967162_10151639880975865_483310329_o

তাবরেজী ভাইয়ের লগে আমার প্রথম দেখা ২০০৮ সালের মার্চ-এপ্রিলের কোন একদিন শাহবাগের বেগম সুফিয়া কামাল গণগ্রন্থাগারের ফুটপাতে। চারুকলার দিক থেকে উনি দৌঁড়ায়া আসতেছিলেন, হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি পইরা, আমি আর পিয়াস (মজিদ) ভাই যাইতেছিলাম মধুর ক্যান্টিনের দিকে।

পিয়াস ভাই আমার লগে টাকলা তাঁর পরিচয় করায়া দিলেন, তিনি একবার শুইনাই আমার নামখানি, কিছুদিন আগেই এক দৈনিকে প্রকাশিত আমার ছয়লাইনের এক কবিতার কথা তুললেন। আর এক কাঠি সরস হইয়া ছন্দের প্রশংসা করলে আমি বেশ বড়সড় ধাক্কা খাইলাম। এবং মনে হইলো, এই নাদানের দিনেও লোকে কবিতা পড়ে তাইলে!

সত্যি কথা হইলো, এই ঘটনার আগে আমার শামসেত তাবরেজীর কবিতা পড়া হয় নাই। এরপর যথাক্রমে ব্লগ ও গুগলগ্রুপে আমি উনার কথাবার্তা, কবিতা, আলাপচারিতা পড়ি এবং বইপত্র সংগ্রহ করি— উনার বইগুলোর নাম সবার আগে আমারে টাসকি খাওয়ায়া দিছিলো— বিশেষত, আম্রকাননে মাভৈ কলের গান, আবাগাবা, অবিরাম অরেঞ্জ, মুহূর্তমা ও  তক্তা— বই হাতে নিয়াই মনে হয় কবিতার বইয়ের নাম এমন হয় নাকি বাবা!

তো, আমি আশির দশকের যে কজনে মোটামুটি মুগ্ধতাসহ ডুইবা ছিলাম, তাদের সহিত তারে স্থান দিয়া, গুরুত্বপূর্ণ গোণা শুরু করি। এবং আমার মুগ্ধতা দিনদিন বাড়তেছে, ফেনাইয়া ফেনাইয়া।

তাবরেজী ভাই, কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজরে কন বাংলা কবিতার যুবরাজ— আমি তারে কই বাংলা কবিতার ডুবোরাজ। এ কনফেশনে আমার কোন ভয় ডর নাই যে, এরাই আমার মুগ্ধতার কেবলা।

সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ থাকেন বহুদূর প্রবাসে, ফেসবুকের ইনবক্স ছাড়া তো তার লগে আলাপের, যাপনের উপায় নাই, তাবরেজী ভাইয়ের লগে আমার প্রায়ই দেখা হয়, করি, কয়দিন দেখা না হইলে, আলাপ না হইলে মনে হয় জীবনে আমার কি জানি নাই। সে ঠিক আমি ঢাকাবাসী হইবার (২০১১) পর থেকেই। হয় কবিতা নিয়া, নিজেদের ভাবনা বিনিময়। তাবরেজী ভাই একটা কথা প্রায়ই কন— “‌পুরাতনের ব্যাখ্যার মধ্য দিয়াই নতুনের জন্ম হয়”। এই ভাবনায় আমারও আস্থা আছে। মাইকেলকে, বন্দে আলী মিঞাকে, জসীমউদ্দীনকে, নজরুলকে তাবরেজী ভাই বড় কবি মানেন, এই দেশকালের পারস্পেকটিভে, আমারও এই মতের প্রতি আছে আস্থা।

শামসেত তাবরেজীর কবিতায়ও তাঁর জবানের নতিজা পাওয়া যায়। তা তার টেক্সটে, শব্দব্যবহারে, খুনসুটিতে, স্লাইট রসিকতা ভরা টোনের বাকভঙ্গিতে প্রামাণ্য হিসেবে হাজির। তাবরেজী ভাইয়ের কবিতার সবচেয়ে বেশি জরুরী বিষয় যেইটা, উদ্ভট কল্পনাপ্রতিভার বাইরে ফ্রেশ রিয়েলিটিতে একটা স্মুথ এক্সেস উনার আছে। দুজনেষু’র একটা কবিতার উদাহরণ দেই। কবিতাটা আছে বইটার ৫১ নাম্বার পৃষ্ঠায়। নাম ‘ল্যাঙ্গোট মালিকদের জন্য’। এর পাঠ এমন—

গন্ধ বেরুচ্ছে গলে, সাবাস, সাবাস
আরও কিছুক্ষণ রাখ এই লাশ!

তন্দ্রা তন্দ্রা ওরে ছুটে যাচ্ছে ট্রেন
তুমি নিয়ে যাও এ গন্ধ, সামলাবেন

আপামণিগণ। উনারা উত্তম। আহা, মরে
বিপ্লব তিলে তিলে উনাদের দাম্ভিক অধরে,

সে সব তর্জমা করে আমরাও কিঞ্চিৎ বুঝি
লেজঝোলা পাখির বিলাপ, রুটিরুজি

ছাড়া আর কিছু নাই, সবের উপরে শব
উঁজিয়ে দুর্গন্ধ করতেছে মন্ত্রী প্রসব—

তার গন্ধ আরও তীব্র, তবু আছি টিকে
মসনদ উঠছে ভরে ল্যাঙ্গোট মালিকে!

 

এ যে এই দেশের স্পষ্ট বর্ণনা, তা মানবিক বোধসম্পন্ন সকলেই তো জানে। কিন্তু কে আর বলতে পারে এভাবে তাবরেজী ভাই ছাড়া। এবং দ্যাখেন, কবিতাটা পড়তে, নিজের কানে শুনতেও কি মজা। আমি তাবরেজী ভাইয়ের মতোই মনে করি কবিতা প্রথমে কানের, পরে অন্যকিছুর। কিন্তু আধুনিক-ফাদুনিক বলে বলে আমাদের যে কবিতার কবিতার কান কেটে নিচ্ছেন, যে কারণে লোকে এখন কবিতা শুনতে পায় না, তাদের বিরুদ্ধে তাবরেজী ভাইয়ের মোটামুটি বলা যায় বাংলা কবিতায় গত বিশবছরে একক সংগ্রাম। তার এ লড়াইয়ে আমি প্রেরণা পাই, নিজের কবিতা নিয়া নতুন ভাবনায় ব্রতী হইতে পারি।

তাবরেজী ভাইয়ের কবিতা বেশিরভাগই ছন্দে লেখা, বিবিধ ছন্দে। গদ্যেও তিনি ভয়ঙ্কর সুন্দর, সাবলীল। কবিতায় মুগ্ধ হয়ে থাকা লোকের পক্ষে ঠিক কবিতা বিচার সম্ভব না। আমিও কবিতা বিচারের পক্ষে না, ফর্ম, টেক্সট, আঙ্গিক এই সমস্ত বিষয় ধইরা। ভালোলাগার চেয়ে বড় দাঁড়িপাল্লাতো আর নাই। আমার খুব ভালোলাগা একটা কবিতা হইলো ২০১৫ তে প্রকাশিত অশ্রু মোবারক এর নামকবিতাটা। ঐটা শেয়ার করি—

তখন             আকাশ ভরা তারা
তখন             মিল-মিলান্তি জোস,
ঘেমেও           মিটছে না আক্রোশ
তখন             পাঁজির পাজহারা

কটি               পার্টি পালোয়ান
গলি               ঘেরাও দিয়ে আসে,
ওদের             গায়ে আলোয়ান
ওরা               জিব মাখিয়ে লাশে

গাহে              রবীন্দ্রসঙ্গীত,
ওদের            পুলিশ ভি কাতরায়
খেয়ে             চৌকো তেকোণ ইট,
ঝড়              পুরো মহল্লায়-

হঠাৎ             আকাশ হল ফাঁকা
নামল            কপিস অন্ধকার-
নামল            শিশু রক্তমাখা
চোখে            কান্না হতাশার-

আমরা          বিছান থেকে নামি
দেখি,            পাতাল গিয়ে স’রে
করছে            দেদার মাতলামি
আর              অশ্রু পড়ছে ঝ’রে

শিশুর            রক্তমাখা দেহে…

 

এই দৃশ্য আমাদের সবার দেখা, কিন্তু তথাকথিত আধুনিক ফাধুনিক কবিতায় এমন দৃশ্যের দেখা তো পাই না, অন্তরাত্মা কাঁপায়া দেয় যা। তাবরেজী ভাই তার পুরনো যুগের আধুনিকবাদ এবং সাহিত্যবাদী ভঙ্গি, গৌরবান্বিতের সাহিত্যচর্চা পাশে থুইয়া তুইলা আনতেছেন সমাজের প্রকাশ্য ও গোপন সংগ্রামগুলি। এসময়ের প্রত্যেক তরুণের জন্য, বৃদ্ধের জন্য— কি বলছি থুরি, আবালবৃদ্ধবণিতা মায় কবিতার পাঠকের জন্য তাবরেজী ভাইয়ের কবিতা অবশ্যপাঠ্য। যত বারুদ আছে তার কবিতায়, তা থেকে অনায়াসে যে কেউ ধার নিতে পারে, তাতে তার ঝাঁজ কণামাত্র কমে না। সর্বশেষ বইমেলায়ও সবার আগে আমি কিনেছি রওজা মোবারক। এই যে আমার তীর্থের কাকের মতোন অপেক্ষা তাবরেজী ভাইয়ের কবিতার জন্য, তা তার কবিতার গুণে, দোষে-গুণে মানুষ তাবরেজীর গুণে না।

তাবরেজী ভাইয়ের সাথে আমার অবাধ মেলামেশার কারণেই তাঁর হৃদয়ের অনেক কথা, অনেক অপ্রাপ্তির কথা, যুগপৎ অনেক বঞ্চণা এবং আনন্দের কথা আমি জানি। যেমন জানি তার মায়ের কাছেই কবিতার বায়াৎ পাইছিলেন তিনি। সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ ‘রওজার দিকে’র একটা কবিতা পড়ি আসেন— কবিতার শিরোনাম, আম্মা।

কে যাবিরে মায়ের কাছে
তুলে নিতে কৌম-কোলে,
আদ্যসভার বাদ্য বাজে
বাপের নামে সবাই ভোলে।

নির্বাপ কি সাপুড়েরা
ফণায় যারা আখর লেখে?
ভোটের বাকসো ঘিরে এরা
বলছে যা-তা হেঁকে হেঁকে।

তক্ষকের হরচালাকি—
মোক্ষ লভেন দুজন বাঁদী,
শরমে তাই চক্ষু ঢাকি
উদাম রয় সাধের চাঁদি!

মায়ের জন্য কেন নেশা,
পুনর-গর্ভী করব তাকে?
শিথিল হল অশ্বহ্রেষা
মউত হবে দুর্বিপাকে?

সকল পুঙ্গ মাঙ্গে মজা
চুঙ্গা ফোঁকে শহরজুড়ে,
মায়ের বন্ধ হয় দরোজা
রাত্রি নামে মাঝ-দুপুরে!

মায়ের মুলাকাত না হলে
কি করবি কালাম দিয়ে?
থাকিস তোরা ভোট মহলে
দুই দূয়োর মন ভজিয়ে!

এদের শুধু গুম্ফ নাই রে
ব্যাটাগিরিই এদের ভাষা,
সকালসন্ধ্যা তাইরে-নাইরে
আমায় নিয়ে তুলতামাসা।

মা গো আমায় আলিঙ্গণো
চুবাও রসের এক জবানে,
চাই না আর দোনোমোনো
আ মরি এই বাংলাগানে!

 

আমি প্রতিদিন তাবরেজী ভাইয়ের ট্যাগের জন্য অপেক্ষা করি ফেসবুকে। মাত্র পঞ্চান্ন আপনি তাবরেজী ভাই, হাফ সেঞ্চুরি এন্ড ফাইভ এন্ড নটআউট। সেঞ্চুরিটা আমার জনমেই আমি দেখতে চাই। শুভ জন্মদিন হে প্রিয় জানালা আমার, হে প্রিয় কবি। বসন্ত কাবাব ঘরের না, বসন্তে শিমুলের ফুল ছুঁয়ে আসা সমস্ত হাওয়া বইতে থাকুক আপনার জানালায়। আপনার অনুজ বন্ধুর প্রণাম লউন, আপনার আনন্দসঙ্গ যে আমি পাইলাম এই জীবনে এ আমার ব্যর্থ কাব্যপ্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

পাঁচই এপ্রিল, ২০১৬

 

শামসেত তাবরেজী-এর কয়েকটি  কবিতা:

নীল নদের তীরে

আয় দেখে যা না কোবাল্ট ব্লু-এর উচ্ছ্বাস
কোজাগরী এই রাত্রে,
একে অপরের দায় নিয়ে এক নিঃশ্বাস
বুভোয়াঁ এবং সার্ত্রে।

কোমলে রেখাবে মিশেছে যেখানে চুম্বন
অস্তিবাদের শর্তে,
নাকি বৃথা গেল যুক্তির এ-আলিঙ্গন
পশ্চিম খোড়া গর্তে।

পিঙ্গল ঢেউয়ে কখনো সাদার সংস্কার
কায়রো লভিল টংকা,
স্ফিংসের মাথা নু’য়ে আসে, ক্লিয়োপেত্রার
জাগল নতুন শংকা।

ওই কী মৃত্যু নীল উপচানো মিথ্যার
পিরামিড ঘেরা প্রস্তর?
চাঁদ গুলে গিয়ে পেল না তবুয়ো নিস্তার,
সূর্যও হল অবশেষে চির-অস্ত!

একই বৃন্তে

যে-গোপনে হয়েছি প্রকাশ
প্রকাশিয়া হয়েছি গোপন,
একই বৃন্তে দু’জনার বাস
ভাই আমি আর আমার বোন।

যে-ফাতিহা ফুঁসিয়া উঠেছে,
যে-ফাতিহা শিরায় শিরায়
নিরবধিকাল বহিতেছে
মরনিয়া মধুর ব্রীড়ায়,

যেই কাদা মাখিয়াছি দেহে,
যে-দেহের কাদায় সুঠাম
জেগে আছে তোমার ওই নাম
প্রেমময় আর সস্নেহে।

যে-বরষা কদমে মাতাল,
যে-কদমে জেগে ওঠে ভাষা,
সে-ভাষায় অধীর উড়াল,
আহ্লাদ এবং তামাসা!

যে-কবরে আমরা ঘুমাই
`যে-ঘুমের স্বপ্ন সবুজ
নিয়ে আসে স্বাদের মিঠাই
সে-মিঠাইয়ে আমাদের বুঝ

যে-পথের আমরা পথিক,
পায়ে যত ভ্রমনের দাগ,
তত মোরা হয়েছি রসিক
ছড়িয়েছি প্রণয় পরাগ।

যে-জবানে আমরা জীয়ল
` অমৃতের তালাশে আকুল,
গায়ে মাখি তা-ই অনুপল
` রহমের স্বভাবে অতুল।

যে-লালনে আমাদের লাল,
` যে-লালের আমরা নিশান
বুকে বীজমন্ত্রের ঢাল,
সেই লালে আমরা বিধান।

যে-গোপনে হয়েছি প্রকাশ,
যে-প্রকাশে হয়েছি গোপন,
নিত্য সেথা প্রণয়ের চাষ
একই বৃন্তে দুই ভাইবোন

সদা জেগে দিতেছি পাহারা
লীলা কীর্তনে হ’য়ে হারা।।

 

একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি!

একটি ফুলকে বাঁচাতে-বাঁচাতে আমরা কি স্মার্ট তেইশ মেরে দিলুম!
আমাদের বামহাত এখন ডানহাত থেকে চুরি করা শিখে গেছে
আমাদের আপন গুর্দা ফুঁসলায় খালাতো যকৃত
ঘরের ভিতরে বৃষ্টি ব্যক্তিগত নালা বেয়ে যায় ঐ যে বাহিরে
ফুলবনে নুন মেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে শহীদ মিনার
ভদ্র আর গোবেচারা উন্নয়ন-তারার ঝলকানিতে নিত্য-নিত্য ফোটে শিশুচোর
একটি ফুলকে বাঁচাতে গিয়ে মেরে ফেললুম সতেরো কোটিকে
কি স্মার্ট! স্মার্ত ও স্নাতক
আমরা ও আমাদের ছক

শিরি-ফরহাদ সংবাদ
(তনুর জন্যে)
অরোকেরিয়া বটে ও গাছের নাম।
স্বপন চিনিয়েছিল, তবে, না চিনলেও
এই গাছটিকে আমি ভালবাসতাম।
কারণ, কেননা- এই গাছ কেউ
                           বাসে নাই ভাল, একা গেছি বেসে
                           স্বপনকে না-বলে হেসে আর হেসে।
ইতিমধ্যে আমি আজ চিনির জাহাজ
স্বপনও হয়ত, অর্থোপেডিক্স
ডাক্তার বলে কি দরকার মেরাজ
এ বয়সে- আপনি নন ত্রিশ!
                           অরোকেরিয়া যেমন একা ময়দানে
                           জিকির করছে আকাশের শানে
আপনিও তাই করে বাকী কটা দিন
সেভাবে কাটান, কে বলেছে কাল
সুদিন আসবে? এ দেশ ‘গ্রামীণ’
লোগো মাত্র- নবতর চাল-
                            হাতে হাতে মেমাবাতি দিয়ে
                            কখন যে পালিয়ে যাবে স্বাধীনতা নিয়ে!
স্বপন- সে কালো মেয়ে মোর
ফেলে গেল ছায়া তার অরোকেরিয়ার,
চলে গেল ইশ্বরদি- কিম্ব যশোর?
-কর্মফল পড়ে র’নু সকল ক্রিয়ার!
                                উদ্ভিদ-বিদ্যা কাঁদে, পায়ে দলে ঘাস
                                জীবিতের কুলখানি- ছাব্বিশে মার্চ!
তনুও নাইরে- আছে সামরিক-সখা
ধর্ষণে, দর্শনে অরোকেরিয়ার
নাম মুছে বানিয়েছে মৃত্যুপত্যকা,
হিয়া বিনে জন্ম লয় আরেক এহিয়া!
                                স্বপন, স্বপন, দেখে যা না বেটাগিরি
                                ফরহাদের কাছে রেপড হয়ে গেল শিরি!

 

ছেঁউরিয়া সংবাদ

ক.
এত অন্ধকারে!

দুরত্ব থেকেও দুরে
শালবন ছাড়ানো আকাশের
অতি-রিক্ত নীল থেকে ছিটকে পড়েছে এই রাত

তারই এককোণে
ব্যথার মতন বসে আছো কেন?

ঘুম নাই তোমার?

প্রবল ঝাঁকুনি-খাওয়া ঐ পিঙ্গল পাহাড়
ঐ অনতিক্রম্য নদী
আলেক্সজান্ডারের ভারী বর্শা গাঁথেনি তোমাকে?

তাহলে এ রক্ত কার?

কার বাহুল্যের নিঃসঙ্গ অহংকার
গর্ভিনী উটের শ্লথ পদক্ষেপে
মহাকাশের মরুপথে এঁকে দিচ্ছে উম্মতের যাত্রাপথ?

ঘুম নাই তোমার?

দরবারের গম্ভীর সুরাপাত্রে
একটা সবুজ চাঁদ ডুবে গেলে
সান্ত্রিরা তুলে ছুড়ে দ্যায় তৃতীয় আকাশে
আর স্তন্য-বিকিরণময় এই রাজ্যে, এই রাষ্ট্রসভায়-

রাজা ঘুমিয়ে থাকেন ভরশূন্য কবরের তলায়!

ঐ দ্যাখো, হরিণ বেরিয়ে পড়েছে ছাল খুলে
ময়দানে জড়ো হচ্ছে স্তূপ-স্তূপ হরিণ-মাংস, নুন আসছে ছুটে
হাওয়ায় ভর করে আর মসলার গাছ শূন্য করে
তরল স্নেহের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে জিব-ঝরা ঝাল
ঝলসাচ্ছে উর্দ্বগামী অগ্নিচুল্লিতে দশলক্ষ সূর্য-পোড়া পশু

ও আমরা যাব সেই চুলায় রে…

খ.
এদিকে তুমি যে নাই, তোমার কাফন
উড়ছে ছেঁউরিয়ায়। ছোট্ট সে-পুত্তুলি ধন
হাত থেকে ছুটে গিয়ে কোথায় হারাল
তুমিও কি হারাবার একই তুষ জ্বালো
দোতারার ভীড়ে? অলাবু-উদ্ভূত কান্নার রোল
খালি করে নিল তোর কোল!
তারে-তারে মরণের আকুল টংকারে
কার বীর্য ঝরে? কার পেট বাড়ছে ওসারে?

পাত থেকে পাতে হরিণের মাংসের বিষাদ
রাত থেকে রাতে হরিণের মাংসের কি-স্বাদ
অনন্ত লালন-মাঝারে…

গ.
জলমুগ্ধ হয়ে ছিল আর-তো কিছু না
ফোঁটা-ফোঁটা ঝরে পড়ল সম্বল তাই,
আখর-পাগল ও যে নিত্য নিতাই
বস্তুপ্রতিমাময়- মোটেও ‘মিছু’ না!

যতটুকু দেখি তারে, মাটির মানুষ
নাম থেকে নামান্তরে ছুটে যায় ধেয়ে
বেটার মতন কিন্তু ধনুকিনী মেয়ে
স্বয়ংগর্ভী হয়ে হাতে নেয় জীবন্ত ক্রুশ।

‘জিসাস, জিসাস, এই-ই তোর মা
এই-ই তোর ঘাম-ছোটা মুুকুলিত বুঁ
গোশালায় উগরানো ঝিলিক-পূষণা
এক ও বহু’

ঘ.
সেদিন শুধু নিরীশ্বর ছিল। পাকা আতার আর্তি জাগিয়ে তুলল তাকে। পূব লেগেছিল পশ্চিমের গায়ে, উত্তর ও দক্ষিণ লীন হয়ে ছিল একই বিছানায়। কেউ শোনে নি নৈঋতের কথা। ঝড় উঠল তুমুল। উল্টে গেল জিব। জেগে উঠল সে। সে তখনও আমি না। তুমি হয়ে ওঠার আয়না জাগে নি তখনও। জাগল হঠাতই। গড়িয়ে পড়ল জতু হয়ে। বীর্যাকারে দেখা গেল তাকে দেখার ভিতর দিয়ে। না-দেখার অযোনিসম্ভূত বিযুক্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। শূন্য হাত। কড়া-পরা। মেয়েটি যে ছিল, কোথায় গেল ও? ছোট্ট মেয়েটি? প্রথম তারার মত প্রথম গ্রন্থিকা? কেমন কেমন করে বাঁধাইয়ের সুতা খুলে হারিয়েই গেল একটা ঘূর্ণির মত মেয়ে?

ঙ.
আমাকে দেয় নাই দুধ
রক্ত পীইয়ে ছিল মা
আমি তো জানতাম না
তারও জন্য গুণতে হবে সুদ!

নিয়েছিল আত্মজা করে
ছুঁড়েছে আবার রৌরবে
মা, মা, তুই কার গোরে
গান গাস লালন-পরবে?

রব না আমাতে দেখে নিস
জেনেছি কিভাবে গেলে বিষ
একই দেহে বাঘ ও হরিণ
অম্ল ও ক্ষারের অধীন

তোর মেয়ে, নাড়ি-কাটা মেয়ে!

……………………………

12522913_1067850949922115_6225139220423950573_n
।শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন।। কবি।

 

Advertisements