11249232_10207651711121420_6877347365566513940_nএকটা সময় ছিল সাম্রাজ্যবাদীরা সরাসরি দেশ আক্রমণ করত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ব্রিটিশ ইম্পেরিয়ালিজমের প্রতিক্রিয়ায় ন্যাশনালিজমের উত্থান ঘটতে লাগল। বিভিন্ন কলোনিতে আসল জাতীয়তাবাদের চেতনা, শুরু হল স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন। একসময় সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশেরা বাধ্য হয়ে স্বাধীনতা দিয়ে সরে গেল।

কিন্তু সরে যাবার পর তারা আরেক পদ্বতিতে শোষন জারি রাখল। সেটা হল রাষ্ট্রনেতাদের হাত করে দেশের সম্পদ লুটে নেয়া। আরো আছে গরীব দেশগুলোতে ইনভেস্ট করে অল্প দামে শ্রম কিনে নেয়া। অনুন্নত দেশগুলোতে শিশুশ্রম, শ্রমের দাম, শ্রমিক স্বাস্থ্য, পরিবশ বিষয়ক বিধিনিষেধ এইগুলা নেই বললেই চলে। সুতরাং, এই সুযোগ ব্যবহার করে অল্প খরচে পণ্য তৈরীর সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। গ্লোবাল কর্পোরেট ব্রান্ডদের মাধ্যমে তাই শুরু করা হল ইম্পেরিয়ালিজমের নতুন মাত্রা।

কিং লিওপল্ড’স গোস্ট উপনিবেশ আর তার পরবর্তীতে উপনিবেশ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবার যে নতুন রূপ, একই ধারাবাহিকতা, উপনিবেশের এই দুই স্তরকে উপজীব্য করে নির্মিত এক দুর্দান্ত ডকুমেন্টারী ফিল্ম। যেখানে দেখানো হয়েছে কঙ্গোতে বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপল্ডের অমানুষিক নির্যাতন এবং তার পরবর্তীতে তার “ভূত”দের উপদ্রব। লিওপল্ডের ভূত আমাদের বাংলাদেশের মতন অনুন্নত দেশগুলির জন্যও প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্রীয় নানা স্তরে, চারপাশে ভুরিভুরি উদাহরণ আছে এসবের;   প্রসঙ্গক্রমে দিনাজপুরের ফুলবাড়ি উপজেলার কয়লাখনি কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনায় অতি নতুন লিওপল্ডের ভূতেদের কথা স্মরণ করা যায়। ১৯৯৪ সালে এই কয়লাখনি বিষয়ে একটি অষ্ট্রেলিয়ান কোম্পানির সাথে অনুসন্ধান চুক্তি করে বিএনপি। অষ্ট্রেলিয়ান কোম্পানি ১৯৯৭ সালে তাদের লিজিং চুক্তি বিক্রি করে দেয় এশিয়া এনার্জি নামে একটি যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক কোম্পানির কাছে।

ইন দ্য ইয়ার অফ ১৯৯৭, তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের সাথে এশিয়া এনার্জির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০০৫ সালে এশিয়া এনার্জি অনুসন্ধান করে তৎকালীন বিএনপি সরকারের কাছে রিপোর্ট পেশ করে।

এই রিপোর্ট গৃহীত হলে, তারা পেত ত্রিশ বছরের জন্য লিজ। তারা কয়লা তুলতে পারত, বিক্রি করতে পারত। আর বাংলাদেশ পেত রয়্যালটি হিসেবে ৬ শতাংশ।

আর চুক্তি অনুযায়ী এই কয়লা উত্তোলিত হত উন্মুক্ত পদ্বতিতে। এতে আশপাশের পরিবেশ এবং জনজীবনে পড়ত মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব। বাংলাদেশের জন্য এই পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন সঠিক-পন্থা নয় বলে পরিবেশবিদদের অভিমত।

২০০৬ সালের ২৫ সে আগস্ট ফুলবাড়ি উপজেলায় কয়লাখনি প্রকল্প বাতিল, ও যুক্তরাজ্য ভিত্তিক কোম্পানি এশিয়া এনার্জিকে প্রত্যাহারসহ ৬ দফা দাবিতে জমায়েত হন ফুলবাড়ির মানুষ। তাদের উপর তৎকালীন বিডিআর গুলি চালায়। অনেকের গায়ে গুলি লাগে। আহত হন অনেক লোক, নিহত হন কয়েকজন।

এর প্রতিবাদে জনতা এশিয়া এনার্জির অফিস ভাঙচুর করে। শুরু হয় লাগাতার হরতাল। সরকার বাধ্য হয় ছয়দফা দাবী মানতে। সমঝোতা করা হয় আন্দোলনকারীদের সাথে।

11825798_10207651722601707_8399988933401024190_n
কিং লিওপল্ড

একে বলা হয় ফুলবাড়ি ট্র্যাজেডি

উপরে যে তথ্যগুলো দেয়া হল, তার সূত্র- হায়দার আকবর খান রনোর লেখা- আমাদের সংগ্রাম চলবেই… ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প ও গণঅভ্যুত্থান। প্রকাশিত হয় ” মুক্তান্বেষা” প্রথম বর্ষ,  প্রথম সংখ্যায়।

এভাবেই নানারূপে লিওপল্ডের ভূতেরা তাদের ‘অমঙ্গলম’ প্রতিষ্ঠা করে যাচ্ছে সারা দুনিয়াকে এক নব্য-উপনিবেশের আওতায় আনার ভেতর দিয়ে।

লিওপল্ড’স গোস্ট ফিল্মটি ভূতেদের এই অতি অজস্র রূপের মধ্যে থেকে খোদ লিওপল্ডেরই বেলিজিয়ামে চালানো উপনিবেশের ক্রূরতা উপজীব্য করে তৈরি। এই শোষণ প্রক্রিয়ার যে কেউই একেকজন লিওপল্ড, কিংবা লিওপল্ডের ভূত। সারা দুনিয়া আজ এদের ষড়যন্ত্র, কৌশলের কাছে হাঁটু গেঁড়ে বসে আছে যেন। কিছু ফিল্ম আছে যেগুলো দেখার আগে একজন যেই মানুষ থাকে, দেখার পরে হয়ে যায় অন্য মানুষ। চিন্তা ভাবনায় অনেক পরিবর্তন আসে। অনেক সময় চিন্তা খুব মারাত্মকভাবে পরিবর্তিতও হয়ে যায়। সেরকমই একটা ফিল্ম কিং লিওপল্ড’স গোস্ট। ডকুমেন্টারী ফিল্মটি বানানো হয়েছে এডাম হর্সচাইল্ডের লেখা বইয়ের উপর ভিত্তি করে। পরিচালনা, বর্ণনা এবং বলা যায় পুরো মেকিংটাই অসাধারণ। শুধু মেকিং এর দিক থেকেই এটিকে একটি অন্যতম সেরা ডকুমেন্টারী ফিল্ম বলা যায়। পরিচালনা করেছেন পিপ্পা স্কট।

মানুষের ইতিহাস হচ্ছে দূর্বলকে নির্যাতনের ইতিহাস। কলোনির ইতিহাস যদি দেখা যায়, যত জায়গায় কলোনি করেছে সবল রাষ্ট্র সব জায়গাতেই নির্যাতন হয়েছে অকথ্য। এই ফিল্মে বেলজিয়ামের কিং দ্বিতীয় লিওপল্ডের কঙ্গোতে চালানো যেসব ভয়ংকর নির্যাতনের চিত্র আছে, তা কোনভাবেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হিটলারের চেয়ে কম না। অনেকক্ষেত্রে বেশিই।

এই দ্বিতীয় লিওপল্ডের মনের বাসনা ছিল কলোনি তৈরী করবে। তার কাজিন- কুইন ভিক্টোরিয়ার কলোনি, এবং আরো বিভিন্ন ইউরোপীয় রাষ্ট্রের কলোনি দেখে তার মনে শান্তি ছিল না। সে এক্সপ্লোরার পাঠাল কঙ্গো বেসিনে।

তার নিযুক্ত এক্সপ্লোরার স্ট্যানলি গেল কঙ্গোতে। গিয়ে প্রথমে ‘বান্দর’ মনে করে কিছু কালো মানুষ মারল। তারপর কালোদের পিঠে চেপে বসল। তখন এইসব অঞ্চল দূর্গম ছিল। তার সাথের কিছু লোক মারা পড়ল বিভিন্ন রোগে।

লিওপল্ড কঙ্গোকে বলত ম্যাগনিফিসেন্ট কেক, যার এক টুকরাও ছাড়া যাবে না। সে স্ট্যানলিকে নির্দেশ দিল একটা বাহিনী তৈরী করতে। সেই বাহিনীকে অস্ত্র দেয়া হল। স্ট্যানলি লিওপল্ডের নির্দেশ মত কঙ্গোর বিভিন্ন গোত্র-প্রধানদের সাথে চুক্তি করতে লাগল। বিভিন্ন জিনিসের বিনিময়ে গোত্রপ্রধানরা স্বাক্ষর দিয়ে দিল। কীসে স্বাক্ষর দিল বুঝতে পারল না, কারণ লেখাপড়া তাদের কাছে অজানা ছিল।

Slaves_ruvuma

এইভাবে লিওপল্ড- স্ট্যানলির মাধ্যমে গোটা কঙ্গো লিখে নিল গোত্রপ্রধানদের কাছ থেকে। তারপর শুরু হল কঙ্গোতে হাতিমারা। কারণ হাতির দাঁতের মূল্য অনেক। হাতির দাঁত দিয়ে অনেক বিলাস-দ্রব্য হয়। ইউরোপে অনেক কদর এগুলোর।

হাজার হাজার হাতি নিধন হল। সেগুলোর দাঁত খুলে নিয়ে আসা হল বেলজিয়ামে। চলল হাতির দাঁতের ব্যবসা। বিলাসী অভিজাতরা হাতির দাঁতের কারুকার্য-খচিত দ্রব্যাদি দিয়ে নিজের ঘর বা অফিসের সৌন্দর্য বর্ধন করতে লাগলেন।

লিওপল্ড এইদিকে ঠিক করল যে, তার পুরা দেশের মালিক হতে হবে। বিভিন্ন পত্রিকায় কঙ্গোতে তার মহানুভবতার কথা প্রকাশ করল সে। প্রচারণার ব্যাপারে সে ছিল অসাধারণ। এরপর কায়দা কসরত করে তখনকার বিশ্ব নেতাদের কাছে কাগজ-টাগজ দেখিয়ে নিজেই মালিক হয়ে বসল কঙ্গোর। মানে কঙ্গো পুরা দেশটার মালিক সে একাই।

এরপর শুরু হল তার আসল একশন। স্ট্যানলিকে দিয়ে রেললাইন বানানোর কাজ শুরু করাল। মানুষদের বাধ্য করল পাথর ভেঙে কাজ করতে। যারা কাজ করতে অস্বীকৃতি জানাত, এদের উপর নেমে আসত দুর্ভোগ; এবং শেষপর্যন্ত মৃত্যু।

কঙ্গো বেসিনটা সম্পদে পরিপূর্ণ। রাবার, ইউরেনিয়াম ইত্যাদি নানা ধরনের সম্পদ। লিওপল্ড রাবার সংগ্রহে বাধ্য করল কঙ্গোর লোকদের। এই কাজটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কারণ, খালি হাতে রাবার সংগ্রহ করতে হত। লোকদের এই কাজে বাধ্য করতে- নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের ধরে নিয়ে যাওয়া হত। যেরকম এই অঞ্চলে করেছিল নীলকরেরা।

রাবার সংগ্রহে যারা জঙ্গলে যেত, তারা কম রাবার নিয়ে আসলে তাদের হাত কেটে ফেলা হত। শিশু, বৃদ্ধ, নারীসহ অজস্র লোকের হাত কাটা হয়েছে সে সময়।

এক ভয়ংকর কলোনিয়ালাইজেশনের ইতিহাস। পুরো ফিল্মে দেখানো হয়েছে কঙ্গো কীভাবে নির্যাতিত হয়েছে লিওপল্ডের মাধ্যমে। এবং এখন আরো লিওপল্ড অথবা লিওপল্ডের ভূতেরা সেখানে শোষণ চালাচ্ছে।

আমেরিকা হাত বাড়িয়েছে কঙ্গোর দিকে।

নানা ধরনের খনিজের সাথে কঙ্গো ইউরেনিয়ামেও পূর্ণ। হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে যে লিটল বয়  আর ফ্যাটম্যান ফেলা হয়েছিল এগুলোর আশিভাগ ইউরেনিয়াম সংগৃহীত হয়েছিল এই কঙ্গো থেকে। কঙ্গোর লোকদের দিয়ে খালি হাতে এসব সংগ্রহ করানো হয়েছে।

কঙ্গোতেও লিডার এসেছিলেন। নির্যাতিত জাতিকে মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন প্যাট্রিক লুবুম্বা। মনে হয়েছিল তখন লিওপল্ডের ভূতের কবল থেকে মুক্তি পেতে যাচ্ছে কঙ্গো। কিন্তু তাকে কম্যুনিস্ট আখ্যা দিয়ে খুন করার পথ করে দেয় ইউনাইটেড স্টেটস অব অ্যামেরিকা। তারপর বেলজিয়ামের সাথে মিলে ক্যু করায়। প্যাট্রিক লুবুম্বাকে ধরে নিয়ে দুই-তিন ঘন্টা নির্যাতন করে খুন করা হয়।

ফিল্মে ধরে নেয়ার পর অসহায় লুবুম্বার মুখ দেখা যায়। এর চেয়ে করুণ দৃশ্য খুব কম দেখা যায়। লুবুম্বা তখন মানুষের হিংস্র বর্বরতায় ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলেন। তার কী তখন নিজের দেশের কথা ভেবে দুঃখ হচ্ছিল? যে দেশকে স্বাধীন করেও তিনি মুক্ত করতে পারলেন না।

এ প্রসঙ্গে মনে করা যায়, ১৯৫৩ সালে আমেরিকা-ইংল্যান্ডের করানো সামরিক ক্যু এর মাধ্যমে একইভাবে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছিল ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেককে। কারণ মোসাদ্দেক তেল ইন্ড্রাস্ট্রিকে জাতীয়করণ করতে চেয়েছিলেন যেটা ১৯১৩ সাল থেকে ছিল অ্যাংলো-পারসিয়ান ওয়েল কোম্পানির অধীনে। মোসাদ্দেক ছিলেন এন্টিকলোনিয়াল মনোভাবের, ডেমোক্র্যাটিক এবং মানবাধিকারের প্রতি কমিটেড।

মোসাদ্দেককে গ্রেফতার করা হলেও খুন করা হয়নি। মোসাদ্দেককে সরানোর পর ইরানে আমেরিকান পেট্রোলিয়াম কোম্পানিগুলো কাজ শুরু করে দেয়। ফ্রান্সের এবং ডাচ পেট্রোলিয়াম কোম্পানিও কাজ শুরু করে।

কঙ্গোর ভাগ্যেও তেমন পরিণতিই জোটে। প্যাট্রিক লুবুম্বাকে ধরে নিয়ে খুন করা হয়। লুবুম্বার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসে আমেরিকার বসানো স্বৈরশাসক। যে দেশের সম্পদ ডাকাতিতে বিদেশীদের সাহায্য করার পাশাপাশি, ইউরোপে বাড়াতে লাগল নিজের সম্পদ। হানাহানি, খুন, বীভৎসতার দিকে আবার ফিরে গেল কঙ্গো। আবার ফিরে আসল এবং জেঁকে বসল লিওপল্ডের ভূত।

ভালো মানুষও আছেন এই কিং লিওপল্ড’স গোস্ট ফিল্মে। ই. ডি. মোরেল কিংবা জর্জ ওয়াশিংটন উইলিয়ামস লিওপল্ডের নির্যাতনের প্রতিবাদ করে গেছেন। উপন্যাস লেখক জোসেফ কনরাড ভাবতেন, কঙ্গোতে কিং লিওপল্ড উন্নয়ন করছেন, ভালো কাজ করছেন। পত্রিকা ও প্রচারণা দেখে কনরাড লিওপল্ডের মহানুভবতার ভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি একবার ভ্রমণে গেলেন কঙ্গো। কঙ্গোতে লিওপল্ডের নির্যাতনের বিভীষিকা দেখে ফিরে এসে মানবজাতি সম্পর্কে তার ধারণাই পাল্টে যায়। তিনি লিখেন ইংরেজি ভাষার একটি বহুল-পঠিত ক্ষুদ্রাকৃতির উপন্যাস হার্ট অব ডার্কনেস, যার নায়কের সেই উক্তি- The horror! The horror! যা পাঠককে অন্ধকার এক বিভীষিকার সামনে দাড় করিয়ে দেয়।

ফ

আমাদের মতন দেশগুলোতে যে বিদেশী লুটেরাদের তৎপরতা, সেগুলো অনুধাবনের জন্য কিং লিওপল্ডের ভূত ডকুমেন্টারী সহায়ক হতে পারে। আমরা সাধারণত আফ্রিকায় কলোনিয়ালাইজেশনের ইতিহাস জানতে পারি না। পাঠ্যপুস্তকে নাই, মিডিয়াতে আসে না, বই-টই এসব নিয়ে বেশি লেখা হয় না। ফলে আমরা একটু আধটু জেনেই হালকা ভাবে কলোনিয়ালিস্টদের ব্যাপারে ধারণা নিয়ে বসে থাকি। এই কারণে পৃথিবীর সামগ্রিক পরিস্থিতি বুঝতে অসুবিধা হয়। মিডিয়া যেটা দেয়, সেটাকে পরখ করার কোন পথ থাকে না।

কিন্তু এরকম প্রামাণ্যচিত্র সেই অজানা অজস্র বিষয়ের ওপর আলো ফেলে। কার ব্রুটালিটি কেমন ছিল তা জানায়। জানায় যারা আমাদের মানবতার গান শেখাচ্ছে, তারা আদৌ আমাদের মানবতা শেখানোর যোগ্য কী না!

আজকের বেলজিয়ামের ডায়মন্ডের জাঁকজমক কঙ্গোর সম্পদ, এবং মানুষের লাশের উপর গড়ে উঠেছে এইসব। কঙ্গোর ছোট ছোট শিশুরা অস্ত্র হাতে নিজেদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করে মরছে। এগুলোর সবই এই সাম্রাজ্যবাদীরা তৈরী করে রেখেছে। এই ইউএসএ, বেলজিয়াম। লিওপল্ডের ভূতেরা।

ক্যাপিটালিস্ট সমাজ এবং মিডিয়ার যুগে নিত্য-নতুন এতো এতো ইলেক্ট্রনিক পণ্যের সমারোহ। এসব ইলেক্ট্রনিক পণ্যের ট্যানটালাম ক্যাপাসিটর তৈরীর জন্য ব্যবহৃত কোলটানের প্রায় ৭০ ভাগের বেশি আসে কঙ্গো থেকে। সেখানে খালি হাতে এগুলো লোকদের দ্বারা সংগ্রহ করানো হয়। এগুলো স্মাগলিং-এ বড় হাত বিস্তার করে আছে লিওপল্ডের ভূত, প্রাণহানি হচ্ছে নিরন্তর।

এই যে বিদেশী কোম্পানি যারা ফুলবাড়ির মানুষদের প্রতিবাদ ও আন্দোলনের মুখে কয়লা উত্তোলন করতে পারল না, তাদের ক্ষমতা থাকলে এবং আমরা আরেকটু দূর্বল হলে নিশ্চিত তারা কয়লা তুলতে বাধ্য করত। আমাদের দেশের শ্রমিক দিয়েই উন্মুক্ত পদ্বতিতে চালানো হতো সেই কাজ। কঙ্গোর পুনরাবৃত্তি। এটা করার সুযোগ থাকলে তারা অবশ্যই করত, কারণ লাভ ছাড়া তাদের কাছে বিবেচ্য আর কিছুই নেই। যেখানে এরকম শক্তি খাটানোর সুযোগ পাচ্ছে সেখানে তা করছে। কঙ্গোতে করছে। বিশৃঙ্খলা তৈরী করে এর সুযোগ নিচ্ছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে, তাদের একে অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরী করে দিচ্ছে। আর সুনিপুণভাবে চালিয়ে যাচ্ছে আগ্রাসন। সেই আগ্রাসনের প্রামাণ্য এক রূপরেখা নিয়ে হাজির হয় কিং লিওপল্ড’স গোস্ট; আর দর্শককে ছুঁড়ে মারে অনেক অনেক প্রশ্ন, পুনর্বিবেচনার মুখে। হরর! ইট’স হরর! The horror! The horror!

album

…………………………..

11406933_10205563453240179_613164010916778529_n
।।মুরাদুল ইসলাম।। গদ্যকার, অনুবাদক

Advertisements