994302_10200635781431817_1576857488_nটানা তিন রাত ঘুমাতে পারিনি। তিন রাত তিন অচেনা স্থানে। হঠাৎ চিৎকার, মুহূর্তেই নৈঃশব্দ্য। মানুষের চিৎকার, মানুষের নৈঃশব্দ্য। বেশ কয়েকবার খুনি কয়েদির লাল চোখের সামনে প্রার্থনাভঙ্গিতে বসা ও শ্লেটে নিজের নাম লেখার পর তা দু’হাতে উঁচিয়ে আমার মত আরও দর্শককে দেখিয়ে মাঠ পেরোলাম। যেতে যেতে বেশ কয়েক তলাবিশিষ্ট একটি ভবন দেখিয়ে এক প্রহরী বলল : যদি কেউ তোমারে শুধায়, বলবে বকুলে! বকুল সেল, কারাভ্যন্তরের সবাই চেনে। প্রহরী একটি ছোট্ট কক্ষে নিয়ে গেল। এক দুই করে গুনলাম। এগারো শিক। অচেনা একজনকে বলতে শুনলাম, ‘ভাই, আগেরটাতে চৌদ্দ ছিল!’ ছোট্ট একটি জানালাও আছে, তাতে চোখ মেললেই সবুজ-হলুদ ঘাস দেখা যায়। প্রহরী কয়েকটি কম্বল এনে দিল। কম্বলগুলোয় কেমন এক গন্ধ, বহু মানুষের ঘামের, চোখের জলের! ঘরের এক কোনায় সেই কম্বলের ওপর দুই হাঁটু বুকে চেপে শুয়ে পড়লাম। তিন দিন পর। তিন রাত পর। টের পেলাম ‘ঘুমের পোশাক গায়ে’, তবু ঘুম আসছিল না। কাঁপতে কাঁপতে আমিও কয়েক ফোঁটা জল কম্বলে মিশিয়ে দিলাম। সেই জল মিশে গেল অন্যদের জলে। শুষে নিল অভ্যস্ত কম্বল।

আমার কিছুই ভাল লাগছিল না। মায়ের মুখ চোখের সামনে ভেসে আসছিল ঝাপসা হয়ে। মা-র মুখে হাত ছুঁয়ে বললাম, ‘নিঃশব্দ কামানে তুমি একা বসে ভরছো বারুদ’। নিজেকে বললাম, ‘নিঃশব্দ কামানে তুমি এখনো কি ভরছো বারুদ?’ পাশের ঘরগুলো থেকে ‘রোবটের কাশি শোনা যায়’। হুল্লোড়, তাস পেটানোর শব্দ আর নানা খিস্তি। মনে মনে আমিও যে ‘দূরের টেবিলে বসে খেলে যাচ্ছি গোপনে পেশেন্স’, তা কি তারা জানে? ‘নাকি ওই তাসগুলি নিজেরাই মেতে আছে অজানা খেলায়?’

লোহার শিকে মুখ গলিয়ে কয়েদিদের অভ্যস্ত মুখগুলো দেখি। দেখি ‘শক্তিচালিত এই তামাশার মধ্যে বহু’ মানুষ দিব্যি সিগারেট ফুঁকছে। এক ফাঁকে আমি ‘বকুলরিক্ত দূষিত’ জেলঘরে আয়নায় দেখছি ‘নিজের ভাঙ্গা ও চূর্ণ মুখচ্ছবি’!

মুকুল, বিডিআর বিদ্রোহের মামলায় যে আট বছর ধরে কারাগারে। আরও কয়েকজনসহ সে খাবার সাপ্লাই দেয় কয়েদিদের। সাবান, ব্রাশ, শ্যাম্পু, সিগারেটসহ আরও প্রয়োজনীয় জিনিশ বললেই এনে দেয়। আমি একটু ওর দিকে তাকাই, আবার সরিয়ে নিই। আগ বাড়িয়ে সে নিজেই পরিচিত হয়। বলে, আমার বেশভূষা কবিদের মতো, ভেঙে না পড়তে। হঠাৎ রুটি-রুটি বলে শোরগোল পড়ে যায়। বেশ বড়সড় পাত্রভরা রুটি নিয়ে সবগুলো কক্ষে দৌড়াচ্ছে ক’জন। প্রথমবারের মত এ দৃশ্যে আমার মুখেও এক চিলতে হাসি টের পাই। দেখি ‘দিনের আশ্চর্য রুটি কার দিকে প্রথমে দৌড়ায়!’ আটা নয়, লাল-হলুদ ভূসির রুটি আমিও পাই দু’খানা। সঙ্গে এক চিমটি গুড়। কামড় বসাতেই ঝলমল করে ওঠে বালি। ‘এক চিৎকারের নদী থেকে আরেক চিৎকারের নদীতে’ ভাসিয়ে দিই সেই ‘আশ্চর্য রুটি’।

জানি, ‘বিস্মরণ এক মেঘভার’। ভাবি,‘একটি ভাতের থালা ঝুলে আছে মেঘের দড়িতে’। কিন্তু ‘কোথায় আশ্চর্য মেঘ?’ মুকুলই এগিয়ে আসে খিচুড়ি আর ডিমভাজি নিয়ে। সেই গন্ধে ‘ভরে ওঠে দূর মহাকাশ’। যেন ‘তারার চাকুর নিচে অবিরাম নিজের চেষ্টায়’ আমি গিলে ফেলি সেই খাবার। তিন দিন পর। তিন রাত পর। নিজেকে আবার বলি, ‘নিঃশব্দ কামানে তুমি একা কেন ভরছো বারুদ?’ ‘শক্তিচালিত এই তামাশার মধ্যে’ উত্তর মিশে যায়!

জেলঘর থেকে বেরিয়ে ভবনটির উঠোনে আসি। বড় প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। গেইটে প্রহরী। তাকে মাঠে যাওয়ার ইচ্ছের কথা বলি। তার ‘না’ শব্দে আবার ফিরে আসি বিশ নম্বর কক্ষে। মুকুল শিখিয়ে দেয়, পাঁচটি সিগারেট দিলেই মাঠে যেতে দেবে প্রহরী। আমি তার কথামত আবার প্রহরীর কাছে যাই। ছাড়পত্র পাই। আকাশে ‘আশ্চর্য মেঘ’। ‘শস্য নেই, রিক্ত শূন্য দীর্ঘ ধু-ধু’ সেই আধোভেজা মাঠে বসে বুকের ভেতর শূন্যতা টের পাই। ভাবি, ‘আমার পাপের ভারে, আমাদের মিলিত ছোবলে’ এই শস্যক্ষেত্র এত স্বপ্নহীন! যেখানে ‘যে কোনো পাখিই এসে ভয় পাবে’, উড়ে চলে যেতে চাইলেও পারবে না। শুধু মনপাখি ‘উড়ে চলে যাবে’। জানি, ‘শূন্যতা বল্লম এক’, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমাকে রক্তাক্ত করে। ‘এক চিৎকারের নদী থেকে আরেক চিৎকারের নদীতে’ ধুয়ে নিই রক্তাক্ত শরীর।

আমার পিঠছোঁয়া চুল। বকুলে আসার আগে চেকাররা ব্যান্ড খুলে ফেলে দিয়েছিল। মুকুলকে একটা ব্যান্ড জোগাড় করতে বললে সে অপারগতা জানায়। তিন দিন স্নান করিনি। চুলে জট পেকে যাচ্ছেতাই অবস্থা। ‘আমাকে পরখ করে ফটকের পাশে এক/ কুঁতকুঁতে চোখের প্রহরী’। আমার হাসি পায়। নানা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় আমার দিকে। আমার কিচ্ছু বলতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় কত কত কথা ‘নিজেকে সরিয়ে দূরে, আলগোছে,/ গাছের গোপন কোনো ডালে রেখে আসি’। কখনও মনে হয় ‘ধস্ত মিনারের নিচে চাপা পড়ে আছে সব কথা ও কাকলি’। আমি এদিক-ওদিক তাকাই। দেখি ভবনের বাইরে ড্রেনের পাশেই একটি পেঁপেগাছ। ছোট-ছোট পেঁপেও ধরেছে। সরুনলা পেঁপেডালে একটি টুনটুনি শিস দিয়ে উড়ে চলে যায়। প্রহরী বিরক্ত হয়ে টুলে গিয়ে বসে। মনে হল ঝিমুনি ধরেছে। ‘পাহারা শিকায় তুইলা নবাবের হুমুন্দির লাহান’ এখনই ‘পুটকি উঁচায়া’ ঘুমিয়ে পড়বে সে! ভাবি, ‘ফলের ভেতরে যাবো অতি দক্ষ শেয়ালের মতো/ লালসায়, মুগ্ধবোধে/ থাবায় মোরগ নিয়ে দ্রুত!’ কিন্তু কিভাবে, কোন ‘ছদ্মবেশে সেই দিকে যাবো’? ‘রাষ্ট্রের ডিমে তা’ দেয় পুলিশ’। নিজেকে বলি : ‘রাষ্ট্রের ডালে জলপাই ঝোলে/ ঝুলছে ঝুলুক, এ নিয়ে ভেবো না’।

জানি, ‘দূষিত নগরে বকুল ফোটে না’, তবু বকুল সেলকেই ফুল ভেবে মাঠ থেকে দেখি। একটি সুউচ্চ ফুল ফুটে আছে জেলের ভেতরে। মুক্তি মুক্তি করি। ‘সামনে খুঁজি তাকে, পেছনে তাকাই/ ঘুমের পোশাক গায়ে, দশ পায়ে নাচি’। তবু মুক্তি মেলে না। ‘কাঠবেড়ালির লাশ বুকে নিয়ে প্রহর’ গুনি। ‘কাঠবেড়ালির লাশ নিয়ে বুকে/ নিজেই শিকার, নিজেই শিকারি’! ‘নিজেরই রক্তে ভেসে যেতে যেতে’ আমি হাসতে থাকি ‘সব ব্যথা ভুলে’!

একটি চিরকুট আসে। বার্তাবাহক জানায়, দেখা করতে এসেছে দুজন। আমার সারা অঙ্গে বিদ্যুৎ খেলে যায়। ‘টের পাই অপার্থিব দোলা ও স্পন্দন’। আমার দয়িতা, রাষ্ট্র তাকে বানিয়েছে কাগজের বউ। দেখি ‘মৃতদের চিঠি আসছে ধাবমান বাতাসে বাতাসে’। আমার সঙ্গ ছাড়া সে তো মৃতই। যেমন আমিও মৃত ‘ঝড়-ঝঞ্ঝা, হাওয়ার চাবুকে’। ‘অবনত শির উঁচু করে’ আমি ছুটতে থাকি, ‘এছাড়া আমার যেন কাজ নেই তীর্থ নেই মোক্ষ নেই কোনো’। ‘আশ্চর্য মেঘ’ উবে গিয়ে আকাশে খেলা করে ‘অমর জোনাকি!’ মাঠে কয়েদিরা ক্রিকেট খেলছে। হইহুল্লোড়। যেন তারা বুঝে গেছে : ‘সংক্ষিপ্ত পর্যটন শেষ হলে তারা আর এখানে থাকবে না’।

খাঁচার ওপারে রুমুকে দেখি। এপাশে অসংখ্য কয়েদি, ওপাশে তারও বেশি দর্শনার্থী। স্বজনদের হাহাকার, আর্তচিৎকারে কেউ কারও কথাই শুনছে না। কিলবিল করছে শব্দ। যেন ‘রক্তমুখ পিপাসার অসীম বিস্ফার’। যেন এত এত মুখ ‘পাষাণের পুঞ্জীভূত স্বপ্নভস্মসার’। রুমুর মুখের দিকে তাকাই। ইশারায় বলি ভাল আছি। বুকের ভেতর হু হু করে ওঠে। কতদিন পর দেখছি ও চাঁদমুখ খাঁচার আড়ালে! না কি এ অলীক স্বপ্ন। না কি ‘জল দাও, জল দাও’ চিৎকার সইতে না পেরে ‘অগত্যা মরীচিকা/ পিপাসার্তকে দিল জলবিভ্রম!’ কতদিন শয্যাহীন আমরা দুজন! আমার ইচ্ছে হল খুব, ‘যেমন মেঘের পাশে শুতে বড়ো ভালোবাসে চাঁদ’! মনে মনে গাই : ‘দুটো দিন সংসারে যাবো/ বাকি দিন পাহাড়ে কাটাবো’…

‘আমার কিছুই নাই, অর্ধস্ফূট ভাষাটুকু ছাড়া
আমারে চেনে শুধু পথে-পথে দলিত ফুলেরা
পাতার ভিতরে বসে রোগা এক কোকিলের মতো
ডেকে ডেকে মরো যাবো। তারপর ঝরবো ধুলায়!’

আবার ছুটতে ছুটতে চলে আসি বকুলের বিশ নম্বর কক্ষে। নিজেকে বলি, ‘নিঃশব্দ কামানে তুমি একা বসে ভরছো বারুদ’। ‘অসহযোগের রীতি, রাজনীতি, ক্রূরতা ও ভয়/ ক্ষিপ্ত বাঘের চোখ, হননবিকার/ একপাশে ঠেলে’ ‘তুমি একা বসে ভরছো বারুদ’। ‘শক্তিচালিত এই তামাশার মধ্যে’ ‘মহাপ্রাণ, তুমি কি এসেছো?’ মুক্তির কথা ভাবি। ভাবি, ‘অবসরে কনুইবন্ধের নিচে/ মদেচুর লাটাই নাচাবো’…

‘মেরুন সন্ধ্যায়’ প্রহরীরা বিশ নম্বর কক্ষে তালা মেরে যায়। বহু মানুষের ঘাম, চোখের জল মেশা কম্বল বিছানো মেঝের এক কোনায় দুই হাঁটু বুকে চেপে শুই। মনে পড়ে, বছর দেড়েক আগে লিখেছিলাম :

‘আমার সহায় নেই, সম্বলও নেই’, বললাম তাকে
সে বলল, ‘আমি তো আছিই, ভালোবাসো না আমাকে?’
‘সখি যাতনা কাহারে বলে, সখি ভালোবাসা করে কয়?’
অবুঝের মতো প্রশ্ন করি, আমার উত্তর পেতে ভয়!

‘আমাকে কবিতা দিয়ো, যদি পারো দিয়ো বুনো ফুলহার
আমি হাসি, বলি, ‘কাব্য থেকে কত দূরে জুয়েল মাজহার?’

কামাননাচের ইতিকথা//প্রান্ত পলাশ

_________________________________________________________

জু য়ে ল  মা জ হা র  – এ র  ক বি তা

রক্ত-সম্পর্ক

বসন্ত সরাইয়ের পথ পাড়ি দিতে দেখেছিলাম
দু’জন হোমোসেপিয়ান তাদের হোসপাইপ
ছেড়ে দিয়ে হাসছে

এতে ভিজে যাচ্ছিল সবার গা
আর আমার সদ্য ঋতুবদল-করে-আনা মন;

সমস্ত ঘটনার সঙ্গে সম্পর্ক মূলত ক্রিয়া ও অব্যয়ের
তাদেরই তা’য়ে বড় হ’য়ে ওঠে যৌথ মমতার কোকিল

পথে ছড়িয়ে রয়েছে পরিচয়হীন অসংখ্য সর্বনাম
তাদের বাধা ডিঙিয়ে ঘটনার হেরেমে ঢুকে দেখি:
বিশেষ্যের খোকা ঘুমিয়ে পড়েছে
বিশেষণের বিপজ্জনক বাঁকা ডালে

তারপর চলো হোসপাইপের ঘটনা ভুলে
পরখ ক’রে দেখি নিজেদের পেন্ডুলাম;
দেখি, সম্পর্কের ভেতর ওঁত পেতে আছে কত রকম বিষ

নিজেদের হোসপাইপ পরখ করে দেখতে চাইলাম
জল ঝরানোর ক্ষমতা।
একদিন আমারই ঘ্রাণে-ঘ্রাণে লাল হ’য়ে উঠেছিল মেয়েলি অব্যয়

সেই থেকে তুমি গেঁয়ো যোগিনীর মতো
অবিরাম ভিক্ষে ক’রে চলেছ হোসপাইপ আর পেন্ডুলাম

একদিন অনেক আগামীকালের প্রাসাদে বসে
আমি পান ক’রে যাব এসব ঘটনা

—প্রবল কাশির সঙ্গে মনে মনে…

মেগাস্থিনিসের হাসি

নি:শব্দ কামানে তুমি একা বসে ভরছো বারুদ।
শীতকাল গেল;
নি:শব্দ কামানে তুমি একা কেন
ভরছো বারুদ?

আমি ভাবছি:
মেগাস্থিনিসের হাসিও কি মেগাস্থিনিস?

শক্তিচালিত এই তামাশার মধ্যে বহু
বাদামি ঘোটক উড়ে যায়
–এঞ্জিনের শব্দ আর রোবটের কাশি শোনা যায়।

নি:শব্দ কামানে তুমি এখনো কি ভরছো বারুদ?

কার্পাস তুলোর মধ্যে

কার্পাস তুলোর মধ্যে হাওয়া ঢুকে ফোলায় নিজেকে
তারপর সূর্য থেকে দূরে, সমুদ্রের পাড়ে
জঙ্গলে ঝাউয়ের মধ্যে
শতখণ্ড হাসি পড়ে থাকে

কিছুক্ষণ দম নেয়, মৃদু কাশে, কুণ্ডলি পাকায়
নড়েচড়ে ওঠে কলরব।

সমুদ্রের বুকে শাদা পেখমের স্ফীতি, চঞ্চলতা

কার্পাস তুলোর মধ্যে একই সঙ্গে পাখি ও বেড়াল
একই সঙ্গে শিকারী ও শিকারের ছায়া ঢুকে পড়ে

আগুনে যে খাক হলো, তার দিকে নিরুপম চাঁদ
মৃত্যুদিনে পাঠায় কার্পাস;

শিশুর শিয়রে যেন সংখ্যাহীন
শাদা বেলুনের উপহার!

ক্রমহননের পথ

অপাপবিদ্ধের মতো জোড়া জোড়া চোখ দেখে ভয়;
এই বুঝি রিরংসা নামের কোনো বিস্ফোরণ ঘটে।
তবু নিথরতা;
দূরে ট্রেন চলমান, ঝাউবনে স্রোতকল্প দোলা।

এসো, তোমাকে উদ্ভিন্ন করি রাতপরিদের নামে
ইন্দ্রিয়ের ক্ষমজলে, তরল ক্ষীরের মতো
গলমান নির্বেদের স্রোতে।

সহস্র তিরের শব্দ, শত হুল তোমার পেছনে;
তুমি একা। তাতে ভয়!

ভয় বুঝি সংবেদনের কোনো ডানা?

তাহলে উড্ডীন হও, উড়ে চলো বনের ভেতর।
ক্রমহননের পথ পাড়ি দিয়ে দ্যাখো:
ঘাসে ঘাসে সিঁড়ি চলমান।
পর্বতের ধাপে ধাপে মনুষ্যখুলির ছায়া প্ররোচনা আকারে সাজানো;

আর দ্যাখো, জলের আঙুলে আঁকা চিত্রময়
শুয়ে আছো তুমি।

তোমাকে ঘিরেই জাগে শত শত দেয়াল, প্রাকার;
ক্রমহননের পথ আমাকে বেষ্টন ক’রে
ঝুঁকে আছে তোমার উপর!

যোগাযোগ

দূর থেকে পাথর ছুড়েছো;
সে-পাথর স্বনিয়মে কাছে এসে পড়ে

বস্তুবিশ্বে ক্রমাগত অভ্যাসের টান

আমি চুম্বক-কান্তার থেকে
মফস্বলে পত্র পাঠালে
তরঙ্গের শতভঙ্গি অগোচরে তোমাকে সাজায়

সিংহ জেব্রা বালির পাহাড়

সিংহ ধূসর কেশর ধূসর
বাতাস উচাটন;

গোল হ’তে হ’তে চাঁদ
আরো গোল হ’তে হ’তে
বালির পাহাড়ে, বাওবাব গাছে
থমকে দাঁড়ায় রাতে

চাঁদকে নামায় সিংহের থাবা।
দূরে বহুদূরে দশটি জেব্রা–
নতমস্তক– এদিক-ওদিক
হাঁটে আর ঘাস খায়।

বালির পাহাড়ে চাঁদকে লুকিয়ে রেখে
হঠাৎ সিংহ সেদিকে তাকায়

তাকাতেই তার জ্বলে ওঠে থাবা!

আর একে একে দূরের পাহাড়ে
শান্ত, নীরব জেব্রারা ঝরে যায়!

রুবিকন

আমার সামনে এক রুবিকন, পুলসিরাত, ভয়ানক ক্রূর অমানিশা
এর সামনে একা আমি;
কিস্তিহীন, নিরশ্ব, রসদহীন
পিগমিদের চেয়ে ছোটো আমি!

আর আমার ভাঙা হাড়, থ্যাঁতলানো খর্বকায় দেহের ভেতরে যতো
রক্ত-পিত্ত-কফ-থুথু-বীর্য-লালা সবই
অসীম বরফে-হিমে গ্রানিটের মতো ক্রমে হতেছে জমাট;

আর ওই থেকে-থেকে ফুঁসন্ত ব্লিজার্ড এক,
আর এক আনক্যানি করাল হিমানী
আমাকে আদ্যন্ত ঘিরে আছে।

সান্নিপাতিক হেতু নাসিকার ছিদ্র বেয়ে
চোখ বেয়ে যে-জল গড়ায় সে তো মাটিতে পড়ে না;
শূন্য থেকে বর্শা হয়ে সিগ্নি ঝুলে রয়—যেন নর্স দেবতার!

সারি সারি শতশত বল্মীকূট পেছনে আমার।
তাদের আড়াল হতে জুল্‌জুল্‌ চেয়ে থাকে লোম-কর্ণ শিবা।
লোলজিভ, অভ্রংলিহ জিভ নাড়ে মেদুসা-মনসা আর কালী।

আমার তরবারি নাই। তাই
দু’হাতে নখর আমার তরবারি!
আমি কি ডরাব?
না, আমি ডরাব না।
অসীম হিম্মত লয়ে এক পায়ে হয়ে আছি খাড়া ।

কিস্তিহীন, শস্ত্রহীন, নিরশ্ব, রসদহীন আমি একা;

আমি ফুঁ দিচ্ছি হাপরে আমার।
আমি আমাকে বলছি: ওঠো, জাগো!
আমার অশ্ব নাই।
এক দুর্বিনীতাশ্ব জন্ম নিচ্ছে ভেতরে আমার।

থ্যাঁতলানো ভাঙা পায়ে আমি লাফ দিচ্ছি। আমি সাঁতরে চলেছি
আমার আয়ুর চেয়ে দীর্ঘ এক গন্ধকের নদী।

আমি ভেদ ক’রে যাবো ক্রূর অমানিশা
আমি জয়ী হব,
আমি পার হব রুবিকন!!

কসাইখানা

ভায়া হে, এলেই যখন           আগুনের আঁচ মেখে যাও
আঙুলের দু’তিন খোঁচায়      বাকলের গিঁট খুলে দাও

দড়িতে ঝুলছে শূকর            ছুরিতে শান দিয়ে যাই
টপকে নগর-পাঁচিল             চলেছি পৌর কসাই
লালরঙ কাবাব খাবো

দেখাবো ছুরির জাদু             কাঁচি আর চাকুর খেলা
দেখে যাও এলেই যখন        ঠকাঠক হাড়ের মেলা

উনুনে কড়াই পাতি               টগবগ ফুটছে কড়াই
বাঁ-হাতে হাড়ের কাঠি          কাঠিতে ঝোল নেড়ে খাই

ফেঁড়ে বুক কল্‌জে খাবো       মেলে দুই দাঁতের পাটি
টুপটাপ লাল সুরুয়ায়             ভেজাবো জিভের বাটি

ভায়া হে, এলেই যখন            নেবো আজ তোমার গলা
ছুরিতে শান দিয়েছি               দেখাবো ছুরির খেলা

পাহাড়ে বেড়াতে যাবার পর

পাহাড়ে বেড়াতে যাবার পর ক্রমশ তরঙ্গবহুল হয়ে উঠল তোমার গ্রীবা। রজস্বলাদের গুরু নিতম্বের ক্রম শিহরন প্রাগৈতিহাসিক গাছেদের গায়ে এসে লাগে। আর আমি, ঝুলন্ত ডেউয়াফলের সঙ্গে তুলনা করে, তোমার গরিমাময় কুচযুগের দিকে তাকাই নতুন করে।
আমার লোভের চাহনি, গ্রীষ্মদিনে, তপ্ত স্বেদবিন্দুর মতো, ক্ষীণধারায় গড়িয়ে শুধু নামে।

উপত্যকায় হাজার রাত্রিশেষের রাত্রি আর হাজার দিনশেষের দিনে লোহু-রঙিন জবাফুলের মতো উপহার তুমি। কালচে-সবুজ পাতার আড়ালে বসে তোমাকে জারিত করি ক্রমাগত চোখের লবণে। তুমি শাদা শাদা অপার্থিব কাচের মিনার থেকে উঁকি দাও। লহমায় লহমায় তোমার মুখ জ্বলে উঠতে দেখি এই অরণ্য-প্রদোষে।

xsalvador-dali-poster-swans-reflecting-elephants-surrealism-jpg-pagespeed-ic-vthe5akuvqযখন পাহাড়ে যায় লোক, ভালুকদের কাছ থেকে তাদের ভারী চলনগতি আর যূথবদ্ধতার মন্ত্র শিখে নেওয়া ভালো। এসবের কিছু নমুনা নিয়ে এসেছি। বরফে, বক্ষবন্ধনীর ভেতরে সেসব তুমি বহুদিন যত্নে রেখে দিও। আর চলো চিরখল, চিরলোভাতুর, চিরকুটিল আর চিরবদমায়েশ শহরে ফিরে না যাই আবার। চলো শীতরাত্রে গোপনে ডিঙি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি সরল অসভ্যতার দিকে। চলো ঘুমের ভেতরে! চলো পরস্পরকে কাঁধে নিয়ে ছুটি আবছা ভোরের কুয়াশায়।

শাদা ফসিলের মতো বৃষ্টিতে ট্যাক্সিরা গর্জন করে ওঠে—শুনি। আর দেখি, হাতের তালুর মতো ঢালু উপত্যকায় ভোর-সন্ধ্যার আভারূপে ক্ষণে-ক্ষণে হেসে ওঠো তুমি; আর, কেঁদে ওঠো ভালুকশিশুর মতো। কেঁদে ওঠো অতিদূর সাইবেরিয়ায়। সেসব কান্নাকে এখন জড়ো করছি; আর ভাবছি, এঞ্জিন-রব আর খুরধ্বনি থেকে দূরেই রয়েছে তোমার অভিজ্ঞান। তুমি লম্বা দৌড় আর পত্রালির ভেতরে সাঁতার—বায়ুবাহিত বেলুনে বেলুনে।

পাহাড় গোপন জলধারা নামায় আর ডাকে তোমায়। আর তাতে শব্দ করে ওঠে রাত্রি;—যেন একাকী তক্ষক। যেন ছল। এটুকু ছলই একদিন আমাদের জোড়া ঠোঁটের কাছে প্রেম হয়ে আসবে কামের পেয়ালায়। সেখানে রঙিন পাথর থেকে পাথরে, চূড়া থেকে চূড়ায় লালাভ সূর্য আর মেদুর রাত্রির চুপ-সিরাপ ছল্‌কে পড়বে তোমার গুরু নিতম্বে; আর তোমার তরঙ্গবহুল গ্রীবায়, ডেউয়া ফলের মতো ঈষৎ-ঝুলেপড়া তোমার স্তনে আর গ্রানিট পাথরে গড়া নাভিনিম্নদেশে।

দাবানল

সহসা স্ফুলিঙ্গ ওড়ে। বৃক্ষে বৃক্ষে গাঁথে অগ্নিশর
মত্ত তরঙ্গে কাঁপে পতঙ্গ-পাখির বাসভূমি

দিকে দিকে ছত্রখান রাতচর পশুদের খুলি
অত্যাগসহনবন্ধু মানুষের প্রিয় প্রাণিগুলি

নিশ্চিহ্ন বৃক্ষের সারি। শাল্মলি বনের কারাভাঁ
ভস্মে ডুবেছে সবই। হরিৎ গুল্মের শিকরাভা

দর্জিঘরে এক রাত

শূন্যতা বল্লম এক, গেঁথে আছে দর্জিমহলে!

রাশি রাশি বস্ত্র ফেলে দর্জিদল গোপনে উধাও;
শুধু দেয়ালের গলদেশে ঝুলে আছে
একটি পুরনো ঘড়ি; –মৃত!

দশবস্ত্রে-দিগম্বর বেশ্যার ইশারা আজ মেঘেতে উত্থান!
তাই, লক্ষ শিশ্ন হাতে চেপে দর্জিদল মেঘে ধাবমান!

শৃঙ্গারের গোলাপি আরকে আজ প্রতিপার্শ্ব ঢাকা;
আঁধারে ঝর্নার মতো বেজে ওঠে গণিকামহল।

সবুজ প্রিজমে আমি চোখ রেখে সবকিছু দেখি:
দর্জিদের অনুপস্থিতির এই দীর্ঘ অবসরে
আতশি কাচের গুঁড়ো জড়ো করে চুপে
ঢেকে রাখি ফাঁকফুঁক, দর্জিঘর, ঘড়ি ও জানালা।

খরগোশ

রাতে প্রতিবেশী তারাদের ঘরে জন্মায়
ছোটো ছোটো খরগোশ;

দিনে ছোটে-দৌড়ায়
ঝোপেঝাড়ে
রাতে নীলে

বেড়ে ওঠে ঘাসে;

—প্রাতরাশে দলে দলে…

পিপাসা

ঝরনার কাছে জন্তুরা পিপাসায়
চেয়েছিল জল; পীত-বিমিশ্র, কটু

ঝরনা দিল না; অগত্যা মরীচিকা
পিপাসার্তকে দিল জলবিভ্রম!

আজো তারা সবে ছায়ারূপে ঘুরে মরে
চেঁচায় আর্ত: জল দাও, জল দাও

ঝরনাজলের শব্দ এখনো বাজে
অচেনা খিলানে, অশেষ বালুর চরায়

জন্তুরা আজো কেঁদে মরে পিপাসায়

দশ পায়ে নাচি

সামনে খুঁজি তাকে, পেছনে তাকাই
ঘুমের পোশাক গায়ে, দশ পায়ে নাচি

কোথায় সে? যখন সূর্য-পূজারির ঘরে
জ্বলে উঠছে উপমা, আগুন?

ঘোড়া ফেলে দিচ্ছে আমাকে আর তার জিন;
তবু বাতাস এক ঘোড়া।
সে ছুটছে আমাকে নিয়ে!

রাত্রির উপসংহার এলিয়ে পড়ছে মোরগঝুঁটিতে
তার শিরদাঁড়া বেয়ে নামছে রক্তঘন চিৎকারের নদী
তখন কোথায় সে?
কোন গাঢ় কুয়োর অতলে তার শব?

নেকাবঢাকা কোন শরবনে গিয়ে তাকে খুঁজি!

পথের ক্লান্তিহেতু গ’লে যাচ্ছে খুর
আমার ঘোড়ার;
আমার হৃদয় আজ ঝুলছে অনেক ডালে ডালে

ঘুম পালিয়ে যাচ্ছে এক জানালা থেকে
আরেক জানালায়

ঘোড়া ফেলে দিচ্ছে আমাকে আর তার জিন
—এক চিৎকারের নদী থেকে আরেক চিৎকারের নদীতে!

নোঙ্গরের পাশে

নোঙ্গরের পাশে তুমি, মনে হলো, ফেলেছো নোঙ্গর
সূর্য থেকে দূরতম পশ্চিমের এলানো বিকেলে;

বিষণ্ন ও একা ছিলে। ডুবন্ত জাহাজ থেকে
জেগে ওঠা বুদ্বুদের মতো।

রাত্রি এখানে তবে, অগোচরে, হয়েছে গোচর?

Advertisements