12661811_1149797075054017_1784065336806206938_nএকুশ শতকের মাত্র ষোলো বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। একুশ শতকের এই প্রভাতবেলায়, এই স্বল্প সময়, অনেকে কবিতা লেখায় মনোযোগী হয়েছেন। সবার কবিতা পড়ার সুযোগ হয়নি আমার। তবু অনেকের কবিতাই পড়েছি। তন্মধ্যে হাতেগোনা যে পাঁচ-সাতজনের কবিতা আমাকে বিশেষভাবে টানে, অমিত চক্রবর্তী তাদেরই একজন। অমিত চক্রবর্তী তার যাপিত জীবনকে সাবলীলভাবে কবিতায় নিয়ে এসেছেন। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন বিষয়ে আমার আলোচনা পড়ার পর কেউ কেউ যখন শুনেছেন অমিতের কবিতা আমার ভালো লাগে, তখন একটু অবাকই হয়েছেন। অবশ্যই পছন্দ করার পিছে কিছু কারণ আছে। যখন আমরা অস্বীকার করি, তখন আগাগোড়াই অস্বীকার করি। যা-কিছু অস্বীকার করি,  সে-সবের ভিতর থেকে যাওয়া শক্তি আর সৌন্দর্যকে একদমই বিবেচনায় না নিয়েই সেসব অস্বীকার করি।আবার, যখন আমরা অংশবিশেষের সমালোচনা করি, তখন আর কেউ এটাকে ভুল ভাবে নেয়, ধরে নেয় তুমুল অস্বীকার। অমিত চক্রবর্তী’র কবিতায় কিছু বিমূর্তধারার চিত্রকল্প আছে, কিছু পরাবাস্তবধর্মী চিত্রকল্পও আছে।আমার পাঠ-অভিজ্ঞতার কারণে অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে যা দেখি, যা পড়ি, তাতে আমি বেশ ক্লান্ত
এ ধরণের চিত্রকল্পের বহুল ব্যবহারে। সচরাচর অতি চেনা এবং অতি দূর্বল হয়ে থাকে এমন চিত্রকল্প; মোটেও সংযোগ স্থাপন করতে পারে না। অন্যথায় পাঠক হিসেবে আমার বিশেষ আপত্তি নেই বিমূর্ত/পরাবাস্তব ধারার চিত্রকল্পসম্বলিত কবিতা পড়তে; এমন কি এ ধরণের কবিতা লিখতেও আপত্তি নেই, কখনও ছিল না। যে-কারণে অমিতের কবিতায় বিমূর্ত/পরাবাস্তব ধারার চিত্রকল্প থাকলেও সেটি পাঠক হিসেবে আমাকে বিরক্তির মধ্যে ফেলে না:

স্যাঁতস্যাঁতে করিডোরে আমাকে রেখে যাওয়া হল করিডোরের দুপাশে সারিবাঁধা দরজা যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে কোনো দরজায় হয়তো অপেক্ষা করছে সাইকেডেলিক ট্রিপ অন্য একটাতে আপেলেরা উড়ে যাচ্ছে কামড়ের দিকে আরেকটা দরজা খুললে সম্ভবত বের হয়ে পড়বে প্রাচীন কোনো টর্চাররুম, গেস্টাপো অফিসার যেখানে বসে একটানা টেনে যাচ্ছে সিগারেটের পর সিগারেট হতেও পারে এই দরজাগুলোর একটি ভেতর দেখা পাওয়া যাবে হেনড্রিক্সের, যিনি এখনো সবুজ সাপটিকে গিটার মনে করেনআমি করিডোরের শেষ দরজা দিয়ে বের হয়ে আসলাম, দেখলাম বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে

(দরজা)

বেশ সুখপাঠ্য একটি কবিতা। এখানে একটি চিত্রকল্প আছে, আপেলেরা উড়ে যাচ্ছ কামড়ের দিকে। কামড়ের দিকে উড়ে যাওয়া বলতে ধরে নেয়া যায় হাঁ করে থাকা মুখের দিকেই উড়ে যাচ্ছে আপেলেরা। সেক্ষেত্রে খুব বেশি অসুবিধা হয় না কল্পনা করতে। কল্পনা তো করতেই হবে, যেহেতু ‘চিত্রকল্প’-এর সাথে ‘চিত্র’ এবং ‘কল্প’ দু’টি শব্দ আছে। কল্পনা করা না গেলে সেটা ‘চিত্রকল্প’ নয়। সেটা কি, আমি মাঝে মাঝে বুঝে উঠতে পারি না, যখন কোনো কিছু কল্পনা করতে ফোর্স করে কিন্তু কল্পনায় আসে না। কল্পনায় না আসুক, কিন্তু অন্য কোনো ইন্দ্রিয়’র সাথে সংযোগ স্থাপন তো করতে হবে। যেমন রবীন্দ্রনাথে পাই পূর্ণিমাচাঁদ তোমার শাখায় শাখায় তোমার গন্ধসাথে আপন আলো মাখায়  বা আমার গান যে তোমার গন্ধে মিশে দিশে দিশে ফেরে ফেরে ফেরে। আলো কল্পনায় আসে কিন্তু গন্ধ আসে না, আবার গন্ধ নাকে পাই, আলো পাই না। ঠিক একইভাবে গান শ্রবণেন্দ্রিয়ের সাথে বা তৎসংশ্লিষ্ট স্মৃতির সাথে সংযোগ রক্ষা করে। ইন্দ্রিয়’র সাথে কোনোভাবে সংযোগ স্থাপন করে না এমন কিছু নাই এতে । ইন্দ্রিয়ের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে না পারার ঝামেলা অমিতের কবিতায় নাই। একেবারেই যে নাই তাও না, আছে কিন্তু মাত্র একবার। যেমন: শূশ্রূষা উড়ে যাচ্ছে

যে-কবিতাটি উল্লেখ করেছি, সেটাতে  একটি জার্নি আছে; স্যাঁতস্যাঁতে করিডোরে আমাকে রেখে যাওয়া হ’ল– কে রেখে গেল, কেন রেখে গেল এই প্রশ্নগুলি পাঠকমনে আনন্দ আনে। অমিত ভাবেন দরজার পর দরজায় কি কি থাকতে পারে এবং আমার দেখি কি কি আছে; কোথাও সিগারেটের ধোঁয়ায় ভরা টর্চারসেল, কোথাও সবুজ সাপ নিয়ে বসে থাকা হেনড্রিক্স, কোথাও-বা সাইকেডেলিক ট্রিপ। কিন্তু শেষ দরজা দিয়ে তিনি বের হয়ে এসে তেমন কিছুই পেলেন না। ফলে অবাক করে, আনন্দ আনে। আছে তুমুল বৃষ্টিপাত। টর্চার সেল, সাইকেডেলিক ট্রিপ ইত্যাদি তো অনুমান ছিল এবং অভিজ্ঞতার সাথে তার সম্পর্ক। করুণ অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে আসা একজন মানুষ সব করুণ ও ক্লান্তিকর অভিজ্ঞতার শেষে বৃষ্টিই দেখতে চায়, নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সব ক্লান্তি ধুয়ে ফেলতে চায়, স্মৃতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবনকে বারবার দিতে চায় গোপন কান্না, ক্ষমা ও ভালোবাসা। একের পর এক দৃশ্য ধারাবাহিক ভাবে কল্পনা করতে করতে পাঠকও একই অনুভবে এসে দাঁড়ায়; বই থেকে চোখ সরিয়ে অন্যকিছু ভাবে; একটি ছোট্ট কবিতা হয়ে ওঠে সময়খেকো, নীরবতার আধার। অনেক কিছু দেখে, শেষমেষ এমন বৃষ্টিপাত সবাইকে টানে; সঙ্গীত ছড়িয়ে পড়ে। এই জিনিসটা অমিতের কবিতায় আছে ব্যাপকভাবে। অমিতের কবিতার প্রেক্ষিতে আমার এই বৃষ্টির গুণগান হয়তো আপাতত ইশারাময় কিন্তু আন্তরিক; আরও কিছু কথা বলার পর আরেকটু স্পষ্ট করবো বিষয়টা।

কোনো বিশেষ বাক্য বা চিত্রকল্পই শুধু নয়, আলাদা আলাদা করে অনেকগুলি কবিতা মনে রাখা যায় অমিতের। আলাদা আলাদা করে মনে রাখতে পারা মানে হলো, আলাদা আলাদা করে ভালো লাগা, কবিতাগুলো ঐকতানে আসার পাশাপাশি নিজেদের স্বাতন্ত্র‌্য বজায় রাখে। এইখানে সমসাময়িক অনেকের দুর্গতি দেখে শেষে অমিতের দিকে তাকালে কিছুটা শান্তি পাওয়া যায়।

সাইডভিউ মিররে মেঘ। সবার থেকে দূরে একটা
ক্ষীণ,একলা মেঘের দিকে নজর যায়। সম্ভবত
আর্হেন্তিনা থেকে ঘুরতে ঘুরতে চলে এসেছে।
বুয়েনোস এইরেস! কখনো যাই নাই আমি।
তবুও ভাবি শহরটাকে। যখন বৃষ্টি হয়,
বুয়েনোস এইরেসে,তখন কোনো অনির্দিষ্ট
জানালায় যে-কোনো অন্যমনস্কাকে ভাবি।
মনে মনে সে বিড়বিড় করে,”আগুয়া! আগুয়া!”
আকাশ ধীরে ধীরে অন্ধকার হতে থাকে
বোর্হেসের দৃষ্টির মতো।

(সাইডভিউ মিররে মেঘ)

প্রথমে যে কবিতাটি উল্লেখ করলাম সেটি এবং এই সাইডভিউ মিররে মেঘ দু’টি আলাদা কবিতা;  আলাদা করেই চিহ্নিত করা যায়।– কারও কবিতা নিয়ে এমন কথা হয়তো অনভিপ্রেত (কারণ এই গুণ থাকেই প্রকৃত কবির), কিন্তু পরিস্থিতি অভিপ্রেত করে তোলে। আসলে অমিত নিয়ে আমার এই আলোচনা মূলে আছে কেন সমসাময়িক অনেকে থাকলেও অঙ্গুলিমেয় কয়েকজনের কবিতা আমার ভালো লাগে পাঠক হিসেবে। এই ভালো লাগা কোনো একটি কারণে তো নয় বরং কারণের সাথে আরও আরও কারণ মিলে এটা তৈরি করে। সামর্থ্যের ইঙ্গিত সব থেকে চেয়ে বেশি পাই, যখন কারো বই খুললে তিনটি জিনিসের সহাবস্থান দেখি: ১. কবিতাগুলি স্বাতন্ত্র‌্য বজায় রাখে ২. কবিতাগুলি বহুরৈখিক হয় ৩. কবির স্বকীয়তা। একই সাথে এই তিনটি জিনিস কারও কবিতার বইয়ে খুঁজে পাওয়া কঠিন; স্বকীয়তার প্রশ্নে কিছুটা শিথিল হওয়া যেতে পারে, কারণ এটি ধীরে ধীরে অর্জিত হয়। ভাষা যদিও নিজেই একরৈখিক নয়, তবু কিছু কিছু কবিতাকে আমরা আলাদা করেই ’বহুরৈখিক’ বলে থাকি, একেক সময় একেকভাবে ধরা দেয় বলে বা একই সাথে অনেক রকম দ্যোতনা তৈরি করে বলে। যা হোক, একই সাথে যে তিনটি কাজই করতে পারে, সে-ই ‘সিকান্দার’।

আমাদের সাইকেডেলিক মনোবিভ্রমের পাশে
কে যেন খুলে রেখে যায় তৃষ্ণার ডায়েরি
পড়ে থাকে অনিমেষের ক্রাচ
আর নির্জনতার ঘড়িগুলো
ন্যাভিগেটরের সামনে
রাত আসে, সেলেস্টিয়াল রাত
আসে হাওয়ানীল জ্যোতি 
আর বেদনার ধ্রুপদ
আমাদের সাইকেডেলিক মনোবিভ্রমের পাশে
নীলাভ মনোপলিরা গান গেয়ে ওঠে
জেগে উঠে সৌরসড়কের গ্রাম

(আমাদের সাইকেডেলিক মনোবিভ্রমের পাশে)

বাংলা ভাষার অনেক গুণের মধ্যে অন্যতম হলে এর শোষণ করার ক্ষমতা, মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা অর্থাৎ অভিযোজ্যতা। যে-কোনো ভাষার শব্দকে হজম করতে পারে অনায়াসে। আমাদের সবার কবিতাতেই ইংরেজি শব্দ কম-বেশি চলে আসে। কিন্তু, খুব কম কবিই মাতৃভাষার সহায়তা পেয়েও ঠিক খাপ খাওয়াতে সমর্থ হন। এ ক্ষেত্রে অমিতের পারঙ্গমতা চোখে পড়ার মতো।একই কবিতায়  সাইকেডেলিক, ন্যাভিগেটর, ক্রাচ, সেলেস্টিয়াল, মনোপলি ইত্যাদি শব্দের পাশে জ্যোতি, ধ্রুপদ, সৌরসড়ক, মনোবিভ্রম ইত্যাদি শব্দকে ব্যবহার করতে পারার সামর্থ্য খুব কম কবিরই আছে। তবে আপত্তির জায়গাও আছে; প্রথম ৭/৮ টি কবিতাতেই দেখা যাবে ২৫/৩০টির মতো ইংরেজি শব্দ। ফলে ইংরেজি’র ব্যবহার বলতে হয় অপরিমিত। আমরা অনেকেই এখন প্রচুর ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করি আমাদের প্রতিদিনের কথা বলায়। সেই বাস্তবতাটাই ধরা পড়েছে। তবু, বাস্তবতাকে পুরোপুরি মান্য করা তো কবির কাজ নয়; স্রোতের উল্টোদিকেও যাবার তাগিদ থাকে, কারণ তিনি স্বপ্ন দেখেন, আর-সবকিছুর মতো নিজের ভাষাকে নিয়েও স্বপ্ন দেখেন এবং দেখান। তবে, অবাক লাগে, এত এত ইংরেজি শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন, কিন্তু একটিও শব্দ নেই, যেটি খাপ খায় নি।
শুধু তাই না, শব্দের সাথে শব্দকে যেভাবে গেঁথেছেন, প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে যেভাবে নিয়ে গেছেন, দৃশ্যের সাথে দৃশ্য যেভাবে জুড়ে দিয়েছেন, তাতে সবকিছু মিলে তার কবিতা খুব সুরেলা হয়ে উঠেছে। গদ্য ছন্দের পাশাপাশি অন্য ছন্দেও কবিতা লিখেছেন। সংস্কৃত ছন্দে ততোটা সাবলীল নন যদিও, মাত্রাবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত ও গদ্যছন্দে বেশ সাবলীল:

সিমেট্রির পথে হচ্ছে খুন কেউ 
জাগছে গ্রিম আলো করোভা মিল্কবারে 
রাতের নেশাচোখে সাইকেডিলিয়ায় 
আমার মুখগুলি আমার দিকে ফিরে 
কেন যে নিজেকেই প্রশ্ন শুধু করে!
সুদূর নভোলোকে কোথাও নির্জনে
ঈশ্বরের আলো ঝরছে পাভলভ

অমিত বিদেশে থাকেন, কিন্তু, দীর্ঘ একটা সময় তিনি দেশে কাটিয়েছেন। ফলে আমরা আশা করতে পারি, তার কবিতায় তার নিজের ভূখন্ড উঠে আসবে। কিন্তু তেমনটা হয়নি বলা চলে। তার কৃষকরা চুরুট টানে, তার নারীরা রেনোয়ার নারী অথবা অ্যাজটেক রমণী। পশ্চিমা ভূখন্ডে যাবার আকাঙক্ষা না থাকলেও সে-ভূখন্ডের প্রকৃতি ও সংস্কৃতির প্রতি একটা টান তার ছিল যখন তিনি দেশে ছিলেন। অমিতের বইয়ের অধিকাংশ কবিতা তিনি দেশের বাইরে বসে লিখেছেন এবং তার তাহিতিকে তিনি এঁকেছেন তার নিজের ভাষায়; নিজ দেশের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠা গ্যঁগা’র বেলায় যেমনটা হয়েছে- তার চিত্রকর্ম যেমন ফরাসী চিত্রকলার অংশ, তেমনি অমিতের কবিতাও বাংলা সাহিত্যেরই অংশ। এও এক বাস্তবতা মানুষের, শিল্প-সাহিত্যের, কবি-শিল্পীর। এসব অমিতের বাস্তবতা, তার যাপন, মানসিকভাবে তিনি কিছুটা আমেরিকা মহাদেশেই বসবাস করেছেন। আমি যেমন ছিলাম, যেমন আছি এবং যেমন থাকতে চাই- এই তিনটিকে ঘিরেই আমার ’যাপন’। স্বচ্ছন্দ্য যাতায়াত আমার তিনটিতেই। ফলে, অমিত তার যাপনকে তুলে ধরেছেন, সেটা অস্বীকার করার উপায় নাই।

তাহিতির নির্জন অঞ্চলে
স্তন্যপান করাচ্ছেন মা
গগাঁ দেখছেন
আঁকছেন
অংশত আমাদের মধ্যে কেউ কেউ
তাহিতিতে চলে যাচ্ছে এই দৃশ্য ভাবতে ভাবতে
কাঠের ঘরগুলো জমে যাচ্ছে শীতে

the-three-hutsগ্যঁগা তাহিতিতে গেছেন জীবনের সদর্থকতাকে ধরতে আর অমিত বসেছেন বিষণ্নতাকে আঁকতে; তার চারপাশের মানুষ, প্রকৃতি সবকিছুতেই তিনি বিষণ্নতা মাখিয়েছেন, তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে অজস্র ফিউনারেলের স্মৃতি।তার বিষণ্নতাও তাকে বাধ্য করেনি ফেলে আসা ভূখন্ডকে স্মরণ করে সদর্থক কিছু লিখতে। এমন তো মানুষের হয়, সে যেখানে আছে সেখানে স্বস্তি না পেলে ফেলে ভূখন্ডের স্মৃতির অনেক কিছু আশাজাগানিয়া হয়ে ধরা দেয়, মমতা বাড়ায়। তেমনটা কেন হলো না অমিতের, সেটা একটু অবাক করেছে আমাকে। যা আমি দেখিনি তার প্রতি যেমন টান থাকে, তেমনি আজ যা-কিছু আর দেখতে পাই না, তার প্রতিও তো মানুষের টান তৈরি হয়।

তার কবিতায় ধৃত বাস্তবতার আরও কতগুলি দিক একটু ঘেটে দেখা যাক। অমিতের কবিতায় যে বাস্তবতা ধরা পড়েছে, তা শেষপর্যন্ত কিছুটা মরবিড। সবুজ প্রেইরি আর একটি গাছ প্রজাতিহীন এই গাছটির নাম দেয়া যেতে পারে পৃথিবী , নী অথবা যা আপনার ভালো লাগে আকাশে চাঁদ নেই তবু এক ধরণের নিস্পৃহ আলো লেগে আছে দৃশ্যটির শরীরে নক্ষত্রের আলো গভীরভাবে দেখুন আপনি যদি সত্যিই গভীরভাবে দেখতে পারেন এই সহজ দৃশ্যটি তাহলে এই গাছটির নৈঃসঙ্গ্য আর মেলাঙ্কোলিয়া আপনার অস্তিত্বে ঢুকে যাবে – এই হলো অমিতের কবিতা ও কবিতায় ফুটে ওঠা বাস্তবতা। সেই সব কবিরাই স্মরণীয় হয়ে থাকলো, যারা পাঠককে হয় অস্তিত্বধারণের তুমুল আনন্দ দিতে পেরেছে কিংবা চরম অসহায় করে তুলতে পেরেছে, ফেলে দিয়েছে অস্তিত্বের সংকটে। এক্ষেত্রে অমিতের দক্ষতা আমাকে পাঠক হিসেবে আনন্দিত করে।
বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ দাশকে মরবিড ধারার কবিতার রাজা বলতে পারি। তিনি যেভাবে অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দিতে পারেন, তার কাছাকাছি নমুনা আজও বাংলা কবিতায় খুঁজে পাওয়া যায় না বিগত কয়েক দশকে। তিনি ইতিহাস, পুরাণ, সমকালীন বাস্তবতার সমন্বয়ে খুব যুক্তিপূর্ণ, খুব বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে প্রকাশ করেছেন তার মরবিড চেতনাকে। তার মরবিড চেতনা তার গুঢ় জীবনবোধের সাথে স্বমন্বিত; গভীর চিন্তা থেকে উঠে এসেছে জীবনানন্দের ভাব-ভাষা। অমিতের ধাঁচটা তেমন নয়। বরং অমিত দেখনদার হয়ে দাড়িয়ে থাকেন, যেন তিনি ভাষ্যকার; তার কবিতায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিষাদকে তিনি যেন সর্বদা ততোটা স্পর্শ করেন না বা আল্টিমেট মনে করেন না, যতোটা নিষ্ঠার সাথে টুকে রাখেন। স্বাভাবিকভাবেই তিনি কোনো সিদ্ধান্ত দেন না, খুব বেশি প্রশ্নও করেন না। কখনও বিষণ্নতা, কখনও নির্লিপ্তি নিয়ে অবলোকন করেন। অবলোকন করেন …… স্ট্রবেরিখামারগুলো ধীরে, লাল থেকে, কালো থেকে, নেই হয়ে গ্যাছে ,… শহরের বাড়িগুলো শীতার্ত, বরফে ঢাকা, অগ্রসরমান মৃত্যুর দিকে। দেখেন দিনের শেষ সূর্যাভায়, কারও চোখে হঠাৎ জেগে ওঠে ভায়োলেন্স। দেখেন স্যাফায়ার আকাশ সরে যাচ্ছে; সরে সরে যাচ্ছে ভিন্ন দিগন্তে বা দেখেন বিস্তীর্ণ রিয়েল এস্টেট এর ভেতর যুবকেরা কোনো মথের জীবন লিখে না… তার চোখের সামনে আলফ্রেডের পাখিগুলো ভেঙে যেতে থাকে, দিগন্তে।

অমিতের কবিতায় ধৃত বাস্তবতাকে যদি আমরা একটু বিশ্লেষণ করি, তাহলে কয়েকটি বিষয় দেখতে পাবো। তিনি স্বপ্নগ্রস্থ এবং দমিত।উদাহরণ দিয়ে বিষটা স্পষ্ট করি।

. স্বপ্নগ্রস্থ:
) ঘুমাচ্ছে আন্তোনিয়ো, নীলজামা পরে স্বপ্ন দেখার জামা 
  
তার ঠোঁটে গুঁড়ো গুঁড়ো স্বপ্নদানা বনের ভেতর, ঘুরছে
  
হ্যানসেল আর গ্রেটেলের সাথে, হাঁসের পিঠে করে
  
পেরিয়ে যাচ্ছে হ্রদ আর আনমনে আঁকছে ঘুমখাতা, রঙপেন্সিল 
  
জেগে ওঠে সে দেখল একটা হারানো খরগোশ, শুয়ে আছে তার খাতায় 

) আমি তো জানি, ভিনসেন্ট আঁকা শেষ করলে দুইজন আজ সারারাত জেগে তারা দেখবো

) আবার এক অন্ধকার সন্ধ্যায়, /আমরা পুরোনো গল্পে ফিরে আসলাম/ ঝিলে, রেড ইন্ডিয়ানদের ক্যানুর পাশে/ যেখানে      অ্যাজটেক মেয়েরা মথ ধরার জাল বানায় 

) আমার আঁকা পাখিগুলোআমার আঁকা পাখিগুলো কোনো এক অগ্রহায়ণের ভেতর রোদ পোহাচ্ছে। ফসলের ঘ্রাণে ভরা সেই মাঠে স্বামীস্ত্রীরা কথা বলাবলি করে, আমার ভাষায়।  

) ঘুম গাঢ় হয়/ ঘুম সে গভীর/ আন্তোনিয়োর/ চোখভরা নীল/ মৌনী নদীর/ বুক চিরে যায় /অন্ধ স্টিমার /আন্তোনিয়োর    স্বপ্ন/ নিবিড়

 

.  একাকিত্ব, অবদমন:

) এখন জেনে গ্যাছি/ মানুষ নিঃসঙ্গ হলে পর্ণ দেখে; /মাস্টারবেইট করে

) কোনো কোনো রাত/ পরিত্যক্ত রেলগাড়ির মতো দীর্ঘ, মেলানকোলিক/ ভুলে যাওয়া মুখগুলো মনে পড়ে/ আর সমুদ্রহিমজ্বরের মতো জেগে ওঠা/প্রথম যৌনবোধ

) কোকেইনের মতো রাত ছড়িয়ে আছে/ কামান্ধ সাড়ে এগারোশো মাইল

) অপ্রাকৃত কোনো নৈঃসঙ্গ্যের/ জানালা দিয়ে/মাথা বের করি/রিসেপসনিস্টের পাতলা ঠোঁটের মতো/বাঁকানো সাঁকো, হাওয়ায় দুলছে/ দূরে/ একটা আলোকবিন্দু/ হয়তো কেউ সিগারেট খাচ্ছে/ শুধু শুধু আমি ভাবছি জোনাকি

 

.  একাকিত্বজনিত বিষণ্নতা এবং ক্রনিকবিষণ্নতাজনিত নির্লিপ্তি, ক্রোধ, হেঁয়ালি:

 ) উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। রক্তকণিকারা চঞ্চল। এমন সূর্যের নিচে হুট করে কাউকে খুন করে ফেলা যায়। তারপর ছোট জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকা, আকাশের রঙ শেখা

) এইরকম দুপুরগুলোতে করা যায় না কিছুই। শিশুদের স্নোবল ছোঁড়াছুঁড়ির হর্ষ লিখে রাখা ছাড়া 

 

এই ৩টি’র সম্মিলিত ঘূর্ণিতেই গড়ে উড়েছে পুরো গ্রন্থটি এবং এ-সবই আন্তোনিয়োর মেঘ-এ ফুটে ওঠা বাস্তবতা। বোর্হেস, আন্তনিয়ো, মার্কেজ, আল মুতাসীম, ভিনসেন্ট, রেনোয়া- এ রকম অজস্র নাম এসেছে অমিতের কবিতায়। এমনটা অন্য কারও কবিতায় কখনও দেখিনি। একটি বইতে এত এত নামের সমাহার, এটাকে ভালো বা মন্দ কিছুই বলা যায় না। তবে একদিক দিয়ে বেশ ভালো, নতুন একটা প্রবণতা আকারের দেখা গেল। বাংলা কবিতায় কখনও কাউকে এত এত নাম ব্যবহার করতে দেখিনি।ব্যক্তিজীবনে কিছুটা নিঃসঙ্গ ও মুখচোরা বলেই হয়তো তার নিজের আঁকা জগতে এত এত লোকের ভিড়।  

main-qimg-4f66435005a28f7b808f72a52ee881f4দীর্ঘক্ষণ আন্তোনিয়োর মেঘ’র সাথে সময় কাটালে কোথাও কোথাও একটু একঘেয়ে মনে হতে পারে। এর কারণও আছে। বিশেষ করে টানা-গদ্যে লেখা কবিতাগুলির কারণে। এক্ষেত্রে নির্মাণশৈলীর অভিন্নতাই দায়ী। কিছু দৃশ্য পাশাপাশি সাজানো একই ভঙ্গিতে। যেমন: রাস্তার দুইপাশে শস্যের মাঠ, মদ আর ম্যাকারনির দোকানে জড়ো হওয়া মানুষ, জ্বলন্ত পোর্চের বাতি, শহরের শীতার্ত বাড়িঘর, জিপসি মেয়েদের চলাচল, পার্ক করা গাড়ি ইত্যাদি এমন কিছু দৃশ্য, কখনও একই রকম কিছু ভাবনা পাশপাশি একই ভাবে বসে যাচ্ছে এবং একই ভাবে শেষতক একটা টোটালিটি দাঁড়াচ্ছে এবং যে অভিব্যক্তি দাঁড় হচ্ছে সেটাও খানিকটা অভিন্ন। নির্মাণ বা নির্মিতির ক্ষেত্রে এটা অমিতের মূল প্রবণতা, সবারই যেমন কিছু বিশেষ প্রবণতা থাকে। কিন্তু, এর ভিতর দিয়ে অমিত আসলে কী করতে চান? এমন কোনো চিত্রকল্প, দৃশ্যকল্প কি তিনি ধরতে চান, যা পুরো কবিতায় শক্তি সঞ্চার করবে, কবিতাকে জীবন্ত করে তুলবে? কবিতাটিকে অন্য সব কবিতাকে আলাদা করে ফেলবে? সেটা দেখার আগে কিছু চিত্রকল্প/ দৃশ্যকল্প তুলে আনা যাক:

. স্যাফায়ার আকাশ সরে যাচ্ছে; সরে সরে যাচ্ছে ভিন্ন দিগন্তে
. আলফ্রেডের পাখিগুলো, ভেঙে যেতে থাকে, দিগন্তে
. মনে মনে সে (অন্যমনস্কা) বিড়বিড় করে,”আগুয়া! আগুয়া!”
আকাশ ধীরে ধীরে অন্ধকার হতে থাকে, বোর্হেসের দৃষ্টির মতো 

. শীতের রাতে, মানুষগুলির দুঃস্বপ্নে শ্রোডিঞ্জারের বেড়ালেরা দেখা দেয়; ঘুমন্ত মুখগুলো চেটে দিয়ে চলে যায়

. আলোহীন একটা দিনের দিকে বাড়ি ফেরার পথ; মানুষগুলোর চোখের ভেতরে রোদের তৃষ্ণা যখন আর নেই

 

এভাবে পয়েন্ট আকারে দেখলেও বোঝা যায় এই বাক্যগুলির শক্তি। ততোধিক শক্তিশালী হয়ে ওঠে যখন যথাস্থানে আমরা এমন বাক্য দেখতে পাই।উল্লেখিত চিত্রকল্প/দৃশ্যকল্পগুলির কয়েকটির মধ্যে একটি মিলও রয়েছে, আর তা হলো গতি। স্থির নয় মোটেও; সাফায়ার আকাশ সরে যাচ্ছে, পাখিগুলি ভেঙে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে।অনেক কিছুর পাশাপাশি, কবিতায় উঠে আসা চিত্রকল্পগুলি ধরণ এবং বিন্যাসের ওপরও কবিতার সঙ্গীতময়তা নির্ভর করে। বিচ্ছিন্ন, হতাশ, অবসাদগ্রস্থ মানুষের ছবি দেখা শেষ হলে, অতঃপর যখন দেখি শ্রোডিঞ্জারের বেড়ালেরা তাদের ঘুমন্ত মুখ চেটে দিয়ে যাচ্ছে বা আলফ্রেড্রের পাখিগুলি দিগন্তে ভেঙে যাচ্ছে, তখন কবিতা জীবন্ত হয়ে ওঠে, ক্রিয়া করে মনের ওপর।
অন্ধকার আকাশে মেঘ জমলে আমরা তা দেখি না, আমাদের মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসে না। কেবল বিদ্যুৎ চমকালে ও বাতাস ঝাপটা দিলেই আমরা নড়ে উঠি, টের পাই। জানালা-কপাট লাগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, যা-কিছু দরকারী তা দ্রুত কিনে আনি। উপরে পয়েন্ট আকারে দেয়া চিত্রকল্প/দৃশ্যকল্পগুলি ঠিক সেই কাজটাই করে। তবে তার জন্য ’যথাস্থান’ বলে একটা বিষয় আছে। এইখানে অমিত পারঙ্গম। অনেক চেনা, শান্ত ও বিমর্ষতায় ভরা দৃশ্যের পরে যখন এমন কিছু আসে, তখন পুরো কবিতা জীবন্ত হয়ে ওঠে, বিচিত্র ক্রিয়া হতে থাকে পাঠকের মনে, তৈরি হয় সঙ্গীত; সঙ্গীত তৈরি হয় চিত্রসমূহের যথার্থ সম্মিলনে। মেঘ, বিদ্যুত-বাতাস, অতঃপর বৃষ্টি এবং সে বৃষ্টি বড়ই মধুর।এর কথাই শুরুতে বলেছিলাম; বলেছিলাম পরবর্তীতে ব্যাখ্যা করবো। কারও কারও কবিতায় মেঘ আছে বিদ্যুত নাই, আবার কোথাও বিনামেঘে বজ্রপাত। হতাশ করে। সঠিক সম্মিলন তথা গণিত ছাড়া কোথাও সঙ্গীত তৈরি হয়, জন্ম হয় না নৈঃশব্দ্যের, কবিতা পারে না সময়খেকো হয়ে উঠতে। আর এই গণিত সংরক্ষিত থাকে কবির শিল্পবোধে, তার রুচিতে, যা তার গভীর অনুধ্যানের ভিতর দিয়ে তৈরি হয়; কবিতা বানিয়ে তোলার বিষয় নয়; শ্রম, নিষ্ঠা ও নিবেদনের বিষয়। কবিতায় চিত্রকল্পে হিড়িক তৈরি করা, যথেচ্ছা ব্যবহার থেকে অমিত বহু আগেই সরে এসেছেন। এখানেই তিনি সারফেসে আটকে থাকা সমসাময়িক অনেকের থেকে এগিয়ে আছেন।শিল্পের গভীরে প্রবেশ করেছেন। এক যুগেরও অধিক সময় ধরে কাব্যচর্চা করতে থাকা অনেক অনেক লোকে যা ধরতে পারেনি, তিনি বিদেশ-বিভুঁইয়ে থেকে, কারও সাথে খুব একটা না মিশেও সেসব ধরতে পেরেছেন। তার কবিতা সস্তা গিমিক ও টুইষ্ট, চিত্রকল্পের হিড়িক, বুদ্ধির ঝিলিক থেকে অনেক দূরে অবস্থান নিয়েছে। বৃদ্ধিবৃত্তির চেয়ে হৃদয়বৃত্তির প্রতি তার টান বেশি।

কবিতায় কোন বাস্তবতা ধরা পড়লো, সেটা উক্ত প্রসঙ্গের ভিতরে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু শিল্পের প্রশ্নে সেটি কিছুটা গুরুত্ব হারায়। অর্থাৎ কবিতায় কোনো বাস্তবতাকে তুলে ধরাতে সাফল্য নাই বরং ফুটিয়ে তোলাতেই সাফল্য এবং কবিতার আলোচনা করতে বসে তার বিশ্লেষণই করণীয়। অন্যথায় সাহিত্যে হেজিমনি তৈরি হয়। কারণ, যে-বাস্তবতা অমিতের কবিতায় ধরা পড়েছে, তা কম-বেশি অনেকের কবিতায় ধরা পড়ে। ফুটিয়ে তোলা, শিল্প করে তোলার গল্পই আমাদের করতে হবে এবং টু দ্য পয়েন্ট। এই ফুটিয়ে তোলার প্রশ্নে অমিত চক্রবর্তী’র মতো পারঙ্গম একুশ শতকের প্রভাতবেলায় খুব একটা নাই। মরুতীর্থ হিংলাজের যাত্রী হয়ে অর্থাৎ দীর্ঘকাল কাব্যচর্চা করার ভিতর দিয়ে তিনি বাংলা কবিতায় একটি বড় কন্ট্রিবিউশন রাখবেন বলে আমি আশাবাদী।

12661811_1149797075054017_1784065336806206938_n

Advertisements