবল দ্বিধা তৈরি করতে সক্ষম। কোনটা আবশ্যক আর কোনটা অনাবশ্যক এটা নির্ধারণ করা সহজ নয়। দূরত্ব এটাকে সম্ভব করে। এটা প্রয়োজন আর অনিত্যের মধ্যকার হায়ারার্কি তৈরি করে।

কয়েকবছর আগে প্রকাশিত একটা রচনায় আপনি বলেছিলেন, সাহিত্য হচ্ছে একটা প্যাশান; এটা সম্পূর্নভাবে মুক্ত এবং এটার জন্য সবরকমের আত্মত্যাগ করতে হয়, কোনোটাকেই আত্মস্থ না করে। “মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে লেখা, বেঁচে থাকা নয়”- যেটা আমাকে পর্তুগীজ কবি ফেরনান্দো পেসোয়ার বলা একটা উক্তি মনে করিয়ে দেয়, “ টু ন্যাভিগেইট ইজ নেসেসারি, টু লিভ ইজ আননেসেসারি”।

আপনি এটা বলতেই পারেন যে লেখালেখি জীবন যাপনের চাইতেও বেশি প্রয়োজনীয়… আমার মনে হয় নিজের সম্পর্কে আপনাকে কিছু বলে রাখা জরুরি, এতে সবাইকে আমাকে আরেকটু ভালোভাবে বুঝবে। ছোটোবেলা থেকেই সাহিত্য আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। যদিও স্কুলজীবনে অনেক পাঠ ও লিখালিখি করা হয়েছিলো, তা স্বত্তেও আমি কখনো কল্পনা করি নি একদিন সাহিত্যেই আমি নিজেকে নিবেদিত করব, কারণ সেইসময়ে একজন লাতিন আমেরিকান, বিশেষ করে একজন পেরুভিয়ানের জন্য এটা ছিল বিলাসিতাসম। অন্য অনেককিছুই করার চেষ্টা করেছি। আইনজীবি, প্রভাষক বা সাংবাদিক হওয়ার পরিকল্পনা করেছি তখন। তখন আমি মেনে নিয়েছিলাম যে সাহিত্যকে মূল লক্ষ্যের বাইরে রাখাটাই আমার জন্য ভালো হবে। কিন্তু যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে বৃত্তি নিয়ে ইউরোপে আসলাম তখন বুঝলাম যে এমন চিন্তা করতে থাকলে আমার কখনোই লেখক হয়ে ওঠা হবে না। সাহিত্য আমার নেশা না হয়ে পেশা হবে, এই সিদ্ধান্তে আসা ছাড়া আর কোনো বিকল্প আমি খুঁজে পেলাম না। তখন সাহিত্যে নিজেকে নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। কিন্তু এতে জীবিকানির্বাহ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো। তখন ভাবলাম এমন কোনো কাজ করতে হবে যেটা করেও আমি লিখালিখি করার প্রচুর সময় পাবো, যে কাজটা কখনোই প্রায়োরিটি হয়ে দাঁড়াবে না। সোজা কথায়, আমি আমার লেখালেখির সুবিধামতো কাজ নিব। আমার মনে হয় এই সিদ্ধান্তই আমার জীবনের একটা টার্নিং পয়েন্ট, কারণ এটা আমাকে লিখে যাওয়ার শক্তি যুগিয়েছিলো। একটা মনোস্তাত্বিক পরিবর্তন। এসবের কারণেই সাহিত্যকে প্রফেশানের চাইতে প্যাশানই মনে হয় আমার কাছে। অবশ্যই, এটা আমার পেশা যেহেতু এটার উপার্জন নিয়েই আমি জীবন যাপন করছি। কিন্তু যদি তা নাও করতে পারতাম, আমি তো তবুও লেখালেখি চালিয়ে যেতাম। সাহিত্য মদুস ভিভেন্দি ( লাতিন ফ্রেইজ- এর অর্থ হচ্ছে যাপনের উপায়) এর চাইতে বেশি কিছু। আমি মনে করি একজন লেখকদর নিজের সবকিছু তার কাজে নিবেদন করা, এটা খুবি গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কেউ এটাকে ট্রিট করেন স্রেফ একটা কমপ্লিমেন্টারি কাজ হিসেবে, এমন কি অনেকে সম্মান ও ক্ষমতা অর্জনের পথ হিসেবে এটাকে বিবেচনা করতে চান। এরকম ক্ষেত্রে এক ধরণের বাঁধা কাজ করে, কারণ এরকম চিন্তাভাবনা থেকে থাকলে স্বাধীনতা, সাহস কিম্বা মৌলিকতার সাথে লেখা সম্ভব নয়। এইজন্যই সাহিত্যের প্রতি পরিপূর্ণ কমিটমেন্ট থাকাটা প্রয়োজনীয়। আজব ব্যাপার হচ্ছে, এই সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আমি ভাবছিলাম যে নিজের জন্য একটা কষ্টের জীবন বেছে নিলাম আমি। কারণ সাহিত্য করে বিলাসযাপন থাকা তো দূরের কথা, প্রয়োজনীয় জীবনযাপনটাই করা সম্ভব এটা আমার বিশ্বাস হয় নি তখন। এখনো হয় না, মিরাকল মনে হয় রীতিমতো। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, লেখালেখি করার কারণে আমাকে কোনোকিছু থেকে বঞ্চিত হতে হয় নি।

আমার মনে আছে, পেরুতে থাকতে, ইউরোপে যাওয়ার আগে, যখন লিখতে পারতাম সেটা ছিলো খুব কষ্ট ও হতাশার। খুব কম বয়সে বিয়ে করে ফেলেছিলাম আমি, তাই যে কাজটাই হাতের কাছে পেতাম সেটা করতেই রাজী ছিলাম। একবার তো একইসাথে সাতটি কাজ করছিলাম। লেখালেখির কোনো সময়ই ছিলো না। রবিবারে কিম্বা ছুটির দিনে আমি লিখতাম। কিন্তু সারা সপ্তাহ আমাকে গ্লানিকর কাজে ব্যস্ত থাকতে হত যার সাথে সাহিত্যের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই আর আমি এ নিয়ে খুব হতাশ থাকতাম। এখন, ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে এটা ভাবলে বিস্মিত হই যে যা আমি সবচেয়ে ভালোবাসি সে কাজ করেই আমি জীবন কাটিয়ে দিতে পারব, এবং সেটা আমার যাপনচাহিদা সমর্থনের জন্য যথেষ্ট, খুব ভালোভাবেই!

সাহিত্য কি আপনাকে বিত্তশালী করেছে?

না। আমি বিত্তশালী নই। যদি একজন লেখকের উপার্জন একজন কোম্পানীর প্রেসিডেন্ট বা একজন টপ প্রফেশনালের সাথে, কিম্বা পেরু’র স্বাপেক্ষে চিন্তা করলে একজন টোরেডর বা টপ এথলেটের সাথে তুলনা করা হয়, তাহলে বোঝা যাবে সাহিত্য একটা নিম্ন-আয়ের পেশা হিসেবেই রয়ে গেছে এখনো।

আপনি একবার উল্লেখ করেছিলেন যে একটা বই লেখা শেষ হওয়ার পর হেমিংওয়ে একইসাথে শূন্যতা, বিষণ্নতা আর হর্ষ অনুভব করতেন। একই পরিস্থিতিতে আপনার অনুভূতি কেমন?

একদমি এরকম। যখন একটা বই শেষ করি, আমি একটা শূন্যতা অনুভব করি, কারণ উপন্যাসটা ততোক্ষণে আমার একটা অংশে রূপান্তরিত হয়েছে। তো পরের দিন থেকে এটার অনুপস্থিতি আমাকে তাড়ায় – মদখোরের এলকোহল ছেড়ে দেয়ার পরের অবস্থা যেন। এটা যেন স্রেফ একটা এক্সেসরি না, জীবনের একটা অংশ যেন ছিঁড়ে ফেলা হল আমার কাছে থেকে। নিরাময় হল – মুহুর্তেই অন্য একটি কাজে ডুব দেয়া, যেটা খুব একটা সমস্যা না কারণ হাজার প্রজেক্ট আছে সময় দেয়ার মত। কিন্তু আমাকে সবসময়ই খুব দ্রুত কাজে ফিরতে হয়, যাতে এই শূন্যতাটা আগের আর পরবর্তী বইয়ের মধ্যকার জায়গাটার খুব বেশি গভীরে চলে না যায়।

অন্যান্য লেখকদের নিয়ে অনেক কথা হল। এবার নিজের কাজ নিয়ে কিছু বলুন। আপনি বেশ কয়েকবার বলেছেন “ দ্য ওয়ার অব দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড” আপনার লেখা শ্রেষ্ঠ বই। এখনো কি তা মনে করেন?

এই উপন্যাসে আমি সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করেছি, নিজেকে নিংড়ে দিয়েছি। চার বছর লেগেছিল কাজটা শেষ করতে। আমাকে প্রচুর গবেষনা করতে হয়েছে, পড়তে হয়েছে এবং অনেক সমস্যা পেরোতে হয়েছে- কারণ প্রথমবারের মতো আমি নিজের দেশ ভিন্ন অন্য কোনো দেশ নিয়ে বই লিখছিলাম, যার ঘটনাকাল ছিল অন্য এক যুগের এবং গল্পের চরিত্রগুলো কথা বলছিলো বইয়ের ভাষা থেকে ভিন্ন ভাষায়। কিন্তু আর কোনো গল্প আমাকে এতোটা উদ্দীপ্ত করে নি।লেখাটার সাথে জড়িত সবকিছুই আমাকে অভিভূত করেছে, নর্থইস্টে ভ্রমণের সময় যা কিছু আমি পড়েছি। এইসব কারণেই এই বইটার প্রতি আমার একটা নরম জায়গা আছে। তাছাড়া বইটার বিষয় আমাকে এমন একটা উপন্যাস লেখার সুযোগ করে দিয়েছে যা আমি সবসময়ই চেয়েছি – একটা রোমাঞ্চ উপন্যাস, যেখানে রোমাঞ্চ অত্যাবশ্যক – তাও কোন কল্পিত রোমাঞ্চ নয়, বরং এমন এক রোমাঞ্চ যা আমাদের ইতিহাস ও সমাজের সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত। এইকারণেই এটাকে আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচনা করি। অবশ্যই এই ধরণের বিবেচনা সাবজেক্টিভ। সংকল্পিতভাবে এরকম হায়ারার্কি তৈরি করার মতো নিরপেক্ষ একজন লেখক তার নিজের লেখার প্রতি থাকতে পারে না। এই উপন্যাস একটা অনতিক্রম্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছিল আমার জন্য যেটাতে আমি উত্তীর্ণ হতে চেয়েছিলাম। প্রথমদিকে আমি খুব এক দোটানায় ছিলাম, যে সুবিশাল গবেষনার কাগজপত্র আমার ভেতরে প্রবল এক ভয় তৈরি করে। আমার প্রথম খসড়া ছিলো অতিকায়, মূল উপন্যাসের প্রায় দ্বিগুণ। আমি নিজেকে প্রশ্ন করছিলাম, কিভাবে এতোসব দৃশ্য, হাজারটা ছোটো ছোটো গল্পের মধ্যে সংহতি স্থাপন করব। দুইবছর আতঙ্কে ছিলাম। তারপর আমি নর্থইস্ট ভ্রমণে গেলাম, পুরো সেরাটো জুড়ে, এটাই ছিলো একটা টার্নিং পয়েন্ট।একটা আউটলাইন আমার মাথায় ছিলো আগে থেকেই।আমি প্রথমে গল্পটা দাঁড় করাতে চেয়েছিলাম, গবেষনাবস্তুর প্রেক্ষিতে, এবং তারপর পরিকল্পনা ছিলো ভ্রমণের। এই যাত্রা আমার কাছে বেশ কিছু বিষয় খোলাশা করে দেয় এবং অন্য বিষয়ের প্রতি এক নতুন অন্তর্দৃষ্টি তৈরি করতে সাহায্য করে। মূলত, বিষয়টা একটা উপন্যাসের জন্য ছিলো না, ছিলো রুই গুয়েরা পরিচালিত একটা সিনেমার জন্য।সেসময় প্যারিসের প্যারামাউন্ট আমার পরিচিত একজন চালাতো এবং সে একদিন ফোন করে জিজ্ঞেস করল আমি চিত্রনাট্য করতে আগ্রহী কিনা যেটা তারা গুয়েরার জন্য প্রযোজনা করছে। আমি তার একটা সিনেমা দেখেছিলাম, টেন্ডার সোলজারস, খুব ভালো লেগেছিল। তাই আমি প্যারিস যাই এবং তার সাথে দেখা করি। সে কি করতে চায় তা আমাকে ব্যাখ্যা করে। সে জানালো সে এমন একটা সিনেমা বানাতে চায় যা কোনো না কোনো ভাবে কানুদোর যুদ্ধের সাথে জড়িত। আমরা কানুদো নিয়ে সিনেমা বানাতে পারতাম না, কারণ বিষয়টা ছিলো অনেক বিস্তৃত, কিন্তু এর সাথে কোনোভাবে যুক্ত কোনো বিষয়কে বিবেচনায় আনতে চাচ্ছিলাম। আমি কানুদোর যুদ্ধ নিয়ে কিছুই জানতাম না, কখনো শুনি নাই কিছু এর আগে। কিছু  পড়া শুরু করলাম। প্রথমেই যা পড়লাম সেটা ছিল ইউক্লেদিস দে কুনহার পতুর্গীজে লেখা অস জারতিওয়েস।এটা আমার জীবনের এক অবিশ্বাস্য উদ্ঘাটন ছিল। অনেকটা শৈশবে পড়া থ্রি মাস্কেটিয়ার্স কিম্বা বয়সকালে ওয়ার এন্ড পীস, মাদাম বোভারি আর মবি ডিক পড়ার মত। অসাধারণ একটি বই, মৌলিক একটি অভিজ্ঞতা। আমি অভিভূত হয়েছিলাম। এটা ছিল লাতিন আমেরিকার অন্যতম সেরা সৃষ্টি। অনেক কারণেই বইটি অসামান্য তবে মূল কারণ এটা হচ্ছে “ লাতিন আমেরিকানিজম” এর একটি ম্যানুয়াল- যা কিছু লাতিন আমেরিকা নয় তার পুরোটাই আপনি আবিস্কার করেবেন এতে। এটা ইউরোপ, আফ্রিকা, প্রি-হিস্পানিক আমেরিকা নয়- কিন্তু এইসব কিছুর মিশ্রণে গড়ে ওঠা একটা কর্কশ এমনকি ভায়োলেন্ট পর্যায়। এইসব কিছু এমন একটি পৃথিবীর সৃষ্টি করেছে যা এতোটা বুদ্ধিদীপ্ত ও চমকপ্রদ উপায়ে খুব কম কাজেই ফুটে উঠেছে অস জেরতিওস এর বাইরে। অন্যভাবে বললে, দ্য অয়ার অব দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড এর জন্য আমি কৃতজ্ঞ ইউক্লেদিস দে কুনহার প্রতি।

আমার মনে হয় অইসময় আমি কানুদোস এর যুদ্ধ নিয়ে যা কিছু সম্ভব সবই পড়েছি। প্রথমে আমি চিত্রনাট্যটি লিখি কিন্তু সিনেমাটা কখনোই বানানো হয় নি। এটা অনেকদুর এগিয়েছিল, এমনকি প্রোডাকশান ও শুরু হয়েছিল, কিন্তু একদিন প্যারামাউন্ট বলল তারা সিনেমাটা করছে না এবং সিনেমাটা আর হল না। রুই গুয়েরার জন্য এটা ছিলো খুব হতাশার। যাই হোক আমি এই বিষয় নিয়ে কাজ করতে থাকলাম যেটা দীর্ঘদিন আমাকে অভিভূত করে রেখেছিল, আর চিত্রনাট্য আসলে তেমন কোনো বড় দৈর্ঘ্যের কাজও ছিলো না। তাই আমি আবার পড়তে শুরু করলাম, গবেষনাও আর উদ্দীপনার চূড়ান্তে পৌছালাম যা খুব অল্প বই-ই আমার ভেতর তৈরি করতে পেরেছে। দিনে দশ-বারো ঘন্টা আমি এটার উপরই কাজ করতাম। ব্রাজিলের প্রতিক্রিয়া নিয়ে কিছুটা শংকিত ছিলাম, ভাবছিলাম এটা অভ্যন্তরীন বিষয়ে নাক গলানোর বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে, আরো বিশেষ করে যখন ব্রাজিলের একজন ধ্রুপদী লেখক এটা নিয়ে কাজ করে ফেলেছেন। কিছু বাজে রিভিউ হলেও, সব মিলিয়ে খুব আগ্রহ ও দয়ার সাথেই এই বইটা গৃহীত হয়, এমনকি সাধারণ মানুষের কাছেও। এটা অনেক বড় পুরস্কার।

images (2)

ভুল বোঝাবুঝির যে ধারাবাহিকতা দিয়ে কানুদো’কে চিহ্নিত করা যায় সে বিষয়ে আপনি কি ভাবেন? প্রজাতন্ত্র বিদ্রোহীদের উত্থানকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সংকেত হিসেবে দেখছে আবার বিদ্রোহীরা মনে করছে তারা লড়াই করছে শয়তানদের বিরুদ্ধে। এটাকে কি আদর্শবাদের সংঘাতের একটা প্রতীক হিসেবে দেখা যায়?

হয়তো এইখানে লাতিন আমেরিকানদের জন্য কানুদো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাস্তবতার একটা চরমভাবাপন্ন দৃষ্টিভঙ্গি যে পারস্পরিক অন্ধত্বের সৃষ্টি করে এটাই বাস্তবতা ও তাত্তিক দৃষ্টিভঙ্গীর মধ্যকার দন্দ্বের জায়গাটা আমাদের দেখতে দেয় না। এটা লাতিনের ট্র্যাজেডি যে আমাদের জাতিগুলো সব সঙ্কট এর সময়, যেমন সিভিল ওয়ার, কানুদো’র ম্যাসাকার প্রভৃতি, নিজেদের বিভক্ত করেছে অই পারস্পরিক অন্ধত্বের জন্য। হয়তো এই কারণেই বিষয়টা আমাকে অভিভূত করেছিল। যদিও এটা একটা সাধারণ ঘটনা। চরমপন্থা ও অসহিষ্ণুতা আমাদের ইতিহাসের সবখানে। সেটা মেসায়নিক, সামাজিক কিম্বা ইউটোপিয়ান বিপ্লবই হোক না কেন অথবা রক্ষণশীল আর লিবারেলদের মধ্যকার সংঘাত। আমাদের ইতিহাস আমাদের পরমত সহিষ্ণুতার অভাবের ইতিহাস।


আপনি একবার লিখেছিলেন আপনার আর কোনো বই উপন্যাসের অতিকল্পনা বা কাইমেরিক আদর্শের দিকে এতোটা যুক্ত করে নাই নিজেকে। ঠিক কি বোঝাতে চেয়েছিলেন এটা দিয়ে?

আমার মনে হয় এই উপন্যাস এক ধরণের অতির দিকে বাহিত জঁর হিসেবেই। এটা দ্রুত নিজেকে অতিগুণীত করে, প্লট যেন ক্যান্সারের মতো বেড়ে ওঠে। যদি লেখক উপন্যাসের প্রতিটি সংকেতের পেছনে দৌড়ায় তখন এটা জঙ্গলে পরিণত হয়। এই যে পুরো গল্পটা বলার কাঙ্খা এটা একটা লেখার জঁর এর সাথে সম্পর্কিত। যদিও একটা সময় আসে, আত্মোপলব্ধির, যখন সময় গল্পটা শেষ করে দেবার, যাতে এটা অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত না চলে। আমি এটাও বিশ্বাস করি যে গল্প বলার বিষয়টা “সম্পূর্ণ” উপন্যাস লেখার যে আদর্শ এটারই প্রচেষ্টা। সেই প্রচেষ্টার পেছনে আমি সবচেয়ে বেশিদুর গিয়েছে “ দ্য ওয়ার অব দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড” উপন্যাসে, কোনো সন্দেহ নাই।

মায়্তা ও এই উপন্যাস সম্পর্কে একবার আপনি বলেছিলেন যে এই দুটো উপন্যাসে আপনি সত্য সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞাত হয়ে সচেতনভাবে মিথ্যে বলতে চেয়েছেন। বিষয়টা কিরকম?

কিছু বানানোর প্রক্রিয়াটা কংক্রীট বাস্তবতার উপর দাঁড়িয়ে শুরু করতে হয়। অন্যদের ক্ষেত্রে জানি না তবে আমার জন্য বাস্তবতার ক্যানভাসই দরকারি। এইজন্যই এতো গবেষনা ও ঘটনাস্থান পরিদর্শন, ব্যাপারটা এমন নয় যে আমি অই বাস্তবতাটা পুনোরোৎপাদন করতে চাই। এটা অসম্ভব। যদি সচেতনভাবেও করতে চাইতাম, ফলাফল একেবারে ভিন্ন কিছুই হতো।

মায়তা’র শেষদিকে বিবরণকারী আমাদের বলে যে মূল চরিত্র, যে এখন পানশালার মালিক, বিবরণকারীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো আর মনে রাখতে পারে না। এটা কি সত্যি? এই লোকটার কি আসলেই অস্তিত্ব আছে?

হ্যাঁ। যদিও সে সম্পূর্ণ অই লোক না যা বইটা নির্মাণ করেছে। আমি অনেককিছুই সংযোজন ও পরিবর্তন করেছি। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই চরিত্র এমন একজনের সাথে যায় যে ট্রটস্কিপন্থি বিপ্লবী ছিল এবং অনেকবার জেল খেটেছে। শেষ অধ্যায়ের আইডিয়াটা আমি তার সাথে কথা বলার পর পেয়েছি এবং অবাক হয়েছি যে যেই সময়টা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার কাছে সেকেন্ডারি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আরো অবাক হয়েছিলাম যে আমি পুরো ব্যাপারটা সম্পর্কে তার চেয়েও বেশি জানতাম। অনেকানেক জিনিসই সে ভুলে গিয়েছিল এবং অনেক কিছু সে জানতই না। শেষ অধ্যায়টা খুবি গুরুত্ববাহী কারণ পুরো বই এর সেন্সই এটা বদলে ফেলে।

আমাদের আন্ট জুলিয়া এন্ড দ্য স্ক্রিপরাইটারের পেদ্রো কামাচো সম্পর্কে বলুন, যে রেডিও এর জন্য ধারাবাহিক লিখতো এবং নিজের প্লটগুলোই মিশিয়ে ফেলতে শুরু করেছিল এক অপরের সাথে।

পেদ্রো কামাচো বলতে কেউ নেই। আমি যখন পঞ্চাশের শুরুতে রেডিও’তে কাজ করতে শুরু করি তখন এক লোক’কে জানতাম যে লিমার রেডিও সেন্ট্রালের জন্য ধারাবাহিক লিখতো। সে ছিলো স্ক্রিপ্ট-মেশিন, খুব সহজেই সে সংখ্যাতীত পর্ব লিখতো রেডিও ধারাবাহিকের, যা লিখা হয়েছে তা আবার পড়বার সময় না নিয়েই। সে আমাকে বিস্মিত করেছিল, হয়তো সে আমার জীবনে দেখা প্রথম পেশাদার লেখক ছিলো বলেই। যা আমাকে একেবারে অভিভূত করেছিল যে এই পুরো পৃথিবীকে যেন সে খুব সহজেই ভুলে যেতে শুরু করেছিল, আর যখন সে বইয়ে পেদ্রো কামাচো যা করে সেটা করা শুরু করল আমি তার প্রতি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়লাম। একদিন তার লিখা গল্পগুলো অভারল্যাপ করা শুরু করল আর রেডিও স্টেশন শ্রোতাদের চিঠি পাওয়া শুরু করল যে চরিত্ররা এক গল্প থেকে আরেক গল্পে চলাফেরা শুরু করেছে। এটা থেকেই আন্ট জুলিয়ায় এন্ড স্ক্রিপরাইটারের আইডিয়া। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই উপন্যাসের চরিত্রটি অনেক রুপান্তরের ভেতর দিয়ে যায়, যা তার মডেলের সাথে মিলে না, যে কখনোই পুরোপুরি উন্মাদ হয় নাই। আমার মনে হয় সে স্টেশন ছেড়ে দেয়, ছুটিতে যায়… তার উপসংহার মোটেও উপন্যাসের মতো নাটকীয় ছিলো না।

এখানে এক ধরণের মেটা-ল্যাঙ্গুয়েজও কি কাজ করছে না এই অর্থে যে ভারগুইতা, যাকে গড়া হয়েছে আপনাকে লক্ষ্য করে, কামাচোর চরিত্রগুলোর মতোই হাস্যকর জীবন যাপন করে?

হ্যাঁ, এটা ঠিক। যখন আন্ট জুলিয়া লিখছিলাম, আমি ভাবলাম শুধু কামাচোর গল্পই বলব। আমি তখন বেশ কিছুটা লিখে ফেলেছি তখন বুঝলাম এটা কেবল এক ধরণের মাইন্ড গেইম হয়ে যাচ্ছে, খুব বেশি বিস্বাসযোগ্য কিছু হবে না। এবং, আগেই বলেছি, আমার এক ধরণের ‘রিয়ালিজ্যম ম্যানিয়া’ আছে। তাই, কামাচোর গল্পের এবসার্ডিটির প্রতি-বিবেচনা হিসেবে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আরেকটা বাস্তব ঘেষা প্লট তৈরির যেটা উপন্যাসকে বাস্তবতার দিকে চালিত করবে। আর যেহেতু আমি এক সোপ অপেরার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম , আমার প্রথম বিয়ে, আমি অই ব্যক্তিগত গল্পটা আনলাম, এই আশায় যে এটা এই ফ্যান্টাসি বিশ্বের প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করবে। তো এই লিখন প্রক্রিয়ার ভেতর আমি দেখলাম একটা কল্পকাহিনীর ভেতর এটা করা অসম্ভব, অবাস্তবতার একটা সংকেত এতে ঢুকে পড়বেই, লেখকের ইচ্ছেবিরুদ্ধ হলেও। তাই ব্যক্তিগত গল্পটা অন্য গল্পের মতোই বিভ্রান্ত হয়ে উঠল। তাই ভারগুয়েতার গল্প আত্মজৈবনিক কিছু উপাদান আছে যা পুরোপুরি বদলে ফেলা হয়েছিল, যা হয়েছিল সংক্রমনের আদলে।

ইদানিং অনেক প্রবন্ধে আপনি নৈরাশ্যবাদী কিছু কথা বলেছেন। যেমন ১৯৮২ তে আপনি বললেন, “ সাহিত্য রাজনীতির চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্যিকদের শুধুমাত্র রাজনীতির বিপদজনক পরিকল্পনাগুলোর বিপক্ষে দাঁড়ানোর এবং অইসব’কে নিজের জায়গায় ফিরিয়ে নেয়ার জন্যই রাজনীতিতে জড়িত হওয়া উচিত। এটা কি কি রাজনীতির সম্ভাবনার বিরুদ্ধে খুব নৈরাশ্যবাদী বক্তব্য না?

না। আমি বলতে চেয়েছিলাম যে সাহিত্যের কাজ অনেক দীর্ঘস্থায়ি বিষয়গুলো নিয়ে রাজনীতির সাথে তুলনা করলে। একজন লেখক সাহিত্য ও রাজনীতি একসাথে করতে পারে না সাহিত্যিক হিসেবে এবং সম্ভবত রাজনীতিবিদ হিসেবেও ব্যর্থ হওয়া ছাড়া। আমাদের মনে রাখা উচিত কাজনৈতিক কাজগুলি সাহিত্যের তুলনায় অনেক ক্ষণস্থায়ী। আপনি বর্তমানের জন্য বই লিখেন না, সময়ের প্রয়োজন আছে, ভবিষ্যতের উপর প্রভাবের ক্ষেত্রটা তৈরি করতে, যেটা রাজনৈতিক কার্যাদির ক্ষেত্রে কখনোই বা বেশিরভাগ সময়ই সত্য নয়। যাই হোক, এটা বল্লেও রাজনৈতিক পরিস্থিতির সম্পর্কে মতামত দিতে আমি কখনোই পিছপা নই, তাছাড়া আমার লেখা ও কাজগুলোও এইসব বিষয়াদির সাথে আমাকে সম্পৃক্ত করে। আমি মনে করি একজন লেখক কখনোই রাজনীতিকে এড়িয়ে যেতে পারে না, যেটা আমার দেশের জন্য আরো বেশি সত্য, কারণ এখানকার সমস্যাগুলো জটিল, একই সাথে আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিও। এটা খুবই জরুরি যে লেখকেরা কোনো না কোনোভাবে জড়িত হবে।সমালোচনা, আইডিয়া কিম্বা তাদের কল্পনাশক্তির মাধ্যমে কোনো সমাধানে পৌঁছাতে সহায়তা করবে। কারণ শিল্পীমাত্রই প্রখর ইন্দ্রিয়সম্পন্ন, তারা সমাজ ও ব্যক্তির স্বাধীনতার গুরুত্ব গভীরভাবে অনুভব করে। ন্যায়বিচারের, যাকে আমরা প্রত্যেকেই কামনা করি, কখনোই স্বাধীনতার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া উচিত নয়; এবং আমাদের এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া উচিত নয় যে সামাজিক বিচার কিম্বা জাতীয় নিরাপত্তার খাতিরে মাঝে মাঝে নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে হয়-যা সর্বগ্রাসী চরম বামপন্থী আর প্রতিক্রিয়াশীল চরম ডানপন্থীরা আমাদের করতে বলবে। লেখকেরা এটা জানে কারণ প্রতিদিন তারা অনুভব করে স্বাধীনতার ঠিক কোন মাত্রা প্রয়োজন সৃষ্টির জন্য, জীবনের জন্য। যথাযথ বেতন কিম্বা কাজ করার অধিকারের মতোই লেখকদের স্বাধীনতাকে রক্ষা করা উচিত।

কিন্তু আমি আপনার মন্তব্যের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বলছিলাম। লেখকদের কি নিজের মতামতকে একটা সীমারেখা দেয়া উচিত নয়?

আমার মনে হয় এটা জরুরি যে লেখকেরা অংশগ্রহণ করবে এবং মতামত দিবে। কিন্তু এটাও জরুরি যে রাজনীতি সাহিত্যে অনুপ্রবেশ যাতে না করে, যাতে সাহিত্যপরিমণ্ডল ধ্বংস না করে। এটা যখন হয় তখন সাহিত্যিক একজন প্রোপাগ্যান্ডিস্ট এ পরিণত হয়। কাজেই এটা গুরুত্বপূর্ণ যে সাহিত্যিক একটা নির্দিষ্ট সীমার ভেতরে তার রাজনৈতিক কার্যাদি চালায়।

আচ্ছা এটা কিরকম যে একজন সাহিত্যিক, যে রাজনীতির প্রতি চরম অবিশ্বাস দেখিয়েছে সবসময়ই, সে ১৯৯০ সালের নির্বাচনে পেরুর রাস্ট্রপতি পদে প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ালো?

কখনো একটা দেশ সংকটের মধ্যে দিয়ে যায়, যেমন যুদ্ধের সময়। এরকম ক্ষেত্রে কোনো বিকল্প নেই। পেরুর আজকের অবস্থা ভয়াবহ। অর্থনীতি ডুবছে। মুদ্রাস্ফীতি চরমে। ১৯৮৯ এর প্রথম দশ মাসে মানুষেরা তাদের ক্রয়ক্ষমতার অর্ধেক হারালো। রাজনৈতিক সহিংসতা হয়ে উঠলো চরম। মজার ব্যাপার হল, এমন সময়েই গণতন্ত্র আর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের বড় সুযোগগুলো আসে। আমরা সমবায়পন্থা বা সমাজতন্ত্রের দিকে ফিরে তাকাতে পারি যা পেরুতে ১৯৬৮ এর পর থেকে ছিলো। এতো বছর ধরে আমরা যার জন্য লড়েছি তা প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ আমরা হারাতে পারি না। উদারনীতির পূনর্গঠন আর মূলবাজার অর্থনীতি। না বললেই নয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন যা আমাদের দেশের নানা ধরণের ক্ষতি করে যাচ্ছে। এইসব কারণই আমাকে সব বাধা অতিক্রম করে অই রাজনৈতিক সংগ্রামে নিজেকে যুক্ত করতে উদ্বুদ্ধ করে ছিল। খুবি নাইভ বিভ্রম – বলতে দ্বিধা নেই।

imagesএকজন লেখক হিসেবে আপনার প্রধান শক্তি ও দূর্বলতা কি?

বড় গুণ হচ্ছে অধ্যাবসায়। আমি অনেক পরিশ্রম করতে এবং নিজের ধারণাকৃত এফোর্টের চেয়ে আরো বেশি কিছু আদায় করে নিতে সক্ষম। আর দোষ হচ্ছে আত্মবিশ্বাসের অভাব, যা আমাকে খুব ভোগায়। একটা উপন্যাস লিখতে তিন থেকে চার বছর সময় লাগে- যার বড় একটা অংশ যায় নিজেকে সন্দেহ করতে করতে। সময়ের সাথে সাথে এটা না কমে বরং বাড়ছে। হয়তো এইজন্যই আমি পুরাপুরি নাই হয়ে যাই নাই। কিন্তু আমি জানি মরার আগ পর্যন্ত আমি লিখব। আমি আরো অনেক বই লিখতে চাই, আরো ভালো বই। যা যাপিত হয়েছে তারচেয়েও আরো আকর্ষণীয় এডভ্যাঞ্চার আমি উপভোগ করতে চাই। আমার সেরা সময় আমি পিছনে ফেলে এসেছি এমন আমি বিশ্বাস করি না- এমনকি কেউ প্রমাণ সহকারে বললেও।

আপনি কেন লিখেন?

আমি লিখি কারণ আমি অসুখী। আমি লিখি কারণ এটা এই অসুখের সাথে লড়ার একটা পদ্ধতি।
…………

মূল সংস্করণ

বাংলায়ন: অমিত চক্রবর্তী

248428_4787585934355_591326943_n

অমিত চক্রবর্তী

Advertisements