download
পিটার জুমথর

[পিটার জুমথর ১৯৪৩ সালের ২৬শে এপ্রিল সুইটজারল্যান্ডের ব্যাসেলে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা অস্কার জুমথর পেশায় ছিলেন একজন cabinet maker। পিটারও ১৯৬২ পর্যন্ত বাবার সাথেই কাজ করেন। এরপরে তিনি ১৯৬৩-৬৭ পর্যন্ত তিনি সেদেশেরই Kunstgewerbeschule বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। পরবর্তীতে ডিজাইন নিয়ে আরো পড়তে চলে আসেন নিউয়র্কের Pratt Institute- এ।১৯৬৭ সালেই পড়া শেষে দেশে ফেরত আসেন এবং সেখানে Department for the Preservation of Monuments  এ ভবন ও পরিকল্পনা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিশাবে যোগদান করেন। ফলে তিনি নানা ঐতিহাসিক স্থানের স্থাপনা গবেষণার সুযোগ পান আর সেগুলোর যথাযথ মেরামত ও সংরক্ষণে কাজ করেন।১৯৭৯ সালে তিনি নিজের একটা ফার্ম শুরু করেন যেখানে তিনি এখনো পর্যন্ত পনেরো সদস্যের একটি ছোট্ট দল নিয়েই কাজ করে যাচ্ছেন! দুই নাতি, তিন সন্তান এবং স্ত্রী নিয়ে এখন তিনি সুখী জীবনযাপন করছেন।

তাঁর রচিত Thinking Architecture বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালেএই গ্রন্থে পিটার মূলত তাঁর ভাষায় স্থাপত্যের দর্শন তুলে ধরেছেন। এ বই প্রসঙ্গে তাঁর কথায় সুর মিলিয়ে বলা যায়- আমার বিশ্বাস যে আজকের স্থাপত্যবিদ্যায় যা প্রয়োজন তা হলো সেই সকল সম্ভাবনাগুলির প্রকাশ পাওয়া, যা পরম্পরাগতভাবে তার নিজের। স্থাপত্যবিদ্যা আমাদের জন্য এমন কোন কোন বাহন বা চিহ্ন নয় যা আমাদের মূল থেকে বিচ্ছিন্ন। এমন এক সমাজ যেখানে অপ্রয়োজনীয়তাকে আর অযৌক্তিকতাকে উদযাপন করা হয়, সেখানে স্থাপত্যবিদ্যা- এর এক বিরোধী শক্তি হিশাবে বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারে। তখন অর্থহীন নানা কাঠামো নির্মাণের চিন্তা বানচাল করে দিয়ে সে নিজের ভাষায় দৃশ্যমান হয়ে ওঠার সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলে। আমার মতে স্থাপত্যবিদ্যার ভাষা কোন নির্দিষ্ট শৈলীর মাঝে সীমাবদ্ধ নয়।  প্রত্যেকটি ভবনকে নির্মাণের পিছনে নির্দিষ্ট ব্যবহার, নির্দিষ্ট স্থান এবং নির্দিষ্ট সমাজের গুরুত্ব রয়েছে।  আর সেইজন্যেই আমার তৈরি ভবনগুলো এই সমস্ত সাধারণ প্রশ্নের উত্তরে সূক্ষ্ম এবং সমালোচনাসূচক জবাব দেওয়ার চেষ্টা করে যায়।”

১৯৯৬ সালে তিনি Mendrisio এর  the Academy of Architecture, Universitá della Svizzera Italiana প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা শুরু করেন। ১৯৮৮ তে তিনি Los Angeles এর Southern California Institute of Architecture and SCI-ARC প্রতিষ্ঠানে আর ১৯৮৯ এ Munich এর Technische Universität এও অতিথি শিক্ষকের দায়িত্বও পালন করেছেন। ১৯৯৯ এ Harvard University এর  Graduate School of Design এ শিক্ষকতা করেন।তাঁর পুরষ্কারের ঝুলিতে রয়েছে- The Praemium Imperiale, Japan Art Association  এর পক্ষ থেকে ২০০৮ সালে;  The Carlsberg Architecture Prize, Denmark থেকে ১৯৯৮ সালে; the Mies van der Rohe Award পান ইউরোপে নানা স্থাপনার জন্য ১৯৯৯ সালে; Thomas Jefferson Foundation Medal in Architecture  পান University of Virginia এর পক্ষ থেকে; ২০০৮ সালে পান The American Academy of Arts and Letters bestowed the Arnold W. Brunner Memorial Prize in Architecture; ২০০৯ সালে পান Pritzker Architecture Prize; ২০১২ সালে পান Royal Gold Medal]

                                দ্য হার্ডকোর বিউটি

                                                     Blue line

 

download (1)
পিয়েৎ মন্দ্রিয়ানের আঁকা

সপ্তাহ দুই আগে আমি রেডিওতে আমেরিকান কবি William Carlos Williams (উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস) এর উপর একটা অনুষ্ঠান শুনি। অনুষ্ঠানটির নাম ছিল ‘দ্য হার্ডকোর বিউটি’। সেই থেকে এই  লাইনটা আমার মাথায় আঁটকে গেছে। সৌন্দর্যের যে একটা হার্ডকোর ব্যাপার থাকতে পারে এটা আমাকে রোমাঞ্চিত করে! আরো চমক পেলাম যখন ভেবে দেখি যে স্থাপত্যবিদ্যায় এই সৌন্দর্যের সাথে হার্ডকোর ব্যাপারটা আসলে যায়, মানে এ’দুয়ের মাঝে আসলেই একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাপার আছে।

‘যন্ত্র হলো এমন এক বস্তু যাতে কোন অপ্রয়োজনীয় উপাদান নাই’, এরকমটাই কবি উইলিয়াম বলেছিলেন বলে জানালেন রেডিও উপস্থাপিকা। আর তক্ষুণি ব্যাপারটা আমার কাছে জলের মত পরিষ্কার হয়ে যায় যে তিনি ঠিক কী বোঝাতে চেয়ে একথা বলেছেন। এটা একটা দর্শন যা Peter Handke (পিটার হ্যান্ডক)ও পরোক্ষভাবে বলেছেন বলেই আমার মনে হয়েছে। কারণ যখন পিটার বলেন, সৌন্দর্য আসলে একটা নৈসর্গিক ব্যাপার; এমন জিনিস সেখানে সে প্রস্তুত করে চলেছে যা কোন চিহ্ন বা বার্তা বহন করে না। সেইসাথে তিনি আরো জানালেন, যখন এসবের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হয়, তখন তার ভীষণ মেজাজ খারাপ হয়!

সেই রেডিও অনুষ্ঠান থেকে আমি শিখলাম যে কবি উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামসের কবিতাগুলির ভাবটা ছিল এমন যে, আসলে কোন বস্তুর কাছ থেকে কেবল তার অস্তিত্বটুকু ছাড়া আর কোন ধারণা পাওয়ার আশা না করাটাই শ্রেয়। এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত বস্তুকে যাতে কবি তাঁর শব্দের দ্বারা নিজের করে নিতে পারেন, সে জন্য সোজাসুজি তিনি তাঁর ইন্দ্রিয়ের উপলব্ধির উপর নির্ভর করেই লিখতে ভালবাসতেন।

ঐ অনুষ্ঠানের ঘোষক যিনি ছিলেন তিনি এটাও বললেন যে, উইলিয়ামের কাজগুলো খেয়াল করলে দেখা যায়, তা কেমন যেন আবেগহীন আর অল্প কথায় সারার মতন কবিতা। অথচ তাঁর লেখার মজাটাই এইখানে যে এই সমস্ত সূক্ষ্ম, স্পষ্ট আর মেদহীন লেখার কারণেই কিন্তু সেসব কবিতায় ছিল আবেগের শক্ত প্রভাব!  

সেটা শুনে আমি দারুন চমৎকৃত হই আর নিজ মনেই ভাবি, কোন স্থাপনাকে আবেগের সাথে না জড়িয়ে বরং আবেগকেই তার থেকে প্রকাশ পেতে দেওয়ার ব্যাপারটা মন্দ না! কোন বস্তু আসলেই যা, তার যতটা সম্ভব কাছাকাছি থেকে অর্থাৎ, তার মূলের কাছে থেকেই আমাকে তার গড়ন নির্ণয় করা উচিৎ। কারণ সেটাই তো নৈসর্গিক! আর নিদেনপক্ষে এতখানি নিশ্চিত থাকা দরকার যে এই ভবন আর তার ব্যবহারিক প্রয়োগের জন্য যতখানি জায়গার দরকার, ঠিক ততখানিই তাকে দিয়ে দেওয়া। তাহলে সে নিজে থেকেই নিজের দৃঢ়তা খুঁজে পাবে আর আলাদা করে শৈল্পিকতার দরকার পড়বে না। আপনা থেকেই সেটা চলে আসবে।

দ্য হার্ডকোর বিউটিঃ পরিশুদ্ধ পদার্থ  

অথচ কেন স্থাপত্যবিদ্যায় সেই বস্তুগুলোকে প্রায় জোর করেই আনা হচ্ছে, আর কেনই-বা তা ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা এবং যৌক্তিকতার বিন্দুমাত্র গভীরে না যেয়েই তাদের ভাগ্য নির্ধারিত করা হচ্ছে?

Italo Calvino  (ইটালো ক্যাল্‌ভিনো) তার Lezioni Americane (লেজিওনি আমেরিকান) গ্রন্থে আমাদের ইতালিয়ান কবি Giacomo Leopardi (গিয়াকোমো লিওপার্দ) এর সাথে পরিচিত করান যাঁর দৃষ্টিতে সৌন্দর্য হলো একটা কলা বা আর্টের বিষয়। তাই তাঁর ক্ষেত্রে সাহিত্যের সৌন্দর্যটি হলো এর বিমূর্ততায় আর এর অনির্দেশ্যতায়। কারণ, এখানে অবয়বটা ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে ওঠে এই সাদামাটা সহজের মতন জটিল ব্যাপারটাসহ আরো নানাকিছু।

11836930_10207331646480004_9210634782628670897_nলিওপার্দের কথাগুলো কিন্তু বেশ মনে ধরার মতন। আর্টের কাজে ব্যবহৃত বস্তুগুলো আমাদের উপর বহুমুখী প্রভাব ফেলে। তাদের অসংখ্য আর খুব সম্ভবত অন্তহীন অর্থ দাঁড় করানো যায়। যারা একে অন্যের উপর দিয়ে লেপ্টে যায়, আবার কখনো প্রভাবিত হয়ে সেই পথেই নিজেরা পাল্টে যায়, ঠিক যেরকম করে আমরা নিজেদের পর্যবেক্ষণের প্রক্রিয়া পাল্টে ফেলি।কিন্তু একজন স্থপতি কি করে এই গভীরতা আর প্রাচুর্যতাকে একটা ভবনের মাঝে ফুটিয়ে তুলবেন? এই বিমূর্ত ব্যাপারটা কী ঠিক পরিকল্পনা করে করা সম্ভব? তখন কি এটা উইলিয়ামের শুদ্ধতার সংজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করছে না?

কালভিনো কিন্তু লিওপার্দের একটা লেখা থেকে এর এক চমৎকার সমাধান বের করেছেন। লিওপার্দের লেখায় কালভিনো আবিষ্কার করেন, এই বিমূর্ততার প্রেমিক আসলে এক ক্রিয়াশীল বিশ্বস্ততাকে উন্মোচন করে তার যাদুময়ী বর্ণনায় আমাদের ধ্যানমগ্ন করে রাখেন। তাহলে লিওপার্দে বস্তুত সেই সৌন্দর্যের কথাটাই জোর দিয়ে বলতে চেয়েছেন যেটা অমীমাংসিত এবং অস্পষ্টতার মধ্য দিয়ে আমাদের আনন্দ দিয়ে চলেছে। তিনি যথার্থতা এবং দার্শনিকতা ব্যাপার দুটির প্রত্যেকটিকেই একটি ছবিতে চূড়ান্তভাবে আশা করেছেন। ‘খুঁটিনাটি নানা ব্যাপারে সতর্ক থেকে বস্তু বাছাই করা আর সেই সাথে আলো আবহাওয়াটাও যথাযথ ভাবেই করা, যাতে করে কাঙ্ক্ষিত সেই বিমূর্ত ভাবখানা অর্জন করা সম্ভব হয়ে ওঠে’ একথা বলেই তিনি ব্যাখ্যার ইতি টানেন। এক্ষেত্রে কালভিনো কিন্তু স্ববিরোধী হয়েও সত্য কথাটাই বলেছেন, ‘বিমুর্ততার কবিই কেবল শুদ্ধতার কবি হতে পারেন!’

কালভিনোর এই ব্যাখ্যায় আমার যেটা ভাল লাগলো তা হলো, না এই শুদ্ধতার সংজ্ঞা, না সেই নিখুঁত কাজ যার সাথে আমরা বেশ পরিচিত; বরং এই যে বস্তুর একদম নিজের থেকেই বয়ে আসা আভিজাত্য আর আধিক্যের ব্যঞ্জনাটা মনোযোগের সাথে খেয়াল করা এবং তাদেরকে তাদের উপযুক্ত মর্যাদা দেওয়ার মত ভাবনাটা। যদি সমগ্র ব্যাপারটাকে স্থাপত্যবিদ্যার আলোকে চিন্তা করি, তবে তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে ক্ষমতা আর প্রাচুর্য, এ দুই বিষয় অবশ্যই সেই ধারণার উপর ভিত্তি করেই করা উচিৎ যার জন্য এই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে, যার দ্বারা একে বানানো হবে।

John Cage (জন কেজ) তাঁর এক লেকচারে বলেন, তিনি এমন একজন সুরকার নন যিনি তাঁর মননে কোন সুরের হদিস পান আর তা চট করে লিখে ফেলেন। এই ব্যবস্থা পরিচালনার অন্য আরেক উপায় তার জানা আছে। তিনি পুরা ব্যাপারটার ধারণা আর তার কাঠামো নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেন আর এটুকুন করেই তিনি শব্দগুলোকে নিজেদের মতন ছেড়ে দেন। ফলত তারাও দারুনভাবে সেই ধারণাকে অনুসরণ করে বেজে চলে। যার দরুন মন-মাতানো সুরের সৃষ্টি হয়!

এই লেখা পড়ার পর থেকে মনে হচ্ছিল কীভাবে সম্প্রতি আমরা, আমার স্টুডিওতে পাহাড়ের উপরে করতে হবে এমন এক থার্মাল বাথের (Thermal Bath) ডিজাইন (Design) ডেভলপ (Develop) করলাম। প্রকল্পটি পাওয়ার পরপরই মাথায় যেমন আকৃতির চিন্তা এলো সেটাকে অনুসরণ করে নয় বরং কিছু মৌলিক প্রশ্ন ধরে ধরে আমরা এগোতে থাকি আর সেরকম করেই ডিজাইনের নানা সিদ্ধান্ত নিতে থাকি। যেমন, যেই সাইট দেওয়া আছে এর মাঝে কোথায় ভবনের জায়গাটা হলে ভাল হয়, এই ভবনের উদ্দেশ্য কী, কী কী বস্তুর সংমিশ্রণে এদের বানানো হবে, পাহাড়ের সাথে সেগুলো কীভাবে যাবে, পাথর আর পানির ব্যবহারটা ঠিক কী উপায়ে করলে সবচেয়ে ভাল ফল হবে- মানে প্রকল্পের সেই পর্যায়ে ভাবা বা কাজ করা যেখানে তখনো স্থাপত্যবিদ্যার দৃশ্যগত শুরুটাই ঘটেনি।

11214311_10207331647480029_1353314493562214442_n

অথচ গোটা সাইটে সেই দৃশ্যগত ব্যাপারটা কিন্তু তখনই আশ্চর্যভাবে ফুটে উঠলো যখন ধাপে ধাপে আমরা সাইট সংক্রান্ত বা কী কী বস্তু ব্যবহার করা উচিৎ এই প্রকল্পের স্বার্থে আর কী রকম কাঠামো হওয়া উচিৎ এর সঠিক জবাবগুলো পেতে থাকলাম। এই পুরো প্রক্রিয়াটা আমাকে দারুণভাবে বিস্মিত করেছিল। কারণ আমার বিশ্বাস আর যেকোনো চোখ-ধাঁধানো আকৃতির চেয়ে এই প্রক্রিয়ার ফলে দাঁড়ানো কাঠামোর সম্ভাবনা হবে সবচাইতে বেশি।  পর্বত, শিলাখণ্ড এবং পানির যে পরম্পরাগত নীতি তাদেরকে বজায় রেখে ভবনের সাথে ব্যবহারোপযোগী করে তুলতে পারাটা কিছুটা আদিমতার আবার ‘নৈসর্গিক নির্মলতা’ বোধের একটা সুযোগ করে দেয়। এবং এই সমস্ত বস্তু স্থাপতবিদ্যায় প্রয়োগ করার মধ্য দিয়ে তা যেন একটা নিরেট আকৃতির কাঠামো থেকে প্রকৃতিতে প্রবেশ করলো, বা বলা ভাল ফেরত গেল। আগে থেকেই ভেবে রাখা প্রকল্পের রূপরেখা কিংবা মন ভোলানো স্টাইলিস্ট আকৃতি কেবলমাত্র লক্ষ্যে পোঁছাতে অক্ষম করতেই সক্ষম।

আমার সুইস বন্ধু Herzog (হেযোগ) আর de Meuron (দে মেউরন ) বলেন যে, স্থাপত্যবিদ্যা আজ আর সকল কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। তাই সে অনুসারে একে কৃত্রিম রূপেই তৈরি হতে হবে ডিজাইনারের কল্পনায়, সূক্ষ্ম ভাবনার একটি ধাপ হিশাবে। এই দুই স্থপতি তাদের এইরূপ ধারণা থেকেই স্থাপত্যবিদ্যার যে তত্ত্ব বার করেছেন তা হলো, সমগ্র বিষয়টি আসলে চিন্তার আকার। আমার মতে একজন স্থপতির উচিৎ আবেগকে নাকচ করে এই সার্বজনীন ব্যাপারটাকে এক বিশেষ ভঙ্গিমায় ফুটিয়ে তুলতে পারা।  

আমার বন্ধু স্থপতিদ্বয় ‘চিন্তার আকার’ বলে স্থাপত্যবিদ্যার যে তত্ত্বটি বার করেছেন আমি ঠিক সেই ধ্যান ধরাণার অনুসারী নই। তবে যেই ধারণার উপর ভিত্তি করে এই তত্ত্ব এলো অর্থাৎ ভবন বা স্থাপনা যে এখন কেবল আর বিচ্ছিন্ন কিছু নয় তার সাথে আমি সম্পূর্ণরূপে একমত।

ব্যক্তিগতভাবে এখনো আমি কোন স্থাপনার প্রয়োজনীয়তার প্রতি একক নির্ভরতায়, সমষ্টিগত নির্ভরতায়, বিশ্বাস করি। তা কঠিন হয়ে থাকলে থাক, আমার কাজের লক্ষ্য, তাকে কঠিন না রেখে সহজ হতে দেওয়া, অর্থাৎ নৈসর্গিক হতে দেওয়া, আর নিঃসন্দেহে সেটাই স্বাভাবিক। তারপরেও কি করে আমরা এই সার্বজনীনতাকে একই সময়ে অর্জন করতে পারি? যা এক ঐশ্বরিক অর্থ বহনে সক্ষম, সেই সঙ্গে বাস্তবে সেই স্থাপনা নিজেই যেন গায়েব হয়ে স্বল্পকালীন অথচ এক অন্তহীন পরিবর্তনশীল পরম্পরার চিহ্ন এবং চিত্র বহন করতেও সক্ষম!

পিটার হ্যান্ডকে তার প্রচেষ্টার কথা লেখনিতে বর্ণণা করেন যে কী করে চারপাশের পরিবেশকে তারা ডিজাইনের সাথে সম্পর্কিত করেছেন। তাঁকে যদি আমি খুব ভুল বুঝে না থাকি তাহলে শুধুমাত্র কৃত্রিম উপায়ে তৈরি কৃত্রিম স্থাপনার কৃত্রিমতা বর্জনের দ্বারা সেটাকে সাধারণ, স্বাভাবিক নৈসর্গিক পরিবেশে আনয়নের জন্য আমার জানা যাবতীয় ধ্যান ধারণাকে পুঁজি করেই আমি এর সামনা করবো না বরং এই বিশ্বাসকেই আঁকড়ে ধরে সামনা করবো যে বস্তুর নিজের মাঝেই কেবল তার আসল সত্যটা নিহত।আমার বিশ্বাস এই শৈল্পিক প্রক্রিয়াসমূহ আদতে সেই সার্বজনীনতার জন্যই প্রাণপণে চেষ্টা করে। তারা সর্বদায় চায় যে তাদের সৃষ্ট কর্ম একটা নৈসর্গিক পরিবেশের স্বাদ বহন করবে।

অনুরূপভাবে, আমি হ্যান্ডকে কে বুঝতে পারছিলাম বলেও মনে হচ্ছিলো। ঐ একই সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেকে একজন ‘স্থানের’ (place) লেখক হিশাবে উধৃত করলেন, যেখানে তাঁরই লেখায় প্রকাশ পাচ্ছে, ‘কোন জটিল সত্যকে বাস্তবে রূপায়নের ক্ষেত্রে তাতে ব্যবহৃত  বস্তুর মাঝে আরোপিত কিছু থাকবেনা, কিন্তু একটা সচেতন নিখুঁততা তাদের অন্তঃসংযোগে বজায় থাকবে’।

যে শব্দটিকে হ্যান্ডকে মর্যাদা দিতে চেয়েছেনে যাকে আমি এখানে বলছি ‘জটিল সত্য’, এটা আমার কাছে পুরো বিষয়টা বোঝার ক্ষেত্রে বেশ অর্থপূর্ণ বলেই মনে হয়েছে। সেই সকল সঠিক সত্যের ঝাঁপিকে এক জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। ভবনকে একটা জটিল বিষয় হিশাবে দেখা হোক তাতে সমস্যা নাই, কিন্তু এর নানা খুঁটিনাটিকে সঠিক রূপে যাচাই বাছাই করা হোক, আর সে অনুসারেই তাদের মিলন ঘটানো হোক, অর্থাৎ সেই সত্যেগুলির মিলন। সতরাং, যে ব্যাপারটা এখানে গুরুত্ব পাচ্ছে তা হলো, মূল বস্তু থেকে মেদ ঝরিয়ে ফেলাটা। এক্ষেত্রেও হ্যান্ডকে বলেছেন, বস্তুর প্রতি বশ স্বীকার করতে। তিনি আরো বলছেন, কোন স্থান নিজেই যা বলছে তা শুনে অভিজ্ঞ হও, আলাদা করে রঙ চড়ানোতে কান দিওনা।

যখন আমি সাম্প্রতিককালের স্থাপত্যবিদ্যাকে নিবিড়ভাবে অবলোকন করি, তখন প্রায়শই নানা অস্বস্তিকর ঘটনার মুখোমুখি আমাকে হতে হয়। তার সামনা করতে এই সমস্ত মতবাদ আমাকে সাহায্য করে। আমি ধীরে ধীরে সেই সকল ভবনের দিকে যেতে থাকি যাদেরকে নিষ্ঠার সাথে ডিজাইন করে আকৃতি প্রদান করা হয়েছে একটা সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে। আর তখন আমি নিজেকে তাদের মাঝে নিবিষ্ট করে ফেলি। যেই স্থপতি এর জন্য দায়ী তিনি আমার সামনে নেই, অথচ আমার সাথে অনবরত কথা বলে যাচ্ছেন তার ভবনের প্রতিটা খুঁটিনাটি কাজের মধ্য দিয়ে। আবার যখন তিনি একই কথা বলতে থাকেন তখন খুব দ্রুতই আমার আগ্রহ ফুরিয়ে আসে। ফলে খুব সহজেই সেখান থেকে আমার মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। একটা ভাল স্থাপনার বৈশিষ্ট্য হলো, তা যেন সাধারণের বন্ধুসুলভ হয়। যাতে সেই জায়গার অভিজ্ঞতাটা সে সুন্দর করে নিতে পারে আর তার মাঝেই প্রাণবন্ত হয়ে থাকতে পারে। তাই বলে ভবন যে সর্বদাই নানা ধরণের কথা বলে নানা অভিজ্ঞতাই কেবল দিয়ে যাবে ব্যাপারটা ঠিক তাও নয়, সাধরণের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ হওয়ার লক্ষ্যে তাকে কিছু বিরতিও দেওয়া লাগে।

আমার কাছে মনে হয়, ভবনের এক আশ্চর্য সুন্দর নীরবতা আছে। যেন কেউ আত্ম-সংবরণ করে রয়েছে, টেকসই হয়ে নিজের প্রমাণ নিয়ে মূর্তিমান অখণ্ড রূপে যেন কেউ বসে রয়েছে একইসাথে ইন্দ্রিয়নিষ্ঠ আর নিদারুন উষ্ণতা সহকারে। যে ভবনের মাঝে তার স্বকীয়তা বিদ্যমান, সেটিকেই কেবল ভবন বলা যায়। সে আর অন্যকিছুকে উপস্থাপন করছে না, সে কেবল নিজেতেই মগ্ন!

বল, যে এটা এক অসমাপ্ত ছাঁপ, কালো কি লাল,

হাল্কা গোলাপি হলদে, কমলা, সাদা, যেমন কড়া রঙে তারা থাকে

এ ঘরের ভিতরে আসা সূর্যের আলোয় যাতে-তাতে বদলে যেতে;

ততটাই কড়াভাবে তারা রূপকে পাল্টে যায়

অধীর এক মোহে, যা বাস্তবতার চেয়েও সত্য

সেখানে কল্পনার শক্তিতে সত্যিগুলো হয়ে ওঠে অবান্তর

টা হলো Bouquet of roses in sunlight (রোদের আলোয় একগুচ্ছ গোলাপ) কবিতার শুরুর কতগুলো চরণ। আমেরিকান চিন্তক, গীতিকার Wallace Stevens (ওয়ালেস স্টিভান) এর লেখা।

8970574492_e16f97515a_b
পিটার জুমথরের পরিকল্পনা

ওয়ালেস স্টিভানের কবিতা সংকলনের সূচনায় আমি পড়লাম, দূরদর্শী হওয়ার পাঙ্গাকে গ্রহণ কর। ধৈর্যের সাথে, আর একদম পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে কোন বস্তুকে বুঝে বুঝে আবিষ্কার কর। তাঁর কবিতাগুলি কবিতা লেখবার কোন নিয়ম ভাঙার বিরুদ্ধতা কিংবা দোষারোপ করে না, আবার তাতে যে কোন আতংকের আভাস রয়েছে এমনটিও নয়। কিন্তু তার কবিতাগুলো একধরনের ছন্দের জন্য হন্যে হয়ে থাকে, যেটা অন্য কবিতার ক্ষেত্রেও ভীষণভাবেই সম্ভব। তবে বিশেষ করে তার ক্ষেত্রে এটিই একমাত্র কবিতার আবেদন। (ক্লাভিনো অবশ্য এর চেয়ে আরেক কাঠি সরেস। তিনি তার সাহিত্য-কর্মকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টায় বলছেন যে, তার একমাত্র হাতিয়ার হলো তিনি তার আশেপাশে যা দেখছেন, তার আকৃতি শুন্যতার বিরুদ্ধচারণঃ এটিই তার সাহিত্য ভাবনা।)

স্টিভানের বাস্তবতা হলো একটা লক্ষ্যে পৌঁছানর বাসনা। পরাবাস্তবাদ (surrealism),  ততদিনে ঘটে গেলেও সেটা তাঁকে মুগ্ধ করতে পারেনি। খুব সম্ভবত কোনোরূপ উদ্ভাবন ছাড়াই হুট করে একে আবিষ্কার করে গ্রহণ করার জন্য। তাঁর মতে, একটা ঝিনুক যে সরু ভাঁজের কোন পৃষ্ঠতলের উপর নাচছে এমনটা দেখাতে হলে তার জন্য উদ্ভাবনের প্রয়োজন, আবিষ্কারের নয়। আর তাই এটা আরো একবার জেগে উঠলো, এই মৌলিক চিন্তার জায়গাটা যেটা আমার মনে হয়েছে উইলিয়াম, হ্যান্ডকের কথায় আমি পেয়েছি। আবার এডওয়ার্ড হপারের করা চিত্রকর্মেও এই একই জিনিসের আভাস পেয়েছি- কেবল বস্তুর সত্যিকে জেনে, তা থেকে কল্পনার স্ফুলিঙ্গ দিয়ে শৈল্পিক আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মত ঘটনা!

যদি আমি এই মতবাদকে স্থাপত্যবিদ্যার ভাষায় অনুবাদ করতে চাই, তাহলে আমি এভাবেই বলবো যে একটা সার্থক ভবনের স্ফুলিঙ্গ একমাত্র তখনি আগুন ধরিয়ে দিতে পারে যখন তা বস্তুর বাস্তব রূপের অধিকারভুক্ত হয় এবং কল্পনারও। আর এটা আমার কাছে এখন আর কোন গুপ্ততথ্য নয়, বরং এমন কিছুর নিশ্চয়তা যার জন্য আমি আমার প্রতিটি প্রকল্পে লড়াই করে যাই, আর একটি ইচ্ছাপূরণের নিশ্চয়তা খুঁজি, যা আমি হৃদয়-মন্দিরে বপন করে রেখেছি।

এই শেষবারের মত আবার সেই প্রশ্নে ফেরত আসাঃ কোথায় আমি সেই বাস্তবতা খুঁজে পাবো, যেখানে কোন নির্দিষ্ট ভবনকে বানানোর লক্ষ্যে, তার সাইট বা জায়গা আর উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করতে গেলে আমাকে কল্পনার আশ্রয় নিতে বাধ্য হতে হয়?

এক চাবি ঘুরিয়ে এই তালাবদ্ধ প্রশ্নের জবাব পাওয়া সম্ভব, আমি ‘জায়গা’ এবং ‘উদ্দেশ্য’ এই দুই শব্দে আর তাদের কার্যপদ্ধতিতে বিশ্বাস করি।

hhhhhhhhhhhhhhhh
পিটার জুমথর

Martin Heidegger (মার্টিন হাইডেগার) তাঁর ‘Biulding Dwelling Thinkin ‘ (বিল্ডিং ডুয়েলিং থিঙ্কিং) শীর্ষক একটা রচনাতে লিখেছেনঃ ‘বস্তুর মাঝে থাকাই হলো মানুষের অস্তিত্বের মূল বুনিয়াদ’। যার অর্থ আমার কাছে এমন মনে হয়েছে যে, আমরা আসলে কখনই একটা বস্তুগত জগত ভিন্ন অন্য কোন এক বিমূর্ত জগতে বাস করি না। এমনকি যখন আমরা কল্পনা করি তখনো এই বস্তুগত জগতের বাইরে ভাবি না। হেইগার আরো বলেন, ‘মানুষের সাথে স্থানের সম্পর্ক এবং তার মধ্য দিয়ে স্থানের সাথে কালের সম্পর্ক নির্ভর করে সেই মানুষ আর তার চারিপাশ নিয়ে আবাসের আচরণের উপর’।

হাইডেগার তাঁর বিস্তৃত চিন্তায় আবাসের যে ধারণা দিয়েছেন, তাতে আমি যা বুঝতে পারি, কোন স্থাপনায় বসবাস করা এবং চিন্তা করা সেই জায়গায় আর কালে থেকে, এই কতগুলো পয়েন্ট আসলে আমাকে একজন স্থপতি হিশাবে যথাযথ সূত্রটি ধরিয়ে দিয়েছে।

বস্তু থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াটা তত্ত্বের বাস্তবতা নয়। একটা কংক্রিটের ভবনকে বসবাসযোগ্য হিশাবে গড়ে তোলাটাই বরং আমার কাছে বেশি রোমাঞ্চকর। যার মাঝে আমি আমার কল্পনার ক্ষমতাকে কাজে লাগাতে পারি, সেটাই বরং বাস্তবতা। ভবনের বস্তুগত উপাদানের এই হলো বাস্তবতা- পাথর, কাপড়, স্টিল, চামড়া…- এবং সেই কাঠামোগত বাস্তবতা যা আমি তৈরি করতাম। সেটা যারই সম্পত্তি হোক না কেন, আমি খুব করে চাইতাম তাকে আমার কল্পনার আদলে ফুটিয়ে তুলতে! এর থেকে কোন এক অর্থ বার করতে, আর ইন্দ্রিয়নিষ্ঠ কিছু যেন সেই ভবন বহন করে, যাতে করে একটা সার্থক ভবনের স্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি হয় আর কিছুটা না হয় আগুনের ফুলকিও বার হলো তা থেকে! সোজা কথায় এমন একটা ভবন যেটা কিনা মানুষের জন্য আবাস হিশাবে নির্ভুলভাবে কাজ করে।

স্থাপত্যবিদ্যার বাস্তবতা হলো যে, এ এক কংক্রিটের দেহ। নানা আকৃতি, নানা আয়তন, নানা ধরনের জায়গা এবং কাল এক হয়ে এসে এই দেহ তৈরি করে। তাই বলাই বাহুল্য সেখানে বস্তুবিহীন আর কোন ধারণাই থাকবে না।

1797415_10204218097446503_304113502014913999_n
।।সুপ্রভা জুঁই।।শিক্ষার্থী স্থাপত্যবিদ্যা, এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়।

 

  

Advertisements