অন্ধ অন্তর্চাক্ষিক :: জাহেদ আহমদ

12165772_10207825137296966_901193885_nএটা অন্ধ বিনোদের গল্প। ছোটবেলায় একটা গান শুনতাম  তোমরা দেখো আইয়া রে / মায়ের বিনন খাইল নাগে — এখানে এই গানে বিনোদ হয়েছে বিনন, সিলেটি কথ্য উচ্চারণ। গানটা বেহুলা-লখিন্দরের ঘটনা উপজীব্য করে রচিত, পুরো কাহিনি গানে গানে বর্ণিত, সম্ভবত মালজোড়া বলা হয়ে থাকে এতদঞ্চলে এ-ধারার গানগুলোকে। এই গল্পের বিনোদ আর মাত্র-উক্ত গানের বিনোদ এক ব্যক্তি নয়। এই গল্প অন্ধ বিনোদের, সাপে-কাটা বিনোদ নয়, এটি বিনোদ মুখার্জির গল্প। অন্ধ বিনোদ, অবাক চক্ষুষ্মান বিনোদ, দ্রষ্টা বিনোদ। গল্পে খুব বেশি ডিটেইলিঙের আশা যারা করেন, তারা আহত হবেন, বিশদ বিবরণ গরহাজির এখানে। নেই ক্যারিশম্যাটিক কৌশলে কথাবস্তুর উপস্থাপন, শৈলীর দিক থেকে নেই ইনকন্সিভ্যাব্যল্ কোনো মোচড়, ট্যুইস্ট গরহাজির গল্পান্তিমেও, অন্তত চরিত্র প্রতিষ্ঠাপনে একটা গল্পের তথা গল্পকারের যে-

টুকু তুকতাক মন্ত্রম্যাজিক প্রয়োগ ফর্জ সেসবের কিছুই নেই। কিন্তু গল্পহীনতার গল্প  বলিয়া যে-একপদের গল্পধারা চালু হয়েছিল সম্প্রতি-বিগত নব্বইয়ের দশকের কতিপয় বাংলাদেশজ তরুণ প্রতিভাদীপ্ত গল্পস্রষ্টার উদযোগে, একটা বেশ কৌতূহলোদ্রেকী নিরীক্ষার প্রবর্তনা ছিল, সেটি যদিও অত্যন্ত স্বল্পদৈর্ঘ্যের, এই বিনোদোপাখ্যান তেমন কোনো প্রয়াসও নয়। এটি তয় কি, বাহে? কেমনছিরি চিজ্ এইটে? ঝেড়ে কাশি তাহলে, বেগতিক হয়ে ওঠার আগেই, নয়তো পরে সামলানো যাবে না পরিস্থিতি। নিমুরদের হাতে পড়ে একটা ভালো সম্ভাবনাময় জিনিশের যেরূপ দশা হয়, এই লিখনবস্তুর পরিণতি ঠিক তা-ই হতে যাচ্ছে নির্ঘাৎ। মুরদ না-থাকলে, কব্জির জোর কম হলে, এইধারা ধানাইপানাই ছাড়া উপায় নাই। কিছুটা রহস্য করা ভালো, সুপ্রযুক্ত ও পরিমিত মাত্রায় রহস্য শিল্পের প্রাণ, অধিক রহস্যীকরণ রসভঙ্গ ঘটায়। এক্ষণে কহা কর্তব্য হয়, এখানে এই পাঠকৃতির পেটে একটি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো রহস্য নাই। কী সেই রহস্য, অগ্রসর হোন চর্মচক্ষুসুদর্শন পাঠক, প্রকাশ্য দিবালোকে একদিন-না-একদিন কেউ-আগে-কেউ-পরে সকলকেই ধরা খাইতে হয়। এবারে একটু খোসা ছাড়াই এ-রহস্যপেঁয়াজের, জট খুলি এই ছদ্মবেশী গল্পের, সহায় হোন সকলে।

এটি একটি গল্প বটে, একটি বইপড়ার গল্প, এই গল্পের প্রোট্যাগোনিস্ট বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়। এই বইটি কয়েক বছর আগে পড়া, এখনো জ্বলজ্বলে সেই স্মৃতি, আড়ম্বরহীন একটি বই কী দুর্ধর্ষ অভিঘাতসঞ্চারী হতে পারে — এথা আলোচ্য বইটি পড়ে ফের-একবার মনে পড়েছিল আমার। কে এই বিহারী বাবু, যদি জানতেই চান, সংক্ষেপে সেই ঠিকুজি পেশ করা যাক। শিল্পী তিনি, চিত্রী, দিবারাত্রির দৃশ্যকাব্যকার। রঙের ভেতরের রঙ, রেখার আড়ালে রেখা, দেখার অন্তরালের দেখা তালাশিয়া ক্যানভাসে বিধৃত করে গিয়েছেন আমৃত্যু-আজীবন। পশ্চিমবঙ্গীয় পাক্ষিক দেশ পত্রিকায় এই মায়েস্ত্রোর সঙ্গে প্রথম মুলাকাত হয় আমার, বহৎ সাল গুজারি গিয়াছে এরপর, মাঝেসাঝে কিছু ছোটকাগজে তার সম্পর্কে অতি-অল্পপ্রস্থ প্রশস্তিব্যঞ্জক নিবন্ধ আর ওইপারের দুটো-তিনটা সাহিত্যপত্র যথা অধুনালুপ্ত প্রতিক্ষণ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যাগুলোতে তার ছোট ছোট কাজ ও কিছু নাতিহ্রস্ব সাক্ষাৎকার, বা পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক প্রতি বছরান্তে নিয়মিত ভিত্তিতে প্রকাশিত রাজ্য চারুকলা পর্ষদের চারুকলা  পত্রিকার আর্টপেপারে ছাপা রচনাদির ফাঁকে গুঁজে দেয়া কাজে — এর বাইরে তেমন চেনাজানা বা দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি আমাদের কোনোদিন, এমনকি আজোবধি। কিন্তু তবু তাকে ভালোবেসে ফেলি। ভালোবাসাপাত্রের সনে আশ নাই বা সম্পর্ক লম্বি নেহি, বড়ি হো না চাহিয়ে। এটা আলবৎ সক্কলেই মানবেন। তো, ঔৎসুক্য জন্মে তার ড্রয়িং দেখে। সে যে কী জিনিশ, কী নিরাভরণ, কী ঋজু ও রোশনাইস্নিগ্ধ না-দেখলে মেহসুস হবার নয়। এরপর, ওইটুকুমাত্তর ওরিয়েন্টেশনের বহু বহু বছর পর, পড়ে উঠি একখানি কিতাব চিত্রশিল্পী বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় বিরচিত। বসেছি সেই গল্প শোনাতেই। কিন্তু তদাগ্রে তেমন-জরুর-নয়-তবু বলি, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে এবং দেহ রেখেছেন ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে।

Untitledচিত্রকর  পড়তে পড়তে এত ভালো লাগছিল যে, এত প্রশান্ত-অতলান্তিক-উত্তমাশা-আরবসাগর মন্দ্রগহনগভীর বোধে আচ্ছন্ন ও বিবশ হয়ে ছিলাম যে, বলার নয়। চিত্রকর, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়। তারই আত্মকথন এই বই। চিত্রীজীবন ও অনির্বচনীয় দেখনভঙ্গি বিধৃত অক্ষরে অক্ষরে। এক অনবদ্য দ্রষ্টামানুষের সাধনমার্গের খোঁজ ছত্রে ছত্রে। কিন্তু কোথাও নোখ-পরিমাণ অহং নেই, বিস্ময়কর অহংহীন, সবিনয় অথচ দার্ঢ্য স্পষ্টগোচর। শ্রুতলিপি/ডিক্টেশন প্রক্রিয়ায় ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির সক্রিয় সহায়তায় তৈরি হয়েছে এ-বইয়ের লেখাগুলো। অন্ধ চিত্রী বিনোদবিহারীর আশ্চর্য মোহহীন ও অনুযোগহীন কণ্ঠ শোনা আমার জন্য সত্যি এক অভিজ্ঞতা, আজ পর্যন্ত, সম্ভবত চিরতরে। এই বই আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন যিনি, কৃতজ্ঞতা জানাই তারে এই সুযোগে, তিনি নিজেও একজন চিত্রশিল্পী। তিনি আমার আপিশবাড়ির তরুণ ছবি-আঁকিয়ে সত্যজিৎ চক্রবর্ত্তী। ও হ্যাঁ, জানতে না-চাইলেও, সত্যজিৎ তার অঙ্কিত চিত্রপটের গতরে স্বাক্ষর করেন সত্যজিৎ রাজন নামে। রাজন সত্যজিতেরই ডাকনাম, মাতৃপ্রদত্ত, তখল্লুস নয়। এই গল্পে আরেক সত্যজিতের দেখা আমরা পাব অচিরে, তিনি বিশ্ববিশ্রুত সত্যজিৎ রায়, এই গল্পের নায়কের কাছে চিত্রকলাশিল্পের তালিম নিয়েছেন তিনি একদা, বানিয়েছেন গুরুবীক্ষণের তথ্যচলচ্চিত্র একখানা, আমাদের পঠিতব্য বইটির প্রচ্ছদও সত্যজিতেরই করা, অবশ্য বিনোদবিহারীরই নিজের আঁকা রেখাচিত্র অবলম্বী কিতাবপ্রচ্ছদ।

শৈশব থেকেই তাঁর চোখে ত্রুটি, কিছুকাল পরেই দৃষ্টিশক্তি বিলুপ্ত না-হলেও ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর, সেই হেতু কোনো শিক্ষালয় তাঁকে নিতে চাইছিল না। আজও কি নেয়, কিয়ৎ-পরিমাণে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে, এমনকি সর্ববঞ্চিতের সহায় বলে বেফায়দা বিবৃত কোনো এনজিওপত্তনি বিদ্যালয়? খেলতে যেতে পারতেন না, কানাকে কে ডাকে খেলায়, আঁকতেন কেবল চুপচাপ। সারাজীবন তা-ই করে গেছেন। তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় রবীন্দ্রসান্নিধ্যে, গুরুদেবকৃপায়, তিনি স্বীকার করছেন বইটিতে খুব সুন্দরভাবে। নন্দলালের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ তাঁকে নেন শান্তিনিকেতনে, দেন অনুমতি শিষ্য হিশেবে নন্দলালের পাঠ গ্রহণের। যার চোখ নেই, সে ছবি আঁকবে কি করে? — এই ছিল নন্দলাল বসুর আপত্তি। নিদারুণ বাস্তবসম্মত আপত্তি। আমি হলে তো বলেই বসতাম, হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই তো! যাও বাপু, সোজাসাপ্টা, রাস্তা মাপো। কিন্তু তিনি রবীন্দ্রনাথ। কি কয়েছিলেন ঠাকুর, বিনোদবিহারীজীবনের সেই নিয়তিনির্ধারণী মুহূর্তে, চিরচক্ষুষ্মান চিত্রকরের জবানে সেই সাক্ষ্য বইটিতে পাওয়া যাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ বলেন, যদি ও নিয়মিত আসনে বসে এবং মনোযোগ দিয়ে কাজ করে তবে ওকে স্থানচ্যুত কোরো না। ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা কোরো না। সকলকে নিজের নিজের পথ খুঁজে নিতে দাও।

বইয়ের ভূমিকাপ্রতিম নিবেদন  অংশটি বিনোদবিহারী লিখছেন ১৯৭৮ সালে বসে, যে-বছর আমাদের অনেকেরই জন্ম হয়েছে কিংবা হবু অনেকেই, বইটা ছাপা হয়ে বেরোচ্ছে ১৯৭৯ সালে; এবং এর ঠিক পরের বছর ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে বিনোদ বিদায় নিচ্ছেন রঙের আগুনভরা মানবসংসার থেকে। অ্যানিওয়ে। এইখানে যে-এডিশনটা আমরা হাতে নিয়েছি, সেইটা প্রথম প্রকাশের উনিশবছর পরেকার সপ্তম মুদ্রণ। এই দীর্ঘ জীবনে ঘটনা ঘটে গেছে অনেক। কিন্তু সেইসব ঘটনা খুব অল্পই জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। যে-সমস্ত মানুষ বা যেসব ঘটনা জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে গেছে তারাই হল আত্মকথার সত্যকার উপাদান। আর অবশিষ্ট কেবল তথ্যপঞ্জি। প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে আমার এই কাহিনী তথ্যপঞ্জি নয়। জীবনের যে অংশটুকু ভালোভাবে চিনেছি, সেই অংশের কথাই আমি বলতে বসেছি। — নিবেদনাংশে এইটুকু শুনে রাখছি শুরুতেই। কিন্তু, প্রশ্ন, অটোবায়োগ্র্যাফি লিখছেন বুঝি বিনোদবিহারী? রিপ্লাই একইসঙ্গে হ্যাঁ এবং না। আগাগোড়া ক্যাল্কুলেইট করে দেখা যাবে বইটা দুইশ অধিক বারো পৃষ্ঠা সাকুল্যে। এর মধ্যে মোটমাট রচনাসংখ্যা চার; — চিত্রকর, কত্তামশাই, কীর্তিকর, শিল্প-জিজ্ঞাসা — চারটি ভিন্ন উপশিরোনামে চারটি ভিন্নবৈষয়িক রচনায় বিন্যস্ত গোটা বই। কিন্তু জৈবনিক হয়েও রচনাগুলোর নৈর্ব্যক্তিক অনাত্মবৌদ্ধিক দিকটা প্রাধান্যবহ। আলোর জগৎ থেকে অন্ধকার জগতে প্রবেশ করে আমার শিল্পীজীবনের এক নূতন অধ্যায় শুরু হয়েছে। আমার এই অভিজ্ঞতার কথা এই পুস্তকের প্রধান উপাদান। — ভূমিকাতেই, নিবেদনাংশে, নিচ্ছেন কয়ে। এর উৎসর্গপঙক্তি স্বীয় সহধর্মিণী শ্রীমতী লীলা মুখোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করে লেখা। ছাত্রী ছিলেন শ্রীমতী, বিনোদের বয়স তখন ফোর্টি, বিবাহ হয় শিক্ষার্থী-শিক্ষক পরস্পর প্রণয়ের অল্প পরে এবং আমৃত্যু অচ্ছেদ্য রহেন। তথ্যগুলো বইয়ের কোথাও কোনো-একভাবে রেখেছেন মৃদুস্বরে বলে লেখক নিজেই। মানুষ যতই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলে ততই তার মনে পড়ে অতীতের কথা। অর্থাৎ স্মৃতির জগতে মানুষ খুঁজে বেড়ায় নিজেকে। আমিও সেইরকম নিজেকে খুঁজে বেড়াই। এই ভাবেই দেখা দেয় বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতা। বার্ধক্যের এই নিঃসঙ্গ অবস্থার মধ্যে জীবনের নূতন মূল্যবোধ জন্মায়। বৃদ্ধের জীবনের এই অভিজ্ঞতা যুবকের কাছে প্রায় সময়ই অর্থহীন। বিনোদের এই বিনয়বাচ্যে এ-যাত্রা আমরা ভুলছি না যে এইটা আদৌ কোনো মামুলি স্মৃতি-বিস্মৃতির স্বর্ণগ্রন্থগাঁথা না। আত্মজৈবনিক হয়েও অনাত্মজৈবনিক স্বরে এই বইয়ের বিস্তার আপনাকে একটানে ট্র্যাভ্যেল্ করায়ে আনবে পেইন্টিংকলা থেকে শুরু করে সমাজ-সংস্কৃতি-বিজ্ঞান-দর্শনের নানান বরণ গাভির ওলানে একই বরণ দুধের অবর্ণনীয় অনন্ত-অনাদি পৃথিবীকিনার।

Untitled3গ্রন্থনামে যে-পরিচ্ছেদটি, সেইখানেই সবচেয়ে বেশি অটোবায়োগ্র্যাফিক স্কেচেস্ এসেছে, রেফ্রেন্সগুলো শৈশব ও শুভারম্ভ যৌবনের; লৈখিক অক্ষরে এরচে বেশি ভিভিড ডেপিকশন সম্ভব কি না, আমার সন্দেহ আছে। এতটাই নিরুপম ছবি আঁকা হয়েছে একদমই নিরলঙ্কার, অবধারিতভাবেই নিরহঙ্কারও, নিরহং ঋজু বাক্যসাংগঠনিক গদ্যে যে এর তুলনা বহু খুঁজেও মেলানো মুশকিল হবে। একেবারে বালক বিনোদের রোগশয্যার একটা ছবি দিয়ে ইন্ট্রোপ্যারায় আমরা পাচ্ছি শিল্পীর মাতৃমূর্তি, এককালে এইরকমই ছিল বটে ভোল্গা টু গঙ্গা মায়েদের মুখ, সিনেমাস্কোপিক্ দৃশ্যটা দেখা যাক আরেকবার। ঘটনা হচ্ছে, তৎকালে দুর্নির্ণেয় অসুখে ভোগা বালকের ভক্ষণসাধ জিগ্যেশ করে ছেলের জন্য গরম ভাত বর্তনে বেড়ে এনে মা যখন মাগুরমাছের ঝোল আনতে হেঁশেলে গেছেন, ফিরে এসে দেখেন ভোলাভালা ছেলে তার ঝোলছাড়া হুদা ভাত খেয়ে সারা। কী কাণ্ড! এরই মধ্যে সব ভাত খেয়ে ফেললি? মাছের ঝোল খাবি কি দিয়ে? ফের মাগুরসুরুয়া, কাঁচকলা ভাতের সঙ্গে মাখিয়ে মুখে তুলে খাইয়ে দিয়ে মা তার অসুখা বাচ্চাটাকে বিছানায় আলগোছে শুইয়ে যে-কণ্ঠস্বর আমাদেরে শোনান, সেই স্বরের সঙ্গে আমরা আবহমান পরিচিত, — যাক, যাবার আগে ছেলের ভাত খাওয়ার ইচ্ছে মিটিয়ে দিলাম। কেননা ডাক্তার তো সাফ-সাফ জানিয়েই দিয়ে গেছেন যে ছেলে তার মরা-বাঁচার বাইরে, কাজেই টুকটাক সাধাহ্লাদ যেন অপূরণ না-রাখেন ইত্যাদি। কিন্তু ভাত খাওয়ানো বারণ। পোলার আবার ভাত খাইতেই মন চায়, বিলাসখাদ্য ভক্ষণে তার ন-পোষায়। কয়েকদিন পরে ফের বাবার আশঙ্কার্ত কণ্ঠ, মরণাপন্ন ছেলেকে ভাত খাইয়ে দিলে? কিরকম আক্কেল তোমাদের? বদ্যির জবাব-দিয়ে-দেয়া দুরারোগ্য অসুখ থেকে বালক বিনোদ সবাইকে অবাক করে বেঁচেও উঠলেন একসময় এই নিষিদ্ধ দ্রব্য অন্ন খেয়ে খেয়ে। অবশ্য নয়ন একখানা চিরতরে হারাতে হয়, যে-একখানা বাঁচে সে-ও অনচ্ছ কাচের অতিক্ষীণতাদুষ্ট, অস্পষ্ট ও আবছা বীক্ষণশক্তির, সেই সবেধন নীলমণি দৃষ্টিক্ষীণতাটুকুও পঞ্চাশে এক উন্নততর অস্ত্রোপচারকালে হারাতে হয়, এবং বাকি জীবনের দেড়-দশকাধিক কেটেছে সুনসান অন্ধকারে, যে-অন্ধকার আলোর অধিক হয়তো বলবেন বুদ্ধদেব বসু। যাকগে। একটি জীবন এঁকে গেলেন অন্ধের দৃষ্টি নিয়ে দিব্যঘোরে একাগ্রচিতে নিশ্ছিদ্র।

শৈশবের বিনোদ কেমন ছিল, প্রায়-অন্ধ নির্বান্ধব বালকের বিনোদন ও সময়-কাটানো রবিগল্পের সেই অমলেরই মুখ মনে পড়ায় আমাদের, অন্তরঙ্গ তুলিতে সেই পিকচার আঁকা আছে এই বইয়ের প্রথমভাগে। ফেরিওয়ালা, বাসনওয়ালা, চুড়িওয়ালা নামপরিচয়ের অধুনা-লুপ্তপ্রায় পেশাজীবীদের ডাক আর রঙবাহার দেখে বেড়ে উঠছেন আমাদের বিনোদ। বলছেন, শৈশবকাল থেকে একদৃষ্টে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবার অভ্যাস আমার হয়েছিল। মুচি কিরকম ক’রে জুতো সেলাই করে, তার লোহার তেপায়া যন্ত্রের ওপর উপুড় ক’রে জুতো ঢুকিয়ে কি করে গোড়ালিতে পেরেক মারে মুচির পাশে বসে একমনে দেখতাম। কোন ফেরিওয়ালা কিরকম দেখতে, সে কাপড় পরেছে কতটা খাটো, না লম্বা; বাবুরা অফিসে চলেছেন — তাদের গায়ের জামা ডোরাকাটা, না সাদা; আর বাড়িতে গিয়ে বলতাম যে একটা লোক দেখলাম, তার জামা ডোরাকাটা। এ যেন আমার এক অভাবনীয় আবিষ্কার! বাড়ির লোক বলল, দেখে আয় তো বাইরে কে ডাকছে? আমি ভেতরে গিয়ে বলতাম, একটা লোক, সবুজ পাড় কাপড়, একটা কোট ও গায়ে চাদর, হাতে লাঠি। অভিভাবকরা অধৈর্য হয়ে বলতেন, নাম জিজ্ঞেস করেছিস? বলতাম, না, নাম তো জিজ্ঞেস করা হয় নি! বিনোদের বীক্ষণপ্রণালির বীজ কি এইখান থেকেই নিচ্ছে তার উদ্গমপ্রেরণা? আর তার শিল্পচৈতন্য? শৈশবে সেই খোঁজপাত্তা নাই? বিনোদ তো স্পষ্ট করে বলছেন না, আমরা ঠিকই নিচ্ছি বুঝে একেকটা বালকোচিত মনোরম ঘটনায়। যেমন তাদের বাড়ির ঝি, শ্রীমতী কুসুম যার নাম, দুপুরবেলা বাড়ির মেয়েমহল যখন ভাতঘুমে, কুসুম তখন দাওয়ায় বসে কাগজের ঠোঙা বানায়। বিনোদ ঠোঙা বানানো রপ্ত করলেন। এরপর থেকে বাড়িতে যেসব ঠোঙা আসত রোজকার বাজারসদাই ভরে, বিনোদ দৌড়ে যেয়ে এক্সামিন্ করতেন সংসারদ্রব্যপরিবাহক ঠোঙাশিল্পখানা তারই সৃষ্টি কি না। যাকগে। একইভাবে তিনি, নিজেই জানাচ্ছেন, নিজের প্রথম এক্সিবিশনে একই শিল্পোত্তেজনা নিয়ে গিয়েছিলেন ঝুলানো ছবিগুলো সত্যি সত্যি তার নিজেরই কি না পরখ করে দেখতে।

12165670_10207825137096961_460168116_nএকের-পর-এক ইশকুল বদলালেন, তবে বেশিদিন প্রথাগত টোলে এনরোল্ড না থাকার কারণে ইশকুল তার মনে বিশেষ ছাপ্পা রাখতে পারে নাই বলে তিনি নিজেই জানাতে ভুলছেন না। মাশ্টার মশাইরা কানাকে কেমন করে পড়াবেন মর্মে একটা সাংঘাতিক আঁতান্তরে পড়ে যেতেন এবং বিনোদেরও সুযোগ এসে যেত ফলে ইশকুল বদলাবার। এমনিভাবে একে একে দুইটা আঁকার ইশকুলেও ভর্তি হয়েছিলেন অল্পদিনের জন্য। সরস বর্ণনাসুরে জানা যায়, সেই ইশকুলদ্বয়ের একটাতে স্কেল-কম্পাস চালনা শেখানোতেই দিন কাবার হয়েছে, কেউ গোল বৃত্তের ভেতরে একটু ফুলটুল আঁকবার চেষ্টা করলেই শিল্পীটিচার হুঙ্কারিয়া উঠিতেন; আরেকটাতে কেবল শার্পনার দিয়ে পেন্সিল কেমন নিপুণ কায়দায় তীক্ষ্ণ করতে হয় সেই বিদ্যা শেখাতেন গুরুজি এবং এই করতে করতেই পিরিয়ডঘণ্টা বাজিয়া উঠিত। মনে পড়বে যে আমাদেরও ইশকুলের ড্রয়িংস্যার আর ড্রিলস্যারদের মুখ। তবু ওরাই আমাদের যাবতীয় শিল্পচর্চা আর সপ্রতিভতার আদি গুরু বলিয়াই স্বীকার করতে হয়। বিনোদবিহারীও গুরুসহায়তা স্বীকার করে নিয়েই স্মৃতি ইয়াদ করছেন। গুরুদের মধ্যে আরেকজন ধর্তব্য। বিনোদ সবিস্তারে সেই গুরুর মুখ এঁকেছেন। সেই আদি গুরু সহোদর তার, ছয় ভাইয়ের মধ্যে আমাদের গল্পের নায়ক বিনোদ সর্বকনিষ্ঠ, সর্বজ্যেষ্ঠ সহোদর পেশায় চিকিৎসক হবার সুবাদে তাদের ইয়াব্বড় পরিবারটিকে এখানে-ওখানে বিভিন্ন মহকুমা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নির্ধারিত কম্পাউন্ডে বাসাবাড়ি বেঁধে থাকতে হয়েছে এবং মেয়াদান্তে ঠাঁইনাড়া হতে হয়েছে। ফলে ভগ্নস্বাস্থ্য বিনোদের দুনিয়াদেখা আর বিনোদন মুফতে ও নির্বিঘ্নে হয়েছে ছেলেবেলা জুড়ে। সেই শিল্পগুরু দাদা বিজনবিহারীর সঙ্গে বালক বিনোদ হ্যারিসন রোড আর কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাতপ্রদর্শনী বিহার করে বেড়াতেন, সেখানে রাজ্যির পোস্টার আর নীতিবাক্যবহ সংসারসজ্জার ক্যালিগ্রাফিক পটচিত্র, স্টেন্সিল-করা নানারকমের মহাজনবাণী ইত্যাদি দেখে বেড়াতেন দুই ভাই মিলে। এর অনেক পরে এসবের, বিশেষত ক্যালিগ্র্যাফের, শিল্পদীপ্ত প্রয়োগ আমরা পরিণত বিনোদবিহারীর চিত্রপটে দেখতে পাব। বড়ভাইটি সম্পর্কে বিনোদের স্মৃতিস্নিগ্ধ মূল্যায়নের পর মন্তব্য, তিনি শিল্পীর মতোই জীবন কাটিয়েছেন, কিন্তু জগতে নাম রেখে যেতে পারেন নি। আমি আরো অনেককে জানি যারা সারাজীবন শিল্প-সংগীত ইত্যাদি নিয়ে জীবন কাটিয়েছেন। এঁদের দেখেই আমার ধারণা হয়েছে যে সৃষ্টির উৎস মানুষের অন্তরের বস্তু। বলা বাহুল্য, সংসারে এহেন লোকের দেখা আমরাও লভিয়াছি।

স্মৃতিসিনেমার দৃশ্যগুলো অত্যন্ত জ্যান্ত। এর মধ্যে রয়েছে দু-দুটো গোখরো সাপ কতল করে তাদের মুঠো-আকৃতির মস্তকদ্বয় স্পিরিটের বোয়েমে প্রিজার্ভ করে রাখা, গায়ের লোকেদের হাতে ধৃত কুমিরের চামড়া রোদে রেখে নুন মাখিয়ে শুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা, আর সর্বোপরি দিনদুপুরে লোকালয়ে এসে আটকা-পড়া এক অপার্থিব থমকানো হুতুম পেঁচার অনবদ্য সুস্থির বর্ণনা। সিমেন্ট করা মেঝের ওপর ডানা বাঁধা হুতুম পেঁচা মূর্তির মতো স্থির হয়ে আছে। কাঠের সিঁড়ি, ছাত থেকে ঝোলানো ইলেকট্রিক বাতির ঝাড়, পাস্তুর ফিলটার, ঘড়ি — এরই মাঝখানে বড় বড় হলদে চোখওয়ালা হুতুম পেঁচা। অভাবনীয় এক অভিজ্ঞতা! কেবল আমি নই, বড়রাও খানিকটা হকচকিয়ে গিয়েছিলেন, পেঁচাকে এইরকম এক পরিবেশের মধ্যে দেখে। এখন মনে হয় মানুষের মধ্যে হুতুম পেঁচা দেখেছিলাম, যেন একখানা সুররিয়েলিস্ট ছবি! কিন্তু শুধু পরিপার্শ্বের নিসর্গবর্ণন নয়, নিজেদের পরিবারের খুঁটিনাটি দুঃখ-সুখের বর্ণনাও অত্যন্ত গভীর উপলব্ধির রসে জারিত হয়ে এসেছে এই বিপুল রৌদ্রছায়ার স্মৃতিসিনেমায়। রিমার্ক করেছেন একেকটা পার্ট স্মৃতিরোমন্থন শেষে এমনভাবে যা আমাদের মনে গেঁথে থাকে। যাদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এইসব ছোটখাটো স্মৃতি তাদের সকলেই সংসার ত্যাগ করেছেন, কিন্তু তাদের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থলপদ্মের গাছ, কৈ মাছের ঝাঁক, আর হুতুম পেঁচা। আমাদেরও মনে হয় এমন-কোনো ঘটনাস্মৃতি কি বিষজারুলির লতা নাই যা মানবসঙ্গবিরল। আমাদেরও মনে হয় এমন-কোনো নৌকো ও হিজলগাছের কাণ্ডজোড়া হাওর নাই যার সঙ্গে কোনো-না-কোনো মনুষ্যস্মৃতি বিজড়িত।

তখনও বিশ্বভারতী হয়নি, কিন্তু শান্তিনিকেতনের বর্ণনা এই বইয়ের প্রথমাংশে এতই বিশেষণ-এড়ানো অন্তরঙ্গ যে এর তুল্য রবীন্দ্রাশ্রমটির নিরাভরণ অনির্বচনীয় বর্ণনা আমরা ঠাকুরপুজার এই দেশে বের করতে পারব অল্প। গুটিকয় এমন বই আছে অবশ্য, মনে পড়ছে এ-মুহূর্তে ভাস্কর শঙ্খ চৌধুরীর একটা বাংলা বই, শিরোনাম মনে পড়ছে না বইটির, তেমনি কবি মণীন্দ্র গুপ্ত প্রণীত আরেকটা বই, এইটারও নাম নিবন্ধকারের কাছে না-জিগায়ে নিকটবর্তী বইদোকানিরে যেয়ে জিগান লেখক-নাম উল্লেখ করে, হাতেনাতে না-হলেও অচিরে মেওয়া ফলিবে। এই বইটিতে চিত্রকর বিনোদবিহারী নিজেই শিক্ষার্থী হিশেবে শ্রীনিকেতনে ছেলেবেলা থেকে শেষোব্দি শিল্পের পাঠ নিয়েছেন। জায়গাটাকে দেখেছেন একদম প্রিমিটিভ অবস্থায়। এবং পরবর্তীকালে মহীরুহ হয়ে উঠবে যে-শিক্ষায়তন অন্তত কয়েক দশকের সীমাবদ্ধ অধ্যায়ের জন্য হলেও, বিনোদ সেই জায়গাটার বর্ণনা আলাদা আদলে এনেছেন বইয়ের পাতাফোকরে। এগুলো মোটেও কোনো পূর্বপ্রকল্পিত গুরুদেবদোহানো বর্ণনা না যেমন তেমনি গুরুদেবধ্বসানো বর্ণনাও নয়। এবং রবীন্দ্রনাথের ঘরোয়া পোশাকে আটপৌরে উপস্থিতি দেখতে পাব আমরা বারবার। দেখতে পাব গুরুদেব স্নানান্তে শাদা তোয়ালে দিয়া গা ঢেকে আমাদের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, ক্রস করার সময় একটা-দুইটা ফোড়নও কাটছেন ছাত্র-মাশ্টারদের সঙ্গে। দেখব আশ্রমের চালা দিয়া বৃষ্টিবারি প্রবেশের কুফলে রাতজাগা আশ্রমবাসী বিদ্যার্থীরা ঠাকুরের কৃপাদৃষ্টি লাভের আশায় ফরিয়াদ জানাইতে গেলে সেয়ানা ঠাকুর আপিলকারীদেরে সদ্য-বাঁধা গান শুনিয়ে ভুলিয়ে রাখেন কেমন দুর্ধর্ষ সম্মোহনকৌশলে।

12092532_10207825137216964_987384221_nএইভাবে যেতে যেতে পথে এক-সময় দেখা হয়ে যাবে সেই বিখ্যাত ত্রয়ীর সঙ্গে, সেই তিন ভাই, এরাও ঠাকুরবাড়িরই। বিনোদবিহারী গিয়া পৌঁছাবেন সেই বিখ্যাত বারান্দায়, যে-বারান্দার বর্ণনা আমরা ইতিউতি নানান বইপত্তরে পেয়েছি, যাবেন ছবি দেখাতে নন্দলালেরই পরামর্শে। সেই তিন ভাই অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ আর সমরেন্দ্রনাথ। তিনজনেই আঁকেন, অবন ঠাকুর মধ্যমণি সকলের, তখনকার নব্য প্রদর্শনীগুলোতে এই তিনের কাজ মর্যাদা পায় আলাদাভাবে। এরা তারুণ্যের বিজয়ডঙ্কা বাজায়েছেন বলেই তরুণমহলে এদের কদর আলাদা উল্লেখ্য তখন। বিনোদ গিয়েছেন মোট তিনখানা ছবি নিয়ে, এর মধ্যে একখানা বাঁশিবাজানোরত সাঁওতাল আর একখানা ব্যাধের ছবি। পয়লা ছবিখানা দেখে অবন ঠাকুর মুচকি হেসে মন্তব্য করছেন, এইটা কি করছে হে, বাঁশি বাজাচ্ছে, না কলা খাচ্ছে? একপলকেই বিনোদ নিজের ফিগার আঁকার খামতি বুঝতে পারেন। বাকি দুই ছবির মধ্যে ব্যাধের ছবি দেখে অবন ঠাকুর নোংরা রঙ আর নোংরা কাগজের ব্যাপারে তার আপত্তি জানান এবং সঙ্গে এও বলেন যে ব্যাধের ছবিখানা এক্সিবিশনের জন্য রেখে যেতে। এরপর এক্সিবিশনে এসে যখন অবন ঠাকুরের সঙ্গে বিনোদের দেখা হয়, অবন তাকে ডেকে নিয়ে সস্নেহ ঠাট্টার স্বরে বলেন, যাও দ্যাখো, আমিও ব্যাধ করেছি, তোমার ছবির পাশেই রেখেছি। দ্যাখো, কার ভাল হয়েছে! অবনীন্দ্রনাথের আঁকা ব্যাধের ছবি দেখে বিনোদের সেই প্রভাতে কেমন করে রবির কর পশেছিল পরানে, নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ যেন, সেই স্মৃতি সকৃতজ্ঞ স্বরে স্বীকার করছেন পরিণত ও প্রতিষ্ঠিত বিনোদ জীবনসায়াহ্নে এসে, — গলায় দড়িবাঁধা একটা হরিণবাচ্চাকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে একজন লোক। ক্রূর তার মুখের ভাব। ছবিতে আর কিছুই বোধহয় ছিল না। হাল্কা এলা মাটির রঙ। তার পাশেই আমার শ্যাওলা রঙের ব্যাধের ছবি। সেদিন এক ঝলকে যা বুঝেছিলাম সে-বিষয়ে লম্বা বক্তৃতা দিয়ে আমাকে কেউ বোঝাতে পারত না। তা, আজকের তরুণ শিল্পী, আজকের নবিশ কবি, আজকের শিল্পশিক্ষার্থীর কাছে এই সিনেমার কানাকড়ি কিমৎ আছে কোনো? মনে হয়, দেখিয়াশুনিয়া চারিপাশ, নেই। শিল্পীকবিরা আজকাল স্বয়ম্ভূ, সোশ্যালসাইটযোনিসম্ভূতা।

আরও অনেকের এমন ঘরোয়া আটপৌরে চেহারা আমরা দেখব গোটা বইটায় ছিটিয়ে ছড়িয়ে আছে। এক-দুই বাক্যে, এক-দুই আঁচড়ে, এক-দুই রেখার আভাসে। রামকিঙ্কর, সুকুমার দেউস্কর, সুধীর খাস্তগীর প্রমুখ অনেকের সঙ্গেই মিতালি হবে আমাদের ক্রমশ। অবশ্য কিঙ্করের প্রসঙ্গটা মাত্র দুই সিনে পেয়েছি, একবার তার যোগদানের তথ্য শুধু, আরেকবার যখন হিন্দিভবনের দেয়ালে ম্যুর‍্যাল/দেয়ালভিত্তিচিত্র আঁকবার জন্য রামকিঙ্করই বিনোদকে তাগিদ দিচ্ছেন তখন। নন্দলালের নিষেধ অমান্য করে বিনোদ হিন্দিভবনের দেয়ালে কাজটা দীর্ঘকাল ধরে অনেক শিল্পশিক্ষার্থীর কায়িক সহায়তায় সমাধা করেন এবং সেই কাজের অভিযানটুকু মনে রাখার মতো। অন্ধের ন্যায় একদম দেয়ালের পেটে সচশমা চোখ নিবদ্ধ করে আবছাদৃষ্টির একচোখওয়ালা শিল্পী কী নিদারুণ সুন্দরভাবে আঁকছেন, দৃশ্যগুলো খণ্ডখণ্ড স্ক্রিপ্টেড হয়েছে মনোহর ভঙ্গিতে। একটা ব্যাপার আপনার মনে কৌতূহল জাগাবেই, সেইটা আর-কিছু নয়, রবীন্দ্রনাথের আঁকাআঁকি বিষয়ে এই বইয়ের কোথাও কোনো দৃশ্য তোলা নাই। কিন্তু ওই সময়েরই মধ্যে আমরা আন্দাজ করি ঠাকুরের ছবি দেশেবিদেশে দেখানো হয়ে গেছে। অন্তত বইয়ের পাতায় ইলাস্ট্রেশন তো করেছেন এবং সবাই তথা বিনোদবিহারী নিজেও প্রত্যক্ষ নিশ্চয় করেছেন। মন্তব্য অনুপস্থিত বইয়ের ভিতরে। এ-ও আপনি ভাববেন নিশ্চয় যে রবি যদি প্রকাশ্য ময়দানে কিংবা লেখার ঘরে জানুর ওপর বোর্ড রেখে মুখ ঝুঁকিয়ে একটাও ছবি না-আঁকেন, পরবর্তীকালে এত ছবি-যে দেখব আমরা, ওগুলো রবীন্দ্রনাথ তাহলে এঁকেছেন কখন? প্রশ্নটা আরেকটু ঘুরিয়ে নেয়া যায় এইভাবে যে, এত-যে লিখলেন রবিন, এত লক্ষ লক্ষ অক্ষরবাক্যপঙক্তি, কে দেখেছে তাকে কেবল গর্দান গুঁজে টেবিলে বেসামাল লিখে যেতে? সেইজন্যে কোন সামাজিকতাটা, কোন সংসারদায়টা, এড়াতে হয়েছে রবিকে? অ্যানিওয়ে। বিনোদবিহারী নন শুধু, সমসাময়িক সকলরেই তখন, রবির ছবি নিয়া নীরব হইয়া বইয়া থাকতে দেখা যাবে; সে-সময়ের শিল্পীদেরকে। এই বিষয় নিয়া ঠাকুরদেবেরও অভিমান ছিল, প্রকাশও করেছেন অভিমান, তবে এর পেছনে নিশ্চয় সেকালের নন্দন ও অন্যান্য বিচারবিবেচনা কাজ করেছে। নতুবা বিনোদবিহারীর ন্যায় শিল্পসজ্জন ব্যক্তি, কিংবা রামকিঙ্কর, বিষয়টা খামাখা এড়িয়ে যাবেন কেন! থাক, এইসব নিয়া প্যাঁচালের ম্যালা মানুষ আছেন মর্ত্যে। আমরা আবার কাহিনিবনে ফিরিয়া যাই।

কিন্তু খটকা একটা না, আরও খটকা জাগবে নিশ্চয় আপনার, জ্যান্ত কাহিনি মাত্রই ইন্টার‍্যাক্টিভ, সত্যিকারের ভালো গল্প খটকাজাগানিয়া। আমরা এখানে সবকিছু হড়বড় করে বলে ফেলব, অতটা গড় গল্প এইটা না, অভিপ্রেতও নয় হেন হড়বড়ানো। দুইয়েকটা শুধু বলি। বিনোদবিহারীর জীবনপরিসর গোটা ভারতীয় ও তৎপার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এক ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ পটপরিবর্তনের কাল। অনেক আন্দোলনঘটনা চারিপাশে। সেইসবের সঙ্গে বিনোদের যোগ নাই কোনো? স্যলিডারিটি নাই? রিয়্যাকশন নাই? অ্যাকশন-রিফ্ল্যাকশন নাই? রেস্পন্স গরহাজির? আহিস্তা, ইয়ার, আহিস্তা, জারা ধিরে। এখানে এই প্রসঙ্গে আমরা বিনোদবিহারীর জবানবন্দি নিতে পারি; অসহযোগ আন্দোলনের সময় আমার এক বন্ধু আমায় বলেছিলেন যে দেশের এই দুর্দিনে আপনার লজ্জা করে না বসে বসে কাগজে রঙ লেপতে? কিন্তু আমি নির্লজ্জের মতো সারাটা জীবন কাগজের ওপর রঙ লেপেই কাটালাম। আসল কথা, আমার স্বভাব এমন যে কোনো সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে আমি নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারিনি। পাকিস্তান-হিন্দুস্থানের ইতিহাস তৈরি হয়েছে আমার চোখের সামনে। দুর্ভিক্ষ, বন্যা, ভূমিকম্প ঘটেছে — এর সঙ্গে কোনো ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ আমার ছিল না। এ বিষয়ে কোনো ছবিও আমি করিনি। শিল্পীজীবনের পরাকাষ্ঠাই আমার চিরদিনের লক্ষ্য। আমি নিজেকে জানতে চেয়েছি এবং সেই জানার জন্যই অন্যকে জানতে চেষ্টা করেছি। আমি সাধারণের একজন, এ-কথা আমি কখনো ভুলিনি। কিন্তু, ভাবুন দেখি একবার, জন্মাতেন যদি তিনি শিল্পী হিশেবে এই শাহবাগ-শাপলাবিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে, আমরা তার জিন্দেগি-বন্দেগি তামা করে দিতাম না? রাজার হয়ে শিঙে না-ফুঁকে কেমন করে তিনি উইথ ডিগ্নিটি ছবিকাব্য করতেন আমরা শার্টের আস্তিন গুটায়ে একবার দেখে নিতাম না? বাংলাদেশে লেখক-কবি-শিল্পী জন্মায় ব্যবহৃত ব্যবহৃত ব্যবহৃত হয়ে জীবনানন্দকবিতায় বিবৃত পশুটার মাংশ হয়ে যেতে, এবং তারা মহানন্দে ব্যবহৃত ব্যবহৃত ব্যবহৃত হতে ভালোবাসে তবু হারাম একটাও কবিতা লেখে না গান গায় না সিনেমা বানায় না, খালি রাজার দলের পেটোয়া বাহিনির পার্পাস্ সার্ভ করে যায় হেসেখেলে খেয়েদেয়ে। ব্যাপারটা আহ্লাদের। বিনোদবিহারী সেই আহ্লাদের আঁচ গায়ে নেন নাই, আচমন করেন নাই আহ্লাদের আঁজলাভরা জলে, যেই আহ্লাদে এই দেশের সব্যসাচী বিটকেলে লেখকদের অশীতিপর জীবন কাটে দেখতে পাই। আর তরুণের রেডিও-রিয়্যাক্টিভ অ্যাক্টিভিটিতে দেশমুলুক উজালা আশায় হৃষ্ট সম্প্রতি।

Untitled2কিন্তু আমরা আবার গল্পচ্যুত হয়ে যেতেছি বোধহয়। ফিরি গৃহের দাওয়ায়, ল্যান্টার্ন লাইটে কিংবা চন্দনি আলোয়, ফিরি বিনোদবিহারীর জীবনে। যেইটা বলছিলাম যে এই বইটিতে শান্তিনিকেতনের অন্য ছবি লক্ষ্য করবেন। যদিও শান্তিনিকেতন নয়, এই বইয়ের প্রতিপাদ্য বিনোদজীবন, অথবা এই বইয়ের ফোকাস্ এক অন্যতর মহাজীবন আসলে। শেষের বিবেচনায় নিবন্ধকারের পক্ষপাত, যদি জানতেই চান। উৎকলন আরেকটা, আসুন বিনোদের অব্জার্ভেশন একটু শুনেই দেখি-না, “নানা কারণে রবীন্দ্রনাথকে অনেক জিনিস সহ্য করতে হয়েছে। যা তিনি চাননি সে-জিনিস তিনি সবলে উৎপাটন করার চেষ্টা করেননি বা করতে পারেননি। এইজন্যেই দেখা যায় যে বিশ্বভারতী সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ ধীরে ধীরে কমে এসেছে। তাঁর এই উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে যেসব আগাছা গজিয়েছিল সেইগুলি মহীরূহ হয়ে উঠেছে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর।” উক্তিটার পেছনে একটা কন্টেক্সট আছে, যেইটা আমরা এখানে না-বলেই শুধু উক্তি নিলাম তুলে; এখনকার কন্টেক্সটেও বসিয়ে এর বিচার আপনি করে নিতে পারবেন।

বইয়ের মোটমাট চারটা রচনার মধ্যে সবচেয়ে বড় কলেবরের রচনাটি শিল্প-জিজ্ঞাসা, পাক্কা পঁচানব্বই পৃষ্ঠায় এর তামাম শোধ, আমরা সেই রচনা থেকে একটাও উদ্ধৃতি না-নিয়ে গোটা রচনাটা আপন করে নেব অবসরমতো বইটাকে শিয়রে টেনে। এখানে বিনোদবিহারীর শিল্পীজীবনের বোঝাপড়াগুলো উপন্যাসোপম বর্ণনায় জীবন্ত হয়ে এসেছে। এই বইয়ের সবচেয়ে ছোট কলেবর রচনার নাম কীর্তিকর, এর ব্যাপ্তি তিনপৃষ্ঠা এবং আরেকটু অর্ধেকপৃষ্ঠারও কম। ফিকশনের কায়দায় চিত্রী নিজের একটা কাউন্টার ক্যারেক্টার ক্রিয়েট করে ডায়ালগ চালাচ্ছেন অনবদ্য কবিতাসাবলীল ভঙ্গিতে। এবং অন্য রচনাটি, কত্তামশাই শিরোনামে, একবাক্যে বিপুল ব্যঞ্জনার দুর্ধর্ষ রচনা এক! এইখানেই পুরোপুরি অন্ধ বিনোদ, পঞ্চাশ-পেরোনো পরিণতমনস্ক প্রতিষ্ঠিত শিল্পী বিনোদ, আর তার অন্ধকার দিনযাপনের দিনের-পর-দিনের রুটিনবর্ণনা আমরা পাচ্ছি এমন এক কায়দায়, এই বর্ণনাভঙ্গির সঙ্গে কোনো য়্যুরোপিয়্যান দার্শনিকের, যেমন জরথুস্ত্রের নিটশের, বর্ণনাভঙ্গি মিলে যেতে পারে এর সমস্ত সদর্থে। এইখানে আমরা তাকে দেখি গিন্নীর সঙ্গে কেমন করে বাতসওয়াল করছেন, দেখি বিরক্ত হচ্ছেন কেমন করে, দেখি শব্দের সঙ্গে প্রহরের ঘড়িটি কীভাবে আন্দাজ করে নিচ্ছেন, দেখি গৃহপরিচারকের সঙ্গে কেমন করে কথাবার্তা বলে একঘেয়েমি থেকে নিষ্কৃতি খুঁজে নিতে চাইছেন, এবং দেখি সম্পূর্ণ অন্ধ একজন লোক কেমন করে নতুন কৌশলে রঙছাড়া খালি কলমে-পেন্সিলে এঁকে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে নতুন উদ্যমে; এইখানেই পাই তিনি মোম দিয়ে মূর্তির কাজ করতে ব্যাপৃত দিনভর। কত্তামশাই কথা বলে চলেছেন অতল অগাধ অপরিমেয় অন্ধকারে কত-না কাল্পনিক-বাস্তবিক লোকের সঙ্গে, মিথমানুষের সঙ্গে, এমনকি পরমা প্রকৃতির সঙ্গেও। একটা ছোট উদাহরণ উঠাই বিশালব্যাপ্তির লেখাটার মাঝখান থেকে এক-খাবলায়, যাতে এর গদ্যচলন সম্পর্কে একটা আইডিয়া পাওয়া যায়। পেছনের কথাটুকু সংক্ষেপে এ-ই যে, স্রেফ শুয়েবসে আন্ধাকানা কত্তামশাইয়ের দিন কাটে, এখনও অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারছেন না প্রাপ্ত নতুন নসিবের সঙ্গে, এই-রকম সময়ে একদিনের দৃশ্য ও সংলাপ। কত্তামশাই উঠি উঠি করছেন। কুর্সির পাশে রাখা লাঠিটা কত্তামশাই খুঁজতে যাবেন এমন সময় চটচটে, চিটচিটে, রোঁয়াওলা একটা জিনিসের উপর হাত পড়তে এটা কী বলে তিনি আঁতকে উঠলেন। / — আজ্ঞে, আমি শ্যাম। / — কে তুই! এখানে কি করতে? / — আজ্ঞে, গিন্নীমা আমাকে এখানে বসতে বলেছেন — আপনার কাজ করব। / — রোঁয়াওয়ালা ওটা কী? / — আজ্ঞে ওটা আমার চুল। / — চুল! ও-রকম! / কত্তামশাই নিজের চুলে হাত বুলিয়ে দেখলেন ছেলেটা মিথ্যে বলে নি। কিংবা আরেকদিনের ঘটনা। হাতড়াতে হাতড়াতে দেশলাই খুঁজতে যেয়ে উপর থেকে গরম জল গায়ে এসে পড়লে হাঁকডাকে বাড়ির লোক জড়ো করে কত্তামশাই রাগতস্বরে জানতে চান উপর থেকে গরম জল পড়ে কেমন করে এবং কোন দৈবী ইশারায়? সবাই তখন ঘটনা তদন্ত করে দেখতে পায় দেশলাইসন্ধানী হাতের ঠেলাধাক্কায় টেবিল থেকে চায়ের পেয়ালা উল্টে যেয়ে এই কাণ্ড। কত্তামশাই শান্ত হন। পড়তে পড়তে আপনার মনে হবে যে বোর্হেসের বা তারও আগের হোমারের বা পাশের গাঁয়ের আরকুম শা-র মাজারের আন্ধা গায়ক লোকটার অভিজ্ঞতাটা কোথায় লিপিবদ্ধ আছে একটাবার খুঁজে দেখি তো!

১৯৫৭ সালের সেই দিনটা বইয়ের চিত্রকর শীর্ষক নামরচনায় লিখেছেন সবশেষে আশ্চর্য নির্লিপ্ত যথাসংক্ষেপে। সচরাচর আমি সন-তারিখ ভুলে যাই, কিন্তু এই দিনটি আমি ভুলি নি। দিল্লির মস্ত চক্ষুডাক্তার ছুরিচিকিৎসার জন্য অবিলম্বে অস্ত্রোপচার-কামরায় যেতে প্রস্তুতি নিতে জোর তাগাদা দেন এবং বলেন যে আপনার লোকসান কী? ডাক্তারি মতে তো আপনি অন্ধ! ইত্যাদি। বিনোদ যেন অমিয়ভূষণ মজুমদার রচিত উপন্যাসের মার্জিত আবেগের চরিত্র, বলছেন — বাকি অংশটা সংক্ষেপেই সেরে দিই। হাসপাতালে কয়দিন কাটিয়ে একদিন অপরাহ্নে কালো চশমা চোখে লীলার হাত ধরে বেরিয়ে এলাম নার্সিং হোমের বাইরে। বাইরে রৌদ্রের উত্তাপ বুঝছি, কিন্তু আলো দেখতে পাচ্ছি না। # তারপর প্রায় বিশ বছর হতে চলল, আলো আর আমি দেখি নি। শাদা কাগজের ওপর নানা রঙের ছোপছাপ দিয়ে ছবিও আর আমি করি নি। # আজ আমি আলোর জগতে অন্ধকারের প্রতিনিধি। রচনাটা ফার্স্ট ছাপানো হয়েছিল শারদীয় এক্ষণ পত্রিকায় ১৩৮৪ বঙ্গাব্দে। অ্যানিওয়ে। শেষ বাক্যটি কি আমরা আজ সমর্থন করব? ভোটাভুটি বাহুল্য ও অনাবশ্যক।

দেখতে-শুনতে কেমন ছিলেন তিনি, কিংবা তার স্বভাব-চরিত্র, ইত্যাদি তো আর নিজের মুখে বলেন নাই বইটাতে। কিন্তু অন্যত্র বর্ণনা পাওয়া যায় বৈকি, বিভিন্ন অনুস্মৃতিনিবন্ধে। সেসবের গড়-মধ্যক নির্ণয়পূর্বক শিল্পীর তসবির একবার স্ন্যাপশটে দেখে নেবার চেষ্টাটা করা যায়। বিনোদবিহারী শিক্ষিত সচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। অন্তর্মুখী, শান্ত, মিতবাক। উচ্চারণ অনুচ্চকণ্ঠ হলেও স্পষ্ট। অতিক্ষীণ চোখদৃষ্টির কারণেই ছেলেবেলা থেকে দৈহিকভাবেও দুর্বল। বুদ্ধিদীপ্ত ও মৃদুহাস্য ব্যক্তিত্ব।

মহাশয় আমি রূপকার, চাক্ষিক মাত্র — বলেছিলেন রামকিঙ্কর, বন্ধু পরস্পরের, দুজনের ভেতরে পরস্পরের সম্পর্কে শ্রদ্ধাবোধ বজায় ছিল অন্তিম পর্যন্ত, প্রকাশও করেছেন প্রয়োজনে অতি সন্তর্পণে সেই বোধ। বিনোদবিহারীকে যদি কিঙ্করের আদলে কোনো কথা বলতে শোনা যেত, তো কী বলতেন তিনি? মহাশয় আমি ভুবনান্ধ, অন্তর্চাক্ষিক’— এই-মতন কিছু বলতেন বুঝি? যা-হোক। ছিলেন কিঙ্করের চেয়ে বয়সে দুই বছরের বড়। রবীন্দ্রাশ্রমেও বিনোদ ভর্তি হয়েছেন রামের অনেক আগে। গ্রামের কায়িক শ্রমজীবী কিঙ্করকে শিল্পের মোক্ষধামের সোপানে পা ফেলতে হয়েছে অনেক লড়াই করে এবং দৈবাৎ রবীন্দ্রাশ্রমে শিল্পশিক্ষার সুযোগ ঘটেছে তার অনেক পরে। বিনোদবিহারীর ছাত্র সত্যজিৎ রায় ইনার আই তথ্যচিত্রে শিক্ষকের শিল্পকল্পনা আর গোটা মানুষটার ভেতরজাগতিক ছবি ধরে রেখেছেন।

binodbihari mukhopadhyay woodcutএকপ্যারায় এইবার বিনোদবিহারীর পেইন্টিংওয়ার্কের শো-কেস্ দেখে নেয়া যাক। ১৯৩৬ সালে শিল্পী গিয়েছিলেন জাপানে শিল্পশিক্ষার উচ্চতর রাস্তাগুলোর সবক নিতে। এই বিদেশবাসকালে পাওয়া তালিম তার বাকি জীবনের কাজে বেগ সঞ্চার করেছে নিশ্চয়। জ্যাপ্নিজ্ শিল্পরীতি তিনি ইন্টার্নালাইজ্ করে নিয়ে দেশীয় কলারীতির সঙ্গে মেশায়েছেন। যদিও জাপানে তখনও ঐতিহ্যানুগত ভূদৃশ্য আর প্রতিকৃতি অঙ্কনের অনুশীলনীই ছিল ব্যাপক, স্যুরিয়্যালিস্ট ধারায় জাপানিরা আসবে আরও পরে। এইসব নিয়া শিল্প-জিজ্ঞাসা  অংশে, এই বইয়ে, বিনোদ বিস্তর কথা বলেছেন। জাপানি রীতির আখর কয়েকটা কাজে চট করে ধরা গেলেও কখনোই তিনি রীতিডুবন্ত মন্ত্রানুশীলন করেননি। বেনারস ঘাট ছবিটা মাথায় রাখা যাক, বা টেম্পল বেল, স্ক্রল শপ প্রভৃতি। আর্টিস্ট ইন স্টুডিও অনেকটা তা-ই। কিন্তু বৃক্ষপ্রেমী? ডিয়েগো রিভেরা বাংলায় আত্মস্থ করে যেমন ছবি আঁকতে একজন শিল্পচৈতন্যে ঋদ্ধ যুবা চাইবেন, সেইটার চাক্ষুষ উদাহরণ যেন ছবিখানা। আর শরবন? বা কথোপকথন? একেবারেই ভিন্ন। বৈচিত্র্যের এই অবাক-করা কারবার বিনোদ করে গেছেন অনায়াস। লোকশিল্পের দেশীয় ধরনের টেপা-পুতুল, পটচিত্তির ইত্যাদির আবয়বিক ও অঙ্গসংস্থানিক ইশারাগুলো তিনি নিজের ক্যানভাসে অননুকরণীয় কায়দায় নিয়েছেন দেদার। ক্যানভাসে টেনশন, বাংলায় যেই প্রত্যয়টাকে বিনোদ বলছেন সংকর্ষ, এবং ব্যালেন্স বা ভারসাম্য বজায় রাখার দিকে তার দুর্মর টান তাকে একাকী শেরপা করে রেখেছে। এই দুই গুণ, যথা সংঘর্ষ ও ভারসাম্য নিয়ে বিনোদ তার বইয়ের ব্যাপকাংশ বরাদ্দ করেছেন সবিস্তার আলোচনায়। রেখা আর রংকে নিয়ে দেখা যায় তাঁর দুঃসাহসিক পরীক্ষা। কখনো রংকে নিয়েছেন একাধারে রং ও রেখার দায়িত্ব পালনের ভূমিকায়।— এই বিবেচনাবাক্য সোমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন বিনোদজন্মশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষ্যে একটা মূল্যাঙ্কনে, যে-লেখাটা ছাপা রয়েছে চারুকলা ২০০৯ সালের সংখ্যায়। আজকাল উইকিপৃষ্ঠায় বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় সম্পর্কিত তথ্যপঞ্জি সুলভ, যদিও তা অতিসংক্ষেপ এবং খণ্ডিত; ছবিও গোটাকতক দেখা যায় ছিটানো-ছড়ানো গুগল্ সার্চ দিয়ে ইমেইজ্ অনুসন্ধানের অপশনে যেয়ে। অ্যানিওয়ে। এবার এই নিবন্ধগল্পের জাল আমরা আস্তেধীরে গুটায়ে নেব।

পুরো বই জুড়ে বিনোদবিহারী কোথাও অভিমান করছেন বলে মনে হয় না, স্বাভাবিকই ছিল অভিমান অন্তত বিধাতাসালিশের প্রতি। কী আশ্চর্য মহাজীবন, মনে হয়, দ্যাখো! কোথাও ক্রন্দন নেই। ছিঁচকাঁদুনিগীতির এই দেশে এ এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা বটে। কেবল একটা-দুইটা জায়গায় যেয়ে চোখ ভিজে ওঠে পড়তে পড়তে। এমন একটা জায়গা এখানে টুকে রাখি : নন্দলাল আমাকে মাদুর, ডেস্ক, জলের পাত্র ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত করেননি, কিন্তু আশপাশের সবাইকে তিনি দেখাতেন, কেবল আমাকে ছাড়া। তারপরও নন্দলালকেই তিনি তার আঙ্গিকের আদি গুরু আখ্যা দিচ্ছেন, রবীন্দ্রাশ্রমের লাইব্রেরি আর বোলপুরের প্রকৃতিনিসর্গের অপার লীলাকেই নিজের শিল্পবীজ থেকে কিশলয় হবার পথে প্রধান নিয়ামক মনে করেছেন। নন্দলাল না থাকলে আমার আঙ্গিকের শিক্ষা হতো না, লাইব্রেরি ছাড়া আমার জ্ঞান আহরণ করা সম্ভব হতো না, আর প্রকৃতির রুক্ষ মূর্তি উপলব্ধি না করলে আমার ছবি আঁকা হতো না।

শান্তিনিকেতন পত্তনির একেবারে শুরুর দিককার দারুণ সুন্দর ডক্যুমেন্টারি এই বই। বিনোদবিহারীর কিছু ড্রয়িং, কিছু উপরিপাওনা কাগজে-পেন্সিলে স্কেচ আর ব্রাশের মতো মোটা নিবকলমের কাজ, বইটিতে লভ্য। অন্ধ হবার পরের নতুন বাস্তবতায় তিনি কীভাবে পথ করে নিচ্ছেন শিল্পযাপনের, এর নজির হিশেবে এই ড্রয়িংগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কতটা শাদামাটা করে নেয়া যায় রেখা আর কতটা অনাড়ম্বরভাবে দেখাদেখিটাকে অপার অন্ধজ্যোৎস্নায় থেকেও উদযাপন করা যায়, বিনোদবিহারী নিজের নতুনজন্মের রেখাচিত্রগুলোতে সেই চেষ্টাই নির্বিরাম করে যান। চিত্রশিল্পে ব্যঞ্জনাবহ সরলসহজিয়ানার দৃষ্টান্ত যদি কেউ দেখতে চান, যদি কেউ সহজিয়ানার পার্ফেকশন চাক্ষুষ করতে চান, বিনোদবিহারীর অন্ধজ্যোতিজীবনের কাজমালা তাকে দেখতেই হবে। যদিও, বলা বাহুল্য, কোনোভাবেই এটি শান্তিনিকেতন বিষয়ক কোনো স্মৃতিকথা নয়। এমনকি কোনো শুভ্রবর্ণ শ্মশ্রুমণ্ডিত দেবদ্বিজে ভক্তি প্রকাশের বইও এটি নয়। এই বই অন্ধ বিনোদের। এই বই চিরচক্ষুষ্মান চিত্রকর বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের।
Untitled5

চিত্রকর ।। বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় ।। অরুণা প্রকাশনী ।। সপ্তম মুদ্রণ ১৪১৪ বঙ্গাব্দ ।। কলকাতা

…………………………………

12165848_10207825223979133_1177776206_n
।। জাহেদ আহমদ ।। কবি, গদ্যকার, অনুবাদক
Advertisements

One thought on “অন্ধ অন্তর্চাক্ষিক :: জাহেদ আহমদ

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s