painting-232কবিকে বলা হয় ভাষার অধিপতি। ভাষার অনুগামী যে- কোনো শিল্প-শাখায় তাই কবিরা যুগে যুগে যখনই হাত দিয়েছেন, তাদের হাতে সেই শাখা ফুলে-ফসলে আলাদাভাবেই তাৎপর্যময় এক মাত্রায় শোভিত হয়েছে।

প্রসঙ্গসূত্রে আমরা গান, গীতিকবিতার দিকে তাকালেই দেখতে পারি, এক সুদীর্ঘকাল এইখানে ছিল কবিদের একচেটিয়া আধিপত্য। ওরাল ট্র্যাডিশনের বাইরে কবিতাকে যখন লেখ্যরূপে বিরাজ করতে হয়েছে, তখন গানের সাথে কবিদের সেই বাঁধন কিছু শিথিল হলেও আজও একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। বরং গানের কথা নির্মাণে সবসময়ই কবির লেখা উৎকর্ষের দিক দিয়ে বিশিষ্ট। ফলে, ‘কবির লেখা গান’র ব্যাপারে বহুবিধ সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, শৈল্পিক কারণে নকটার্ন বিশেষ মাত্রায় আগ্রহী।

তারই সূত্র ধরে, এই আয়োজন। এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা আমরা করবো। আমরা চেষ্টা করবো এমন কিছু লেখার একটা ছোট্ট সংগ্রহ দাঁড় করাতে। এই আয়োজনে প্রকাশিত যে-কোনো লেখাই লেখকের অনুমতি ছাড়া ব্যবহার আইনগত ভাবেই নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য। এর সকল সত্ত্ব লেখকের।–   নকটার্ন

 

১.
এ কী এ অদ্ভূত ভুবন!                                এ কেমন চিহ্ননাশী!
আঁধারে ভেসে এসে                                   আঁধারে ফের তো ভাসি!
নকশা-কাটা ঝর্‌কা-কাটা                        এই পথে আর যায় না হাঁটা—
ও তুমি শুনেছিলে তখন                             যে-বাজা বাজল বাঁশি?

এই মাংস ক্ষ’য়ে ক্ষ’য়ে                                রোদ-শুকোনো ক্ষীরের পানা,
রোদ্দুরে পায় যে পানা,                                আহা! রোদ্দুরে হয় যে ফানা!
কোথা কোন্ মনের মানুষ,                         চলো যাই দেখে আসি।

সকলে সন্ধেকালে                                        ঘরে গে’ কী দেখতে পায়?
চটি এক, ভাঙা ছড়ি,                                   যেন কার দুষ্প্রাপ্যতায়!
আহা রে, গড়াগড়ি,                                      বাতাসে লটরপটর,
যদি না তুই তা ধরিস,                                   যদি না হাসিস হাসি!

এই পালাতে মেলা গলা,                               এই বুদ্‌বুদ্ ফাটায়ে দে,
বিষ্ণু পড়ে চক্রে কাটা,                                 শম্ভু মরে কম্বু কেঁদে—
এ-জীবন ধ’রেই সবাই                                 মিলে রই আমরা ক’ ভাই,
যেমতো আজ্ঞা করেন                                 শ্রীমা— স্বর্বিনাশী।

আসে সে বেভোল ভোলা                             অনাহত দণ্ড-হাতে—
তুমি তায় ফিরিয়ে দেবে?                              নাকি তায় রাখবে সাথে?
নাকি তার দণ্ড নেবে?                                  নাকি তার নেবে ফাঁসি?

(ঢাকা, ডিসেম্বর ১৯৯৭)

 

২.
কে তুমি আমায় খোঁজো                                 বিধুহীন বিধুর রাতে
নিয়নে পাস্তরিত                                             জায়নের সাত-তলাতে?
কে তুমি সন্ধিকালে                                         মেপলের পত্র-হাতে
ঘুরিছ গগনকোণে কোনো                              শ্বেত- বামন না’ তে?

হেই হোজান্না নেমেছে মান্না,        থেমেছে কান্না, ডিমিটার, বুকের খাতে?
হেই হোজান্না নেমেছে মান্না,        কত তামান্না জুড়েছে সুরের সাথে!

কে গো নিজ- রক্তে নাচো                              আমদির যন্ত্রণাতে?
মরণের অন্ধকারে                                          স্মরণের কী-মৌতাতে?
এ-জীবন উদ্‌যাপনের                                    পিছনে যে-পথ, তাতে
কেন, হায়, ঘুরছ তুমি?                                   আমি এই— খোলা হাতে!

হেই হোজান্না নেমেছে মান্না,       থেমেছে কান্না, মরুময় আরাফাতে?
হেই হোজান্না নেমেছে মান্না,        কত তামান্না জুড়েছে সুরের সাথে!

কে তুমি?
কে তুমি?
কথা বলো!
কথা বলো!
বিধুর রাতে—
বিধুহীন বিধুর রাতে—
কে তুমি?

(ঢাকা, ১৯৯০)

 

৩.
হারানো সুরটি আমি কোথা খুঁজে পাই
এত দূর-সম্ভাবনায়?
চলতে-চলতে টলি, টলতে-টলতে চলি
রাতের পরে রাত কত কানাগলি—
হারানো সুরটি আমি কোথা খুঁজে পাই?

সে-ই তো আমারে দেখে নেমেছিল নিজে থেকে
সন্ধ্যাতারার মতো একাকী,
সে-ই তো আমার পানে, সকরুণ আঁখি,
উড়িয়ে দিয়েছিল হিরামন পাখি—
হারানো সুরটি আমি কোথা খুঁজে পাই?

সে-ই তো নিদালি-হাতে রাতের দোলনাতে
আমারে পাড়াল কত স্বপ্ন!
সে-ই তো এ-নীলসুতা বেঁধে দিল পাঁজরে,
তারপর কত রাত কত-না বালুচরে
আমি তার সাহানায় মগ্ন…
হারানো সুরটি আমি কোথা খুঁজে পাই?

সেই সুতার গুটিটি কখন যে গেল টুটে,
কোথায় গেল ছুটে শৈশব…
হারানো সুরটি আমি কোথা খুঁজে পাই
এত দূর-সম্ভাবনায়?

(ঢাকা, ১৯৯০)

emerald night light

৪.

বুড়ো কাক নামে হায়                      অন্ধকার
কুয়াশায় ডুবে যায় দু’টি পার
দু’টি                    চোখে তার
হায়          সে কী যে দীর্ঘ ঘুম

কার্নিসে রক্তচোখ           জালালি কবুতর
উনিশে সেপ্টেম্বর       এক উড়ো অখবর
হায়                            সে কী যে        দীর্ঘ ঘুম

থামল ঝড়
ক্লান্ত             মাস্তুলে
থামল ঝড়
অষ্ট-          পাশ খুলে

অতঃপর দেখা যায়           খোলসা জলসাঘর
কার্নিসে রক্তচোখ         জালালি কবুতর
আরে                                       কী খবর
হায়                            সে কী যে      দীর্ঘ ঘুম

থামল ঝড়
য়ুঙের                      খাবনামায়
থামল ঝড়
রক্ত-                         রিক্ততায়

শুধু ঐ মেয়েকে      কে বোঝায়
আর কী                 লাভ খোঁজায়
যে ম’রে কাঠ সাতশ’ সাল রোজায়
হায়                          সে কী যে      দীর্ঘ ঘুম

হায়                          সে কী যে      দীর্ঘ ঘুম

(ঢাকা, ১৯৯০)

 

৫.
দিন
দিন
দৈনন্দিন
কেঁপে
কেঁপে
যায়
সমাধির
তৃণ
মাগ্‌দালেনা
আহা
মন
মানে
না
আহা
অধ্যবসায়
দিন
দিন
দৈনন্দিন

(ঢাকা, ১৯৮৯)

 

.
আমার        মাথার ভিতরে
কত            ওড়না যে ওড়ে
ফাল্গুন-বাতাসে
আহা           আমারই নিশ্বাসে
কত            ওড়না যে ওড়ে
ঝিকিমিকি
চিকিমিকি
তারা-খচা
ভাই রে

আমি            ওড়না সরালে
দেখি            তাহার আড়ালে
ঝিকিমিকি
চিকিমিকি
তারা-খচা
রাত
আর এক কুণ্ঠা-ভরা হাত

আমি            ভাবি বিস্ময়ে
এ-সব          আমার কি নহে
আমি            মাথারে শুধাই
কত               জটিল জল্পনাই
কেন কী শখে
এমন অসুখে
ফাল্গুন-বাতাসে
নিশ্বাসে নিশ্বাসে
ঝিকিমিকি
চিকিমিকি
তারা-খচা
ভাই রে

(রাজশাহি, ১৯৯২)

 

৭.
ঐ কে ডাকে আমায় আকাশ-চূড়ায় রে আকাশ-চূড়ায়
তোড়ে-জোড়ে জীবন ফুরায় রে জীবন ফুরায়
ওগো মধুরকোমলকান্ত তুমি আমারে খালাস করো সময়ের কারাগার থেকে
কিংবা এবে চুপ করো চুপ করো চুপ করো মোরো না আমারে ডেকে-ডেকে
আমি তো জেনেছি এই কালো হিম আলো এই আলোহিম ব্রহ্মপ্রজ্ঞাকণা
স্বপ্নে আর স্বপ্নভঙ্গে আমি আর কিছুই জানব না আমি কিছু জানব না

(ঢাকা, ডিসেম্বর ১৯৯৭)

 

৮.
ঐ রে!                  আমার হাড়ের মধ্যিখানে
কে ঢেলে দেয় অমিয়!
হাতের                   চামড়া ফুঁড়ে পালক বেরয়
পালক বেরয় পালক বেরয়
দুলতে আছে জমি-ও।

ওরে                    সাধ্য কি আর আছে আমার
নিজের চোখে নিজকে চেনার?
আহা                    অষ্টপ্রহর ঘুরে-ঘুরে
ঘুরে-ঘুরে উড়ে-উড়ে
আমায় আমি নমি, ও!

এই                       গন্ধরাজের কুঞ্জ থেকে
আমায় কেনে নিচ্ছে ডেকে?
আমার নাড়ির-বাঁধন নাড়ের-বাঁধন
নাড়ির-বাঁধন নাড়ের-বাঁধন
আমারে ভাই ক্ষমিয়ো।

হায়                       সাধ্য কি আর আছে আমার
একটিবারের জন্যে থামার?
ওগো                     একবারটি পিছন ফিরে
পিছন ফিরে পিছন ফিরে
চাও না দেখতে তুমিও?

(ঢাকা, জানুয়ারি ১৯৯৮)

 

৯.
বিস্ময়ে আকাশে             দেখেছি তাকিয়ে
রৌদ্রজল ভেদ ক’রে       এসেছে অর্চনা
আন্দান্তে আন্দান্তে           তন্দ্রাভ ঝরনা ॥

জ্বর-শেষে নিঃশ্বাসে         নিঃশ্বসে স্বস্ত্যয়ন
অন্তঃস্থ সন্তাপে                পুড়েছে কামনা
আন্দান্তে আন্দান্তে            তন্দ্রাভ ঝরনা ॥

শক্তিকে মর্ফিয়ুস              খেলেছে সাপুড়ে
উদাসীন রক্তে তাই            প্রগাঢ় বেদনা
আন্দান্তে আন্দান্তে            তন্দ্রাভ ঝরনা ॥

(ঢাকা, ১৯৯০)

 

১০.
এ আমার চন্দন নয়
এ শমীকাঠ
কতিহুঁ মদন তনু দহসি হামারি?

সন্ধ্যারতি সন্ধ্যাদীপের সাথে নেভে
রাতভর শোচনা এ কে নেবে
এ বাতুল বিলাস
ঘুণের আখর-পথে পশে
কতিহুঁ মদন তনু দহসি হামারি?

লাশ ভেসে আসে জঙ্ঘার কাছে
পঙ্কিল ঘুম পুঁজ শয্যায়
ত্রিভঙ্গ মুদ্রায়
আকাশের নির্বিকার মনুমেন্টে রক্ত গড়ায়
বিবর-বিদ্বেষ ওঠে তেতে
কতিহুঁ মদন তনু দহসি হামারি?

(ঢাকা, ১৯৯০)

nightlightspotlight

১১.
কী তোর মন্ত্রে,             কী তোর তন্ত্রে,
কী তোর রে ধ্যান          ব্যাখ্যানেই?
আসছে যারা                 সৃষ্টি ছাড়া,
আসছে রে তোর           সন্ধানেই।

তিসরা মনজিল              গগনকোণে
কান পেতে তোর           প্রলাপ শোনে,
যায় ছড়িয়ে                    পাঁচ-কানেই!

রক্তধারা                           শক্ত কারা
ভাঙল চুরল                    সবখানেই,
লাগায় টক্কর                   বোধের ফক্কড়,
চন্দ্রযান তোর                 লক্কড়ঝক্কড়,
ঢুকল সোজা                    আসমানেই?

সেথায় পঞ্চ-                  শাখ বৃক্ষ,
ভীষণ দন্তুর                    রিপুর ঋক্ষ,
তাও কি রে তোর            শঙ্কা নেই?

(ঢাকা, ১৯৯০)

 

১২.
পথক্লান্ত, ভ্রান্ত, ওরে থাম্ তো!
রোদসী মরু প্রান্তে উষ্ট্রহীন—
মৃত্যু জ্বলে চোখে নগ্ন পূষার,
আদিগন্ত ব্যাপ্ত ধুধু রৌদ্ররুদ্র দিন।

এবে জপ্ তো জপ্ তো, অভিশপ্ত,
সিকতাহৃত গুহ্যমন্ত্র তোর—
গিলছ কেন শুধু তপ্ত তুষার!
পথক্লান্ত, ভ্রান্ত, আহা, আত্মহন্তা ঘোর!

(সিডনি, ২০০০)

 

১৩.
প্রিমা দোনা
নোনা অন্ধকারে
তোমার নিশ্বাস নাচে
বোধের বেদির নিরালায়

মৃৎ-চুম্বী অম্বরে
করুণানিষিক্ত বৈতালিকে
সমস্ত মস্তানা দুলে ওঠে
অলীক হাওয়ায়

অপাবৃত শুচিতায়
আমার বুকের ধাপে ধাপে
তোমার পায়ের দু’টো আলতো আঙুল
নেশার নিশান ছুঁয়ে যায়

(ঢাকা, ১৯৯০)

 

১৪.
সুরগুলি দূরে উড়ে যায়
কোথায় যে হায়—
রাত কাঁপে আলেয়ায়,
জোনাকির ঝরোকায়,
সুরগুলি দূরে উড়ে যায়…

নিষুপ্ত মঞ্জরি,
স্বপ্নে কে চঞ্চরী
চুমে তোর ঘুমের গুহায়?
কোথায় যে হায়
সুরগুলি দূরে উড়ে যায়…

(ঢাকা, ১৯৯০)

 

১৫.
ডেকে আর কাজ হবে না, আমি আজ আমার রাজা।
কুয়াশায় আগ বাড়িয়ে চলেছি বাগ ছাড়িয়ে,
হতেছে খুনখারাপি সমানে ডাইনে বাঁয়ে,
চ’লে যাই কাল হারিয়ে রেশমের পথ মাড়িয়ে
কুবলাই খানের দেশে, সাথি তিন ছিলিম গাঁজা।
তোমাদের হাজার সেলাম, চললাম শেষ বিদায়ে,
হ’লে হোক এই জীবনের শেষ ওয়াক্ত্ নমাজ কাজা।

(ঢাকা, ১৯৯০)


1923616_8331835228_5637_n
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

painting-232

 

Advertisements