Patrick-Modiano-les-cinq-chefs-d-oeuvre-du-nouveau-Prix-Nobelনোবেল লরিয়েট, ফ্রেঞ্চ উপন্যাসিক প্যাট্রিক মোদিয়ানোর চৌদ্দতম উপন্যাস হলো, আউট অফ দা ডার্ক। ১৯৯৬-এ প্রথম প্রকাশের পর ফ্রান্স’র পাঠক সমাজে ব্যাপক সাড়া জাগায় এই উপন্যাসটি। মোদিয়ানো তখনো বিশ্বজুড়ে অতো নামকরা কোনো লেখক ছিলেন না। ২০১৪ সালে তার ঝুলিতে নোবেল পুরস্কার পড়লে সারা বিশ্বের সাহিত্য অঙ্গনে সাড়া পড়ে যায়; কেন এক স্বল্প পরিচিত লেখক এই সর্বোচ্চ সম্মান-সূচক পুরস্কার পেলেন! সাহিত্য অঙ্গনে ঝড় ওঠে, বিচার-বিশ্লেষণ শুরু হয় তার কাজ নিয়ে। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে জানার জন্য, মোদিয়ানো কি ফর্মে লেখেন।

মোদিয়ানো একটা সম্পুর্ন নতুন ফর্মে আউট অফ দা ডার্ক লেখেন, যা পাঠকদের কাছে অপরিচিত ছিল। তিনি অসংখ্য চরিত্র বা অনেক খণ্ডিত প্লট ব্যাবহার করে উপ্যনাসকে এগিয়ে নিয়ে যান না। চরিত্রদের অন্তর-জগতের কথা খুব সামান্যই বলেন। তাঁর চরিত্ররা আগাগোড়া বোহেমিয়ান। তাদেরকে দেখা যায় প্যারিসের অথবা লন্ডনের রাস্তায়, ক্যাফে, হোটেলে। আউট অফ দা ডার্কের কোন চরিত্রের স্থায়ী কোন বাসস্থান নেই।

উপন্যাসের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কোথাও আমরা বর্ণনাকারীর নাম খুঁজে পাই না! লেখক তিরিশ বছর আগেকার নিজেরই ভবঘুরে ছাত্রজীবনের কথা প্রথমপুরুষে বর্ণনা করছেন সারা উপন্যাসে। উপন্যাসটির পটভূমি গড়ে উঠেছে প্যারিস ও লন্ডনে। ১৯৯৫ সালে দাঁড়িয়ে লেখক তিরিশ বছর আগেকার কাহিনী বর্ণনা করছেন, যখন তিনি পড়াশোনা ছেড়ে পুরানো আর্ট-বই বিক্রি শুরু করেন। প্যারিসে অবস্থানের সেই সময়ে পরিচিত হন জেরার্ড ভান বিভার ও জ্যাকুলিনের সাথে, যাদের স্বপ্ন ছিল রুলেতে একটা বড় বাজিমাত করে দ্রুত অর্থ উপার্জন করার।

লেখক জ্যাকুলিনের প্রেমে পড়েন, অথচ এটা স্পষ্ট হয় না যে- জ্যাকুলিন তার প্রেমে পড়েছে। আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় জ্যাকুলিন বিভার’র প্রতি বেশি অনুভূতিশীল। লেখক তার প্রতি জ্যাকুলিনের শীতল আচরণের জন্য ভিতরে ভিতরে ঈর্ষা বোধ করতে থাকেন। হঠাৎ তাদের এই ট্রায়ো সম্পর্কের মাঝে এসে হাজির হয় বিভারের এক জুয়াড়ি বন্ধু কার্টুড, যে পেশায় একজন ডেন্টিস্ট। জ্যাকুলিন কার্টুডের সাথে ঘনিষ্ট হয়, এবং এক সময় সে লেখককে খুলে বলে কার্টুডের সাথে ঘনিষ্ট  হবার কারণ। জ্যাকুলিন লেখককে কার্টুডের গচ্ছিত টাকা চুরি করার প্ল্যান খুলে বলে এবং এ ব্যাপারে তাকে সাহায্য করতে বলে। লেখক এতে রাজী হন। জ্যকুলিন তার হাতে কার্টুডের এ্যপার্টমেন্টের ডুপ্লিকেট চাবি তুলে দিয়ে বলে কার্টুডের সাথে সে যখন তার হোটেল-রুমে রাত যাপন করবে সেই সময় লেখক যেন তার টাকা ভরা ব্রিফকেসটা নিয়ে আসে। লেখক কার্টুডের ব্রিফকেস চুরি করে আনে এবং ওই রাতেই প্যারিস ত্যাগ করে লন্ডনে পাড়ি জমায়! আউট অফ দা ডার্কের প্যারিসের প্রথম পর্ব এখানেই শেষ।

২.

প্যারিস-পর্বে এই চারটি চরিত্রের প্রাত্যহিক জীবনযত্রার বর্ণনাই এগিয়ে নিয়ে যায় উপন্যাসের গল্পকে। এর সাথে যোগ হয় ক্যাফে দান্তে, সিন নদী, তূর্নেল হোটেল, হোটেল দ্য লিমা, আর প্যারিসের বুলভার্ডগুলো, যেখানে তাদের নিয়ত ঘুরে বেড়াতে দেখা যেতো। এই স্থানগুলো যেন এক একটা চরিত্র হয়ে পাঠকদের মাঝে উপস্থিত হয়। লক্ষ্যনীয় যে, লেখক কখনই তার এই কেন্দ্রীয় চরিত্রদের অন্তর্জগতের বর্ণনা দেন না, অথচ তাদের দিনলিপির বর্ণনায় পাঠকদের মনে তাদের মনোজগতের একটা ধারণা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটাই মোদিয়ানোকে অন্য লেখকদের থেকে আলাদা করেছে।

জ্যাকুলিন ও লেখক লন্ডনে এসে অনুভব করে যে তাদের চারপাশের সবকিছু অপরিচিত। আবার তদের দেখা যায় প্যারিসের মতোই লন্ডনের ক্যাফেতে সময় কাটাতে, যেখানে তারা পরিচিত হয় র‍্যাচমান ও লিন্ডার সাথে। তারাও এদেরই মতন বোহেমিয়ান।

৩.

এখানেই লেখক প্রেরণা পান লেখার। তিনি হঠাৎ-ই একদিন কাগজ-কলম কিনে লেখা শুরু করেন পার্কে বসে। জ্যকুলিন ও লেখকের লণ্ডন-বাস স্থায়ী হয় মাত্র মাসদুয়েক। এক রাতে লেখক দেখেন জ্যাকুলিন তার হোটেল-রুমে আর ফিরে আসে না। আর এভাবে, এখানেই লন্ডন-পর্বের ইতি হয়।

মোদিয়ানোর কোন চরিত্রই অন্যান্য লেখকদের চরিত্রের মতো কোনো পরিণতিতে পৌঁছায় না। এমনকি এরপরে মোদিয়ানো এমন কোনো ঘটনার বর্ননা দেন না, যাতে করে পাঠকরা বুঝতে পারে যে কাহিনী বর্ণনাকারী, যে এই উপ্যনাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র, সে পরবর্তীতে আর কোনো পরিণতিতে পৌঁছাল কি না।

1418238528_189768_1418239167_noticia_normalএবার মোদিয়ানো পাঠকদের নিয়ে যান প্যারিসের দ্বিতীয় পর্বে- পনের বছর পরে। লেখক প্যারিসে ফেরেন। মোদিয়ানো এমন কিছু বলেন না যাতে করে পাঠকরা বুঝতে পারে এতদিন কাহিনী বর্ণনাকারী কোথায় ছিল, আর প্যারিসেই বা কেন ফিরে এলো। হঠাৎ ঘটনাক্রমে তার জাকুলিনের সাথে দেখা হয়ে যায়। লেখক তাকে অনুসরণ করে এক পার্টিতে তার সাথে মিলিত হয়। জ্যাকুলিন তখন নতুন নামে পরিচিত। জর্জ নামের একজনকে বিয়ে করে সেটেল্ড হয়েছে। দেখা হবার পর জ্যাকুলিন তাকে না চেনার ভান করে। অবশেষে জ্যাকুলিন তার স্বামীর অগোচরে লেখকের সাথে কথা বলে স্বীকার করে সে জ্যাকুলিন।

মোদিয়ানো এখানেও পাঠকদের কোন ক্লু দেন না যে কেন সে রাতে জ্যাকুলিন তাকে ছেড়ে গিয়েছিল। মোদিয়ানো যেন জ্যাকুলিনের মাঝে দেখিয়ে দেন আজকের মানুষদের এ্যলিয়েনেসনের ক্রাইসিস, যেখানে মানুষ নিজেই জানে না যে সে কী করবে। মোদিয়ানো শুধু ঘটনা বর্ননা করে যান, আর তা পাঠকদের টেনে নিয়ে যায় তাদের মনোজগতে! এটা যেন সম্পূর্ণ এক নতুন স্টাইল, যা মোদিয়ানোকে অন্যান্য লেখকদের থেকে আলাদা করেছে।

মোদিয়ানো তার এই উপন্যাসের টাইমপ্লটে পরবর্তীতে আরো পনের বছর যোগ করেন। অর্থাৎ তাদের এই দেখা হবার পনের বছর পরে আবারো জ্যকুলিনের সাথে দেখা হয়। তবে…

৪.

এবার দূর থেকে দেখা। লেখক তার সামনে এসে দাঁড়ায় না। সারা উপন্যাসে মোদিয়ানো কোনো কাব্যিক বর্ণনা দেন না, অথচ শেষ করেন অনবদ্য কাব্যময়তায়। তিনি উপন্যাসটির ইতি টানেন রিউ দ্যা প্যারিসের ক্যাফের কাব্যিক বর্ণনায়, যে স্থান ঘুমায় না; জেগে থাকে রাতের আঁধারে কোনো কারণ ছাড়াই, আলো জ্বেলে!

551f22b716ab8139ac3a2a5452a2610d-w204@1xজয়েসের ইউলিসিসের একটা প্রচ্ছন্ন ছায়া যেন দেখতে পাওয়া যায় আউট অফ দ্যা ডার্কে; যেখানে চরিত্ররা পথচারী। পথেই যেন বেড়ে ওঠে। তারা জানে না যে তারা কি চায়, কি তাদের উদ্দেশ্য, জীবনের লক্ষ্যই বা কী? পার্থক্য যে জয়েস তার মহাকাব্যিক বর্ণনা দিয়েছেন মাত্র চব্বিশ ঘন্টার টাইমফ্রেমে গল্পকে অজস্র চরিত্রের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে, আর মোদিয়ানো নিয়েছেন তিরিশ বছর। জয়েসের গল্প শেষ চরিত্রদের চূড়ান্ত পরিণতিতে, আর মোদিয়ানো শেষ করেন এক চূড়ান্ত অসম্পূর্ণতায়। ঠিক যেন আজকের বিশ্বায়িত পৃথিবীর অনিশ্চিত যাপিত জীবনের মত।

 

Advertisements