flying-hat

‘অর্থই সকল অনর্থের মূল’ — উদ্ধৃতিচিহ্নিত কৈশোরকালিক নীতিবাক্যটিকেই শিরোনাম ধরে একটা গদ্য দাঁড় করাবার চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল মাথায়। গদ্য বলতে গেরামভারী গবেষকবৃন্দের গগনবিদারী গাণিতিক সমীকরণাকীর্ণ জট্টিল জিনিশ গোছের কিছু নয়, একান্ত আমার খোঁড়া যুক্তির অশ্লীল আমিত্ববহুল লেখা একটা। যাকে বলে প্রবন্ধ বা ওই-রকম কোনোকিছুর ‘প্রকৃষ্টরূপে বন্ধন’ থাকবে না তাতে, থাকবে না সরমা-পরমা খুঁজে দেখিবার কোনো খাঁই, নিকৃষ্ট নর্তনকুর্দন থাকবে কেবল। তবু যদি নিজের কথাগুলো বলা যায়, নিজ বলে কিছুই নাই স্বীকার করে নিয়েও, মন্দ হবে না। গলগণ্ডালঙ্কৃত গবেষক হওনের চাইতে আমি পছন্দ করব গগন হরকরা হতে। ‘আমি কোথায় পাব তারে / আমার মনের মানুষ যে রে’ … আর কিছু চাই না ভাই, পাই তারে যদি। মনের মানুষ বাইরে পাওয়া যায়? কবিতা কখনো পাওয়া যায় কবিতালোচনায়?

২.

আজকালকার বঙ্গজ কবিতায় রেলা আর কায়দা-মারানো করণকৌশল শুমারসীমালুপ্ত। বঙ্গের বাইরেকার দুনিয়ায় কাব্যিবাজনা আদৌ হয় কি না, খাতায়-কিবোর্ডে রেখায়িত কবিতাদির কথা বলছি, আমরা জানি না। আমাদের হয়, আর-কিছু পুঁছি না আমরা কাইব্য/পইদ্য ব্যতীত, বেহদ্দ করণকৌশলঝঙ্কৃত কবিতায় আমরা আমৃত্যু ডুবন্ত। দুই রকমের প্রবণতা দেখা যায়, মোটা দাগে, এইখানকার কবিতাদিতে। একদিকে খুব-বেশি অর্থ তৈয়ার করার প্রতি কবিদের মাত্রাতিরিক্ত ঝোঁক, অর্থবিত্তপয়মন্ত, নতুবা মাত্রাছাড়া তাল-লয়হীন ফিচলেমির প্রবণতা। কবিতা অনেক রকম হতে পারে, নিশ্চয়ই, কিন্তু বর্ণিত দুইয়ের কোনোটাই কবিতার লক্ষণ নয় বলে বিশ্বাস করি। ভালো কবিতার লক্ষণ তো নয়ই বলা বাহুল্য। যদিও ভালোকবিতা আর খারাপকবিতা আরেক অস্তি-নাস্তি বিকটতর্কের ন্যায় গ্যাঁজানো বলেই মনে হয়। অ্যানিওয়ে। এর বাইরে মোটা দাগে আরেক ধরনের কবিতা-পদবাচ্য বস্তুর সাক্ষাৎ সুলভ, — যার মধ্যে না আছে অর্থ, না অনর্থ। ওগুলো স্রেফ গায়ের জোরের গামা-পালোয়ানি ছাড়া আর কিছু নয়। বড়জোর উহাদেরে গমগমে বা মিনমিনে গলার গাজোয়ারি পিলে-চমকানিয়া গান/গান্ডু বলা যায়। শেষোক্ত শ্রেণির উপস্থিতি এতই অজস্রঅসংখ্যঅবিরল, মুখে-গ্যাঁজলা-ওঠা মৃগী বিমারির দশা হবে বলতে লাগলে, এবং অঙ্গুলিমেয় নয় বিধায় উদাহরণ প্রদর্শন থেকে বিরত থাকাই সমীচীন। যারা নাকি যে-কোনোকিছুই উদাহরণ ব্যতিরেকে একিন করতে নারাজ, তারা যেন বাজারের থেকে দৈবচয়িত একটা-কোনো কবিতাকাগজ বা গড়পরতা পদ্যগ্রন্থ দেখে নেন, এই সাজেশন্ রাখা যাচ্ছে। তাহলে পূর্বোক্ত দুই প্রবণতাভুক্ত বস্তুর কী অবস্থা? হ্যাঁ, সে-ব্যাপারে কয়েক বাক্য ব্যয় করে মামলাটা পাঠকের বিচারাধীন রাখা যায়। কিন্তু ব্যাপারটা সময় ও সামর্থ্যসাপেক্ষ, অতএব, এ-মুহূর্তে দুইয়েকটা ইঙ্গিত দিয়া খালনালা পার হওয়া যাক। অর্থপ্রস্তুতকারক তারাই, যারা কবিতায় একটা-কিছু বক্তব্য রাখতে অত্যাগ্রহী। এই বক্তব্য জিনিশটাকে এরা কেউ-কেউ আবার আদর করে দর্শন নামে ডাকতে ভালোবাসেন। আর ওদিকে ওই ফিচেলরা চান কবিতায় কেবল ভাষার কেরদানি। আসলে ভাষারও নয়, কেরদানিটা শেষতক শব্দের। শব্দের পর শব্দ উৎপাদনেই তাদের যত উদ্যম, বিবাহ বা নিদেন সমাজনিষিদ্ধ সহবাসে তেমন উদ্যোগী দেখা যায় খুব অল্পজনকেই। কোনোটাই সুস্থতা নয়। প্রাসঙ্গিক হোক বা না-হোক তবু উল্লেখ্য, দুটোতেই নব্বইয়ের ন্যাকামি ছিল ভয়াবহ। এখন বরং কমেছে অনেক। নব্বইয়ের ন্যাকামিও আলাদা বিশ্লেষণের দাবি রাখে। বটে!

৩.

একজন কবি যখন রচনা করবেন কবিতা, তার সমকালের হাওয়াবাতাস-শ্বাসপ্রশ্বাস-আলোজল থাকবেই সেখানে। অসরাসরি বা সরাসরি যেভাবেই হোক, থাকতেই হবে কবিতায় কবির সমকালের স্পন্দমান স্বরবর্ণ ও সুরধুন। অন্যান্য ব্যঞ্জনও বর্তনের কিনারে জড়ো হবে যার যার রসনারুচি ও তৌফিকমতো। অন্তত অভিজ্ঞতা-অন্তর্গত আমাদের এ-তাবৎকালের ভালো কবিতার নিদর্শন সেই সাক্ষ্যই দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠবে, সমকালের শঙ্খধ্বনি থাকলেই বুঝি কবিতা হয়ে গেল?  অবশ্যই না, বলা বাহুল্যেরও বাহুল্য, অবশ্যই না। আরো দুটো জিনিশ, অন্তত, থাকা চাই সেখানে। অতীতের আলোবাতাস, এবং ভবিষ্যতেরও। অতীত ও ভবিষ্যের আলোবাতাসের ব্যাপারটা জীবনানন্দবর্ণিত ইতিহাস, পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান ও প্রজ্ঞা ইত্যাদির আশ্রয়ে ভালো ব্যাখ্যা করে নেয়া যাবে। আগ্রহী যে-কেউ এ-লাইনে মাথা ঘামালে মোটামুটি একটা বুঝসমুজ করে নিতে সহজেই পারবেন। এখানে অতীতের আলোবাতাস বলতে কেউ যদি কেবল অতীতের অনুকৃতি বা অনুসৃতি মনে করে বসে থাকেন, কিংবা ভবিষ্যতের আলোবাতাস বলতে বুঝে বসেন মুক্তির স্লোগ্যান্ অথবা অহিংসা/হিংসার জয়গান, সেক্ষেত্রে উড়ে-এসে-জুড়ে-বসা এই কলালোচকের চোখে অন্ধকার দেখা ছাড়া অন্যকিছুই দ্রষ্টব্য থাকছে না। আশার জায়গাটা এখানেই যে, একজন ভালো কবি ব্যাপারটা আলবৎ বোঝেন; এবং গ্রন্থগ্রস্ত ও উদ্ধৃতিউন্মাদ ওইসব অকথ্য আলোচকের চেয়ে অনেক বেশি রাডার-ব্যর্থ-করা বুঝসমুজ একজন ভালো কবির মধ্যে রয়েছে বলেই কবিরা প্রায় অমর, আলোচকেরা প্রায়শ বুদবুদের ন্যায় ক্ষীণায়ু ও দ্রুতমরণশীল। পরাজয়তু যাবতীয় কবিতালোচক!

৪.

এখন, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ — এই ত্রিকালের ও ওই ত্রিকালোত্তর যাবতীয় বায়ু পরিচ্ছন্ন পাতন প্রক্রিয়ায় পুরে দিয়ে বানানো হলো ফুলানোফাঁপানো কবিতা একখান, ধরা যাক। এবং বানিয়ে সেইটে উড়ানো হলো বাতাসমণ্ডলে, অর্থাৎ কিনা হলো যথাস্থানে প্রকাশিত। পাঠক সেই ফানুশ ধরতে পড়িমরি ছুট লাগাবে বুঝি? না-ও পারে, বেরাদর-এ-আলা, সে-রকম সম্ভাবনা এতাবধি ক্ষীণ এইটুকু বলা যেতেই পারে। — কেন, কেন? ইতিহাসচেতনা, পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান আর প্রজ্ঞা ইত্যাদি কল্পনাপ্রতিভার সমস্ত কারিকুরি সমুপস্থিত, তবু কবিতা কেন কবিতা হবে না মশাই? — আজ্ঞে, কবিতা কিসে হয় আর কিসে হয় না তা তো বলা মুশকিলই, তবে বর্ণিত ও জীবনপরবর্তী বহুল চর্চিত ওই তিন উপাদানের বাইরে আরো দুয়েক লবণ-পাঁচফোড়ন আপনাকে ভুলে গেলে চলবে না কবিবর! তার মধ্যে একটা হলো ‘স্বতঃস্ফূর্ততা’, আরেকটা ‘ঐতিহ্য ও ব্যক্তিক প্রতিভা’-র হোমিওপ্যাথিক মিশ্রণ। স্বতঃস্ফূর্ততার ব্যাপারটা কিটস্ বলেছিলেন ভালো করে : গাছে নতুন পাতা গজানোর মতো কবিতা লিখিত না-হলে সেটি রসোত্তীর্ণ হবে না। আর ট্র্যাডিশন্ ও ইন্ডিভিজ্যুয়্যাল্ ট্যালেন্ট সম্পর্কে এলিয়ট যা বলেছিলেন, তা তো য়্যুরোপধাঁচা বাংলা আধুনিক কবিতার এ-যাবৎ পথনির্দেশক। ব্যাপারটা উপেক্ষণীয় নয়।

৫.

গদ্যে প্রযুক্ত যুক্তিবিস্তার কি পদ্যে প্রত্যাশিত? এখানে অপ্রাসঙ্গিক বলে রাখি যে, বাংলায় ছন্দোবদ্ধ লেখনপত্রের আলাদা তিনটা রকম ধার্য করা রয়েছে : ছড়া, পদ্য ও কবিতা। কে বা কারা অমন বিভাজনপন্থ নির্দেশিছেন? উত্তরও তো নয় অজ্ঞাত, বলা বাহুল্য, কবিতাতাত্ত্বিকেরা। বোঝা যাচ্ছে, অ্যাকোর্ডিং টু কবিতাবিচারকবর্গ, কবিতা পৃথক জিনিশ পদ্যের থেকে। বলা হয়ে থাকে যে, পদ্য একতলীয়, কবিতা বহুতলীয়। পদ্য রহস্যবিহীন শাদাসিধা ছন্দে-বাঁধা বাণীমঞ্জরি, কবিতা অপার রহস্যমণ্ডিত। মোদ্দা কথায় ওই হলো পদ্য ও কবিতার মধ্যকার ফারাক, সাহিত্যক্রিটিকদিগের যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ অনুসারে। সে-যাক, শক্তি তাঁর লেখাজোখাগুলোকে পদ্যই মনে করতেন এবং তাঁর কবিতার কমন্ নাম হিশেবে পদ্য লেবেলটাকে তিনি স্বহস্তে সেঁটে গিয়েছেন। কেউ কোনো অভিযোগ তোলেননি আজোবধি তাঁর পদ্য-নামধেয় বস্তুনিচয়ের কবিতাবিভার কমতি নিয়ে। একজন ভালো কবির কবিতা নিয়ে আমরা যখন কথা বলতে চাইব, তখন কবি নিজে সেগুলো কী নামে ডাকতেন তা বিবেচনায় না রেখে আমরা তাদেরে কী নামে ডাকলে পরে সে-জিনিশগুলো প্রাণ পাবে দেহে এবং সাড়া দেবে আমাদের ডাকে ঠিকঠাক, সেদিকেই নজর দেবো নিশ্চয়। আজ্ঞে হ্যাঁ! প্রবন্ধের প্রযুক্তি কবিতায়/পদ্যে প্রত্যাশিত নয়। এবং পারম্পর্য — চিন্তার, বাক্যের/পঙক্তির, ভাবের — ভাঙাই কাব্যের অন্যতম কাজ। কবিতার একটা বড় ও বিশেষ কাজ অর্থান্তর। অন্যান্য কাজ : স্বরান্তর, রূপান্তর, স্থানান্তর, বনান্তর, সমুদ্রান্তর, নীলিমান্তর, মূল্যান্তর, অনন্তর ষড়ঋতুর চঙ্ক্রমণান্তর।

৬.

কবিতার বাস্তব/বাস্তবতা আর বাহ্যজগতের বাস্তব/বাস্তবতা এক নয়। চট করে একটা দৃষ্টান্ত দেয়া যাক। ধরি, এই মুহূর্তে বৃষ্টি হচ্ছে। বাহ্যজগতে ব্যাপারটির ব্যাখ্যা ও অভিঘাত প্রায় অভিন্নভাবে বর্ণনা করবে সবাই। ভাববে বর্ষণের ফলে বোরো ফসলের লাভ-ক্ষতি, আসন্ন বপন তাতে কতখানি প্রভাবিত হবে, খাদ্য-নিরাপত্তায় এর ফল কী দাঁড়াবে; অথবা আজি বৃষ্টিদিবসে আপিশ যেতে কতটা হুজ্জোৎ পোহাতে হবে, বর্ষাতি-বৃষ্টিকোট নিতে হবে কিনা, রেতের বেলা মাংশ-পরোটা খাবা নাকি হিলসাফিশের পেটির সনে ডেলিক্যাসি খিচুড়ি ইত্যাদি। সংবাদপত্রে এর বিবরণও ছাপা হবে সর্বত্র সমান — কোথায় কোন রাস্তা বা কালভার্ট তলিয়ে গিয়েছে অথবা নগরের পয়ঃনিষ্কাশন কতটা নাজুক ইত্যাদি বিষয়ে। অন্যপিঠে একই সময়ে একজন যখন বৃষ্টি উপজীব্য করে কবিতা লিখছে, তার ধৃত বাস্তবতা/বাস্তব সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি নিয়ে আসছে। সে হয়তো ভাড়াবাড়ির জানালা থেকে লহমায় চলে যাচ্ছে উজ্জয়িনীপুরে, রেসিস্ট নরেন্দ্রমোদিকিংডোম্ কিংবা ওবামাজামানা ছেড়ে কালিদাসকালে! যক্ষের জায়গায় সে হয়তো তার খতরনক বাড়িওয়ালাকে বসিয়ে লিখে চলেছে লাইনের পর লাইন। বৃষ্টির শব্দকে তার কাছে মনে হচ্ছে পিয়ানোঝঙ্কার, আর ফোঁটাগুলোকে ভাবছে তার প্রেমিকার গালে-ফোটা টোল! তো, একপক্ষে বিবরণধর্মী বর্ণনা বা ব্যক্তকরণ, অন্যপক্ষে তুলনা-উৎপ্রেক্ষার সহায়তায় ব্যক্তকরণের বাইরে যেয়ে সঙ্কেতায়ন/চিত্রকল্পায়ন। আর আরেকটা ব্যাপার এখানে ঘটল : স্থানান্তরণ। ভাড়াবাড়ি থেকে অন্য কোথা অন্য কোনোখানে উড্ডয়ন, তেমনি বাহ্যবাস্তব থেকে উত্তরণ — যাকে আমরা চট করে অবাস্তব বলে বসি, বলে বসি আকাশকুসুম কল্পনা।

৭.

‘তোমার যাহা বলিবার প্রয়োজন, রচনায় তাহা যদি প্রকাশ করিতে না পারিলে, তবে রচনা বৃথা হইল।’ উদ্ধৃতিচিহ্নিত বাক্যটির বক্তা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বলেছিলেন রচনার শিল্পগুণ বিষয়ক একটি প্রবন্ধে, সবাই জানেন। প্রবন্ধটি প্রাসঙ্গিক এখনো, এতকাল পরেও, বিশেষত রচনার অর্থব্যক্তি ও প্রাঞ্জলতা বিষয়ে উদাহরণ-সহকারে প্রদত্ত তাঁর বক্তব্য নতুন-লিখতে-আসা লেখকদের জন্য উপকারী নিঃসন্দেহে। কিন্তু, চয়নকৃত বঙ্কিমবক্তব্য নিয়ে একটা আপত্তি এখানে তোলা আবশ্যক। বক্তব্য ঠিকঠাক যুক্তি-ব্যাখ্যা-ভাষ্য দিয়ে বুঝাতে ব্যর্থ হলে বা সুপরিস্ফুট করতে না-পারলে রচনাই বৃথা, আলবৎ, কথাটা গদ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কবিতার বেলায় এইটা খাটে না। বলবার প্রয়োজন থেকে কি কবিতা লিখিত হয় সবসময়? বেশিরভাগ সময় এ-সওয়ালের জওয়াব : না। blue20streets20rain20men20sad20digital20art20artwork20umbrellas201920x120020wallpaper_www-wall321-com_151হ্যাঁ, কখনো-কখনো বক্তব্য প্রকাশের বাহন হতে পারে কবিতা। অধিকাংশ সময় কবিতা রচিত হয় সুরের প্রেরণা থেকে, অথবা প্রেরণার সুর থেকে, এমনকি বোধ/অনুভবরাশি নিছক বক্তব্যখপ্পর থেকে বের করে নেবার প্রয়োজনে। একটা ব্যাখ্যাতীত সুরের রেশ একজন অনুভূতিপ্রবণ মানুষকে উদাস করে যেমন, করে খেয়ালের স্বপ্নচারী, তেমনি উদ্যোগী করে সুরটি ধরে রাখার প্ররোচনায়। যে গাইতে জানে, সে কাজটি করে একভাবে; যে গাইতে জানে না, সে করে আর-ভাবে। সুর কি প্রয়োজন-উদ্ভূত? একজন কবি কখনোই জানেন না তিনি কখন কোথায় কিভাবে লিখবেন কবিতা, কিংবা লিখে ফেলবার পর কেমন হবে সেইটা। কবিতাটা আদৌ দাঁড়াবে কি না, শেষ যতি দেয়ার আগ পর্যন্ত ঘুণাক্ষরেও জানেন না তিনি। ফলে, ব্যতিক্রম বাদে বস্তুত, কবি লিখতে বসেন তাড়না থেকে। লিখনবৈঠক থেকে উঠে ফের নতুনতর আরেকটা তাড়নার পেছনে ছুটতে হয় বেচারাকে। কবিদের কেউ-কেউ আপাত সালিশে উন্মাদ ও অসামাজিক সাব্যস্ত হন এই কারণেই। আর গদ্যকার বসেন আঁটঘাট বেঁধে, পূর্বস্থিরীকৃত সিদ্ধান্ত প্রমাণ করতে।

৮.

‘প্রাঞ্জলতা রচনার বড় গুণ। তুমি যাহা লিখিবে, লোকে পড়িবামাত্র যেন তাহা বুঝিতে পারে। যাহা লিখিলে, লোকে যদি তাহা বুঝিতে না পারিল, তবে লেখা বৃথা…।’ এ-বক্তব্যও সর্বাংশে প্রযোজ্য নয়, বাবু বঙ্কিম হোন-না যতই নমস্য, অন্তত সব লেখকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বাহুল্য হলেও বলা আমাদিগের কর্তব্য। রচনার বড় গুণ প্রাঞ্জলতা, এ-বিষয়ে দুনিয়ার কারো কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না এবং আপনার-আমারও নাই। কিন্তু প্রাঞ্জলতামাপক মানদণ্ড কই? একের কাছে যা প্রাঞ্জল, অন্যে কহিতেছে তাহা হায়ারোগ্লিফিক্স; তবে? ধরা যাক জেমস্ জয়েসের ‘ইউলিসিস্’ কিংবা ‘ফিনেগান্স্ ওয়েক্’, ইংরেজিশিক্ষিত পণ্ডিতবর্গ এমনকি জন্ম-ইংলিশ সাহিত্যিক-শিল্পীরা দ্বিধাবিভক্ত এ-দুই উপন্যাসের পাঠোদ্ঘাটনসম্ভব সারবস্তু বিষয়ে। আবার একটা বড় অংশ, যারা বিশ্ববিদ্বৎসমাজে বরণীয়, মনে করেন ওই দুই উপন্যাসের শিল্পমান তর্কাতীত উচ্চস্তরীয়। এখানকার না-হলেও মোটামুটি বাংলা ভাষাস্থ কমলকুমার মজুমদার, সুবিমল মিশ্র, উদয়ন ঘোষ … এদের কথা বলা যায়। এরা আপনাকে হয়তো কম্যুনিকেইট করেন না, আপনি-আমি এদের মধ্যে হয়তো-বা প্রাঞ্জলতার ছিঁটেফোঁটাও দেখি না, কিন্তু এরা তা করছেন রচনাকে শিল্পমণ্ডিত করবার বিশেষ তাগিদ থেকে সচেতনেই। ঠিক বঙ্কিমোক্ত ধরনে এত সরলরৈখিক নয় প্রাঞ্জলতার ব্যাপারটা। আর লোকে বুঝতে পারবে কি পারবে না, এটাও নির্ণয় করে ওঠা সম্ভব হয় না আগেভাগে। দেখা গেল, লোকে বুঝতেছে ভালোই এবং বাহবাও কুড়াচ্ছেন লেখক কিন্তু লেখার বারোটা বেজেছে বা সাহিত্যরচনার জাতও হয় নাই মনে করছেন আরেকদল লোক। এমনটা হতে পারে, হয়। লোকে যে কথা বলে, সব লোকের কথা বলার ধরন তথা কথনভঙ্গি বুঝি অভিন্ন? যদি না হয়, তবে প্রাঞ্জলতার ব্যাপারটা এভাবে যুক্তি হিশেবে দাঁড়াতে পারে না। যে লোক জন্মগতভাবে কথা বলতে অক্ষম, অর্থাৎ বোবা, সে কী কম্যুনিকেইট করে না? সে-ও তো বক্তব্য রাখে বিশেষ কায়দায়। হয়তো তার বলনভঙ্গিমা সাধারণ বলিয়েদের থেকে ভিন্ন, কিন্তু বলতে তো সে পারে, নাকি? বলে সে ইশারাভাষায়। বোবা যখন বলে, ভালো-মন্দ যা-ই হোক, বুঝাইতেও পারে। কিছু লোক বিরক্ত হয়, আগ্রহ হারিয়ে বেশিরভাগ লোক অন্য/অর্ধমনস্ক হয়ে পড়ে, কিন্তু যারা বোবা তারা তো ঠিকই বোবাকে হৃদয়ঙ্গম করে! এখন এই বোবার প্রাঞ্জলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কী সমীচীন হবে? নিশ্চয়ই না। বোবারও রয়েছে প্রাঞ্জল প্রকাশভঙ্গি অন্য বোবার কাছে, কিংবা বোবা-সমব্যথী দ্বিতীয়/তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কাছে। আর ভুবন জুড়ে বোবা অথবা বোবাব্যথী মানুষের সংখ্যাও তো কম নয়। তারা ঠিকই বোবার ভাষাটাকে সংযোগের ক্ষেত্রে সমস্যা মনে করে না। তাছাড়া সবাই কী আর ঝরঝরে-তরতরে গোছানোগাছানো কথা বলে? কেউ বলে হড়বড়িয়ে, কেউ থেমে-থেমে, কেউ তোৎলায়, কেউ-বা ঘুরিয়েপেঁচিয়ে, কেউ বলে কম-কথায় অনেক ব্যঞ্জনাবাহী স্মরণার্হ সাধু বাক্যাবলি। এরা সকলেই সমান প্রাঞ্জল নন, কিন্তু প্রাঞ্জল কী নন তারা যার-যার প্রত্যেকের বলয়ে? শ্রোতা সকলেই কী তরতরানো-হড়বড়ানো পছন্দ করেন? কিংবা থেমে-থেমে দুলকি চালে কথা বলা পছন্দ করেন না একজনও? কেউ তো আছেন এমন, যিনি খুব ভদ্রতাবান্ধব ভাষা সহ্যই করতে পারেন না। অতএব, প্রাঞ্জলতার প্রশ্ন শেষমেশ অমীমাংসিত রয়ে যায়।

৯.

সন্ধি ও সমাসবদ্ধ নতুন নতুন শব্দ নির্মাণ সাম্প্রতিক বাংলাদেশের কবিতার সাধারণদৃশ্য আরেকটি প্রবণতা। ব্যাপারটা যে আহ্লাদের, এতে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু একটা খটকা — না, একটা নয়, আদতে একাধিক ও অনেক খটকা — থাকিয়াই যায়। ব্যাকরণগত বিচারে কেলাসিত ওই শব্দাবলি সিদ্ধ না অসিদ্ধ, সেই প্রশ্ন ছেড়ে দিলেও বেশিরভাগ নির্মিত শব্দের সারশূন্যতা নিয়মিত-কবিতা-পোড়ো যে-কেউ বুঝে ফেলতে পারেন। আর কেবল শব্দনির্মাণই হচ্ছে বলে যদি মনে হয় কবিতা পড়তে যেয়ে, তবে তো মুশকিল। চমক আর চটকেই যদি শব্দের শক্তি ফুরায়, তবে আর কিছু বলার থাকে না। দেখা যাবে, এখন/এখানকার গড়পরতা কবিতা-পদবাচ্য বস্তুগুলোতে কেবল শব্দের বিন্যাস-সমাবেশ। শব্দের কম্বিন্যাশন্ অ্যান্ড পারমিউটেশনই তবে কবিতা? তা-ই তো দেখছি এখন। কবিতার এখন-তখন নিয়ে, ব্র্যাকেটে বলিয়া রাখি, এই টোনে কথাবলাবলি বিপজ্জনকও। তো, প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, নব্বইয়ের কবিতা নিয়ে কথা বলতে যেয়ে কেউ-একজন চমৎকার একটা রিমার্ক করেছিলেন : ‘শব্দব্যায়াম’। ওই একটি শব্দে পুরো ওই সময়ের কাব্যপ্রবণতাটা কেমন ছিল স্পষ্ট ধরা যায়। দু-তিন উজ্জ্বল ব্যতিক্রম এখানে গণনায় না-নিয়ে আমাদের কথা চালাতে হচ্ছে। আজ, এতদিন বাদে, পরিস্থিতি যখন অনেকটাই থিতিয়ে এসেছে, নব্বইয়ের নিরাকার সেইসব উজ্জ্বলতর সম্ভাবনাভাণ্ড কবিরা মোটামুটি একটা আকার পাচ্ছেন সচেতন পাঠকের সামনে। কিন্তু ওই রোগ, ওই খাসলত, ওই শব্দব্যায়ামের ব্যামো কথিত প্রথম/শূন্য দশকেরও সনাক্তিযোগ্য লক্ষণ। কবিতার পাতা মেলে ধরলেই চোখে পড়ে ওই শব্দজব্দ কসরতের ব্যাধি, মোটেও যা স্বাস্থ্যস্বস্তিকর নয়। হাঁসজারু ও বকচ্ছপদের প্রেজেন্স এবং উহাদিগের সনে দেখাসাক্ষাৎ সুকুমারের চিড়িয়াখানায় যেটুকু পরানবৈচিত্র্যপ্রচুরতা নিয়া হাজির, বাংলাদেশজ নক্ষত্রচিহ্নিত কবিতাসার্কিটে সেই হিয়াহ্লাদিনী ডিকশনের সিকিভাগও যদি মিলিত!

১০.

সুন্দর কবিতা লেখার চেয়ে অনেক বেশি সম্মানের বরং একটি জরুরি কবিতা লেখা, একটি প্রয়োজনীয় কবিতা লেখা — বলছিলেন একজন। শুনেই আমার খট করে কানে লাগল। ‘সুন্দর কবিতা’, ‘প্রয়োজনীয় কবিতা’, ‘জরুরি কবিতা’ ইত্যাদি ঠিক কেমন ধরনের জিনিশ, ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না। আপত্তিকর ওই বক্তব্যাংশটি নিয়ে পরে তেনার সঙ্গে দু-চার বাক্য ব্যয় করে বুঝে নিতে চাইছিলাম তিনি ঠিক কী বুঝাইতে চাইছেন। তিনি বেশ বিস্তারে বুঝিয়েই বললেন যে, কবিতা সুন্দর হয়ে উঠতে পারলে তার আপত্তির কিছু নেই; তবে কবিতাকে সুন্দর করে তোলার কসরত না-করে বরং জরুরি করে তোলা দরকার, প্রয়োজনীয় করে তোলা দরকার; জরুরি ও প্রয়োজনীয় ভাঙচুরগুলো কবিতার শরীরে ঘটিয়ে যাওয়া এ-মুহূর্তে কবিদের অবশ্যকরণীয় হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। একজন ব্যক্তি-আমি হয়তো তাতে সমকালে সম্পন্ন-সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারব না, তা না হই, ভাবিদিনের কবিতা ও সর্বাংশে বাংলাসাহিত্য তাতে দিশা পেতে পারে; এবং এরই সঙ্গে তিনি আরও যোগ করেন যে, স্রেফ সৌন্দর্যস্ফুটন ও রূপচর্চার দিন কবিতায় আর-কোনোদিনই ফিরবে না বলেই মনে হয়। অ্যানিওয়ে। এই কথাটুকু কূটতর্কবিনে মেনে নিতে কারোরই কষ্ট হবার কথা নয়। কিন্তু সমস্তকিছু বোঝাবুঝির পরেও তবু যেন জোর করে ‘জরুরি কবিতা’ ইত্যাদি লেখার ইশতেহারে সই দিতে মন সায় দেয় না। আর জরুরি কখন ও কীভাবে এবং কোথায় ও কেন, এই হিসাবকিতাবগুলোও গৌণ নয়, জিজ্ঞাসা আসতেই পারে। ইত্যাকার জিজ্ঞাসার তো কোনো রেডি-অ্যান্সার নেই, নানান মুনির নানান অপিনিয়ন্ কেবল।

graffitialphabet003অধিকন্তু ন-দোষায়, এই সুযোগে এইক্ষেত্রে আরও একটা অপিনিয়ন্ যুক্ত হউক এইখানে। যা ও যেভাবে ও যখন ও যতটা বলতে চাইছে কবির মন, তা-ই জরুরি কবির কাছে; উড়ে-এসে-জুড়ে-বসা বা জোর-করে-ডেকে-আনা ভুঁইফোঁড় ভাঙচুর নয়। অবশ্য এটাও ঠিক যে, কখনো-কখনো এমন সময় আসে যখন জোর করেই ভাঙচুরটা করতে হয়। চারপাশে সকলে যখন একযোগে প্রথানুবর্তী পদ রচে চলে, জোর করেই তখন ভাঙচুরকর্ম সাধন করতে হয় বৈকি। অন্যদিকে এটাও সত্যি যে, সবাই যখন খেয়ে-না-খেয়ে এবং বেহদ্দ বুঝে-না-বুঝে ভাঙচুরের নামে ব্যাঙলাফ দিয়ে-দিয়ে অস্থির করে তোলে মর্ত্য ও পাতাল ও অন্তরীক্ষ সমুদয়, তখন একজন স্থিতধী কবি চাইবেন কথিত ভাঙননাচন থেকে সম্পূর্ণ ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে স্বাভাবিকতায় ফিরে যেতে। ভাঙচূর্ণন কিংবা স্থিতপ্রজ্ঞ বুদ্ধের উপবেশন, কোনোটাই মিথ্যে নয়। কেবল প্রেক্ষাপটপরিস্থিতি বুঝে এগোতে হয়। তাহলে এখন, এই মুহূর্তে, এটা কি ভাঙচুরের সময়? নাকি অনেক হয়েছে ভাঙচুরের নামে ধস্তাধস্তি, সাফল্যও এসেছে বেশ বিগত নিরীক্ষার দিনগুলোতে, এবার তবে পেসিফিস্ট স্বাভাবিকতায় পদ রচনার দিন? সিদ্ধান্ত নেবেন কবি নিজে, খেলায় খেলোয়াড় থেকে ধরে রেফারি ও লাইন্সম্যান্ সমস্ত ভূমিকাতেই তিনি নিবেদিত সম্মিলিতভাবে একলার প্রয়াসে, এইখানে আমাদের কিছুই বলার নাই।

১১.

কবিতার ভেতরে নানা প্রকারের ট্যুইস্ট করা আর কবিতায় ডেভিলিশ্ এ্যলিমেন্টস্ ঢোকানোর খুব চল্ আজকাল। অন্তত এখানকার বাংলা কবিতার তরুণ কবিরা এ-রকমই বলে ও করে থাকেন আকছার। এগুলো না-করলে নাকি কবিতা ভদ্রলোকী খোলসে ঢেকে থাকে, যা খুবই ন্যাক্কারজনক। হ্যাঁ, ভদ্রলোকী খোলস নিন্দনীয় তো বটেই। কিন্তু দিনের শেষে সবকিছুর মধ্যেই তো একটা সম্পূর্ণতা-স্বাভাবিকতা থাকতে হবে। স্বাভাবিক সেই সম্পূর্ণতাটুকু কোথায় তবে? ভবে এখন ভাষা নিয়া খালি বোলচাল আর বেহুদা প্যাঁচাল, সুর-সরগম সাধার গরজ কোথাও নাই। ভাষা নাকি কাস্তে-হাতুড়ি দিয়া গায়ে খেটে বানাতে হয়, শুনতে পাই। ভাষার বিকাশে শুনি উত্তমাশা অন্তরীপে গিয়া বিবিধ মুখব্যাদান ও অন্যান্য অঙ্গভঙ্গি শিখিয়া আসতে হয়! আমরা ভাই বুঝিশুঝি কম, ভাষাব্যাপারে উম্মি একদম। জানি কেবল কবিতা লিখতে-লিখতে যে ভাষা তৈরি হবে, সেই ভাষা আমি চাই। কিন্তু ভাষা লিখতে-লিখতে যে কবিতা তৈরি করবে তুমি, তার আমার দরকার নাই। প্রায় সবাই আজকাল ভাষা লেখে, কবিতা লেখে কই? কবিতা লিখতে লেগে তারা কেন অত ভাষাবিপ্লবী হয়ে ওঠে, রহস্য বটে! হওয়ার কথা কবিতাবিপ্লবী, হয় ভাষার বাজখাঁই বুদ্ধিবিভ্রান্ত বাকোয়াজ। ভারি চিন্তার বিষয়! এই বিমারের চিকিচ্ছে যে করবে, সে (এক/বহুবচনবাচ্য সর্বনাম) নিশ্চয় শানাচ্ছে নিজের বদ্যিবিদ্যে অলক্ষে বসে। যেন তা-ই হয়, কৃপাসিন্ধুদয়াময়, তা-ই যেন হয়। আজ্ঞে। তথাস্তু।

১২.

বঙ্গীয় কবিদের হাতে যথেচ্ছ বদমায়েশির লাইসেন্স দিয়ে গিয়েছেন জীবনানন্দ দাশ। কেনই-বা তিনি কবিতার সংজ্ঞা খুঁজতে গেলেন, আর কেনই-বা সংজ্ঞা না-দিয়ে কবিতার রকমভেদ সম্পর্কে বললেন তাঁর ঋষিসুলভ সর্বংসহা সেই বহুলোচ্চারিত কথাটি : কবিতা অনেক রকম! সত্যি কি কবিতার অত রকমসকম, প্রকরণবৈচিত্র্যের অস্তিত্ব ও অত্যাবশ্যকতা স্বীকার যেয়েও, রঙ-ঢঙ-রেলা বর্তমান? কবিতার সংজ্ঞাবাদীরাই তো বলেন, কবিতা বস্তুত অমীমাংসিত ও অধরা এক রহস্যের নাম! তাহলে রহস্য যদি, মর্মে তো এত ভিন্নতা থাকবার কথা না। রহস্যের আবার রকমফের কী গো! রহস্য তো অশরীরী, যদিও রহস্য সংঘটিত হয় নানান ঘটনা আর তার পাত্রপাত্রী-স্থান-কাল প্রভৃতির শরীর ধরে, রহস্য তো অনুভবগত ব্যাপার। অনুভবের তবে রকমসকম রয়েছে? নিশ্চয় রয়েছে। তবে তো কবিতার রকমসকম থাকবেই। তা যত-যা বলেন আপনি, দুনিয়ার প্রাচীন বয়স থেকে এতাবধি যে-সমস্ত কবিতা আপনার ভালো লাগে বলে আপনি প্রায়শ বিবৃতি দেন, লক্ষ করে দেখবেন যে তাদের মধ্যে মিল/সাদৃশ্য কী ভীষণ! যেটুকু মিল আপনি পাবেন ওই ‘হাজার বছর ধরে’ নানান স্তরে বেঁচেবত্তে-থাকা কবিতাগুলোর মধ্যে, সেই অভিন্ন বস্তুটুকুর নামই কবিতা। মর্মত কবিতা আমি ওইভাবে দেখি বলেই ‘অনেক রকম’ শব্দজোড়ের প্রশ্রয়ে যথেচ্ছাচারের বিরোধিতা না-করলেও অনুমানে ভর দিয়া আলাপবিস্তারের চেষ্টা করি এবং পৌঁছাতে চাই বিবৃত রকমসকমগুলোর যুগপৎ সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের সীমান্তরেখায়। শাঁস ও মূল বিবেচনায় কবিতা থেকে কবিতায় বিশেষ ফারাক বা রকমভেদ নাই বলেই ধারণা আমার। শরীর ভিন্ন হতে পারে, রেলা হাজারও হতে পারে, শাঁস অভিন্ন। কবিতা তো শরীর নয়, শাঁস। অবশ্য, বেচারা জীবনানন্দেরে দোষ দিয়া লাভ নাই। যে-দেশে পিঁপড়েরও পাখা গজায়, সব শালাই কবি হতে চায় যেইখানে, জীবনানন্দ যদি ওইভাবে ‘কবিতা অনেক রকম’ না-বলতেন তবে ট্রামচাপা না-পড়ে তাঁর মৃত্যু হতো তৎকালীন কবিবংশের আক্রমণচাপায়। কুচ্ছিরি কবিতা-করিয়ে বন্ধুদের আক্রোশের তলায় পিষ্ট হয়ে ভবলীলা সাঙ্গ হতো বেচারার। কেননা কোনো কবিকে তার কবিতার খামতি বিষয়ে সততার সঙ্গে সরাসরি কিছু বলতে গেলে, তা সে যত গোবেচারা নেচারের বর্ণপরিচয়মূর্খ কবি-লিখিয়ে হোক না কেন, বক্তাকে হজম করতেই হবে ওই প্রত্যাখ্যাত কবির কিল-চড়-চপেটাঘাত। এই দেশ এতটাই সমালোচনাবিমুখ আত্মমুগ্ধ কবিদের দেশ। ও হ্যাঁ, এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, জীবনানন্দ তার ওই ‘কবিতার কথা’ প্রবন্ধে ‘অনেক রকম’ কবিতার পক্ষে বলতে যেয়ে জরুরি জ্ঞাতব্য অনেক কথাই বলেছেন বিশদে। বলেছেন কবিতার অভ্যন্তরভাগের মর্ম-ছায়া-ছবি-গান, ইতিহাসচেতনা ও কালজ্ঞান, অস্থি-রক্ত-মজ্জার কথা যথাসাধ্য সদৃষ্টান্ত। এখন পরের কবিরা এসে এই কথাটাকে যদি বদমায়েশির ছাড়পত্রপঙক্তি ভেবে ধেই-ধেই নাচতে শুরু করেন, যদি কাগের-ঠ্যাং লিখে ভান করেন এমন যেন লিখেছেন ডোরাকাটা বাঘের তলপেট, নটেগাছটিকে তবে এখানেই মুড়ে নেয়া ভালো। আর-যা-ই-হোক, কবি কখনো আরেক অকবির আশ্রয়দাতা হতে পারেন না। আর শবদে-শবদে নিকাহ্ রেজিস্ট্রি করতে বসে এহেন কবি-অকবি দ্বৈরথ মাথায় চেপে বসলেই কবিতার দফারফা। প্রাগুক্ত সুমুন্দি-শ্যালক লইয়া গালিগালাজপূর্ণ রচনা পার্পাস্ সার্ভ করে নিশ্চয়, শ্যালকশাসানো খোলামেলা কাব্যিপনারও দরকার হয় হিস্টোরিক্যাল্ হায়েনা বা পানিঢোঁড়া তাড়ানোর তাগিদেই, কিন্তু কবিতার দাবি ও আওতা পার্পাস্ সার্ভিসের বাইরেই বিরাজ করে সবসময়।

————

12165848_10207825223979133_1177776206_n
জাহেদ আহমদ( কবি, গদ্যকার, অনুবাদক)

Advertisements