16298790_1195267480526422_7867288548853363150_nচঞ্চল মাহমুদ আমার বন্ধু। আমি তার কবিতার ভক্ত।ব্যক্তি চঞ্চলের ভক্ত না হলেও অনুরাগী তো বটেই, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার পক্ষপাতি। তার  কম্পিত বিন্দুর ধারণা  নিয়ে লেখা এই প্রবন্ধ মোহপ্রবণ। কাজেই লেখকের নির্মোহতার বিচার এখানে অচল না বললেও অকার্যকরী! তাতে কাব্যপ্রেমীদের কবিতার রসাস্বাদনের ঘাটতি হবে না, বরং আশা করাই যায়, বিশুদ্ধতা আর বৈদগ্ধতার চিন্তা মাথায় না রেখে, আবেগের প্রশ্রয় কবিতার স্বাদ গ্রহণের পথকে আরও স্নিগ্ধতা দেবে। প্রশ্রয়াবনত মন কবিতার তুল্যমূল্যতা যথার্থরূপে নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হলেও কবিতাকে উপলব্ধির পথে বাধা হবে না।

সহজ কথা সহজ করে বলার সহজাত প্রতিভা নিয়েই যেন জন্মেছেন চঞ্চল মাহমুদ। কথা যত সহজই ঠেকুক না কেন, কবিতার হৃদয়সংবেদী শক্তি না থাকলে কাব্য যাই অর্থই করুক, পাঠকের অন্তরাত্মায় পৌঁছাবে না। আর কে না জানে প্রকৃত কবিতা অর্থোৎপাদনের আগেই পাঠকের মর্মে পৌঁছে যায়। এই বিশ্বাস ছিল কোলরিজের। একই কথা বলেছেন টি এস এলিয়টও। তবে সে তাদের মত নয়, চঞ্চল ঐতিহ্য খুঁজতে যত না আগ্রহী, তার চাইতে নির্মাণের দিকেই তার নজর। তিনি এই বিষয়ে অবগত, কিন্তু সব সময় সজাগ নন। ঐতিহ্য নির্মাণের প্রসঙ্গ নিয়া পরে কথা বলব। এইটুকু বলি, তার এই নির্মাণ-প্রচেষ্টা চর্চিত নয়, অভিজ্ঞতালব্ধ, অর্জিত। জীবন প্রবাহমান। ব্যক্তির পুনরোৎপাদনের ভেতর দিয়েই যেমন জীবন সময়কে অতিক্রম করে, তিনি ব্যক্তির ভেতর দিয়েই তেমন দেখতে প্রয়াসী হয়েছেন সবকিছু। তিনি বাংলাদেশের কবি, তবে তার দৃষ্টিভঙ্গি বৈশ্বিক। এই কথা মাথায় না রাখলে তার কবিতার রসগ্রহণে বাধা না পড়লেও তাকে ভুল বোঝার সম্ভাবনা রয়েই যায়। তবে এ-ও সত্য, কবিতার সঠিক পাঠ আর ভুল পাঠ বলে কিছু নাই। তবু, এই কথা মনে করিয়ে দেয়ার কারণ হল, কবির অর্জিত অভিজ্ঞান সম্পর্কে সংস্কার কাটাতে না পারলে তার সঙ্গে অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠা যায় না। অন্তর্লীন ভাব ও পরিচয় গ্রহণে সংস্কার বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাতে কবির কিছুই ক্ষতি নাই, কিন্তু পাঠকের দৃষ্টি তখন দিগন্তবিস্তৃত হয় না। এতে করে ব্যক্তির ভেতর দিয়ে যেই সার্বজনীনতার অনুভূতি লাভের সুযোগ থাকে, তা আমাদের আন্দোলিত করে না। ফলে কবিতার রসগ্রহণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়!

চঞ্চলের কবিতার শক্তি এই যে, তার কবিতার প্রসঙ্গগুলো আমাদেরই। তাতে লাভ হল, বিষয়বস্তুর গুরুত্ব কবিতার রসোৎপাদনে বৈরি তো হয়ই না, বরং পাঠক তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে ওঠেন। আর বর্তমান সময়ে কবি কোনো অঞ্চলের নন, তিনি নানা কারণেই বৈশ্বিক। পুঁজিবাদ-এর ভালমন্দ যাচাই না করেই বলি, পুঁজিবাদ জগৎকে ছোট করে এনেছে। বিশ্বায়ন পৃথিবীকে আমাদের সম্মুখে অপরাধীর মত এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। পুঁজিবাদের সঙ্গে যেমন ভালমন্দের সম্পর্কের চাইতে সম্ভাব্যতার সম্পর্ক গভীর, তেমনি কবিতাও সত্যাসত্য প্রকাশের দায় নিয়ে সৃষ্টি হয় না। কিন্তু, সত্যিকারের কবি তার সৃষ্টির ভেতর দিয়ে আমাদের চৈতন্যে সত্যের প্রতি স্বভাবসিদ্ধ মমতা জাগাতে সক্ষম হন। কবিকে তখন ধন্যবাদ দিয়ে পিঠ চাপড়ে দেই না, বরং ভালোবেসে ফেলি। এতে বিস্ময়ের কিছু নাই।তা’ই স্বাভাবিকতা । মনোঃসমীক্ষণ বিদ্যা সকলে না জানলেও আত্মোপলব্ধিজাত এই জ্ঞানকে কেউই অস্বীকার করে না। আগেই বলেছি, তার কবিতা অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে নির্মিত। অভিজ্ঞতা কাউকে কবি বানায় না। এইকথাও সত্য, অভিজ্ঞতা যতই গুরুত্ববহ হোক, কাব্যের মূলধন নয়। কাব্য স্মৃতিসঞ্চিত আবেগের সুনির্মিত প্রকাশ। অভিজ্ঞতা, স্মৃতি আর আবেগ- এই তিনের সুসমন্বিত নির্মিতি।

আমরা দেখাতে চেষ্টা করব চঞ্চল কিভাবে এই তিনের মধ্য সম্পর্ক রক্ষা করেন, এদের সমন্বিত করেন। বলে রাখা ভালো, পাঠকেরও বুদ্ধির দারস্থ না হয়ে হৃদয়ের পাঠ গ্রহণ করাই উত্তম হবে। জানি, উত্তম  শব্দটা বিচারার্থতা প্রকাশ করে। তবে, এইসব জটিলতাকে কবিতা উপভোগের ক্ষেত্রে সম্মুখে না রেখে বরং চলুন সমর্পিতের সারল্য নিয়েই কবিতা পাঠে মনোযোগী হই। তার কবিতা পাঠ করতে করতেই জেনে নিতে পারব তার ভূগোল। তাতে করে তার সঙ্গে সময় ও ইতিহাস পাড়ি দিতে বৈরিতার মুখোমুখি হতে হবে না। কবিতা উপভোগের আতিশয্যে নিশ্চয়ই আমরা পথকষ্ট ভুলে যাব।

মাতাল পাথর তুলা হয়ে গেলে
বাতাসে বাজে বিদ্যুৎ
ফুল আর ফলের যৌবন ধুয়ে
প্রবাহের খাঁজে
মহাকাশ হারিয়ে ফেলে গতি
স্থির বস্তুই মূলত গেঁথে থাকে
চুম্বকের ধর্ম মেনে।
কিউই ফল
মজ্জার ভেতর পাকিয়ে তোলে
রাতের আকাশের নকশা
এ চিত্র ধারণ করেই
পাখি দেখতে এসেছিল আকাশ

সংক্ষিপ্ত পরিসরের এই কবিতা পাঠ শেষে যেখানে এসে আমরা থেকে যাই, থমকেও যাই, বাকি পথ সেখান থেকেই পাড়ি দিতে হবে। তখনই বুঝে নিতে পারব কে কাকে দেখতে এসেছিল।কবিতার আলোচনায় কবির ব্যক্তিজীবনের তথ্য আমাদের সাহায্য করতে পারে নানভাবেই। কবিতা আর কবির জীবন আপাত ভিন্ন হলেও এদের মাঝে যোগসুত্র নিশ্চিতরূপেই রয়েছে। সেখানেই হয়তো থেকে যায় কবিতাকে আবিষ্কারের গোপন চাবি। ব্যক্তি চঞ্চল কোন এক সময় জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজনে ইউরোপে পাড়ি জমান। কবিতার জন্য এই তথ্য খুব কাজের না হলেও কম্পিত বিন্দুর ধারণা  পাঠ করার সময় তা আমাদের সাহায্য করবে কবির জগৎকে চিনে নিতে। আধুনিক ধনতন্ত্রের ভিত্তি মজুরি-শ্রম। এর বিকাশ ইউরোপে  উপনিবেশায়িত করেছিল আমেরিকার ও অস্ট্রেলিয়াকে, জয় করেছিল ভারত আর আফ্রিকাকে, এবং গত পাঁচ শতাব্দী ধরে ছড়িয়ে আছে সমগ্র বিশ্বে। আর বদলে দিয়েছে সারা মানবজাতির জীবনকে।

এর দিশা পেতে কারো সাহায্য নেয়া লাগে না। তবু একবার দেখে আসতে চাই, পুঁজিবাদের গুণমুগ্ধ নেহেরু কী বলেন: বর্তমানে ইউরোপ প্রবল ও পরাক্রান্ত আর ইউরোপীয়রা নিজেদের ভাবেন যে বিশ্বে তারাই সবচেয়ে সভ্য ও সংস্কৃতিমান। এশিয়া ও তার জনগণকে তারা দেখেন উঁচু থেকে, এশিয়ার দেশগুলিতে এসে তারা যা পারেন দখল করেন। সমাজতাত্ত্বিকরা বলেন উপনিবেশবাদের সমাপ্তি ঘটেছে। আদতে তার সমাপ্তি ঘটেনি। বরং নতুনরূপে তার বিস্তৃতি ঘটেছে। লেনিন ১৯০৩ সালেই পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তরকে সাম্রাজ্যবাদ অভিধায় অভিহিত করেছিলেন। রুশ ও চীনা বিপ্লবের প্রবল ধাক্কা সামলে সাম্রাজ্যবাদ আজও বহাল রয়েছে। তার প্রসার ঘটেছে নানা অভিমুখে। সম্পদের লোভ আর লালসা পুঁজিপতির কাছে মানুষকে আজও বাকসর্বস্ব যন্ত্র বানিয়ে রেখেছে। আফগানিস্তান আর ইরাক যুদ্ধের পর পৃথিবী বদলে গেছে অনেকটাই।

ব্যক্তি চঞ্চলের জীবিকার লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে আমরা দেখতে চাই কী ঘটেছে মানুষের জীবনে। বাস্তবতা ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে পার্থক্য তৈরি করে। তবু দেখি ভাগ্যান্বেষী এক যুবক অ্যালেক্স, যে তার আসল পরিচয় হারিয়ে ফেলেছে কিংবা তা ভুলে যেতে বাধ্য হয়েছে যুদ্ধের কারণে। ইউরোপে পাড়ি দিয়ে বদলে গেছে তার পরিচয়। যে এই কাব্যগ্রন্থে বার বার হাজির হয়। তার কথা বলতে গিয়ে চঞ্চল বলেন :অ্যালেক্স, আমাদের যে জীবনের উপর ইউরোপ দাঁড়িয়ে আছে, সে জীবনকে আমরা মৃত ঘোষণা করছি। ওরা মরা মানুষের শরীরকে নাচের স্কুল ভেবে নাচ শিখছে…

একটা রুশ প্রবাদ মনে পড়ছে, সৈনিকের আছে বন্দুক আর বণিকের টাকা। মানুষকে বাস করতে হয় পূর্বপুরুষের নির্মিত পথ ধরেই আর মানব-আবিষ্কৃত অভিজ্ঞতার জগতে- এটাই বাস্তবতা। মজুরি ও শ্রমনির্ভর জগৎ নিখুঁত নয়, তাই তা পরিবর্তনযোগ্য। কিন্তু, কবির হাতে ভাষা ছাড়া আর অস্ত্র নাই। শিল্পের জন্য যে স্বাধীনতা প্রয়োজন, তা এই সমাজে মিলবে না। তাই চঞ্চলকে বলতে শুনি: ভাগ্যবদল হয় না দেখে জীবন প্রায়ই উঠে আসে চটের ব্যাগে। অন্ধকারে স্বেচ্ছানির্বাসিত হয়ে সভ্যতা পড়ে থাকে পার্কের বেঞ্চিতে।

চঞ্চলের বিষয়বস্তু হলো জীবন। তা সকল কবিরই। যে-জীবন সহজ নয়, তাকে বিনির্মাণের দায়িত্ব কবির একার নয়। সত্যিকার অর্থে কবির কাজ জগতের পরিবর্তন করা নয়, কবিতা লেখা। কিন্তু, জীবনের প্রতি দায়বদ্ধ কবি সে দায় এড়াতে পারেন না। তাই সমাজ পরিবর্তনের ডাক না দিলেও, তার বিনির্মাণ চঞ্চলকে উদ্বুদ্ধ করেছে। প্রথা আর রীতির পথ মাড়িয়ে ন্যায়বোধ তাকে প্ররোচিত করেছে জগতকে পরিবর্তনে। তিনি বলেন, জেগে ওঠ মানবতা, শুয়োরের বাচ্চার মতো কোলাহল করে। আমার বন্ধুর বিক্ষত হাত কাঁপছে, বিস্রস্ত চুল, ভুরুতে ঘাম, পায়ের কালশিটে নির্মম হয়ে উঠছে ক্ষুধায়, চিৎকার করছে আলজিভ ; শুনতে পাসনি?

তার এই আহ্বান অভিজ্ঞতা আর স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের ফসল। বদলে যাওয়া প্রাণতত্ত্বের নিয়ম, তবে মানুষ যেহেতু সচেতন স্বার্থপরায়ণ প্রাণী, সে সহজে কোনো পরিবর্তন মেনে নিতে চায় না। কিন্তু, এই কথা অস্বীকারের কোন সুযোগ নাই যে পরিবর্তনই প্রাণের পরিচায়ক।

সমাজতাত্ত্বিকেরা বলেন, কোন একক ব্যক্তিই তার সময়কে ছাড়িয়ে যেতে পারেন না। যে তার সময়কে উপলব্ধি করেছে সেই জগতকে উপলব্ধি করেছে। একজন প্রকৃত সাহিত্যিক তার সময়কে ধারণ করেই টিকে থাকেন। কোনো নির্দিষ্ট যুগ কোনো কবিকে মহৎ কিংবা বড় করে না। কবিরা কেবল আপন যুগের মানসসত্ত্বাকে ধারণ করেন। তার ভেতর দিয়েই লাভ করেন জগতের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা, যা প্রবেশ করে তাদের অন্তঃপ্রদেশে, যার স্পর্শে তাদের মন সক্রিয় হয়ে ওঠে আর সৃষ্টি করেন সাহিত্য। মাতিস সেই কথাই বলেন। তার ভাষায়, All art bears the imprint of its historical epoch, but great art is that in which this imprint is most deeply marked.

আমরা দেখতে চাই সময় কিভাবে কার্যকর রয়েছে চঞ্চলের অভিজ্ঞতার ভেতর।

*যে সভ্যতা ডুবে গেছে বালির নিচে, কতদূর পেরিয়ে অ্যালেক্স এসেছে কবরে শুতে!

*পৃথিবীর সব মধু খেয়ে অ্যালেক্স যে তির ঝরিয়ে দিল বাতাসে, সে ভাংঝরতাকে পাল বানিয়ে বয়ে যাচ্ছে সময়

*আমরা কাপঁতে কাঁপতে টের পাই, পৃথিবীর সকল ক্ষুধার্ত মানুষের সন্তান আমাদের ভেতর দিয়ে মিছিল নিয়ে যাচ্ছে

*চোখেমুখে পানি নিতে নিতে মনে হয়, পৃথিবীর নগরপিতারা আমার ক্লান্ত শরীরের উপর দাঁড়িয়ে মুতে দিচ্ছে

*জয়তুনের আচার ক্ষুধার চেয়েও লবণাক্ত

*আমাদের দাঁতের ভেতর আটকা পড়ে উৎসবের কয়লা আর লোহার লাল উত্তাপ

*তুই যে পথ অতিক্রম করে এসেছিস সেসব পথের গোপনীয়তা ভেসে আসছে তোর মোজা থেকে।
আমার নিজস্ব কৌশলে আমি পিতার হিংস্রতাকে প্রতিরোধ করি

*জন্ম, তুমি আমাকে টান দিয়ে ধরো
যেমন, মধ্যবিত্ত টানাটানি করে সংসার

diego-rivera-pre-hispanic-america2আরবের লোকেরা উটের বিষ্ঠার রঙ দেখে বুঝে নিতে পারেন উটটি কোন অঞ্চলের, আমরাও উপলব্ধি করতে সক্ষম হই, চঞ্চল নিজেও পাড়ি দিয়ে চলেছেন সেইসব পথ, যে পথ মাড়িয়ে অ্যালেক্স ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছে, তার মোজার গন্ধে লুকিয়ে আছে সেই পথের পরিচয়। ২০১৭ সালে দাঁড়িয়ে এই কথা বলাই যায়, চঞ্চল অর্থনীতি আর রাজনীতিকে উপজীব্য করে কবি হয়ে ওঠেন নি। বরং সময় তার কবিতায় এসেছে প্রাসঙ্গিকভাবে। এইকথা বললে অত্যুক্তি হবে না, কাল ও সমাজ সম্পর্কে তার জাগ্রত চেতনা তাকেই বেছে নিয়েছে কবিতার মুখপাত্র হিসেবে। জীবনানন্দ সময়চেতনা  হিসেবে যে বস্তুকে আখ্যায়িত করেছেন তার উপস্থিতি চঞ্চলের কাব্যে যথারীতি বর্তমান। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী আর্থরাজনৈতিক ব্যবস্থায় সংস্কৃতি চর্চার আলাদা সুযোগ নাই; কেন নাই তার ব্যাখ্যায় না গিয়েই বলি, সাহিত্য-সংস্কৃতি নিজেও পুঁজির বাইরে নয়; তবু তা’ই স্থানকাল ভেদে তাৎপর্যবাহী বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করতে পারে। ভাষা ও সংস্কৃতিতে পুঁজির লক্ষণ ও চিহ্ন গভীরভাবে প্রোথিত। তবু সেই ভাষাই হয়ে ওঠে লড়াইয়ের অস্ত্র। ভাষার ভেতরেই দিয়ে বেড়ে ওঠে চিন্তা আর পরিবর্তনের সামাজিক মনস্তত্ত্ব। চঞ্চল বলেন, হৃদয় বেদনা পেলে যন্ত্র হতে চায়। এই যন্ত্রকে নিছক অস্ত্র বা আয়ুধ ভেবে না নিয়ে অন্যভাবে ভাবার সুযোগ আছে। অর্থাৎ, আমাদের ব্যক্তি ও সমাজজীবনে যে-সকল প্রতিকুল অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে আমরা এগিয়ে যাই, তা কেবল আমাদের ভেতরে ভেতরে দূর্বল আর অসহায় করে রাখে না, আমাদের ভেতর প্রতিক্রিয়াও সৃষ্টি করে। যদিও বেশিরভাগ মানুষ এই সম্পর্কে নির্বিকার, কিন্ত প্রকাশিত  কবিতায় তিনি যখন বলেন: আমার শরীর উল্লেখযোগ্য কুমিরের হাওড় ; তখন উপলব্ধি করতে পারি সঙ্ঘবদ্ধতার শক্তি, যে-শক্তিই তাকে ঠেলে দেবে পরিবর্তনে অভিমুখে।শরীর কুমিরের হাওড় হয়ে ওঠে কেবল সচেতনতার পথ বেয়েই। আর সচেতনতা নিজেই চিন্তার সহিংস রূপ। এমনই মনে করতেন ফ্রাঞ্জ ফানো।

তার স্রোত, বেঁকে যাওয়া গ্রাম, কোদাল, খনিজের ভাবনা নিয়ে এসেছি- এইসব কবিতা পড়তে গিয়ে যে কারো এই কথা মাথায় আসা খুব স্বাভাবিক, দুনিয়ায় প্রতি মুহুর্তে চলছে জীবিকার লড়াই। সম্পদের অসম বন্টনের দৌরাত্ম্য। একদিকে প্রাচুর্য আর অন্যদিকে সীমাহীন অভাব। সম্পদ মানুষকে দিতে পারে মুক্তি, যদি তা বন্টিত হয় সুষমভাবে। কিন্তু তা হয় না। লোভ আর লালসা মানুষকে মানুষ হতে দেয় না। সেই কথা প্রতিধ্বনিত হয় কলম্বাসের উক্তিতে: সোনা হচ্ছে সম্পদ এবং এ সম্পদ যার আছে এই দুনিয়ায় সব প্রয়োজনীয় দ্রব্যই তার আছে। এটা হচ্ছে আত্মার যন্ত্রণামুক্তির এবং স্বর্গসুখ ভোগেরও উপায়।

তার কোদাল কবিতায় তিনি বলেন:

পৃথিবী একটা ভাতের পাতিল। সূর্য একমাত্র ফুয়েল। আমরা প্রতিটি মানুষ চাল-ডাল__ সেদ্ধ হচ্ছি, বিপরীত গোলার্ধের ক্ষুধার্ত মানুষের দাঁতে কাটা পড়ব বলে।
উত্তর-গোলার্ধজুড়ে ভাতের পাতিল
দক্ষিন-গোলার্ধজুড়ে ভাতের পাতিল

পৃথিবীতে একটি সূর্য
দিনে দুইবার জেগে ওঠে
পৃথিবীতে একটি সূর্য
দিনে দুইবার ডুবে যায়…

এই কবিতা পড়তে পড়তে আমাদের মনে পড়ে, যদিও বিপরীতধর্মী ভাবনা, কিন্তু সমচিন্তার, মার্লো’র জিউ অফ মাল্টা’র সেই ইহুদির কথা যে বলে:
This trolls of our fortune in by lands and sea
And thus are men on every side enriched
What more may heaven do for earthly man
Then thus to pour out plenty in their laps,
Rippling the bowels of the earth for them,
Making the seas their servants,and the winds
To drive their substance with successful blasts.

এইসব কবিতাকে কেবল এইভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়, যে এগুলো বুর্জোয়া সমাজের আদর্শিক ক্রাইসিস থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। কিন্তু, এর সাথে সেইসব ক্রাইসিসের সরাসরি সংযোগ নাই; কবির সামর্থ্য ও সক্ষমতা মাথায় রেখেই বলি, এইগুলোর সেইসবেরই বাইপ্রোডাক্ট। চঞ্চলের কবিতা ছন্দবদ্ধ নয়, কবিতার আন্তর্দেশীয় ছন্দ তাতে বিদ্যমান যদিও, তিনি টানা-গদ্যেই বেশির ভাগ কবিতা লিখেছেন। তার কারণ হিসেবে এইটুকু উদঘাটন করেছি যে সমাজে ও জীবনে যেমন চলছে ছন্দহীনতা, ক্রমাগত উত্থান-পতন, তেমনি তিনিও কবিতায় ধারণ করতে চেয়েছেন তারই রূপ। যদিও জানি, কবিতার শরীরে কবিতা থাকে না। কবিতার শরীরকে সরিয়েই তার ভেতর থেকে আবিষ্কার করতে হয় কবিতা। আর হেগেলের কথায় তারই সমর্থন মেলে। তিনি বলেন, Content is nothing but the transformation of form into content and form is nothing but the transformation of content into form. আর এইকথা বলাই যায়, কবিতা আমাদের সেই অভিজ্ঞতাই প্রদান করে, যা অবস্থা আর অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত, আবার একইসঙ্গে তার থেকে বিযুক্তও।

আলোচনার শুরুতেই বলেছি তার কবিতা অভিজ্ঞতা আর আবেগের সংশ্লেষিত রূপ। আবেগের উচ্ছাস বা আতিশয্য নাই, বরং তার কবিতায় আছে আবেগের সমাহিতি। তাতেই কবিতা স্বার্থক হয়ে ওঠে। ‘লাগাম, আহরণ, অপচয়, রিলেশন অব বিটস, নকশা, ডিউটি ডাক্তার, দেশাত্মবোধক- এইসব কবিতা তার আবেগ আর অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে নির্মিত হয়েছে। তবে আমাদের দৃষ্টি এড়ায় নি, কোন কবিতাই আত্মজীবনীতে রূপ নেয় নি। তাতে করে কবিতার ব্যাপ্তি বেড়েছে,কেবল আপন অভিজ্ঞতা জারিত থাকে নি কবিতা, অন্যের অভিজ্ঞতাও জায়গা করে নিতে পেরেছে তার কবিতায়। তাতে কবিতা হয়ে উঠেছে বহুস্তরি। আগেই বলেছি, কবিতার মর্মোদ্ধার করা আমার লক্ষ্য নয়। আমি ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়াই প্রকাশ করে চলেছি। তিনি নিছক আবেগ আর প্রেরণা দ্বারা তাড়িত হয়েই কবিতা লেখেন নি। আন্তঃপ্রেরণার সঙ্গে অভিজ্ঞতার সংশ্লেষণ ঘটেছে তার কবিতায়। তার বোধ ও বুদ্ধি ঐকান্তিক। আপাত সরল ও ঋজু কবিতার সংখ্যাই বেশি। তাতে আছে শ্লেষ ও বক্রোক্তি। বিষয়বৈচিত্র থাকা সত্ত্বেও তা বহুমুখিনতা নয়। ঘুরে ফিরে জীবিকা, জৈবিকতাই ফিরে এসেছে। তবে তার কবিতা কোথাও আড়ষ্ট নয়, কবিতার ভেতর ইংরেজ শব্দ ব্যবহার মোটেই অশ্রাব্য শোনায় নি, কিন্তু সেই সাথে তার হাতে শব্দ সংযমও লক্ষণীয় ছিল। কোনো কোনো কবিতাকে গদ্য হিসেবেও পাঠ করা সম্ভব:

তখন আমার শৈশব। বাবা খেওজাল দিয়ে মাছ ধরতেন। আমি একদিন বাবার সাথে মাছ-ধরা দেখতে গেলাম। বাবাকে বললাম, আজ আমরা কয়টা মাছ পাব? বাবা উত্তর দিলেন না। তার আকাঙ্ক্ষাকে খেওজালে রোপন করে ছুঁড়ে মারলেন পানিতে। আমি খুশির সম্ভাবনায় কাঁপছি। বাবা খেওজাল তুলে আনছেন পাড়ে। আমাদের খেওজালে উঠে এলো সেসব নকশা, যে নকশা এঁকে মাছেরা পালিয়ে গেছে জাল ও জেলের জীবন থেকে।

বাবার পর
আমার জীবন কেটে যাচ্ছে মাছেদের জীবন খুঁজে পেতে।

তবে কবিতার এই স্বাধীনতাটুকু তার ভাষার ওপর দক্ষতারই বহিঃপ্রকাশ। তিনি মুখের ভাষাকে কবিতায় রুপান্তরিত করেছেন। তাতে আমার মনে হয় কবিতা সামান্যতমও ক্ষতিগ্রস্ত হয় নি। অথচ তা কবিতা উঠেছে দিনানুদৈনিক ব্যবহৃত ভাষার রীতিতে। এই কবিতাটি পড়ার পর মনে হয়েছে মুখের ভাষাও কবিতার ভাষা। এতদিন বিশ্বাস করতাম কবিতার ভাষা আর কথ্য ভাষা এক নয়।

এইটা তার অবিসংবাদী বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত হবে। ব্যক্তি চঞ্চল মাহমুদের মত ও পথের সাথে সকল সময় একমত না হলেও এই কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার্য, তার কবিতা পাঠে আনন্দ মেলে, কবিতাও। আর আনন্দ এমন বস্তু, তা শত্রু-মিত্র জ্ঞান করে না। এখানেই চঞ্চল স্বার্থক, এতেই তার কবিতার মুন্সিয়ানা।
তার রিলেশন অব বিটস ’র শেষ কয় লাইন পাঠ করতে করতে আলোচনায় ছেদ টানি।

যারা আমাকে পিতা ভাবো, যারা আমাকে পুত্র ভাবো, যারা আমাকে ভাই ভাবো, যারা আমাকে বন্ধু ভাবো, আমার সবরকম সম্পর্কের মানুষদের বলছি, রোগব্যাধি লুকিয়ে রাখতে নেই। কোনো ভীতি ছাড়া, কোনো অবহেলার আশঙ্কা ছাড়াই, শরীরভরা ব্যাধি নিয়ে অসুস্থ পায়ে টলতে টলতে আমার দিকে চলে আসো। দ্যাখো, সারি সারি হাসপাতাল আমি নির্মাণ করে রেখেছি শুধুই সম্পর্কের তাগিদে।

 

18010956_1510236709020709_5919933075420683371_n
শামশাম তাজিল ।। কবি

 

16298790_1195267480526422_7867288548853363150_n

Advertisements