2783662যৌনতা এই সময়ের সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়েবসাইটের সিংহভাগই যৌনতাকেন্দ্রিক। মানুষের কল্পিত বা অকল্পিত যতরকম যৌনবাসনা আছে সেসবের বাস্তবরূপ এই ওয়েবসাইটগুলো। মানুষ হিসেবে নারীর মর্যাদা ও সম্ভাবনাকে সমূলে ধ্বংস করার মূর্তপ্রতীক। যেহেতু মূল সভ্যতাটাই এখন দাঁড়িয়ে আছে ডাকাতি, রাহাজানি বা নির্বিচার বাণিজ্যের ওপর। এই ব্যবসাটাকেও তাদের ভাষায় দেখতে হবে স্রেফ লাভজনক ব্যবসা হিসেবে। কারণ মূর্ত-বিমূর্ত সবকিছুই এখন ব্যবসা। শুধু ওয়েবসাইটগুলো নয়, সারা পৃথিবীতে প্রভাব বিস্তারকারী বিশাল চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি হলিউডেরও অধিকাংশ ছায়াছবির বিষয় এই যৌনতা। এমনকি হলিউডের ভারতীয় ভার্সন বলিউডি ছায়াছবিরও অধিকাংশ এখন যৌনতা-নির্ভর। মানবিক-অমানবিক কাহিনির ভেতরই তারা এই যৌনতা প্রয়োগ করে এবং দর্শকদের এই আদিম বাসনাকে উস্কে দিয়ে মাতাল করে রাখে।

সম্প্রতি “লিজিয়া” ছবিটি দেখে এই ধারণা আরও বদ্ধমূল হলো। “লিজিয়া” ছবিটি মূলত কিনেছিলাম এডগার অ্যালানপোর নাম দেখে। ডিভিডির কাভারে লেখা ছিল এডগার অ্যালানপোর লিজিয়া। এডগার অ্যালানপো লেখক হিসেবে বড় কি না সে প্রশ্ন অবান্তর। প্রায় পাঠকের ছোটবেলায় পড়া অ্যালানপোর লোমহর্ষক গল্পগুলো আর ফরাসি কবিগুরু মহাত্মা শার্ল বোদলেয়ারের অ্যালানপোর কবিতা ও গদ্য নিয়ে মাতামাতি। বোদলেয়ার নাকি ইংরাজি শিখেছিলেন অ্যালানপো অনুবাদ করার জন্য। অ্যালানপোকে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে একটা আলাদা আসন দেয় এই সব ঘটনা। অ্যালানপোর গল্পগুলো আঙ্গিক ও বিষয়বস্তুর কারণে ইতিমধ্যে ক্লাসিক পর্যায়ে উন্নীত। অ্যালানপোর গল্পগুলোর মধ্যে ভয়ের আবহ থাকলেও ভায়োলেন্স প্রকাশ্য নয়। যৌনতা তো নেই বললেই চলে। কিন্তু হলিউডি পরিচালক মাইকেল স্টাইনিংগার এই লিজিয়া গল্পটিকে একটি ভায়োলেন্স ও যৌনতাকেন্দ্রিক হলিউডি হরর থ্রিলারে পরিণত করেছেন।

অ্যালান পো’র রচনাসমগ্র পড়েছিলাম বেশ আগে। ছবিটি দেখে অবিশ্বাস্য ঠেকায়, ফের লিজিয়া গল্পটা পড়ে অবাক হয়ে যেতে হলো। গল্পটির মধ্যে যা নেই তা দিয়ে ছবিটি বানানো। গল্পটির সব স্বকীয়তা সব সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে রূপান্তরিত করা হয় একটা রগরগে যৌন ফ্যান্টাসিতে। অ্যালান পো’র ‘লিজিয়া’ গল্পটি বলতে গেলে পুরোটাই আফিম সেবনকারী এক কত্থকের বয়ান। অ্যালানপো দুর্দান্ত সংবেদনশীল কবি ও গল্পকার। তিনি বুঝেছিলেন তার বানানো এই গল্পটির যদি বৈজ্ঞানিক সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে তখন কী হবে। তাই তিনি এই লোমহর্ষক গল্পটিকে বলিয়েছেন এক আফিম সেবনকারী স্মৃতিভূককে দিয়ে। গল্পটির লিজিয়া চরিত্রটি অষ্টাদশ শতকের কোনো ইউরোপীয় বিদুষীর চিত্র। গল্পটির কত্থকের মুখ থেকে শুনলে ব্যাপারটি স্পষ্ট হবে।

অবশ্য লিজিয়ার সৌন্দর্যের বিষয়ে আমার স্মৃতি লোপ পায় নাই। সে ছিল দীর্ঘ, একহারা, শেষের দিকে কিছুটা ক্ষীণকায়া। তার আচরণের মাহাত্ম্য শান্ত সরলতা। তার চালচলনের মসৃণতা। যতক্ষণ সে শ্বেতমর্মরোপম হাতখানি আমার কাঁধে রেখে মধুর সুরে আমার নাম ধরে না ডাকত ততক্ষণ পর্যন্ত সে যে আমার ঘরে ঢুকেছে তা আমি বুঝতেই পারতাম না। সে যেন আফিম ফুলে স্বপ্নে ভরা উজ্জ্বলতা, এক বায়বীয় আত্মিক সৌন্দর্য যা দেবত্বের মহিমায় মহিমান্বিত।

…রূপের কথা রেখে এবার লিজিয়ার জ্ঞানের কথায় আসি।

অগাধ পাণ্ডিত্য কোনো নারীর মধ্যে এমনটি আমি দেখিনি। প্রাচীন ভাষায় তার দক্ষতা সুগভীর। আর ইউরোপের আধুনিক ভাষাসমূহ আমি যতদূর জানি, তাতে কখনও কোথাও তাকে ভুল করতে দেখিনি। যতদিন কেটেছে ততই তার বিদ্যা-বৈদগ্ধে আমি মুগ্ধ হয়েছি।

অবশেষে সেই লিজিয়াও যখন মরে যায় তখন নায়কের অবস্থা হয়েছিল খানিকটা মজনু বা দেবদাসের মতো। কিন্তু তবুও এরপর সে বিয়ে করে লেডি রোয়েনাকে। সে রোয়েনাকে ধীরে ধীরে লিজিয়া হয়ে উঠতে দেখে আশ্চর্য হয় এবং পাঠকদের চমকিত করে। এখন আমরা যদি প্রশ্ন করি অ্যালানপো মশাইকে। এটা কি সম্ভব! তখন তিনি বলবেন সম্ভবের প্রশ্ন নয়। নায়ক কিন্তু আফিমসেবী মাতাল। কী দেখতে কি দেখেছে তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে। এখানেই গল্পকারের শ্রেষ্ঠত্ব হয়তো।

কিন্তু মাইকেল স্টাইনিংগার পরিচালিত ’লিজিয়া’য় লিজিয়া চরিত্রটিই একটা উদ্ভট ব্ল্যাক ম্যাজিক জানা মহিলা যে মানুষকে হত্যা করে তার প্রাণবায়ুকে বন্দি করে রাখে। আর তা দিয়ে ব্ল্যাক ম্যাজিকের চর্চা করে। মারাত্মক যৌনপ্রবণ লিজিয়ার যৌনদৃশ্য দেখে হলিউডি প্রথম শ্রেণির পর্নোছবি দেখার অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। সব ছবির কেন্দ্রবিন্দু দুটি সঙ্গম-দৃশ্য এবং সামগ্রিকভাবে লিজিয়া চরিত্রটিকে স্বাভাবিক পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে এমনভাবে চিত্রায়ণ করা হয়েছে যে, মহিলাদের প্রতিই একটা বিরূপ ধারণা তৈরি হতে বাধ্য। কারণ লিজিয়া নায়ককে তার গার্লফ্রেন্ডের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বিয়ে করে। এমনভাবে কব্জা করে রাখে যে, সে লিজিয়ার ইশারা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না।

download
এডগার অ্যালান পো

একের পর এক হত্যা তো আছেই। কেন এমন ঘটে? এ রকম ক্লাসিক রহস্য গল্প নিয়েও কেন হলিউডিরা যৌনতা আর হত্যা-ব্যবসা করে। এর সবকিছুর জবাব এক ব্যবসায়। হত্যা ও যৌনতা এখন সবচেয়ে বড় ব্যবসা। যা মার্কিনীরা গোটা দুনিয়ায় প্রসারিত করেছে। তাদের ছবি দেখে মনে হতে পারে নারী কেবলই একটা যৌনযন্ত্র। নারীদের মানুষ ভাবার সব সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেয় হলিউড তথা আমেরিকা। যৌন স্বাধীনতাই একমাত্র নারী স্বাধীনতা এই তাদের বলার বিষয়। না হলে এডগার অ্যালানপোর লিজিয়ার মতো এত অসাধারণ একটা নারী চরিত্রকে বেশ্যা আর পেশাদার খুনিতে রূপান্তরিত করতে তাদের হাত এতটুকু হলেও কি কুণ্ঠিত হতো না!

……………………………………………

1497682_10202292050160591_235710457_n
।। জাহেদ সরওয়ার।। কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক
Advertisements