imagesপ্রস্তাবনা: ওশো সম্পর্কে আপনারা প্রায় সবাই কিছু না কিছু জানেন। তবে এই জানাটা একেকজনের কাছে একেক রকম। কেউ যদি-বা তাঁকে মহান গুরু বা ভগবান জ্ঞানে পূজো করেন, তো কেউ-বা তাঁকে ভণ্ড, কামুক এবং একজন বিলাসী জীবন-যাপনকারী মানুষ হিসেবে জানেন। আমার মনে হয় এমন বিতর্কিত একজন মানুষকে বুঝতে গেলে তাঁর কাজের মধ্যে দিয়েই তাঁকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে।

১৯৩১ সালের ১১ ডিসেম্বর ভারতবর্ষের মধ্যপ্রদেশের কুছোয়াড়াতে শ্রী রজনীশ জন্মগ্রহণ করেন, যিনি তাঁর ভক্তদের দেয়া ওশো নামেই বেশি পরিচিত। খুব ছোটবেলা থেকেই তিনি হৃদয়ানুভূতির দিক থেকে বিদ্রোহী, স্বাধীনচেতা ছিলেন। অন্যের কথা শুনে বিশ্বাস করা বা জ্ঞান অর্জন করার চেয়ে তিনি কোন কিছুকে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জানতে আগ্রহী ছিলেন। একুশ বছর বয়সে সিদ্ধিলাভের পর ওশো তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করেন। এবং তারপর বেশ কয়েক বছর জাবলপুর ইউনিভার্সিটিতে দর্শন বিভাগে অধ্যাপনা করেন। ইতোমধ্যে তিনি ভারতবর্ষের নানান এলাকা ঘুরে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। সে সময় গোঁড়া ধার্মিকদের সাথে নানান বিতর্কেও জড়িয়ে পড়েন।

তারপর ১৯৬০ সালের শেষদিক থেকে তিনি তাঁর অনন্য ধ্যান-পদ্ধতিগুলো প্রবর্তন করেন। তিনি বলেন আধুনিক মানুষের উপর এখন তথাকথিত সেকেলে রক্ষণশীলতা আর বর্তমান সময়ের অনিশ্চয়তা, উদ্বেগের ভার। তাই নিজের চিন্তাহীন শিথিল ধ্যানস্থ অবস্থাকে আবিষ্কার করতে হলে মানুষকে অবশ্যই গভীরে বিশোধনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। অসংখ্য ভক্ত সমালোচক রেখে ১৯৯০ সালের ১৯ শে জানুয়ারী ওশো দেহ রাখেন।

ওশো তাঁর THE DHAMMAPADA:THE WAY OF THE BUDDHA (Vol-3, Ch-3) লেকচারে কবিতা নিয়ে তুলনামূলক নিম্নোক্ত আলোচনাটা করেছেন। এখানে উদাহরণ হিসেবে তিনি জেন গুরু ‘বাশোর’ একটা হাইকু এবং বিখ্যাত কবি ‘টেনিসনের’ একটা কবিতা নিয়েছেন। অধ্যাত্মবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি এই আলোচনা করেছেন। কবিতার অনেক রকম আলোচনা সমালোচনা পড়েছি কিন্তু এই দুটো— একটা হাইকু এবং একটা কবিতার তুলনামূলক আলোচনা আমার কাছে বেশ ভিন্ন রকম লেগেছে, আনন্দ দিয়েছে। তাই অনুবাদ করতে প্রবৃত্ত হয়েছি বলা যায়। তবে এখানে কবিতা বা হাইকু অনুবাদের ক্ষেত্রে আমার দৈন্য স্বীকার করে নিচ্ছি। আমি মূল ভাবকে অনুসরণ করে অনুবাদের চেষ্টা করেছি। আশা করি আমার কবি বন্ধুরা আমার এই ধৃষ্টতাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন এবং সুপরামর্শ দিয়ে আমার ভুলত্রুটিগুলো শুধরে দেবেন। বিষয়টা আরো ভালো করে বোঝার স্বার্থে হাইকু এবং কবিতাটির ইংরেজি ভার্সন অনুবাদের নিচে বন্ধনীর মধ্যে সংযুক্ত করা হলো।

ওশো—

সেদিন রাতে আমি জেন আধ্যাত্মবাদী গুরু, বাশো’র একটা বিখ্যাত হাইকু পড়ছিলাম। পশ্চিমা মনের কাছে বা পশ্চিমা আদলে যারা শিক্ষিত হয়েছেন তাদের কাছে এটাকে কোন মহৎ কবিতা মনে হবে না। আর এখন সারা পৃথিবীতে পশ্চিমা ধরণেই মানুষকে শিক্ষিত করে তোলা হচ্ছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে এখন পূর্ব এবং পশ্চিমের দূরত্ব ঘুচে গেছে। এটা খুব নীরবে শোন, কারণ তোমরা যাকে বিখ্যাত কবিতা বলো এটা তেমন কিছু নয় কিন্তু এর একটা মহৎ সংবোধ বা উপলব্ধি আছে—যা অধিকতর তাৎপর্যপূর্ণ। এর সুমহৎ কাব্যগুণ আছে, কিন্তু সেই কাব্যকলাকে অনুভব করতে গেলে তোমাকে খুবই সূক্ষ্মবুদ্ধিসম্পন্ন বা সুবেদী হতে হবে। বৌদ্ধিকভাবে এটাকে বোঝা যেতে পারে না; এটা কেবল স্বজ্ঞাবলে বোঝা যেতে পারে।

হাইকুটা হলো—

আমি সজাগ হয়ে তাকালে,

দেখি নাজুনিয়া ফুটছে

ঝোপের ধারে!

(When I look carefully,

I see the nazunia blooming

By the hedge!)

basho-tabi-no-soraএখন, মনে হবে এই কবিতার মাঝে বিশেষ কিছুই নেই। কিন্তু আমাদের আরো দরদের সাথে এটার ভিতরে প্রবেশ করতে দাও, কারণ বাশো’কে ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছে। তাঁর নিজের ভাষায় এটার একটা সম্পূর্ণ নিজস্ব বুনট এবং বৈশিষ্ট্য আছে।

নাজুনিয়া খুবই সাধারণ ফুল— নিজে থেকেই রাস্তার ধারে জন্মায়, এক ধরণের ঘাসফুল। এটা এতই সাধারণ এবং সব জায়গায় দেখা যায় যে কেউ-ই কখনও এটার দিকে তাকায় না। এটা মহার্ঘ্য গোলাপ নয়, এটা দুর্লভ পদ্ম নয়। জলাশয়ের পানিতে ভাসমান একটা দুর্লভ পদ্মের সৌন্দর্য দেখা সহজ বিষয়, একটা নীল পদ্ম— তুমি কীভাবে এটা দেখা থেকে বিরত থাকতে পারো? এক মুহূর্তের জন্য হলেও তুমি তার সৌন্দর্যে ধরা পড়তে বাধ্য। অথবা একটা চমৎকার গোলাপ বাতাসে নাচছে, সূর্যের আলোতে… ক্ষণকালের জন্য হলেও এটা তোমাকে অধিকার করে নেয়। এটা অপূর্ব সুন্দর। কিন্তু একটা নাজুনিয়া খুব সাধারণ, সবখানে দেখা যায় এমন একটা ফুল; একে বাগানে লালল-পালনের প্রয়োজন নেই, তার পরিচর্যার জন্য কোন মালীর প্রয়োজন নেই, এটা নিজে থেকেই যে কোন জায়গায় জন্ম নেয়। নাজুনিয়াকে সযতনে দেখার জন্য একজন ধ্যানীর প্রয়োজন, একটা খুব সূক্ষ্ম সচেতনতার প্রয়োজন; অন্যথায় তুমি এটাকে পাশ কাটিয়ে যাবে। আপাতদৃষ্টিতে এর কোন সৌন্দর্য নেই, এর সৌন্দর্য গভীর। খুব সাধারণ হওয়াতেই তার সৌন্দর্য, কিন্তু এই খুব সাধারণের মাঝেই সে অসাধারণকে ধারণ করে আছে, কারণ সব কিছুই ঈশ্বরময়— এমনকি এই নাজুনিয়া ফুল। দরদী বা সমবেদী হৃদয় দিয়ে যদি তাকে না দেখো তবে তুমি তার নাগাল পাবে না।

যখন প্রথবারের মত বাশো’কে পড়ো, তখন তুমি চিন্তা করতে শুরু করো যে— “ঝোঁপের ধারে ফুটে থাকা নাজুনিয়াকে নিয়ে বলার মত এমন অসাধারণ গুরত্বপূর্ণ কী বিষয় আছে?” বাশো’র কবিতায় শেষ সিলেবল্‌—  ‘কানা’ (kana), জাপানী ভাষায়— এটাকে একটা বিস্ময়বোধক চিহ্ন দিয়ে  ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছে, কারণ এ ছাড়া আমাদের এটাকে অনুবাদের অন্য আর কোন উপায় নেই। কিন্তু কানা অর্থ হলো, “আমি বিস্ময়াভিভূত।”

এখন কোথা থেকে এই সৌন্দর্য আসছে? এটা কি নাজুনিয়া থেকে আসছে?—কারণ হাজারো মানুষ এই ঝোঁপের পাশ দিয়ে রাস্তা পার হয়ে চলেছে কিন্তু হয়তো কেউ-ই এই ছোট ফুলটার দিকে তাকায়নি। কিন্তু বাশো এই ফুলটার সৌন্দর্যে পাগল হয়েছে, অন্য এক জগতে আত্মহারা হয়েছে।

কী ঘটেছে?

প্রকৃতপক্ষে এটা নাজুনিয়া নয়, নইলে এটা সবারই নজর কাড়তো। এটা বাশোর সংবোধ বা অন্তর্জ্ঞান, তাঁর খোলা হৃদয়, তাঁর সমবেদী দৃকশক্তি, তাঁর ধ্যানমগ্নতা। ধ্যান হলো কিমিয়া (alchemy); এটা আবার ধাতুকে সোনাতে রূপান্তর করতে পারে, এটা একটা নাজুনিয়া ফুলকে পদ্মে রূপান্তর করতে পারে।

যখন আমি সজাগ হয়ে দেখি…

এবং ‘সজাগ’ শব্দটার অর্থ হলো—  মনোযোগসহকারে, সচেতনতার সাথে, অভিনিবিষ্ট হয়ে, ধ্যানস্থ হয়ে, প্রেমময় হয়ে, আগ্রহান্বিত হয়ে। মানুষ কেবল সম্পূর্ণ জাগুরকতা ছাড়াও দেখতে পারে, তখন সে সমগ্র বিষয়টার নাগালই পাবে না। ‘সজাগ’ শব্দটাকে তার পূর্ণ অর্থ সহকারে স্মরণ রাখতে হবে, কিন্তু মূল অর্থ হলো ধ্যানশীল হয়ে। এবং যখন তুমি কোন কিছু ধ্যানস্থ হয়ে দেখো তখন তার অর্থ কী দাঁড়ায়? তখন সেটা বোঝায় যে কোন মন ছাড়াই তুমি দেখছো, তোমার চেতনার আকাশে কোন চিন্তার মেঘ নেই, কোন স্মৃতি বয়ে যাচ্ছে না, না কোন আকাঙ্ক্ষা; কোন কিছুই না, নিরেট শূন্যতা।

যখন এমন এক “না-মন” (no-mind) অবস্থায় কোনকিছুর দিকে তাকাও, এমনকি তখন একটা ‘নাজুনিয়া’ ফুলও তোমাকে অন্য আর এক জগতে নিয়ে যায়। এটা স্বর্গের পদ্ম হয়ে যায়, তখন সেটা আর কোন পার্থিব বিষয় থাকে না, তখন এই সাধারণ বিষয়ের মধ্যে সেই অপার্থিবকে অবলোকন করা যায়। এবং এটাই হলো বুদ্ধের পথ— সাধারণের মাঝে অসাধারণের দর্শন, সবকিছুকে একমুহূর্তে হঠাৎ ধরে ফেলা, এর মাঝেই পূর্ণকে উপলব্ধি করা— বুদ্ধ এটাকে বলেন তথতা( tathata)।

বাশো’র হাইকু হলো তথতার হাইকু। এই নাজুনিয়া, প্রেমাত্মক হয়ে দেখা, হৃদয়বান হয়ে সযতনে দেখা, অনাবিল সচেতনতায়, ‘না-মন’ অবস্থায়। এবং তখন একজন বিস্ময়াভিভূত হয়, সম্ভ্রমোপম হয়। এক মহান বিস্ময়ের উদয় হয়। কীভাবে এটা সম্ভব হয়? এই নাজুনিয়া—এবং এমন একটা নাজুনিয়া ফুলে যদি এই বিস্ময় সম্ভব হয় তবে সবকিছুতেই সম্ভব। যদি একটা নাজুনিয়া এত সুন্দর হতে পারে তবে বাশো “বুদ্ধ” হতে পারেন। যদি একটা নাজুনিয়া এমন কাব্যকে ধারণ করতে পারে, তাহলে প্রতিটা প্রস্তর খণ্ড “ধর্মোপদেশ” হতে পারে। আমি সজাগ হয়ে তাকালে, দেখি নাজুনিয়া ফুটছে ঝোপের ধারে! কানা (Kana)… আমি বিস্ময়াভিভূত! আমি মুক। আমি এই সৌন্দর্য সম্পর্কে কিছুই বলতে পারছি না—আমি কেবল এই সৌন্দর্যের আভাস দিতে পারি। একটা হাইকু শুধুমাত্র কোন কিছুর একটু আভাস। কবিতা বর্ণনা করে কিন্তু  হাইকু কেবল নির্দেশ করে—এবং সেটা করে খুবই অপ্রত্যক্ষ্যভাবে।

অনুরূপ একটা অবস্থা দেখা যায় “টেনিসনের” একটা বিখ্যাত কবিতায়। এই দুটোর তুলনামূলক আলোচনা করা হলে বিষয়টা বুঝতে সুবিধা হতে পারে।

বাশো অন্তর্জ্ঞানলব্ধতার (intuitive)  প্রতিনিধিত্ব করেন, আর টেনিসন করেন বুদ্ধিবৃত্তির। বাশো প্রাচ্যের প্রতিনিধিত্ব করেন, টেনিসন করেন পশ্চিমের। বাশো ধ্যানের (meditation)  কথা বলেন, আর টেনিসন বলেন মনের (mind)। তাদের একই রকম মনে হয়, এবং মাঝে মাঝে টেনিসনের কবিতাটাকে বাশোর হাইকুর চেয়ে বেশি কাব্যিক দেখায় কারণ এটা স্পষ্ট, স্পষ্টত প্রতীয়মান।

টেনিসনের কবিতা—

দেয়ালের ফাটলের মাঝে ফুল

আমি ফাটল থেকে তুলে নেই

তোমাকে ধরি এখানে, মূল এবং সব, আমার হাতে

খুদে ফুল—যদি আমি তোমাকে উপলব্ধি করতে পারি

তুমি কী, মূল এবং সমস্ত, এবং সর্বেশ্বর,

আমার জানা কর্তব্য ঈশ্বর এবং মানুষ কী।

 9c822e55176dee0f6902b252574313baএকটা চমৎকার কবিতাংশ কিন্তু বাশোর সাথে তুলনা করার কিছুই নেই। আমাকে দেখাতে দাও কোথায় টেনিসন সম্পূর্ণ আলাদা। প্রথমত— দেয়ালের ফাটলের মাঝে ফুল/ আমি ফাটল থেকে তুলে নেই…

বাশো শুধুমাত্র ফুলটার দিকে তাকাচ্ছেন, তিনি ফুলটাকে তুলছেন না। বাশো একজন অক্রিয় সচেতনতা বা সতর্কতা; টেনিসন সক্রিয়, সহিংস। সত্যি বলতে কি, যদি সত্যিই ফুলটা তোমার মনে রেখাপাত করে, তবে তুমি সেটাকে উৎপাটন করতে পারো না। যদি ফুলটা তোমার হৃদয় ছুঁয়ে যায়, তবে কীভাবে তুমি সেটাকে উৎপাটন করতে পারো? উৎপাটন করার অর্থ এটাকে ধ্বংস করে ফেলা, হত্যা করা—এটা খুন! কেউ টেনিসনের এই কবিতাকে খুন হিসেবে চিন্তা করেনি—কিন্তু এটা খুন। এমন সুন্দর কোন কিছুকে তুমি কীভাবে ধ্বংস করতে পারো? কিন্তু এভাবেই আমাদের মন ক্রিয়া করে; এটা ধ্বংসাত্মক। সে অধিকার করতে চায়, কেবল ধ্বংসের মধ্য দিয়ে কোন কিছু অধিকৃত করা সম্ভব।

বাশো সযতনে, সজাগ হয়ে তাকিয়ে দেখেন, কেবল দেখেন, এমনকি খুব মনোযোগ সহকারে স্থির দৃষ্টিতেও দেখছেন না, কেবল তাকিয়ে দেখা, কোমল, মেয়েলি, যেন এই ভয়ে— যদি নাজুনিয়া আঘাতপ্রাপ্ত হয়। টেনিসন দেয়ালের ফাটল থেকে ফুলটাকে তুলছেন এবং বলছেন— তোমাকে ধরি এখানে, মূল এবং সব, আমার হাতে/ খুদে ফুল… এখানে তিনি বিচ্ছিন্নই থেকে যাচ্ছেন। পর্যবেক্ষক এবং পর্যবেক্ষিত বিষয়ের কোথাও দ্রবণ হচ্ছে না, তারা সম্পূর্ণরূপে সংযুক্ত হচ্ছে না, মিলিত হচ্ছে না। এটা কোন প্রেমীয় সম্পর্ক নয়। টেনিসন ফুলটাকে আক্রমণ করেন, মূলসহ সবকিছু উপড়ে তুলে আনেন, হাতের নাগালে এনে ধরেন।

মন সর্বদা তুষ্টিবোধ করে যখন সে কোনকিছু অধিকার করতে পারে, নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, আঁকড়ে ধরতে পারে। কিন্তু চেতনার একটা ধ্যানস্থ অবস্থা কখনও অধিকারী হতে, আয়ত্ত করায় আগ্রহী নয়, কারণ এই সবকিছু সহিংস মনের উপায়। এবং তিনি বলছেন— “খুদে ফুল…” ফুলটা ক্ষুদ্রই আছে, আর তিনি উচ্চ মর্যাদাসূচক আসনে প্রতিষ্ঠিত। তিনি একজন মানুষ, একজন মহান বুদ্ধিজীবী, বিখ্যাত কবি। তিনি তার অহমের মাঝেই আবদ্ধ হয়ে থাকেন, বলেন— “খুদে ফুল…”

বাশোর ক্ষেত্রে তুলনা করার কোন প্রশ্নই ওঠে না। তিনি তাঁর নিজের সম্পর্কে কিছুই বলেননি, যেন তিনি নেই। সেখানে কোন পর্যবেক্ষক নেই। সে সৌন্দর্য এমনই যে সেটা সমাধি অবস্থা আনে। নাজুনিয়া ফুলটা সেখানে, ঝোপের ধারে ফুটে আছে—কানা (kana)—বাশো পুরোপুরি বিস্ময়াভিভূত হন, তাঁর সত্তার মূলে আঘাত করে। এই সৌন্দর্য অত্যন্ত প্রবল। বরং ফুলটাকে অধিকার করার চেয়ে তিনি ফুলুটা দ্বারা অধিকৃত, তিনি ফুলটার সৌন্দর্যের কাছে সম্পূর্ণ সমর্পিত ছিলেন, সেই মুহূর্তের সৌন্দর্যের প্রতি, সে ক্ষণের আশীর্বাদের প্রতি।

খুদে ফুল, টেনিসন বলছেন, যদি আমি তোমাকে উপলব্ধি করতে পারি— বোঝার জন্য মনের ঐ আচ্ছন্নতা! রসাস্বাদন যথেষ্ট নয়, অনুরাগ যথেষ্ট নয়; সেখানে বোঝাপড়া থাকতে হবে, জ্ঞানপ্রসূত হতে হবে। জ্ঞানের আগমন ছাড়া টেনিসন স্বস্তিবোধ করছেন না।

images (4)

ফুলটা প্রশ্নবোধক হয়ে গেছে। টেনিসনের জন্য ফুলটা একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন, বাশোর জন্য এটা বিস্ময়াভিভূত হওয়ার একটা যথামুহূর্ত। এবং সেখানেই ব্যাপক পার্থক্য— প্রশ্নবোধক চিহ্ন এবং বিস্ময়াভিভূত হওয়ার যথামুহূর্ত।

বাশোর জন্য প্রেমই যথেষ্ট—প্রেমই উপলব্ধি। এছাড়া বোঝার আর কী থাকতে পারে সেখানে? কিন্তু মনে হচ্ছে টেনিসন প্রেম সম্পর্কে কিছুই জানেন না। সেখানে তার মন জানার জন্য লালায়িত।

যদি আমি তোমাকে উপলব্ধি করতে পারি/ তুমি কী, মূল এবং সমস্ত, এবং সর্বেশ্বর…

এবং মন অমোঘরূপে পূর্ণ নৈতিক শুদ্ধতা অর্জনে সচেষ্ট থাকে। কোনকিছুকে অজানা অবস্থায় ছাড়তে পারে না, কোন কিছুকে অজানা এবং রহস্যাবৃত অবস্থায় মেনে নিতে পারে না। মূল এবং সমস্ত, এবং সর্বেশ্বর… এই সব কিছুকে তার বুঝতে হবে। সবকিছুকে না জানা পর্যন্ত মনের ভয় থাকে—কারণ জ্ঞান শক্তি দেয়। যদি কোথাও রহস্যাবৃত কিছু থাকে, তবে তুমি ভয়ে ভীত থাকতে বাধ্য, কারণ রহস্যাবৃত কোন বিষয়কে তুমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারো না। এবং কে জানে সেই রহস্যের মাঝে কী লুকিয়ে আছে?

“বৈজ্ঞানিক জিদ” হলো যে— আমরা কোন কিছুকে অজানা অবস্থায় ছেড়ে দেব না, এবং আমরা মানতেই পারি না যে, কোনদিন কোনকিছু অজানা থাকতে পারে।

বিজ্ঞান অস্তিত্বকে জানা এবং অজানা এই দুটো ভাগে ভাগ করেছে। জানা বিষয় যা একদিন অজানা ছিল, এখন সেটা জানা হয়েছে। এবং অজানা বিষয় আজ যা অজানা রয়েছে তা আজ, কাল বা পরশু জানা হবে। জানা এবং অজানার মাঝে খুব বেশি পার্থক্য নেই, কেবল একটা ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা, একটা ক্ষুদ্র গবেষণা, এবং একদিন সকল অজানা বিষয় জানা হয়ে যাবে।

বিজ্ঞান কেবল তখন স্বস্তিবোধ করে যখন সবকিছু জানাতে পর্যবসিত হয়। কিন্তু তাহলে সেখানে সকল কাব্য হারিয়ে যায়, সকল প্রেম, সকল রহস্য অন্তর্হিত হয়, সকল বিস্ময় অগোচর হয়। আত্মা, ঈশ্বর অন্তর্হিত হয়, জীবনের গান, উদযাপন অগোচর হয়, হারিয়ে যায়। যখন সবকিছু জ্ঞাত, তখন আর কোনকিছুই মহার্ঘ্য নয়। সব কিছু অধিগত, তখন আর কোনকিছুর মূল্য নেই। সব কিছু জানা, তখন জীবনের আর কোন অর্থ নেই, কোন তাৎপর্য নেই।

আপাত বৈপরীত্য দেখো—  প্রথমে মন বলছে, “সব কিছু জানো!” –এবং যখন তোমার সব কিছু জানা হয়ে যাচ্ছে তখন মন বলছে, “জীবনের কোন মানে নেই।”

তুমি জীবনের সকল মর্মার্থকে ধ্বংস করে এখন তার জন্য হাহাকার করছো। বিজ্ঞান অর্থের ক্ষেত্রে খুবই ধ্বংসাত্মক। এবং এর কারণ হলো বিজ্ঞান সবকিছু জানার জন্য জোর করে, এটা তৃতীয় আর একটা অবস্থা বা বিভাগকে মেনে নেয় না, যা অজ্ঞেয়, জ্ঞানাতীত—যা চিরকাল অজ্ঞেয় থেকে যাবে। এবং এই অপরিজ্ঞেয়র মাঝেই জীবনের তাৎপর্য।

সৌন্দর্যের সকল মহামূল্য বিষয়—  প্রেম, ঈশ্বর, প্রার্থনা, যা কিছু প্রকৃত অর্থেই তাৎপর্যপূর্ণ, যা কিছু মানুষের জীবনে বেঁচে থাকাকে বিশিষ্টতা দেয়, এর সবগুলোই এই তৃতীয় বিভাগের অন্তর্গতঃ সেই অজ্ঞেয়। অজ্ঞেয় ঈশ্বরের আর এক নাম; রহস্যাবৃতের, অলৌকিকের আর এক নাম। এ ছাড়া তোমার হৃদয়ে কোন বিস্ময় থাকতে পারে না—এবং বিস্ময় ছাড়া কোন হৃদয় আদৌ হৃদয় নয়, এবং তোমার হৃদয়ে এই সশ্রদ্ধ বিস্ময় না থাকলে তুমি মহামূল্যবান কিছুকে হারিয়ে ফেলো। তখন তোমার চোখ ময়লাপূর্ণ হয়, তাদের স্বচ্ছতা হারায়। তখন পাখিরা গান গেয়ে যায় কিন্তু তোমাকে সেটা স্পর্শ করে না, সে গান তোমাকে জাগিয়ে তোলে না, তোমার হৃদয় সে গানে তোলপাড় করে না—কারণ তুমি তার ব্যাখ্যা জানো।

গাছপালা সবুজ, কিন্তু পাতার সে শ্যামলিমা তোমাকে একজন নাচিয়ে, গায়কে রূপান্তর করে না। এটা তোমার সত্তার মাঝে আর কাব্যের গোলা বর্ষায় না, কারণ তুমি তার ব্যাখ্যা জানো— ক্লোরফিলের উপস্থিতিতে পাতার রঙ সবুজ হয়েছে। সুতরাং আর কোন কাব্য অবশিষ্ট রইল না। যখন কোথাও কোনকিছুর বাখ্যা এসে হাজির হয় তখন তার সকল কাব্য হারায়। এবং সকল ব্যাখ্যা উপযোগবাদী, সেগুলো চুড়ান্ত নয়। এবং তুমি ঈশ্বরের খোঁজ করে চলতেই পারো এবং কোথাও তাঁকে খুঁজে পাবে না, কারণ তিনি সর্বত্রই বিরাজিত। মন তাঁকে হারাতে যাচ্ছে কারণ মন তাঁকে একটা বস্ত (object)  হিসেবে পেতে পছন্দ করবে এবং ঈশ্বর কোন বস্ত নয়।

download

ঈশ্বর হলেন একটা স্পন্দন। যদি তুমি অস্তিত্বের নীরবতার ধ্বনির সাথে সুরে বাঁধা হও, সেই নিগুঢ় রহস্যময়তার সাথে, তখন তুমি জানবে যে কেবল ঈশ্বরই আছেন, আর কিছু নেই। তখন ঈশ্বর অস্তিত্বের সমার্থক। কিন্তু এইসব বিষয়গুলোর সাথে বোঝাবুঝি করা যায় না, এইসব বিষয়গুলোকে জ্ঞানে পর্যবসিত করা যায় না—এবং এখানেই টেনিসন ব্যর্থ হয়েছেন, সমগ্র বিষয়ের লক্ষ্যভেদে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি বলছেন— খুদে ফুল, যদি আমি তোমাকে উপলব্ধি করতে পারি/ তুমি কী, মূল এবং সমস্ত, এবং সর্বেশ্বর

আমার জানা কর্তব্য ঈশ্বর এবং মানুষ কী।

টেনিসনের সব কিছু হলো, ‘কিন্তু’, ‘যদি’ দ্বারা আবৃত। আর বিস্ময়সূচক চিহ্ন— “কানার” মাঝে, বাশো জানেন ঈশ্বর কী, মানুষ কী—

“আমি বিস্ময়াভিভূত, আমি বিস্ময়াপন্ন, নাজুনিয়া ফুটে আছে ঝোপের ধারে!”

হয়তো সেটা একটা পূর্ণিমা রাত, অথবা সেটা খুব ভোরবেলা— বস্তত আমি দেখতে পাচ্ছি,  বাশো রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছেন, নিশ্চল, যেন তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস থেমে গেছে। একটা নাজুনিয়া— এবং এত সুন্দর! সকল অতীত বিদায় হয়েছে, সকল ভবিষ্যৎ অন্তর্হিত হয়েছে। তখন সেখানে আর মনের কোন প্রশ্ন নেই কিন্তু কেবল সুতীব্র বিস্ময়বোধ! বাশো একটা শিশুতে পরিণত হয়েছেন— আবার শিশুর নির্মল দৃষ্টিতে একটা নাজুনিয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন, সজাগ হয়ে সযতনে, প্রেমাত্মক হয়ে। এবং এই প্রেমে, এই সজাগ সতর্কতায় একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের বুঝাবুঝি হয়— সেটা না বুদ্ধিবৃত্তিক, না বিশ্লেষণাত্মক।

10689616_912815828757935_4203561190869823022_n
।তোরিফা নাজমিনা। শিক্ষক, গদ্যকার, অনুবাদক

Advertisements