wend_kuuni2আমার এবং আরও অনেকের পরিচিত মানুষ জায়েদ আজিজ লেখাটা দিয়েছিলেন তার পরিকল্পিত একটা বইয়ের একটা অধ্যায় হিসেবে, বেশ কয়েক বছর আগে। লেখাটা পড়ার পর ভাল লেগে গেল। অনুবাদও করে ফেলি, তখনই। কিন্তু যে কোন ব্যর্থতার কারণেই হোক বইটি নিয়ে তার তৎপরতা পরবর্তী সময়ে আর তেমন চোখে পড়েনি। তাকে বলেছিলাম, একবার লেখকের নামটা জানাতে, কারণ যে অধ্যায়টা আমাকে ফটোকপি করে দেওয়া হয়েছিল, তাতে লেখকের নাম ছিল না। তিনিও তখন পরে জানাবেন বলেছিলেন, তবে জানাননি। এদিকে সময় বয়ে গেলো বেশ কয়েক বছর। বইটা নিয়ে কোন তৎপরতা আর চোখে না পড়ার কারণে আমিও ভাবলাম, একসময় হয়তো লেখাটা আর ততটা জরুরী বলে মনে হবে না। তাই তার আগেই শেয়ার করা দরকার, এর টার্গেট পাঠাকের সঙ্গে।  লেখাটি ’নকটার্ন’- এর সাথে জড়িতদের ভাল লাগায়, তারা চেয়ে বসে তাদের ‌সাইটের জন্য। তো নিরুপায় হয়ে আবারও জায়েদ আজিজের সঙ্গে যোগাযোগ করি। কিন্তু দুজনেই চেষ্টা করে ব্যর্থ হই। জায়েদ আজিজ আশ্বাস দিয়েছেন, লেখককের নাম পাওয়ামাত্র আমাকে জানাবেন। নেটে আর লেখাটির অস্তিত্ব নেই, বা ফ্রি-এক্সেস হিসেবে নেই। নানা কৌশল খাঁটিয়ে আমিও খুঁজে পাইনি। লেখকের নাম গুরুত্বপূর্ণ তো অবশ্যই, কিন্তু লেখাটি পড়ে ফেলাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, সব ভেবে প্রকাশ করা শেষমেশ।  তো কখনও পাওয়া গেলে লেখার সঙ্গে যোগ করে দেওয়া হবে লেখকের নামটিও। ততদিন অপেক্ষা ছাড়া গত্যন্তর নেই। সে জন্য ক্ষমা চেয়ে চেয়ে রাখলাম।– র. র.

========================================================================

গত চল্লিশ বছরের চেষ্টায় আফ্রিকা চলচ্চিত্রে নিজস্ব উপস্থাপন-রীতি নির্মাণ করে নিয়েছে, যে-রীতি একইসাথে আধিপত্য বিরোধীও। আফ্রিকার সিনেমার স্বতন্ত্র সংবেদনশীলতা নির্মাণে এইসব সিনেমায় দৃশ্যের সমপরিমাণে বাছাইকৃত সঙ্গীতের ভূমিকা অন-স্ক্রিন অ্যাকশনের সমপরিমাণেই তীব্র। ফিল্মে সঙ্গীত মাঝে মাঝে কেবল অবচেতনেই অনুভূত হয়। তবে, দৃশ্যসমূহকে কিভাবে ‘পাঠ’ করতে হবে সে-সম্পর্কে ধ্বনি ফিল্মের দর্শকদের সহযোগী হতে পারে। ডকুমেন্ট থেকে একটা দৃশ্যকে গল্পে রূপবদল ঘটায় সঙ্গীত এবং একইসাথে এর সাথে রঙ, মন্তব্য, ভঙ্গী, আবেগ, সেটিং, বিন্যাস ও কাঠামো যোগ করে। এর ভেতর দিয়ে সঙ্গীত ফিল্মকে আখ্যানময় করে তোলে। যাই হোক, আফ্রিকার অনেক চলচ্চিত্রে সঙ্গীত আরও অনেক বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। লা মরটো নেগা’র (১৯৮৮) মতো সিনেমাগুলোতে প্রসংশা-গানের লিরিকগুলো একটা চরিত্রের জন্য যেমন সমবেদনা সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি কোনো রাজনৈতিক বিষয়কেও তীব্র করে তুলতে পারে। আবার ভিসেজ ডি ফেমেস (১৯৭৩)-এর মতো সিনেমাগুলোতে গান নেপথ্যের সর্বদর্শী ভাষ্যকারের ভূমিকাই কেবল পালন করে থাকে, যেমনটা করে থাকে হলিউডের মুভিগুলোতে। আফ্রিকার সিনেমা পরিচালকরা থার্ড সিনেমা ও সামাজিক-বাস্তবতাবাদী আখ্যানের রাজনৈতিক শিক্ষার ভেতর দিয়ে উৎসগত ও গ্রিয়টিক রূপকাহিনীর কাছে ফিরে এসেছেন, এবং সবশেষে, ঔপনিবেশিক এবং নব্য-ঔপনিবেশিক সমালোচনাকে গ্রহণ করেছেন। তারা সঙ্গীত নির্বাচনে এ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছেন, যে-সঙ্গীত তাদের সিনেমার ভাবনাবিষয়কে যুগপৎ সমৃদ্ধি ও প্রোজ্জ্বলতা দিয়েছে।

আফ্রিকার সিনেমার ধ্বনিগুণ হলিউড ফিল্ম থেকে খুবই স্বতন্ত্র। সঙ্গীত পশ্চিমের মতো আফ্রিকার সিনেমাকেও আখ্যানময় করার ভূমিকায় থাকে। তবে, এসব সিনেমা আফ্রিকার একেবারেই নিজস্ব বিষয়সমূহকেই তুলে ধরতে চায়। তদুপরি, অ-পশ্চিমা সঙ্গীতের নিজস্ব গতিশীল ইতিহাসতো রয়েছেই। আফ্রিকায় নির্মিত সিনেমার ধ্বনি চরিত্রদেরই মুখের ভাষা, বা তাদের যন্ত্র থেকেই সৃষ্ট। এসব সিনেমার গানও প্রধানত আফ্রিকার ধাঁচকেই শ্রুতিময় করে। ‘হোটেল রাওয়ান্ডা’ মুভিটির অফ-স্ক্রীন অর্কেস্ট্রায় দেখা যাবে, সঙ্গীত পরিচালকরা যতক্ষণ না তাদের বাদন নাটকীয়ভাবে সম্প্রসারিত হয়ে উদ্বেগ ও হতাশাকে উস্কে দিচ্ছে, ততক্ষণ হলিউডের সিনেমার প্রথানুগ ‘ক্লাসিক্যাল স্কোরের’ ওপর নির্ভর করে ব্যাকগ্রাউন্ডের সাথে বাদনের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। হোটেল রোয়ান্ডা’র অফস্ক্রীন অর্কেস্ট্রা থেকে শুরু করে আফ্রিকায় নির্মিত যেকোন সিনেমা নিয়ে তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ চালালে একটি বিষয় প্রবলভাবেই সামনে আসে যে, প্রতাপশালী পশ্চিমা সিনেমার  উৎস-বহির্ভূত টোনাল স্কোর থেকে আফ্রিকার সিনেমার ধ্বনিস্রোতকে নিজস্ব নান্দনিক, মনোজাগতিক এবং রাজনৈতিক তাৎপর্য অর্জনের লক্ষ্যে অবশ্যই স্বতন্ত্র হতে হবে।

download

ঔপনিবেশিক আমলেই চলচ্চিত্র মাধ্যমটির আবির্ভাব এবং উপনিবেশোত্তর আফ্রিকায় পশ্চিমা-শক্তি দ্বারাই অব্যাহতভাবে এই মাধ্যমটি নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে। তাই স্বাধীনভাবে ধারণকৃত এবং বিনিয়োগবিহীন সিনেমা নির্মাণ প্রক্রিয়াটি নিজেই এই ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে এক সক্রিয় প্রতিরোধ হয়ে দাঁড়ায়। এই ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়াটিকেই ভি ওয়াই মুডিম্বি ‘উপনিবেশী কাঠামো’ বলে অভিহিত করেন। মুডিম্বির মতে, ‘একটা সমগ্রতাবাদী এবং আধিপত্যশীল প্রকল্প হয়ে উঠতে ঔপনিবেশিক অভিযান তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করতো- ‘ভৌতস্থান’, অর্থনীতি এবং ‘স্বদেশের’ মনন।’ ঠিক প্রাচ্যবাদের মতোই, এ অভিযানও জ্ঞানের ক্ষেত্র হিসেবে, আরব বা এশীয় ‘অপরে’র ধারণা পশ্চিমকে সরবরাহ করলো, এবং এদের বিপরীতেই পশ্চিম তার আত্মপরিচয় নির্মাণ করলো। ‘অন্ধকার মহাদেশ’ এবং এর অধিবাসীদের সম্পর্কে নৃতাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক সন্দর্ভসমূহ পশ্চিমে এবং আফ্রিকায় প্রচারিত হয়ে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যকে ‘সভ্যকরণের’ প্রকল্প হিসেবে বৈধতা প্রদান করলো। একইসাথে ঔপনিবেশিক এই অভিযাত্রা আদিম আফ্রিকা এবং প্রগতিশীল পশ্চিমের বিভাজনও সৃষ্টি করলো। ইন ডার্কেস্ট হলিউড নামের বইয়ে পিটার ডেভিস পশ্চিমা সিনেমায় বহুলব্যবহৃত জুলুদের গৎবাঁধা ধরনটি নিয়ে ‘রাজকীয় পুরাণবিদ্যার’ এক শতাব্দির হিসেব কষে দেখিয়েছেন এর আসল চেহারাটা। ফিল্মে আদিবাসী ড্রামবাদন এবং নাচ, জুলু ডাউন (১৯৮০) মতো ছবি থেকে শুরু করে আপাত-ব্যতিক্রম লোনি টোনে’র ‘দেশী’ ভেঙচাভেঙচি পর্যন্ত, ড্রামের ছন্দময় এবং স্পন্দন-উৎসারী স্বতঃস্ফূর্ত এবং নিয়ন্ত্রণাতীত শৈলীর উপস্থাপনের ভেতর দিয়ে পশ্চিমা সিনেমার সঙ্গীত ও ধ্বনিযোজনা ‘অসভ্য’ আফ্রিকার নঞর্থক ধারণাকে প্রায় সবসময়েই দৃঢ়তর করে এসেছে। এবং ‘হোটেল রোয়ান্ডা’ ছবিটিতে আফ্রিকার গল্পে হলিউডের সিনেমা-রীতির সানুরাগী প্রয়োগ ঘটলেও, চিরাচরিত ‘জুলু’ ধ্বনিস্পন্দন ব্যবহারের মাধ্যমে সঙ্গীত স্কোরের রূপবদল ঘটানো হয়েছে অনেক বেশি পরিমাণে। বরং আফ্রিকার উৎসজাত সঙ্গীতের অনুপস্থিতির ফলে ‘হোটেল রোয়ান্ডা’ আফ্রিকার সিনেমা থেকে লক্ষ্যযোগ্যভাবেই আলাদা হয়ে গেছে।

পশ্চিমা-আওতার বাইরে সিনেমা বানানোর উদ্দেশ্যে আফ্রিকার সিনেমা পরিচালকদের পশ্চিমা আখ্যান, শৈলী এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্যারাডাইমকে সচেতনভাবে প্রতিরোধের প্রয়োজন নেই। থার্ড সিনেমার প্রবক্তারা এমন এক নতুন সিনেমাভাষার ওপরেই জোর দেন যা পশ্চিমা সিনেমার কাঠামো ও ভাবকে ধ্বস্ত করে, নতুবা ছাপিয়ে যায়। রয় আর্মস-এর মতে– ভাষা ও ভাবাদর্শ অবিচ্ছেদ্য। তাই প্রতাপশালী হলিউডের সিনেমাভাষার এমনকি একেবারেই প্রচল উপাদানের গ্রহণও যুক্তরাষ্ট্রীয় লগ্নিপুঁজি থেকে উদ্ভাবিত ভাবাদর্শগত অনুমেয়সমূহকে গ্রহণের দিকেই অপ্রতিরোধ্যভাবে পরিচালকদের ঠেলে দেয়, প্রচল উপাদানগুলোর আড়ালেই এই ভাবাদর্শ সচল থাকে। পরিচালকদের ভাবনাকে বিবেচনায় না-এনেই বলা যায়, আফ্রিকার অনেক মুভি থার্ড সিনেমার ফিল্ম-মাধ্যমের পুনরোদ্ভাবনার রীতিকেই প্রতিফলিত করে। ফিল্মে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক বিবৃতি নির্মাণের একটি লক্ষ্য থার্ড সিনেমায় বরাবরই রয়েছে। কিন্তু এ ধরণের জনপ্রিয় সিনেমা পরিস্কারভাবেই এর বাইরে অবস্থান করে। এমনকি ব্যবসাসফল লা ভি এস্ট বেলে, অথবা জিটে’র ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। এই সিনেমা দুটির আখ্যানপটের সাথেও সঙ্গীত আত্মীকভাবে যুক্ত। সঙ্গীত নির্দেশ করতে পারে ধ্বনির ইতিহাস এবং রাজনীতিকেও, তার আছে এক আয়রনিক সাবটেক্সট, অথবা ‘প্যারাডিগম্যাটিক প্রতিপক্ষকে’ প্রভাবিত করতে পারে, বা তাদের ওপর সমালোচনাও ছুঁড়ে দিতে পারে। যে-প্রতিপক্ষ, মুদিম্বি যেমনটা দাবী করেন, আফ্রিকার মৌখিক, ঐতিহ্যগত, কৃষিভিত্তিক, এবং আবহমান সংস্কৃতিকে প্রগতি ও উন্নয়নের বর্ণালির অসভ্যপ্রান্তেই পূর্বাপর ঠেলে দেয়। নিজের মুভি ‘মানডাবি’ সম্পর্কে বলতে গিয়ে সেনেগালের সিনেমা পরিচালক ওসমান সেমবেন দাবী করেছেন, সিনেমায় সঙ্গীতের ‘গুরুত্ব সর্বাধিক’, এবং আফ্রিকার সিনেমার স্বাতন্ত্র্য অর্জনের ক্ষেত্রে এটা একটা অবিচ্ছেদ্য কৌশল। আফ্রিকার আইকনিক বর্বরদের উপস্থাপনের পাশাপাশি মহাদেশটির সঙ্গীত এবং নান্দনিক সংবেদনা সম্পর্কে এক সরলীকৃত দৃষ্টিভঙ্গী প্রতিষ্ঠায় পশ্চিমা সিনেমা-যে বরাবরই সহযোগিতা দিয়ে এসেছে তা কোনভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। ‘সারাবিশ্বের অনেক লোক যেমনটা ভাবেন, আফ্রিকা যেনো সারা সময় নেচে গেয়ে কাটিয়ে দেয়। এর বিপরীতে’ সেমবেনের পর্যবেক্ষণ, আমাদের সঙ্গীত অনেক সময়েই জরুরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ করেছে। মৌখিক ও গ্রায়টিক ধারার কথা অনুসরণে সেমবেন বলেন, ঔপনিবেশিক আমলে, জনগণের অজানা যত সংবাদ ও তথ্য কেন্দ্রীয় কোন বিশাল সমাবেশস্থল থেকে সঙ্গীতের সহযোগে ছড়িয়ে দেয়া হতো। আফ্রিকার অনেক সিনেমা ‘কেন্দ্রীয় সমাবেশস্থলে’র রূপ পরিগ্রহণের মাধ্যমে এ জ্ঞাপন-কাঠামোকেই গ্রহণ করেছে। আফ্রিকাবাসী এই কাঠামো থেকে তাদের ইতিহাস শিখতে পারে, বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং রাজনীতি সম্পর্কেও জানার সুযোগ পায়। পশ্চিমা নান্দনিকতার প্রতারণা, এবং সরলীকৃত আফ্রিকা ও আফ্রিকার প্রচল ও প্রতাপশালী বর্বর ভাবাদর্শের বিপরীতে, এ মহাদেশের সিনেমা এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট সঙ্গীত এক বিকল্প পথ বাতলে দিয়েছে, যে-পথ একইসাথে নিখুঁত ও সমৃদ্ধ। এই পথ ধরেই সিনেমা পরিচালকরা নিজেদের ভাবনাবিষয়, ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং রাজনীতি প্রচারের ক্ষমতা অর্জন করে নিয়েছে।

টাউকি বাউকি (১৯৭৩), হায়না (১৯৯২), ওয়েন্ড কূনি (১৯৮৩), ভিসেজ ডি ফেমেস (১৯৭৩), লা ভি এস্ট বেলে (১৯৮৫), জিট (১৯৯০), কুয়ার্টেয়ার মোজার্ট (১৯৯২), ইয়াবা (১৯৮৯), এবং লা ভি স্যুর তেরে (১৯৯৮)–এই নয়টি সিনেমার ধ্বনি প্রয়োগ সবিস্তার বিশ্লেষণ করলে ফিল্মের সাথে সেমবেনের জুড়ে দেওয়া মিউজিকের ‘সর্বোচ্চ গুরুত্ব’টি বেশ ভাল করেই অনুভব করা যাবে। সঙ্গীতযন্ত্র, গীতিকবিতা, শৈলী, টোনালিটি, উৎসের সাথে সম্পর্ক রক্ষার মাধ্যমে আফ্রিকার সিনেমা মহাদেশটির মৌখিক ও শ্রুতিগত ঐতিহ্য, এবং সামষ্টিক-সংস্কৃতিগত স্মৃতির চিহ্ন হিসেবে যে-সমস্ত উপাদান বহন করে চলেছে, তার অনেক কিছুই সঙ্গীতের কারণে সম্ভব হয়ে উঠেছে। সঙ্গীত বাদ দিলে আফ্রিকার সিনেমা সার্বিকভাবে স্বল্প অর্থই বহন করতে পারতো।

yaaba2আফ্রিকার সিনেমায় সঙ্গীত প্রায়ই আখ্যানের গতি ও কাঠামোকেই কেবল প্রতিফলিত করে না, আখ্যানকে প্রতীকি তাৎপর্যেও তীব্রতর করে তোলে। এমনটাই দেখা যায় পরিচালক জিব্রিল দিওপ ম্যামবেটি’র ‘টাউকি বাউকি’ এবং ‘হায়না’ ছবিতে। তিনি একজন সুরকারও। সিনেমাটিতে গান দৃশ্যচিত্রের শোভন-নামে পরিণত হতে পারে, কিংবা উৎসগত অন্তর্বস্তুর সমলয়ে সঙ্গত করতে পারে, বা সমর্থন জোগাতে পারে। আবার এর বিরোধিতাও করতে পারে। এমনকি শটের মাঝে দর্শকের দৃশ্যাবলোকনেও হস্তক্ষেপ করতে পারে। কলোব্যানে’র উন্মুক্ত মঞ্চের বাইরে বিভিন্ন মুভি শোনার শিশুকালীন অভিজ্ঞতার সাথে মিশে থাকা ফিল্মের ধ্বনির প্রতি নিজের সতর্ক মনোযোগকে ম্যামবেটি কাজে লাগিয়েছেন। আমি আমার ছবিতে ধ্বনি সংযোগের ব্যাপারে প্রচুর গুরুত্ব দিই। তিনি জানিয়েছেন, এ হলো দেখার বহুবছর আগেই ফিল্মগুলো শুনে ফেলার প্রভাব। টাউকি বাউকি’র দৃষ্টিভঙ্গী এবং ভাবনাবিষয়টি মূলত ধ্বনিযোজনার ফলেই ব্যঞ্জনাময় হয়ে ওঠেছে।

ফিল্মের সমাপ্তির দিকে ক্ষিপ্ত জাম্পকাটের সমান্তরালে জাজ উন্মত্ত হয়ে ওঠে। অথচ সিনেমাটা প্রশান্ত ভঙ্গিতেই শুরু হয়, এবং নেপথ্যে বাঁশের বাঁশি বাজতে থাকে। একটানা প্রশান্ত বংশিধ্বনি ফিল্মের প্রথম শটের সাথে সংযোগ রেখে চলে। এই শটে ফাঁকা ঊষর ভূ-দৃশ্যের ভেতর দিয়ে পশুর পালকে পথ দেখিয়ে চলে ষাঁড়ের পিঠে চড়া এক বালক। এই গ্রামীণ দৃশ্যটি পুরো শটেই প্রাধান্য বিস্তার করে। পরিবর্তিত হতে থাকা ধ্বনি এবং দৃশ্যের যৌথ-আঘাতে এই শান্ত দৃশ্য ক্ষতবিক্ষত হয়। পশুর পাল নিয়ে শুনশান এই মাঠ পেরিয়ে চলা রাখাল বালকের বিপরীতে, আমরা দেখতে পাই একটা ষাঁড়কে জোর করে অন্ধকারাচ্ছন্ন কসাইখানার দিকে টেনে নেয়া হচ্ছে। এ দৃশ্য ধ্বনিস্রোতের কারণে বিরক্তিই উৎপাদন করে। বাঁশির ধ্বনি এক লাফে কর্কশ, যান্ত্রিক, বিশৃঙ্খল ধ্বনিতে পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং পশুর পালের চলার নির্বিঘ্ন ধ্বনির সমান্তরালে এই কর্কশ ধ্বনি বাজতেই থাকে। দুটি বিচ্ছিন্ন দৃশ্যের সাথে যুক্ত ষাঁড়ের আর্তনাদ, এক অলসবিধুর অতীত থেকে তরাসী ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলাকেই বাঙ্মময় করে তুলেছে। ধ্বনির উৎসের পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে একটা আকস্মিক পরিবর্তনকেই শ্রুতিময় করা হয়েছে– যে-পরিবর্তন অতীত আফ্রিকার বাঁশির মধুর সুর থেকে যান্ত্রিকতা ও আধুনিকতার কর্কশতার দিকে এগিয়ে চলেছে।

পরিচালক ম্যামবেটি তার টাউকি বাউকি’তে শুধু অলসবিদুর অতীত এবং বিরূপ ভবিষ্যতের জল-অচল বিভাজন তৈরি করেই থেমে যাননি। ফিল্মে সংশ্লেষণের সম্ভাবনাকেও ইঙ্গিত করেছেন। প্রধান চরিত্র মরি এমন দ্বি-মেরু-অবস্থায় নিজেকে অনুভব করার বহুপূর্বেই ধ্বনিস্রোতের মাধ্যমে এ ধরনের সংকরতাকে এই পরিচালক সামনে এনেছেন। ত্রাসী দৃশ্যকল্প এবং কসাইখানার ধ্বনি অনুসরণ করে একসময় স্পন্দনময় বাঁশির সুর মুহূর্তের জন্য থেমে আসে। এসময় বাঁশি বাজতে থাকে আর এর সাথে মরি’র মটরবাইকের আধুনিক ধ্বনি জাক্সটাপোজ হতে থাকে। এই মটরপ্রযুক্তি আফ্রিকার অতীত ধ্বনি-ঐতিহ্যেকে ছেটেও ফেলে না, তাড়িয়েও দেয় না, বরং এর সমান্তরালে ছুটে চলে– মরি’র মটরবাইকের মতোই। একই দৃশ্যে ষাঁড়ের শিং দিয়ে অলংকৃত মটরবাইকটি একটি দৃশ্যমান সংকরতার প্রতীকও হয়ে ওঠে। মজার ব্যাপার, সিনেমাটি যে-দৃশ্য দিয়ে শুরু হয়, শেষও হয় সেই একই দৃশ্যপরম্পরা দিয়ে– ষাঁড়ের পিঠে চড়ে একটি ছেলে মাঠের মাঝ দিয়ে পশুরপাল নিয়ে যাচ্ছে। যাইহোক, ম্যামবেটি ঔপনিবেশিকতা কিংবা কালের প্রবাহে অপরিবর্তনীয় আফ্রিকার প্রচল কোনো ছবিও ফুটিয়ে তোলেন নি। সঙ্গীত নির্বাচন একটা ‘কন্ট্রাপানটাল পূরিপুরণ’। এই সঙ্গীত শুধু ‘ছবির অন্তর্বস্তুকে পুনরাবৃত্তিই’ করে না, একে ‘প্রতীকী অর্থেও’ সমৃদ্ধ করে। নি-তান জাজের অসমঞ্জস ধ্বনির সাথে ধীর গতির রাখালিয়া দৃশ্যের সংকরণ ঘটে, যেটা স্ববিরোধী টানাপড়েনকে প্রশমিত করে। মরি’র এবং আন্তার বিচ্ছিন্নতার গল্পের ভেতর দিয়ে পরিচালক এই বিষয়টিই ফুটিয়ে তুলেছেন। ফ্রান্সের দিকে যাত্রা করা এক জাহাজের বোর্ডিংয়ে পারস্যের স্বর্গের স্বপ্ন ভেঙে মরি জেগে ওঠে, এবং সেনেগালে নিজেকে দেখতে পায়। এখানে মরি’র শৈশবের দিকে একটা দৃশ্যগত প্রত্যাগমন রয়েছে। এ আসলে আফ্রিকার উপনিবেশ-পূর্ব অতীতেরই একটা রূপক। ‘উৎসে ফেরা’ গানের টুকরো এ প্রত্যাগমনের দৃশ্যের সাথে যুক্ত হয়েছে। মরি’র অতীতে ফেরার বিষয়টি আসলে, এন. উকাডাইকের ভাষায়, ‘ভবিষ্যতকেই অনুসন্ধান’, যা উপনিবেশ-পূর্ব সময়ে প্রত্যাবর্তনের রীতি থেকে আলাদা। আর বিচিত্র-ধ্বনির আধুনিক জাজের ব্যবহারই একে এই স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে।

টাউকি বাউকি আফ্রিকার মানদণ্ডে প্রথার বাইরের একটি সিনেমা, সমভাবে পশ্চিমা মানদণ্ডেও প্রথার বাইরে, এবং একটা পরীক্ষামূলক সিনেমা। এ কেবল সিনেমাটির সঙ্গীতযোজনার জন্যই নয়। উকাডাইক লক্ষ্য করেছেন, ধ্বনি এবং দৃশের মাঝে যে-পরিমিত-অসমতা তা পাশ্চাত্য ও আফ্রিকা উভয়েরই প্রচলরীতির সিনেমার আধিপত্যশীল উপস্থাপনারীতি মেনে চলেনি। সাঙ্গীতিক স্যাটায়ার এবং প্রতীকি ধ্বনিতে সিনেমাটা উপচানো। পশ্চিমা সিনেমায় গান নির্বিষ হয়ে উঠতে পারে, অথবা কাল্পনিক পটভূমির যোগানও দিতে পারে। এ ছবিতে গান হয়ে ওঠেছে সমালোচনামুখর এবং আইরনিক। ফরাসি গান– ‘প্যারিস প্যারিস প্যারিস?/ স্বর্গ সে ধরার ওপর…’– এই গান কল্পনাবিষ্টতা এবং বিচ্ছিন্নতার মাঝে চরিত্রগুলোর পলায়নের স্বপ্নকেই ধসিয়ে দেয়। জোসেফাইন ব্যাকারে’র অতিমিঠে ও অবিশ্রান্ত কোরাস এক কল্পিত ইউরোপীয় জীবনকেই তুলে ধরে এবং এই গানের বাইরে অস্তিত্ব নেই এমন এক স্বপ্নের পৃথিবীকে হাস্যাস্পদও করে তোলে। “ক্লাসিক্যাল” স্কোর পশ্চিমা সিনেমার ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে থাকে। ম্যামবেটি প্রাচুর্য, বিলাসী, এবং সমকামীতার প্রেক্ষাপটে এ স্কোরকে যুক্ত করেছেন। ম্যামবেটি ক্লাসিক্যাল স্কোরকে নঞর্থকভাবে উপস্থাপন করেছেন। এভাবে তিনি এই পশ্চিমা-নান্দনিকতার ‘অতিশায়ন’কে উল্টে দিয়েছেন। ম্যামবেটি আধুনিক-ধ্বনি দিয়ে সিনেমার সমাপ্তি টেনেছেন। এটা তাৎপর্যপূর্ণ যে, এই আধুনিক-ধ্বনি নিজেই আফ্রো-আমেরিকার উৎসজাত এক সংকর-শৈলী, এবং অতি-ইউরোপীয় “ক্লাসিক্যাল” ধ্বনির উপজাত হওয়ার চেয়েও বেশি-কিছু। যেমনটা ঘটেছে ওসমান সেমবেনে’র সেডো এবং ক্যাম্প ডি থিয়ারয়া সিনেমা দুটিতেও। এ মুভিতে জাজ একটা আফ্রিকা-অঞ্চলীয় পটভূমিতে মরি’কে স্থাপন করেছে। সংকর-সংস্কৃতিকে ধরতে টাউকি বাউকি ছবিটি সাহসিকতার সাথে আভাঁ-গার্দ জাজ ব্যবহার করেছে, যা মূলে আফ্রিকারই উৎসজাত।

HR-SIAআফ্রিকার আরেকটা সিনেমায় বাঁশির ধ্বনি একই ধরনের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক স্মৃতির নির্দেশক হয়ে আছে। গাস্টন কাবোরি’র ওয়েন্ড কুনী সিনেমাটিও একটা ব্যবহারযোগ্য অতীতের পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে আফ্রিকার বৈশিষ্ট্যঋদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণের বিষয়টিকেই আকর্ষণীয়ভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। টাউকি বাউকি’র মতো এ ছবিটাও উৎসের দিকে প্রত্যাবর্তন ঘটায়। এড়িয়ে যায় না আত্মীকরণ এবং পরিবর্তনের প্রয়োজনকে । প্রশান্ত ও সতেজ চারণ-ভূমির লং শট দিয়ে ছবিটির শুরু, এবং এই শটে একটা তারযন্ত্র থেকে আমেরিকার সঙ্গীত-রীতির কল্পনা-উজ্জীবক ধ্বনির সমান্তরালে এক তরুণ লোককে তার দত্তক নেয়া পরিবার নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতে দেখা যায়। বাজেভাবে জুড়ে দেয়া ধ্বনিস্রোতের মাধ্যমে এসব দৃশ্যকে উদ্বেগময় এবং অবাস্তব করে তোলা হয়েছে। এই ধ্বনিস্রোতের অমার্জিত সিম্ফোনি এবং আফ্রিকার বাইরের ধ্বনি-যে আর্দশায়িত বিষয় সেটাই এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিপরীতে, তরুণ ওয়েন্ড কুনি বাঁশের বাঁশিকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন, যা তার আজও-অশ্রুত-স্বরের প্রতীক হয়ে ওঠেছে। তার জগতের প্রেক্ষাপটে আমাদের যুক্ত করা, এবং তার অতীতের দিকে শ্রুতি-পথ খুলে দেয়ার মাধ্যমে তার বাঁশি বাকি ছবিটাকে আখ্যানময় করে তুলেছে। শ্রোতাদেরকে বারকিনা ফাসো (আপার ভোল্টা) গ্রামের জটিলতা এবং বাদ-বিবাদকে অনুসরণের সুযোগ করে দিয়েছে এই বংশিবাদন। সিনেমার শুরুর দিকের আদর্শায়িত জীবনের সূচনা-লং-শটের চেয়ে যেখানে দৃশ্যের অন্তর্বস্তু আরো বেশি সংকটজটিল, সেখানে ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত আফ্রিকার অতীতে প্রত্যাবর্তনের ওকালতি করেই চলে, তথাপি তা কল্পনাচারিতার বিরুদ্ধে আমাদেরকে সতর্কও করে দেয়।

জিব্রিল দিওপ ম্যামবেটি’র দ্বিতীয় সিনেমা ‘হায়না’। টাউকি বাউকি’র দীর্ঘ উনিশ বছর পর ছবিটি মুক্তি পায়। তার পূর্বের ছবিসমূহের দ্রত-গতিসম্পন্ন, সংকর এবং উৎস-বহির্ভূত ধ্বনিস্রোত থেকে তিনি এ ছবিতে অনেক দূরে সরে এসেছেন। একইসাথে আফ্রিকার সিনেমার রীতিগত স্পন্দন এবং কাঠামোর অনেক বেশি নিকটবর্তী হয়েছেন। পরিচালকের সহোদর ওয়েসিস দিওপে’র শোকাবহ সঙ্গীত দিয়ে হায়না ছবিটির শুরু। এই নেপথ্য সঙ্গীত সারা ছবিতেই ফিরে ফিরে শোনা যায়। প্রথমে, হর্ণ এবং ড্রাম দৃঢ়ভাবে স্পন্দিত হয়। মাইনর কি-তে হার্পসিকর্ড এবং বাঁশি ধ্বনিস্রোতে যুক্ত হওয়ার পর সঙ্গীতের এই দ্বিধাগ্রস্থ-সূচনা ধীর, শোকাবহ, কিন্তু শান্ত ও সুরেলা ধ্বনিতে পরিবর্তীত হতে থাকে। শুরুর পর্বে গান যে-চলমান দৃশ্যের সমান্তরালে বাজতে থাকে তা হাতির চলাফেরা। আফ্রিকার এক শান্তিপ্রিয় জানোয়ারের সাথে এরই ভূ-দৃশ্যের সম্মিলন এবং এমন ভূ-দৃশ্যে ঘুরে বেড়ানো টাউকি বাউকি’র গবাদিপশু/বাঁশির অনুরূপ একটা ভাবকে ইঙ্গিত করে। বিষাদের মৃদু আমেজ মিশে আছে এই সঙ্গীতে, শোক ও ক্ষতির পূর্বাভাস দিতে থাকে এই ধ্বনিস্রোত। এ সত্বেও, প্রি-লেঙ্গুরে রামাতো কলোব্যানে’র প্রশান্ত প্রতিবেশের সাথে এ ধ্বনিস্রোত বেশ মানিয়ে যায়।

হায়না আসলে ইউরোপীয় নাটক দ্য ভিজিটে’রই আত্মীকরণ। এ ছবিতে গ্রামে বেড়ে ওঠা এক মহিলা গর্ভবতী হওয়ার পর তরুণ প্রেমিকের অস্বীকৃতিতে গ্রাম ছাড়া হয়, এবং ফের গ্রামে আসে বিচারের আশায়। বর্তমানে ‘বিশ্ব ব্যাংকের চেয়েও ধনশালী’ এই মহিলা। লিঙ্গুরে রামাতো কোলোব্যানে’র লোকজনের কাছে সে একটা ব্যবসায়িক প্রস্তাব রাখে। প্রস্তাবটা হলো : তার সমস্ত সম্পদের বিনিময়ে তার তরুণ প্রেমিক দ্রামান দ্রামেহে’র মৃত্যু। সিনেমাটি রামাতো ও দ্রামান উভয়ের জন্যই সহমর্মিতা প্রকাশ করে, যদিও ততক্ষণে বস্তুগত প্রতিশ্রুতিতে পুরো শহরটাই মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, এবং তাদের বন্ধু ও ঐতিহাসিক আফ্রিকার সাথে প্রতারণাও করে বসেছে– এসবের ভেতর দিয়ে নিন্দার পাত্রই হয়ে উঠেছে গোটা শহরটা।

‘হায়না’র ধ্বনিস্রোত প্রধানত উৎসজাত– অর্থাৎ, শটের ভেতর থেকেই উদ্ভুত এবং এর চরিত্রদের কাছে আপাত-শ্র“তিযোগ্য। এই ছবির তীব্রতম আবেগী কয়েকটা গান নেপথ্যসঙ্গীত হিসেবে ক্রমে উন্মোচিত হতে থাকে। আর বলয়িত হতে থাকে সারা ছবিতেই। উৎস-বহির্ভূত সঙ্গীত আখ্যানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ফিরে ফিরে আসে– যখনই লিঙ্গুরে রামাতোর ফিরে আসার সাথে সম্পর্কিত মুহূর্তগুলো দুঃখজনক কিংবা না-বোধক দিকে মোড় নেয়। তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার, এই সঙ্গীত সেই দৃশ্যের সহগামী যেখানে দ্রামান ও রামাতো তাদের অতীত জীবনের স্মৃতিতে মগ্ন হয়। পিতৃতান্ত্রিকতা, মুগ্ধতা, লোভ, এবং নয়া-ঔপনিবেশিকতার আঘাতে নষ্ট হওয়ার আগের একটা প্রেমের রোমাঞ্চকর স্মৃতি তারা হাতড়ে বেড়ায়। টাউকি বাউকি’র সঙ্গীতের মতোই, এইসবই ঐতিহ্যবাহী আফ্রিকার থেকে আবির্ভূত ধ্বনিপুঞ্জ। হায়না’র সমাপনী সঙ্গীতের নোটগুলো, অনেক বেশি হতাশার। এগুলো জ্যাজ-সংকর নয়, বরং আফ্রিকার অধিবাসীদের মুক্তির লড়াইয়ে আহবান জানায় যে-গীতিকা তারই মিশ্রণ।

hyenasকলোব্যানে শহর অবমাননার ভবিষ্যত-যে বেছে নিয়েছে সে-বিষয়ে সতর্ক করে দেয় এ গান– যেখানে হাতির দল এক সময় ঘুরে বেড়াতো, আমরা দেখতে পাই, এখন সেখানে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য বুলডোজার মাটি খুঁড়ে চলেছে এবং ধ্বংস করে চলেছে এলাকাটি।

উৎসজাত সঙ্গীত আখ্যানের অনুপঙ্খে আঞ্চলিক রঙ এবং অর্থ যোজনের ভেতর দিয়ে একটা ইউরোপীয় নাটককে সেনেগালের প্রেক্ষাপটে মানানসই করে তোলে। দ্রামানের মুদিদোকানে স্বতঃস্ফূর্ত নাচগানের ব্যাঘাত ঘটিয়ে এগিয়ে চলা শোভাযাত্রা লিঙ্গুয়েরে’র আগমন ঘোষণা করে। ড্রামের নিনাদে মিছিলটি ‘সে (মহিলা) ধনসম্পদ নিয়ে এসেছে’ বলে প্রচার করে। একজন ধনী অতিথির আগমন ঘোষণার ফলে শহরের লোকপ্রিয় দ্রামান দ্রামেহে’র স্বাগত সঙ্গীত থমকে পড়ে। সিনেমাটা আমাদেরকে ঘটনার পূর্বেই বুঝিয়ে দেয়, শেষের গানটাই সমাপ্তির দিকে প্রাধান্য পাবে, লিঙ্গুয়ের রামাতৌ’র ন্যয়সঙ্গত আচরণের কারণে নয়, বরং তার সম্পদের কারণেই। ভূততাড়ানোর অনুষ্ঠানে বলদ বলিদানের ইঙ্গিত দিতে ম্যামবেটি উৎসজাত সঙ্গীতকে ব্যাপক দক্ষতার সাথে ব্যবহার করেছেন। লালে ছোপানো এক মহিলার উদ্দাম নর্তন এবং টেনে হেচড়ে লাঠির আঘাতে বলদটিকে পাকড়াতে থাকা এক দল লোকের ছাড়া-ছাড়া এবং ভিন্ন ভিন্ন শট জুড়ে পুরোদৃশ্যটি নির্মিত হয়েছে। ক্ষেপাটে সঙ্গীতের সাথে এইসব স্বতন্ত্র শট জুড়ে দেয়া হয়েছে, যে-সঙ্গীত চমকপ্রদ দৃশ্যবস্তুর সহগামী, যা দৃশ্য-ধ্বনির সংঘাতে বলদটির মৃত্যুকে অন্তরঙ্গ করে তোলে, যতোটা না নিখুঁতভাবে এর মৃত্যু দৃশ্যকে দেখায়। সিনেমাটিতে ঐতিহ্যবাহী গানের প্রয়োগ আফ্রিকার ধাঁচটিকেই সুদৃঢ় করে, এবং একইসাথে সমৃদ্ধ এক সংস্কৃতির দিকে আমাদের মনোযোগ কাড়ে, যে-সংস্কৃতির সংরক্ষণ কলোব্যানে শহরের সিদ্ধান্তের ফলে ধ্বংসের মুখে পড়েছে।

ডিজায়ার একারে’র শুরুর দিকের সিনেমা ‘ভিসেজ ডি ফেমেসে’র সঙ্গীতেই উৎসজাত ধ্বনির আরও বেশি দৃশ্যযোগ্য এবং অর্ন্তবৃত ভূমিকা রয়েছে। মুভিটা দুটো স্পষ্ট আলাদা আখ্যানের যুক্তরূপ, উভয় আখ্যানই নারীবাদী-ভাব সংশ্লিষ্ট। সিনেমার কাঠামো, সময়-এবং-স্থান উভয়ে ভ্রাম্যমাণ, সংযুক্তি ও আখ্যানের প্রয়োজনে সঙ্গীতের ওপর পরিচালক অনেক বেশি নির্ভর করেছেন। সিনেমাটিতে অনেক লং শট রয়েছে যেখানে সঙ্গীত একচ্ছত্রভাবে সক্রিয়, শুরুর একটানা দশমিনিটের নাচসহ গান তো আছেই। বহুমাত্রিক সাঙ্গীতিক বিরতিতে ধ্বনির একটা ভূমিকা রয়েছে। এটা কেবল একটা ক্রিয়াই হয়ে ওঠে না, একইসাথে দৃশ্যের আখ্যানও হয়ে ওঠে। রূপ-কাহিনী বলার গ্রায়টিক রীতিতে, নারীর একটা সামষ্টিক অভিজ্ঞতার সংযোজন, গায়নরত মহিলার বৃত্তাবদ্ধ দল, অফ-স্ক্রীনে ঘটা নানা-বিষয় শ্রোতার অন্তর ভরিয়ে তোলে। মেলিসা থাকওয়ে সিনেমার সাথে মৌখিক ঐতিহ্যের সম্পর্কের ওপর জোর দিয়েছেন, তা কেবল আখ্যানের সাঙ্গীতিক বিরতিতেই নয়, উৎসবগুলোতেও দিয়েছেন, যেহেতু এরা ফিল্মটিকে কাঠামো প্রদান করে। সিনেমাটি, তার পর্যবেক্ষণ, ‘গ্রামীণ নাচের সিনেমা-ভ্যারাইটির শৈলিতে ধারণ করা দীর্ঘ ডকুমেন্টারী সিকুয়েন্স দিয়ে শুরু, যেটা ‘সমাপ্তিতে পুনরায় দেখা যায়।’ এই পুনরাবৃত্তি ‘সিনেমাটির সার্বিক অর্থের ওপর একটা নিটোল মন্তব্যই’ নির্মাণ করে দিয়েছে বলে থাকওয়ে মনে করেন, যেহেতু তা ‘মৌখিক আখ্যানের সুলভ বৈশিষ্ট্য বৃত্তাকার-কাঠামোটিকে’ই প্রোজ্জ্বল করেছে। অলিভার বারলেট উল্লেখ করেছেন যে, আফ্রিকার সিনেমার এক অনন্য শৈলী এটি।

44b66689714f6354bf0a7565cbd1fa83সঙ্গীত সিনেমার কথায় স্বাধীন ব্যঞ্জনা যোগ করে থাকে। নিঃসন্দেহে সঙ্গীত আফ্রিকার সিনেমায় অধিক সক্রিয়ভাবে এ বিষয়টিকে পরিপূর্ণতা দেয়, যতোটা-না দেয় পশ্চিমা সিনেমায়। পশ্চিমা সিনেমায়, ধ্বনিমিশ্রণের বিশেষজ্ঞ ডমিনিক হেইনিকেন যেমনটা বলে থাকেন, ‘মুখের ভাষা তথ্যের ৯৮ শতাংশই বহন করে।’

ডাক-ও-সাড়াদানের গানগুলো কাহিনীকে এগিয়ে নেয়, সময়ের ক্রমে মুছে যাওয়া দুটি দৃশ্যের সংযোগকারী ক্ষণিক-উল্লম্ফনকে সম্ভব করার মাধ্যমে। এখানে, দলবদ্ধ মহিলারা-যে এক সামষ্টিক অভিজ্ঞতার সমভাগী এই ব্যঞ্জনাই ফুটে উঠেছে। যা সিনেমাটির নারী চরিত্র ন’গুয়েসানে’র প্রতি সহমর্মী, এমনকি সে তার স্বামীকে প্রতারিত করছে বলে মনে হলেও। মহিলাদের নাচগান হাসাহাসি নিপীড়িত জীবনের চেয়ে বরং তাদের মুক্তির আবহকেই জাগিয়ে তোলে। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন একারে’র গল্পের একটা উজ্জ্বল ভাব-রেখা। মুভিটিতে কৌয়াসসি ইউরোপের শিক্ষায় শিক্ষিত ও ইউরোপীয় কেতারই একটা চরিত্র। ন’গুয়েসানের স্বামী কৌয়াসসি’র ভাই। গ্রামে ফিরে আসার পর ন’গুয়েসানে’র সাথে কৌয়াসসি’র সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ সম্পর্ক স্বামীর প্রতি ন’গুয়েসানে’র এতদিনের আনুগত্যে টানাপড়েন সৃষ্টি করে। যখন কৌয়াসসি নিজে তার গোষ্ঠীগত কর্মকাণ্ডে এবং তাতে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে নিজের প্রান্তিক অবস্থানকে সমালোচনা করে চলে, তখন আখ্যানের ভাষ্য ন’গুয়েসানের ওপর কোয়াসসির আধুনিক প্রভাবকে দৃঢ়ভাবে মূর্ত করে। সঙ্গীত এ ভাষ্যের সমান্তরালে এগিয়ে চলে, এবং এ প্রভাবকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। আধুনিক ভাবনার মাঝে শ্রুতি-চর্চার ঐতিহ্যকে আত্মীকরণ, স্বতন্ত্র পুরুষ গ্রায়টের (এরা রূপকাহিনী বলে থাকে) স্থলে মহিলাদের কোরাস ব্যবহার, এবং পুরুষ-মহিলা জোড়ায় জোড়ায় রেখে সিনেমার সূচনা ও সমাপ্তি, আলাপী-ড্রাম, গরুর ঘণ্টি এবং বাঁশি ফুঁকার ভেতর দিয়ে ঐতিহ্যিক ধ্বনি-তালের সাথে নাচ, — এসবের ভেতর দিয়ে পরিচালক মহিলাদের মুক্তি এবং লোকসংস্কৃতির এক সহযোগী অস্তিত্বের প্রস্তবনাই রেখেছেন সিনেমাটিতে।

জনপ্রিয় সিনেমার ধাঁচে নির্মিত ‘লা ভিয়ে এস্ট বেলে’ এবং জিট দুটো ব্যবসা সফল ছবি। তথাপি প্রথম দৃষ্টিতে সিনেমা দুটি যতোটা সরল মনে হয় তার চেয়ে আসলে অনেক বেশি জটিল এবং সমালোচনামুখর। অনেক পশ্চিমা দর্শকের কাছে একটি বিষয় অপরিচিতই মনে হবে। তা হলো, প্রতিটি সিনেমাতেই একটা নিদির্ষ্ট রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রেক্ষিত থেকে সঙ্গীত উঠে এসেছে, যা গানের আপাত নিরীহ মেজাজকে গভীরতা দিয়েছে। দুটি ফিল্মে দেখানো বিখ্যাত সঙ্গীতকার পাপা ওয়েম্বা এবং অলিভার ম’টুকুডজি’র ফাচুকি গানগুলো সত্বেও বলা যায়, সিনেমা দুটির ধ্বনিস্রোত নিখাদ পলায়নপরতার চেয়ে অনেক বেশি আয়রনিক। শেষাবধি, রাম্বা ও জিট যদিও ইউরোপ-প্রভাবিত, এইসব সিনেমার সংকর পপ-শৈলীও প্রবলভাবে আফ্রিকার সঙ্গীত-ঐতিহ্য থেকেই বিকশিত হয়েছে। বাহ্যিকভাবে, সিনেমা দুটিকে প্রভাবশালী পশ্চিমা সঙ্গীতের সহযোগে আধুনিক নগর জীবনেরই উদযাপন মনে হবে। এই রাম্বা ও জিট শৈলীর উৎস ও প্রেক্ষিতগত জটিলতাকে বিবেচনায় আনলে ছবি দুটি সম্পর্কে আসলে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিই ফুটে উঠবে।

download (2)ন’গ্যাঙ্গুরা ম’ওয়েজি’র ছবি ‘লা ভি এস্ট বেলে’ (১৯৮৭)। সিনেমাটিতে কিনসাসা শহরটি একটু রোমান্টিক কমেডির রূপ পরিগ্রহ করে। প্রেমের গল্প নিয়ে সিনেমাটি নির্মিত। সত্যি যে, এর ধ্বনিস্রোতে চটুল বিনোদনের একটু ছোঁয়া রয়েছে। কিন্তু সিনেমার ভাবনা-প্রতিনিধি ‘লাইফ ইজ রোজি’ গানটির দিকে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, নায়কের জন্য গানটা যতোটা আশা-উৎসারী ব্যালাড, আয়রনিক মন্ত্র হিসেবেও ততটাই ক্রিয়াশীল। টাউকি বাউকি’র ক্ল্যাসিক্যাল সঙ্গীত কিংবা জোজেফিন ব্যাকারে’র গানের মতোই, কিনসাসা’র বেপরোয়াভাবে লড়ে চলা দরিদ্র এবং অভিজাত ধনীদের দৃশ্যস্রোতের সাথে ‘লাইফ ইজ রোজি’ যুক্ত হওয়ায়, ফিরে ফিরে ধ্বনিত এই রোমান্টিক গানটি একটা ভ্যাঙ্গাত্মক মাত্রা লাভ করে। ম’ওয়েজে তার সিনেমার পক্ষাবলম্বন করতে গিয়ে বলেছেন, জনপ্রিয় সিনেমা সবসময়েই-যে বাণিজ্যিক সিনেমাই হবে, তা কিন্তু নয়, … আমি মনে করি, প্রতিদিনকার জীবনে প্রত্যেকেই উপভোগ করতে পারবে তেমন বিষয় নিয়েও সিনেমা সম্ভব। আর সিনেমার বাণীটা আসবে পরে, যারা মুভিটাকে ব্যাখ্যা করবেন, তাদের কাছ থেকে!স্পষ্টই যে, লা ভি এস্ট বেলে মুভিটি কেবল ধনবানদের জন্যই সংরক্ষিত অতিব্যয়বহুল জীবনযাপনের রীতিকে প্রচুর সমালোচনা করে থাকে। কারণ, এদের চাকরবাকরেরা হাসিখুশিতে দিন পার করলেও আসলে হতদরিদ্র। এসব সত্বেও, সিনেমাটা ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ গায়ককে অপসারণের ভেতর দিয়ে আধুনিক ও শহুরে শিল্পীকে সমালোচনার পাত্র করে তোলে। এই সিনেমার নায়কও একই প্রক্রিয়ায়, অর্থাৎ গ্রামীণ গায়ককে বিসর্জন দিয়ে, তার তারকা-জগতের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছে। শহরে আসার পথে গানের যন্ত্র হারিয়ে এবং ইলেক্ট্রিক যন্ত্রাংশের সহযোগে শহুরে গায়কে পরিণত হওয়ার ভেতর দিয়েই এ নায়ক এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেছে।

সিনেমাটা আধুনিক এবং ঐতিহ্যবাহী উপাদানসমূহকে একিভূত করে। একইসাথে দরিদ্র অবস্থা থেকে ধনী হওয়ার এই গল্পজুড়ে শ্রমিক-শ্রেণী এবং জনপ্রিয় জীবন-জীবিকাকে প্রশংসা করে চলে। সিনেমাটিতে রাম্বা থেকে সৃষ্ট ধ্বনিস্রোত ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে এই আধুনিক ও ঐতিহ্যবাহী, জনপ্রিয় ও লোকরঞ্জক দুই-ধারারই সম্মিলন আরো দৃঢ় হয়েছে। গেরি স্টিওয়ার্ট-এর মতে পাপা ওয়েম্বা’র ব্যন্ড ভিভা লা মিউজিকা, ‘ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতের কাছে প্রচুর ঋণী’। তারপরেও এটি নগরের তরুণ প্রজন্মের সাবকালচার থেকে নির্মিত ধ্বনিস্রোত, যে-প্রজন্ম জোট বাঁধে, চুরি করে, এবং লাইভ কনসার্টের মাধ্যমে এক দুর্নীতিবাজ সরকার এবং তার বিফল অর্থনীতিকেও প্রতিহত করেছিলো। একে রবিন ডি জে কেলি’র মতো ঐতিহাসিকেরা সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ হিসেবে, কিংবা জেমস সি স্কট ‘দুর্বলের অস্ত্র’ বলে বিবেচনা করেছেন। এতো ঠিকই যে, জোসেফ মোবোতো’র সামরিক শাসনের অধীনে, দ্রোহের পুরো প্রকাশ দমিত হবেই, এবং সিনেমায় যদি তা ধরা পড়ে, আবশ্যিকভাবেই তা সেন্সরশিপেরও শিকার হবে।

বস্তুত, যে-অনুজ্ঞার ওপর লা ভি এস্ট বেলে সিনেমাটা নির্মিত– যা করো’কে গান করার আশায় শহরে টেনে এনেছে– সেটা উনবিংশ শতাব্দির আশির দশকের নগরায়ন এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার প্রতিই ইঙ্গিত করে। করো চরিত্রটি পাপা ওয়েম্বা কর্তৃক অভিনীত। সে-সময়ে গায়কদের বিক্রির রেকর্ড পড়ে যাওয়ায় ‘লাইভ পারফমেন্স ব্যাপক গুরুত্ব অর্জন করলো’ এবং স্টিওয়ার্ট যুক্তি দেখান, ‘তাদের চরিত্র এবং শৈলী তাদের সঙ্গীতের সমপরিমাণ, বস্তুত তার চেয়েও বেশিই গুরুত্ব পেলো।’ তাই পাপা ওয়েম্বা’র ক্যাস্টিং রাস্তার তরুণদের চলতি সাবকালচারকে আকর্ষণেরই চেষ্টা করে। এর সমান্তারালেই করো’র প্রয়াস। সে তার ওপরঅলা ন’ভয়ান্ডো’কে ছলেবলে নিজের দলে টানার চেষ্টা করে। কারণ, করো তাদের যৌথ ভালবাসার ধন, কাবিবি’কে জয় করতে চায়। ক্যানসাসা শহরে জনপ্রিয় তারকাদের সমকক্ষতা অর্জনের জন্য ‘লা সেপে’ এবং ‘লা গ্রাইফি’র চল আছে। এ চলটি হলো, চুরি-যাওয়া-দামী-জামাকাপড় কেনা এবং জনপ্রিয় তারকাদের সমকক্ষ হিসেবে নিজেদের জাহির করা। এ চল সম্পর্কে স্টিওয়ার্টের ঐতিহাসিক বিবেচনা : এর ভেতর দিয়ে বোঝা যায়, এ সিনেমায় ছলচাতুরীই কেবল বিচিত্র বিষয় নয়, বরং এর ভেতর দিয়ে সে-যে ‘একজন অপরাধী তা-ই যেনো এড়িয়ে যায়।’ ওয়েম্বা’র শ্রোতাদের মধ্যে এ প্রবণতা ব্যাপক হারেই রয়েছে। শ্রমিক-শ্রেণীর সমৃদ্ধতার প্রতি ইঙ্গিত করতে করো’র ছলচাতুরির বিষয়টি দেখানোতেই পরিচালক থেমে যাননি, সে-যে নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রীকে সঙ্গীত যন্ত্র বা প্রপস হিসেবে ব্যবহার করছে তাও দেখাতে ভুলেননি। এর মাধ্যমে সেলিব্রেটি গায়কের ইলেক্ট্রিফাইয়েড ধ্বনির সাপেক্ষে একটা বৈপরীত্যকেও সামনে তুলে ধরেন তিনি। পরিচালক ম’ওয়েজে দেখিয়েছেন যে, এক শোসাইন লাইনে ধোয়ামোছার কাজে মগ্ন করো থালাবাসন দিয়েই তাল ঠুকে। এও দেখিয়েছেন, বিদ্যুৎবাল্বের ভেতরে করো এমনভাবে হাহাকার করে যেনো এটা একটা মাইক্রোফোন।

5313.original

মাইকেল রেইবার্নে’র জিট আরেকটি সিনেমা, সঙ্গীত যার প্লটের সাথে একাত্ম, যদিও প্রোটাগনিস্ট জিম্বাবুয়ের জনপ্রিয় সঙ্গীতজ্ঞ অলিভার ম’টুকুডজি নয়, তার সদ্যতরুণী ভাজতি ইউকে, যে কিনা দায়িত্বজ্ঞানহীন, অথচ আদুরে। লা ভি এস্ট বেলে মুভির মতো এ সিনেমাতেও সঙ্গীত দুর্দান্ত নগর প্রেক্ষাপটের ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে কাজ করে এবং কমেডির মৃদ আমেজ সৃষ্টি করে। যাইহোক, সৎ ও কঠোর পরিশ্রমী ইউকে জিট ছবির শ্রমিক-শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে। ছবিতে এ শ্রেণীর ওপর বীরত্ব আরোপ করা হয়েছে। যদিও অজ্ঞতাবশত ইউকে অনেক বেশি ভুল করে ফেলে, যতোটা-না করে তার শত্রু অপরাধ-ও-প্রতারণাপ্রবন জনসন। ম’ওয়েজি সিনেমার সাথে এ ছবির মিল নেই। গ্রেট ব্রিটেনের নামে নায়িকা ইউকে’কে ডাবিংয়ের মাধ্যমে রেইবার্ন তেমন কোন সাদামাটা বিনোদনপ্রিয় গল্পের জন্ম দেননি, যা ইউরোপের সংস্কৃতির তোষামোদি করবে। রেইবার্নে ইউকে সম্পর্কে জানিয়েছেন, লোকজন ভেবেছিলো আমি বুঝি আরো বহুদূর যাবো। ছবিটিতে ইংরেজি লিরিক হিসেবে ম’টুকুডজির প্রথমদিককার একটি গান জিট জাইভ ‘আফ্রিকারই স্পন্দন, আফ্রিকারই ধ্বনি’। থমাস তুরিনো এ ছবির ধ্বনিস্রোতের সাথে ‘স্থানীয় শোনা’র নন্দনশৈলীর মিল পেয়েছেন এবং এই ধ্বনিস্রোতকে একস্টিক গিটারিস্টদের (নিচুতলার পৃষ্ঠপোষকদের) বাদন ও গায়ন শৈলী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। জিটের সঙ্গীতে আধুনিক বৈদ্যুতিন গিটারের প্রাধান্যকে বিবেচনা না-করেই বলা যায়, থাম্বপিয়ানোর বাদনশৈলী থেকেই এর প্লাকড রিদম আত্মীকরণ করা হয়েছে। একে তাই ‘ম’বিরা-গিটার’ মিউজিকই বলা যায়। তুরিনো এই সংকর ধ্বনির বিবরণ দিয়েছেন। ‘জিটের বিকাশে’, তিনি লিখেছেন, দক্ষিণ আফ্রিকার ঐকতান এবং স্পন্দন, গ্রামীণ শোনা’র তাল ও কথা, এবং কঙ্গোলিজ রাম্বা নানা প্রভাব ফেলেছে। জিট সিনেমাটি এবং এর সঙ্গীত উভয়েই ইউরোপীয় রক এন্ড রোলের ঠিক ততটা তোষামুদি নয় (যদি-না আমরা ভুলে যাই যে, রক আমাদের আফ্রিকা-আমেরিকার সেকুলার প্রথা থেকে বিকশিত হয়েছে), যতোটা আফ্রিকাঅঞ্চলীয় নগর বা কসমোপলিটান সংস্কৃতিকে উদযাপন করেছে। লা ভি এস্ট বেলে এবং জিট উভয় ছবির সাথেই ক্যামেরোনের ফিল্ম কুয়ার্টেয়ার মোজার্টে’র বেশ মিল রয়েছে। এ মুভিও একইভাবে সঙ্গীতের ভেতর দিয়ে নগরের তরুণ শ্রমিক-সংস্কৃতিকে বেশ ভালভাবেই উদঘাটন করেছে। যাইহোক, কুয়ার্টেয়ার মোজার্টের ধ্বনি প্রবাহ প্রথম সিনেমা দুটির মতো নয়। এর ধ্বনি প্রবাহ উৎস-বহির্ভূত অফ-স্ক্রিন সিন্থেসাইজ স্কোরের মাধ্যমে সিনেমাটিতে বর্ণবৈভব যোগ করেছে। গ্র্যাফিটি-স্টাইলের ক্রেডিট লাইনের উপস্থাপনা, উজ্জ্বল বর্ণ, জাম্পকাট, স্থির ফ্রেম, দ্রুত-গতির সম্পাদনা, এবং টাইট ক্লোজআপ আধুনিক এবং পশ্চিমা প্রভাবিত স্থানীয় র‍্যাপ শৈলীর কিছুটা সচেতন প্রতিফলনই বলা যায়। আফ্রিকার অনেক সিনেমার স্থির লং শট এবং ধীরগতির সঙ্গীত থেকে এ মুভির দ্রুত-গতির সংগীত এবং সম্পাদনা একেবারেই আলাদা। এই ফিল্মে স্পাইক লি’র মতো দৃশ্যায়ন-নান্দনিকতা এবং ধ্বনিস্রোত ব্যবহারের ফলে মুভিটি আধুনিক হয়ে উঠেছে বলে বিকোলোর দাবী। তিনি এও বলেছেন, আফ্রিকার মিউজিকে তার ঝোঁক নেই। যাইহোক, ছবিটি নিয়ে ইভা জরহোল্টে’র অভিমত : মুভিটিতে দলের ওপর যেই পরিমাণে ফোকাস করা হয়েছে এবং দলবদ্ধতাকে মূল ভাবনা হিসেবে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে, তাতে মৌখিক ঐতিহ্যই মুখর হয়ে ওঠেছে। স্পষ্টতই মুভিটিতে সমপরিমাণে স্বতন্ত্র কোন নায়কের লক্ষ্যে পৌঁছানোর ধারাবাহিক গল্প ফাঁদার চেষ্টাও করা হয়নি। যেমন পুর্বপুরুষের আত্মা জকুয়া অনুসরণ করে জিটে’র ইউকে চরিত্রটিকে, তেমনি কুয়ার্টেয়ার মোজার্ট ছবিটিতেও মামান থেকলা’র জ্যোতিষ ক্ষমতার মাধ্যমে কুইন অব দ্য ‘হুড’ রূপান্তরিত হয় মাই গাই’য়ে। ফিল্মের কাঠামো নির্মাণ এবং ছবিটিকে বাঙময় করে তুলতে কি জিট কি কুয়ার্টেয়ার মোজার্ট উভয় ছবিই ঐতিহ্য থেকে প্রচুর উপাদান গ্রহন করেছে।

download (1)জাঁ-পিয়েরে বিকোলো’র সিনেমা ভাবনাসমূহে সঙ্গীত উৎস-বহির্ভূত হলেও একবারেই কেন্দ্রীয় একটা বিষয়। তিনি মিউজিক ভিডিওর পরিচালক ছিলেন এক সময়, তথাপি বিকোলো মাঝে মাঝে ধ্বনিস্রোতকে ফোরগ্রাউন্ড করেন, কিছু ভিজুয়্যাল আপাতভাবে মনে হয় দৃশ্যের সাথে সিনক্রোনাইজ করা, আসলে তার উল্টোটাই অনেকখানি সত্য। আঞ্চলিক র‍্যাপ-মিউজিককে নেপথ্য-সঙ্গীত হিসেবে বাছাইয়ের ভেতর দিয়ে, বিকোলো ফুটপাতের সংস্কৃতিকে ভিজুয়্যাল উপাদান হিসেবে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। যেমন র‍্যাপ-মিউজিকের স্টাইল, ইশারা, ভঙ্গী, এবং কাজকারবার– তিনি ফিল্মে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এই ধ্বনিস্রোত ফিল্মের লোকজনের জীবনেরই অংশ। এ ধ্বনিপ্রবাহ অন্তর্গতভাবেই তাদের সংববেদনের সাথে একাত্ম। এমন অভিমতই পোষণ করেন জনাথন হাইনস। চরিত্রদের নিজস্ব নান্দনিকতা এবং তাদের ফুটপাতের সংস্কৃতি উভয়ই প্রতিফলিত হয়েছে এ সিনেমাটিতে। আর সঙ্গীত তো সিনেমাটির অনন্যভিত্তিই নির্মাণ করে দিয়েছে। বিকোলো ইউয়ান্ডের ‘হোডে’র ভেতর তার আত্মবিশ্বাস, সৃষ্টিশীলতা, এবং স্বাধীনতার ওপর জোর দিয়েছেন। কুয়ার্টেয়ার মোজার্ট ছবিটি স্পষ্টতই বিকোলোর রাজনৈতিক অভিমতকেই বহন করে, তা কেবল কথোপথনে নয়, গানে সুর ও কথাতেও। নগরের তারুণ্য নিয়ে অধিকাংশ আফ্রিকান সিনেমাতে যেমনটা হয়ে থাকে, তার চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত এক ভাষা বিকোলো এ ছবিতে ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘আমি মর্মাহত’ বিকোলো সিনেমার ভাষা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আফ্রিকার লোকজন সিনেমাতে যেভাবে ফরাসিতে কথা বলে। এটা মনে হয় কোন বইয়ের ভেতরেই একমাত্র সম্ভব, এবং এর বাইরে তো বিশ্বাসযোগ্যই নয়।’ এবং যখন কুয়ার্টেয়ার মোজার্ট সম্পর্কে বিকোলোর ভাবনা হলো, এ কোন রাজনৈতিক সিনেমা নয়, বরং সঙ্গীত এবং ফুটপাতের স্ল্যাংয়ের ব্যবহারই  লোকজনের মধ্যে এমন স্বাধীনতা ও দৃঢ়তার উদ্ভব ঘটিয়েছে।

সিনেমার প্রথাগত গতি এবং সাঙ্গীতিক স্পন্দনে ফিরে এসে ইদ্রিসা ওয়াদ্রেগো’র ইয়াবা ছবিটি লং টেকস ও স্থির শটের ক্ষেত্রে বিশিষ্ট হয়ে ওঠেছে। সিনেমাটিতে আফ্রিকার কলাকৌশল লক্ষযোগ্যভাবেই উপস্থিত যা আফ্রিকার সিনেমারই সাধারণ লক্ষণ। কোন কোন মুহূর্তে ক্ষুদে গানগুলো ইয়াবা’র প্রাধান্যবিস্তারী নৈঃশব্দ্যকে ভেঙে ফেলেছে। ‘কার্যকরী স্কোরে’র জন্য ফ্রান্সিস বেবি’র প্রশংসা করেছেন এন ফ্রাঙ্ক উকা ডাইক। ফিল্মের দৃশ্যায়নের সমান্তরালে শ্রুতিময় এ স্কোর দৃশ্যের অনুপুঙ্খকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। আদিবাসীয় তারের বাদ্যযন্ত্র এবং বাঁশি ভাবঘন মুহূর্তগুলোকে তুঙ্গস্পর্শী করার সাথে সাথে কোন একটা হালকা মুহূর্তকেও সমভাবে বাঙময় করেছে। টানা পঁচিশ মিনিটের নীরবতা বেবি’র প্রথম স্কোরের ভেতর এসে ভেঙে পড়ে যখন তরুণী চরিত্র বিলা, সানা’র বাড়ির দিকে যাত্রা করে। এ সময়ে সানা’র বাড়ির সন্ধানে বিলা’র গ্রামের ল্যান্ডস্ক্যাপকে ঘিরে ক্যামেরা ধীরে ঘুরে বেড়ায়। অরগ্যানের সুর আমাদের মনোযোগ পরিত্যাক্ত একটা ভবনের দিকে টেনে নেয়। সুরটি দুঃখ-উৎসারী, এবং সানা’র জন্য আমাদের মাঝে সমবেদনা সৃষ্টি করে। সানা এক গ্রামীণ মানুষ, ডাইনি হওয়ার অভিযোগে দণ্ডিত। বিলা সানা’র দেখাশোনা করে এবং সানাকে সে দাদী (ইয়াবা) বলে ডাকে। নির্বিঘ্ন একটা ইন্টারলুড এই অধিক বয়সী একঘরে মহিলাটির সাথে যুক্ত হয়। একটা দ্রুত-গতির, হালকামেজাজের, এবং আশা জাগানো বাঁশির সুর এবং ট্যাম্বোরিনের ধ্বনিমূর্ছনা দৃশ্যপটে সানা’র অনুপ্রবেশ ঘোষণা করে, এবং একইসাথে মহিলাটির সাথে সমব্যাথী মেয়েটির সম্পর্কটিকেও মাধুর্যতা দেয়। ছবিটির উৎস-বহির্ভূত স্কোর পশ্চিমা রীতিকেই মনে পড়িয়ে দেয়। কিন্তু গ্রামীণ নাচগানের রীতি থেকে গৃহীত উৎসজাত সঙ্গীতে প্রজ্জ্বোল মুহূর্তগুলোর পাশাপাশি, ছবিটির স্টাইল, টোনালিটি এবং কলাকৌশল, সব মিলিয়ে ইয়াবা’র ধ্বনিস্রোত আফ্রিকার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগুলোকেই উজ্জ্বল করে তোলে।

ইয়াবা’র মতো উৎসজাত ও উৎস-বহির্ভূত উভয় ধরনের ধ্বনিপ্রয়োগই মালির পরিচালক আবদারমেইন সিসাকো’র লা ভিয়ে স্যুর তেরে সিনেমাটিতে রয়েছে। উল্লেখিত অনেক সিনেমার মতো এ ছবিতেও ঐতিহ্যগত এবং আধুনিক দুই-ধারাকেই পরিপূর্ণভাবে উদঘাটন ও ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে সঙ্গীতের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। কাহিনিহীন এবং ভ্রাম্যমাণ এই সিনেমাটি সঙ্গীতে উপচানো। উৎস-বহির্ভূত ধ্বনি অনেকটাই সিনেমাটিক “মিউজিক” হিসেবে ক্রিয়াশীল। এর উৎস-বহির্ভূত ধ্বনি দর্শকশ্রোতাদের মাঝে অনুকূল আবেগটুকুই নির্মাণ করতে পারে। এ ধরনের সঙ্গীত সংযোজন অনস্ক্রিন অ্যাকশন এবং বিভিন্ন ঘটনাসমূহের মাঝে খুবই কম মিথস্ক্রিয়া ঘটাতে পারে। ডকুশৈলীর (ডুকুমেন্টারি স্টাইল) ফিল্মে এই উৎস-বহির্ভূত ধ্বনি একবারেই বেখাপ্পা। যাই হোক, এই সিনেমায় কিছু উৎস-বহির্ভূত ধ্বনি নেপথ্য-সঙ্গীতের বেশি কিছু ভূমিকাও পালন করেছে। দুই পাশে সারি করা অন্তহীন পনিরের মাঝ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে করতে প্যারিস ‘হাইপারমারচে’র শব্দহীন এক দৃশ্য দিয়ে সিনেমাটির শুরু। নৈঃশব্দ্য মাঝে মাঝে ভেঙে পড়ে মাথার ওপর ভেসে আসা এক মহিলা-কণ্ঠের ঘোষণায়, দোকানের ক্রেতাদের লক্ষ করে ফরাসিভাষায় এ ঘোষণা আসে। দোকানের বাইরের এস্কালেটরে চড়ে পরিচালক। তখন লিউট-সাউন্ডের যন্ত্র থেকে অনিয়মিত প্লাকিং সহযোগে একটা গান ইতস্তত বাজতে শুরু করে। খুব সম্ভব, কোরা এবং ওড (kora and oud)। দৃশ্যটা বাওবাব গাছে এসে কাট হয়। গাছের শাখা-প্রশাখার একটা ক্লোজ-আপ দেখিয়ে ক্যামেরা দোকানের শটে ফিরে আসে। বরফশীতল রঙের প্যারিসীয় মুদিদোকান এবং শটের সূচনায় পরিচালকের বগলে সাদা পশমের মেরু ভালুকের সাথে গাছ এবং উষ্ণ পৃথিবীর টোন। এসবই একটা বৈপরীত্যের আমেজ সৃষ্টি করে। দৃশ্যের পরিপূরক হিসেবে মেজাজ চনমনে করা সেরা একটা গান পরিপূর্ণ স্বরে বেজে ওঠে। ঠাণ্ডা এবং ফাঁকা সুপার মার্কেটের সাথে এর বৈপরীত্যকে এ সঙ্গীত আরো তীব্র করে তোলে। এই বৈসাদৃশ্যকে দৃঢ় করার লক্ষ্যেই সিসাকো সিনেমাটিতে মালি’র ল্যান্ডস্কেপ সঙ্গীতে আর ধ্বনিতে টুইটুম্বুর করে রেখেছেন।

imagesলা ভিয়ে স্যূর তেরে, একই রকমভাবে, উৎসজাত ধ্বনিযোজনার ভেতর দিয়ে পশ্চিমা এবং আফ্রিকার সিনেমার বৈসাদৃশ্য দেখিয়ে দেয়। ফিল্মনির্মাণ, চিঠিলেখা, এলাকার পোস্ট অফিস থেকে ফোনকল, যে অফিসটা কেবল মাঝে মাঝেই খোলা থাকে, এবং একটা আঞ্চলিক প্রচারকেন্দ্র রেডিও কোলন যেমন গ্রামবাসিদের বিষয়-আশয় প্রচার করে থাকে, তেমনি মালি’র গানও প্রচার করে থাকে– এসবের ভেতর দিয়ে সিসাকো পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থাটিকেই ফুটিয়ে তোলেছেন। একটা দৃশ্যে, অসাধারণ বছর ২০০০ উদযাপনের ঘোষণা দেয় রেডিও ডিজে, যে-অনুষ্ঠান কিনা ইউরোপেই অনুষ্ঠিত হবে। এরপরই কাট হয়ে প্রাচীন ও মৃদু ধ্বনির সঙ্গীত বেজে ওঠে। পশ্চিমের আধুনিক ও উচ্চনাদী সঙ্গীতের সাপেক্ষে এতে একটা বৈসাদৃশ্য নির্মিত হয়। এই বিশেষ দৃশ্যে, শটের অন্য যেকোন দৃশ্যবস্তুর মতো সঙ্গীতও সমান গুরুত্ব পেয়েছে। এই লং-শটে কোন দৃশ্যমান বিষয় নেই, তারপরেও গানটি দিয়ে এই দৃশ্য এমনভাবেই ফ্রেম করা হয়েছে যে, দৃশ্যটি দেখামাত্রই দর্শকের কাছে গানটি শ্র“তিময় হয়ে উঠবে। সিসাকো’র ছবির ধ্বনিস্রোত আধুনিক এবং ঐতিহ্যবাহী উভয় ধরনের সঙ্গীতেই প্রাজ্ঞ ও দক্ষ আন্তর্জাতিক সঙ্গীতজ্ঞদেরকে সামনে তুলে ধরে। আমরা এ সিনেমায় প্রাচীন সঙ্গীত যন্ত্রসমূহ যেমন ওড, কোরা, বালা, ড’জেম্বি, এবং ম’বিরা শোনার সুযোগ পাই। একই সাথে, এসব যন্ত্রানুষঙ্গের কারণে মুভিটি সময়-ও-স্থানগতভাবে আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী বলেও চিহ্নিত হয়। দুঃখের গান ‘ফোলোন’ গাওয়ার মাধ্যমে সালিফ কেইতা’র আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কণ্ঠস্বরও এই ফিল্মে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সংকর উপাদান (হাইব্রিড) এই মুভিতে টাউকি বাউকি’র চেয়ে অধিকতর সুক্ষ কিন্তু সমভাবেই ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক উপাদানের সমন্বিত অবস্থাকে বাঙময় করেছে। এমনকি যখন পশ্চিমা বিশ্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দি উদযাপনের দিকে ব্যাকুলভাবে ধাবিত হচ্ছে তখনও ছবিটি আফ্রিকারই একটি সংস্কৃতির স্মৃতি বহন করেছে। দূরবর্তী সংস্কৃতির সাথে ফিল্মের প্রযুক্তি, রেডিও এবং উৎসজাত উপাদানের সাথে ধ্বনিস্রোত চমৎকার মিশে গেছে।

অস্বীকার করা যাবে না যে, আফ্রিকার সিনেমা পরিচালকরা হলিউড ফিল্ম স্কোরের বেশ কিছু রীতিই গ্রহন করেছেন। কিন্তু সিনেমার বিষয় হিসেবে বা উৎসজাত উপাদান হিসেবে গানকে প্রাধান্য দিয়েছেন, যা অবশ্যই ব্যতিক্রমী একটি বিষয়। এ বিষয়টির ফলে পশ্চিমা মূলধারা থেকে আফ্রিকার সিনেমা বড়ো ধরনের স্বাতন্ত্র অর্জন করে নিয়েছে। একবারেই আফ্রিকার বিষয়গুলোকে উপস্থাপন, বা এ সমস্ত বিষয়ে কোন অভিমত নির্মাণে সমান্তরলতা, বিরোধী অবস্থান, এবং সংমিশ্রণের নান্দনিক কৌশল প্রয়োগের ভিন্নতা তো এর পাশাপাশি আছেই। অলিভার বারলেট আফ্রিকার সিনেমায় সঙ্গীতের বহুমুখী ভূমিকার কথা বলেছেন। যখন সঙ্গীত ঐতিহ্যগত উৎস থেকে আসে, তা ফিল্মের বহমান স্মৃতিকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে ফিল্মের একটা লক্ষ্যকে পূরণ করে। সাধারণত যখনই সিনেমা যন্ত্রণাময় বাস্তবতাকে বর্ণনা করে, তখনই সঙ্গীত দুশ্চিন্তা আর সমস্যাকে দূরে ঠেলে দেয়ার জাদু দেখায়। পরিচালকের ঝোঁক অনুযায়ী সঙ্গীত এমনকি মাঝে মাঝে আক্রমণাত্মকও হয়ে ওঠে। রেগে মিউজিকের ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটে। এ বৈশিষ্ট্যটি নিপীড়ত জনগণের স্বাধীনতার অনিবার্যতাকেই ফুটিয়ে তোলে। তখন পরিবর্তনের সপক্ষে সঙ্গীত ‘হাতিয়ারে’ পরিণত হয়।

গীতিময় বা কোরাসীয় বর্ণনা, নিস্ক্রিয় লং টেকস, সতেজ সঙ্গীত, আফ্রিকার কোরিওগ্রাফি, দৃশ্যাতীত সঙ্গীত যা দৃশ্যে সক্রিয়তা যুক্ত করে, চলমান সজীব আধুনিক এবং শহুরে স্পন্দন-তাল-লয়– আফ্রিকার সিনেমায় এমনই সব বিচিত্র উপায় ব্যবহার হয়ে থাকে। আফ্রিকা-ধাঁচের কাঠামোর সাথে দৃশ্যটির সম্পর্ক নির্মাণ, প্রতীকি ওজস্বিতা প্রদান, সাংস্কৃতিক স্মৃতি, মৌখিক ঐতিহ্যকে উস্কে দেয়া, রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক সাবটেক্সটকে সামনে আনা, এবং কনট্রাপান্টাল ধ্বনিযোজনার মাধ্যমে উত্তর-ঔপনিবেশিক সমালোচনার সুযোগ উন্মুক্ত রাখা– এসবের ভেতর দিয়ে সঙ্গীত ভিজুয়্যালকে আফ্রিকার নিজস্ব সম্পদ করে তুলেছে।

সঙ্গীতে এমন কেন্দ্রীয় মনোযোগ এবং এর ওপর এমন নির্ভরতা পশ্চিমা ফিল্মের কাছে অনেকটাই অজানা। কারণ, গীতিচিত্রের ধাঁচসমূহের (দ্য মিউজিক্যাল জেনর) বাইরেও আফ্রিকার সিনেমা ঐতিহ্যবাহী প্রকাশ-আঙ্গিকসমূহকে আধুনিক সিনেমাভাষায় রূপান্তর করে নেয়। হলিউডের মুভির অফ-স্ক্রীন ড্রামাটিক ফিল্ম-স্কোরের বিপরীতে, আফ্রিকার অধিকাংশ পরিচালক দৈনন্দিন জীবনের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে ক্রিয়াশীল সঙ্গীতকেই সিনেমায় ধারণ করে থাকেন। মৌখিক ঐতিহ্যের দিকে আখ্যানকে পথ দেখায়, ‘স্থানীক বৈভবে’ সমৃদ্ধ করে, কিংবা, ঐতিহ্য, আধুনিকতা, এবং সংকরতার ভাবনাসমূহের রূপকল্প হিসেবে কাজ করে– এমন ধ্বনি ও সঙ্গীতেরই সহচর আফ্রিকার সিনেমার কাঠামোবিন্যাস এবং দৃশ্য-পরম্পরা। সিনেমা এবং এর মিউজিকের যে বাজার অনুমোদিত সম্পর্ক রয়েছে, হলিউডের পুনরাবৃত্তিময় ধ্বনিস্রোত কেবল তাকেই সমর্থন যোগায়, কিন্তু সামষ্টিক সঙ্গীতের ইন্টারল্যুডসমূহ আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধকেই ফুটিয়ে তোলে, গোষ্ঠীর মূল্যবোধকেই আরও জোরদার করে।

LES-SAIGNANTES-2005_portrait_w858

যারা ধ্বনির গুরুত্ব নিয়ে সংশয়ে ভোগেন তাদের বিরুদ্ধে অর্থনীতিবিদ জ্যাকস আত্তালি মন্তব্য করেছেন : ‘আড়াই হাজার বছর ধরে, বিশ্বকে বুঝার চেষ্টা চালিয়েছে পশ্চিমা-জ্ঞান, কিন্তু বোঝেনি বিশ্বটা দেখার নয়, শোনার। বোধযোগ্য নয়, বরং শ্রুতিযোগ্য।’ আরো বলেন, ‘আমাদের শিখতে হবে, কোনো সমাজকে তার পরিসংখ্যান দিয়ে যতোটা-না বিচার করা উচিত, তার চেয়ে সেই সমাজের ধ্বনি, শিল্পকলা, এবং এর উৎসবসমূহের মধ্য দিয়েই বেশি বিচার করা উচিত।’ আপাতত দৃশ্যমাধ্যমে দৈনন্দিন জীবনের ধ্বনির ওপর জোর দিয়ে আফ্রিকার সিনেমা তাদের দেশ, গ্রামের রাজনীতি, ইতিহাস এবং সংস্কৃতিকে উদঘাটনে সক্ষম এক দৃশ্যসম্ভারই আমাদের উপহার দেয়।

…………………………………

10891727_10206043937838169_4871154299599315818_n
।। রথো রাফি।। কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক

………………………………………..

সূত্র:

  1. V. Y. Mudimbe, Invention of Africa : Gnosis, philosofy, and The order of knowledge (Blomington : Indiana University Press), 1988, 2 
    2. Peter Devis, In Darkest Hollywood (Athens, Ohio: Ohio University Press) 1996, 166 
    3. Roy Armes, third World Film Making and the West, (Berkley: University of California Press) 1987, 99 
    4. V. Y. mudimbe, 4 G. M. Perry, Patrick McGilligan, Osmane Sambene, `Osmane Sembene: An Interview,” in Film Quarterly, Vol. 26, No. 3 (Spring 1973), 39 
    5. Oliver Barlet, African Cinemas: Decolonizing the Gaze, (New York: St. Martin’s Press) 1996, 192 
    6. Siegfried Kracauaer, Theory of Film: The Redemption of Physical Reality, (New York: Oxford Univesity Press) 1960, 142
    7. N. Frank Ukadike, Black African Cinema, (Berkley: University of California Press), 1994, 176 
    8. Ibid. 174 
    9. Melisa Thackway, Africa Shoots Back: Alternative Perspectives in Sub-Saharan Francophone African Film, (Bloomington, Indiana University Press.) 2003, 81
    10. Oliver Barlet, 186, 
    11. Ibid. 184
    12. Gary Stewart, Rumba on the River: A Hisrory of the Popular Music of the Two Congos, (New York: Verso) 2000, 308-309
    13. Portia k. Moltsby, ` A Map of the Music: The Evalution of African American Music,’ African American Review, Vol. 2(1995), 183 (see attached chart)
    14. Thomas Turino, Nationalists, Cosmopolitans, and Popular Music in Zimbabwe, (Chikago: University of Chikago Press) 2000, 225-233
    15. Eva jorholt, Africa’s Modern Cinematic Griots: Oral traditions and West African Cenema,’ in Same and Other: Negotiating African Identity in Cultural Production, Ed. Maria Erikson Baaz Mai Palmberg, (Stockholm, Sweden: Elanders Gotab) 2001, 111
    16. Jonathan Haynes, `African Filmmaking and the Postcolonial Predicament: Quertier Mozart and Aristotle’s Plot’ in Cinema and Social Discourse in Cameroon, Ed, Alexie Tcheuyap, (Bayreuth, Germany: Bayreuth University) 2005, 118
    17. Ibid. 123
    18. N. Frank Ukadike, Black African Cinema, 279
    19. Oliber Barlet, 185
    20. Jacques Attali, Noise: The Political Economy of Music, (Minneapolis: University of Minnesota Press) 1985, 3

    Web: htt//www.unc.edu/~vcfloyd/inls102/africa.html

Advertisements