11787424_724074874389021_26744413_n
আলোক সরকার

[কথা হচ্ছিল বাংলাদেশের দুই তরুণ-তুর্কির সাথে। ‘নকটার্ন’ নামে একটি কবিতাকেন্দ্রিক পত্রিকার (আন্তর্জাল) সম্পাদনা করে চলেছেন বেশ কিছুদিন। তো একদিন কথা হচ্ছিল দুপার বাংলার কবি ও লেখকদের বইপত্র আসা-যাওয়া নিয়ে। সত্যি কথা হল, এপারের অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের কবি লেখকরা যতটা ওপারে গিয়ে পৌঁছেছেন তার ভগ্নাংশও  ওপার থেকে  এপারে এসে পৌঁছয় না কোনো এক অজ্ঞাত রহস্যময় কারণে। সুনীল-শক্তি থেকে ভাস্কর, উৎপল কুমার, জয়, রণজিৎ থেকে জহর সেন মজুমদার পর্যন্ত ওপারে বহুল-পঠিত বলেই মনে হয়। অন্তত সামাজিক মাধ্যমগুলিতে বিভিন্ন আলোচনা সূত্রে এঁদের রচনাংশ প্রায়শই উদ্ধৃত হতে দেখা যায় বাংলাদেশের বন্ধুদের কলমে। তো খুব ভালো হয়, যদি আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে একতরফা পদ্ধতিটির মূলে যে রহস্যময়তা, তাঁকে পাত্তা না দিয়ে, যদি আমরা সামাজিক মাধ্যমগুলিতেই এই আলোচনাগুলি চালাতে থাকি। অর্থাৎ বাংলাদেশের অন্তর্জাল পত্রিকাগুলি যেমন এপারকে জানতে ও জানাতে  আগ্রহী, তেমনি এদিকের অন্তর্জাল মাধ্যমগুলিও সেই অভাব পূরণ করুক। ছাপানো পত্রিকা বা বই এর ক্ষেত্রে যে অসুবিধা, এখানে সেই বাধা হয়তো ডিঙানো যাবে কিছুটা। যদিও অন্তর্জালের সুযোগ এখনো বেশীর ভাগ মানুষের হাতে নেই আমরা জানি।

তবু, আরো যেসকল বাংলা ভাষার কবিজন এপার-ওপার কোথাও সেভাবে পৌঁছচ্ছেন না, তাদের কথা কিছু বলা দরকার। যদিও এমন কি সকল তরুণ কবিতা লিখিয়েরা কতখানি প্রয়াস পাবেন এই সমগ্রকে ধরতে সেও এক প্রশ্ন। কারণ আমাদের মস্তিষ্ক জুড়ে কায়দার কবিতা!

‘কবিতা’র কোনো সংজ্ঞা হয় না, একথা আমরা বলে থাকি প্রায়শই। তথাপি কবি ও গুণীজন অনেকেই ‘কবিতা’ কি বস্তু তার নানা ইঙ্গিত ও ইশারা রেখে গেছেন । খুব বেশী পড়াশোনা না করেও অন্তত জীবনানন্দ প্রণীত ‘কবিতার কথা’ নামের একটি আস্ত পুস্তকের কথা আমরা জানি। সেখান থেকে একটু পাঠ নেওয়া যাক বরং— সৃষ্টির ভিতর মাঝে মাঝে এমন শব্দ শোনা যায়, এমন বর্ণ দেখা যায়, এমন আঘ্রাণ পাওয়া যায়, এমন মানুষের বা এমন অমানবীয় সংঘাত লাভ করা যায়; কিম্বা প্রভূত বেদনার সঙ্গে পরিচয় হয়, যে মনে হয় এই সমস্ত জিনিসই অনেকদিন ধরে প্রতিফলিত হয়ে কোথায় যেন ছিল; এবং ভঙ্গুর হয়ে নয়, সংহত হয়ে, আরো অনেক দিন পর্যন্ত, হয়ত মানুষের সভ্যতার শেষ জাফরান রৌদ্রালোক পর্যন্ত, কোথাও যেন রয়ে যাবে; এই সবের অপরূপ উদ্গীরণের ভিতর এসে হৃদয়ে অনুভূতির সৃষ্টি হয়

আমরা আপন আপন সাধ্য মতো তাঁর ইশারা ও ইঙ্গিত বুঝেছি, তারপর বলেছি “কবিতার কোনো সংজ্ঞা হয় না”। আর এই অসংজ্ঞার ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছি ‘কায়দা’! এখন কবিতার চেয়ে বেশী এই কায়দাগুলোকে দেখিয়েও বলা হচ্ছে– এসব সংজ্ঞাতীত পরম ব্রহ্ম!

এখন কথা হল যা কিছু কবিতা, তাকে ভাঙলে আমরা কি পাবো? উত্তর হল— কিছুই না। এমন কি কবিতা পোড়ালে তার অবক্ষেপ হিসেবেও কিছু পড়ে থাকে না। আর তখনই তা হয়ে ওঠে পরম, অদাহ্য। শুধু পাঠক তা হৃদয়ঙ্গম করার পর কখনো কখনো হয়তো-বা এক ব্রহ্মাণ্ডব্যাপী মহাশূন্যের নিচে নিজেকে একাকী আবিষ্কার করে কিঞ্চিৎ থমকে দাঁড়ায় । হয়তো এটুকুই।

কথা হল ওপারে যারা পৌঁছেছেন তার চেয়ে আরো অনেকেই পৌঁছলেন না সেভাবে। অথচ এঁদের আরো আগেই সামগ্রিকভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছানোর প্রয়োজন ছিল। অন্ততঃ যাদের কবিতার মধ্যে রয়ে গেছে এক একটি ভিন্ন মহাজগৎ। এক এক মহাজগতের আলো ছায়া বর্ণালী ভিন্ন ভিন্ন। যথা রমেন্দ্রকুমার আচার্য চৌধুরী, মনীন্দ্র গুপ্ত, আলোক সরকারের মতো কবিদের রচনার বর্ণময় জগৎ! কবি শম্ভু রক্ষিত অথবা অকাল প্রয়াত কবি বীতশোক ভট্টাচার্যের কথাও মনে পড়ে এ প্রসঙ্গে। আরো কেউ কেউ, সকলেই নন।

তো, হিজল-ইমরান আমাকে কবি আলোক সরকার সম্পর্কে লিখতে বলেছেন। আরো সত্যি কথা, সে যোগ্যতা আমার বিন্দুমাত্র নেই। কবি আলোক সম্পর্কে এদিকে এত উৎকৃষ্ট লেখা এবং লেখার মতো মানুষ রয়েছেন যে আমি সেই জায়গায় হাত দিতেই ভয় পাই রীতিমত।

কবি আলোকের কবিতার যে নিভৃত-লোক, সেখানে পৌঁছনোর জন্য যে নিভৃতির ছায়াঘেরা পথ, তা হয়তো আমরা হারিয়ে ফেলেছি ক্রমশ। সমস্ত রকম আভরণ, অলংকার খুলে ফেলে যে শান্ত নগ্নতা, তাই কবি আলোকের উপজীব্য বিষয়হীনতা। সেই সহজ-নগ্নতা হয়ত সহজ নয় তত। সেই সহজকে, চমকহীনতাকে আমরা কতটা গ্রহণ করতে পারব আজকের এই কায়দা সর্বস্ব জাগলিং এর যুগে সেও এক প্রশ্ন! সেই সহজকে বিষয়হীনতাকে আলোচনায় ধরা আমার সাধ্য নয়।

পরজীবী

এই শোকের বিষয়হীনতা

উৎকর্ণ হয়েছে। যা কিছু নিঃস্ব তার

মনোযোগ চতুর্দিক হয়। বিষয়হীনতা

চতুর্দিক হয়েছে। সেই অপরিমাণ

ভাষার সহযোগিতা চাইছে। সেই দারিদ্র

সেই অসহায়তা বটগাছ খুঁজছে। পত্রের

মর্মরধ্বনি খুঁজছে। ভাষা স্থিতি চায়। যা কিছু বিশেষ

তাই সীমাচিহ্নযুক্ত—সেই সম্ভ্রান্তি, সেই

অভিনিবেশ বর্ষণরজনীর সমান্তরাল নয়।

শরৎ শেফালীর মন্থর সামঞ্জস্য নয়।

আমরা হাত যুক্ত করছি

আমরা ভাষার জন্য করুণা ভিক্ষা করছি।

সেই কাঙাল, সেই চিরদিনের

পরজীবী।

আলোক সরকারের কবিতা উদ্ধৃত করতে গেলে দুটো লাইন করা যায় না সাধারণত। কারণ দুটো লাইন  উদ্ধৃত করে আমরা যে বিষয় দেখাতে চাই, তা মূলত কবিতার কায়দা, কবিতা নয়। আলোকের কবিতায় তাই সম্পূর্ণ কবিতাই সবসময় উদ্ধৃত করতে হয়। প্রকৃতার্থে, যে কোনো কবিতাই তাই। অর্ধেক বা অংশত কথা থেকে কিছুই বোঝার সম্ভাবনা থাকে না শেষ পর্যন্ত।

এখানে আর একটা মুশকিল হল, আলোক সরকারের এই ‘বিষয়হীন’ কে সামনে রেখে অনেকেই আবার অর্থহীন শব্দের জাগলারি চালিয়ে যাচ্ছেন। অথচ মূল ‘বিষয়’টি সেখানে যে চাপা পড়ে যাচ্ছে তা চেতনে-অবচেতনে অগ্রাহ্য হচ্ছে। ‘মূল বিষয়’ বা ‘বিষয়হীনতা’ অর্থাৎ সেই ‘চেতনা তরঙ্গ’, যার কথা আলোক বারবার বলেছে। আরেকটা কবিতা পড়া যাক—

নিষেধ

যে সঞ্চয়গুলো একেবারে

নিভৃত উপার্জন

তার ব্যবহার কেমন হবে?

ব্যবহার জানাটাই প্রথম ভাবনা।

যা কিছু আছে

সবই ব্যবহারের মধ্যে আছে। নিভৃত উপার্জন

সুযোগ পেলেই ঝমঝম করে ওঠে। ওর একটা

বসবাসের ঘর আছে—তার জানলা দরজা

সবই নিভৃত উপার্জন। মাঝরাতের আকাশে

যে আলো নামে তার সেরকম আলো।

তার ব্যবহার কেমন হবে? তার সখ্য

দুপুর বেলার মাঠের শেষ প্রান্তে যে আঁধার আঁকিবুকি

একবার তার পাশে দাঁড়াচ্ছে, তার সখ্য

রাজপথের ফুল্ল দামামার ভিতর যে একাকিনী

তার পাশে দাঁড়াচ্ছে। আর হুহু নিষেধ বলছে

নিভৃতি, নিভৃতির উপার্জন। যেমন

হুহু প্রত্যাখ্যান বলছে

মাঝরাতের আকাশ

দুপুরবেলার মাঠ

রাজপথের ফুল্ল দামামা।

না। এইসব নিভৃতির উপার্জন নিয়ে বলা আমার কাজ নয়, শিরোনামে ‘নিষেধ’ রয়েছে। বরং একদিনের কবি-সাক্ষাতের কথা এইখানে তুলে ধরা যাক। যা একদিন কবি আলোক সরকারের বাসা থেকে ফিরে হঠাৎ-ই লিখে ফেলেছিলাম। এই সুযোগে বন্ধুদের সামনে আনা হল…।-কৌশিক বাজারী]

                              পুণ্য-তীর্থে আলোক-স্নান

                                                 Blue line

11759521_724074274389081_1719470935_n
উৎপলকুমার বসু’র সঙ্গে

 টেলিফোনে কথপোকথনঃ শুক্রবারঃ বিষ্ণুপুর

-আলোকদা, আগামী রবিবার কলকাতা যাবো, একটু সময় পাবো হাতে, আপনার সেদিন যদি কোনো অসুবিধা না থাকে, তাহলে আপনার বাড়ি যেতে পারি। যাবো?

 -আরে হ্যাঁ হ্যাঁ, অসুবিধে-তো নেই-ই তুমি এসো, ভালো লাগবে (দু’জনে তো থাকি, নির্জনতা বন্ধু…) আমার বাড়ি চিনতে পারবে?

-সুদেবদাও (সুদেব বক্সী) যেতে পারে সঙ্গে।

 -ও হ্যাঁ, সুদেব সুদেব বড় ভালো ছেলে, ওর বইটা (অভ্র ও আবীর) পেয়েছি, খুব ভালো হয়েছেএসো, তোমরা এসো

রবিবারঃ বালীগঞ্জ ষ্টেশন

সুদেব দা বালীগঞ্জ ওভারব্রীজের উপর দাঁড়িয়ে এক-মনে বিপুল বালুকারাশির মধ্য হইতে, চেনা বালুকণাটিকে খুঁজছিলেন হয়ত, আমি হাত নাড়লাম।

আমি- সাড়েবারোটা বাজে, পৌঁছতে পৌঁছতে একটা বাজবে। ওনারা কখন খেতে বসেন সুদেব দা?

সুদেব- আর বোলো না, আমি ফোন করেছিলাম, বৌদিই (কবি-জায়া) ধরলেন, এ একরকম ভালই হল, সরাসরি জিজ্ঞেস করে নিলাম- ‘বৌদি আপনারা কখন খেতে বসেন?’

আমি- ইস্, একটা বিচ্ছিরি সময়ে গিয়ে পৌঁছব।

সুদেব- বললেন, ‘ঐ আড়াইটের মধ্যে বসে পড়ি’। আমি বলেছি, একটু অসময়ে গিয়ে পৌঁছব, একটা-দেড্ডা হবে আমাদের। বললেন, ‘আরে, এসোই না’।

৩৪, নন্দীবাগান,হালতু, ১২,২,২০১২ দুপুর একটা

‘যে বাড়িতে এসেছি

সে বাড়িতে এই আমার প্রথম আসা 

-আলোক সরকার

(কবি-জায়া দরজা খুললেন)

সুদেব- কেমন আছেন বৌদি?

-আরে এসো এসো, তোমাদের জন্য-ই অপেক্ষা করছেন উনি।

(আমি, সুদেবদা, চরণ স্পর্শে উদ্যত হলে উনি নিরস্ত করলেন)

একটা ডাবল, দুটো সিঙ্গেল, কাঠের সোফা। ছোট্টো কাচ-ঢাকা টেবিল মাঝখানে। সামনের দুটো কাঠের সেল্ফে সুন্দরভাবে গোছানো বই, পত্র-পত্রিকা। বেশকিছু স্মারক, সবই কোনো ছোটোপত্রিকা-গোষ্ঠির সম্মান স্বরূপ। সবই সুন্দর গোছানো! আমি বিস্ময় প্রকাশ করে ফেললাম

-এতো সুন্দর গোছানো!

সুদেব- সব-ই বৌদিই করেন।

বুঝলাম, গেরস্থালী-জোড়া প্রেমময় করস্পর্শ।

কবি এলেন। একে ঠিক ‘প্রবেশ’ বলা যাবে না । দেয়াল ধরে ধরে, ঈষৎ কম্পিত পদক্ষেপে, প্রায় ভেসে ভেসে এসে পৌঁছলেন তিনি। আমি আর সুদেবদা ডাবল্ এ, উনি সিঙ্গেলের একটায় বসলেন। মনে হল তাঁর ‘আবির্ভাব’ ঘটল।

কথা কিভাবে শুরু হল মনে নেই। কোন কথা থেকে কোন প্রসঙ্গান্তরে চলে গেছে কথার সূত্র, সেও উদ্ধার অসম্ভব। ধরা আছে শূন্যতায়, নিরাবয়বে, যা আলোকদার নিজস্ব দর্শন।

তিনি বললেন- বিষয়-হীনতাই কবিতা! কবিতার আবার বিষয় কী? সামাজিক কবিতা, ধর্মীয় কবিতা, ঐতিহাসিক কবিতা এসব হয় নাকি? এই যে সমাজরাজনৈতিক মানুষের চাওয়া-না পাওয়া, অপ্রাপ্তি, দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ এসব প্রবন্ধের বিষয় হতে পারে, হয়ও কবিতায় এসব কেন? কবিতা অন্যকিছু, এসব নয় অথবা দার্শনিক কোনো তত্ত্ব? তাইবা কবিতা হবে কেন বড় জোর ‘বাণী’ বলা যায় তাকে কবিতা হল তাই, যা সমকাল কে স্পর্শ করে থাকবে না

11791877_724075377722304_1480589521_n

আমি আমার মত ক’রে বুঝলাম। বুঝলাম, কবিতা সমকালকে অতিক্রম ক’রে কিভাবে মহাকালের অংশ হয়ে যায়। কবিতায় মহাজাগতিক আলো কোনো বিষয় নয়, কবিতাই মহাজগৎ। আবার কবিতাই মহাকালচক্র, মহাকালের রস ও নির্যাস। সব কী বুঝলাম! আবেগ ও নিয়ন্ত্রিত আবেগ কিভাবে কাব্যের মধ্যে এসে পড়ে? বিষয়ের থেকে শুরু হ’য়ে কিভাবে বিষয়কে অতিক্রম করে ছুঁয়ে ফেলে অরূপ?

বললেন- এই যে কত মানুষ, তাপিত, শোকগ্রস্ত, সন্তানহারা কেউশোক মানুষকে আবেগতাড়িত করেছে, আবেগের কারণ একটি বিষয় কিন্তু বিষয় কবিতা নয় এক ঐ দশরথ রাজার পুত্র শোক ছেলে বনবাসে চলে যাচ্ছে, সেই শোক মানুষ হাজার হাজার বছর মনে রেখেছে সে কি বিষয়ের জন্য?               না কাব্য! সেই মহাকাব্য মানুষের হৃদয়ে গেঁথে গেছে, স্থায়ী হয়েছে

 “রবীন্দ্রনাথ-তো কাতরে লিখে গেছেন কত নাম, কত ব্যক্তি, তাদের ধরে ধরে একখানা করে কবিতা লিখেছেন, লিখতে হয়েছেযে বিবেকানন্দের সঙ্গে আজীবন ব্যক্তিত্বের সংঘাত, তাকে নিয়েও লিখেছেন একটি কবিতা এসব কিছু না পড়লেই বোঝা যায়

 অথচ দেখো, ‘গগনে গরজে মেঘ ঘন বরষা‘; ‘সোনার তরী পড়েছো, ‘কবিতা’ পত্রিকায় তুমুল বিতর্ক, আলোচনা এই কবিতার তত্ত্ব কি? দর্শন কি? তা রবীন্দ্রনাথ কি বললেন? বললেন, তো বর্ষার রূপ, বর্ষাপ্রকৃতির কবিতা হিসেবেই একে দেখা ভালো

 অর্থাৎ আবার সেইঅপ্রমাণের‘ খেলা, আবার সেই ‘অনির্দেশ’ যা কথার সূত্রে রবীন্দ্রনাথে এসে পৌঁছল

 নিস্তব্ধতা বিষয়ে আমার যা কিছু বলা

সবই বিরুদ্ধ পক্ষের বলা

নিস্তব্ধতা স্বার্থপর হতে শেখেনি

নিস্তব্ধতা নিঃস্বার্থ হতে শেখেনি

যা কিছু স্বার্থপর নয় নিঃস্বার্থ নয়

তাকে ভয় পাই

সে বড় ভয়ংকর নিঃসম্বল

গাছ মাটির প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে

গাছ নিজেকে প্রমাণ করে

যা কিছু নিজেকে প্রমাণ করছে না

যা কিছু প্রমাণিত হবার অবকাশ নেই

যা কিছু কেবল একটা থাকা,- একটা বর্তমান

তার মতো স্বর্গ-মর্ত্য-জোড়া হাঁ আর কার

অপ্রমাণ, নিভৃতলোক আলোক সরকার

আলোক দা বললেন- “একবার দাদা (অগ্রজ, কবি অরুণ কুমার সরকার) এসে বললো, তোর কবিতা পড়ে বুদ্ধদেব বসু কি বলেছ শোন, বলেছে; ‘আলোক সরকারের কবিতা পড়ে আমার একটি স্নায়ুও উত্তেজিত হয় না আমি বললাম, ‘শুনে খুশী হলাম, আমিতো বুদ্ধদেব বসুর জন্য কবিতা লিখিনা

 -এই হল সেই সমকাল বুদ্ধদেব বসুতৎকালীন সমকাল

 যে সমকালের থেকে তিনি বরাবর দূরত্ব রচনা করেছেন তাঁর কবিতায়, জীবনে ‘জীবন শব্দটি সচেতনভাবেই বলা তাঁর আত্মজীবনী ‘জ্বালানী কাঠ জ্বলো’ সেই সমকালকে অস্বীকারের এক দীর্ঘ-কাব্য, যাপিত জীবনের ভাষ্য মাত্র নয়

একটি উদ্ধৃতিঃ বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকা,যার প্রতি তৎকালীন তরুণ কবিদের শ্রদ্ধা এবং আস্থা গভীর ছিল সেই সময় তা-ও আর নতুন কবিদের কাব্যভাবনা এবং কাব্যকলা বিষয়ে বিশেষ উৎসাহী ছিল না, সেই সময়কার তরুণ কবিদের কবিতার সংকলন ‘সমকালীন বাংলা কবিতা’র সমালোচনায় নতুন যুগের সঙ্গে ‘কবিতা’ পত্রিকার ব্যবধান স্পষ্ট হয় অবশ্য তরুণ কবিরা অনেকেই ‘কবিতা’র লেখক ছিলেন, এমন কি ‘শতভিষা’ পত্রিকা যে সমস্ত তরুণ কবিদের রচনা প্রকাশে আগ্রহী ছিলো তাদের লেখাও মাঝে মাঝে প্রকাশিত হ‘তো ‘কবিতা’য় কিন্তু বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ সেই সেই ধরণের কবিতা বিষয়েই পক্ষপাত প্রমাণ করতো যা তিরিশের দশকের কবিদের-ই প্রতিধ্বনি নতুন কোনো কাব্য আন্দোলন যে শুরু হ‘তে পারে এমন ধারণা ‘কবিতা’ পত্রিকার ছিল না এই অবস্থায় ‘শতভিষা’ যা আধুনিকতাকে প্রবহমান অর্থেই একদিক থেকে গ্রহণ করেছিল, তার প্রকাশ যে বিশেষ প্রয়োজনের ছিল যেটা বুঝতে পারা যায়

-আলোক সরকার। (‘শতভিষা’ রজত-জয়ন্তী বর্ষ, ১৩৮৩ সংখ্যা। ‘দাহপত্র’ পত্রিকায় আংশিক পুনর্মুদ্রিত অংশ থেকে)

আমি- আলোক দা, টেলিফোনে আপনার কণ্ঠস্বর অনেক তরুণ।

আলোক সরকার- হ্যা, আমিতো তরুণই নই কি? (হাসি)

আমি- বিষ্ণুপুরে একজন কবি আছেন, জানেন, বিকাশ দাস? তিরাশি বছর বয়স হল। তিনি এখনো মাঝে মাঝে, কোনো বিকেলবেলা, কাঁধে ঝোলা নিয়ে উপস্থিত হ’য়ে বলেন, চলো কৌশিক, তোমার স্কুটিতে চড়ে জঙ্গল বেড়িয়ে আসি, দ্বারকেশ্বর নদ দর্শন করে আসি।

আ.স.- তাই নাকি! ও আচ্ছা, বিকাশ দাস বিষ্ণুপুরে থাকেন?

আমি- হ্যাঁ, ওখানকারই মানুষ।

আ.স.- হ্যাঁ, বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকায় একবার আটখানা কবিতা ছাপা হয়েছিল, মনে আছে উনি আমার একজন পছন্দের কবি খুব ভালো লেখা অনেক পরে ‘অনুবর্তন’ ‘তিরপুর্ণি’তে ওঁর কিছু লেখা পড়ে ছিলাম

সুদেবদা- তিরপুর্ণি’ প্রথম সংখ্যায় একটা বড় গুচ্ছ ছিল, আড়ালে থাকা বিশিষ্ট কবিদের নিয়ে, তারপরেও…

আ.স.- এখন আর লেখেন না কেন?

আমি- লেখেন তো, রোজই লেখেন।

আ.স.- দেখিনা তো, ছাপাতে চান না?

আমি- না না, তা নয়, চাইলেই দেন।

সুদেবদা- আসলে কলকাতার সম্পাদকরা তো খোঁজও পান না সেভাবে, উনিও সেভাবে এগিয়ে আসেননি কখনো, আর এই বয়সে…

আ.স.- ঠিকই তো, ঠিকইতো

সুদেবদা- কৌশিকের ‘মিরুজিন’ পত্রিকায় ওঁর ‘দেশ রাগে বাজো’ নামে একটি সংকলন, কাব্যগ্রন্থের আকারে ছাপা হয়েছে।

আ.স.- হ্যাঁ, হ্যাঁ, পড়েছিতো, খুব ভালো কবিতা দেশ পত্রিকায় একবার ওনার একটি চিঠি ছাপা হয়েছিল, সে বহুদিন হল, আমার মনে আছে এখনো, সেখানে উনি আমার নাম উল্লেখ করেছিলেন

আমি- কত বছর? মানে আপনার তখন কত বয়স হবে?

আ.স.- বছর তিরিশ বয়স হবে তখন আমার আমি ভাবলাম, দেশ পত্রিকায় প্রথম আমার নাম ছাপা হল, তাও একজন অন্য কবির চিঠিতে (হাসি)এইভাবে মনে রয়ে গেছে বিষয়টা

 (কবি কিছুক্ষণ চুপ রইলেন)

11758821_724075161055659_95725462_n
আলোক সরকারের বই প্রকাশ করছেন শঙ্খ ঘোষ

 নারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের খবর শুনেছো তোখুবই অসুস্থএতো ভালো মানুষটা, এতো বড় মনতার কবিতা পড়ে দেখো, বোঝা যাবে সব; অথচ চিরকাল আড়ালেই রয়ে গেলেনকেউ তো যোগ্য সম্মানটুকু জানালো না অথচ এতো এতো পুরস্কার, চারিদিকে ছড়াছড়িকেউ তো ডাকতেই পারতো; কখনো ডাকেনি

আমি ও সুদেবদা- আসলে, আলোকদা, এসব পুরস্কার, দাতা ও গ্রহীতা, এ সবের পিছনে প্রায় অনেক সময় যা থাকে, সেই চিরাচরিত বিভাজন, লবি, ‘তুমি কোন দল’- এসব এখন সবাই জানে।

আ.স.- (একটু গলা তুলে, ভেতর ঘরে কবি-জায়ার প্রতি) এই, তুমি কি ফ্রি রয়েছো? ঐ বইটা এক কপি এনো-তো কৌশিক, তুমি তো পড়নি, তোমাকে দেব, ‘নিভৃতলোক

আমি  – আলোকদা, বই এর প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ছে, তখন আমি একাদশ শ্রেণীর ছাত্র। একবার, ঐ একবারই, সজ্ঞানে  চুরি করেছিলাম।

আ.স.- … ???

আমি- একটি কবিতার অনুষ্ঠানে, তাদের বই-এর স্টল ছিল, সেখান থেকে একটি মোটা বই চুরি ক’রে ছিলাম।

আ.স.- …???

আমি- ‘আলোক সরকারের কবিতা সমগ্র’

আ.স.- কোন্‌ খণ্ড?

আমি  – সম্ভবত, দ্বিতীয়।

সুদেব দা- তাই নাকি!(হাসি) কোথায়? কাদের স্টল?

আমি- বাঁকুড়ায়, ‘কবিতা পাক্ষিকের’ বার্ষিক অনুষ্ঠানে।(সকলের হাসি)।

আলোক দা- বই চুরির মধ্যে কোনো পাপ নেই আমরা তো কতভাবে বই চুরি করিপড়তে নিয়ে ফেরৎ দিই নাএই নাও ‘নিভৃতলোক’ দেখো, আমার হাতের লেখা কেঁপে যাচ্ছেসিগ্নেচার কিন্তু ঠিক আছে, তাই না!

(কবিস্পর্শময় কাব্যগ্রন্থটি শ্রদ্ধায় গ্রহণ করি। উঠে দাঁড়াই। আমি ও সুদেব দা অনুমতি নিই আলোক দা’র কাছে। আড়াইটে বাজে। এতক্ষণ কবি-দম্পতিকে অভুক্ত রাখার জন্য মার্জনা চাইনি আর। যখন উঠে আসছি, আশি-উত্তীর্ণ কবির চোখ কোনো অজানা শ্রান্তিতে বুজে এসেছিল- তিনি সে অবস্থায় ঘাড় নাড়লেন।)

-এসো ভাই

-প্রণাম।

[এই রচনার সকল সংলাপ আপন পারম্পর্য বজায় রেখেছে সর্বদা তা বলা যাবে না হয়তো টেলিফোনে কথোপকথনের কোনো অংশ কবি-কক্ষে হয়েছিল, অথবা কবি-সম্মুখে বলে যে কথা লিখিত হল তার কোনো অংশ হয়তো ফিরে আসার পর টেলিফোনেঅর্থাৎ এই রচনা কোনো সাক্ষাৎকার নয়, বরং বলা ভালো, আমার তীর্থ দর্শনের গাল-গপ্পোআর তীর্থযাত্রীরা যে মিথ্যাচারের পাপ করে না সে কথা তো পুরাণ-সিদ্ধ]

971191_336166343179878_925895913_n
।।কৌশিক বাজারী।। কবি
Advertisements