courtesan_with_wine_wj05মদ, যৌবন এবং কবিতা;উর্দু কাব্যের অতিপুরোনো অপব্যাখ্যা

গল্পটা আমি প্রায়ই করে থাকি, বিশেষত নতুন ব্যাচে যারা আমার ক্লাসে থাকে তাদের সাথে। গল্পটা এই – হরকিষাণ লাল স্যারের প্রথম ক্লাসেই একজন ছাত্র প্রশ্ন ছুঁড়ে বসল, উর্দু কাব্য মদ আর যৌবনের মত্ততা ছাড়া আর কিছুই না, আছে কি? লাল স্যার ছিলেন পাঞ্জাব সরকারকর্তৃক চালুকৃত উর্দু ডিপ্লোমা কোর্সের ঝানু শিক্ষক, স্মিত হেসে স্রেফ দুটো পঙক্তি আওড়ালেন-

উসকে প্যয়মানে মে কুছ অউর, মেরে প্যয়মানে মে কুছ অউর
দেখনা সাকি হো না যায়ে, তেরে ম্যয়খানে মে কুছ অউর
[তোমার ভাগ্যে কি, কি-ই বা লেখা আছে আমার বরাতে
সামলে থেকো হে সাকি, উল্টাপাল্টা কিছু না হোক তোমার ডেরাতে ]

সঙ্গে সঙ্গেই সেই ছাত্রটি এমন ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল যেন, দ্যাখেছ…বলেছিলাম না! এরপর লাল স্যার যে কথাটা বললেন বলাবাহুল্য অজ্ঞ পাঠকের এমন প্রশ্নের জন্য ওটাই ছিল স্বতঃসিদ্ধ উত্তর, ‘উর্দু কবিতাকে অক্ষরে অক্ষরে নিও না – যে অক্ষর তুমি পড়ছ, তাতে যা বলা আছে এ তার চাইতেও বেশি কিছু। এখানে প্যয়মানা  কেবল পানপাত্রই নয়, বরং নিয়তি; ম্যয়খানাকে শুঁড়িখানাই ভেবোনা, এ বরং গোটা ব্রহ্মাণ্ড, সাকি শুধুই পরিচারক/পরিচারিকা নয় এখানে, সে স্বয়ং ঈশ্বর। আর কবি সেই স্রষ্টার কাছে ছুঁড়ে দিলেন অতিপ্রাচীন এক দ্বন্দ, যে, কেন আমার ভাগ্যই এত অপ্রসন্ন যা অন্যের সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে বা দরাদরিতে নামতে হবে? কবি, এক অর্থে, স্রষ্টাকেই সাবধান করে দিচ্ছেন যেন তাঁর সাথে সদাচরণ করা হয়; অন্যথায় প্রতিহিংসা বশতঃ হয়ে ধরাধামে একটা অনাসৃষ্টি ঘটিয়ে ফেলবেন কবি।’ এমন একটি উদ্ভেদে প্রশ্নকর্তা স্বভাবতই বাকরহিত হল।

 

সাধারন পাঠককুলের ভ্রান্ত ভাবনা এর চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। প্রখর চোখ খুব কম পাঠকেরই থাকে, যা শব্দের গভীরে প্রোথিত মর্মার্থকে অবগুণ্ঠন থেকে আলোয় নিয়ে আসতে পারে। উর্দু কবিতা বিষয়ে বলতে গিয়ে কেবল অপেশাদার পাঠকই নন, বেশ ভাল মানের পাঠকও আতান্তরে পড়ে যান। বস্তুত উর্দু কাব্যে সাকি-ও-ম্যয়খানা বা পরিচারক/পরিচারিকা আর শুঁড়িখানার প্রতীক প্রচণ্ডভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তার মানে এই নয় যে এতে মাদকাসক্তি, মাদকাসক্ত বা মদ্যপদের সমর্থন করা হল। পঙক্তিতে পঙক্তিতে তা উস্কে দেওয়ার মতনও কিছু নয়, এমনকি কবিকুল পানশালার ব্র্যাণ্ড এম্বাসেডরও নন।

অন্যান্য সব ভাষার কবিতার মতই, উর্দু কবিতার শব্দও রূপকাশ্রয়ী। ঘটনাক্রম বা প্রসঙ্গক্রমের ওপর ভিত্তি করে, শব্দরা আক্ষরিক বর্ণনার চাইতে রূপককেই বেশি আস্থাশীল মেনেছে। অন্যান্য কবিতার মতই, উর্দু কবিতাও সুবিবেচনা আর অহিংস উপলব্ধির দাবিদার। বহুদিন ধরেই সমালোচকরা একটা বিষয়ে তর্কে মেতে আছেন,যে,উর্দু কবিতায় শব্দ-প্রকরণের যে ব্যবহার তা অন্যান্য ভাষার কবিতার মতন কাম্যমাত্রায় নেই, আবার ধরা যাক কোনও একটি পঙক্তির একধরনের ব্যাখ্যা সবসময় নিশ্চিত করে বলা না-ও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কাব্যভুবনের মোহনীয় কায়া থেকে অসংখ্য বিচ্ছুরণ না নিয়ে কেন কেবল পানপাত্র, শুঁড়িখানা, নারী শব্দগুলো আকছার ব্যবহার হতে দেখা যায়? আসলে এর কোনও সোজাসাপ্টা উত্তর নাই, প্রতীকের এই চয়ন কি নিছক সংস্কৃতির আচারের অধীন না কি ব্যক্তিক উদ্বেগাকুল পরিস্থিতির ফসল, তা বলা মুশকিল। একটা শব্দ বা বাক্যের প্রচলিত মানে কি বা কি কি আর কবির কোন এখতিয়ার থেকে নিষ্পন্ন হয়ে তা কি মানে ধারণ করেছে, এই প্রশ্ন করাটাই বরং যথাযথ। দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব ভাষাই প্রচলিত শব্দ বা শব্দবন্ধকে রূপকের মাধ্যমে অখ্যায়িত করে থাকে। ফলে, রূপক হিসেবে হিন্দিতে যেখানে ধর্মশালা এসেছে, উর্দু সেখানে ব্যবহার করছে ম্যয়খানা। উর্দু রূপক এমন-ই বিলাসী, ইন্দ্রিয়পরায়নও বলতে পারেন। আর এহেন প্রতীক চয়নের কারনে উর্দু রূপককে উপহাস করা অনেকটা ফ্যাশনের মত, প্রায় দুর্নীতির মত ব্যাপারে দাঁড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি উর্দু কবিদের এই পক্ষপাতদুষ্ট গুঢ়লেখ্যমুখী এমতন শব্দের ঘন ঘন ব্যবহার যেমন সাকি এবং ম্যয়খানা কবিতার মানের ক্রমাবনতিকেই প্রতিনিধিত্ব করে ফলে কাব্যউৎকর্ষতা নিন্দিত হচ্ছে। আচ্ছা, নিছক প্রতীক নির্বাচনশৈলীতার কারনেই কি উর্দু ভাষা জনগনের কাছে সুবিধাজনক এক বলির পাঁঠা হতে পারে? প্রতীক নির্বাচনের ভেতরকার এই যে (অ)দুঃসাহসিক দ্বন্দ বা পার্থক্য,বিষয়টি আমাদের  ভাল করে বুঝতে হবে।

অন্যান্য ভাষা থেকে সরে এসে, উর্দু কবিতা বিশেষত জড়বাদী এবং কামদ প্রতীকের ব্যবহার হতে দেখি; কখনও কখনও অধি-প্রাকৃতিক, অধি-মূলদ এমনকি বিতর্কিত, উদ্ধত শব্দবলীও। এখানে, প্রতীক এবং প্রতীকি অবস্থান যেন একেবারেই বিপরীত মেরুর দুটো বিষয়; বস্তুত চিন্তক যেখানে স্বীয় চিন্তাকেই অশুচি হিসেবে তুলে ধরছে। প্রতিনিধিত্বশীল এসব প্রতীকের মধ্যে শরাব, শাদাব এবং সাকি সমধিক ব্যবহৃত। নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ শব্দ ব্যবহারের মুন্সিয়ানাকে আমলে নিলে, বেশিরভাগ কবিই এইরূপ শব্দের আশ্রয় নিয়েছেন এন্তার। বস্তুত, এমন কবি খুঁজে পাওয়া বেশ দুষ্করই হবে যিনি এই শব্দত্রয় তাঁর কবিতায় ব্যবহার করেননি। এখন, যেহেতু বলা হয়ে থাকে যে এই শব্দত্রয় আকছার অপব্যাখ্যার শিকার হয় (এইবেলা বলে নি-ই, শব্দ বা রূপক তিনটি আমার ভীষণ প্রিয়) তাই এই রচনায় শব্দত্রয় নিয়ে তৈরি হওয়া অস্বস্তিকর বাতাবরণ খানিকটা দূর করবার প্রয়াস খুঁজব। যা-ই হোক, শুরু করবার আগে বলে নেওয়া ভাল যে, শব্দ তিনটি নিয়ে ঝুটঝামেলা যা ঘটে তা মূলত প্রতীকি প্রয়োগ অর্থে ঘটে। তবে সবসময়ই ব্যাপারটা ঘটে  তেমনও নয়।

এদের মধ্যে শরাব বা মদ শব্দটার ওপর সবচেয়ে বেশি ফাড়া! উর্দু কাব্যে প্রতীকি এই শব্দের আমদানী নিয়ে কিছু বলার আগে এর পরমাত্মীয় কিছু শব্দের সাথে যেমন: প্যয়মানা, ম্যয়খানা, সাকি এবং আবশ্যিকভাবে যাহিদ (যিনি সুরা পান পরিহার করে চলেন) ও বায়িজ (গোঁড়া মৌলভি বা পুরোহিত) এর সম্পর্কটা কিরূপ তা জেনে নেওয়া দরকার, এক অর্থে যাদের সাথে এর একটি নেতিবাচক পরম্পরা চলমান। আর সবগুলো মিলেঝুলে এমন একটা অবয়ব দেয় যে মনে হয় কেবল মদ-ই সত্য কিংবা একমাত্র প্রশংসাযোগ্য। যা-ই হোক, সবসময় এইরকম ভাবনা ভাবাও সমীচীন নয়। উর্দু সাহিত্যে এমতন শব্দগুলোর আগমন ঠিক কবে থেকে তার দিনক্ষণ বলে দেওয়া কিছুটা মুশকিল, তবে সবচেয়ে কাছাকাছি উদাহরণ পাওয়া যায় মধ্যযুগের কবিতা বিশেষত মুঘল আমলে। মুঘল যুগে উর্দু কবিতা তাঁর রচয়িতাকে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার সুযোগ এনে দেয়। তন্বী পরিচারিকাদের পরিবেশিত অবারিত দ্রাক্ষারস সহযোগে পৃষ্ঠপোষকগণ প্রায়ই বিভিন্ন মুশায়রায় অংশ নিতেন আর কাব্যরসে ডুবে যেতেন। বলাবাহুল্য, তৎকালে মুশায়রা বা আবৃত্তি-সন্ধ্যাগুলো  ছিল বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম আর নির্ধন কবিদের কাছে ওইসকল পৃষ্ঠপোষকগণ ত্রাতার চাইতে কম কিছু ছিল না, তাই এটা খুব স্বাভাবিক যে কবিরা শুন্য পানপাত্র ভরে দেওয়ার জন্য দ্রাক্ষারসকেই আপন করে নেবেন। এইভাবে অজ্ঞানবশতঃ, শব্দগুলো সমসাময়িক কবিদের কবিতায় জুড়ে বসেছে, পরে উত্তরাধিকারসূত্রে গজল রচয়িতারাও তা আপন করে নেন। কবিগণ এই শব্দগুলোকে বুনে দিয়েছেন নানা আঙরাখায়, আর যা ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে তীব্র প্রতীক। এসবের ব্যবহার দেখি উপহাস অর্থে, কখনও নিষিদ্ধ কিছু বা সমাজের সঙ্কির্ণতা বোঝাতে। এই পঙক্তিগুলোর কথাই যদি বলি,

বায়িজ না খুদ্ পিও, না কিসিকো পিলা সাকো
ক্যায়া বাত হ্যায় তুমহারি শরাব-এ-তহুর কি – মির্জা গালিব*১
[হে খোদাপ্রেমী,পান তো করই না কাউকে সে স্বাদও দাও না
হায়, কি মহিমা তোমার প্রেমসুধার!]

যাহিদ শরাব পিনে দে মসজিদ মে ব্যয়ঠকার
ইয়া বো জাগা বাতা দে যাহা পর খুদা না হো – দাগ দেহলভি*২
[শোনো হে প্রিয়, মসজিদে বসেই পান করতে দাও
নয়তো বলে দাও সে ঠাঁই যেখানে খোদার আসন নেই]

ইক জাগা ব্যয়ঠকার পি লু মেরা দস্তুর নেহি
ম্যয়কাদা তঙ্গ বানা লু মুঝে মনজুর নেহি – জিগার মুরাদাবাদি*৩
[একঠায় বসে পান করে যাব এমনধারা নই
গড়ব নিজের পানশালাটাই তেমন মাতাল নই ]

 

 

তঙ্গ-ম্যয়কাদা বা ছোট সরাইখানা দ্বারা কবি সরাইখানার আকার বা ভৌগোলিক পরিমাপ যতটা বোঝাতে চেয়েছেন তার চেয়ে চিন্তার আটকে পড়াটাই এখানে প্রণিধানযোগ্য, প্রথমোক্তটি বরং তিনি সজোরে প্রত্যাখানই করেছেন। গালিব, সামাজিক বিধি-বিধানকে আমলে নিচ্ছেন, ধর্মীয় অনুশাসনের ওপর একঅর্থে যুদ্ধ ঘোষনা করলেন যা সচেতনভাবে পৃথক হতে বাধ্য করে। শরাব-এ-তহুর একটি পৌরাণিক নদী, যাতে পানির বদলে মদ প্রবাহিত হয়, যেটি স্বর্গ হতে প্রবাহিত এবং বস্তুত এই নদী বিষয়ে গালিব সন্দিহান। পবিত্র গ্রন্থ আশ্বস্ত করছে, যারা পুণ্য করবে, যারা বাধ্যগত তাদের জন্য মৃত্যুর পর রয়েছে এক চিরশান্তির জগৎ, অপেক্ষা করছে হুর-পরী আর শরাব-এ-তহুর। কবি আমির মিনাই অবশ্য ময়না তদন্তের প্রতিবেদন দেখেশুনে আশ্বস্ত হয়েছেন যে এ মূলত ভূষিমাল কেননা দিনশেষে বেহেড মাতাল আর সৌম্য আরাধক দুয়ের স্বপ্নই এক ও অভিন্ন। কেননা:

জুদা হ্যায় দুখতার-এ-রাজ কা নাম হার সোহবৎ মে এ্যয় সা-কি
পরী হ্যায় ম্যয়কাশো মে, হুর হ্যায় পরহেজগারোঁ মে – আমির মিনাই*৪
[তোমার সান্নিধ্যে হে দয়িত আমার,প্রতিটি সন্ধ্যা ভিন্ন মোহে
মদ্যপরা পরী মানুক, হুর জানে সব সৎ লোকে]

তাহলে ভক্তের শেষ পরিণাম কি দাঁড়াল? শেষতক এতসব আরাধনা বা ভক্তি কোথায় পৌছুলো? স্বর্গ কেবল এক আনন্দদায়ক অনুভূতি ছাড়া কিছুই নয়,তাই নয় কি? মোদ্দাকথা, সকল ধর্মীয় মতবাদগুলো আসলে যা করছে, শাশ্বত আনন্দকে সীমিতভাবে উপভোগ করার জন্য একধরনের ঘেরাটোপ দিয়ে দিচ্ছে। ফলে বিশ্বের প্রায় সব ধর্মেই দেখা যায়, একজন ভক্তের চুড়ান্ত পুরস্কার হিসেবে থাকে স্বর্গগমন। বর্ণনায় ভিন্নতা সত্ত্বেও চারিত্রিক প্রজ্ঞায় সব ক’টি স্বর্গই সীমাহীন আনন্দের স্থান, কতকগুলো আবার বেশ বিলাসব্যসনের জন্য উৎকৃষ্ট। কতকটা কর্পোরেটের ব্যবসায়িক ফন্দিফিকিরের মতই কি না যে শেষ প্রিমিয়ামের সময়ই সবচেয়ে দামী উপহারটা বরাদ্দ থাকছে, জানি না এতে ধর্মের অগভীরতা প্রকাশ পায় কি না? যা-ই হোক, মিনাই যে দিকটার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন এ তারচাইতেও বেশি কিছু। তিনি একজন মদ্যপের ও একজন পুন্যাত্মার আলাদা আলাদা উদ্দেশ্যকে একিভূত করার, সমার্থক ভাবার প্রয়াস খুঁজেছেন। এই দুই পদের মানুষের পরিচয় ভিন্ন হলেও, লক্ষ্য একই । বিশ্বাসীরা যাকে হুর বলে, অবিশ্বাসীদের কাছে তা-ই পরী। ফলে এ কেবল সংশয়ীদের বিতর্কিত সমীকরণ উদ্ভাবনের চেষ্টারই নামান্তর। অথচ এর মানসিক ভিত্তি কিন্তু আরও দৃঢ়। বিষয়টা এমন, প্রচেষ্টা এবং নিবৃতি এই দুইকে এক করে সেই আলোয় ফেলে তিনি জানতে চান মৃত্যু-পরবর্তী লাভালাভের কথা, না কি এই ধরাধামে থেকেই যে/যারা সেই অপার্থিব আনন্দ নিতে পারছে তার কথা – কেননা দুয়ের লক্ষ্যই তো এক, সবশেষে আনন্দধাম।
ghalibউর্দু কবিতায় সমধিক ব্যবহৃত আরেকটি উপমা বায়িজ, যা ধর্মের অলঙ্ঘনীয় বিষয়াদির সাথে যুক্ত, যুক্ত সুরাপানের আবহের সাথেও। এই বায়িজ বা কাঠ মোল্লারা ধর্মীয় মতবাদের সনাতনিপন্থাকে প্রতিনিধিত্ব করেন, যে পন্থা সাধারনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভুল-চুক করবার স্বাধীনতাকেও অস্বীকার করে। তিনি তীব্র রক্ষণশীল ধর্মীয়গুরু, যিনি ধর্মের ঝাণ্ডাহাতে অহর্ণিশ সুরাসক্ত কবির সাথে উচ্চণ্ড বাহাসে লিপ্ত। কথাপ্রসঙ্গে বলে রাখি, আজতক  এমন একটি কবিতা বা গজলও পাওয়া যায়নি যেখানে বায়িজ আর কবির শান্তিপূর্ণ সহবস্থান বিদ্যমান। ব্যাপারটা আদতে ‘বায়িজ বনাম কবি’ এমনও নয়, কতকটা ‘ধর্মাচরন বনাম প্রাতিস্বিক’ হতে পারে। জনৈক সাধারন প্রতিনিয়িতই ধর্মীয় বিধিবিধানে হাবুডুবু খেতে খেতে হতাশায় নিমজ্জিত, যাকে নিজের দুঃখভার স্বাধীনভাবে বয়ে যাওয়ার বদলে তা ধর্মের অনুশাসনে সহ্য করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বায়িজ ধর্মের সেই উদ্ধত কতৃপক্ষ যিনি জবরদস্তি করে ব্যবস্থাপত্র চাপিয়ে দিতেই পছন্দ করেন, হাতিয়ার হিসেবে একঘরে বা সমাজচ্যুত করে ফেলার অন্তর্নীহিত সতর্কীকরণ তো আছেই। এই মর্মে

একটি উত্তম পরামর্শ দিয়েছেন কবি জওক,
জওক যো মাদ্রাসোঁ কে বিগড়ে হুয়ে হ্যায় মুল্লা
উনহে ম্যয়খানে লে আ-ও, সাওবর জায়েঙ্গে – জওক *৫
[পাঠশালার বিগড়ে যাওয়া মহাত্মনদের, ওহে জওক
নিয়ে এসো পানশালায়, ঠিক শুধরে যাবে] 

বায়িজের হুকুমজারির বিপরীতে থাকে সাকি বা সুরাবাহক, উর্দু কাব্যের আরেকটি অপব্যাখ্যায়িত চরিত্র। অবশ্য, আক্ষরিক অর্থে এর ব্যবহার ঘটলেও বেশিরভাগ সময়ই তা নিছক সুরা বাহকের রূপে থাকেনা। প্রাক-মুঘল এবং মুঘলামলে, সাধারণত সাকি বলা হত সুশ্রি তরুণীদেরকে যারা সুরাহি (লম্বা গলার পানপাত্র) থেকে সুরারসিকদের সুরা ঢেলে দিত। একজন সুরা-পরিবেশকের চাইতেও, সাকি এমন কেউ; প্রতিটি পানাসরে যার সদয় কৃপা লাভের কাঙ্খা ক্রমাগত গুঞ্জিত হতে থাকে, যেন একজন উপাসক তাঁর স্রষ্টার মনোযোগ কামনা করে চলেছে নিয়তই। মদ্যপরা সরাইখানায় সাকি’র কৃপাধন্য হয়ে থাকে। অনুচ্চারিত প্রার্থনায় সে সাকি’র জন্য অপেক্ষা করে, মনোযোগ আকৃষ্ট করে। দরিদ্র মদ্যপের কাছে সাকি হচ্ছে অনুগ্রহের বৈকুন্ঠ। সাকি’র কৃপা অর্থাৎ সে কতটা তাঁর উপাসকদের জন্য উদার তার নিক্তি পানপাত্রে বহমান সুরাই বলে দেয়। নানান উপমায় তাকে ডাকা হয় – দয়িত, যাদুকর, মায়াবী, শিক্ষক। পাশপাশি পানশালার পরিচালক মায় পানশালার স্রষ্টা ইস্তক। সাধারণত, যা-ই বলি না কেন, মদ্যপেরা যে সাকিকে সুন্দরী দয়িতা রূপে জ্ঞান করে সেটা কিন্তু বেশ। অবশ্য প্রিয়তার চাইতেও সাকি রূপায়িত হয় প্রেমের মুরতি হিসেবে, যে প্রেম ঘিরে থাকে যত্নে, সহানুভূতিতে আর সান্তনা দিয়ে।

প্রায়শই দেখা যায় যে কবিগণ মদ্যপের স্বরে কথা বলেন। হতদরিদ্র সুরাসক্তকে উর্দু কাব্যে গৌরবকান্তি নায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মানুষে মানুষে যে বৈষম্য তা যুগপৎভাবে দারিদ্রক্লিষ্ট যুবাদের সংবেশিত করেছে, পীড়িত করেছে, সমাজস্থিত বিধি-নিষেধ তাদের টুঁটি চেপে ধরেছে, নির্বিকার বৈরীতার অনুচর করে তুলেছে। কিন্তু এই অকৃত্রিম মাতাল কেবল সরাইখানাতেই মেলে, সভ্য সমাজে নিজগৃহে নয়। গালিব, জওক, মীর, সওদা, মীনাই, রিয়াজ খায়রাবাদি, জিগার মুরাদাবাদী প্রত্যেকেই তাদের কাব্যে এই নায়ককে এঁকেছেন কপর্দকশূন্য, হতভাগা মদ্যপ হিসেবে। প্রতীকি অর্থেই, এইসব মদ্যপেরা দারিদ্রতার নিপীড়ন সয়ে বেঁচে থাকেন, মৃত্যুবরন করেন তবুও তারাই হন ভ্রান্তধারণা প্রসূত বলির শিকার। বস্তুত সমাজের চোখে পানশালা এমন একটি স্থানরূপে পরিগণিত যেখানে তাবৎ নিষিদ্ধ, অস্বস্তিদায়ক চরিত্ররা ভীড় জমায়। সমাজ, যেখানে সাধারণের স্বাধীনভাবে কথা বলার কোনও অধিকার নেই, সুরাপান যেখানে পাপের শামিল, প্রেম সেখানে অনাচার। নানা নামে ভূষিত হয় মদ্যপ – রিন্দ, ম্যয়কাশ, ম্যয়নশ, বাদাকাশ, বাদাখ্বার কিংবা ম্যয়খার, যারা একলা-একা, প্রেমভিখারী এবং প্রেমিক বা বন্ধুদের কপটতা, চপলতা আর বিশ্বাসঘাতকতার শিকার। সামাজিকতা থেকে, ধর্ম থেকে যে বিচ্যুত, নিস্পৃহ। সমাজ ও স্রষ্টা, দুয়ের প্রতিই তাঁর দৃষ্টি ধূসর, সে জানে যুগপৎভাবে উভয়েই শঠ। বিশ্বাস স্থাপনের প্রতি তাঁর কাঙ্খা আছে, সে সংবেদনশীলও বটে কিন্তু এতে প্রশ্নাতীত বশ্যতাও খুঁজে পায়। মানবতায়, সামাজিক রীতি-নীতিতে সে অনুরক্ত অথচ একই সাথে মানেুষে মানুষে সে সীমাহীন বিভেদের দেয়ালও দেখতে পায়। মোহমুক্তি ঘটে তাঁর, এক শুঁড়িখানাকেই সে আন্তরিকতায় খুঁজে পায়। শুঁড়িখানাই তখন তাঁর আবাস, যে আবাসে কেউ তাঁর ধর্মবিশ্বাস কিংবা জীবনাচার নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। এই-ই একমাত্র ঘর যেখানে সে সম্পূর্ণ স্বাধীন। একইসাথে সে যেমন শুঁড়িখানার সদস্য তেমনি এর মালিকও বটে! যে ঘরের প্রতিটি ইটের সাথে সে একাত্ম, যেমন গুটির সাথে একাত্ম থাকে প্রতিটি মথ। তাইতো একজন মদ্যপ উদাসীন সমাজ আর মহাবিশ্বের শাশ্বত সূত্রকে জানিয়েছে,

 

লাজিম হ্যায় ম্যয়ক্বাদে কি শরিয়ত কা এহতেমাম
ইয়ে দওর-এ-রোজগার, যারা লড়খাড়াকে চল্
দ্যয়র-ও-হারাম নেহি তো খারাবাৎ হি সহি
ইয়ে গর্দিশ-এ-জমানা, কাহি তো কায়াম কর্ – আবদুল হামিদ আদম *৬
[পানশালারও থাকে বটে কিছু রীতি
ওহে মত্ত পৃথিবী ধীরে চলো কিছুটা
প্রেমরাঙা ঘর না হোক পর্ণকুটীরেই আছি
পৃথিবীর ধুলিজমা পথে থাক তবে কিছু রেখা]
নেশা-এ-ইশ্ক কা গর জর্ফ দিয়া থা মুঝকো
উমর কা তঙ্গ না প্যয়মানা বানায়া হোতা
রোজ-এ-মামুরা-এ-দুনিয়া মে খারাবি হ্যায় জাফর
এয়সি বস্তি কো তো বিরানা বানায়া হোতা – বাহাদুর শাহ্ জাফর*৭
[চড়ালেই যখন প্রেমের নেশা
বয়স কেন রুখলে না
দুনিয়াজোড়া মারকাটারি
কেন উজাড় করে বাঁধলে না]

অসম সমাজের ভেতর ক্রমাগত ঘটে চলা এসব অনাচারে হতাশ হয়ে মদ্যপ তাই  শান্তি খুঁজে পায় একমাত্র পানশালাতেই,সেখানে নিজেকে ভুলে থাকা যায় । যেখানে একমাত্র প্রবোধ সেই সাকি যে হাতে তুলে দেয় তাঁর প্রিয় ত্রাণপাত্র। এই ধরাধামে সাকিই একমাত্র বিশ্বস্ত সাথী যে সকল সমূহ বাস্তবতা থেকে তাকে আগলে রাখে। সেই দ্বৈত সত্ত্বা যে পরম মমতায়, ভালবাসায় আর যত্নে সুরাসক্তের দুর্দশা ভাগ করে নেয়। পানশালার নিত্যবন্ধু কবি’র তাই নিরন্তর শ্রোতা ওই সাকিই। কবি’র অশ্রুত করুণ-রস শোনার মত দরদি শ্রবণেন্দ্রিয় আছে কেবল তারই। সুতরাং সব কবিই যে কবিতার ভাষায় সাকি’র সাথে খোশামোদে মেতেছেন এতে অবাক হবার কিছু নেই। তাকে গজল উপহার দিয়েছেন, তাঁর মোহনীয় রূপের প্রশংসায় মেতেছেন, কামনা করেছেন তাঁর সদয় অনুগ্রহ, কাঙ্খা করেছেন যেন সে সবসময় কবির আশেপাশেই বিরাজ করে। তাঁর এক লহমা কটাক্ষেই কবি নিজেকে ধনী ভেবে নেন। পানশালার চিরায়ত রকম-সকম তাঁর উপস্থিতিতে যেন পাল্টে যায়! সুতরাং দেখা যাচ্ছে, সাকি কেবল সুরা-পরিবেশকই নয়, সুরাপূর্ণ পানপাত্রও বটে।

 মগর উসকো ফারেব নার্গিস-এ-মাস্তানা আতা হ্যায়
উলটাতি হ্যায় সাফেঁ, গর্দিশ মে যব প্যয়মানা আতা হ্যায় – আতিশ*৮
[তাঁর কটাক্ষে দেখি প্রবঞ্চনা,যদিও
তীব্র ব্যথায় পৃষ্ঠা উল্টে যাই,তবুও]

সাকি’র মনোযোগ আকৃষ্ট করবার জন্য, মাতাল কবি সর্বদাই তার প্রতিদ্বন্দী কবিদের সাথে বাহাসে লিপ্ত হন। সাকি মাতাল কবির চিরসখা, যার প্রতি কবির কাঙ্খা চিরতরুণ। যার জন্য কবি’র হৃদয় সততই অস্থির, যার সামান্যতম অঙ্গুলি হেলনে সমস্ত সম্পদ, সকল বিশ্বাস, এমনকি জীবনতক বিলিয়ে দিতে সদা প্রস্তুত।

বাত সাকি কি না টালি যায়েগি
করকে তওবা তোড় ডালি যায়েগি – হাবিব জালিব*৯
[প্রতীজ্ঞা করে তা ভেঙ্গে ফেলা হতে পারে
তবুও সা-কি, তোমার কথা ফেলতে পারে কে?]
আখোঁ কো জাম সমঝ ব্যয়ঠা থা আনজানে মে
সা-কিয়া হোশ কাহা থে তেরে দিওয়ানে মে – শামিম শাহবদি*১০
[ভুল করে তোমার চোখকেই সুরা ভেবেছি
শোনো প্রিয়, তেমন করে হুশ কবে কার থাকে!]

একজন সাকি যদিও প্রিয়তমের চাইতেও বেশি কিছু হিসেবে উচ্চারিত হয়, উর্দু কবিগণ তাঁর সমান্তরালে শাবাবকে-ও সমান শ্রদ্ধায়, প্রেমে স্মরণ করেন। বিচিত্রিতার মাত্রাহেতু, শাবাব শব্দটি আক্ষরিক প্রয়োগের বাইরে রূপকার্থেই সমধিক ব্যবহৃত। আক্ষরিক অর্থে, শাবাব প্রধাণত লাবণ্যময়কেই বোঝায়। রূপকার্থে এটি কখনও ব্যবহৃত হয় দয়িতার মোহনীয় রূপ প্রকাশ হিসেবে, কখনও পার্থিব আনন্দ, প্রেক্ষাপট অনুযায়ি তা কখনও বৈভব অর্থেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। হৃদয় চায় তার ক্ষতস্থানগুলোর উপর কোনও এক দয়ার্দ্র মলম লাগিয়ে দিক। সুফি সাধকগণ স্রষ্টার সাথে দয়িতার মিল খুঁজে পান, পূরাণে যেমন কৃষ্ণ আর গোপিনীরা। সমূহ বাস্তবতাসূত্রে, স্রষ্টা যেহেতু সর্বত্র বিরাজমান, কবি আমির মিনাই অধীর-প্রাণকে প্রবোধ দিয়েছেন, সাহস জুগিয়েছেন,

কৌন সি জা হ্যায় যাহা জালওয়া-এ-মাশুক নেহি
শৌক-এ-দিদার হ্যায় আগার তো নজর প্যয়দা কর্ – আমির মিনাই
[ঢুঁড়ে দেখো, কোথায় বলো তাঁর ছোয়া নেই
পেতে চাও যদি তাঁকে তবে দৃষ্টি প্রসার করো]

 পঙক্তিদুটো পড়ে যদি কেউ মাশুক কে কেবল প্রেমিক জ্ঞান করেন তাহলে ওই পঙক্তি দুটোর প্রতিই অন্যায় করা হবে। পাঁড় নাস্তিকদের সঙ্কীর্ণ ব্যখ্যার বাইরে এসে মিনাই বরং সর্বেশ্বরবাদীতার উপর জোর দিয়ে প্রিয়-উন্মুখদের সহনশীল হতে সুপারিশ করেন। কোনও প্রতীকি শব্দকে গভীর অনুধাবন না করে হালকা চালে নেয়াটা উর্দু কাব্যের ক্ষেত্রে একটি বিষফোঁড়ার মতই। অন্যান্য ভাষায়, এই ধরণের অনুশীলণ স্রেফ চাষাড়ে এবং অনায্য হিসেবেই ধরা হয় যা উর্দু কাব্যের ক্ষেত্রে হরহামেশাই ঘটে থাকে। প্রতীকি শব্দকে যে কেবল মনগড়া অর্থেই নেয়া হয় বিষয়টি তার চাইতেও অধিক, আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে একে বিকৃত করা হয়। যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা এই অপব্যাখ্যা নিতান্তই অন্যায়। সারমর্ম হিসেবে যদি ধরেও নেই  মদ এবং মোহনীয়তার ঝঙ্কারকে একই পাত্রে পরিবেশন করা হচ্ছে তাহলেও বলতে হবে যে, তাতে দুটি প্রতীককেই একসাথে অবমাননা করা হয়। আলোচক বা সমালোচকদের এমনধারা কবিতার মানের ক্ষেত্রে কোনও উদ্বেগের বিষয় না হলেও, তা তাদের অভব্য ভাবনার পরিচায়ক ঠিকই। সামগ্রিকভাবে উর্দু কাব্যের প্রতি এটি সঙ্কীর্ণমনা উগ্র জাতীয়তাবাদেরই শামিল। এমন ভিত্তিহীন আর অনায্য ব্যখ্যা কেবল অনৈতিকই নয়, শাস্তিযোগ্য অপরাধের মতই। এ অনেকটা কবিতার রসাস্বাদনের পূর্বেই সাধারণ পাঠকদের মগজ ধোলাইয়ের মতো।

caro-25_46a

পেশাদার সমালোচক বা অপেশাদার, উভয়ই উর্দু কাব্যের এই সুক্ষাতিসুক্ষ্ণ ফারাকগুলো প্রায়শই সচেতনভাবে মাপতে পারেন না। অন্যান্য ভাষার ক্ষেত্রেও এই সমস্যা বিদ্যমান। কেবল পূর্বলব্ধ জ্ঞান বা বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা দিয়ে এর সুরাহা তেমন একটা হয়না। এটি বরং ব্যক্তিক মনোভাব, বিশেষ করে ভাষার প্রতি ওই ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়। সত্যি বলতে কি, স্বীকার করতেই হবে যে অন্যান্য ভাষার প্রতি পাঠক যতটা নিকটতমের মতো আচরণ করে উর্দুর বেলায় ততটা বেকসুর নয়। তারা যে ধরনের সামাজিক বাস্তবতার বাতাবরণে বাস করে সেটি দ্বারাই তারা উর্দু ভাষার প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি চুড়ান্ত করে থাকে। সেই ‘সামাজিক বাস্তবতা’ যা মূলত রাজনীতি দ্বারা তৈরি। এই দৃষ্টিকোণ হতাশাজনকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট, অনায্য এবং ক্ষতিকর। একটি ঋদ্ধভাষাকে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের ছাঁচে ঢেলে, তাঁর প্রতি মনোভাব প্রকাশ করাটা বিরক্তিকর তো বটেই, অর্থহীন-ও। ভাষাকে ধর্মের সাথে গুলিয়ে ফেলার এই চল মানুষকে মন্দীভূত করে। এর ফলে যা দাঁড়ায়, হিন্দু সম্প্রদায়ের ভাষা হিন্দি, শিখদের ভাষা পাঞ্জাবী, মুসলিমদের জন্য উর্দু! এই নোংরা বিশ্বাস এতটাই বদ্ধমুল যে একজন হিন্দু যখন উর্দু জবানে কথা বলে ওঠে আশেপাশের লোকজন তখন বিস্ময়ে হাঁ করে ফেলে, কোনও মুসলিম সংস্কৃত বোলে বলে ফেললে তারা খাবি খায়। এই আপাত ‘বিস্ময়কর’ ঘটনায় আমিও প্রায়ই মূর্চ্ছা যাই। ভাষা কখনওই, কখনওই ধর্মের পরিচায়ক নয়, নয় কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলেরও। ভাষা একান্তই মানুষের। যে যেখানে যে ভাষায় কথা বলবে সে-ই তার ভাষা। মানুষের হাতেই ভাষার জীবন এবং পরি‌ষেবা।

ফলে যেকোনও ভাষাভাষির মানুষ, যতক্ষণ না স্বীয় ভাষার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসবে ততক্ষণ অন্য ভাষার রসাস্বাদন তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এটি নির্ভর করছে তাদেরই উপর, এমন উগ্র জাতীয়তাবাদের আগল ভেঙে এগিয়ে আসতে হবে তাদেরই। কেননা, উর্দু ভাষা যতটা হিন্দু বা শিখ সম্প্রদায়ের, হিন্দিও ততটা মুসলিমদেরও, হিন্দুদেরও। এমন একাত্মতাই পারে যুগ যুগ ধ’রে উর্দু কবিতা বিষয়ে গড়ে ওঠা ভ্রান্তির বেড়াজাল ছিঁড়তে। আসুন, একজন বিমুখ বায়িজ না বনে, মানুষের কাছে সাকি  হয়ে উঠি আর উর্দু কাব্যের জোরদার মিছিলে সহনশীল শ্রবণেন্দ্রিয় নিয়ে হাজির হই, গজলের পানপাত্র প্রস্তুত।

———————————————————————–

অনুবাদকের সংযোজন:

  • অনুবাদটি Sharab, Shabab and Shayari –The Chronic Misinterpretation of Urdu Poetry’ শির্ষক প্রবন্ধ-এর ভাষান্তর।
  • প্রবন্ধটির লেখক গগন রিস্ম, তিনি বোম্বে আইআইটির সাবেক ছাত্র। কবি ও গল্পকার।
  • হরকিষাণ লাল।উর্দু ভাষার শিক্ষক,প্রখ্যাত রাজনৈতিক।সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য পাঞ্জাব সরকারের পুরষ্কারপ্রাপ্ত।

১. মির্জা আসাদুল্লাহ বেগ খান (১৭৯৭-১৮৬৯। যিনি গালিব নামেই আমাদের কাছে পরিচিত,  তাকে এবং তাঁর সৃষ্টির সাথে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবার কিছু নেই। উর্দু কাব্যজগতে তার আসনটি সবচে উচ্চস্থানে, একথা অনস্বীকার্য।

২. নওয়াব মির্জা খান, ছদ্মনাম দাগ দেহলভি (১৮৩১-১৯০৫। উর্দু কাব্যজগতে রোমান্টিক কবি হিসেবে স্বীকৃত। উর্দু বাগধারা প্রণয়ন এবং তা ব্যবহারে তাঁর মুন্সিয়ানা উল্লেখযোগ্য।

৩. আলি সিকান্দার, ছদ্মনাম জিগার মুরাদাবাদি (১৮৯০-১৯৬০)। জনপ্রিয় উর্দু কবি। কাব্যসঙ্কলন আতিশ-ই-গুল-এর জন্য ১৯৫৮ সালে পেয়েছেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার।

৪. আমির আহমদ মিনাই (১৮২৮-১৯০০। গালিব-দাগের সমসাময়িক কবি।ছিলেন নবাব ইউসুফ আলি খানের সভাকবি। তাঁর মরমি ধারার কবিতাগুলো উর্দুকাব্যে অবশ্যপাঠ্য।

৫. শেখ মোহাম্মদ ইব্রাহিম জওক (১৭৮৯-১৮৫৪। বিখ্যাত উর্দু কবি। ছিলেন দিল্লির শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের সভাকবি। গালিব আর জওকের মধ্যে, সে সময়কার দ্বৈরথটি উর্দু কাব্যজগতের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

৬. আবদুল হামিদ আদম (১৯১০-১৯৮১। একাধারে কবি, সাংবাদিক, একদা সেনা কর্মকর্তা।পাকিস্তান প্রগ্রেসিভ রাইটার্স মুভমেন্ট-এর সাথে যুক্ত ছিলেন।

৭.মির্জা আবু জাফর সিরাজুদ্দিন মুহম্মদ বাহাদুর শাহ জাফর (১৭৭৫-১৮৬২)। প্রণিধানযোগ্য উর্দুকবি, গজল রচয়িতা। ভারতের শেষ মুঘল সম্রাট। তাঁর দরবার কাব্যসুষমায় আলোকিত করেছেন গালিব, দাগ, জৌকের মতো স্বনামধন্য উর্দু কবিগণ।

৮. খাজা হায়দর আলি আতিশ (১৭৭৮-১৮৪৮।লখনৌ-এর উর্দু কবিতার সোনালী যুগের প্রথিতযশা কবি, গজল রচয়িতা।উর্দু কাব্যের সমালোচকগণ তাঁকে মীর এবং গালিবের পরের স্থানটিতে রাখেন।

৯. জালিব;হাবিব আহমদ (১৯২৮-১৯৩৩)।পাকিস্তানের প্রখ্যাত মার্ক্সিট কবি, যুক্ত ছিলেন প্রগ্রেসিভ রাইটার্স মুভমেন্ট-এর সাথে।

১০. শামিম শাহবদি। ভারতের বিখ্যাত গজল রচয়িতা।

 ………………………

12208517_1095963093747134_4494128583499489417_n
মাহমুদ আলম সৈকত
Advertisements