images[১৯০০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি  স্মিরনায় স্তেলিয়োস ও দেসপো সেফেরিয়াদিস-এর ঔরসে জর্জ সেফেরিস জন্মগ্রহণ করেন। ১৯১৪ সালে তিনি তাঁর পরিবারের সাথে স্মিরনা থেকে অ্যাথেন্সে চলে আসেন এবং এখানেই তিনি মাধ্যমিক স্তরের পাঠ সমাপ্ত করেন। ১৯১৮-২৪ পর্যন্ত উচ্চ শিক্ষার্থে তিনি প্যারিসে অবস্থান করেন এবং আইনে ডিগ্রি নেন। ১৯২৬ সালে তিনি গ্রিক পররাষ্ট্র-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে চাকরি নেন। এর পর নানা দেশে তিনি তাঁর কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৭-৬২ পর্যন্ত ছিলেন গ্রেট ব্রিটেনে রাষ্ট্রদূত। ১৯৬০ সালে তিনি সাম্মানিক ডক্টর অব লিটারেচারে ভূষিত হন। ১৯৬২ সালে পান ফয়েল পুরস্কার। ১৯৬২ সালে তিনি কূটনৈতিক চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত হন এবং আথেন্সে বসবাস করতে থাকেন।  ১৯৬৩ সালে  তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান, তিনিই প্রথম গ্রিক যিনি এ পুরস্কার পান। ১৯৭১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর  তিনি মারা যান। তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অসংখ্য মানুষের সমাগম হয়, যা অবশেষে স্বৈরশাসক পাপাদোপাউলোস-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রূপ নেয়। উল্লেখ্য, ১৯৬৯ সালের ২০ মার্চ স্বৈরশাসক পাপাদোপাউলোসকে নিন্দা জানিয়ে তিনি প্রতিবেদন দিয়েছিলেন। তাঁর কবিতাগ্রন্থগুলো হলো : Mythistorema, Gymnopaidia, Book of Exercises, Logbook-1, Logbook-11, Logbook-111, Turning Point, The Cistern, The Thrush|

                                             green-line

                                                                জর্জ সেফেরিস-এর কবিতা

                                             green-line

I regret having let a broad river slip through my fingers

Without drinking a single drop.

Now I’m sinking into the stone.

A small pine tree in the red soil

Is all the company I have.

Whatever I loved vanished with the houses

That were new last summer

And crumbled in the winds of autumn.

[এক বিন্দু জল পান না করেও

আঙুলের ভেতর দিয়ে যে প্রশস্ত নদীকে ঢুকিয়ে দিয়েছি আমি

কষ্ট হয় তার জন্য আজ

তলিয়ে  যাচ্ছি পাথরের গহিনে

লাল মাটির ওপর দাঁড়ানো ছোট্ট  পাইন গাছটিই

বলতে গেলে আমার সঙ্গী এখন

যা কিছুই ভালোবেসেছি সব বিলীন হয়ে গেল সেই বাড়িগুলোর মতো

গত গ্রীষ্মে যা ছিল নতুন

আর শরতের ঝড়ে হলো যে ছিন্নভিন্ন]

[পুরাণেতিহাস: ১৮-সংখ্যক কবিতা]

জর্জ সেফেরিসের কবিতায় তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দ্বিধা, দেশের অবস্থা নিয়ে ভয়-ভীতি, নির্বাসন, হারানো, বঞ্চনা এবং অর্জন; চিত্রকল্প এবং অবয়বে এমন সূক্ষ্মভাবে রূপান্তরিত যাকে বলা যায় তার আলম্বন বিভাব, শুধু স্থূল জৈবনিক তথ্যাদি ছাড়া অন্যভাবে তাঁর প্রতিস্ব থেকে যাকে আলাদা করা যায় না। হয়তো এসবকিছুই তাঁর ঐতিহাসিক পারসোনা।  অভিজ্ঞতা ও নন্দন তাঁর কবিতায় এমনভাবে সন্ধি করে যে  নৈর্ব্যক্তিকতা কোনো  শৈল্পিক পদ্ধতি নয়, বরং এমন এক বিশ্বাস যেখানে সমগ্র সবসময়ই অংশ থেকে বিশাল আর ব্যক্তিক সচেতনতা তার আধেয়  থেকে কমই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বসাহিত্যের সাথে তাঁর কবিতা যেভাবেই সম্পর্কায়িত হোক না কেন, জর্জ সেফেরিস আধুনিক গ্রিক সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব গুণবাচক, কেননা তা আধুনিক গ্রিক কবিতাকে নতুন অভিমুখ দিয়েছে, দিয়েছে আধুনিকের নতুন আত্মস্বর। তাঁর কবিতা গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে স্মরণীয় গ্রিক ঐতিহ্যে, ও ভাষায়। এর মানে হলো, তা শুধু গত দেড়শ বছরের আধুনিক গ্রিক কবিতার যে পুনর্জাগরণ তাতেই পরিতৃপ্ত থাকেনি, বরং এগিয়ে গেছে আরও আরও এদিক-ওদিক, তাৎপর্যপূর্ণ কালসূত্র নির্মাণে; পূর্বের উৎসগুলোকেও সাঙ্গীকৃত করেছে নতুন বিভাবে, এবং প্রতীকিতায়।  বিখ্যাত আধুনিক গ্রিক কবি সলোমোস, কালভোস, পালামাস, সিকেলিয়ানোস, কাভাফি, ইলাইতিস, ও রিতসোসদের কবিতার পাশাপাশি তিনি সৃষ্টি করেছেন অন্য এক জগৎ যা স্বতন্ত্র, দ্যুতিমান ও নিজস্ব নাদে অনুপম। প্রাচীন ও আধুনিক জগৎ তাঁর কবিতায় এক অভিন্ন রূপকে পরিণত হয়ে যায়। জাতির ভূ-প্রকৃতি, তার ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক অতীত তাঁর কবিতায় অসাধারণভাবে আত্মস্থ, এবং উন্মেষিত। যদি বলা হয় প্রাচীন গ্রিক কবিতার নতুন এক পুনরুত্থানের সূচনা ঘটে এই কবির হাতে, তাহলে তা হবে না অতিশাব্দিক  অতিশয়োক্তি। গ্রিক কবিতার আদি অন্যতম ধারা হলো বালাদ এবং লোকসংগীত; এর প্রভাবশালী আঙ্গিক হলো দেকাপেনতাসিলাভোস (dekapentasyllavos) যা হলো পনেরো সিল্যেবলের এক পঙক্তি যার আট সিল্যেবলের পর একটি বিরাম আর ছয় বা আট সিল্যেবল ও চোদ্দো সিল্যেবলের পর একটি করে শ্বাসাঘাত। এই আঙ্গিকই বাইজানটীয় সময় থেকে কিছুটা পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে আজও গ্রিক কবিতায় অনুসৃত। সেফেরিসের প্রথম দিককার কবিতা, ‘এরোতিকোস লোগোস’, এই পরিবর্তনের এক অমোঘ উদাহরণ যেখানে  সমসাময়িক সংবেদনকে ধরার জন্য দেকাপেনতাসিলাভস পংক্তির সার্থক ব্যবহার  হয়েছে। আরও একটি ধারার প্রভাব উন্নত গ্রিক কবিতায় দেখা যায় যার উৎপত্তি হয়েছিল ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দে ক্রিতি দ্বীপে। ক্রিতির নাট্যসাহিত্যের মধ্যে ছিল ধর্মীয়  নাটক আব্রাহামস সেক্রিফাইস আর ইরোফিলে যেখানে প্রধান সব চরিত্র একে অপরকে অথবা নিজেকে হত্যা করে। কিন্তু এই ধারার প্রধান কাজ হলো ভিৎজেনতোস কোরনারোস লিখিত ১০০৫২ পদ্যের কাহিনিমহাকাব্য এরোতোক্রিতোস যাতে রাজা আথেন্স-এর কন্যা আরেতোউসা আর সম্ভ্রান্ত বংশের ছেলে এরোতোক্রিতোস-এর প্রেমকাহিনিই উপজীব্য। এই মহাকাব্যটি গ্রিকবিশ্বে এমনই জনপ্রিয় হয়েছিল যে কখনও কখনও সাধারণ মহাকাব্যের ধরনে  একে মুখস্থ আবৃত্তি করা হতো। এই ধরনের আবৃত্তি সেফেরিসের ব্যক্তিত্বকে কীভাবে তাড়িত করেছিল, তাঁর  প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর কবিতায়।  ‘এক বিদেশি কবিতার পঙ‌ক্তিভাবনা’ কবিতায় তিনি বলেন:

আমার শৈশবের দেখা কিছু অভিজ্ঞ নাবিকের দল

যখন শীত আসছে হাওয়ায় হাওয়ায় তখন জালের ওপর ঝুঁকে

শ্রুসজল চোখে আবৃত্তি করত এরোতোক্রিতোস;

মার্বেলের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে

আরেতোউসাযে দুর্ভাগ্য ঘটে তার কথা ভেবে ভেবে

আমি ঘুমের মধ্যে শিউরে উঠতাম

এরোতোক্রিতস-এর ওপরে সেরা সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লেখেন সেফেরিস যা তাঁর প্রবন্ধাবলি, আথেন্স, ১৯৭৪-এ অন্তর্ভুক্ত। এর প্রভাবেই আধুনিক গ্রিক ভাষা, যাকে বলা হয় ডেমোটিক গ্রিক ল্যাঙ্গুয়েজ বা দেমোতিকে বা জনভাষা, তার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়, তা সাহিত্যের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়, এবং এর স্পষ্ট প্রমাণ সেফেরিসের ‘এরোতিকোস রোগোস’ নামীয় সিরিজ কবিতা। এখানে বলা দরকার, বিংশ শতাব্দীর আগে এই জনভাষা সাধারণভাবে গৃহীত হয়নি, তখন ছিল বিশুদ্ধ গ্রিক ভাষা যা কাথেরউঔসা (katharevousa) নামে পরিচিত যার প্রতিষ্ঠাতা আদামানতিঅস কোরায়েস নামের এক ভাষাতাত্ত্বিক। সেফেরিস তাঁর ‘এরোতিকোস রোগোস’ কবিতায় পুরাণ থেকে গৃহীত বাগধারাকে এমনভাবে  কবিতায় ব্যবহার করলেন যাতে একই সাথে তাঁর নিজস্ব রচনাভঙ্গি এবং প্রাচীন সাহিত্যের প্রাসঙ্গিক মুহূর্তের সাদৃশ্য বোধগম্য হয়। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর ক্রিতীয়  সাহিত্য   এবং লোকঐতিহ্যই, বিশেষত  গ্রিক ভাষার তাদের সৃষ্টিশীল কার্যকারিতার বিবেচনায়, সেফেরিসের লেখার প্রধান স্থানিক উৎস।

তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে, চরিত্র, চিত্রকল্প এবং  প্রাচীন গ্রিসীয় পুরাণের পুনর্নির্মাণের বিবেচনায় সেফেরিস ও তাঁর পূর্বসূরিদের রচনা এ সমস্ত কবিতা থেকে তাৎপর্যপূর্ণভাবে আলাদা। যেমন পালামাস যখন তুলনা করেন ‘পবিত্র স্মরণীয় মানুষেরা’ যারা মন্দির, জলপাইকুঞ্জ আর অ্যাটিক ভূ-প্রকৃতির ভেতর শাসন করত, তাদের সাথে সাদা ফুলের ওপর শুঁয়োপোকার মন্থর  হামাগুড়ির মতো আধুনিক মানুষদের, তখন নতুন তাৎপর্যের পৃথকীকরণের দিকটি ফুটে ওঠে যা আসলে রয়েছে শিকড়বদ্ধ ঐতিহ্যে। এই সুবিধা অন্যান্য আধুনিক কবিদের মতোই সেফেরিসেরও শক্তির উৎস, এবং ইংল্যান্ড এবং আমেরিকার কবিদের থেকে গ্রিসের আধুনিকেরা এখানে খানিকটা এগিয়েও। এভাবেই প্রাচীনতার স্মৃতিসমুদ্রকে নিয়ে আধুনিক এক লেখক স্পর্শধন্য হন স্বকীয়তাকে শিরোধার্য করে। সেফেরিস এই পুরোনো আধেয়কে নিয়ে নতুন এক প্রকাশভঙ্গিকে উপস্থাপন করেন যা তাঁকে  স্বতন্ত্র হিসেবে চিনিয়ে দেয়।

তিনি পুরাণের দিকে পাঠককে  দৃষ্টিবদ্ধ করার আগে এক কাব্যিক অভিমুখ ঠিক করে নেন, যা বাস্তব এবং সমসাময়িক এবং আধুনিক। এভাবে জীবনে আসে পুরাণ যথাযথভাবে, প্রাচীন ও আধুনিক জগৎ কোনোরকম অসতর্ক সংঘর্ষ বা অহেতুক সমস্যা সৃষ্টি করা ছাড়াই এক অভিন্ন রূপকে মিলেমিশে যায়। কালবিপর্যয় এখানে ঘটে না, যা একসময় ছিল তা আজও আছে, যা এখন আছে তা একসময়ও ছিল। আধুনিক ওদুসসেউসের ভ্রমণ থেকে  পেয়ে যান এমনকিছু যা তাকে একই অভিজ্ঞতায় অন্বয়বদ্ধ করে: পরিত্যক্ত, স্থানচ্যুত, নীরস, পুনরাবৃত্তিময়। এভাবেই ওদুসসেউসের দীর্ঘ ভ্রমণ এবং দুর্ভাগ্য এক প্রতীকী ব্যঞ্জনা ও উপস্থাপনায় আধুনিক মানুষকে সামীপ্য করে। সেফেরিসের পুনঃপুন উল্লিখিত প্রকাশিত সমুদ্র যেন ওদুসসেউসের নিরাশাময় সমুদ্র-দুর্বিপাককেই প্রতিভাসিত করে। ভ্রামণিকের উদ্দেশ্য বন্দরে ফেরা যেখানে সে পাবে চিরন্তন আনন্দ ও আশ্রয়, কিন্তু ওদুসসেউসের মতো আধুনিক জীবনও বঞ্চিত এই আশ্রয় থেকে। কবিতায় পৌরাণিক চরিত্রের এই ভূমিকা বিষয়ে বলতে গিয়ে সেফেরিস ‘লেটার অন থ্রাশ’-এ তাই বলেন:  পরিব্রাজনে এবং যুদ্ধে অসমঞ্জস মানুষ, যদিও মহত্ত্বে ও মূল্যবোধের বিচারে তারা ভিন্ন; একই আকাঙ্ক্ষায় সর্বদা ঘুরপাক খাচ্ছে। সুতরাং পুরাণ যেসব চরিত্র আর প্রতীক আমাদের কাছে হাজির করেছে তাতে আমরা বিশ্বস্ত থাকি এই উপলব্ধি করে যে, আমাদের সময়ের চলিষ্ণুতা আর জগতের বিভিন্ন অবস্থায় এসব প্রতিভূস্থানীয় চরিত্ররা বদলে গেছে- যা আসলে ব্যক্তির প্রকাশের অন্বেষণ ছাড়া  কিছুই না।

এজন্যই প্রাচীন পুরাণ তাঁর কবিতায় এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কারণ  তা  প্রতীকায়নের এক ভিন্ন শক্তি জোগায়। কিন্তু এটা ভাবা অপ্রতুল এবং অযথার্থ হবে যে- সেফেরিসের কবিতা শুধু পুরাণের উদ্ভাস বা রূপান্তর, বরং তা আসলে গ্রিক ঐতিহ্যের সবকটি বিষয়  নিয়েই  পুনর্নির্মিত। হোমার থেকে সমসাময়িক  গ্রিক কবিতার যে বিবর্তনান্তিক প্রবহণ, তা-ই কখনও উচ্চগ্রামে কখনও বা অধঃস্থতায় তাঁর কবিতায় ধারিত, যা হয়তো গ্রিক না-জানা পাঠকদের নিকট কিছুটা অপরিবাহিত থেকে যেতে পারে।  বোধ হয় সব কবিতার অনুবাদনিয়তিই এরকম।

কবিতায় সেফেরিসের মেজাজ বা প্রতিস্ব বা বিশিষ্টতা বা সংবেদনশীলতা, তাঁর কথায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর অ্যাংলো-আমেরিকান এবং ইয়োরোপীয় কাব্য দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড-এর  ভাবাদর্শে  গ্রিকীয়  স্বকীয়তায় উপস্থাপিত,   কিন্তু এই গ্রিক ঐতিহ্যের বাইরে বেশ কজন কবির দ্বারা উন্মেষপর্বে তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাঁর লেখার বিকাশসময়ের প্রস্বর এবং শৈলীর পরীক্ষানিরীক্ষায় সমসাময়িক ফরাসি কবিদের প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য: বিশুদ্ধ কবিতা লেখার যে প্রচেষ্টা তাঁর মধ্যে জাগ্রত হয়েছিল, তা ভালেরির ‘অ্যাবসলিউট পোয়েট্রি’র কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ১৯৩৫ সালে যখন তাঁর মিথিসতোরেমা বা পুরাণেতিহাস কাব্য প্রকাশিত হয়, তখন একটি ভিন্ন লেখনভঙ্গি চোখে পড়ে যায়, যা তিরিশের দশকের প্রথম দিকের পাউন্ড ও এলিয়টের কবিতার গভীর অনুধ্যানকে মনে করিয়ে দেয় এবং একইসাথে তাঁর নিজ প্রতিস্বের উদ্ভাসনকেও প্রতিফলিত করে যা প্রকৃতপক্ষে দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল ১৯৩২ সালে প্রকাশিত কাব্য দ্য সিসটার্ন  থেকে, যেখানে ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের এক শুদ্ধতার ছাপ দৃষ্টিগোচর হয়ে ওঠে। কিন্তু পুরাণেতিহাস বা  মিথিসতোরেমায় প্রথমবারের মতো তাঁর কাব্যভাষা বাঁক নেয় যা পরবর্তী সময়ে তাঁর সামগ্রিক কাব্যচর্চার পরিপ্রেক্ষিতে স্থায়ী হয়ে যায়। এই কাব্যে তিনি তাঁর আগেকার কবিতার গতানুগতিক ধরনকে ত্যাগ করে অধিকতর মুক্ত এবং প্রাকৃতিক ভঙ্গির এবং গভীরতার এক রীতিকে আবিষ্কার করেন যা ভবিষ্যতে রচিত সকল পরিপক্ব কবিতার ক্ষেত্রেই বজায় থাকে। এই রীতিতে রয়েছে  যথাযথ  নিয়ন্ত্রিত এক শৈলী, যা অলংকারহীনতায় সুসজ্জিত এবং ছড়ানো-ছিটানো চিত্রকল্পে উদ্দীপিত। এই ধরনের পরিপক্ব কবিতায় সেফেরিস প্রথাগত আঙ্গিক ও ছন্দোস্পন্দের আধারে দৈনন্দিনতার বাচনকে উপস্থাপন করেছেন যা একাধারে নিবিড়তা ও বাকসংযমে অনন্য, যাকে ইংরেজিতে পুরোপুরি আনা অসম্ভব, শুধু কৃত্রিমভাবে অনুকরণই করা যায় মাত্র। তাঁর কবিতার রচনাশৈলীর যে সুপ্রকাশ, তার মধ্যে বিদেশি উৎসের অনুসন্ধান করলে সহজেই  বোঝা যাবে যে  কবিতার মর্ম শুরু থেকেই দুর্মরভাবে ব্যক্তিক। প্রতিটি অসাধারণ কবিতাই, যা ন্যূনতম পৌরাণিকতা বা ধ্রুপদিয়ানার কারণে পাশ্চাত্যের কাছে কিছুমাত্রায় অনধিগম্য, জীবনের মর্মন্তুদ সংবেদনশীলতায় ঋদ্ধ; যা বস্তুত ইতিহাসের ব্যক্তিগত উপলব্ধি থেকে সরাসরি আবির্ভূত, আসলে যা মানবীয় ভোগান্তির সাথে কবির প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা বা নিবিড় অবলোকনেরই উৎসারণ। তাঁর সত্তার কাব্যিক নির্বাসন এবং শৈশবের জন্মভূমি থেকে ১৯২২ সালে তুরস্কের কামাল পাশার সেনাবাহিনীর কাছে গ্রিকদের পরাজয়ের ভেতর দিয়ে যে প্রকৃত শারীরিক নির্বাসন এবং কূটনৈতিক হিসেবে গ্রিস থেকে যে বাহ্যিক নির্বাসন, তা তাঁর কবিতাকে একধরনের রূপকাত্মক তাৎপর্য জুগিয়েছে।  ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা অন্তর্দৃষ্টিকে রূপকে পরিণত করার মাধ্যমে তিনি কবিতাকে ভিন্নতর ব্যঞ্জনায় সিক্ত করেন যা তাঁর কবিতাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করে এবং আমাদের সময়ের বলে মনে করিয়ে দেয়। এর উদাহরণ পাওয়া যাবে ‘বিবরণ’ কবিতায় সেই ‘প্রদর্শনীয় এবং প্রশান্ত মানুষটি’ যে ‘কেঁদে কেঁদে হেঁটে বেড়ায়’ এবং ‘এক সীমাহীন ব্যথার যন্ত্রপাতি যা অবশেষে তার সকল তাৎপর্য হারায়’, অথবা ‘আমাদের সূর্য’ কবিতার সেই ‘নোংরা আর শ্বাসরোধী বার্তাবাহক’ যে আসে মুখ দিয়ে  ‘আমাদের সময় নাই’ এই বৌদ্ধিক কথা বলে মরে যেতে, বা ‘শেষ দিন’ কবিতার যুগল যারা, আলো জ্বালানোর জন্য ঘরে ফেরে কেননা গোধূলিতে হাঁটতে হাঁটতে তারা অসুস্থ হয়ে যায়। এ সকল কবিতাই  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগে বা পরে লেখা হয়। এসবই রূপক, যা ব্যক্তিক বা স্থানিক ইতিহাসের বাইরে সেফেরিসের পরাদৃষ্টিকে তুলে ধরে; যা তাঁর সমসাময়িক ইয়োরোপীয় বা আমেরিকান সেরা কবিদের মতোই সুনির্দিষ্ট ও সর্বজনীন মনশ্চক্ষুর চিত্রকল্পকে ধারণ করে রাখে। কখনও কখনও  ব্যক্তিগত বা স্থানিক তাৎপর্যমণ্ডিত কোনো সাধারণ ঘটনা বা বিষয়, মানবিক অভিজ্ঞতার এক সরল প্রতিবেদন যা সত্য হিসেবে তাঁর কবিতায় উদ্ভাসিত হয়। এইসব প্রতিবেদন বা ডিসকোর্স কবির রূপকোদ্ভাসিত ভাবাভাস অপেক্ষা সরাসরি এবং কখনও বা অধিক যথাযথ। যেমন ‘শেষ স্টপ’ কবিতার দ্বিতীয় স্তবক যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কবির গ্রিসে ফেরার প্রাক্কালে রচিত, বা ‘হেলেন’ কবিতাটির সমাপ্তি অংশ যা ১৯৫০ সালের প্রথম দিকে সাইপ্রাসের গণ্ডগোল থেকে রচিত, এ ধরনের অভিজ্ঞতা থেকে রচিত:

ক.

আমাদের শেষ বন্দরে এখানে গত সন্ধ্যায়

বাড়ি ফেরার জন্য অপেক্ষা করছি আমরা

অতীত ঋণের মতো, কঞ্জুস এক মানুষের

সিন্দুকে পড়ে থাকা মুদ্রার মতো,

এখন এসেছে ঋণ পরিশোধের সময়

তুমি শুনতে পাচ্ছো টাকাপয়সার ঝনঝনানি, শব্দ করে

পড়ছে টেবিলে,

এই এট্রুসকান গাঁয়ে, সালেরনো সমুদ্রের পেছনে

আমাদের ফেরার বন্দরের পেছনে, শরতের ঝড়ঝাপটার পেছনে

চাঁদ উঠেছিল মেঘকে সরিয়ে আর পাহাড়ের ঢালুর দিকে

ঘরবাড়িগুলো হয়ে উঠল এনামেলের মতো ফকফকে সাদা

চাঁদের বন্ধুত্বপূর্ণ নীরবতা

বন্ধুর মতো নিস্তব্ধ চাঁদ

খ.

অশ্রুমান পাখি

সমুদ্রস্পর্শিত এই সাইপ্রাসে

আমাকে স্বদেশের কথা মনে করিয়ে দিতে নিজেকে ঢেলে দিলে তুমি

এই গল্প নিয়ে নোঙর পেতেছি আমি এখানে

তা যদি সত্য হয় যে এটা গল্পই

যদি সত্য হয় যে কিছুতেই মানুষ

দেবতাদের প্রাচীন ছলনাগুলোকে মানবে না আর;

যদি সত্য হয়

ভবিষ্যতে আরেক তেইক্রোস

বা কোনো এক আইয়াকস বা প্রিয়াম বা হেকাবে

অথবা অন্য এক অজানা মানুষযে দেখে

মৃতদেহভরা স্কামান্দার নদী

তাদের যেন এমন নিয়তি না হয়

কোনো লোক এসে যেন না বলে

এতটা ভোগান্তি

অতল অন্ধকারে জীবনের অপচয়রাশি

সবকিছু  শূন্যতার জন্য

এক হেলেনের জন্য

এখানে দেখতে পাচ্ছি এক সর্বজনীন সংবেদনশীলতা যা তাঁর কবিতাকে, তাঁর ইতিহাসবোধকে জারিত করছে। তাঁর প্রতিভার আরেকটি দিক হলো, তিনি ব্যক্তিগত ইতিহাস ও পুরাণের ভেতর থেকে এক স্থানিক রাজনীতিকে সূত্রবদ্ধ করেন, যা সাধারণী প্রতিবেদন এবং রূপকে পরিণত হয়ে ওঠে। দ্বীপগুলোর নষ্ট কড়িকাঠে তাঁর যে ওদেসীয় ভ্রমণ, তার সাথে কিছুটা হলেও মিল আছে ইয়েটসের বাইজানটিয়ামের উদ্দেশে যাত্রার বা এলিঅটের ঊষর মরুভূমির ভেতর দিয়ে যাত্রার। ভাব বা বিষয়বস্তুর দিক থেকে তিনি যদিও একজন জাতীয়তাবাদী কবির পর্যায়ে পড়েন তবু তাঁর রাজনীতিবোধ সাধারণ জাতীয়তাবাদীর সংকীর্ণ বোধে কোনোভাবেই আবদ্ধ নয়, যদিও তাঁর কবিতা বা তাঁর পরাদৃষ্টি অতীত ইতিহাসবোধ, পুরাণ, সাহিত্য, ভূপ্রকৃতিকে প্রায়শই ধারণ করে প্রতিভাসিত। তাঁর রাজনৈতিক বীক্ষণ  শুধু সমসাময়িক ইতিহাসকে নিয়ে দাঁনা বাঁধে না বরং সেখানে এক স্পর্শকাতর মনের অভিসঞ্চার লক্ষ্যণীয়, যা এসবকে নতুনভাবে তাৎপর্যমণ্ডিত করে। নিজ প্রজন্মের অনেক কবির মতোই তিনি যদিও ঐতিহ্যে ছিলেন আস্থাশীল এবং প্রত্যক্ষ ও সক্রিয়ভাবে তাঁর জাতির  রাজনৈতিক ব্যাকুলতায় ছিলেন উদ্দীপিত, কিন্তু কবি হিসেবে তাঁর পূর্ববোধ ও পরিপৃক্তি নিহিত আছে এক বিশাল কাব্যিক রূপকল্পে যা অন্তর্গতের উন্মোচনের মাধ্যমে সর্বজনীন সত্যের অন্বেষণে মানবীয় অস্তিত্বের নতুন নিশানাকে তুলে ধরে।

images (1)

সেফেরিসের ওপর প্রভাব ছিল পাউন্ড এবং এলিঅটের, অনেকে বলেও থাকেন যে এঁদের দ্বারা তিনি অতি-প্রভাবিত ছিলেন। এটা বলা সংগত যে আধুনিক ইঙ্গ-ইয়োরোপীয় কবিতার একজাতীয় অন্তরঙ্গ এবং সার্থক দেশীয়করণ তাঁর হাত দিয়ে ঘটে যা তাঁকে মৌলিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কাভাফির লেখনরীতিতেও তিনি প্রভাবিত ছিলেন বলে অনেকে মনে করে থাকেন। ‘দ্য ডেমন ফরনিকেশন’ কবিতাটি এর অন্যতম প্রমাণ। এটা কাভাফির দ্বারা প্রভাবিত কবিতা।  ১৯৪০ সালে প্রকাশিত কাব্য “দ্য বুক অব এক্সারসাইজ” বা অনুশীলনের খাতায় পাউন্ডের প্রভাব স্পষ্ট এবং মিস্টার স্ত্রাতিস থালাসসিনোস-এর যে প্রতিস্ব অঙ্কিত তা অতি উদ্ভূত। ‘কুরেনিয়া জেলায়’ কবিতাটি এলিঅটের কবিতা দ্বারা অনুকৃত। বুক কাব্যের ‘হেলেন’ কবিতায়ও রয়েছে এলিঅটের প্রতিধ্বনি যেখানে  পোড়োজমির শেষের স্পন্দন অনুভবিত:

আর আমার ভাই?

নাইটিংগেল নাইটিংগেল নাইটিংগেল

দেবতা কী? কী নয় দেবতা? আর তাদের মাঝে কী পার্থক্য?

এভাবেই তিনি বিশ্লেষণধর্মী কবিতার জন্ম দেন। অনেকে তাঁকে অতি-উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলেও মনে করতেন। এ বিষয়টির অনুপূরণ হিসেবে তিনি লেখেন “অন দ্য গ্রিক স্টাইল” বইটি, যা গুরুত্বপূর্ণ রচনা বলে বিবেচিত। অনেকে আবার তাঁকে উৎকর্ষ লিখনভঙ্গির অনুপম লেখক বলেও মনে করেন। সেফেরিস মূলত গ্রিক সাহিত্যে  উত্তর-প্রতীকবাদী কবিতার আত্ম-চরিতার্থতাকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন এবং পেরেছেনও। তাঁর শৈলী নিবিড়, সংযমী এবং অতি-উল্লেখবহুল। তাঁর কবিতায় প্রচ্ছন্নতা এবং প্রকাশ এমনভাবে ব্যবহৃত যা প্রকারান্তরে  নৈঃশব্দ্য ও বাচনে বহুগুণিত হয়ে ওঠে। শূন্যতা ও সৌন্দর্যের মাঝে আবর্তন এবং প্রত্যাবর্তন তাঁর কবিতাকে আত্মপ্রতিকৃতির উন্মোচনে সহায়তা করে।

কুয়াশায় অস্পষ্ট অঙ্গার

গোলাপেরা ছিল হৃদয়ে প্রোথিত

আর প্রতিদিন সকালে

ছাই ঢেকে দিয়ে যেত তোমার মুখ

 

এক গ্রীষ্মকাল আগে চলে গেলে তুমি

সাইপ্রেসের ছায়ারাশি কুড়াতে

                                                 green-line

                                                            জর্জ সেফেরিস-এর সাক্ষাৎকার

                                                 green-line

[জর্জ সেফেরিসের এ সাক্ষাৎকারটি  নেন এডমান্ড কিলি, যিনি একজন সেফেরিস বিশেষজ্ঞ এবং তাঁর কবিতার ইংরেজি অনুবাদক। সাক্ষাৎকারটি দ্য প্যারিস রিভিয়্যু  আর্ট অ্যান্ড পোয়েট্রি  সংখ্যা-১৩-এ প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয় ইন্সটিটিউট  ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিতে সেফেরিসের অস্থায়ী নিবাসে, যা ছিল তিন কক্ষের বড়ো জানালাবিশিষ্ট সাধারণ এক দ্বিতল অ্যাপার্টমেন্ট। ঘরে বইয়ের তাক প্রায় খালি, আথেন্সে সেফেরিসের বাড়িতে আধুনিক গ্রিক ছবি এবং মূল্যবান বস্তুর যে সাজ থাকত, তাও ছিল অনুপস্থিত। তথাপি কবি এই বাড়িটিতে আনন্দেই ছিলেন, কারণ এই জায়গাটি থেকে তিনি দেখতে পেতেন সঞ্চরণশীল গাছপালা, কাঠবেড়ালির আনাগোনা,  উঠানে স্কুল-ফেরত বাচ্চাদের  কলকাকলি। পুরো সাক্ষাৎকারের সময়েই  তরুণীর মতো বেনীবাঁধা স্বর্ণকেশি চুলের স্ত্রী মারো ছিলেন উপস্থিত, কখনও  আনন্দচিত্তে শুনছিলেন, কখনও বা উঠে গিয়ে খাবার বা পানীয় প্রস্তুত করছিলেন।]

এডমান্ড কিলি: শুরুতে ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্স স্টাডি সম্পর্কে এবং অতি সম্প্রতি কূটনৈতিক চাকরি থেকে অবসর নিয়ে ছাত্র হিসেবে আপনি নতুন ক্যারিয়ার শুরু করেছেন, এ সম্পর্কে আপনার অনুভূতি জানতে চাই।

জর্জ সেফেরিস: প্রিয়ভাজন, যে সমস্যা আমাকে বিভ্রান্ত করে তা হলো, অ্যাডভান্সড স্টাডি জিনিসটা কী? কেউ কি ভুলতে চাইবে কিংবা আরও জানতে চাইবে যে, আমার পর্যায়ের  কেউ অ্যাডভান্সড স্টাডিতে অবস্থান করছে? এখন আমি অবশ্যই বলব, সাদামাটাভাবে বিষয়টি হচ্ছে- এখানে পুরো অবস্থাটা আমি বেশ উপভোগ করি, কারণ এখানে রয়েছে অনেক চমৎকার লোক, খুবই ভালো বন্ধু, আর যদি বলি, উপভোগ করি তাদের বিষয়বৈচিত্র্য। আমার চারপাশে রয়েছে অনেক বিষয়: বিজ্ঞান, ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, ধর্মশাস্ত্র, দর্শন…

কিন্তু এত যে বিজ্ঞানী, এত যে ইতিহাসবিদ, এদের মাঝে নিজেকে আপনি কি অপাঙক্তেয় মনে করেন না?

 না, কারণ আমার নিজের বিষয়ে যাদের আগ্রহ নেই তাদের প্রতিই আমি আকর্ষণ বোধ করি।

আমার কাছে যে রকমটা মনে হয়, কাভাফি সম্ভবত চিন্তা করে থাকতে পারেন, ইতিহাসবিদদের সাথে সংলাপের সুবিধা আছে, আপনিও কি তাই মনে করেন? যদি অন্যভাবে বলি, আপনি কি মনে করেন যে, ইতিহাসের বিশেষত্বের জায়গা থেকে ইতিহাসের কি কবিকে কিছু বলার আছে?

আপনার স্মরণে আছে কি যে, কাভাফি তাঁর ইতিহাসচেতনা নিয়ে গর্ববোধ করতেন। তিনি বলতেন: আমি ইতিহাসের লোক— এ রকমই কিছু তিনি বলতেন, যদিও হুবহু তাঁর উক্তিটি আমার মনে নেই। আমি সে রকম কিছু নই, তা সত্ত্বেও ইতিহাসের চাপ আমি অনুভব করি। অন্যভাবে বললে, সম্ভবত তা অধিকতর রীতিসম্মত, অধিকতর বিমূর্ত কিংবা অধিকতর মূর্ত… কোনটি আমার ঠিক জানা নেই।

গ্রিক কবির সাথে তার সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সম্পর্ক বিষয়ে বলবেন কি? আপনি একদা বলেছিলেন, গ্রিসে প্রাচীন গ্রিসের কোনো অস্তিত্ব নেই। এর দ্বারা আপনি সুনির্দিষ্টভাবে কী বোঝাতে চেয়েছেন?

আমি বোঝাতে চেয়েছি গ্রিস একটি চলমান প্রক্রিয়া। ইংরেজি ভাষায়, ‍‌‌‘প্রাচীন  গ্রিস’-এর শব্দার্থের মধ্যে নিহিত আছে সমাপ্তিসূচক অর্থ। পক্ষান্তরে আমাদের কাছে গ্রিস জীবন্ত কিছু, ভালো হোক বা মন্দ হোক; এটি জীবনের অংশ, এখনও এর মৃত্যু ঘটেনি। এটি বাস্তবতা। কেউ একই যুক্তি দেখতে পারে, যখন সে প্রাচীন গ্রিক ভাষার উচ্চারণ নিয়ে আলোচনা করে: তাদের জন্য গ্রিক একটি মৃত ভাষা, কিন্তু আমাদের জন্য এটি ভিন্ন এক কাহিনি।  বাস্তবতা হচ্ছে, প্রাচীন গ্রিক ভাষা বিশেষ কোনো সময়ে তার কার্যকারিতা হারিয়েছে এবং দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, এ কারণেই আপনি স্বেচ্ছাচারিতার সাথে এটি উচ্চারণ করতে পারছেন।

তাহলে আপনি স্পষ্টত ভাষার ক্ষেত্রে কিংবা অন্যান্য ক্ষেত্রে গ্রিক ঐতিহ্যকে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। এ দেশে কিছু ক্লাসিক্যাল ও বাইজানটাইন পণ্ডিত এটি বিশ্বাস করেন না, আমার মনে হয়, কোথাও না।

আপনি কি জানেন কেন এমনটি হলো? কারণ বিষয়টি তথা গ্রিসের ইতিহাস এত বিশাল যে প্রত্যেক পণ্ডিত এর কোনো সুনির্দিষ্ট সময় কিংবা শাখার মধ্যে নিজেকে সীমিত রাখেন, এবং এর বাইরে আর কিছুই তাতে পাওয়া যায় না। উদাহরণস্বরূপ, গিবন মনে করতেন যে, এক সহস্র বছর ছিল ক্ষয়িষ্ণু। কীভাবে একটি জাতি মোটের উপর এক সহস্র বছর ক্ষয়িষ্ণু থাকতে পারে, হোমারীয় কাব্যকাল এবং খ্রিস্টের জন্মের মধ্যে আটশ বছরের ব্যবধান কিংবা প্রায় কাছাকাছি সময়ের দূরত্ব ছিল এবং ধরে নেওয়া যায়, এরপর এক সহস্র বছর ছিল ক্ষয়িষ্ণু সময়।

download (1)

গ্রিক কবির সাথে তার ঐতিহ্যের সম্পর্কটি কেমন ছিল এ নিয়ে আমার কাছে সতত মনে হয়েছে যে, গ্রিক কবি তাঁর অ্যাংলোস্যাক্সন প্রতিপক্ষ যিনি গ্রিক পুরাণ এবং মাঝে মধ্যে গ্রিস ল্যান্ডস্কেপের ব্যবহার করেছেন, তাঁর চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন। আমার মনে পড়ে, বহু বছর আগে যখন আমি কাভাফি এবং সেফেরিসের কবিতায় ইংরেজির প্রভাব বিষয়ে অভিসন্দর্ভ রচনা করেছিলাম, যখন আমি আপনার ল্যান্ডস্কেপে প্রতিবিম্বিত সুনির্দিষ্ট কিছু চিত্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, যেমন, আপনার রচনায় যে সব মূর্তি আবির্ভূত হয় তাদের প্রতীকী অর্থ কী। আপনি আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন: ‘কিন্তু ওগুলোই প্রকৃত শিলামূর্তি। যে ল্যান্ডস্কেপ আমি দেখেছি সেখানে তারা অবস্থান করছে।’ আমি মনে করি আপনি বলছিলেন, আপনি সব সময় জীবন্ত, প্রকৃত ঘটনা দিয়ে শুরু করেন এবং সেখান থেকে যে কোনো সর্বজনীন অর্থের দিকে যাত্রা করেন যাকে এর মধ্যে ধারণ করা যেতে পারে।

ক্লাসিক্যাল ভাস্কর্য বিশেষজ্ঞ একজনের কাছ থেকে সেদিন এর একটি ব্যাখ্যা পেয়েছিলাম যিনি ছিলেন একজন ইংরেজ পণ্ডিত এবং যিনি পার্থেননের ভাস্কর্যকর্ম সম্পর্কে বক্তব্য প্রদান করছিলেন। তাঁর বক্তৃতার পর তাঁকে অভিনন্দন জানানোর জন্য এগিয়ে গেলাম, এবং আমার যতটুকু স্মরণে আছে তাকে, তিনি তখন বললেন, তোমার একটি পঙ্ক্তি আছে আমি যা বোঝাতে চেয়েছি তার সাথে মিলে যায় যেখানে তুমি বলো : ‘শিলামূর্তিগুলো ধ্বংসাবশেষ নয়, বরং আমরাই হচ্ছি ধ্বংসাবশেষ’। আমি বোঝাতে চাই যে, আমি বিস্মিত হয়েছি, তাঁর মাপের একজন প্রাজ্ঞজন একটি বিষয় ব্যাখ্যার জন্য আমার একটি উদ্ধৃতি ব্যবহার করছিলেন।

একজন কবি যে তাঁর শৈশব থেকে চিত্রকল্প গ্রহণ করে থাকেন, তা আগে আমরা আলোচনা করেছি। একজন গড়পড়তা ইংরেজ থেকে আপনার স্বাতন্ত্র্য বোঝানোর জন্য আপনি বলেছিলেন, যে ইংরেজদের জীবনে ফুটবল ও কার গাড়ির প্রয়োজনীয়তা যেমন, আপনার কাছে গাধাগুলোও সে রকম।  সম্ভবত আমার মনে আছে, আপনি সমুদ্র এবং এস্মারনার কাছে অবস্থিত আপনার নিজ গ্রামের নাবিকদের সম্পর্কেও বলেছিলেন।

আপনি জানেন, চিত্রকল্পের অদ্ভুত দিকটি হলো, এর অনেকটাই অবচেতনে থাকে এবং মাঝে মাঝে তা কবিতায় এসে আবির্ভূত হয় এবং কেউ জানে না এর উৎপত্তি কোথায়। কিন্তু আমি নিশ্চিত কবির অবচেতন জীবনে এর  শেকড়, প্রায়শ তাঁর শৈশবের মধ্যে এবং এ কারণেই আমি মনে করি, যে শৈশব তিনি কাটিয়েছেন তা তাঁর জীবনের চূড়ান্ত নিশানা ঠিক করে দেয়।

আমি মনে করি দুটি পৃথক বিষয় কাজ করছে: চেতন ও অবচেতনের স্মৃতি। আমি মনে করি, কবিরা প্রকৃতিগতভাবে মগ্নচৈতন্য থেকে জীবনীশক্তি সঞ্চয় করেন। বলা যায়, আপনি যেভাবে স্মৃতিগ্রন্থ লেখেন এটি তা নয়, কিংবা নয় আপনি আপনার অতীতকে, শৈশবকে যেভাবে স্মরণ করতে চান। আমার শৈশবের অনেক ঘটনাই আমার মনে পড়ে যেগুলো আমাকে প্রভাবিত করেছে। যেমন, যখন আমি শিশু ছিলাম, আমাদের ঠাকুরমার বাগানে বাংলো ধরনের একটি বাড়ি ছিল যেখানে আমরা আমাদের গ্রীষ্মযাপন করতাম- আমি সেই বাড়ির কোণায় কোথাও জাহাজের একটি কম্পাস আবিষ্কার করেছিলাম, পরে আমি জেনেছিলাম এটি আমার পিতামহের ছিল। এবং আমার মনে হয়, আমি সেই অদ্ভুত জিনিসটি বার বার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, খুলে, আবার জোড়া দিয়ে শেষ পর্যন্ত নষ্ট করে ফেলেছিলাম। ঘটনাটি আমার স্মৃতিপটে রূপকথা হয়ে থাকল। কিংবা আরেকটি ঘটনা বলি- যখন শরৎকাল আসত, যখন ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেত, এবং মাছ ধরার নৌকাগুলো দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াতে পাল তুলে ভাসতে থাকত, আমরা আনন্দ পেতাম যখন দেখতাম তারা আবার নোঙর ফেলেছে এবং আমার মা  বেরিয়ে পড়া জেলেদের কোনো একজনকে বলত, ‘সাবাস, তোমরা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া অতিক্রম করে এসেছো’; এবং জেলে তখন বলত,  ‘ম্যাডাম আপনি জানেন, আমরা সব সময় সারেঙকে আমাদের সাথে নিয়ে নৌকা ভাসাই।’ এটা আমার কাছে মর্মস্পর্শী ছিল। সম্ভবত আমি যখন প্রথম পর্যায়ের সেই কবিতায় ইউলিসিস সম্পর্কে লিখেছিলাম আপনি সেই কবিতার উপর (‘একটি পরদেশি কবিতাকে নিয়ে’) মন্তব্য করেছিলেন, সম্ভবত আমার মনের মধ্যে সেই জেলের মতো কেউ একজন ছিল। আমার ছোটোবেলার সেই বৃদ্ধ নাবিকেরা, যারা এরোতোক্রিতোস আবৃত্তি করত, সব ক্ষেত্রেই, আমার মতে অচেতন রূপকল্পকে জাগিয়ে তোলা, তাদের আলোতে নিয়ে আসা সব সময়ের জন্য কিছুটা বিপজ্জনক কারণ, আপনি জানেন, তারা দ্রুতই বাষ্পীভূত হয়।

একটি ক্ষুদ্র পাঠকগোষ্ঠীর জন্য বহুকাল ধরে লেখার ফলে আপনি কি ক্লান্ত বোধ করেছেন এবং এই পাঠকগোষ্ঠী আপনার কবিজীবনের শুরুতে এতটাই ক্ষুদ্র ছিল যে আপনাকে নিজের টাকায় বই ছাপাতে হয়েছে এবং প্রতিটি বই ৩০০ কপির কম ছাপাতে হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠিত আমেরিকান কবির কাছে এটি সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি ব্যাপার।

আমি আপনাকে একটি উদাহরণ দেব। আমি যখন আমার প্রথম খণ্ড, স্ট্রফি (দ্য টার্নিং পয়েন্ট) প্রকাশ করলাম, আমি এর ১৫০ কপি ছাপিয়েছিলাম। সেটা ১৯৩১ এর ঘটনা।  আমার মনে পড়ে ১৯৩৯ সালেও বইয়ের দোকানে এগুলোর কিছু কপি ছিল। আমি সেই কপিগুলো বাজার থেকে তুলে নিয়েছিলাম যাতে করে ১৯৪০-এ সেই বইয়ের একটি নতুন সংস্করণ বের করতে পারি। কিন্তু আমাকে অবশ্যই বলতে হবে কিছুকাল পরেই একটু একটু করে অবস্থার পরিবর্তন শুরু হলো। জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে গ্রিসের পতনের পর আমি যখন মিশরের উদ্দেশে যাত্রা করলাম তখন আমি পূর্বেকার গ্রন্থ চিস্টার্ন এবং স্ট্রফি ছাড়াও আমার তিনটি কবিতাগ্রন্থ লগ বুক, পুরাণেতিহাস এবং অনুশীলনের খাতা  ফেলে এসেছিলাম। এগুলো ছিল একবারেই আনকোরা, আপনি জানেন নির্বাসিত গ্রিক সরকারের সাথে  ক্রিটে এবং কায়রোর উদ্দেশে জাহাজে চড়ার আগে আমি বইগুলোর একটি কপিও বিক্রি করিনি। আমার অনুপস্থিতিতে সবকিছুই বিক্রি হয়ে গেল।  যখন ফিরে এলাম, এগুলোর এক কপিও অবশিষ্ট ছিল না। বিদেশি  শত্রু কর্তৃক দখল গ্রিক জনগণকে মনোনিবেশ ও পড়ার সুযোগ এনে দিয়েছিল। এবং আমি দেখলাম, দখলমুক্ত হওয়ার পর যখন আমি ফিরে আসলাম তখন আগের চেয়েও গ্রিসে আরও বেশি পরিচিত হয়ে গেছি।

এটি একটি আশ্চর্য ব্যাপার যে, গ্রিসে দখলদারিত্বের সময় কবিতার প্রতি আগ্রহের পুনরুত্থান ঘটল। আমি এ বিষয়টি জানতে পেরেছি অন্য কবিদের কাছ থেকে, উদাহরণস্বরূপ, গাতসোস এবং ইলাইতিস-দের কাছ থেকে। কবিতা আথেন্সের বিদগ্ধ ব্যক্তিবর্গকে পাঠ ও আলোচনায় ঐক্যবদ্ধ করল, ফলে এ সময়টা ত্রিশের দশকের পর এ শতাব্দীতে কবিতার জন্য শ্রেষ্ঠ সময়ে পরিণত হলো।

ইলাইতিস তাঁর বই ছেপেছিলেন দখলদারিত্বের সময় এবং গাতসোসের বিখ্যাত বই আমোরগোস  দখলের সময়ই প্রকাশ পেয়েছিল।

দখলের পর কী ঘটেছিল; শীর্ষস্থানীয় কবিরা এত দীর্ঘ সময় কেন নীরব ছিলেন?

এটাকে আসলে নীরবতা বলা যাবে না। সময় বদলে গিয়েছিল এবং দিগন্তসমূহ প্রসারিত হয়েছিল, আর প্রত্যেকেই দেশের বাইরের জীবনকে অধিকতর প্রত্যক্ষ করতে চেয়েছিল, তারা প্রকাশের নতুন নতুন ভঙ্গি খোঁজার চেষ্টা করছিল।

আমি ভাবছি আপনি এদেশের বৃহৎ সাধারণ শ্রোতাসমাজের নিকট কবিতা পাঠ করে  নতুন এবং আগ্রহোদ্দীপক কিছু অনুভব করছেন কি না, আমার বন্ধু-বান্ধব যাদের গ্রিক সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই, তাদের সম্পর্কে বলতে হয় যে, তারা গ্রিক ভাষায় আপনার লেখা পড়ে কবিতার ছন্দ সম্পর্কে যে ধারণা লাভ করেছে তা ইংরেজি ভাষায় আপনার লেখা পাঠ করে তাদের অর্জিত ধারণা থেকে ভিন্ন।

এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমি আমেরিকাতে বই পড়ার এই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আরও বেশি কিছু বলতে পারি। সেদিন অন্য এক কবি আমার লেখা সম্পর্কে একটি কবিতা পাঠিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। সেটি এক নতুন ধরনের প্রতিক্রিয়া। কিন্তু তা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ঢি হচ্ছে প্রতিক্রিয়াগুলো জানা, প্রশংসা পাওয়া নয় বা প্রশংসিত হওয়া নয়।

এই শরতে রুটজারসে আপনার লিখিত বক্তব্যের পর শ্রোতাদের মধ্যে একজন আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিল আপনার কবিতার ইংরেজি অনুবাদ সম্পর্কে আপনার ধারণা কী, আপনি তখন আপনার ইংরেজি অনুবাদকের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। কিন্তু তারপর বলেছিলেন, ‘অবশ্য আমার কবিতার সেরা অনুবাদ চীনা ভাষায় হয়েছে যে ভাষা আমি মোটেও বুঝি না।’

এটি সম্পর্কে বিস্তারিত বলা কঠিন কিছু না, কারণ আপনি জানেন, আমি অনুভব করি সেসব ভাষায় যেগুলো আমি জানি, কারণ সম্ভবত আমি সেগুলো এত ভালো জানি যে, (উদাহরণস্বরূপ ইংরেজি নয়, ফরাসি ভাষা, যা আমি  সত্যি ভালো জানি) অনুবাদের ক্ষেত্রে আরও নতুন নতুন সম্ভাবনা রয়েছে।  চীনা ভাষার ক্ষেত্রে অন্য কোনো সম্ভাবনা নাই। কিন্তু প্রশ্নটা একটু পরিবর্তন করে নিচ্ছি, অনুবাদ সব সময় মজার বিষয়, কারণ এটি আপনার নিজের ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি মাধ্যম। এখন অবশ্য আমাদের ভাষার চেয়ে ইংরেজি আরও স্থিতিশীল একটি ভাষা; বলতে হয় আমাদের নিজস্ব ভাষা সৃষ্টি করতে হবে, সবসময় আমরা লিখে যাচ্ছি।

পাউন্ড বলেছিলেন যে, অনুবাদ লেখকের জন্য অবিরাম নিজের ভাষা সম্পর্কে চেতনাকে তীক্ষ্ণ করার একটি উপায়, এবং তিনি তরুণ কবিদের পরামর্শ দিয়েছেন সুযোগ পেলেই  অনুবাদ করতে।

যদি আপনি এটির অতিচর্চা না করেন তবে এটি সব সময় প্রয়োজনীয়।

আপনি যে ভাষায় লিখেন সে ভাষা গ্রিসের বাইরে খুব কম লোকই জানে। আমি ভাবছি এজন্য আপনার বিরক্তি আসে কি না যে আপনি আপনার দেশের বাইরের কাব্যজগতে প্রধানত অনুবাদের মাধ্যমে পরিচিত।

513SAiuwwVL._SY344_BO1,204,203,200_প্রাপ্তির একটি ব্যাপার আছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রায় এক বছর আগে একজন আমেরিকান চিঠি লিখে আমাকে জানিয়েছিল: ‘সেফেরিস পাঠ করার জন্য আমি আধুনিক গ্রিক শিখেছি’। আমি মনে করি তা ছিল এক বড়ো স্বীকৃতি। যিনি স্কুলে কোনো বিদেশি ভাষা শিখছেন তার চেয়েও এটি অনেক বেশি ব্যক্তিগত, তাই নয় কি? আমি অন্যদের বলতে শুনেছি : ‘আপনি জেনে থাকবেন, আমরা আপনার কবিতা পড়ে গ্রিক ভাষা শিখেছি।’ একটি বড়ো পুরস্কার বটে। এবং আমি অতঃপর যুক্ত করতে চাই, সম্ভবত অনেক বেশি-সংখ্যক পাঠক না পাওয়ার এই ব্যাপারটার মধ্যে ভালো কিছুও নিহিত আছে। আমি বোঝাতে চাই, এর মাধ্যমে আপনি একটি বিশেষ শিক্ষা লাভ করছেন, তা হলো, পৃথিবীতে বিপুল-সংখ্যক পাঠক পাওয়াটা সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার হিসেবে বিবেচ্য নয়। আমি মনে করি, যদি মাত্র তিনজন লোক আমার লেখা পড়ে, আমি বোঝাতে চাই, সত্যিকারভাবে পড়ে, তাহলে এটাই যথেষ্ট। এটি আমাকে মনে করিয়ে দেয় হেনরি মেকক্সকে, আমি মাত্র একবারই ক্ষণিকের জন্য তাঁকে কাছে পেয়েছিলাম, আর তখন তাঁর সাথে আমার কথোপকথন হয়েছিল। মিসর থেকে ফেরার পথে এথেন্সে তাঁর যাত্রাবিরতি ছিল। তাঁকে বহনকারী জাহাজ পিরেইউসে নোঙর করেছিল। তখন তিনি কূলে এসেছিলেন শুধু এক্রোপলিস দেখার জন্য। সে সময় তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘প্রিয়বরেষু , আপনি জানেন যার একজন মাত্র পাঠক তিনি লেখক পদবাচ্য নন। যাঁর দুজন পাঠক, তিনিও লেখক পদবাচ্য নন। কিন্তু যাঁর ‘‘তিনজন পাঠক’’ আছে তিনিই সত্যিকারের লেখক’, আর ‘তিনজন পাঠক’ এমনভাবে তিনি উচ্চারণ করলেন যেন তিন মিলিয়ন পাঠকই বোঝালেন তিনি।

ইতিপূর্বে আপনি বলেছিলেন যে গ্রিক ভাষায় ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার একটি সমস্যা আছে। এটি এমনকিছু যা অধিকাংশ আমেরিকান পাঠক স্বভাবগতভাবে বোঝে না। আমাদের একটি ভাষা আছে। আমাদের সমস্যা হলো আমাদের কাছে যে ভাষা আছে তাকে সব সময় টেনে বড়ো করা যাতে করে এর মধ্যে নতুন শক্তি দেখা যায়। যখন আপনি একটি ভাষা প্রতিষ্ঠা বা সৃষ্টি করার কথা বলেন, আপনি সম্পূর্ণ নতুন কিছু বোঝান।

আমরা একাডেমিক কর্মকাণ্ডের দুর্যোগ পেয়েছি। লক্ষ্য করুন, আমি বাম এবং ডান উভয় দিক থেকে বুঝিয়েছি। শুরুতে আমরা অধ্যাপকদের তৎপরতা দেখেছি যারা আমাদের রক্ত-মাংসের ভাষাকে বিমূর্ত কিছুতে  রূপান্তর করতে চেয়েছে যাতে করে বিশুদ্ধ ভাষার ধারণার মতো কিছু পাওয়া যায়। অপর পক্ষে, আমরা আমাদের জনপ্রিয় যে কথ্যভাষা যাকে আমরা দেমতিকে বলি, সে ভাষার জন্য লড়াই করেছি। কিন্তু এই ঐতিহ্য- পেশাগত ঐতিহ্য এতই প্রবল ছিল যে, এক ধরনের একাডেমিক মন সক্রিয়ভাবে লড়াই করেছে শুদ্ধিবাদী ভাষা ও আঞ্চলিক ভাষা উভয়ের জন্য । এগিয়ে যাওয়ার সেরা উপায় হলো সব ধরনের একাডেমিক তৎপরতা ভুলে যাওয়া। উদাহরণস্বরূপ ক্রিটীয় পুনর্জাগরণকে আমি খুবই প্রশংসা করি। সেই কালে আপনি খুঁজে পাবেন একটি পূর্ণাঙ্গ কবিতা- দশ সহস্র পঙক্তির এক বিশাল কবিতা, যেখানে চাপ ও প্রয়াসের  লেশমাত্র নেই, ভাষাটি সম্পূর্ণ সাবলীলভাবে কাজ করছে, যার মধ্যে শিখতে হবে এমন কোনো জাজ্বল্যমান প্রবণতা নেই।

এটি আগ্রহোদ্দীপক যে আপনি অনায়াসসাধ্য সাবলীল কবিতাকে আদর্শ হিসেবে নিচ্ছেন, কারণ আমার মনে আছে, অন্য একটি প্রেক্ষাপটে আপনি বলেছেন যে, নিজেকে প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যক্তি তার স্টাইল বা শৈলী নিয়ে জটিলতার মধ্যে পড়ে।

মাকরিয়ানিস যিনি তাঁর পঁয়ত্রিশ বছর পূর্ণ না হওয়া অবধি লিখতে কিংবা পড়তে শিখেননি, তাঁর সম্পর্কে বক্তৃতায় আমি সেই কথাটি বলেছিলাম। আপনি যখন তাঁর পাণ্ডুলিপি দেখবেন তখন মনে হবে এটি একটি দেয়ালের মতো। মনে হবে পাথর দিয়ে তৈরি দেয়াল, পাথরগুলো একটির উপর আরেকটি বসানো।  এটি বড়ো অদ্ভুত। উদাহরণস্বরূপ তিনি যতিচিহ্ন মোটেও ব্যবহার করেন না। কোনো প্যারাগ্রাফ ব্যবহার করেন না। কোনো কিছুই না। এটি এভাবেই রচিত। এবং আপনি দেখবেন যে প্রতিটি শব্দ আরেকটি শব্দের সাথে যুক্ত যেন একটি পাথরের উপর আরেকটি পাথর বসানো। আমি বোঝাতে চাই, যে কোনো ক্ষেত্রেই, যখন আপনি সত্যি কিছু অনুভব করেন, আপনি তা প্রকাশের ক্ষেত্রে সমস্যা বোধ করবেন। এবং সেটিই সর্বোপরি আপনার স্টাইল গঠন করে দেবে।

আপনি আপনার নিজস্ব শৈলী গঠনে কী কী সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন?

সেটি আরেক কাহিনী। যৌবনে আমি গ্রিক ভাষা নিয়ে যথেষ্ট কাজ করেছি। নির্ঘণ্ট, পুরানো বই, মধ্যযুগীয় বই এবং এ জাতীয় বিষয় নিয়ে। কিন্তু শুধু পাঠ করতে গিয়ে যে অসুবিধায় পড়েছি তা নয়, এগুলো ভুলে যাওয়া ও স্বাভাবিক হওয়াও ছিল কঠিন কাজ। আমি জানি না, সম্ভবত স্বাভাবিক হতে পারার আশীর্বাদ আমার উপর ছিল। এটি অন্যদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

আমি জানি আপনি সবসময় মনে করেছেন, স্টাইলের ক্ষেত্রে পরিচিতিবোধ আনার চেষ্টা করা একজন কবির জন্য প্রথম করণীয় কাজ। মনে হয়, এটি আপনার পূর্বসূরিদের মধ্যে প্রবলভাবে বিদ্যমান ধারা থেকে ভিন্নতর, অন্ততপক্ষে পালামাস ও সিকেলিয়োনেস-এর অনুসৃত ধারা থেকে।

সেটি সম্ভবত স্থানিক বৈশিষ্ট্য। আমার পেশাগত জীবনের শুরুতে কাজ করতে গিয়ে আমি অনুভব করেছিলাম যে, গ্রিসের জনগণ অতিমাত্রায় বাগাড়ম্বরপূর্ণ। এবং আমি এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি। এটাই ছিল আমার উপলব্ধি। উদাহরণ দিতে পারি, শব্দ, বিশেষণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ করে যৌগিক বিশেষণের ক্ষেত্রে, সেগুলো আমি পরিহার করতাম। আপনি জানেন, কিছু জিনিস পরিহার করার ক্ষেত্রে আমি আমার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। প্রকাশের ক্ষেত্রে আমার আগ্রহ ভাষার রঙের প্রতি খুব বেশি ছিল না, যা গ্রিকদের মধ্যে প্রচুর পাবেন, তবে আমার আগ্রহ সর্বোপরি সারবস্তুর প্রতি, আর নির্যাসটুকু প্রকাশের ক্ষেত্রে আপনাকে আপনার বিষয়ের ব্যবহারে পরিমিত হতে হবে। আপনার মনে আছে, ভালেরি বলেছেন, গীতিময়তা হলো সর্বোপরি ‘আহা’ আশ্চর্যবোধের প্রকাশ। আমার জন্য ‘আহা-ই’ যথেষ্ট। আমি কখনো আশ্চর্যবোধের ব্যাখ্যা প্রদানের চেষ্টা করি না।

আমি স্টাইল বা শৈলী বিষয়টিকে ভাষা পরিমিতভাবে ব্যবহারের প্রক্রিয়া হিসেবে অনুসরণ করতে চাই। আপনি কি একমত হবেন যে আপনার কাজের একটা ধারা আছে যেখানে রয়েছে কাব্য স্ট্রফি এবং তাকে যা কিছুই অনুসরণ করেছে তার মাঝামাঝি অধিকতর সংহত প্রকাশ।

অবশ্যই। এটি যতটা না রচনাশৈলীর উন্নয়ন তার চেয়েও বেশি হলো বিবর্তন। সবকিছুই বিবর্তিত হয়। আমি বোঝাতে চাই, তাঁকে বিবর্তিত হতে হবে যিনি নতুন কিছু দেখতে চাইবেন। তাঁকে অন্য বিষয়গুলো দেখতে হবে এবং এগুলো প্রকাশ করতে হবে। অবশ্যই এখানে একটা বিবর্তন আছে, কিন্তু আমি একে উদ্ধৃতি চিহ্নযুক্ত ‘উন্নয়ন’ হিসেবে দেখি না। যদি আমার সামনে অনেক বছর থাকত আমি সম্ভবত অন্যভাবে লিখতাম, এমনকি ভিন্ন স্টাইলে। আমি সম্ভবত আমার প্রথাগত চরণযুক্ত কিংবা অন্ত্যমিলযুক্ত ভাষা লিখতাম। কবিতায় আপনি প্রকাশকে সজীব রাখার জন্য সময়ে সময়ে বিষয়ের ভিত্তি পরিবর্তন করেন। যে মূল বিষয় আপনি কবিতায় খুঁজছেন তা হলো পুরানো, বহুল ব্যবহৃত প্রকাশগুলো পরিহার করা, সেটাই হলো মূল সমস্যা।

গদ্যশৈলী সৃষ্টি করার সমস্যাটি বলবেন কি? গ্রিসে হাতে  গোনা কবিদের আপনি একজন যিনি গদ্য সমালোচনার ভাষাতে যেমন তেমনি কবিতা সমালোচনার ভাষাতেও জোরালো প্রভাব ফেলেছেন। একটি জীবন্ত অথচ সযত্ন গদ্যশৈলী সৃষ্টি শুরু থেকেই আপনার সংগ্রামের অংশ হয়েছে।

হ্যাঁ, কিন্তু আপনি জানেন, আমার সংগ্রাম সব সময় পরিমিত প্রকাশের জন্য। আমার প্রকাশের মূলেই রয়েছে এটি এবং অবশ্যই গদ্যে তা অধিক স্পষ্ট, আমি বাকসংযমের বিষয়টি বোঝাচ্ছি।

টেপ মেশিনটি রেকর্ড করা বন্ধ করে দিয়েছে মনে হয়।  কিছু বলুন এবং দেখি  তো এটি এখনও ঠিকমতো কাজ করছে কি না।

ওয়ালেস স্টিভেনস একটি বিমা কোম্পানিতে ছিলেন।

আশা করি এটি আমাদের সাথে কিছুক্ষণ চলবে। আপনার মন্তব্যগুলোর একটি আমাকে আকৃষ্ট করেছে যা হচ্ছে কবিতা ও জনসেবার মধ্যে সম্পর্কের বিষয়টি, আমি মনে করি আপনি বুঝিয়েছেন কবির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সে ধরনের কাজ না নেয়া যা কবি হওয়ার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত।

আমি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয়টি বলিনি। আমি আসলেই এটা জানি না, কারণ আমি অন্যদের জন্য কথা বলতে পারি না, তবে অন্তত আমার জন্য আমি মনে করি, লেখালেখি করতে হয় এমন কাজ আমার না নেয়ার সুবিধা আছে, কারণ আমি আমার নোটবুক কিংবা কবিতার বইয়ে লিখি। উদাহরণ  দিই, আমি প্রফেসর নই কিংবা শিক্ষক নই কিংবা সাংবাদিকও নই। আমি বরং অন্য পেশা পছন্দ করি।

আপনার পেশাগত জীবনে এমন কিছু ঘটেছে কি না, অর্থাৎ কূটনীতিক হিসেবে আপনার অভিজ্ঞতা, যা কোনোভাবে আপনার কবিতার চিত্রকল্পকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে কিংবা প্রকাশের জন্য আপনার নির্বাচিত বিশেষ বিষয়সমূহের উপর প্রভাব ফেলতে পারে?

আমি বিশ্বাস করি না কোনো বিষয়বস্তু কিংবা কোনো চিত্রকল্প আমার কাজের দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে, যদিও আমি বলতে পারি- আপনি কীভাবে এটি অনুবাদ করেছেন: ‘লাস্ট স্টপ’-এর চরণগুলো: জনতার পাপে আত্মাসমূহ ভীতসন্ত্রস্ত হয়েছিল, প্রতিটি আত্মা খাঁচায় বন্দি পাখির মতো কাজে নিয়োজিত ছিল। আমি বোঝাতে চাই যে, এটি ছিল আমি সরাসরি জনসেবা থেকে নিয়েছি এমন একটি প্রতিচ্ছবি। কিন্তু আমি তাও অনুভব করতে পারতাম যদি আমি কুটনৈতিক সার্ভিসে নাও থাকতাম। কিন্তু এটি আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, আমি এমন একটি কাজে নিয়োজিত ছিলাম যা আমার সৃজনশীল কাজের সাথে সম্পৃক্ত ছিল না। এবং অন্য

বিষয়টি হলো আমি কীভাবে ব্যাখ্যা করব- আমি সাহিত্য-গোত্রভুক্ত মডেল নিয়ে কাজ করতে বাধ্য ছিলাম না। অবশ্য সেই পেশায় ভোগান্তি আছে। যা আমাকে সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে তা হচ্ছে যথেষ্ট সময় না পাওয়া। যদিও অন্যরা আপনাকে বলতে পারে যে, সময় না পাওয়াটা তুলনামূলকভাবে ভালো কারণ অবচেতন অবস্থাই কাব্যিক কাজ সম্পাদন করছে। এটিই হলো, টম এলিয়টের দৃষ্টিভঙ্গি। আমার মনে পড়ে একবার যখন আমি লন্ডন থেকে বৈরুতে বদলি হয়েছিলাম (লন্ডনে মাত্র দেড় বছর কাজ করার পরে), আমি তাঁকে বলেছিলাম, ‘প্রিয় এলিয়ট, আমার মনে হচ্ছে আমি আমার পেশায় ভীষণ বিরক্ত হয়ে পড়েছি এবং আমি এসব ছেড়ে দেব।’ আমার মনে আছে তিনি বলেছিলেন, ‘সাবধান হোন, যদি তা করে থাকেন তবে সাবধান হোন’ এবং অতঃপর তিনি অবচেতন, কবিতার অবচেতন ক্রিয়াশীলতার কথাটি বলেছিলেন। এবং আমি তাঁকে বললাম,‘হ্যাঁ, কিন্তু আমার যদি একটি কাজ থাকে, একটি দাপ্তরিক কাজ যা আমার মগ্নচৈতন্যে হস্তক্ষেপ করছে, তাহলে সেই কাজটি করতে আমি ইচ্ছুক নই। আমি বোঝাতে চাই আমি একজন কাঠমিস্ত্রি হতে চাই এবং যে কোনো স্থানে কাজ করতে চাই যেখানে আমার মগ্নচৈতন্য সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে যে কোনো কাজ করতে সক্ষম, সেটি নৃত্য হোক বা অন্য কিছু হোক।’ এবং আমি আরও বললাম, ‘আপনি জানেন, আমি আপনাকে বলতে পারি কখন আমার সামাজিক জীবন আমার মগ্নচৈতন্যে হস্তক্ষেপ করা শুরু করল। এটি ঘটেছিল ’৪০-এর সেপ্টেম্বরে ইটালিয়ানদের সাথে যুদ্ধের প্রাক্কালে, যখন আমি রাজনৈতিক স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম। অতঃপর আমি ভালোভাবেই জেনেছি যে, আমার অবচেতন সত্তা আমার দাপ্তরিক কাজের দ্বারা নিপীড়িত হচ্ছে। ‘‘স্বপ্নের মধ্যেই দায়িত্বের শুরু’’।’

আপনি একবার কবিতা ও রাজনীতির মধ্যে যোগসূত্র নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন।

আমি প্রপাগান্ডা লেখা কিংবা ‘ফরমায়েসি’ লেখা বলতে কী বোঝাচ্ছি কিংবা আমাদের সময়ের এ জাতীয় লেখাকে আপনি যে নামেই ডাকুন না কেন সে সম্পর্কে আমি যা বলেছি আপনি তা-ই বোঝাচ্ছেন। আমি বিশ্বাস করি যে, অনুভব-সংশ্লিষ্ট বাস্তব কোনো কিছু অনুভব হিসেবেই ব্যাখ্যাত হওয়া উচিত। আমি মনে করি না যে, ইস্কাইলাস যন্ত্র্রণাকাতর পার্সিয়ানদের কিংবা দুঃসাহসী জারেক্সেস কিংবা দারিয়াসের ভূত প্রমুখকে মঞ্চে উপস্থাপন করে কোনো প্রপাগান্ডা নাটক করছিলেন। পক্ষান্তরে, এর মধ্যে একটা মানবিক আবেগ ছিল, তার শত্রুদের জন্য। এমন নয় যে, গ্রিকদের সালামিসের যুদ্ধ জয়ে তিনি আনন্দিত হননি। এমনকি তখনও তিনি দেখিয়েছেন যে জারেক্সে’র পরাজয় ছিল স্বর্গ থেকে আরোপিত শাস্তি।  দম্ভের জন্য সাজা যা জারেক্সেস সমুদ্রকে কষাঘাত করে অর্জন করেছিল। সমুদ্রকে কষাঘাত করে যেহেতু সে দাম্ভিকতার পরিচয় দিয়েছিল সেহেতু সালামিসের যুদ্ধে সমুদ্র সমুচিত সাজাই দিয়েছিল।

জাতীয় সীমারেখায় কবিতাকে তুলনা করা সম্ভব কি? কিংবা আমরা কি সর্বদাই আবশ্যিকভাবে একটি মাত্র ঐতিহ্যের মধ্যে থেকে গুণগত তুলনা করে থাকি?

কবিতে কবিতে তুলনা করার বিষয়ে আমি এক প্রকার অনাগ্রহ বোধ করি। এটা খুবই কঠিন কাজ। এমনকি একই ঐতিহ্যের অনুসারী হলেও। উদাহরণ স্বরূপ: দান্তে এবং আলফ্রেড লর্ড টেনিসনের মধ্যে তুলনার চেষ্টা করুন, আমি জানি না তাতে কী প্রাপ্তি ঘটবে। কিংবা, ফরাসি ঐতিহ্যে, আপনি কীভাবে রাসিন ও ভিক্তর উগোর মধ্যে তুলনা করবেন? আপনাকে অনেক গভীরে যেতে হবে, ঐতিহ্যের তলদেশ পর্যন্ত যেতে হবে যাতে করে একটি সাধারণ ভিত্তি খুঁজে পেতে পারেন যেখানে দাঁড়িয়ে নিরপেক্ষ তুলনা হতে পারে। পক্ষান্তরে, উদাহরণস্বরূপ, আমি নিজে আমার স্টকহোম ভ্রমণ বক্তৃতায় ইয়েটসকে ব্যবহার করেছিলাম কারণ আমি স্টকহোম গমনের মাত্র কয়েক মাস আগে ‘বাউন্টি অব সুইডেন’ পড়ছিলাম যেখানে তিনি তাঁর নোবেল পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হওয়ার সব ঘটনা বর্ণনা করছেন : তাঁর স্টকহোম ভ্রমণ, পুরস্কার-প্রদান অনুষ্ঠান এবং সব কিছুই। এবং আমি মানুষ হিসেবে তাঁর সাথে এক ধরনের সম্পর্ক অনুভব করেছিলাম- কবি হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে কারণ ইয়েট্স একটি সমৃদ্ধ লোকজ ঐতিহ্যবিশিষ্ট দেশের অধিবাসী ছিলেন, যদিও দেশটিতে রাজনৈতিক গোলযোগ ছিল। প্রসঙ্গত, তাঁর মধ্যে একজন গণমানুষের কবির উদাহরণ আছে, তিনি প্রপাগান্ডা লেখেন না।  উদাহরণ স্বরূপ, তিনি কবিতা  লেখেন একজন আইরিশ বৈমানিককে নিয়ে যা মোটেও প্রপাগান্ডা না: যাদের সাথে আমি যুদ্ধে লিপ্ত তাদের আমি ঘৃণা করি না,  ইত্যাদি। কিংবা তিনি লিখেন ‘দ্বিতীয় আগমন’। সেটিও প্রপাগান্ডা নয়: ’কেন্দ্র ধারণ করতে পারে না’ ইত্যাদিও, যেটির শুরু মূলত আইরিশ রাজনৈতিক জীবনের কোথাও থেকে, কিন্তু এর অনেক গভীরতা এবং এটাই হলো আসল বিষয়, আমি মনে করি।

আপনি আপনার লেখায় ‘আসিনির রাজা’ কবিতাটি সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন যে, সেই বিশেষ অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লেখার পদ্ধতি ঠিক করতে আপনি দু-বছর সময় নিয়েছেন এবং অতঃপর কোনো একসময় সেই কবিতার জন্য নোটগুলো এক বন্ধুকে দিয়ে আপনি এক দীর্ঘ সন্ধ্যায় চূড়ান্ত খসড়াটি সম্পন্ন করেছিলেন। এলিয়ট ইঙ্গিত করেছেন, আপনি কবিতাটি লেখা শেষ করেছিলেন (রাত দশটা থেকে ভোর তিনটার মধ্যে) ঠিক এই কারণে যে আপনার সামনে আপনার নোটগুলো ছিল না।

download

আমার কোনো নোট ছিল না। এবং তিনি সম্ভবত ঠিকই বলেছেন। আমি জানি না। এ ক্ষেত্রে, আমার বাড়িতে আমার সব কাগজপত্র ও আমার বইগুলো আছে। এবং আমি ভেবে বিস্মিত হই, এটি আমার জন্য সহায়ক নাকি সহায়ক নয়, কোনো কাগজপত্র কিংবা কোনো বইপত্র ছাড়া ফাঁকা লেখার ডেস্ক থাকাটা অপেক্ষাকৃত ভালো নয় কি না, যেখানে প্রতিদিন আপনি নিয়মিত সময়ে বসতে পারেন।

আপনি কি সচরাচর কবিতা লেখার আগে কবিতাটির অভিজ্ঞতা নোট করেন?

ও, অনেক ধরনের পথ আছে। মাঝে মাঝে  করি, মাঝে মাঝে করি না। কিছু বিষয় আছে আপনাকে মনে রাখতে হবে এবং আমাকে ওগুলো কোথাও লিখে রাখতে হবে, অতএব, অবশ্যই আমি নোট করি। উদাহরণস্বরূপ, একটি কবিতা আছে যেখানে আমি ক্রনোগ্রাফার মাখাইরাসকে উল্লেখ করেছি, যেখানে ব্যভিচারের দানবটি সম্পর্কে সেই গল্পটির উল্লেখ না করাটা অসম্ভব ছিল।

আমি নোট বলতে বুঝাইনি যখন আপনার মনের মধ্যে কবিতাটি লেখা হয়ে গেছে, বরং সেই অভিজ্ঞতাসমূহকে নিয়ে নোট রাখা বুঝিয়েছি যা কার্যত কবিতার রূপ নিচ্ছে।

না, আমি তা করি না, যখন আমি নোট করি, তখন বোঝাই লেখার উপকরণ, নোট যেগুলো প্রয়োজন, কারণ সেগুলো বর্ণনামূলক। এবং এমন নোটও আছে সেগুলোতে আছে ভাবনা, কবিতা লেখার ভাবনা। যেমন কাব্যিক প্রকাশ, কাব্যিক উচ্চারণসমূহ, আমি নোট বলতে সে ধরনের নোটকে  বোঝাই। যদি আপনার সম্পর্কে আমাকে একটি কবিতা লিখতে হয়, আমি নোট করতাম এভাবে যে ‘মাইক অনেক বছর ধরে ধূমপান থেকে বিরত আছে।’ আমি বোঝাতে চাই যদি কোনো কিছু গ্রিক ভাষায় আমার কানে ভালো শোনায়, আমি তা লিখতাম। ওটাই আসল কথা- সেসব বিষয় যেগুলোর অন্যের কাছে মূল্য নেই। এগুলোকেই আমি কাব্যিক নোট বলি। মাঝে মধ্যে আমি সেগুলো সম্পূর্ণ অবহেলা করি, এবং মাঝে-মধ্যে আমি তাদের কাছে ফিরে যাই। কখনও বা সেগুলো যখন সম্পূর্ণ বিস্মৃত হই, তখন এক ঝলক ওগুলো দেখে আমি বলি, ‘ও, ওই কবিতাটা বরং ভালো ছিল’, যদিও সাধারণ লোকের কাছে এগুলোর কোনো অর্থ নেই। তথাপি সেগুলো আমাকে একটা বিশেষ অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়, যা ইতোমধ্যে আমার মনে ক্রিয়াশীল রয়েছে, সম্প্রসারিত হচ্ছে, একটা অবয়ব তৈরি করছে।

আপনি কি এসব নোট সংরক্ষণ করেন, না কি ধ্বংস করেন?

ও, আমি অনেকগুলো ধ্বংস করে ফেলি। কয়েক মাস আগে এক্ষেত্রে হেলেন জাতীয় একজন লোক নোটের ছবি তোলায় আগ্রহী হয়েছিলেন। এবং আমার ধারণা হয়েছিল যে, আমি দ্য চিসটার্ন‘র উপর লেখা আমার নোটগুলো রেখে দিয়েছিলাম। আমার সব নথিতে আমি সেগুলো খুঁজেছিলাম, অতঃপর আমার কাছে প্রতীয়মান হলো যে, আমি সেগুলো ধ্বংস করে ফেলেছি। শুধু ‘নোটস ফর আ উইক’টি আমি খুঁজে পেয়েছিলাম যা অতি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে, অর্থাৎ সেই নোটগুলোর মধ্য থেকে হারানো দুটো কবিতা।

যেভাবেই হোক আমি এ ব্যাপারে দুঃখিত, কারণ আমি মনে করি দ্য চিসটার্ন এমন একটি কবিতা যা তার বিভিন্ন পর্যায়ে আমাদের কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়েছে এবং সেক্ষেত্রে নোটগুলো সহায়ক হতে পারত, কোনো না কোনোভাবে আমার জন্য সহায়ক হতে পারত।

এ নিয়ে অভিযোগ করবেন না। ওগুলো কবিতাটিকে আরও দুর্বোধ্য করতে পারত। উদাহরণস্বরূপ, কাব্যে আমার বিবর্তনের সাধারণ ধারণাটি হচ্ছে: ‘আহ, আপনি দেখেন, সেফেরিস নিয়মিত পঙক্তি, অন্ত্যমিল ও কঠিন রীতিসিদ্ধ পদ্যময়তা দিয়ে শুরু করেছিলেন এবং অতঃপর মুক্তছন্দের দিকে ধাবিত হলেন’, যখন আমি আমার নোট প্রত্যক্ষ করি, আমি দেখি যে, স্ট্রফি গ্রন্থের প্রধান কবিতা ‘এরোতিকোস  লোগোস’ অত্যন্ত কঠিন রীতিসিদ্ধ পদ্যময়তা দিয়ে লেখা হয়েছে, কিন্তু আমার নোটগুলো বলে যে, এই কবিতাটিও মুক্তছন্দে লেখা হয়েছে। আমি প্রথম দিকের কিছু খসড়া খুঁজে পেয়েছি।

আপনি কি এগুলো প্রকাশের বিষয়টি কখনও ভেবেছেন?

ঈশ্বরের দোহাই, না।

আপনি কি মনে করেন এলিয়ট এজন্যই দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড-এর হারোনো অংশগুলো পুনরুদ্ধার না করার ব্যাপারে খুবই সজাগ ছিলেন, যা ইদানীং পুনরাবিষ্কৃত হয়েছে।

যখন তিনি আমার কাছে দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড রচনার কাহিনি বর্ণনা করেছিলেন, তাঁকে হারানো পাণ্ডুলিপির ব্যাপারে খুবই মরিয়া মনে হয়েছিল। অপরপক্ষে তিনি আমাকে আরও বলেছিলেন, কত না অর্থবহ ছিল, তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, পাউন্ডের হস্তক্ষেপ সত্যিকার অর্থে কতই না অর্থবহ ছিল।

আপনি কি পরিত্যক্ত লেখাগুলোর প্রকাশ সমর্থন করেন?

বলতে পারব না, এটা নির্ভর করে। এর জন্য প্রয়োজন যথেষ্ট কৌশলী হওয়া। কবির নিজের দ্বারা নয়। সম্পাদকদের দ্বারা। যদি তারা প্রকাশ করে, তবে তারা গুরুত্ব দিতে চাইবে যে, লেখাগুলো মহামূল্যবান আবিষ্কার, এবং আমি এটিকে খারাপ মনে করি।  অতিরঞ্জন, সম্পাদক এবং ভাষাতাত্ত্বিকেরা সবসময় অতিরঞ্জন করে আসছে, আমি তা-ই মনে করি।

আপনার একটা ডায়েরি, যেটি আমার স্ত্রী ও আমি অনুবাদ করেছি, তার একটি অংশে দেখি, আপনার সাথে এলিয়টের সম্পর্ক আপনার জীবনে নানাভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমি জানি না পাশ্চাত্যের অন্য কোনো সাহিত্যিকও আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কি না। আমি বিশেষ করে হেনরি মিলার এবং লরেন্স ডুরেলের কথা ভাবছি এবং হতে পারে আরও কেউ আছেন। কিন্তু আমি জানি না। আমি আপনার স্বদেশি লেখকদের কথাও ভাবছি: উদাহরণস্বরূপ থেয়োতোকাস এবং কাতসিমবালিস।

আপনি জানেন, ডুরেল আমার চেয়ে বয়সে অনেক নবীন। তাঁর সাথে যখন আমার দেখা হয় তখন তাঁকে খুবই চমৎকার তরুণ মনে হয়েছে। তাঁর বয়স পঁচিশের কাছাকাছি ছিল। আমি হেনরি মিলারসহ তাঁর সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম। মারোউসি, কাতসিমবালিসের মূর্তি দর্শনে তাঁরা আথেন্সে এসেছিলেন। যদি আমার স্মৃতি ঠিক থাকে তবে সেদিনটি ছিল যুদ্ধ ঘোষণার দিন।

অবশ্য সেই জায়গায় কাতসিমবালিসের মূর্তিটি অতিকায় ছিল না।

না, তবে মিলার তাঁকে অতিকায় কিছু বানানোর ভয় দেখাচ্ছিলেন।

হ্যাঁ, তিনি তা-ই করেছিলেন।

তাঁর সাথে দেখা হওয়াটা আনন্দদায়ক ব্যাপার ছিল।  বলতে গেলে তাঁরা হলেন প্রথম, ঠিক প্রথম না হলেও দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় পর্যায়ের পাঠক যাঁরা আমি যা করছিলাম তা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। উদাহরণ টেনে বলি, তাঁদের একজন, মিলার কিংবা লরি, আমার কবিতাগুলো পাঠ করার পর আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনি জানেন, আপনার যে দিকটা আমি পছন্দ করি তা হচ্ছে আপনি বিষয়ের ভেতরটা বের করে আনেন। এবং আমি তা ভালো অর্থে বোঝাচ্ছি’। ওটা ছিল আমার জন্য একটি চমৎকার প্রশংসা।

তাঁরা আপনার কবিতার সাথে কীভাবে পরিচিত হলেন?

সে সময় কাতসিমবালিস-এর কেবল ইংরেজি অনুবাদ ছিল। আমি বোঝাচ্ছি যে তা ছিল পাণ্ডুলিপি অনুবাদ।

[প্রথম কিস্তি]

………………………..

10155242_10152789325289270_734364820010589418_n
।।কুমার চক্রবর্তী।। কবি, গদ্যকার, অনুবাদক
Advertisements