10628483_10153317172420229_4156724677632633119_nতখন, সেকালে পদ্যচর্চা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক। ৭০-এর ডাঙর-ডাঙর কবিতে ছেয়ে থাকত ক্যাম্পাস। কিছু বয়স্যজনও আসতেন তখনকার দিনের তরুণ কবিদের আড্ডায়। সেটাকে বলা যেতে পারে ‘রুদ্রকাল’। আজ বলতে বাধা নাই, ঐ সময় এমন কেউ ছিলেন না, যাকে দেখলে মাথা নুয়ে আসে। সকলের স্বরই একরকম। স্বাধীনতার গৌরবগাথাই কবিতার বিষয়বস্তু। টানা চোখের মত কবিতার নয়নে খোলামেলা কবিতার শরীর। এর মাঝখানে গোপনে গোপনে আমার অস্বস্তি তৈরি হতে থাকে। কলিকাতার ৫০/৬০ দের কবিতার বই পড়ি. তবু এক আনন্দ হয়। আম্মা যেমন তাল, লয় সুরে পদ্য পড়ে শোনাতেন, তার নজির সেসময়কার কবিদের থেকে উপে যায়নি। অবশ্য এদিকে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ প্রমুখ খুব অল্প সংখ্যক কবির কবিতাও আমাদের শরীরে-মনে কাজ করে। বিশ্বাস করেন, তবু অশান্তি ছিল মনে। নিজেরও বুঝতে পারার আওকাত হয় নাই, আবার কবিতার মধ্যে যা চাই, তাও পাই না। শুধু জাবির একছাত্র, শুনেছি তিনি সেলিম আল দীনের আত্মীয় ছিলেন, আরও শুনেছি, পরে মানুষিক অসুস্থতায় অনেকদিন কাটিয়ে ইহলোক ছেড়ে চলেও যান। নিজের চোখে সেই প্রথম আমার কবি বা নিউরোটিক মানুষ দেখা। কি তার শক্ত, স্পিং-এর মত মত টান-টান কবিতা, প্রাচীনকালে গ্রিকদেশের দর্শনের মত, এখনও আবছা-আবছা মনে পড়ে, পারমিনেদিয়েসের মত যেন সেসব কথা। তাও আমার অস্বস্তি ঘোচে না। বলতে দ্বিধা নাই, যুদ্ধকালকে আরএফএলের পন্য বানিয়ে ছাড়ছিলেন সে সময়ে কবিতার অনুষ্ঠান।

তারও অনেক পরে, কোথায় পড়লাম যেন একজনের কবিতা। প্রথম পড়াতেই বিমুগ্ধ! কারুকে বলতেও পারি না, এর কবিতা মনে মনে খুঁজে বেড়াই। তারও একটু আগে, একটু যেন অভিমানই হল, কবিদের সঙ্গে স্বাভাবিক সৌজন্যমূলক সম্পর্ক ছিলই, কিন্তু ভিড়ে গেলাম চলচ্চিত্র আন্দোলনের সঙ্গে। হেথায় দুয়েকজন কবি ছিলেন, যেমন মুজাহিদ শরীফ, একটু আলাদা স্বর। একা কবিতার সঙ্গে জীবনযাপন করি, আর মুহম্মদ খসরু’র সঙ্গে সিনেমা-সিনেমা করি। যাই হোক, যার কবিতা পড়লাম, দেখি, এর সবই আলাদা। কিন্তু তা বাংলা কবিতার সঙ্গেই যায় বেশি। নামটিও অন্যরকম। সেই কবিই আজকের বাংলা-কবিতার রাজপুত্র সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ। বাংলা কবিতার রাজপুত্র অভিধাটি কি আরেক প্রিয় কবি সাজ্জাদ শরিফের দেয়া? তাইতো মনে হচ্ছে। আর এই অভিধা দেখে আমার সত্যিই আনন্দ হয়েছিল।

আমি এখানে সুব্রত নিয়ে নিশ্চয়ই কোন সমালোচনা লিখব না। কিন্তু বুঝতে পারি যে আমি এক বিপথিক তার সন্ধানেই আবার নেমে পড়লাম মাঠে। কিন্তু কবিসমাজের সঙ্গে বিশেষ ঘর করা আমার আর হল না। প্যাট আর (…) বাঁচাতে এখনকার অনেকের মত কতরকমের কাজ, দেশবিদেশ করে আবার এসেছি আমি বাংলায়। কিন্তু মনের মধ্যে সেলাই হয়ে গিয়েছিল সুব্রত’র বাংলা কবিতা। আমরা যেন অনেক বিদেশ ঘুরে নিজের গাঁয়ে ফিরলাম আবার। সেই দুলুনি। সেই শ্লেষ। সেই প্রেম আর অপ্রেমের জ্বালাগাথা। আর রাজনীতি। কবিতায় সুব্রত যতটা ভাল করে রাজনীতি বা দর্শনের কথা বলেছেন, সেটা অনেকেই গলাবাজি করে বলতে পারে নাই।

এককথায় একটা কথা তাহলে বলি। এই বয়সে আর কার অনুুমতি নেব? বাংলার কবিসমাজ কি দেবে?

আমার দেখা গত ত্রিশ বছরে সুব্রতই বাংলাদেশের একমাত্র কবি, যিনি নিছক সৌন্দর্য বা জ্ঞানবিদ্যা তৈরি করেন না। হালকা কথাকে সিরিয়াস আর সিরিয়াস কথাকে হালকাচালে কবিতা করে তোলেন। যা দেখেন, তাই কবিতা। যা লেখেন তাই কবিতা। এক হাজার বছরের বাংলা কবিতার সুরের সঙ্গে সুব্রত কবিতার সুর বাঁধা। ন্যাকা আধুনিক নন। আজীবন বাঁধুনিক!

আজ সুব্রত’র জন্মদিন। সুব্রত’র হাজার বছর পরমায়ু হোক। সুব্রত থেকে যদি বুড়া কবিরাও কিঞ্চিত শেখেন গুনা হবে না। সত্যিকার অর্থে ‘আধুনিক বাংলা কবিতার’ (স্বাধীনতার পরবর্তী সময়কালে) কথা যদি বলি, তবে তার সারগামটা সুব্রতই ধরিয়ে দিয়েছে। এখন তরুনপ্রাণেরা সেই মোতাবেক গলা সাধলেই হয়। তবে বলি, ভয় নাই ওস্তাদের কাছে শিখলে, গায়কীটা কিন্তু নিজেরই হতে হবে। ঐটুকুই ‘আমি’, তার বেশি ‘আমি’ না হলে ক্ষতি নাই।

-সুব্রত’র জন্মদিনে // শামসেত তাবরেজী

___________________________________

  সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ-এর কয়েকটি  কবিতা
___________________________________

 

 

হাইড পার্কে অপেক্‌খা

লালঝুঁটি, কেশরফোলানো মেঘ, রিরংসায় থরোথরো মেঘ,

আকাশে-আকাশে-দামি-জামিয়ার-খুলে-দে’য়া অন্যতর মেঘ,

এ-সময় কে আছে তোমার তলে মর্ত্যের-বীতংস-বন্দি, হায়,

টর্নেডো-মন্থনদণ্ড ওপড়াতে পারে না যারে আর?

তোমার বাজের চোখে কে আর এমন অসহায়

ধর্ষণশঙ্কিতসংজ্ঞা? ঐ তো ঐ তো তব ওল্টানো টাওয়ার

নেমে আসে… হায় রে শম্বূক!

কোথায় লুকাবি তোর তুলতুলে বুক?

উড়ে যায় বেশুমার বালিহাঁস (অথবা বাঘের ভয়ে সন্ত্রস্ত শশেরা),

প্রকৃতি খশায় তার বাৎসল্যের খোশা ধীরে-ধীরে,

টিযেন এক এপিফ্যানি ঘ’টে যাচ্ছে এই ম্লান প্যারাম্যাটা-তীরে,

এই পার্কে শুরু হ’ল সময়ের দ্বি-দ্বাদশ দশার দশেরা,

মাশুক মুখোশ যত উবে যাচ্ছে বুনো ডুমুরের আর মেকি মেপলের,

ঘাসে-ঘাসে কেঁপে যাচ্ছে যৌন শিহরন—

হোক তবে, হোক আজ জানকী-হরণ,

জয় হোক জয় হোক হিংস্র প্রবলের!

 

ঐ যে রক্তমুহূর্ত— যা এক শিশ্নাগ্রসম ক্রম-অগ্রসর

আমার নিয়তিরন্ধ্রপানে, তার তাতা লাল লালা,

আত্মপরভেদহীন ব্রহ্মজ্ঞান, উগ্র রতিজ্বর,

তার মহামহিম নির্বেদ,

তার যত ঘৃণা, গ্লানি, খেদ,

আমি তার একটি-একটি পুঁতি দিয়ে গেঁথে নেব নব মুণ্ডমালা,

আমি তার তেজ নেব, প্রেম নেব, নেব তার আশী’র চুম্বন,

আমি তার শুক্রবৃষ্টি শুষে নেব ওডিনের শিঙার মতন!

(সিডনি, ১৯৯৮)

 

ম্যাকাবার

কালো বিদ্যুৎ চমকায়, আহা, শোঁ-শোঁ কালো হাওয়া ধমকায়, ভাই,
কালো সূর্যটা জ্বেলে কালো রোদ প্রাণ জড়ে মোর শঙ্কায়, ভাই।
আমি কোন্ দিকে কোন্ বোন-ঝিকে ডাকব, বাড়ায়ে অন্ধের হাত!
ভালো কালো রাত, কালো আখেরাত, কালো ধারাপাত কর্ আঁধিয়ার;
সকল কালোর সেরা কালো তুই,- আয়, আমি শুই- শব-এ-বরাত!
গ্র্যানিট-কঠিন এ-কফিন মম আজ হোক তমোপহ হাতিয়ার!
কালোতে কালোতে কাটাকাটি হবে, লাঠালাঠি হবে লঙ্কায়, ভাই,
রগ-রঙ-চটা কালো সূর্যটা নীল হ’য়ে যাবে শঙ্কায়, ভাই!

 

পুলিপোলও ২১

কও তোতা, কাহিনি তোমার বাখানিয়া,

টক্কা টরে টরে টক্কা টক্কা টরে টরে
কেমনে আইলা তুমি আধখানা পোড়া পাখা নিয়া
উড়িতে উড়িতে আর পুড়িতে পুড়িতে এই কদলী নগরে?
আহা ও কিসের দাগ লেগে আছে ঠোঁটে
আরক্তিম? জ্যোৎস্নার ঝিলিক্ বুঝি চোখের কোনায়
এক কণা? অথচ তোমার কণ্ঠ বুজে গেছে ঝড়ের ঝাপটে,
কনীনিকা জ’মে গেছে সমুদ্র-নোনায়!
টক্কা টক্কা টরে টরে টক্কা টরে টরে
ক্যান্ বা আইলা, পাখি, কদলী নগরে?
কোন্ বা নমাজ তুমি করেছিলে কাজা,
নতুবা সাবাথে কোন্ করেছিলে আমিষভোজন,
যে, তোমারই শিরে শুধু নেমে এল আকাশের সাজা,
তোমারই জেনিথে শুধু ফুটো হ’য়ে গেল যে ওজোন?

 

শাহ্ মখদুম
রাত : সম্নাম্বুলিস্ট্ ট্রেনটা ছুটে যায়, সুনসান
শূন্যমার্গে; যেন মর্গের দেরাজে দেরাজে লাশ
বার্থে বার্থে হিমায়িত ঘুম-গুমসুম ইনসান;
রাত-কানা এক টিকেট চেকার করে খানাতল্লাশ।

উৎকণ্ঠার ন্যায় নিঃসীম পদ্মার বিস্ফার,
শাহ্ মখদুম দুম দুম হয় হার্ডিন্জ্ ব্রিজ পার।

রাত : ছাইচাপা আপার বার্থে ধূমপিণ্ডের মতো
গুলে-যাওয়া কোনো প্রত্যঙ্গের করি অনুসন্ধান,
চোখ কান হাত চুল নখ দাঁত ছড়ায়ে ইতস্ততঃ
ঢুঁড়ি লাপাত্তা আত্মা আমার- হৈহৈ হয়রান।

উৎকণ্ঠার ন্যায় নিঃসীম পদ্মার বিস্ফার,
শাহ্ মখদুম দুম দুম হয় হার্ডিন্জ্ ব্রিজ পার।

তিরিশ পাখির মতো উড্ডীন এক-ট্রেন খণ্ডতা,
মহান্ সেমুর্গ্ আর কত দূর? পোড়াদহ জংশন
আর কত পথ? শত শত প্রাণ শুষে নিয়ে, অন্ধটা
কই আমাদের নঞ্ হ’য়ে, হায়, ব’য়ে যায় শন্ শন্?

উৎকণ্ঠার ন্যায় নিঃসীম পদ্মার বিস্ফার,
শাহ্ মখদুম দুম দুম হয় হার্ডিন্জ্ ব্রিজ পার।

রাত : তকরার- একবার যদি পড়শি আমায় ছুঁতো!
গলন্ত-লোহা-বহা যমুনায় খেয়া দেয় নিশি-কানু;
শরীর পালায় শরীরীকে ফেলে; সময়ের চেয়ে দ্রুত,
একটা মানুষ হবে ব’লে, ছোটে এক-ট্রেন শুক্রাণু!

উৎকণ্ঠার ন্যায় নিঃসীম পদ্মার বিস্ফার,
শাহ্ মখদুম দুম দুম হয় হার্ডিন্জ্ ব্রিজ পার।

 

 

হজরত বায়েজিদ বোস্তামির প্রতি প্রার্থনা
(
তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হোক)

(উপক্রম :
চাটগাঁয় বাবা বায়েজিদ বোস্তামি
রেখে গেছেন কিছু কাছিম, যাদের আমি
ভীষণ ভয় পাই, কারণ, তারা ঢের
বৃদ্ধ, এমনকি আমার হৃদয়ের
চেয়েও। কাজেই তাদের আছে সে-গ্রাম্য চোখ
যাতে শুধু ভুলচুক ধরা পড়ে আমার। সে যাই হোক,
তাদের খোলগুলি যেহেতু ভরা শুধু পুরানো নৈতিকতায়,
আমি জানি, জবাবে আমারও কিছু বলবার থেকে যায়,
যা আমি বলতে পারি না, কেননা আমি শিশু, আর, হায়!
আমি শিশুই র’য়ে যাই, কারণ, তারা বুড়াই র’য়ে যায়।)

আমি কী করিব, বাবা, তুমি ব’লে দেও।
আকাশের পিলা রঙে কী করিব আমি।
মাটির পাটল রঙে কী করিব আমি।
কী করিব সাদা মেঘে তুমি ব’লে দেও।

তটিনীর রূপে রসে আশীবিষ হাসি।
নটিনীর রূপে রসে বিবমিষা রঙ।
জননীর ভুখা কোলে বিবমিষা রঙ।
ধমনির গলিপথে আশীবিষ হাসি।

বাবা, কী দারুণ ভালো ছিল এই ঘাস।
মেঘ-ছেঁড়া, ঝাঁকেঝাঁক বুলবুলি চোর।
মোর ধান খেয়ে যেত বুলবুলি চোর।
কুমারী মায়ের মতো ছিল এই ঘাস।

“আমি কী করিব, বাবা, তুমি ব’লে দেও।
কী করিব সাদা ঘাসে তুমি ব’লে দেও।

(উপসংহার :
পাপবিদ্ধ ইডিপাস ব্রোচের শয্যায়,
মৃতের পুস্তক থেকে প’ড়ে যায় প্রথম অধ্যায় :
পা- নি-
নিক্ষিপ্ত তিরের মুখে প্রতিধ্বনি আসে,
শির্কার শরবত আসে স্পন্জের গেলাসে :
আ- মিন্ ॥)

 

খাত

কা! আমার কা!

আমায়  চিনতে পারছ না?

আমার  আকাশ ছিলে তুমি,

আমি    ছিলাম তোমার ভূমি

কয়েক  হাজার হিজরি আগে

তখন    সৃষ্টি জাগে-জাগে,

দৃষ্টি জাগে-জাগে।

 

কা! আমার কা!

তুমি     এমন স্বচ্ছতা!

আমি    দেখি না তোমায়,

আমি    চোখ খুলে ঘুমাই,

অন্ধ ফুলের মতো

আমার  নীরব পরাগ-ব্রত,

আমি    আমার চেহারার

একটা   কফিনে নিঃসাড়।

 

এক রাজা দুই রানি

খুলল    ক্ষৌমবস্ত্রখানি,

খুলল    আমায় তোমার থেকে,

নদীর    মতন এঁকেবেঁকে

তুমি     উধাও হ’য়ে গেলে

একটা   খামে আমায় ফেলে,

উত্তুরে নীল-স্রোতে

মধ্য-    সমুদ্রে পৌঁছোতে।

 

আমি    ব্যান্ডেজে মোড়ানো

একটা   গবেষণাগার,

আমার  ভাল্লাগে না আর,

হয় না   মরণের মরণও।

কা! আমার কা!

আমায়  দেখতে পাচ্ছ না?

হায় কী স্বচ্ছতা!

 

ঝুলন্ত উদ্যান

।।প্রথম সোপান।।

কী বলো আমাকে, রাত্রি? – কান পাতি, বুকে শুনি: কে- ?

আকাশে হেলান দিলে, ভিজে উঠছে: আলো? বসুধারা?

কেন্দ্র – ফোটো, কেন্দ্র – পুষ্প – তৃতীয় নয়নে বুড়ো আংলা

চেপে ধ’রে বলব – “মরো!” রক্তে গাইবে উদারা-মুদারা

বৃষ্টির সোপ্রানো। ট্র্যামে তন্নতন্ন ভ্যানিটি ঘেঁটেও

দশ পয়সা কম পড়ল? নেমে যেতে হবে কি এক-স্টপ

আগেই? বাকিটা রাস্তা – ভাবছ, জন্মান্তরে ব’য়ে যাবে,

জাতিস্মর?

 

দশ-পয়সা পথ, রাত্রি, কেউটের কুণ্ডলি ফুঁসে যাচ্ছে,

ঝুলি খোলো, দেখতে পাবে; না-খুললেও পাবে বৈকি সাড়া;

খালি তুমি খুলে ফ্যালো তোমার কুণ্ডল, রাত্রি, মোছো

অকাল-গ্লোকোমা – ঐ-তো! কেঁপে উঠছে লাল নীল তারা

তোমার শীৎকারে, রাত্রি, একশ’-কোটি! ফুটে উঠছে ঘাম

হরেক রোমকূপে, তারা আইসক্রিমের দাগ ধুয়ে দেবে –

শরীরে আত্মার গন্ধ না-থাকলে তা কীসের শরীর?

শুয়ারের?

শুভরাত্রি, মাসকল, শুভরাত্রি, সুন্দরী মেয়েরা,

শুভরাত্রি।

 

১৩-জুলাই-১০

 

।।দ্বিতীয় সোপান।।

 

তুমি ঘুমাবা না? নাইট্রাজিপামেও? কোনো লালাবাই

তোমার চোখের পাতা জুড়ে দিতে পারবে না আমার

স্তনিত মেঘের ভিড়ে ত্বড়িৎস্পৃষ্ট রুপালি ঘোড়ার

এক-শিং-বরাবর উড়ে-যাওয়া গমনরেখায়?

 

গোর-খোদকেরা সব ফিরে গেছে চায়ের দোকান

কোদালটোদাল ফেলে, না-বুজিয়ে একটাও কবর,

শ’য়ে-শ’ বিস্মিত লাশ – হয়তো বৃষ্টিরই অপেক্ষায় –

খাড়া ব’সে আছে মোরাকাবায়, তাদের নাভি থেকে

মা গো! কী বিচ্ছিরি গন্ধ আসছে! বিতিকিচ্ছিরি হলুদ –

কিন্তু, তবু, ‘তুমি’ কেন ঘুমাবে না ‘আমার’ ছায়ায়?

 

ঐ-তো আমার ঘোড়া আসমানের ছাদ ফুঁড়ে যায়!

ঐ-তো সে-ফুটো দিয়ে তিনকোনা ঈশ্বর তাকায়!

আমরা বদলে যাচ্ছি না কি? আমারও কি গজাচ্ছে না স্তন?

তা কি গুঁজে দিচ্ছি না তোমার হাল্কা গোঁফের তলায়?

জলপাই-পাতার মতো আমাদের ঘেরে নি কি মন?

 

১৪-জুলাই-১০

 

।।তৃতীয় সোপান।।

 

আমাকে জড়িয়ে নাও, তুমিময়, চামড়ার মতন,

ছোঁওয়াও আঙুল আর ছোঁওয়াও ভৈরবী লোমে-লোমে

যেমন ছুঁয়েছে ভোর এখন তোমার ক্লান্ত ঘুম –

আমাকে কবুল করো তোমার মোমের চৌবাচ্চায়।

 

ঠোঁটের শর্না দিয়ে তুলে ফেলব একটা-একটা ব্লেড,

জিলেটের ফেরিওয়ালা হ’য়ে যাব শাহবাগের মোড়ে :

একটা কিনলে একটা ফিরি। সত্যি বলছি, আমার দাঁতের

গড়ন গোরুর মতো, গারার নাড়ায় বর্তে যাব,

দরবারির বিরিয়ানি শুঁকেও দেখব না, কথা দিচ্ছি।

 

কখনও ব্যান্ডেল যাই নি, এমনকি দিয়াং, কোনো তীর্থে

আমাকে ঢুকতেই দেয় না; আমার প্রভূত অশুচিতা

অচ্ছোদপটলে জমছে আমার রাত্রির জন্য – রাত্রি,

আমাকে কবুল করো তোমার মোমের চৌবাচ্চায়।

 

১৫-জুলাই-১০

 

।।চতুর্থ সোপান।।

 

তোমার আঙুলগুলি যেরকম নাচে তানপুরায়

এখন আমার চুলে চুলবুল খেলেই যাচ্ছে – হাওয়া?

প্রথম বিকেল থেকে শেষ বিকেলের দিকে টানা

হারবার ব্রিজের স্প্যান – ছুটছেন জনাব স্ববিরোধ

ডবল ডেকার ট্রেনে, বন্ধ-ঘড়ি, উত্তর সিডনিতে

পাঁচটার আগেই নামতে তড়িঘড়ি। হিপি মেয়েটার

মিনি স্কার্টে

সোনালি সিংহের ঘাড় ঘুরিয়েছে রাজকীয় রোদ।

 

কিন্তু এসবই বাহ্য – অন্য এক সাম্রাজ্য গোপনে

ব্রিজের নীচেই জাগছে – যেন; আমরা কবে যে শৈশবে

বসেছি টিকেট কেটে কাপ্তেন নিমোর নটিলাসে –

সে-গোষ্পদে সূত্রপাত হ’ল সূক্ষ্ম কোরাল রিফের :

দ্যাখো, যারা চোখ ছিল আমাদের, গত শুক্রবারও,

আজ মুক্তা।

আর এখানেও দিব্যি – পাতালেও – শতেক শরদ্ –

সোনালি সিংহের ঘাড় ঘুরিয়েছে রাজকীয় রোদ।

 

১৫-জুলাই-১০

 

।।পঞ্চম সোপান।।

 

আমি আর অন্ধকারে চাইব না নির্বাণ, কবরেও।

ঠিক আছে, ঘুরিয়ে বলছি : আমি দেব আমার প্রয়াণে

অন্ধকারের সব হা-গুলি বুজিয়ে। অতএব,

রাত্রি, তোমাকেও শেষে দিবা হ’তে হবে। তবে নামটি

বদলাতে চাইছি না আমি, কেননা এ-নামে থোকা-থোকা

জ্যোৎস্নাফুল – নাকি জুই? নাকি স্রেফ ফুটে-থাকা – হাসি?

 

তুমি মুখ খুললে, অম্নি হুডিনির টপ-হ্যাটটি থেকে

দুদ্দুড় বেরুচ্ছে কত মুমুক্ষু দেবতা, ঘষাকাচ

কনীনিকা –

সাদা বুক কালো পিঠ, এদেরই কি বলে রূপচাঁদা?

নাকি চাঁদ? চাঁদ, আমি কামড়ে খাব তোর কালো পিঠ;

তারপর? – সম্পূর্ণ নেব। হ্যাঁ, আমি তোমাকে নেব, রাত্রি,

আমার ত্রিশূলে গেঁথে, আপামাথা সাদা চাঁদামাছ।

 

১৬-জুলাই-১০

 

।।ষষ্ঠ সোপান।।

 

আমার নিশ্বাসে তুমি বেড়ে উঠছ, যেমন মায়ের

জরায়ুতে বাড়ে ভ্রূণ, – যে এখনও স্বচ্ছ, জেলিমাছ –

তর্জনী-তর্জনে আর মধ্যমার মধ্যস্থতায়

আমি একে-একে যার নাক-চোখ ফোটাব, ভুরু আঁকব,

বুড়ো আঙুলের চাপে নাভিটা গভীর হবে, পাপড়ি

খুলে খুঁজব – জন্মদাগ – আমার নামের আদ্যাক্ষর

আগোলাপি।

শুধু বলো, – তুমি তো আমার, রাত্রি, আমি কি তোমার?

 

আমি কি তোমার, রাত্রি? আমাদের বাইরে থেকে কারা

ডাকছে : ওরে দরজা খোল্, পূর্বদেশ থেকে ত্র্যহস্পর্শ

এসেছে, নজরানা নিয়ে… আমি কাউকে রুখি না অন্দরে,

আস্ত এক ম্যহফিল ভাঙা আস্তাবলে! গাইছে তারা,

দিচ্ছে তারা, নিচ্ছে তারা, যত আলো খোলা চোখে ধরে –

 

আর আমি?

আমি দেখছি, আমার গর্ভের ফুল আমাকে ছাপিয়ে

বিশাল মাশরুম হ’য়ে ঢেকে ফেলছে আমার আকাশ,

আমি নিজে ছোট থেকে ছোট আর গৌণ থেকে গৌণ

হ’তে-হ’তে বদলে যাচ্ছি স্বচ্ছ ভ্রূণে – রাত্রি, আমি আর

আমাকে চিনি না, কিন্তু, তুমি বলো, আমি কি তোমার?

 

১৬-জুলাই-১০

 

।।সপ্তম সোপান।।

 

তুমি কি বর্ষার বিলে ঢেউ-খেলানো আকাশ দেখেছ

অথবা নবির দিল-এ কাঁপতে-থাকা আল্লার আরশ?

তুমি কি আমার চোখে দেখেছ তোমার লীলা? – আয়না!

আয়নার কথাই তুমি বলছিলে সেদিন, রাত্রি, তাই না?

 

সেদিন ধেয়ান দিই নি, সেদিন কুয়াশা কী হলুদ

মহাজগতের ঐ জায়গাটিতে, ক্যাসিয়োপিয়ার

কাছেধারে; আলোহিম সুপারনোভার ঝড়ে আমরা

লুকিয়ে ছিলাম ভয়ে, একে অপরের ক্রিপ্টিক

পাসওয়ার্ডে; তখনই কি? নাকি তারও দিনতিনেক আগে

তুমি বললে – আয়না! অমনি কেলাসিত মহাকাশ ছেয়ে

আমরা, বহু।

 

আমাদের কলবে কে এ-আয়না রুয়ে দিল? কবে? কেন?

আমরা কি আয়নার বাইরে বেরিয়ে রুবরু কোনোদিন

তাকাতে পারব না? – এ কী! কোথা থেকে ঝরে এত ছাই!

শুভরাত্রি, মাসকল, শুভরাত্রি, সুন্দরী মেয়েরা,

শুভরাত্রি।

 

১৭-জুলাই-১০

 

নাগপঞ্চমী

(তোটক)

প্রিয়, আজকে আমার শুধু ভাঙছে দুয়ার,
ধুধু উড়ছে পরাগ কালো পাগলা ঝড়ে,
বুকে বর্শা-সমেত ছোটে মত্ত শুয়ার,
তত শুক্র উছল, যত রক্ত ঝরে!

ফাঁকা বৃক্কে আমার কোনো নক্তাহারী
বাঁকা কুকরি শানায় পাকাপোক্ত হারে :
তুমি আসবে কি আর? ভালবাসবে কি আর?
গোধূলির লালিমায় মধু হাসবে, প্রিয়া?

বহে সন্ধ্যানদীর মোহতন্দ্রামদির
মৃদু মেঘলাটে জল ভরা সর্বনাশের–
কালী-জিহ্বা– প্রথম-রতি-ভয়-তরাসে–
আমি কৃত্তিবাসের বুকে নৃত্যামোদী;

আমি চন্দ্রিকাখোর, আমি রৌদ্রখেকো,
আমি অন্ধকারের পোষা হ্যাংলা মেকুর;
আমি দংষ্ট্রানখর, আমি চৌর্যতুখোড়,
আমি রূপ ও অরূপ-চাঁছা ক্ষিপ্র উখো–

তুলে আর্তনাদের তানে মিড় মণিতের
আমি গান গেয়ে যাই একা শেষ ত্রুবাদুর;
আমি বীর্য ঝরাই জননীর যোনিতে,
মনোনির্জনে এক ভূতপূর্ব বাদুড়…

 

অগ্নিষ্টোম 

 

ওগো অগ্নি, আধো-উদগম, কালো বাতাসে মেশে রক্তের

অভিসম্পাত; কাঁপে রংহে ভুখা জঙ্ঘা, ভাসে বন্যায়

ক্ষীণ প্রতিরোধ; অভিমন্যু, করো ব্যূহভেদ! যদি জাগলই

গূঢ় জাগরণ, যদি ভাঙলই অহিনিদ্রা, তুমি সামনে

কেন আনবে অনুকম্পা, ওগো সংবিৎ, ও অপেক্ষা,

দু’টি চুর মাঝে চিৎকার! নাকি সংজ্ঞার হলকর্ষণ?

নাকি নির্জ্ঞান? ওঠো, অগ্নি, শুভরাত্রি, শুভজন্ম!

 

শবাহূত

বেরিয়ে এসেছি বাইরে শ্মশানঘাটায়,বিষ্ণু, তোমার চিতার কাছে প’ড়ে আছে ছাই,বিষ্ণু,উড়ে যাচ্ছে নদীর হাওয়ায় হায়-রে আমি তো এসেছি রাতে সিগ্রেটের একচক্ষু লাল-আগুন হাতে শুধু একটাবার পাই যদি তোমাকে জ্বালাই,বিষ্ণু,আমাকে জ্বালাই রাজকুমার!

 

সুতনুকা,আমি দেওদীন

১.
দেহ ভ’রে শুনি আমি শব্দময় বিশ্ব
সকল গুঞ্জন তথা সব কোলাহল
স্বরলিপি-সহ আসে আমার বীক্ষায়;
সমস্ত নৈ:শব্দ্য গায়… হরেক গানের

ভিতরে আরেক-কোনো গান বাজে,যার
অলাত আমাকে এই আলোহীন শীতে
পশমিয়া ওমে রাখে; স্পষ্ট দেখতে পাই
সবক’টি শব্দের আর নৈ:শব্দ্যের রঙ—

সবুজ ষড়জের সাথে রাতুল রেখাব
খুনসুটি করছে দেখে সোনালী গান্ধার
আল্লাদে কোমল হয়ে যাচ্ছে; আমি দেখি
শ্রুতিতে শ্রুতিতে ঘষটে ক্ষয়ে যাচ্ছে নাদ

শামুকের মতো, তার পিছন-পিছন
কামুক অশ্রুত তা-ই চেটে নিতে নিতে
পরিশেষে পশে গিয়ে খালি খোলাটায়;
এই সবই দেখি আমি,এবং তোমার

পুরোটা শরীর,পুরো অশরীর এক
অধ্বনীন ধ্বনি হ’য়ে গিরগিটিয়া ধায়,
কেবলই বদলায় তার গন্ধ,তার বর্ণ:
এই বুঝি শুনি হাঁ, এই শুনি না…

১৫.

মেস্কালিনা, রোদ-জ্বলা আকাশ খাতায় লিখে দিলে কুটিল লেখায় এক কীলক হরফ; আকাশের বাকি সাদা পাতা জমে গেলে নির্জলা বরফ।ব’সে আছি সপ্তস্বর্গতলে রেখে মাথা;উপরে হ্যালির ধূমকেতু,অলৌকিক রেলসেতু,আর কোটি-কোটি টন ভয়েডের চাপ, আর স্বাতীর বিলাপ।

মহাকাশলীনা, কক্ষে-কক্ষে গ্রহাণুর ধূপ পুড়ে যায় কেমন নিশ্চুপ,পুড়ে যায় অদৃশ্য আগুনে আঁধারের গোপন উনুনে,উড়ে যায় অলকানন্দায়,তোমার কটির চারিপাশে,সতত-আবর্তমান জটিল বিন্যাসে,তোমার নি:শ্বাসে,অলকা-শিফন,অলকা-কাতান,ঐ তারকাবিতান,সদা-জায়মান,আর অগণন।

তুমি সমাসীনা ব্রক্ষাণ্ডের গুপ্ত শতদলে,তার সুপ্ত পরিমলে।তার সব তার আমি চেটে নিই রোমকূপেকূপে।চুপে চুপে আমার দ্বিখণ্ড জিহ্বা বেড়ে চলে,গোধূলিচ্ছায়ার রূপে,লণ্ডভণ্ড ক’রে-ক’রে সদ্য:পাতী যত ইষ্ট,যত ঈহা,আর, হঠকারী রেটিনার অতিবেগুনিকিরণ-হেন প্রতিভাত হয়: আমাদের যমল সময়।

এই উপহৃতি,এই মুহূর্ত প্রভৃতি,এই সমাহার,আর এই নিখিল-বিহার,আমার মাথায় আর পায়ের পাতায়— চাঁদে-পাওয়া চিন্ময় চিন্তার এক নেগেটিভ ছবি।মেস্কালিনা,মেস্কালিনা,মহাকাশলীনা,ঐ সোনালী হরফ,ঐ শুকনো বরফ— ব্যর্থ বা সার্থক, আহা, তুল্যমূল্য সবই।।

………………………

10429268_10204469602482771_5543257015776900265_n
।। শামসেত তাবরেজী।। কবি।
Advertisements