249147_10151721529318185_491360206_n

যতক্ষণ না অবচূর্ণনের রেণু হই….

কোনিয়া, ১২ জুন, ১২৪৫ খৃস্টাব্দ। (আমি শামস তাবরিজি বলছি।) উন্মাতাল ঈমানদার তারা! রমজান মাসে রোজা রাখলেন, কোরবানীর ঈদে ভেড়া জবাই করলেন পাপের প্রায়শ্চিত্ত করবার উদ্দেশ্যে, জীবনে একবার যদি-বা হজ্বের সুযোগ আসে, তা গেলেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লেন, কিন্তু এইসব বন্দেগীর সাথে যদি ভালোবাসাবোধ না থাকে, তাহলে ওসব কষ্টের মানে কি? ঈমান একটি শব্দ, ভাষা মাত্র, এর কেন্দ্রে ভালোবাসা না থাকলে, তা নড়বড়ে এবং প্রাণহীন হয়, ফাঁপা ও শূন্যগর্ভ হয় – সত্যিকার কোনো উপলব্ধি এতে আসে না। তারা কি মনে করেন আল্লাহ মক্কা মদীনায় বা কোনো স্থানীয় মসজিদে থাকেন? কেমনে তারা আল্লাহকে কোথাও সীমাবদ্ধ আছেন ভাবেন? (এখানে শামসের ভাষ্য এসেছে ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে, গড বলছেন – ‘নাইদার মাই হেভেন নর মাই আর্থ এমব্রেসেস মি, বাট দ্য হার্ট অব মাই বিলিভিং সার্ভেন্ট ডাজ এমব্রেস মি।’ এই দলিলটা ইমাম গাজ্জালী তাঁর ‘এহিয়া উলুম আল দীন’ গ্রন্থেও ব্যবহার করেছেন। উল্লেখ্য, আরবি মাতৃভাষার যেসব মুসলিম, মসিহী ও ইয়াহুদ ধর্মাবলম্বী, তারা সবাই আল্লাহকে আল্লাহ বলেন।) আমি (শামস) বলি, করুণা তাদের জন্যে যারা নিজেদের মরণশীল মনের সীমিত গন্ডিতে আল্লাহকে সীমাবদ্ধ দেখেন। তারা কি মনে করেন খোদা মুদির দোকানদারের মতো পাল্লা দিয়ে নেকি বদি মাপেন? আল্লাহ তো তাঁর সম্পর্কে মানুষের ধারনার চাইতেও বিশাল – মহৎ আল্লাহ। তিনি চিরঞ্জীব- আল হাইয়্যু। কেন আমি সারাক্ষণ ভয়ে উৎকণ্ঠায় কাঁপবো? কেন সব সময় নিষেধাজ্ঞার বলয়ে বন্দী থাকবো? তিনি দরদী – দয়ালু, তিনি মহামহিম। সকল প্রশংসা তাঁর। আমার সব কাজে কথায় তাঁর গুণকীর্তন করি। আমার স্বাভাবিক শ্বাস প্রশ্বাসে তাঁরই মহিমাকীর্তন। যদি আমি জানি আমার অন্তরের গহীন দেখছেন শুনছেন আল্লাহ, তাইলে আমি পরনিন্দা ও গুজব রটাবো কেমনে? তিনি আল বাসির। তাঁর সৌন্দর্য মানুষের স্বপ্ন কল্পনার বাইরে। তিনি আল জামাল, আল কাইয়ুম, আর রাহমান, আর রাহিম। আমি তাঁর জন্যে পিপাসার্ত ক্ষুধার্ত অবস্থায়, বানের পানিতে ভাসতে ভাসতে কিংবা জলশূন্য বিশুস্ক প্রান্তরে – চরাচরে গাইবো নাচবো যতক্ষণ না আমার হাঁটু ভেঙ্গে পড়ে, যতক্ষণ না আমার শরীর খসে পড়ে, যতক্ষণ না আমার হৃৎস্পন্দন থামে। আমি আমার আমিত্বের অহংকে চূর্ণবিচূর্ণ ক’রে – কণা কণা করতে থাকবো যতক্ষণ না এই আমিত্ব শূন্যগর্ভ হয়, বিশুদ্ধ শূন্যতার পথচারী হয়, এবং যতক্ষণ না অবচূর্ণনের রেণু হয় তাঁর অত্যুচ্চ স্থাপত্যশিল্পের। কৃতজ্ঞচিত্তে, সানন্দে, নিরলসভাবে আমি তাঁর ঐশ্বর্যে ও ঔদার্যে সমর্পিত হই। আমি কৃতজ্ঞতা জানাই যা তিনি দিয়েছেন আর যা দেন নাই আমাকে তার জন্যে, কারণ তিনিই জানেন আমার জন্যে যা কিছু ভাল। আমি ভালোবাসার তেইশ নম্বর নিয়মটি স্মরণ করি: “খোদার সৃষ্টিকূলের মধ্যে মানুষ অতুলনীয়। ‘আমি তার মাঝে আমার রুহ থেকে ফুঁক দিয়েছি’ আল্লাহ বলেছেন(সুরা হিজর ২৯)। ব্যতিক্রম বাদে আমরা প্রত্যেককে খোদার প্রতিনিধি আকারে বানানো হয়েছে পৃথিবীতে। নিজেকে প্রশ্ন করেন, প্রতিনিধির আচরণ কতটুকু আছে আপনার মাঝে। প্রতিনিধির ভূমিকা রেখেছেন কখনো? মনে রাখবেন, এটা আমাদের সবার দায়িত্বে পড়ে যে, খোদার কুদরতি বুঝে নিয়ে সে-আলোকে জীবন যাপন করা।” ( বইয়ের একটি অনুচ্ছেদ)

‘ভালোবাসার চল্লিশ  নিয়ম’ বইটির ভূমিকা

1929917_1274116775938148_8716630658266550563_n

 এ বইটি মূলত…

পৃথিবীর পথে চলতে চলতে, গ্রামে বা শহরে, আমাদের চোখে পড়ে অজস্র দৃশ্য। তার মাঝ থেকে কিছু দৃশ্য বিশেষভাবে নজর কাড়ে। প্রকটিত বা অপ্রকটিত ভিন্নতর খণ্ড দৃশ্যগুলো সারগর্ভ থাকে বলে আমরা ওসবের আলোকচিত্র নিই, আলাপ করি খণ্ড দৃশ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে। বিশেষ কোনো দর্শনীয় স্থানেরও কেন্দ্রীয় দৃশ্য থাকে। সেই কেন্দ্রেও থাকে নানাবিধ দৃশ্যপুঞ্জ। কোনো একটা বইয়ে বা কোনো রচনায় বিশেষ চিন্তাসমৃদ্ধ অংশ থাকে, সেসব আমরা হাইলাইট করি, উদ্ধৃত করে শেয়ার করি, বিশেষ ভাবকে বিশেষভাবে ছড়িয়ে দিতে আগ্রহী হই। উদ্ধৃতাংশ থেকেও আমরা সুনির্দিষ্ট বুঝ পাই। এলিফ সাফাক-র ‘দ্য ফোরটি রুলস অব লাভ’ থেকে এখানে মুলত শামস তাবরিজি ও জালালউদ্দিন রুমির জীবনের বিশেষ দিক ও চিন্তা যেসব অধ্যায়ে গল্প আকারে এসেছে, গল্পের ভেতরের গল্প হয়ে এসেছে, বা কোথাও প্যারাবল উদ্ধৃত হয়েছে, সে-সব গল্পের কিছু পুরোটাই নিয়েছি, কিছু গল্পের সবটুকু না নিয়ে মুল মর্ম অনুবাদ করেছি। এক্ষেত্রে আমি সচেতন থেকেছি যাতে একটা ধারাবাহিকতা থাকে এবং পাঠকের বুঝতে অসুবিধা না হয়। কোথাও কোথাও আগে পিছের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছি। শামস ও রুমির জীবন ও কাজের উপর লিখিত এ পর্যন্ত অনেক বইয়ের এবং সুফি ভাবাদর্শের আলোকে এলিফ সাফাকের বিনির্মাণ উপন্যাস হল ‘দ্য ফোরটি রুলস অব লাভ’। এর থেকে বাছাই করে বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে বলা যায় একটি পাঠ বিনির্মাণ বা পুনঃনির্মাণ করেছি। এতে জীবন জগৎ বাস্তবতার নানা স্তরের উপলব্ধি, উপরিতলের, বাইরের আর ভেতরের বিস্ময়কর বুঝ বিবৃত হয়েছে। এলিফ সাফাকও তা-ই করেছেন। আমি সংক্ষেপ করেছি কোথাও এবং মাঝেমাঝে অনুবাদ শেষে, বা কোথাও আগে সুফি ভাবনার প্রাসঙ্গিক বাড়তি তথ্য সংযোজন করেছি তৃতীয় বন্ধনী দিয়ে অন্যান্য সূত্র থেকে যা এলিফ সাফাকের বইয়ে আসেনি। কিছু প্রতীকী কথার অর্থও খুলে বলেছি বন্ধনীর ভেতর অনূদিত বাক্যটির পরেই। প্রায় বিশ বছর ধরে আমি সুফি ভাবাদর্শ পাঠ করে আসছি। আমার মনে হয়েছে এভাবে একটি সার নির্যাস সহজপাঠ তৈরি করা যায়। শামস আর রুমির অন্তর্দৃষ্টিসমৃদ্ধ ভাবকে খুলেমেলে দেখানোর জন্যে সাফাক গল্পের জনম দিয়েছেন। তিনি এ জে আরবেরির ‘ফিহি মা ফিহি’ বা ডিসকোর্সেস অব রুমি, কোলম্যান বার্কস-র ‘দ্য বুক অব লাভ’ ও ‘দ্য এসেন্সিয়াল রুমি, উইলিয়াম সি চিট্টিক-র ‘মি এ্যান্ড রুমি’ (অটোবায়োগ্রাফি অব শামস তাবরিজি) ইত্যাদি বইয়ের তথ্য নিয়েছেন। তাঁর গ্রন্থটিতে দুই উপন্যাস সমান্তরালে এগিয়েছে। ত্রয়োদশ শতকের নানা ঘটনার ভিত্তিতে এবং একুশ শতকের ঘটনাপুঞ্জের আলোকে, দুই গল্প এগিয়েছে। উল্লেখ করা যায়, কারবালায় হোসাইন (রা.) শহীদ হওয়ার ঘটনার আলোকে মীর মশাররফ হোসেন বিনির্মাণ করেছিলেন উপন্যাস ‘বিষাদ সিন্ধু’। সেখানে তিনি কাল্পনিক চরিত্রও সৃষ্টি করেছেন দরদ গাঢ়তর করবার জন্যে। কিন্তু বইটির মূল মর্ম ত্যাগের মহিমা। শাহাদুজ্জামান লিখেছেন ফিদেল ক্যাস্ট্রোর জীবন থেকে নিয়ে ‘আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে’। এটি একটি উল্লেখযোগ্য ডকুফিকশন বিনির্মাণ। কবি জীবনানন্দ দাশের জীবনের একটি খণ্ডচিত্র নিয়ে আব্দুল মান্নান সৈয়দ বিনির্মাণ করেছেন গল্প ‘নারীর হৃদয় প্রেম গৃহ অর্থ কীর্তি সচ্ছলতা’। এমন ধারারই বিনির্মাণ বা পুনঃনির্মাণ করা ডকুফিকশন এলিফ সাফাকের ‘দ্য ফোরটি রুলস অব লাভ’। এর সারমর্ম হল ইসলামের সুফি ভাবের মাধ্যমে জীবনের গভীরতর মর্মদেশের উপলব্ধি কিঞ্চিত ভাষার ভেতরে নিয়ে আসা।

পরিশীল মনের মানুষ

শামস তাবরিজি (ফারসি স্ক্রিপ্টে شمس تبریزی) ও জালালউদ্দিন রুমি, তাঁরা দুজনেই অতুলনীয় দ্রষ্টা। আমরা জেনেছি, সুফি হন ভয়মুক্ত আউটস্পোকেন— স্পষ্টভাষী। দেখতে শুনতে তাদের মাঝে অহংভাব মনে হলেও মুলত বিদ্যাবুদ্ধির অযথা অহং/অবসেশন/পক্ষপাত/ফুটানি উড়িয়ে দিতেই সুফির স্পষ্টবাদিতা। মন পরিচ্ছন্ন কিনা সুফি দেখেন। তাঁর নজর অন্তরের দিকে। বাহ্যিক ভাঁওতাবাজিতা সুফির না-পছন্দ। তিনি এ্যাপলিটিক্যাল না। কিন্তু কোনো ক্ষতি ব্যাতিরেকে অন্তর সাফ করবার পক্ষে সুফি বা পরিশীল মনের মানুষ। কখনো তাঁর ভিশনের পক্ষে নিজেকে অনড় রাখবার জন্যে তাঁরই কথা বা কাজের দ্বারা সৃষ্ট মানুষের ক্রোধও পর্যবেক্ষণ করেন ধীরস্থির। রাগ মানুষকে কীভাবে নাচায় দেখেন তিনি। পর্যবেক্ষণ করেন দুষ্ট আর শিষ্টের ব্যবধান। দুষ্টও স্পষ্টবাদী বেপরোয়া হয় তার নিজের মাত্রাতিরিক্ত মতলবে। কিন্তু সুফি ব্যক্তিস্বার্থে অন্ধ থাকতে চান না। তিনি যথার্থ মুসাফির, ইল্যুসিভ মায়ায় বান্ধা থাকতে চান না এমন এক বান্দাহ। জগত পরিব্রাজক তিনি হিস্টরিতে বসবাস করেও ইল্যুসিভ হিস্টরিক্যাল ডাইমেনশনে থাকেন না, থাকেন সদা সচেতন আল্টিমেট ডাইমেনশনে। এই ধরনের মানুষ নারী পুরুষ উভয়েই হতে পারেন। এঁরা দেহতে থেকেও দেহাতীত ধরতে পারেন কিন্তু দেহাত্মবাদী থাকেন না। তাঁরা দেখেন মানুষের আত্মা আলাদা আলাদা তবু ইন্টারকানেকটেড। দেখেন মানুষের অভিজ্ঞতাতে অজস্র অপর মিশে থাকে। চিন্তায় কাজেকামে অপর হাজির।

অনির্বচনীয় রোশনি, শরীর শরমিন্দা

জামাই-বউ বা নারী পুরুষের সম্পর্ক মানেই দেহের ভালবাসার গোলাম হওয়া না। বহুবিধ ভালবাসা চর্চার একটি সম্পর্ক। তাতে শরীরের ভালবাসা অন্যতম মাত্র। শরীর বেশি গুরুত্ব পেলে সংকট গুরুতর। কেমনে সে সংকটে জ্বলে মানুষ সেইটার পাঠ আছে। আর নারী পুরুষের শরীরের নৈকট্য পেলেই শরীরের কামতৃষ্ণা জাগে না। জাগলেও হৃদয়ের ভালবাসা অনির্বচনীয় রোশনির সামনে শরীরের তৃষ্ণার ক্ষুদ্রতা প্রকাশ পায়। জাগছে— জাগছে— জাগছে কিন্তু না, শরীর শরমিন্দা হয়ে গেছে। কেন হয় অমন কখনো তার গল্প আছে। শামস বাসররাতে দেহ মেলালেন না কেন? পরেও নতুন বউয়ের রুমে আসেন, বসেন গল্প করতে করতে বউয়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েন, সুন্দরী বউ শামসের কপালে চুমু দেন। ব্যাস অতটুকুই। নাহ অক্ষমতা না, অন্য কিছু….। এই সুন্দরী বউ মরার আগে মরতে চান। সেটা কেমনে? আছে এর গল্প এতে। আর আসল চ্যালেঞ্জ ভালো ও মন্দকে ভালবাসা। কাম ক্রোধ হিংসাও দরকারি। ব্যবহার জানতে হবে। জানলে মজা, নইলে বিপদ। রুমির এক ছেলের বুঝ ভালো, আরেক ছেলে হিংস্র হল কেন এই ব্যাপারটার গল্প আছে। বইটির বিভিন্ন অধ্যায়ে কখনো প্রসঙ্গক্রমে রুমি, কখনো শামস, কখনো মদ্যপ লোকটি, কখনো দুশমনের কথায় বিবৃত হয় চল্লিশটি নিয়ম ভালবাসার। যে-ভালবাসা সমগ্রকে ধরে। সুফিগণ চান, ‘ক্ষতি করো না কারো, দরদ চর্চা করো’। সুফি চান না জীবনে জগতে অপ্রতিরোধী বা নিশ্চেষ্ট থাকতে। ঠিক সময়ে ঠিক কাজটি করতে চান সুফি। রুমি আগে ছিলেন একজন ওয়াজকরনেওয়ালা আলেম। কাব্য-সাহিত্যের ধারে-কাছে ছিলেন না। ভালবাসার বহুমাত্রা বুঝতে পারেন শামস তাবরিজির সাথে পরিচয়ের পর। পরে শামস বিরহে হয়ে যান অসাধারণ কবি। ইংরেজি ভাষায় খেতাব দেয়া হয়েছে তাঁকে ‘পয়েট অব দ্য হার্ট’।

দরদি হওয়ার সবক

rumi_retouch_02বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষানুসারে লিখিত বিশ্ববিখ্যাত ভিয়েতনামের সাধু শিক্ষক Thich nhat hanh এর “No death no fear” বইটি পড়ার সময় দেখলাম, বইয়ের পাতায় পাতায় অন্যতর বয়ানে ইসলামের দেওয়া আত্মশুদ্ধির পাঠ, ভালো কাজের তাগিদ, ধৈর্যশীল শান্ত থাকবার পাঠ, দরদি হওয়ার সবক ইত্যাদি। কোরানের সুরা যিলযালে আছে ‘ফামাইইয়ামাল মিসক্বালা জাররাতিন খাইরাইয়ারাহ’, মানে ‘অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকাজ করলে তা দেখতে পাবে।’ তার অণু পরিমাণ অসৎ কাজও দেখতে পাবার কথা পরের আয়াতে। ইসলাম ‘আমলে সালেহ’ বা সৎ কাজের গুরুত দেয়। আউলিয়া পর্যায়ে উন্নীত হলে তার মনে কোনো ভয় থাকবে না। সাধু হান বলেন এ্যাওয়ারনেস প্রাপ্ত হলে the energy of the Holy Spirit is present in you. ফলে তুমি ভয়মুক্ত হবে। আর কর্মফলের ব্যাপারে হান বলেন- “The only thing I can carry with me is the fruit of my own action. I cannot bring along with me anything else except the fruit o f my actions in terms of thought, speech and bodily acts.”

ধর্মীয় মতভেদ প্রসঙ্গে রুমি

প্রসঙ্গত ধর্মীয় নানা মতের ব্যাপারে রুমির চিন্তা-বক্তব্য কী তা নিচের উদ্ধৃতিতে পরিষ্কার পাওয়া যায়: Rumi’s love and honor for all religious traditions was not always popular in his day, and often provoked criticism from the more dogmatic. A story is told that one such public challenge came from a Muslim dignitary, Qonavi, who confronted Rumi before an audience. “You claim to be at one with 72 religious sects,” said Qonavi, “but the Jews cannot agree with the Christians, and the Christians cannot agree with Muslims. If they cannot agree with each other, how could you agree with them all?” To this Rumi answered,“Yes, you are right, I agree with you too.” —> DISCOURSES OF RUMI ( FIHI MA FIHI) চল্লিশের মাহাত্ম্য কী? চল্লিশ নিয়ম কেন? এ নিয়ে একটি অনুচ্ছেদ রয়েছে ‘চল্লিশের গুরুত্ব’ শিরোনামে। বাড়তি তথ্যও আছে ওখানে।

দুই শতকের জীবন ও চিন্তা

এলিফ সাফাকের বইটিতে তিনি ত্রয়োদশ শতকের রুমি আর শামস তাবরিজির জীবন ও চিন্তা থেকে বিনির্মিত গল্পের পাশাপাশি, তাঁদেরই চিন্তা চেতনার অনুসারী এই একুশ শতকের একটি চরিত্র এ্যালা রুবিনস্টাইনের ভালবাসার টানাপোড়েনের গল্প রয়েছে। সাফাক বুনেছেন এভাবে : এ্যালা একজন অখ্যাত ইউরোপীয় লেখকের উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি ‘সুইট ব্লাসফেমি’-র উপর রিপোর্ট লেখার কাজ পান একটি সাহিত্য এজেন্সি থেকে। এ্যালা চল্লিশ বছরের অসুখী বিবাহিতা। শারীরিক ইল্যুসিভ ভালবাসার পরিমণ্ডলে কেমনে-কেমনে এ্যালার খুব ভালবাসার মানুষ ডেভিড দুটি সন্তান বড় হওয়ার পর যাতনা লেলিয়ে দিয়ে দূরে-দূরে থাকে, সে-গল্প আছে তাতে। এই ‘সুইট ব্লাসফেমি’ উপন্যাসটি লেখেন আমস্টারডাম থেকে আজিজ জাহরা নামের সুফি লেখক। লেখেন ত্রয়োদশ শতকের শামস তাবরিজি ও জালালউদ্দিন রুমি-র জীবন থেকে বিষয়বস্তু নিয়ে। দুখী এ্যালা ‘সুইট ব্লাসফেমি’ পড়তে-পড়তে, শামস ও রুমির জীবন এবং ভালবাসার মনছোঁয়া কথা পড়তে-পড়তে লেখক আজিজকেই মনে করতে থাকেন শামস তাবরিজির অনুরূপ ব্যক্তিত্ব। অনিন্দ্যশুভ্র ভালবাসার খোঁজ পেতে এ্যালা আজিজে মজেন। পত্র বিনিময় হয় তাদের মধ্যে বেশ কবার। দেখাও হয় পরে। পুনরায়, এই বইটি হল এলিফ সাফাকের বইটির প্রায় ৯০ শতাংশ অনুবাদ শামস তাবরিজি ও জালালউদ্দিন রুমির জীবন ও চিন্তা ভিত্তিক হিস্টরিক্যাল ফিকশনের, যেখানে মুলত আত্মশুদ্ধি ও ভালবাসাবোধের কথা রয়েছে।

সবকিছুর প্রবহমানতার মধ্যেই অর্থপূর্ণতা

কথাশিল্পী এলিফ সাফাকের উপন্যাসের প্রত্যেকটি অধ্যায়ে সব চরিত্র আত্মকথনের মাধ্যমে নিজেদের সুখ দুখ বুঝ বিবেচনা প্রকাশ করেন। এতে দেখা যায়, জগতের বা বিভিন্ন সমাজের একটা সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরবার প্রয়াস আছে। ধনাত্মক ও ঋণাত্মক সমাজবাস্তবতার বিচিত্রতা, বিভিন্নতা-যে, মূলত একটা সামগ্রিক বাস্তবতারই দ্যোতন বা জ্ঞাপন, সেই ব্যাপারটাও স্ফুট বিভিন্ন অধ্যায়ে। ‘দ্য গার্ডিয়ান’ এর সেই বহু আলোচিত সাক্ষাৎকারে সাফাক বলেছিলেন, ‘নো সোসাইটি ইজ স্ট্যাগনেন্ট, দ্য ইসলামিক ওয়ার্ল্ড ইজ নট স্ট্যাগনেন্ট’। মানে ‘কোনো সমাজ নিশ্চল-নিষ্ক্রিয় না, ইসলামি দুনিয়া নিশ্চল-নিষ্ক্রিয় না’। মানে সবকিছুর প্রবহমানতাই অর্থপূর্ণ জীবন জগৎ।

ফার্সি সুফি সাহিত্যে প্রতীকী ভাবের অরিজিন

এ জে আরবেরি-র একটি গ্রন্থ “মুসলিম সেইন্টস এ্যান্ড মিস্টিকস” চার শতাধিক পৃষ্ঠার। বইটি আসলে ফরিদউদ্দিন আত্তার সাহেবের “তাযকিরাতুল আউলিয়া” বইটির ইংরেজি অনুবাদ। ওখানে ভূমিকাতে উল্লেখ করেছেন, “The language and imagery of old Arab erotic poetry became transformed into a rich and highly symbolical vocabulary mystical aspiration. This theme was taken up again by Ahmad al- Ghazali of Tus, brother of the more famous Hojjat al-Islam whose learned and eloquent Arabic writings completed the reconciliation between Sufism and orthodoxy. The ‘Savaneh’ of Ahmad al-Ghazali (d. 1123), a series of short and very subtle meditations in prose and verse upon the trinity of Beloved, Love, and Lover”।

দার্শনিক হেগেল কেন বলেছিলেন ‘এ্যাক্সেলেন্ট রুমি’

শামস তাবরিজির সান্নিধ্য পাওয়ার পর যে-রুমি উন্মোচিত হলেন, সে-রুমি জার্মান দার্শনিক হেগেলের প্রায় সাড়ে পাঁচ শত বছর আগে দুনিয়াতে এসেছিলেন। হেগেলের ফিলোসফিক্যাল থিওলজি চর্চার ভেতর থেকে বের হওয়া ‘self-determining fullest real’ অথবা ‘এ্যাবসলিউট রিয়েল’ অথবা ‘ইনফিনিট গড’ কিংবা ”হেগেল’স গড এগজিবিট দি কমবিনেশন অব জাস্টিস এ্যান্ড লাভ”- এইসব গড ধারণার সাথে মুসলমানদের আল্লাহ সম্পর্কিত বিশ্বাসের বিরোধ নাই।1471004-1280x800-desktopnexus-com মুসলমানের আল্লাহ জগতসমূহের প্রতিপালক (রাব্বুল আলামীন) এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ অনন্ত অসীম প্রেমময়। হেগেলের প্রস্তাবিত ‘রিয়েল’ মাপজোখ করে বুঝাবুঝি করতে সমর্থ কোনো বস্তু বাস্তব নয়। তিনি চিন্তার নানা পর্যায় পার করেছেন প্রশ্নোত্তর চর্চা করতে করতে। তাঁর বই ‘ফেনোমেনোলজি অব স্পিরিট’- জর্মন ভাষায় Phänomenologie des Geistes এর চিন্তা সমূহ ধীরে ধীরে নানা পর্যায় পার হয়ে ‘ফিলোসফি অব রাইট’-এ এসে অন্য মোড় নেয়। প্রথম দিকে ধর্ম সম্পর্কিত হেগেলের বিবেচনা খৃষ্ট ধর্মের পক্ষে দেখা গেলেও পরবর্তীতে তা একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোর (আব্রাহামীয়) সারাংশ আকারে প্রকাশ পায়। যদিও তিনি যাত্রা শুরুর দিকে গতানুগতিক গড ধারণার সমালোচনা করেছিলেন। পরে হেগেল বলেন- ‘Knowing God is our highest duty’ (হেগেল এ্যান্ড হেরমেটিক ট্রেডিশন) LPR1:164;VPR 1:74 । এবং দ্রষ্টব্য ‘লেকচারস অন ফিলোসফি অব রিলিজিওন’। হেগেলের মিস্টিক সখ্যতা দেখবার জন্যে নজর দেয়া যাক আরেকটু। Franz von Baade এর সাথে হেগেল প্রায়শ মিস্টিক Meister Eckhart এর চিন্তা নিয়ে আলোচনা করতেন। ফ্রানজ জানান- একদিন হেগেল Eckhart এর উপর দীর্ঘ বক্তব্য শেষে বললেন- ‘সত্যিই, আমরা যা চাই তা ওইখানে আছে’। কথাটা জর্মন ভাষায়- Da haben wir es ja, was wir wollen’। (হেগেল এ্যান্ড হেরমেটিক ট্রেডিশন) হেগেলের গড চিন্তা এক পর্যায়ে এরিস্টটলের গড চিন্তার সাথে গিয়ে মিলে, মানে, গড যিনি, তিনি পারফেক্ট, এ্যাটারনালি কমপ্লিট। দরবেশ কবি জালালউদ্দিন রুমির ‘মাসনাওয়ী’ এবং ‘দিওয়ান-এ শামস-এ তাবরিজি’ পড়ার পর দার্শনিক গেয়র্গ ভিলহেল্ম ফ্রিদ্রিখ হেগেল নতুনভাবে উজ্জীবিত হলেন। রুমির নাম রাখেন ‘এ্যাক্সেলেন্টে রুমী’ বা ‘এ্যামবডিমেন্ট অব এ্যাক্সেলেন্স’। হেগেল জর্মন ভাষায় রুমি পড়েছিলেন। যার অনুবাদ পড়েছিলেন তিনি Friedrich Ruckert (1788-1866)। এই অনুবাদকের মাধ্যমে জর্মন ভাষায় রুমি পাঠের মধ্য দিয়ে পশ্চিমে বেশ ছড়িয়ে পড়েছিলেন রুমি। উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক যে, ১৮২১ সালে F.A.D Tholuck প্রয়াস নেন জালালাউদ্দিন রুমিকে প্যানথীইস্টের সমগোত্রীয় আকারে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা (১৯৬৭ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত) Annemarie Schimmel কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন Tholuck এর প্রয়াস। এ্যানমেরি শিমেল জার্মানির প্রথম সারির ওরিয়েন্টেলিস্ট লেখক অনুবাদক। পাকিস্তানের কবি আল্লামা ইকবালের ‘খুদি’র উপর এ্যানমেরি শিমেলের সারগর্ভ বক্তব্য ইউটিউবেই রয়েছে। Tholuck এর সেই প্রয়াসের সময়ে নামে গুণে শীর্ষে থাকা দার্শনিক হেগেল রুমির কথা খুব আগ্রহভরে ভাষণে এবং লেখায় উল্লেখ করতে থাকেন, তাঁর বইয়ে যুক্ত করেন রুমির কবিতা। ফলে Tholuck এর প্রয়াস ধ্বসে যায়। হেগেলের ভাষায় ‘সো-কলড প্যানথীইজম’র বাইরে জালালউদ্দিন রুমি। তাঁর পংক্তিদের ‘ফাইনেস্ট পিউরিটি’র কথা উল্লেখ করেন হেগেল। বলেন- ‘মোহাম্মদি ধর্ম থেকে এক্সেলেন্ট জালালাউদ্দিন রুমিকে উল্লেখ করতেই হয়’। Ruckert এর প্রাঞ্জল অনুবাদের প্রশংসা ক’রে হেগেল তাঁর ‘এ্যানসাইক্লোপেডিয়া’-তে রুমি’র একুশটি পংক্তির উদ্ধৃতি দেন। [“হেগেল ও রুমির খোদা” শীর্ষক আমার একটি প্রবন্ধ থেকে কিছু কথা এ অনুচ্ছেদে যোগ করলাম।] 

[* ভালোবাসার চল্লিশ নিয়ম : এলিফ সাফাক :: অনুবাদ ও সম্পাদনা : সারওয়ার চৌধুরী * প্রকাশনী : চৈতন্য * প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৬ * প্রাপ্তিস্থান : একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৬, স্টল: ১৫৬]

Advertisements