Untitledএই লেখাটি কবিরের দুটো গান নিয়ে রজনীশ ওশো’র আলোচনা। আসুন লেখাটি পড়ার আগে সংক্ষেপে কবির সম্পর্কে দুটো কথা জানা যাক। কবির ১৫ শতকের একজন ভারতীয় মরমি কবি এবং সন্ত। যাঁর লেখা হিন্দু ভক্তিগীতিকে প্রভাবিত করেছে এবং তাঁর শ্লোক শিখ ধর্মের আদি গ্রন্থে পাওয়া যায়। শোনা যায় তাঁর জন্ম মুসলিম পরিবারে, কিন্তু পরবর্তীতে তিনি তাঁর গুরু রামানন্দ দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত ছিলেন। অনেকে এও দাবী করেন যে তাঁর জন্ম মুসলিম পরিবারে হতেই পারে না। তাঁর জীবিত কালে অধ্যাত্মবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তিনি হিন্দু এবং মুসলিম উভয়েরই অপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর আবার হিন্দু এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের উভয়েই কবিরকে তাদের নিজেরদের সম্প্রদায়ের বলে দাবী করে থাকে। আরো অনেক মহান গুরুগণের মত তাঁকেও তাঁর কথাগুলো বলার জন্য কবিতার আশ্রয় নিতে হয়েছিল, যে সব কবিতা আজ গান হয়ে গীত হয়ে আসছে তাঁর ভক্তকুল পরম্পরায়। এবং কেন তাঁকে কবিতার আশ্রয় নিতে হয়েছিল সেটা ঋদ্ধ পাঠক মাত্রই বুঝবেন আশা করি।

তাহলে কে এই কবির?সে প্রশ্ন আমারও। তাঁর অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছেন অনেকেই। তাই কিছুদিন আগে এক কনিষ্ঠ বন্ধুর কাছে পাওয়া দুটো স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচিত্রের লিঙ্ক এই লেখার শেষে দেয়া হলো। আশা করি কিছুটা হলেও তা আপনাদের কবির সম্পর্কে তৃষ্ণা নিবারণে সহায়ক হবে। এবং বর্তমান ধর্মীয় অস্থিতিশীলতার সময়ে তিনি কতটা প্রাসঙ্গিক তা উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন।

 সদ্‌গুরু প্রসঙ্গে ওশো এবং কবির :: মূলঃ রজনীশ ওশো
                                                               
                                                                             

1.68 bhaikaisatgurusantkahawai

যাঁর পরশে নিরাকার তোমার কাছে সাকার রূপে দেখা দেন তিনিই সদগুরু
যিনি সহজ করে দেখান পরমের পথ,
অনাচারী হয়ে।
যিনি তোমার সবদিক রুদ্ধ করে কুম্ভক করতে বলেন না,
বলেন না বৈরাগী হতে।
যেখানে আসক্তি সেখানেইদেন পরমের দর্শন।
যিনি তোমায়শেখান পাথারে নিস্তরঙ্গ হতে।
নিরন্তর সুখময় অবস্থাহলে,ভয় থাকে না মনে,
সকল আনন্দের মাঝে থাকেন তাঁর ধেয়ানে।
সর্বত্রসীমার মাঝে অসীমের বাস…
পৃথিবী, আকাশে,বাতাসে,পানিতে…
শূন্যে পাতা সাধকের সুদৃঢ় আসন।
যিনি সীমার মাঝে অসীমঃ আমি তাঁকে দেখি আর কেউ নয়।

1.22. jab main bhula re bhai

ও ভাই, যখন আমি ভুলেছিলাম,
সদগুরু আমায় পথের দিশা দিলেন।
আমি অনাচারী হলাম,
না স্নাত হলাম আর গঙ্গাজলে।
জানলাম কেবল আমিই অপ্রকৃতিস্থ ছিলাম,
আর সবাই প্রকৃতিস্থ;
এবং আমি তাদের বিরক্ত করেছি।
তখন জেনেছি কীভাবে ধুলোর মাঝে সেজদায় লুটাতে হয়।
তাই এখন আর না বাজাই ঘণ্টা মন্দিরে,
না করি স্থাপন বিগ্রহ সিংহাসনে,
করি না পুষ্পপূজো কোন প্রতিমার।
এটা তো তপশ্চর্যা নয়, নয় ঈশ্বরকে খুশি করতে দমিত কামনা।
যখন তুমি আবরণহীন, হত ইন্দ্রিয়সমূহ,
তখন তুমি ঈশ্বরকে তুষ্ট করতে পারো না।
যে মানুষ দয়ালু এবং ন্যয়নিষ্ঠ সাধক,
যিনি জগতের সকল কাজের মাঝে অক্রিয়,
যিনি জগতের সকল সৃষ্টিকে নিজের সত্তা জেনেছেন,
তিনিই অর্জন করেন অবিনশ্বরতা,
ঈশ্বর নিরন্তর তাঁর সাথেই থাকেন।
কবির বলেনঃ তিনিই সত্যনাম অর্জন করেন যাঁর কথা বিশুদ্ধ,
এবং যিনি অহংমুক্ত।

ধর্ম কী? ধর্ম হলো সমগ্রের সাথে সুরময়তা, সমগ্রের সাথে প্রেমাত্মক হওয়া, সমগ্রের সাথে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। তিনিই হলেন ধার্মিক ব্যক্তি যিনি সমগ্রের বিপক্ষে নন, আর অধার্মিক হলেন তিনি যিনি সমগ্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছেন, যিনি সমগ্রের সাথে প্রতিদ্বন্দীতায় আছেন। ধার্মিক মানুষ জীবনের প্রতি ইতিবাচক। অধার্মিক মানুষ জীবনের প্রতি নেতিবাচক। ধার্মিক মানুষের কাছে সবকিছুই ভালো—তার ইতিবাচকতা অবিমিশ্র এবং সম্পূর্ণ। কোন কিছুই ভুল নয়, এটা নিশ্চয় ভুল বুঝাবুঝি, ভুল ব্যাখ্যা। এটা নিশ্চয় আমাদের অজ্ঞতার জন্য ভুল মনে হচ্ছে কারণ আমরা সম্পূর্ণ কাহিনী জানি না। সুতরাং হয়ত সমগ্রের সাথে আমরা মানানসই হয়ে উঠতে পারি নি বলে কিছু অংশকে এমন দেখাচ্ছে। এখনও আমাদের সমগ্র সঙ্গীত শোনা হয় নি, সুতরাং কিছু সুরকে আমাদের বেসুরো, খাপছাড়া মনে হচ্ছে। কিন্তু যদি ঈশ্বর থাকেন তবে সবকিছুকেই মঙ্গলকর হতে হবে। ঈশ্বর হলেন সদাশয়তার জামিনদার। মন্দের মত কোন বিষয়ের অস্তিত্ব থাকতে পারে না। যদি এটা দৃশ্যমান হয়, তবে নিশ্চয় সেটা আমাদের মনের দুঃস্বপ্ন; নিঃসন্দেহে এটা আমাদের সৃষ্টি।

ধার্মিক মানুষ প্রত্যাখ্যান করেন না, তাঁর ইতিবাচকতা বিশুদ্ধ, শর্তহীন। তিনি বাস্তবকে হ্যাঁ বলেন। এবং তাঁর এই স্বীকার করে নেয়াতে কোন শর্ত নেই—মনে রেখো; যখন তিনি বলেন হ্যাঁ তখন তিনি সেটাই বোঝান। যদি তুমি একজন মানুষকে দেখো যিনি বাস্তবকে না বলছেন, জীবনকে না বলছেন, এটাকে না বলছেন ওটাকে না বলছেন, তবে মনে রেখো, তিনি কেবল একজন আত্মশ্লাঘী, দাম্ভিক ব্যক্তি—তিনি মোটেও কোন ধার্মিক মানুষ নন। তিনি সমগ্রের সাথে লড়াই করছেন, নিজেকে দখলদার হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। নিজেকে বিশেষ কিছু হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। তিনি ব্যর্থ হতে বাধ্য। এখন অথবা পরে তার পরাজয় হতে যাচ্ছে; এটা দীর্ঘদিন এড়িয়ে চলা যেতে পারে না, সেটা আগেই ধার্য হয়ে গেছে। এটা তার দ্বান্দ্বিক আচরণের কারণে ধার্য হয়ে গেছে। ধর্ম হলো সহযোগিতা করা—যা কিছু আছে তার সকল কিছুর সাথে সহযোগিতা করা।

যতটা গভীরভাবে সম্ভব বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করো কারণ কেবল তাহলেই কবিরের মতন একজন মরমি গায়ককে উপলব্ধি সম্ভব। তিনি প্রাণের প্রেমিক। তিনি অস্বীকার করেন না, বাতিল করেন না, কোন কিছুকে দোষ দেন না, তিনি কোথাও মন্দ বলে কিছু দেখেন না। একবারের জন্যও যদি সমগ্র তোমার দৃষ্টিগোচর হয় তবে সব কিছু তোমার কাছে মহীয়ান হয়ে ওঠে। তখন আর কোনকিছুই পার্থিব নয়, সবকিছুই ঐশ্বরিক, অপার্থিব, তখন সমগ্র অস্তিত্বই ঈশ্বরের উপাসনাগৃহ, এবং সমগ্র জীবনই উপাসনা। হাঁটছো, তুমি তাঁর মাঝেই হাঁটছো, নাচছো তাঁর আঙ্গিনায়, ঘুমাচ্ছো তাঁর কোলেই—কারণ ঈশ্বর ছাড়া আর কিছুর অস্তিত্ব নেই।

ঈশ্বর হলেন সদাশয়তার জামিনদার।

কবির প্রকৃতই একজন ধার্মিক মানুষ। জীবনের প্রতি তাঁর বিঘোষণ অসাধারণ আস্থাপূর্ণ। তিনি তোমাকে কোন কিছুই ত্যাগ করতে বলেন নি। বরং তিনি বলেছেন, ‘সবকিছুকেই ঈশ্বরের কাছে আনো এবং ঈশ্বরকেও সবকিছুর সাথে রাখো।’

তুমি তাঁর দৃঢ়োক্তি গুলো দেখলে বিস্মিত হতে পারোঃ তাঁর এই কথাগুলো অসাধারণ বৈপ্লবিক।

কবিরের গানে প্রবেশ করার আগে আমি আরো কিছু কথা বলতে চাই।

ধর্ম ঐতিহ্যবাহী বা সনাতন নয়—এর বিশেষ প্রকৃতির কারণে সেটা হতে পারে না। ঐতিহ্য হলো তাই যা অতীত হয়ে গেছে, ঐতিহ্য হলো কেবল অতীতের ধুলো, ঐতিহ্য হলো কেবলই স্মৃতি। ধর্ম হলো সর্বদা সপ্রাণ, জীবিত। ধর্ম কখনও ঐতিহ্যবাহী, সনাতন হতে পারে না। যখনই ধর্ম সনাতন হয়ে যায়, তখন সেটা ঈশ্বরের চেয়ে শয়তানকে বেশি সেবা দেয়। তখন সেটা জীবনের চেয়ে মরণের সেবা করে বেশি। তখন সেটা রাজনীতিবিদ, পুরোহিত, সংগঠন, গীর্জার সেবা দেয় বেশি, কিন্তু মানুষের আত্মার সেবা দেয় না। তখন এটা আর ভবিষ্যতের সূত্রপাত করে না। ঐতিহ্য পিছু ফিরে চায়; কিন্তু আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। পিছু ফিরে চাওয়া অর্থহীন। কেবল অর্থহীনই নয়, ক্ষতিকরও বটে, বিপজ্জনক—কারণ আমরা অতীতে যেতে পারি না, আমাদের আগামীর পথে যেতে হবে। এবং পিছনে যেতে গেলে সমস্যা হতে বাধ্য।

দ্বিতীয় বিষয় হলোঃ ধর্মগ্রন্থে ধর্ম থাকে না, থাকতে পারে না। ধর্মগ্রন্থ হলো নিষ্প্রাণ শব্দভাণ্ডার। হ্যাঁ, একদিন সেটাতে ধর্ম ছিল, যখন সেটা কোন প্রকৃত গুরুর কথিত বাণী ছিল তখন সেটা স্পন্দমান ছিল। কৃষ্ণ যখন অর্জুনকে শ্রীমাত ভগাবাত গীতা বলেন, তখন সেটা প্রাণবন্ত ছিল। এটা প্রাণবন্ত ছিল কৃষ্ণের কারণে, এটা উদ্দীপ্ত ছিল কৃষ্ণের কারণে—যখন কৃষ্ণের অন্তর্ধান হয় তখন গীতা শবে পরিণত হয়। মৃত শব্দেঃ তুমি এই শব্দগুলোকে নিয়ে বিশ্লেষণ করে যেতে পারো, বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারো… গীতার হাজার রকমের প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে। এ ছাড়া আরো অনেক রকম ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে। সত্যি বলতে কি, যখন কেউ একজন গীতা পড়ে তখন সে তার নিজের মত করে একটা ব্যাখ্যা করে। কৃষ্ণের অর্থ হারিয়ে গেছে; তাঁর সাথেই অন্তর্হিত হয়েছে। সাপ চলে গেছে… কেবল বালির উপর তার চলে যাওয়ার চিহ্ন রেখে গেছে। তাঁদের চলে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট এই চিহ্নকে তোমরা ধর্মগ্রন্থ হিসেবে পূজো করতে পারো।

যখন যীশু এই ধরায় ছিলেন এবং তাঁর ভক্তদের উদ্দেশ্যে কোন বার্তা দিতেন, তখন সেটা স্পন্দমান সত্য, সেটা জীবনের সাথে স্পন্দিত—প্রাণবন্ত, কম্পিত, স্পন্দিত। তখন সেটা কোন মৃত শব্দ নয়; ঈশ্বরের কথা ছিল, স্বতঃস্ফূর্ত সত্য ছিল। সে শব্দের একটা হৃদয় ছিল। সে কথা ভালোবাসায়, অভিজ্ঞতায়, বাস্তবতায়, সত্তায় আবৃত ছিল। যখন যীশু অন্তর্হিত হলেন, প্রাণবন্ততা চলে গেলো। তারপর তুমি তাঁর বলা কথাগুলো সংগ্রহ করতে পারো এবং যত খুশি তত গসপেল তৈরি করতে পারো। সেই সব গসপেল তোমাকে কোন সহযোগিতা করতে যাচ্ছে না।

প্রকৃত ধর্ম কখনও ধর্মগ্রন্থে থাকে না। এবং একজন প্রকৃত ধার্মিক কখনও ধর্মগ্রন্থের খোঁজে থাকেন না, তিনি একজন গুরুর খোঁজে থাকেন—একজন চেতন গুরু। এটা হলো কবিরের উপলব্ধির মৌলিক মতবাদের একটাঃ সদ্গুরু—চেতন গুরু। যাও এবং একজন জীবন্ত, চেতন গুরুর সন্ধান করো! যদি তুমি কোন জীবন্ত গুরুর সংযোগে আসতে পারো তবে সেটা আবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। কেবল একজন চেতন গুরুর মধ্য দিয়েই সেটা জীবন্ত হয়ে ওঠে—এছাড়া আর কোন উপায় নেই, কারণ চেতন গুরুই একমাত্র কেতাব। যখন একজন চেতন গুরু গীতা স্পর্শ করেন, তখন গীতা আবার প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, যখন আবার গসপেল স্পর্শ করেন, তখন আবার সেটা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। যখন কোন মোমিন কোরান আবৃত্তি করেন, তখন সেটা আবার প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। তিনি সে কথাকে নিজের প্রাণের পরশে জাগিয়ে তোলেন, কথামালা স্পন্দিত হতে শুরু করে। কিন্তু সরাসরি কোন ধর্মগ্রন্থে তুমি ধর্ম খুঁজে পাবে না।

সুতরাং ঐতিহ্যে ধর্ম নেই এবং ধর্মগ্রন্থেও ধর্ম নেই, নেই ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায়। ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান হলো লৌকিকতা। একজন চেতন গুরুর সংযোগে না আসা পর্যন্ত, আচার অনুষ্ঠান গুরুভার। সেগুলো তোমার বোঝা হয়ে যাবে, তোমাকে নিষ্প্রাণ করে ফেলবে, হত্যা করবে, এবং তুমি সীমাহীন লৌকিকতার মাঝে হারিয়ে যাবে। একজন চেতন গুরুর সান্নিধ্যে এলে, এক নতুন আচার-অনুষ্ঠানের জন্ম হয়। এই সংযোগের ফলে সেটার উদয় হয়, তার একটা প্রসঙ্গ থাকে, যা একটা সচেতন আরোপণ। এটা নিষ্প্রাণ ঐতিহ্যবাহী আচার অনুষ্ঠান নয় না যার শিক্ষা এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মে চলে আসছে। তুমি এটা যাপন করো—এবং এই যাপনের মধ্য দিয়ে তুমি শেখো।

যখন তুমি একজন তেচন গুরুর সান্নিধ্যে আসো, তোমার গভীরে কিছু একটা প্রণত হতে চায়। এটা এমন নয় যে তুমি কোন একটা নির্দিষ্ট লৌকিকতা করতে যাচ্ছো—যদি তুমি করো, তবে সেটা অর্থহীন। কিন্তু তোমার মর্মমাঝে কিছু একটা প্রকৃতপক্ষেই অবনত হতে চায়, তোমার অন্তরতমস্তে, তোমার কেন্দ্রের গভীরে কিছু একটা অবনত হতে চায়। তখন এই চেতন গুরুর কাছে প্রণত হওয়া আর কোন আনুষ্ঠানিকতা থাকে না। এটা সপ্রাণ, অর্থপূর্ণ, এটা আর কোন অসার দেহভঙ্গি নয়। কিন্তু তুমি এখন যে কারো প্রতি অবনত হতে পারো, কারণ তোমাকে প্রণত হতে শেখানো হয়েছে—তাহলে এটা অর্থহীন। পার্থক্যটা বোঝার চেষ্টা করো। যখন তোমার স্বতঃস্ফূর্ততা থেকে তোমার মাঝে কোন কিছুর জন্ম হয়, তখন সেটা সত্য। যখন তোমার দায়িত্ববোধ থেকে তোমাকে কিছু করতে হয়, তখন সেটা অসত্য। ‘দায়িত্ব’ একটা অশ্লীল শব্দ। যদি তোমার প্রেম থেকে কোনকিছুর জন্ম হয়, ভালো। যদি তোমার দায়িত্ববোধ থেকে কোনকিছুর জন্ম হয়, তবে সেটা এড়িয়ে চলো, কখনও সেটা করো না—কারণ সেটা বিপজ্জনক। যদি তুমি দায়িত্ব পালনের উপায়গুলো অধিক পরিমানে শেখো, তবে তুমি প্রেমের পথকে ভুলে যাবে। দায়িত্ব প্রেমের প্রতিপক্ষ। দায়িত্ব হলো প্রেমের একটা কৃত্রিম বিকল্প।

ধর্ম কেবল আচার-অনুষ্ঠান পালন নয়। তবে অবশ্যই যেখানে ধর্ম আছে সেখানেই কিছু আনুষ্ঠানিকতা আছে—কিন্তু সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। যখন তোমাদের মাঝ দিয়ে একজন বুদ্ধ চরণ ফেলে চলেন তখন তোমরা কীভাবে তাঁকে এড়িয়ে যাবে, কীভাবে তোমরা তাঁর চরণ স্পর্শ না করে থাকবে? অসম্ভব। তুমি দুটো বিষয় করতে পারো এবং উভয়ই ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতাঃ হয় তুমি তাঁর চরণ ছোঁবে নয় তাঁকে পাথর ছুঁড়ে মারবে। উভয়ই আনুষ্ঠানিকতা—এক হলো একজন বন্ধুর জন্য, আর এক হলো একজন শত্রুর জন্য, কিন্তু উভয়ই ধর্মীয় আচার। তুমি একজন বুদ্ধকে উপেক্ষা করতে পারো না, তুমি তাঁর প্রতি উদাসিন হতে পারো না, এই হলো সার কথা। বিষয়টা এমনই যে তুমি সেটাকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারো না। হয় তোমাকে বন্ধু হতে হবে নয় তোমাকে শত্রু হতে হবে; তোমাকে নির্বাচন করতেই হবে। তোমার একটা মনোভাব থাকতেই হবে—এই মনোভাবই ধর্মীয় আচার। কিন্তু সেটা তোমার হৃদয় থেকে উৎসারিত হয়, কারো কাছে থেকে শিখে নয়। এটা খুব সহজ ভাবে তোমার সত্তার মাঝ থেকে উদয় হয়।

যখনই কোন ধর্মের উদয় হয়, সেখানে কিছু আচার অনুষ্ঠানের সৃষ্টি হয়; কিন্তু যখন সেই ধর্মের অন্তর্ধান হয়, তখন সেই আচার অনুষ্ঠান নিষ্প্রাণ হয়ে যায়। সেই শব আর বয়ে যেও না। এটা ঠিক যে, তুমি তোমার মাকে অত্যন্ত ভালোবাসো কিন্তু তিনি মারা গেছেন—তাহলে এখন তুমি কি করবে? তুমি কি সারাজীবন তোমার মায়ের মৃতদেহকে সাথে নিয়ে চলবে? তোমাকে সেটা দাহ করতে হবে অথবা সমাধিস্থ করতে হবে। তোমার এটা থেকে মুক্ত হতে হবে, তুমি এটা বয়ে চলতে পারো না। কিন্তু ধর্মের সাথে ঠিক এই ব্যাপারটাই ঘটেছে। তুমি বুদ্ধকে খুব ভালোবাসতে, এবং তোমার হৃদয়ে অসীম প্রেমের উদয় হয়েছিল, এবং তাঁর উপস্থিতিতে মহত্তম আরাধনা এবং সঙ্গীতের জন্ম হয়েছিল… এখন তিনি চলে গেছেন, তুমি তবুও সেই গান গেয়ে চলেছো। কালক্রমে এটা এখন অনেক দূরের প্রতিধ্বনিরও প্রতিধ্বনি… ক্রমশ ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

যখন ভ্যাটিক্যান থেকে পোপ বলেন তখন সেটা মোটেও যীশুর কথা নয়—হতে পারে না। যখন যীশু বলেন তখন তিনি তাঁর কর্তৃত্ব, তাঁর প্রভুত্ব থেকে বলেন। যখন পোপ বলেন তখন তিনি যীশুর এক্তিয়ার থেকে বলেন। একজন প্রকৃত গুরু তাঁর নিজের এক্তিয়ার থেকে, নিজের প্রভুত্ব থেকে বলেন, তিনিই তাঁর একমাত্র অথোরিটি।

ঐতিহ্যে বা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে ধর্ম নেই, এবং তথাকথিত ধর্মেও নেই—হিন্দু ধর্ম, খৃষ্ট ধর্ম ইত্যাদি। ধর্মের কোন বিশেষণ নেই। ধর্ম কেবল ধর্ম যেমন প্রেম কেবল প্রেম। তুমি কি প্রেমকে হিন্দু, খৃষ্টান বা মুসলিম বলো? যদি প্রেম তা না হয় তবে কেন ধর্ম হিন্দু বা খৃষ্টান বা আর কিছু হবে? যীশু বলেন নি যে, ‘ঈশ্বর হলেন প্রেম’? ধর্মগুলোয় ধর্ম নেই, ধর্ম সকল বিশেষণ, সকল সংজ্ঞার্থ থেকে মুক্ত, এবং প্রত্যককে সেটা অন্বেষণ করতে হয়। কেউ কোন ধর্মের মাঝে জন্মগ্রহণ করতে পারে না, তোমার মাঝে ধর্মের জন্ম হয়। তোমাকে তোমার আত্মাকে উন্মুক্ত করে ধর্মকে ধারণ করতে হবে। এটা তোমার সর্বত্র নিষিক্ত হচ্ছে… কিন্তু তোমরা হাতে খেলনা নিয়ে আছো, অচল পয়সা, এবং ভাবছো ধর্ম পেয়ে গেছো। গীর্জা বা মন্দিরে এটা নেই। সেখানে যাও যেখানে একজন চেতন গুরু আছেনঃ ধর্ম সেখানে আছে। এবং সেটাও থাকে কিছু সময়ের জন্য—সেখানে গুরুর অন্তর্ধানের সাথে সাথে ধর্মও অন্তর্হিত হয়।

এ কারণে কবির একজন সদগুরুর উপর জোর দিয়েছেন—একজন বাস্তব গুরু।

ধর্ম হলো ব্যক্তিগত বিষয়, মানুষকে নিজে থেকে তার অনুসন্ধান করতে হয়। এটা কোন সামাজিক বিষয় নয়, এর সাথে বিশৃঙ্খল জনতার বা যৌথতার কোন যোগ নেই, মানুষকে তার নিজের জন্য সেটার খোঁজ করতে হবে। এটা একান্ত নিজের বিষয়, প্রেমের মত ব্যক্তিগত। তুমি একাকী তার কাছে আসো, গভীর অন্তরঙ্গতায়, গোপনীয়তায়… তোমার হৃদয়কে উন্মুক্ত করো। ধর্ম স্বতঃস্ফূর্ত এই অর্থে যে তুমি সেটা শিখতে পারো না। তুমি সেটা হতে পারো কিন্তু জানতে পারো না। এটা প্রেমের মত স্বঃস্ফূর্ত। তুমি কি কখনও জানতে পেরেছো যে প্রেম কি? এবং যেদিন মানুষ জানতে পারবে কীভাবে প্রেম করতে হবে, সেদিন শেষ বিচারেরদিন হবে। মনে হচ্ছে সেদিনও প্রতিদিন একটু করে এগিয়ে আসছে, বিশেষ করে আমেরিকায়। সেখানে বই লেখা হচ্ছেঃ কী করে প্রেম করতে হয়, কীভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ হতে হয়—মূর্খতাপূর্ণ বই, কারণ যদি মানুষ ভুলে যায় কীভাবে ভালোবাসতে হয় তবে কোন বই সেটা শেখাতে পারে না। মনুষ্যজাতিকে কীভাবে ভালোবাসতে হয় সেটা শেখাতে যাওয়া অনেকটা পানিতে ভাসমান মাছকে সাঁতার শেখানোর মত—সেটা নির্বুদ্ধিতা হবে। ধর্মের ক্ষেত্রেও সেই একই বিষয়। ধর্ম শিক্ষা দেয়া যায় না, ধর্ম দ্বারা ধৃত হওয়া যায়, এটা সংক্রমণের বিষয়। যখনই তুমি কোন শুদ্ধচিত্ত ধার্মিক মানুষের সংস্পর্শে আসো তখনই তুমি সেটা ধরতে পারো, আত্মভূত করতে পারো।

ধর্ম হলো একটা বিদ্রোহ, এটা মৃত্যুর বিরুদ্ধে একটা বিদ্রোহ, যা কিছু নিষ্প্রাণ ধর্ম তার বিরুদ্ধে একটা বিদ্রোহ; এটা বহির্জগতের সাথে বিদ্রোহ; এটা রাজনীতি, লোভ, সমাজ, সংস্কৃতি, সভ্যতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহঃ ধর্ম বলে আমাদের অন্তরতমস্ত সত্তার কথা শুনতে হবে এবং অনুসরণ করতে হবে তা যেদিকেই পরিচালিত করুক। যেদিকেই হোক… পরিণতির ভয় না পেয়ে, আমরা আমাদের ভিতরের মিহি প্রশান্ত স্বর শুনবো এবং অনুসরণ করবো। ধর্ম হলো ঝুঁকি গ্রহণ। যে মানুষ সব সময় নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে সে ধার্মিক হতে পারে না; এটা একটা বিপজ্জনক বিষয়। যদি তুমি এর মধ্য দিয়ে যাও, তবে তোমাকে ক্রুশারোহণ করে চলতে হবে… কিন্তু কেবল ক্রুশারোহণের পরেই পুনরুজ্জীবন।

এখন কবিরের সূত্রগুলো শোন।

যাঁর পরশে নিরাকার তোমার কাছে সাকার রূপে দেখা দেন তিনিই সদগুরু…

এখন সাধনার জন্য, পরমের অন্বেষণের জন্য একজন প্রকৃত গুরুই যদি হন ভিত্তিক বিষয়, তাহলে অবশ্যই তার সংজ্ঞার্থ নির্ণয় প্রয়োজনঃ প্রকৃত গুরু কে? কাকে প্রকৃত গুরু বলব? কীভাবে জানবো? কবির বলছেনঃ যিনি নিরাকারকে তোমার কাছে সাকার রূপে দেখাতে পারেন তিনিই সদগুরু।

 … যাঁর উপস্থিতিতে নিরাকার সাকারে অবতারিত হন… যাঁর মধ্য দিয়ে আমরা সর্বাপেক্ষা দূরের তারাটি দেখতে পাই… যাঁর মধ্য দিয়ে তুমি ঈশ্বরের উপলব্ধি লাভ করতে পারো… যাঁর মধ্য দিয়ে তুমি নিঃশব্দতার গান শোন, যাঁর আঁখির আড়াল থেকে অসীম তোমার পানে উঁকি মারে। এবং যদি তুমি তাঁর হাত ধরো, তবে অকস্মাৎ তুমি দেখবেঃ এই হাত তাঁর হাত—কিন্তু কেবল তাঁর হাত নয়, তার মধ্য দিয়ে ঈশ্বর তোমার হাত ধরে আছেন। তিনি একটা বাহন, অমিতের ঠোঁটে তিনি একটা বাঁশের বাঁশি। তিনি নিরাকারকে আকার দেন, তিনি বিমূর্তের মূর্ত প্রকাশ।

তোমাকে খুবই উন্মুক্ত এবং অরক্ষিত হতে হবে, কেবল তাহলেই তুমি একজন গুরুকে অনুভব করতে পারবে। নেতিবাচক মনোভঙ্গি নিয়ে একজন গুরুর নিকটে যেও না, তাহলে তুমি কখনও তাঁর কাছে পৌঁছতে পারবে না। তিনি যে তরঙ্গদৈর্ঘে বাস করেন তোমার নেতিবাচক মনোভাব সে স্থানের দিকে পরিচালিত হতে দেবে না। তাঁর আবহে প্রবেশ করতে দেবে না। এ কারণে আস্থার প্রয়োজন। এ কারণে, প্রেমের প্রয়োজন। অন্যথায় তুমি যাবে রিক্ত অবস্থায় ফিরবেও রিক্ত হয়ে—এবং যখন রিক্ত হয়ে ফিরবে তখন বলবে, ‘তিনি প্রকৃত গুরু নন, গিয়েছিলাম রিক্ত হয়ে ফিরেছিও তাই হয়ে।’ যদি তুমি উন্মুক্ত না হও, তবে তুমি রিক্ত হয়েই ফিরবে। যদি তুমি খোলা, উন্মুক্ত হও কেবল তবেই অনুভব করার সম্ভাবনা থাকে। উন্মুক্ততাকে ভয় পেও না। এবং যদি তুমি উন্মুক্ত হও এবং গুরু প্রকৃত না হন, তবে কিছুই ঘটবে না। এবং তুমি জানতে পারবে, তুমি নিঃসন্দেহে জানতে পারবে, তিনি তোমার জন্য নন, তুমি যে মানুষের খোঁজ করছো তিনি সেই ব্যক্তি নন। কিন্তু উন্মুক্ত, খোলা হও—কারণ কেবল তুমি উন্মুক্ত হলেই বুঝতে পারবে তিনি প্রকৃত নাকি নন। যদি তুমি আবদ্ধ হও, ইতোমধ্য তুমি আবদ্ধ হয়েই আছো, তখন আর কোন সম্ভাবনা থাকে না। সত্যি বলতে কি, যদি তুমি আবদ্ধ হও তবে আজ কিংবা কাল তুমি এমন কারো শিকার হবে যিনি মিথ্যে গুরু—কারণ মিথ্যে গুরু যুক্তি-তর্কে তোমাকে বোঝাতে চেষ্টা করবেন।

প্রকৃত গুরুগণ খুব আপাতবিরোধী হন। জীবন যেমন আপাতবিরোধী তাঁরাও তেমনই আপাতবিরোধী হন, কারণ তাঁরা জীবনের প্রতিমূর্তি। তাঁরা তেমনই সঙ্গতিহীন স্বয়ং ঈশ্বর যেমন, কারণ তাঁরা ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি। তাঁরা যৌক্তিক বা লজিক্যাল নন, খুবই অযৌক্তিক—কারণ তাঁরা হলেন সুপারলজিক্যাল, কারণ তাঁরা এমন কিছু বয়ে আনেন যা যুক্তি দিয়ে ধরা বা উপলব্ধি করা যেতে পারে না।

প্রকৃত গুরুর সান্নিধ্যে এলে তুমি অনুভব করবে যেন অতল গহ্বরের নিকটবর্তী হয়েছো… কিন্তু যদি তুমি উন্মুক্ত হও… কেবল তাহলেই। যদি তুমি উন্মুক্ত না হও তবে তুমি কিছু ভুল মানুষের দ্বারা প্রণোদিত হতে পারো, যিনি তোমার সাথে কথা বলতে পারেন, ভ্রষ্ট করতে পারেন। একটা উদাহরণ দেয়া যাক, যদি তুমি লোভী হও, তবে তিনি তোমাকে লোভের কথা বলবেন। তিনি বলবেন এই ধ্যান, এই উপাসনার মাধ্যমে তুমি কত কিছু অর্জন করতে চলেছো। তিনি তোমাকে লোভ দেখাবেন যে, যদি তুমি তাকে অনুসরণ করো তবে আখেরে তুমি কী পরিমাণ অর্জন করতে চলেছো। তিনি তোমাকে অনেক কিছুর প্রতিশ্রুতি দেবেন কিন্তু প্রকৃত গুরু কখনও তোমাকে কোন কিছুর প্রতিশ্রুতি দেবেন না। সত্যি বলতে কি, তিনি তোমায় সম্পূর্ণরূপে ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলবেন—তোমার লোভ, কামনা, তোমার কিছু হয়ে ওঠার ধারণা—তিনি এই সবকিছুকে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলবেন। একজন প্রকৃত গুরু হলেন একটা শিলাখণ্ড যার আঘাতে তোমার নৌকা ভেঙ্গে চুরমার হয়… তোমার সমগ্র মন চূর্ণবিচূর্ণ হয়। তিনি তোমাকে দিশেহারা করে তোলেন; তিনি যুক্তি তর্কে তোমাকে বোঝান না। তাঁর কথায় যুক্তি প্রদানের চেয়ে সত্তার প্রভাব বড়।

কিন্তু আমরা লোভী। লোভের মধ্যে বসবাস করি, আমরা ভীত, শঙ্কাপূর্ণ—কেউ আমাদের সান্ত্বনা দিলে, আমরা তার শিকার হয়ে যায়। একজন প্রকৃত গুরু সান্ত্বনা দেন না, তিনি প্রবোধ দেন না। তিনি, সত্যি বলতে কি, তিনি তোমার কাছে মৃত্যুর সামিল। তিনি তোমাকে হত্যা করেন, ধ্বংস করেন, তিনি অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক… কারণ সৃজনশীলতা কেবল তখনই সম্ভব যখন পুরাতন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। যখন পুরাতনকে সরিয়ে নেওয়া হবে, কেবল তখনই নতুনের আগমন ঘটতে পারে।

আমি একটা মজার কাহিনী শুনেছিলাম। এখন সেই কাহিনী মন দিয়ে শোন…

সীন নামের একটা ছেলে তার মাকে একটা চিঠি লিখেছিল যা বেশ উৎসাহ পাওয়ার মত। সে তার মাকে লিখেছিল, “প্রিয় মা, আমি তোমাকে কিছু বটিকা পাঠাচ্ছি যা আমাকে এক সম্মোহক ডাক্তার দিয়েছিলেন। যদি তুমি তার একটা খাও তবে সেটা তোমার জীবনকে অনেক বছর পিছিয়ে নিয়ে যাবে।”

তারপর সে কয়েক সপ্তাহ পরে বাড়ি এসে দেখল তাদের বাড়ির আঙ্গিনায় এক সুন্দরী নারী একটা দোলনা দোলাচ্ছেন আর সেই দোলনায় একটা শিশু বোতল টেনে দুধ পান করছে।

সে প্রশ্ন করল, “আমার মা কোথায়?”

তিনি বললেন, “বোকার মত কথা বলো না। সেই বটিকাগুলো বিস্ময়কর ছিল।”

সীন বলল, “কল্পনা করেছো! একটা বটিকা আর তুমি এমন সুন্দর হয়ে গেছো যা কোন নারী হতে পারে না—এবং আর খবর কী? তোমরা একটা শিশুর জন্ম দিতেও সক্ষম হয়েছো! প্রভু, সেগুলো এতটাই শক্তিদায়ক ছিল!”

সীনের মা কেঁদে বললেন, “ওরে পাগল! ওটা তোর বাবা, সে দুটো বটিকা খেয়ে ফেলেছিল।”

লোভকে এড়িয়ে চলো—অন্যথায় তুমিও দুটো বটিকা খেয়ে ফেলবে। এবং অনেক মানুষ আছে যারা এমন বিষয় চালিয়ে যাচ্ছে। সম্মোহক ডাক্তার……

এখানে একজন গুরু তোমার লোভকে পূর্ণ করার জন্য নেই, তিনি এখানে তোমার লোভকে ধ্বংস করে ফেলার জন্য আছেন। কারণ যখন একদিন তোমার লোভ ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে তখন তুমি নিজের কাছে নিজেকে প্রাপনীয় হবে। যদি তুমি লোভী হও তবে কখনও নিজেকে পাবে না। লোভ কামনায় রূপান্তরিত হবে, আর কামনা রূপান্তরিত হবে ভবিষ্যতের অভিক্ষেপণে। এবং তোমরা সর্বদায় ভবিষ্যতের কোন সময়ে সদা বিচরণ করে চলো, কখনও বর্তমানে থাকো না। লোভ তোমাকে তোমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়ঃ লোভকে ধ্বংস হতে হবে।

Kabir (3)
কবির

একজন গুরু তোমাকে কখনও কোনকিছুর প্রতিশ্রুতি দেন না—কিন্তু কেবল একজন গুরুর উপস্থিতিতেই কিছু হওয়া সম্ভব। তিনি বলবেন না যে, “আমি মৃত্যুকে তোমার থেকে দূরে সরিয়ে রাখব” বা “তুমি অমর হবে”। তিনি তোমাকে অমৃত পান করতে দিচ্ছেন না, দিচ্ছেন না স্পর্শমণি, অমরতা-দানকারী দেবভোগ। অবশ্যই একজন গুরুর সান্নিধ্য তোমাকে অমর করে—তার মানে এই নয় যে তিনি তোমাকে অমর করেন। তিনি সহজভাবে তোমাকে অন্তকালের অস্তিত্বের গভীরে নিয়ে যান।

কেবল এই বিষয়টার দিকে খেয়াল করোঃ তিনি তোমাকে মরণের অভিজ্ঞতার গভীরে নিয়ে যান। আর এটাই হলো প্রগাঢ় ধ্যান সম্পর্কে সবকিছু—একটা মৃত্যুর অভিজ্ঞতা। এবং যখন তুমি তোমার মৃত্যু সম্পর্কে জানবে, দেখবে, অকস্মাৎ উপলব্ধি করবে যে তুমি এটা থেকে পৃথক। মৃত্যু ঘটে, কিন্তু কখনও সেটা তোমার সাথে ঘটে না। এটা উপরিতলে ঘটে, কখনও কেন্দ্রে পৌঁছায় না। এটা দেহের প্রতি ঘটে, তোমার সাথে নয়। এবং দেহ তোমার আবাস ছাড়া আর কিছুই নয়। তুমি অনেক আবাস বদলেছো, এবং আরো অনেক আবাস বদলাবে—কিন্তু তুমি অমর। কিন্তু একজন প্রকৃত গুরু এটার প্রতিশ্রুতি দেন না। একদিন তিনি সেটা প্রদান করেন, কিন্তু তার জন্য কোন প্রতিশ্রুতি নয়। যদি তুমি এমন কিছু অবস্থার অন্বেষণ করো যেখানে ভয় দ্রবীভূত হবে, কামনা পূর্ণ হবে, এমন অবস্থা যেখানে ক্রমশ সুখানুভূতির সুড়সুড়ি পাবে, স্বর্গ, তাহলে তুমি একজন মেকি, নকল মানুষের শিকার হতে বাধ্য।

সদগুরুর অর্থ হলো প্রকৃত বা আসল গুরু, আর অসৎগুরুর অর্থ হলো নকল গুরু।
যাঁর পরশে নিরাকার তোমার কাছে সাকার রূপে দেখা দেন তিনিই সদগুরু
যিনি সহজ করে দেখান পরমের পথ,

পরমকে পেতে যিনি দেন সহজ শিক্ষা—জটিল পদ্ধতিতে নয়, যোগের অঙ্গভঙ্গি নয়, নয় কঠিন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। তিনি সহজ উপায়ে শিক্ষা দেন, খুব সহজ,  যে কেউ সেটা করতে পারে, এখনই করতে পারে। তাঁর শিক্ষা পদ্ধতি এতই সহজ যখন তুমি দেখবে এই ভেবে বিস্মিত হবে যে কেন তুমি নিজেই সেটা আবিষ্কার করো নি। সেগুলো এতই সাদামাটা সহজ বিষয়! একদিন যখন গুরু তোমাকে শিক্ষা দেবেন, তুমি সেগুলোর সৌন্দর্য সম্পর্কে জানবে, তার সামান্য স্বাদ গ্রহণ করবে, তুমি সম্পূর্ণরূপে বিস্মিত হয়ে যাবে, কেন তুমি সেটা নিজেই আবিষ্কার করতে পারো নি—এতই সহজ সাধারণ।

আসল গুরু কৌশল প্রয়োগ করেন না, তিনি খুব সহজ সরল—কারণ ঈশ্বরে উপনীত হওয়ার কোন কৌশল নেই। কোন কৌশলের উপান্তে ঈশ্বরের বাস নয়, না। ঈশ্বর ইতোমধ্যেই তোমার নাগালের মাঝে আছেন। তুমি তাঁর মাঝেই বিরাজ করছো; তোমাকে কেবল একটু ঝাঁকুনি দিতে হবে যাতে তুমি আরো একটু সজাগ হয়ে উঠতে পারো। কেবল আর একটু সতর্কতা, সচেতন হয়ে, সেই যথেষ্ট।

মাঝে মাঝে তুমি আরো একটু সজাগ হয়ে ওঠো, কিন্তু তাও খুব অসচেতনভাবে। তুমি একটা গাড়ি চালাচ্ছো, এবং হঠাত দেখো যে বিপরীত দিক থেকে একটা বাস আসছে যার চালক মাতাল অথবা পাগল, এবং তুমি দেখতে পাও যে দুর্ঘটনা এড়ানোর আর কোন সম্ভাবনা নাই। দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে; এটা প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে। সেই মুহূর্তে তুমি সজাগ হও, খুব সজাগ, কিন্তু ঐ সজাগতা আসে অসচেতনভাবে। সজাগ, কিন্তু তুমি যে সজাগ সে বিষয়ে তুমি সজাগ নও।

কিছু বিপজ্জনক মুহূর্তে তুমি সজাগ হও, কিন্তু সেই সজাগতা অনবহিত। একজন গুরু তোমাকে শিক্ষা দেন যে কীভাবে সম্পূর্ণ সচেতনভাবে সজাগ হতে হয়। তিনি তোমাকে চৈতন্যময় সজাগতা শিক্ষা দেন। এখন তুমি একটু ধাঁধায় পড়ে যেতে পারো, কারণ… চৈতন্যময় সজাগতা? তুমি চিন্তা করো সচেতনতার অর্থ হলো সজাগতা, সজাগতা মানে সচেতনতা, না। এমন কিছু মুহূর্ত আছে যখন তুমি সজাগ কিন্তু সচেতন নও। যদি কেউ একটা পিস্তল নিয়ে তোমার বুকে ধরে তবে তুমি সে বিষয়ে সজাগ হবে কিন্তু সচেতন নয়। চিন্তা করা থেমে যাবে, এমন আকস্মিক ধাক্কা, এমন অপ্রত্যাশিত, এবং চিন্তা করতে পারছো না কী ঘটতে যাচ্ছে, এবং মৃত্যু এমন ঘনিয়ে এসেছে… এমন ধাক্কায়, তোমার মন থেমে যায়। তোমার ক্রমাগত ঘুরে চলা মন থেমে যায়। তোমার অবিরত বাচাল মন সে ধাক্কায় একেবারে নীরবতায় পতিত হয়ঃ তুমি সজাগ হয়ে যাও। কিন্তু এই সজাগতা চৈতন্যময় অবস্থা নয়।

গুরু কেবল মাত্র একটা বিষয়েরই শিক্ষা দেনঃ কীভাবে চৈতন্যময় হয়ে সজাগ হতে হয়। এবং সেটা খুব সহজ বিষয়। যে কোন মুহূর্তে তুমি সেটা শুরু করতে পারো; তুমি যে সব কাজ করে চলেছো সেই প্রতিটি কাজে তুমি তোমার সচেতনতা, সজাগতাকে প্রয়োগ করতে পারো। যদি তুমি রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলো, তবে কেবল সচেতনভাবে হাঁটো। প্রতিটা পদক্ষেপ নাও গভীর সতর্কতার সাথে। আমার কথা শোন, ঠিক এখন, শোন গভীর মনোযোগের সাথে। তুমি হয়ত মনোযোগের সাথে শুনছো, কিন্তু সেই মনোযোগ হতে পারে অসচেতনভাবে। এই মনোযোগ সম্পর্কে সচেতন হও, এবং অকস্মাৎ তোমার মাঝে এক গভীর পরমসুখ নেমে আসতে দেখবে। আচানক অজানা থেকে তার আবির্ভাব হবে। কেবল এক মুহূর্তের সচেতন সজাগতা এবং তোমার দরজাগুলো খুলে যায় এবং ভিতরে ঈশ্বর প্রবেশ করেন—এমন যেন তিনি কেবল দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন, এবং ক্রমাগত কড়া নেড়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তুমি এতটাই উন্মনা হয়ে ছিলে…

কবির বলেনঃ যিনি সহজ করে দেখান পরমের পথ,

যে সব মানুষ জটিল পদ্ধতিতে শিক্ষা দেন, এই পদ্ধতি দ্বারা বোঝা যায় যে, তাদের কাছে ঈশ্বর প্রতিভাত নন—কারণ ঈশ্বরের কোন বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন নেই। এবং যে সব মানুষ তোমাকে জটিল পদ্ধতিতে শিক্ষা দেন তাদের জটিল পদ্ধতিতে শিক্ষা দেওয়ার একটা কারণ আছেঃ যাতে তারা সব সময় বলতে পারে যে, যদি তুমি এটা সঠিকভাবে না করো তবে কীভাবে তাঁকে পেতে পারো?

তোমরা কি খলিল জিবরানের এই চমৎকার গল্পটা শুনেছো?

একজন লোক শহর থেকে শহরে ঘুরে বেড়াতেন। তিনি একজন বিখ্যাত গুরু ছিলেন, এবং সবাইকে তিনি এটা বলতে অভ্যস্ত ছিলেন যে, “এসো, আমাকে অনুসরণ করো, আমি তোমাদের খোদার পথ দেখাবো।” কিন্তু মানুষজন ব্যস্ত ছিল, এবং তাদের হাজারটা কাজ করার ছিল। তারা বলত, “আমরা আপনাকে সেবা করি, শ্রদ্ধা করি, এবং একদিন আমরা আপনাকে অনুসরণ করবো—কিন্তু এখন সেটা বেশ কঠিন হবে।”

কেউ এই মুহূর্তে প্রস্তুত নয়—এ কারণে এত বেশি নকল গুরু টিকে থাকে। সেন্ট অগাস্টিন তার কনফেশনে বলেনঃ ‘যখন আমি তরুণ ছিলাম তখন আমি এভাবে প্রার্থনা করতে অভ্যস্ত ছিলাম, “ঈশ্বর আমাকে রক্ষা করুন, কিন্তু এখনই নয়। রক্ষা করুন কিন্তু এখনই নয়।”—কারণ আমি এমন অনেক বিষয়ের প্রতি আসক্ত ছিলাম’, তিনি বলেন, ‘এবং যা পাওয়া যায় তার সব কিছু আমি ভোগ করতে আগ্রহী ছিলাম। সুতরাং সেটা শীঘ্রই শোনার বিষয় ছিল না। আমি প্রার্থনা করতাম কারণ সেটা প্রথাবদ্ধভাবে বলতেই হত, কিন্তু আমি সর্বদা বলতাম, “আমাকে রক্ষা করুন ঈশ্বর কিন্তু ঠিক এখনই নয়।”’

সুতরাং সেই ধর্মোপদেষ্টা শহর থেকে শহরে ঘুরে বেড়াতেন, আর লোকজন বলত, ‘এখনই নয়। আমরা আসব একদিন।’ এবং তিনি খুব খুশি ছিলেন কারণ কেউ তাঁকে অনুসরণ করে নি ফলে কোন ঝামেলাও ছিল না। এক পাগল একদিন বলল, “ঠিক আছে, আমি আসছি।” তিনি একটু ভয় পেলেন, কিন্তু তিনি বললেন—তিনি খুবই খুব চতুর এবং ধুরন্ধর মানুষ ছিলেন— বললেন, ‘এসো।’ এবং তাকে এমন সব সাধন ক্রিয়াবিধি দিলেন যা করা প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু সেই লোকটা আসলেই পাগল ছিল। সে সব কাজ করত, এমন কি গুরু তাতে কোন ভুলও পেতেন না। সেই অবস্থা চলতে লাগল। গুরু ভাবলেন নিশ্চয় একদিন না একদিন সে হাল ছেড়ে দেবে।

এক বছর যায়, দু’বছর যায়, এবং সে বলে, “কখন?” ভক্তও সেই রকম! –এবং সে বারবার প্রশ্ন করে, ‘এখন আর কী করতে হবে আমাকে?’ এবং সে সবকিছু করেছিল। এমনকি গুরুও ভীত হয়েছিলেন—এখন তিনি তাকে আর কী করতে বলবেন? সে সবকিছু করেছে।

ছয় বছর পেরিয়ে গেলো, এবং একদিন ভক্ত বলল, ‘আর কত দিন আমাকে সাধনা করতে হবে? আমি এখনও সে সবকিছু করার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু আপনি আমাকে আর কোন কিছু দিচ্ছেন না।’ তিনি বললেন, ‘শোন, সত্য হলো, তোমার সঙ্গে থেকে আমি আমার পদ্ধতিকে হারিয়ে ফেলেছি। আমি জানতাম তিনি কোথায় আছেন, কিন্তু যবে থেকে তুমি এলে… তুমি আমায় ক্ষমা করো, আমাকে ত্যাগ করে যাও।’

জটিল পদ্ধতি চতুর মানুষের উদ্ভাবন। প্রথমত কেউ সেটা করতে চাইবে না; ভালো—তাহলে নকল গুরু টিকে থাকতে পারবে, কারণ তার পদ্ধতিগুলো কখনও পরীক্ষা করে দেখা হবে না। দ্বিতীয়ত, কেউ যদি সেটা করতেও চেষ্টা করে তবে সেটা এতই জটিল হবে যে, সব সময় এটা বলা যাবে তুমি কাজটা ঠিক ভাবে করো নি। সেগুলো এতই জটিল যে তুমি নিজের উপর আস্থা রাখতে পারবে না এবং সব সময় তুমি এই ভয়ে থাকবে যে কোথাও হয়ত কোন ভুল হচ্ছে। কিন্তু একজন প্রকৃত গুরু তোমাকে অত্যন্ত সহজ পদ্ধতি দেবেন—সাধারণ বুদ্ধিমত্তার সাধারণ স্বাস্থ্যের যে কোন মানুষ সেটা করতে পারবে।

যিনি সহজ করে দেখান পরমের পথ,
অনাচারী হয়ে…

তিনি কখনও তোমাকে প্রথগত ধর্মীয় আচার-বিধি এবং বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের শিক্ষা দেন না। তিনি তোমাকে উদযাপন শেখানে পারেন—কিন্তু কখনই বাহ্য লৌকিকতা নয়। উদযাপন হলো মর্মের বা হৃদয়ের বিষয় আর বাহ্য লৌকিকতা হলো কেবল মনের প্রথাগত অনুষ্ঠান।

যিনি তোমার সবদিক রুদ্ধ করে কুম্ভক করতে বলেন না,
বলেন না বৈরাগী হতে…

প্রকৃত গুরু হলেন জগতের জন্য সবকিছু, কারণ এ জগত হলো ঈশ্বরের প্রকাশ। এ জগত ঈশ্বরময়। প্রতিটা শৈল এমন ঈশ্বরময়, প্রতিটা গাছ, পাখি, এবং এই সমগ্র অস্তিত্ব এমন ঈশ্বরময়, ঈশ্বরে উদ্বেলিত… উছলান… উচ্ছ্বসিত… কোথায় যাবে? এবং কেন? কাকে ত্যাগ করবে? এবং কেন ত্যাগ করবে? এবং কীভাবে তুমি ত্যাগ করতে পারো?—কারণ সর্বত্র তুমি তাঁরই মাঝে বিরাজ করছো, তুমি যেখানেই থাকো না কেন এই জগতেই আছো… কারণ আর কোন জগত নাই।

যিনি তোমার সবদিক রুদ্ধ করে কুম্ভক করতে বলেন না,
বলেন না বৈরাগী হতে।
যেখানে আসক্তি সেখানেইদেন পরমের দর্শন…
কেবল এই সূত্রটির সৌন্দর্য খেয়াল করো। কবির বলছেনঃ
যেখানে আসক্তি সেখানেইদেন পরমের দর্শন…

তিনি বলছেনঃ চিন্তা করো না। যখনই তোমার মনে আসক্তি আসে, সেই আসক্তির কারণে ভয় পাবে নাঃ তার গভীরে প্রবেশ করো এবং সেখানে তাঁকে খোঁজার চেষ্টা করো… এবং তুমি সেখানে তাঁকে খুঁজে পাবে। তুমি একজন নারীকে ভালোবাসো —তার থেকে পালানোর প্রয়োজন নাইঃ তার নয়নের গভীরে চাও… এবং তুমি সেখানে ঈশ্বরের দেখা পাবে। ঈশ্বর সবখানেই উথলে পড়ছেন। তুমি তোমার সন্তানকে ভালোবাসো—এই সন্তান ফেলে পালিয়ে বৈরাগী হয়ো না এবং এই বুভুক্ষ, হিংস্র, কদর্য জগতের মাঝে তোমার সন্তানকে ফেলে পলায়ন করো না, এই সব নেকড়েদের মাঝে তোমার সন্তানকে ছেড়ে যেও নাঃ তোমার সন্তানের নয়নের গভীরে চাও। তার হৃদয়ে কান পাতো এবং গভীরভাবে শোন… এবং সেখানে তুমি ঈশ্বরের দেখা পাবে।

কবির বলছেনঃ নিঃশর্তভাবে, মন যেখানে সংযুক্ত হয়, সেখানে পরমের উপলব্ধি হয়।

আমি একজন মানুষ সম্পর্কে শুনেছিলাম যিনি কবিরের কাছে এসেছিলেন এবং তিনি ঈশ্বরকে জানতে চেয়েছিলেন, এবং কবির তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, “তুমি কি কাউকে ভালোবাসো না?”

লোকটি বলেছিল, “দুঃখিত, আমি কাউকে ভালোবাসি না।”

কবির বলেছিলেন, “এই কেউ তোমাকে ঈশ্বর দর্শন করাবে, কিন্তু তুমি ভালোবাসো —কারণ ভালোবাসা বা প্রেম ছাড়া তার সাথে যোগাযোগের কোন সেতু নাই।”

লোকটি একটু লজ্জিত হলো এবং তারপর স্বীকার করল, “জ্বী, আমি ভালোবাসি। আমি আমার গাভীটাকে ভালোবাসি।”  সে একজন দরিদ্র মানুষ এবং একটা গাভী ছাড়া তার আর কিছুই ছিল না।

কবির বলেন, “খুব ভালো। এতেই চলবে।”

লোকটা জানতে চাইল, “তবে এখন আমাকে কী করতে হবে?”

তিনি বলেন, “এখন তুমি এটা ভাবতে শুরু করো যে গাভীটি ঐশ্বরিক। এখন সেটা আর কেবল একটা গাভী নয়; সে তোমার ভগবান, দেবী। তুমি তাকে সেবা দাও, ভালোবাসো, মৃদু চাপড় মেরে আদর করো, স্নান করাও, তুমি সবকিছু করো—কিন্তু সে এখন ঐশ্বরিক, দেবী। ঈশ্বর সেখানে প্রচ্ছন্ন হয়ে আছেন। এবং তিনি মাস পরে এসো।”

তিন মাস পরে সেই মানুষটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষে পরিণত হয়েছিলেন, নতুন শক্তিতে দীপ্তিশীল। কবিরের ভক্তরা একটা ধাঁধায় পড়েছিল—‘ তিনি কি এই লোকটির সাথে মজা করছেন?’ কিন্তু যখন সেই মানুষটি ফিরে এলো, তারা বিস্মিত হয়ে গেলো। তিনি প্রায় এক নতুন মানবে পরিণত হয়েছেন, এক নতুন সত্তা; এবং তিনি কবিরের চরণে পড়ে বললেন, “এটা অসাধারণ বিষয় ছিল! আমি আমার ঈশ্বরের দেখা পেয়েছি। এবং যেদিন আমি আমার গাভীটির মাঝে তাঁর দেখা পেলাম, সেদিন সর্বত্রই তাঁর দেখা পেয়েছি।”

যখনই তুমি প্রেমে পতিত হও, সেটা ত্যাগ করে পালানোর প্রয়োজন নেই। তোমার প্রেমকে প্রার্থনায় পরিণত হতে দাও।

নিরন্তর সুখময় অবস্থাহলে,ভয় থাকে না মনে,

সকল আনন্দের মাঝে থাকেন তাঁর ধেয়ানে।

এবং কবির বলছেনঃ আনন্দ উদযাপন করা থেকে বিরত হয়ো না। স্মরণ রেখো, এগুলো তাঁর উপহার। এবং পার্থিব ক্রিয়াকর্ম থেকে পলায়ন করো না; অক্রিয়, প্যাসিভ হয়ে থাকো। ভিড়ের মাঝে যাও এবং একা থাকো। আসল বিষয় হলো একা থাকা—নিঃসংঙ্গ হওয়া নয়। এবং একজন মানুষ ভিড়ের মাঝেও একা হতে পারে, এবং হিমালয়ের গুহার মাঝে বসেও তুমি ভিড়ের মাঝে হতে পারো—এই সবকিছু নির্ভর করে তোমার মনের উপর। সুতরাং, পরিবর্তন হতে হবে ভিতর থেকে, বাইরে থেকে নয়।

সর্বত্রসীমার মাঝে অসীমের বাস…
পৃথিবী, আকাশে,বাতাসে,পানিতে…
শূন্যে পাতা সাধকের সুদৃঢ় আসন।
যিনি সীমার মাঝে অসীমঃ আমি তাঁকে দেখি আর কেউ নয়।

তুমি কেবল নিজে শূন্য হও। নিজে শূন্য হও, শূন্যস্থান হও… এবং তুমি ঈশ্বরের আসনে পরিণত হবে, তুমি তাঁর আবাস হবে, তুমি উপাসনগৃহে রূপান্তরিত হবে।

ও ভাই, যখন আমি ভুলেছিলাম,
সদগুরু আমায় পথের দিশা দিলেন।
আমি অনাচারী হলাম……

যখন তুমি তোমার গুরুর সন্ধান পেয়েছো তখন আচার-অনুষ্ঠান আর তোমার কী কাজে আসবে? যখন তুমি একজন গুরুর জীবন্ত প্রতিরূপ খুঁজে পেয়েছো তখন প্রথা বা ধর্মগ্রন্থের কি প্রয়োজন? যখন আমি আমার গুরুকে পেলাম…

আমি অনাচারী হলাম,
না স্নাত হলাম আর গঙ্গাজলে।
জানলাম কেবল আমিই অপ্রকৃতিস্থ ছিলাম,
আর সবাই প্রকৃতিস্থ;
এবং আমি তাদের বিরক্ত করেছি……
এই অভিজ্ঞতা তোমাদেরও হবে, সকল সন্যাসিদের। লোকজন ভাববে তুমি পাগল।

এবং কবির বলছেনঃ যখন থেকে আমি বোকামিপূর্ণ বিষয় ত্যাগ করলাম—আমি আর পবিত্র গঙ্গাজলে স্নাত হলাম না এবং কোন মন্দিরেও গেলাম না এবং আমি কোন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানও পালন করলাম না—মানুষ ভাবলো আমি উন্মাদ হয়ে গেছি। যখনই তুমি কোন প্রকৃত গুরুর নিকটবর্তী হবে, এই পৃথিবী ভাববে তুমি অপ্রকৃতিস্থ হয়ে গেছো। তারা সবাই প্রকৃতিস্থ, বিজ্ঞ মানুষ। অথচ তাদের প্রজ্ঞা কোন দিকে পরিচালিত করে নি, তাদের এই প্রকৃতিস্থতার বড়াই এক মুহূর্তের  জন্যও তাদের সুখময় অবস্থার অনুভব দেয় নি। তাদের এই প্রকৃতিস্থতা দুরাবস্থা ছাড়া কিছুই নয়, এবং তাদের প্রজ্ঞা মূঢ়তা ছাড়া আর কিছুই নয়—কিন্তু তারা এখনও ভাবে যে তারাই প্রকৃতিস্থ, তারাই প্রজ্ঞাবান, তাহলে তাদের পরম সুখময় হওয়া উচিত। যদি তারা প্রকৃতই প্রকৃতিস্থ হয় তবে তাদের মাঝে বুদ্ধিমত্তা এবং সৃজনশীলতা দেখতে পাওয়ার কথা। কিন্তু তাদের মধ্যে এ সবের কিছুই দেখা যায় না।

কিন্তু যে মানুষ একজন প্রকৃত গুরুর নিগুঢ় সান্নিধ্যে এসেছে এবং তাঁর সত্তা দ্বারা আলোকিত, রঞ্জিত হয়েছে তাকে পাগল মনে হবে। সব সময়ই এটা এমন হয়, এবং সব সময় এটা এমনই হবে। এ কারণে লোকজন ভাবে যে তুমি পাগল, উন্মাদ, চিন্তা করো না—কবির সম্পর্কেও তারা এমনটিই ভেবেছিল।

জানলাম কেবল আমিই অপ্রকৃতিস্থ ছিলাম,
আর সবাই প্রকৃতিস্থ;
এবং আমি তাদের বিরক্ত করেছি।
তখন জেনেছি কীভাবে ধুলোর মাঝে সেজদায় লুটাতে হয়।
তাই এখন আর না বাজাই ঘণ্টা মন্দিরে,
না করি স্থাপন বিগ্রহ সিংহাসনে,
করি না পুষ্পপূজো কোন প্রতিমার।
এটা তো তপশ্চর্যা নয়, নয় ঈশ্বরকে খুশি করতে দমিত কামনা।

এবং কবির ঘোষণা দিচ্ছেনঃ যদি তুমি নিজেকে দমিত করো তবে তুমি একজন বিকৃত মানুষ, এবং ঈশ্বর তোমার সঙ্গে তৃপ্ত হবেন না। যদি তুমি নিজেকে পীড়ন করো তবে তুমি একজন মর্ষকামী, এবং ঈশ্বর তোমার সঙ্গে খুশি হবেন না। ঈশ্বর খুশি হন যখন তুমি খুশি থাকো। তোমার সুখেই ঈশ্বরের সুখ… কারণ তিনি তোমার অন্তরতমস্তে লুকিয়ে আছেন। যখন তুমি নিজেকে পীড়ন করো তখন তুমি ঈশ্বরকেই পীড়ন করো—তবে তিনি কীভাবে খুশি হতে পারেন? যখন তুমি একজন মর্ষকামী হয়ে ওঠো এবং মানুষ তোমাকে মহাত্মাজ্ঞানে পূজো করতে থাকে, তুমি তখন একজন মর্ষকামী, একজন বিকৃত মানুষ, উন্মাদ—এবং নিজের মাঝে ঈশ্বরকে পীড়ন করে চলেছো।

তিনি অনুপায়, একটা ছোট শিশুর মত অনুপায়। তুমি তাঁকে খুব সহজভাবেই পীড়ন করতে পারো।
এটা তো তপশ্চর্যা নয়, নয় ঈশ্বরকে খুশি করতে দমিত কামনা।
যখন তুমি আবরণহীন, হত ইন্দ্রিয়সমূহ,
তখন তুমি ঈশ্বরকে তুষ্ট করতে পারো না…

এই অদম্য প্রবচন গুলো শোন। এটা এমন নয় যে যখন তুমি তোমার ইন্দ্রিয়গুলো ধ্বংস করে ফেলবে তখন ঈশ্বর খুশি হবেন, তিনি খুশি হন যখন তোমার সংবেদনশীলতা সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছায়। যখন তুমি এই জগতের আরো যৌন্দর্য দেখতে পাও, যখন তুমি শুনতে পাও আরো সুর এই পৃথিবীর, যখন তুমি আরো গভীর প্রেমে নিমজ্জিত হও, যখন তুমি আরো প্রাণবন্ত সচেতন হতে পারো, তিনি তখন খুশি হন।

যখন তুমি আবরণহীন, হত ইন্দ্রিয়সমূহ,
তখন তুমি ঈশ্বরকে তুষ্ট করতে পারো না।
যে মানুষ দয়ালু এবং ন্যয়নিষ্ঠ সাধক,
যিনি জগতের সকল কাজের মাঝে অক্রিয়,
যিনি জগতের সকল সৃষ্টিকে নিজের সত্তা মেনেছেন,
তিনিই অর্জন করেন অবিনশ্বরতা,
ঈশ্বর নিরন্তর তাঁর সাথেই থাকেন।
কবির বলেনঃ তিনিই সত্যনাম অর্জন করেন যাঁর কথা বিশুদ্ধ,
এবং যিনি অহং মুক্ত।

dKbSRwfoFq1Oo5e1pTfQYjl72eJkfbmt4t8yenImKBVvK0kTmF0xjctABnaLJIm9যিনি নিজের প্রতি এবং অন্যদের প্রতি সদয়, কেবল তিনিই নিজেকে এবং অন্যকে ভালোবাসেন… তোমাকে শেখানো হয়েছেঃ ‘কখনও নিজেকে ভালোবেসো না।’ তোমাকে শেখানো হয়েছেঃ ‘কখনও নিজের প্রতি সদয় হয়ো না।’ তোমাকে কখনও নিজেকে ক্ষমা করতে শেখানো হয় নি। তোমাকে বহু আত্মপীড়নের শিক্ষা দেয়া হয়েছেঃ তুমি যত নিজেকে পীড়ন করো সে অনুপাতেই তোমাকে বাহবা দেয়া হয়। যদি তুমি একজন মহাত্মা হতে চাও তবে তোমাকে মর্ষকামী হতে হবে—এছাড়া আর কোন উপায় নাই। যদি তুমি আনন্দময়, উৎফুল্ল, উল্লসিত হও, তবে কেউ তোমাকে পূজো করতে যাচ্ছে না। কে একজন আনন্দময় মানুষকে আরাধনা করে? কোন আনন্দময় মানুষকে তুমি কখনও আরাধিত হতে দেখেছো? মানুষ বিষন্ন লম্বা মুখের মানুষকে পূজো করে, নিষ্প্রাণ, নিস্তেজ, নির্বোধ মানুষদের পূজো করে যারা নিজেদের পীড়ন করতে পারে। তাদের একমাত্র আর্ট হলো যে তারা নিজেদের পীড়ন করতে পারে; তারা নিজেদের প্রতি হিংস্র হতে পারে, নিষ্ঠুর হতে পারে।

কবির বলছেনঃ সদয় হও, এবং তোমার ভিতর দিয়ে এই সদাশয়তাকে প্রবাহমান হতে দাও। নিজেকে ভালোবাসো, কেবল তাহলেই তুমি অন্যকে ভালোবাসতে পারবে। গভীর প্রেমে, গভীর সংবেদনশীলতায়, ঈশ্বর পরিতুষ্ট হন।

আসল বিষয় হলো তোমাকে অধ্যাত্মিক প্রেয়োবাদী বা আনন্দবাদী (hedonist)  হতে হবে। এটাই আমার সমগ্র শিক্ষাঃ একজন অধ্যাত্মিক প্রেয়োবাদী হওয়া। অধ্যাত্মিক মানুষ মাত্রই প্রেয়োবাদী, কিন্তু অনেক প্রেয়োবাদী আছেন যারা অধ্যাত্মবাদী নন। পাশ্চাত্য প্রেয়োবাদী কিন্তু অধ্যাত্মিক নয়; জড়বাদী। প্রাচ্য অধ্যাত্মিক কিন্তু প্রেয়োবাদী নয়—এবং এরা উভয়েই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। একটা উচ্চতর সংশ্লেষণ প্রয়োজনঃ আনন্দবাদ এবং অধ্যাত্মবাদ। যখন তাদের সম্মেলন হয়, তখন এক পূর্ণাঙ্গ মানুষের জন্ম হয়। এবং সেই পূর্ণাঙ্গ মানুষই আলোকিত, স্বম্বুদ্ধ, সেই পূর্ণ মানুষই ধার্মিক মানুষ।

  1. https://www.youtube.com/watch?v=waOosA3Rf1g
  2. https://www.youtube.com/watch?v=Dr83axn1IbM

………………….

11101258_941752502530934_276125119434617653_n
তোরিফা নাজমিনা মণি

Advertisements