বিস্মরণের বিষ্ণু বিশ্বাস :: নাহার মাওলা

 bishnu-biswasহারিয়ে গেল বিষ্ণু। কেমন করে কোথা থেকে কেন ও হারিয়ে গেল কেউ জানে না। এসব ওই একমাত্র বলতে পারে, কিন্তু সে যে কথা বলে না!

কথা বলে না তা জানতে পারলাম যখন, তখন ওকে খুঁজে পেয়েছি। কেমন করে খুঁজে পেলাম সে এক লম্বা গল্প। অন্য কোথাও বলব তা। কিন্তু ২০১১ তে প্রায় ৩০ বছর পরে যাকে খুঁজে পেলাম, হারিয়েছিলাম তাকে নয়, অন্য বিষ্ণুকে, অন্য মানুষকে।

৮২ বা ৮৩-র গোড়ার দিকে আমি ইউনিভার্সিটিতে ওকে শেষ দেখেছি। ৩০ বছরের পলি পড়েছে ওর মুখে চোখে যেমন, আমারও তেমনি। তবু চিনতে পেরেছে আমাকে, আমাদের! ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে ইচ্ছে হল কিন্তু হেসে বললাম, ‘চিনতে পারিস?’ ও জবাবে এমন করে হাসল যেন অবান্তর প্রশ্ন করেছি! ওকে কথা বলানোর জন্যে আমার নাম ওর মুখ থেকে শুনতে চাইলাম।

কথা বলল না, একটা কাগজে অনভ্যস্থ কাঁপা হাতে লিখল, “নাহারা হারা”। এবার কেঁদে ফেললাম। হারিয়েছে ও, আর আমাকে বলছে “হারা”। হাতের লেখা দেখে বুঝলাম বছর বছর পার করেছে কাগজ কালি কলম ছাড়াই।  কীসের অভিমান ওর? কার ওপর অভিমানে নির্বাসিত করেছে নিজেকে? কোন বঞ্চনায় ঠোঁট দুটোকে শাস্তি দিচ্ছে এমন? কেন অনেক কথা বলে হৈচৈ করে উঠছে না, এতদিন পর দেখা হল তবু? কে বা কী ওকে তপস্বীর মতো এই মৌনী করেছে?

ডাক্তারি বিদ্যায় ঝটপট বলে দেবে, স্কিটজোফ্রেনিয়া। ব্যস?

আমরা ঠিকানা পেয়ে ওর কাছে গিয়ে যখন পৌঁছলাম তখন নিঃসঙ্গ বিষ্ণুর ঘর, দাওয়া, উঠোন ভরে উঠেছে চারপাশের মানুষের ভিড়ে। ওরা অবাক হয়ে দেখছে, শহুরে দুই নারী এই পাগল মানুষটির বন্ধু! তাকে দেখতে এসেছে আরেক দেশ থেকে!

আশেপাশের লোকেরা তাকে পাগল বলেই চেনে। কাঁচাপাকা চুলদাড়িতে ওকে দেখতে মনে হচ্ছে আমাদের চেয়ে বয়সী। লোকজনের চোখেমুখে খানিক কৌতূহল আমাদের ঘিরে। সাধারণ কারণেই তাদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে শুধু ভালবাসার টানে আমরা ছুটে গেছি তেপান্তর পেরিয়ে। কেউ কেউ ভাবছে একটু অন্যরকম। ফিসফাস শুনতে পাচ্ছি।

আমাদের ঘাড়ের ওপর লোকেরা দাঁড়িয়ে। কোনো আড়াল নেই। আমরা কী বলছি, কী করছি অবাক হয়ে দেখছে। তার মাঝেই মাসীমা (বিষ্ণুর মা) আমাদের মিস্টি, বিস্কুট আর চা আনিয়ে খেতে দিলেন। নিজের পাতের মিষ্টিটা বিষ্ণু আমার মুখে তুলে দিল আর বিস্কুটগুলো ভেঙে পায়ের কাছে ওর বিড়াল দুটোকে। চা-টুকু খেল শুধু। আমার মুখটা মিষ্টি আর চোখদুটো নোনতা হয়ে উঠল।

বিষ্ণুর পাতে শেষ কবে এসব খাবার জুটেছে বলতে পারব না; কিন্তু সহজে যে জোটে না, তা ওর শরীরের হাল দেখলে আঁচ করতে কষ্ট হয় না। তবু ওর বুকের ভেতর যে বৈরাগ্য তা কি চা-মিষ্টি বা কোনো রাজকীয় ভোগ মেটাতে পারে? পরে জানলাম ওর রোজাকার বরাদ্দ খাবার ভাগ করে খায় ও আর ওর পোষা কুকুর আর বিড়ালেরা। বিষ্ণু এতটাই নিজেকে আলগা করে নিয়েছে মানুষের সমাজ থেকে পশুর সমাজে! নাকি উল্টোটা?

ওর জন্যে আমার ব্র্যান্ডের সিগারেট নিয়ে গিয়েছিলাম। ওর হাতে দিলাম। বিড়ি খায় এখন ও। আমি জানতাম না। তবু দুজনে বসে একটার পর একটা সিগারেট টানলাম উঠোনভর্তি উৎসুক মানুষের ভিড়েই। বিষ্ণুই জ্বালিয়ে দিল আমার ঠোঁটের সিগারেট। আমার ঠোঁট আর চোখ দুই-ই জ্বলতে থাকল। কিন্তু এতো মানুষের মাঝখানে কাঁদাটাও যে শহুরে সভ্যতা নয়!

বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যাওয়া ‘ভোরের মন্দির’ (যুক্ত থেকে প্রকাশিত বিষ্ণুর কবিতার বই) রানা (নিশাত জাহান রানা) ওর হাতে তুলে দিল। ওকে পড়তে বলা হল। তবু কথাহীন। বইগুলো উল্টেপাল্টে দেখলো শুধু। কিছু জিজ্ঞেস করলেই আমাদের হতাশ না করতে একটুখানি হাসছে শুধু। ওটুকুতেই ওর সব আবেগ, আনন্দ আর ভালবাসা আমাদের বুঝে নিতে হচ্ছে। রানাকে বই এগিয়ে দিয়ে পড়তে ইশারা করল। রানা পড়ছে বিষ্ণুর কবিতা, বিষ্ণুর জন্যে। রানা কাঁদছে, আমি কাঁদছি।

বিষ্ণু লেখাপড়া জানে? তার লেখা বই ছাপার অক্ষরে বেরিয়েছে? চোখের সামনে দেখেও বিশ্বাস অবিশ্বাসের মুগ্ধতা আর বিস্ময় নিয়ে পাড়ার মানুষের কাছে সম্মানিত আর দর্শনীয় হয়ে উঠল বিষ্ণু। এতে যদিও তার কিছুই যায় আসে না।

এই ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা পাড়াতুতো মাসী, কাকী, দিদি, দাদারা পড়তে জানে না অনেকেই তবু এই ভর-দুপুরেও হাত থেকে হাতে ঘুরতে লাগলো ‘ভোরের মন্দির’। আর এর স্রষ্টা পাথরের ঈশ্বরের মতই নিশ্চল, নিশ্চুপ। সব গ্রামীণ সংস্কার ভব্যতা অগ্রাহ্য করে বিষ্ণুর হাত ধরে বসে আছি। আঙুলগুলো শুকিয়ে গেছে। লম্বা নখ দু’হাতেই। আমি ওর নখ কেটে দিতে চাইলে মাথা নেড়ে না বললো। ও যেন কারো কাছ থেকেই কিছুই নেবে না। ও একানড়ে হয়ে থাকবে। ওর কাউকে চাই না। কিচ্ছুকে না।

download

মাঝখানে আমি নিজেই রানা ছাড়া কারোর কোনো খোঁজ জানতাম না। থাকতাম এক জেলা শহরে। ইউনিভার্সিটি ছাড়ার পরে কুড়ি বছর পর পাকাপকি ২০১১তে ঢাকা চলে এলাম। রানার কাছে জানলাম সব বৃত্তান্ত। বিষ্ণু হারিয়ে গেছে। খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু ওর কিছু কবিতাতো আছে! সেই ভাবনা থেকে খুঁজে পেতে রানা ওর কবিতাগুলো সংগ্রহ করে নিজের প্রকাশনা সংস্থা (যুক্ত) থেকেই বইমেলার আগেই ছাপিয়ে ফেলল ‘ভোরের মন্দির’। সুব্রত (সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ)-র কাছেও বিষ্ণুর কিছু কবিতা ছিল, রানাকে পৌঁছে দিল সেগুলো। তখনও বিষ্ণুর খোঁজ জানি না আমরা। ও কোথায় আছে বা আদৌ বেঁচে আছে কি না।

একদিন যুক্তর অফিসে রানা আমাকে কাছে ডেকে ফেইসবুকের একটি ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এটা কি বিষ্ণুর ছবি বলে মনে হয়?”

ছবিটির সাথে কোত্থাও আমার চেনা বিষ্ণুর মিল নাই, শুধু খানিকটা বাঁকা হয়ে দাঁড়ানোর ভঙ্গিটুকু ছাড়া। দেখে মনে হল, ও বিষ্ণু। এরপর রানা সব খোঁজখবর বের করলো। বিষ্ণু বারাসাতের কাছে…

আমরা দুজনে ভিসা করতে দিলাম। বেরিয়ে পড়লাম বিষ্ণুর ঠিকানায়।

বিষ্ণু হারিয়ে যায়নি, বিষ্ণু বেঁচে আছে, বিষ্ণুর সাথে দেখা হবে এসব সাতপাঁচ ভাবছি আর অন্য আরেক দেশে পাড়ি দিচ্ছি। দমদম থেকে বারাসাতে সুশীল দা’-র বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। ঠিকানা জেনে নিয়ে ভোর-ভোর রওনা হব। এর মাঝেই রানার সাথে নানাজনের কথা হচ্ছে ফোনে। বিভাস (কবি বিভাস রায় চৌধুরী, তখনও আলাপ হয়নি) নামে একজন জানালো সে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করবে পথ চিনিয়ে দিতে। সুশীল দা’ আমাদের পথ প্রদর্শক, বন্ধু, আশ্রয়দাতা।

পরদিন ভোরে বারাসাত থেকে ট্রেনে…। স্টেশান থেকে বাস-স্টপ। সেখানে বিভাসের সাথে বাসে করে না আকাশ না পাতাল মাথায় করে বিষ্ণুর ঠিকানায়।

ওখানেই পরিচয় হল মিতুল (মিতুল দত্ত), গৌতম (কবি গৌতম চৌধুরী) দা, মৃদুল (কবি মৃদুল ) দা’র সাথে।

আমরা দুদিন ছিলাম ওর কাছাকাছি।  সেসব অনেক কথা অনেক গল্প! ফের একদিন বসব ওর ভাবনা নিয়ে যদি সময় আমার কাছ থেকে বিষ্ণু ভাবনাটুকুনও কেড়ে না নেয়।

[ বাংলাদেশর কবিতায় বিষ্ণু বিশ্বাস আশির দশক থেকে খুব পরিচিত একটি নাম। প্রায় দেড় যুগ নিখোঁজ ছিলেন। ধারণা করা হয়, মানসিক ভারসাম্যহীনতা, উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়া সাম্প্রদায়িকতার বিষ, সাহিত্যের অপরাজনীতি ইত্যাদি তার নিখোঁজ হওয়ার অন্যতম কারণ। প্রায় দেড় যুগ পর তাকে খুঁজে পাওয়া যায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। বর্তমানে তিনি বন্ধুদের তত্ত্বাবধানে পশ্চিমবঙ্গে চিকিৎসাধীন রয়েছেন]

*সংযুক্ত চিত্রসমূহ: গুগল আর্কাইভ

…………………

11751816_10207284202253928_7056894902542741376_n
।।নাহার মাওলা।। পর্যবেক্ষক, সংবাদপত্রকর্মী
Advertisements

3 thoughts on “বিস্মরণের বিষ্ণু বিশ্বাস :: নাহার মাওলা

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s