10257

Juan Ramón Jiménez

হিস্পানি কবিতায় মদার্নিসমোর প্রবক্তা রুবেন দারিওর নতুন কাব্য-আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের কবিতার অন্তর্লীন গহনবিষাদ আর জীবনের উজ্জ্বল বিভায় অভিভূত ছিলেন। তাঁর নিজের কবিতাও হয়ে উঠেছিল আধুনিক মনোজাগতিক সহজ-সরল গহনস্পর্শী কবিতার হিস্পানি নিদর্শন। গীতিকবিতা যে একইসঙ্গে নির্ভার আর গভীর হয়ে উঠতে পারে, হিমেনেথের কবিতা পড়লে আবিষ্কার করা যায় সেই কবিতালোক। হিমেনের জন্ম ১৮৮১ সালে আন্দালুসিয়ার মোগের নামের একটা ছোট্টগ্রামে। আঠারো বছর বয়সে ১৯০০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম দুটি কবিতার বই। রিরংসা, প্রেমই ছিল সেই কবিতার বৈশিষ্ট্য। এরপর নিজের জন্মভূমিতে বসবাসের সূত্রে লিখলেন ‘প্লাতেরো আর আমি : আন্দালুসিয়ার একটি বিষাদগাথা’ [Platero y yo] কাব্যগ্রন্থের সেই অসামান্য কবিতাগুলি। আন্দালুসিয়ার ল্যান্ডস্কেপ আর দৈনন্দিন কিন্তু রহস্যপূর্ণ জীবনযাপন যেখানে একটি গাধা আর তার সঙ্গী মানুষের রূপকে মরমীভঙ্গিতে উপস্থাপিত হয়েছে। হিমেনেথের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে ‘মরমী সনেট’, ‘পাথর ও আকাশ’, ‘গদ্য আর কবিতায় পদ্য’, ‘আমার গানের কথা’, ‘সবশেষে প্রাণীদের কথাই বলবো’। ১৯৫৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। মৃত্যু ১৯৫৮ সালে। অনলাইনে Project Gutenberg-এ তাঁর প্রায় সব কবিতাই প্রকাশিত হয়েছে। পাঠকেরা সেখান থেকে পড়ে নিতে পারেন।

এখানে প্রকাশিত হলো হিমেনেথের ‘প্লাতেরো এবং আমি’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম ৫টি কবিতার অনুবাদ।

উৎস : ইংরেজিতে অনূদিত Platero and I, Translated by Eloise Roach, University of Texas Press, Third paperback print : 1999.

Green line                                                                      প্লাতেরো এবং আমি    Green line

images (1)

চন্দ্রগ্রহণ

পাইন গাছের ঘন অরণ্যে যখন ঢুকে পড়ি, কপালে অনুভব করি শীতল ছায়ার স্পর্শ, জানিনা তখন কীভাবে যেন আমাদের হাতদুটো পকেটে গিয়ে আশ্রয় নেয়। এক এক করে মোরগ-মুরগিগুলো বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ঘরে ফিরতে শুরু করে। চারপাশের গ্রামগুলো সমস্ত সবুজ নিয়ে ঘন অন্ধকারে ভরে যায়, নীলাভ চাদরের রঙে সবকিছু বদলে গিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। দূরের সমুদ্র যেন শ্বেতশুভ্র উদ্ভাসন, কিছু কিছু তারা মিটমিট করে জ্বলে। নিজেদের বাড়ির ছাদে যারা বিচরণ করে, তারা এ-ওর সঙ্গে কিছুটা কৌতুকের সুরে কথা বলে, অন্ধকারের ছোট্ট জীবগুলো চন্দ্রগ্রহণের নিবিড় নৈঃশব্দ্যের মধ্যে স্থির। কীভাবে যেন ছাদের শ্বেতশুভ্রতা বদলে যাওয়া শুভ্রতায় পরিণত হচ্ছে।

সবকিছুর মধ্য দিয়ে আমরা সূর্যকে দেখবার চেষ্টা করি : অপেরা গৃহের কাচ, টেলিস্কোপ, বোতল, ঘসা কাচ। সবদিক থেকেই দেখা যায় এইসব : দরমার জানালা, বাগানে পড়ে থাকা মই, গোলাঘরের জানালা, লোহিত আর নীল কাচের ভেতর দিয়ে রৌদ্রকরোজ্জ্বল আকাশের আলো …

অস্তমিত হওয়ার আগে সূর্য তার জটিল আলোকচ্ছটা আর স্বর্ণাভা দিয়ে কিছুক্ষণের জন্যে সবকিছুই আমাদের চোখে দ্বিগুণ, তিন গুণ, হাজার গুণ বড় করে তুলেছিল। অথচ এখন সেই দীর্ঘ রূপান্তরিত আলোকচ্ছটা ছাড়াই সবকিছু ছেড়েছুড়ে সে চলে যাচ্ছে, নিঃসঙ্গ আর দারিদ্র্যপীড়িত, সোনার বদলে শুরুতেই সে রুপো আর রুপোর বদলে তামার সওদাগর হয়ে উঠেছিল। সব হারিয়ে শহর এখন যেন কপর্দকহীন ঘসা তামার পয়সা। কী বিষণ্ন আর অর্থহীন সব রাস্তাঘাট, চত্বর, গির্জার চূড়া, পাহাড়ি পথ। নীচের ওই আস্তাবলে প্লাতেরোকে মনে হচ্ছে কেমন যেন অস্পষ্ট, কিছুটা অবাস্তব, পৃথক আর অপসৃয়মান, ভিন্ন এক গাধা …

images

ভয়

বেশ বড়, গোলাকার, স্পষ্ট চাঁদ, যেদিকে যাই পায়ে পায়ে আমাদের অনুসরণ করছে। তন্দ্রাচ্ছন্ন তৃণভূমি, কালো কালো ছাগলের মতো ছায়াখণ্ড কালো জামের জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরা হেঁটে যাওয়ার সময় কে যেন নিঃশব্দে সরে গেল। মস্ত্ এক কাঠমাদামের গাছ, ফুলভারে চন্দ্রালোকে ঝলমল করছে, এর শীর্ষে জড়িয়ে আছে সাদা মেঘ, মার্চের জ্বলন্ত্ নক্ষত্রে রাস্তাটা ছায়াচ্ছন্ন। বাতাসে কমলালেবুর ঝাঁঝালো নিবিড় গন্ধ। আর্দ্র আর নিস্তব্ধ। ডাকিনীদের উপনিবেশ…

 “প্লাতেরো, খুব শীত তাই না!”

প্লাতেরো- আমি জানিনা সে কী ভয়ে অথবা আমার নিজের কারণে – ছুটে চলে গেল, ঢুকে পড়লো নদীর ভেতরে, প্রবেশ করল চাঁদে আর চাঁদটাকে টুকরো টুকরো করে ফেলল। মনে হলো স্ফটিকস্বচ্ছ একরাশ গোলাপ তার পায়ে জড়িয়ে গেছে, থামিয়ে দিতে চাইছে প্লাতেরোর চলার গতি…

প্লাতেরো অবশ্য দুলকিচালে পাহাড়ের ওপরে উঠছে, তার শ্বাস-প্রশ্বাস ছোট হয়ে আসছে, যেন কেউ তাকে অনুসরণ করছে, তার শরীরে জেগেছে অনর্জিত মৃদু উষ্ণতার অনুভব – পাহাড় ডিঙিয়ে সে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে শহরের দিকে।

প্লাতেরো

cubierta-de-platero-y-yo

প্লাতেরো একটা ছোট্ট গাথা, নরম রোমশ গাধা : দেহ জুড়ে এতটাই নরম মসৃণ রোম, স্পর্শ করলে মনে হয় পুরো শরীরটা বুঝি তুলোয় তৈরি আর অস্থিহীন। শুধু তার আরশির মতো চোখ দুটো কঠিন একজোড়া কৃষ্ণস্ফটিক।

ছেড়ে দিলে হালকা পায়ে সে মাঠের ভেতরে হাঁটতে থাকে, আর, নাকটা ঘষতে থাকে ঘাসের বুকে ছোট ছোট গোলাপি, নীল, সোনালি ফুলে … আমি তাকে নরম গলায় ডাকি, ‘প্লাতেরো?’ ডাক শুনেই সে দুলকি চালে ফিরে আসে আমার কাছে। তার মুখ জুড়ে অস্পষ্ট স্মিত উদ্ভাসিত হাসি।

যা-ই খেতে দিই তাই খেতে ভালোবাসে। ও ভালোবাসে চীনা কমলালেবু, মাস্কাটেলের সোনালি আঙুর, মধুসিক্ত বেগুনি ডুমুরের পাতা।

শিশুর মতো সে সুকুমার, দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সে একেবারেই দুর্বল নয়, পাথরের মতো কঠিন। প্রতিটি রবিবার আমি যখন তার পিঠে চেপে এ-গ্রাম সে-গ্রাম ঘুরে গ্রামের প্রান্তে গিয়ে হাজির হই, ধীর-স্থির গ্রামের মানুষ, ছুটির পরিচ্ছন্ন পোশাকে সজ্জিত, মন্থর, একবার ঘুরে ওকে দেখে আর তারা বলে :

‘দেখ, দেখ, প্লাতেরো যেন ইস্পাতের তৈরি।’

ইস্পাত, হ্যাঁ তাই-ই তো। একইসঙ্গে ইস্পাত আর চাঁদের মতো উজ্জ্বল রূপোলি শরীর তার।

শুভ্র প্রজাপতি

রাত্রি নামছে, অস্পষ্ট বিধুর আর লোহিত-নীল। গির্জার পেছনে অস্বচ্ছ সবুজ আর  নীলাভ আলোর দ্যুতি। সামনের পথ পুরোপুরি ছায়াচ্ছন্ন, ঝুলন্ত ঘণ্টার, ঘাস আর অজানা ফুলের গন্ধ, ক্লান্ত, বিষণ্ন বাসনা। হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ালো নিকষ কালো এক ছায়ামূর্তি। মাথায় টুপি, হাতে তরবারি, চুরুটের প্রজ্বলিত ফুলকির আলোয় ফুটে উঠলো লোহিত মুখ। কয়লার স্তূপের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া কুড়ে ঘর ফেলে এভাবেই সে এগিয়ে এসেছিল আমাদের সামনে। প্লাতেরো তখন ভীত, সন্ত্রস্ত।

“কিছু কী বয়ে আনছো তুমি?”

“নিজেই দেখ … শুধু শাদা প্রজাপতি।”

লোকটা লোহার শলাকাটা ছোট্ট ঝুড়ির মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে চাইলো। আমি বাধা দিলাম না। ঢাকনাটা খুলে দেখালাম। লোকটা কিছুই দেখতে পেল না। আমার মনের বাসনাগুলো হারিয়ে গেল, মুক্ত, স্বাধীন, লোকটাকে কিছুতেই অভিবাদন জানানো গেল না।

গোধূলি বেলার খেলা

ঠিক যখন সন্ধ্যা নামছে, ঠা-য় সবকিছু হিম, প্লাতেরো আর আমি তখন লোহিত-নীল অন্ধকারের ভেতর দিয়ে শহরের নানা আঁকাবাঁকা পথ ঘুরে মজা নদীটির কাছে এসে দাঁড়ালাম। গরীব ঘরের একদঙ্গল ছেলেমেয়ে চোর-পুলিশ খেলছে, একজন আরেক জনকে ভয় দেখাচ্ছে, ভিখিরি ভিখিরি খেলছে। একজন ছালা দিয়ে মাথা ঢেকে নিল, আরেক জন বললো সে অন্ধ, আরেক জন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে থাকলো …

পরে, ছেলেমানুষি তাড়নায়, আর যাই হোক তারা তো জুতাটা পড়েছে, পোশাকও গায়ে চড়িয়েছে, তাদের মায়েরাও সেই থেকে-  যদিও তারা শুধু জানে কীভাবে বাচ্চাকাচ্চাদের খাবার খাওয়াতে হয়, ওই শিশুরা হয়ে গেল এক-একজন রাজপুত্র আর রাজকন্যা।

“আমার বাবার একটা রূপার ঘড়ি আছে।”

“আমার আছে ঘোড়া।”

“আমার আছে বন্দুক।”

ঘড়িটা ওকে দিনের বেলাতেই জাগিয়ে দিত; বন্দুক দিয়ে ক্ষুধাকে জয় করা যেত না; ঘোড়াটা তাকে সর্বনাশের শেষ সীমায় টেনে নিয়ে গিয়েছিল …

এরপরই ছেলেমেয়েগুলো হাতে হাত দিয়ে ঘুরতে থাকলো, গোল হয়ে নাচতে থাকলো। সেই গাঢ় ঘনান্ধকারে একটা ছোট্ট মেয়ে, স্ফটিক জলের ধারার মতো ভঙ্গুর যার গলা, ছায়ার মধ্যে রাজকন্যার মতো গর্বভরে গান গাইলো :

“মহান নৃপতি ওরের

আমি তরুণী বিধবা বউ …”

এসো, এসো! গরিব ঘরের ছেলেমেয়েরা। গান গাও, স্বপ্ন দেখ। মনে হচ্ছে বেশ দ্রুত তোমাদের যৌবন জেগে উঠছে, এখন বসন্তকাল, শীতে বুঝি কোনো ভিখিরি ছদ্মবেশ নিয়েছে, তোমাদের নিশ্চয়ই ভয় পাইয়ে দেবে।

“এসো, এবার আমাদের যাওয়ার পালা, প্লাতেরো।”

JuanRamónJimenez-362x460

………………………..

10452384_726843494021753_5443000967118017289_n

ড. মাসুদুজ্জামান

কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক

অধ্যাপক, শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউট,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

images (1)

Advertisements