দ্বিধাবচনে কবি রফিক আজাদের জন্যে শোক :: শামসেত তাবরেজী

rafiq-azadসেই এক পুরানা জমানায়, আমাদের তখন দ্বিতীয়ার চাঁদের মত গোঁফ উঠছিল, রফিক আজাদ ছিলেন তখন কালের একজন স্টার। স্টার মানে স্টার। সিনেমায় যেমন স্টার থাকেন। একালে কবিরা আপনদোষে প্রান্তিকতাপ্রাপ্ত হলে তারকারা গলে গিয়ে কালো লিকালের চায়ে থিতু হতে থাকে আর কবিরা ট্রেড ইউনিয়নের মত আচরণ শুরু করে। তখনও কবিতার খুন ভুলভ্রান্তিসহ তাজা। সেই সময়, একদিন আমরা জেলখানা রোড ধরে নিরুদ্দেশের দিকে হাঁটতে বেরোই আর তাঁর ‘অসম্ভবের পায়ে’ দাঁড়ানো জীবন-যাপনের গল্প করি। অগোচরে বন্ধুরা সবাই যার-যার মত কামনা করি, যেন এই জীবন আমাদেরও দেহসুদ্ধ উপড়ে ফেলে। তখন আমাদের সেই বয়স যখন আমরা গোপনে শরীর এবং দেহের অর্থ আলাদা করতে শিখছি। আমরা রফিক আজাদের সেই সুমহান দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। কিন্তু দরজা খুলতে ব্যর্থ হই। আমাদের হাতের আঙুল থেকে রক্ত ঝরে। কব্জি ছড়ে যায়।


তারও অনেক অনেক আগে বাংলাদেশ মুক্তির লড়াইয়ে বুক পেতে দিলে আগস্টের এক মধ্যরাতে আমার সেজভাই যুদ্ধময়দান থেকে লুকিয়ে আম্মাকে দেখতে আসেন। তার কাছেই প্রথম শুনি কবি রফিক আজাদের কথা। তিনিও যুদ্ধে। সেজভাই ‘হেই পাহাড়ে’ কাদেরিয়া বাহিনীর হয়ে কবির সঙ্গে ‘রণাঙ্গন’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করছেন, আর মাঝে-মাঝে অতর্কিত শহরে এসে কি কালভার্ট, কি ব্রিজ, কি পাওয়ার স্টেশনে বোমা মেরে পালিয়ে যাচ্ছেন।

তবু, আমাদের জাতীয় রণাঙ্গনের গল্প কেন যেন দ্রুত ফুরিয়ে যায়! কান না পেতেই শুনতে পাই দেশের শিরা ও ধমনীর ভিতর রক্তের ঢেউ ক্রমে নিস্তেজ হয়ে আসছে। মায়ের শরীর ফুঁড়ে বেরোনো মুক্তিরা ডাকাত হয়ে যাচ্ছে। সেজভাই মাথা নীচু করে আব্বাকে বললেন, অসমাপ্ত লড়াইয়ে মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিলে ডাকাতই তো হবে। সেই এক ক্ষুব্ধ, কিন্তু চাপা ভয়ের দিনে বাড়িতে এল রফিক আজাদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অসম্ভবের পায়ে’। নামেই মধ্যেই যার অহংকার ‘আধুনিকতা’ মোড়ানো। এই বইয়ের দ্রোহ ও প্রেমের মিশেল উচ্চারণ আমাকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে ফেলে। তারপর ধীরে-ধীরে অথবা আচমকাই আমরা বড় হয়ে উঠতে থাকি। যুদ্ধের সময়ে লুণ্ঠিত কোন লাইব্রেরির বেওয়ারিশ হয়ে যাওয়া সুধীন দত্তের কাব্যসমগ্র হতাশাবিদ্ধ সেজভাইয়ের হাত থেকে আমাদের অপ্রপাপ্তবয়স্ক হাতে উঠে আসে। সুধীন দত্তের কবিতা থেকে আমার মনে কবিতা সম্পর্কে দ্বিতীয় ধারণা জন্মাতে শুরু করে। এবং কবুল করতে বাধা নাই যে, সুধীন দত্তের আধুনিকবাদ, রবীন্দ্রকেন্দ্রিকমুখিন বিকেন্দ্রিকতা আর ততদিনে পেয়ে যাওয়া শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ ও অন্যান্য কবিদের কবিতা আমাকে বিচিত্র ধন্দে ফেলে দ্যায়। পথে নেমে পথ হারিয়ে ফেলি। একসময় শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ নিয়ে ধন্দ কিছুটা কাটলেও পরবর্তী ষাট খোঁচাতেই থাকে। অবশেষে, অনেকদিন পর আবিষ্কার করি, স্বয়ং আধুনিকবাদের মধ্যেই রয়ে গেছে বিশেষ একটি ভূত। এই ভূতের আরেক নাম উপনিবেশবাদ, যা আমাদের ভাষাকে প্রায় লোকাভিগ করে তুলেছে। তার রাজনৈতিক অপচেষ্টা এখনও শেষ হয় নাই। বাংলাদেশের সংবিধানের ভাষা এবং ত্রিবিধ শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়।

ফলে, যে ষাট দশককে আমরা মুক্তির দশক বলে জানি, বাংলাদেশে, আশিতে এসে তা আমাদের পুনরায় মুক্তি বিষয়ে নতুন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দ্যায়। শুধু তাই নয়। আমরা প্রশ্ন তুলি আমাদের স্বাধীনতা কেন বেহাত হয়ে গেল। কমুনিস্ট পার্টিগুলি কাঠের গুড়ার মত বাতাসে উড়ছে। বিশ্বপুঁজির নতুন ব্যবস্থা আমাদের চোখের সামনে পুন-উপনিবেশের শর্ত তৈরি করতে থাকে। আমরা ব্যক্তিমালিকানাধীন টেলিভিশন, দৈনিক সংবাদপত্রকে গণমাধ্যম বলে ডাকতে শিখে ফেলি। অথচ গণ ওরফে জনগণ নামমাত্র জনসংখ্যা হয়ে থাকে ডেভেলপমেন্টর অত্যাচারে। গণতন্ত্র একটা ভুষিমাল হিসাবে ফাসিস্টিক বলয়ের মধ্যে ঢুকে পড়তে শুরু করে। আর কবিকে দেখি আগের চেয়ে আরও ছায়া-ছায়া দেয়াল ঘেঁষে বাস ধরতে হেঁটে যাচ্ছেন। কেউ কেউ পাঁচজন পাঁচজন হয়ে নিজেরা নিজেদের ব্যক্তিগত নিশান কাঁধে জয়ধ্বনি করছেন। ক্রেস্টের ধাতব লাবণ্য জিব দিয়ে পরখ করে দেখছেন, ওতেও লবণের স্বাদ আছে, যেমন চোখের জলে থাকে, সমুদ্রের পানিতে থাকে!

6a6eaa725eb3be9e49dc6b58a6118037-1এর মধ্যে রফিক আজাদ তাঁর বেপরোয়া স্বাধীনতাবোধ নিয়ে ধীরে-ধীরে অসুস্থ হতে থাকেন। যে দামালতা একদা তাঁকে কবিতার ‘স্টার’ করে তুলেছিল, সেই তিনি কেমন নির্জন হতে থাকেন। মৃত্যুর খরাল জিব তাঁর কবিতা, প্রেম, দ্রোহ আরও-আরও কিতাবি টার্মসহ তাঁকে টেনে গিলে ফেললে আমরা জুকারবার্গের ফেসবুক-রিপাবলিকজুড়ে যে যেমন পারি অবিচুয়ারি লিখতে থাকি। আমরা আবার ভুলে যেতে থাকি আমাদের কোথাও কোন ভুল হচ্ছে কিনা। অথবা বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে বুজুর্গ উকিলদের মত অনুযায়ী এটাই হচ্ছে ‘শেষ সমাজ-ব্যবস্থা’। এমনকি চায়না কিচেনে ছোট্ট করে এ সংবাদও কানে আসে, আলহ্বাজ মন্ত্রি সাহেবের জাসদ আরও এক প্রস্ত টুকরা হল। এই অর্থহীন টুকরাত্ত্ব কারো কারো মনে সমগ্র এবং টুকরা নিয়ে আবার ভাবতে বাধ্য করে। লুকিয়ে লুকিয়ে ‘ভূঁইয়া’ ভাইয়ের কাছ থেকে গ্রিকদের এই বিষয়ক বই ধার নিতে প্ররোচিত করে।

রফিক আজাদ ততক্ষণে মাটির পুত্তুলি হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার আয়োজনে নিঃসাড় হয়ে শুয়ে থাকেন একবার শহীদ মিনারে, একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গনে, হয়ত আরও কোথাও। দুরন্ত ষাটের প্রস্থান ঘটে, কিন্তু বাংলা কবিতার সুরাহা হয় না। দিকে-দিকে কবিতার বই প্রকাশিত হয়ে মহান প্রকাশকদের কল্যাণে আবার তা ধুলা ও ময়লার ভিতর সমাধিস্থ হয়ে যায়। তারও অনেকদিন পর আমরা আবারও হয়ত রফিক আজাদের কবিতা খুলে বসি। তখনও ন্যাংটা-চোখে দেখি, ‘অসম্ভবের পায়ে’ ভর করে আমাদের চুনিয়া-যাত্রার শুরু না শেষ- এই দ্বিধায় ঠোঁট কামড়াচ্ছি। করপোরেট-মোলায়েম হাত থেকে ক্রেস্ট নিচ্ছেন কোন আপাত-নিরীহ আত্মশ্লাঘাময় মিহি-কণ্ঠের কবি। অনেকটা বুরবুরি তোলার মত রফিক আজাদের ‘ইউটোপিয়া’ চুনিয়ার সমস্ত শালবন নিশ্চিহ্ন এবং দিকে-দিকে আকাশে দাঁত খিলালের মত খাড়া হয়ে আছে এডিবিকৃত প্রকল্প রাবারগাছের চূড়া। দুয়েকটি পুরোনো মুথাগুড়িতে বনভোজনে আসা শহরের ছেলেমেয়েদের বমির দাগ, কোথাও-বা একটু লিপস্টিক লেগে আছে। যেখানটায় নতুন বিদেশি উদ্ভিদের জঙ্গল উঠেছে, তার আবছায়ায় শুকিয়ে পড়ে আছে কনডম, কাঁচের চুড়ির ভাঙ্গা-টুকরা। চুনিয়া ধর্ষিত হল কি! এই নিয়ে কাউকে আতঙ্কিত হতেও দেখা গেল না। তবে চুনিয়া ইতিমধ্যে বিশ্বগ্রামের শর্ত-অনুযায়ী সর্বশান্ত হয়ে গেছে।

সেই সর্বশান্ততার ঘাস-ফাঁক গলে কেউ বলছে, রফিক আজাদ তৎসম শব্দের অতি-ব্যবহার করে কবিতাকে ক্লান্তিকর করে ফেলেছেন। আরেকজন চায়ের কাপের ডানা নাড়িয়ে বলে উঠলেন, কিন্তু তিনি টানা-গদ্যের নিরুদ্দিষ্ট অভিযানে নামেন নাই। আরও কথা ভেসে আসে- কেউবা চুল ঠিক করার হঠাৎ ক্ষিপ্রতায় জবাব দেন অন্যের, প্রেম আর দ্রোহ তো একই মর্মের দুইপ্রকাশ। আমরা কেন ‘পুজার ছলে’ ইনি-এই উনি-ঐ বলে ধর্মশালা বানিয়ে ফেলি? না, না, ধর্মশালা না। ধরমশালা, কেউ শুধরে কথা শেষ করেন, ওখানে তো বাংলাদেশের ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে। একটা স্ট্যাম্প উড়িয়ে নিলে কিম্বা ছয়ের বল সী..মা…না পেরিয়ে গেলে ধারাভাষ্য আরও উঁচুতে উঠে যান, কবি রফিক আজাদ তখন কবরের অন্ধকারেও চুনিয়ার স্বপ্ন দেখেন কিনা আমরা আর জানতে পারি না। আমরা মরো-মরো জীবিতেরা দেখি, বাংলা-কবিতা টানা গদ্যে দৌড়াচ্ছে, তার পিছে-পিছে বড়-ছোটর তর্কে-লিপ্ত বর্ণবাদী কবির দল। পাতি-ধনিকপ্রাণ সকল কবি-আত্মা দশক-দশক খবর খুঁড়ছে নিজেদের জন্য। আর ফেরনান্দ পেসোয়া অনুবাদিত হয়ে ক্লাউনের মত হাঁটছেন শাহবাগে, গণজাগরণ মঞ্চের ভীড় এড়িয়ে-এড়িয়ে।

…………………

চিত্রসমূহ:  গুগল আর্কাইভ

1491599_10202817537702184_349404972_n
।।শামসেত তাবরেজী ।কবি।।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s