salvatore-quasimodoআধুনিক ঐতালিক কবিতার অন্যতম পথিকৃত সালভাতোরে কোয়াসিমোদোর জন্ম ১৯০১ সালে, সিসিলিতে। পেশায় পুরকৌশলী কোয়াসিমোদো একজন আদ্যন্ত স্বশিক্ষিত কবি। তাঁর সতীর্থ ও সমসাময়িক অপর দুই আধুনিক জ্যুসেপ্পে উনগারেত্তি ও ইউজেনিও মন্তালের মতো তিনি ঠিক সাহিত্যের প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্র নন। তাঁর শিক্ষা বহুবিচিত্র কর্মময়, দ্বন্দ-সঙ্কুল জীবন এবং নিজস্ব পঠনপাঠন থেকে। প্রথম যৌবনেই তিনি গ্রিক সাহিত্য ও দর্শন এবং দান্তে, পেত্রার্ক, স্পিনোজা প্রমুখ পড়ে শেষ করেন, যার সুস্পষ্ট প্রভাব লক্ষ করা যায় তাঁর কাব্যে। ইতালির আধুনিক কবিতার ইতিহাসে যে ‘হারমেটিক স্কুল’ বা ‘সন্ত ঘরানার’ বিপুল প্রসিদ্ধি, কোয়াসিমোদো প্রথম তাঁরই সদস্য ছিলেন, মন্তালে কী উনগারেত্তি’র মতই। তখন তাঁর আদর্শ ছিল ফরাসি প্রতীকবাদী কবিতা। তাঁর প্রথম দিককার অন্তর্লীন, ব্যক্তিগত, নিমগ্ন, মিতবাক ও চিত্রপ্রধান কবিতার মধ্যে আমরা এর প্রমাণ পাই। কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে তাঁর মনোজগতে ব্যাপক ভাংচুর হয়। তিনি তখন ‘সামাজিক কবিতা’র কথা উচ্চারণ করেন। বলেন, ‘‘তাঁর কবিতা স্বগতোক্তি নয়, সংলাপ হয়ে উঠতে চায়।” কারণ “আজ দু’টো যুদ্ধের পর কবিকে নতুন মানুষ হয়ে উঠতে হবে।” তাঁর এই দায়বদ্ধ কবিতা, ১৯৫৯ সালের নোবেল কমিটির ভাষ্য মতে, “আমাদের সময়ের জীবনের ট্রাজিক অভিজ্ঞতাকে ধ্রুপদী আগুনের তীব্রতায় প্রকাশ করতে সক্ষম।” তাদের ভাষায় তাঁর এই ‘গীতল কবিতা’র জন্যই তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। অনূদিত কবিতাসমূহের শেষক’টাতে এই জীবন-সচেতনতার ছাপ মেলে, যদিও শিল্পের মৌলিক শর্তে তিনি আমৃত্যু অনাপোষী ছিলেন। ১৯৬৮ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। কোয়াসিমোদোর প্রধান কাব্যগ্রন্থগুলো হলো: And Suddenly It’s Evening, Day after Day, Life is not Dream, Debit & Credit ইত্যাদি।

 

এবং হঠাৎ সন্ধ্যা
সূর্যের বল্লমে বিদ্ধ
আমরা প্রত্যেকে একা পৃথিবীর বুকে
এবং হঠাৎ সন্ধ্যা।

মৃত সারস
ভাঁপানো জলায়, পতঙ্গের কাছাকাছি,
কাদা-মাখা, আমার ভেতরে
এক মৃত সারসের শোক।
আলো আর শব্দে নিমজ্জিত আমি
দুষ্ট প্রতিধ্বনিতে বিদীর্ণ
থেকে থেকে হাহাকার করে
বিস্মৃত নিঃশ্বাস।
দয়া করো, আমি যেন কোনদিন
কন্ঠহীন আর নিরাকার
না হই স্মৃতিতে।

এখন ভোর
রাত্রি শেষ, আর চাঁদ
খোলা আকাশে চুঁইয়ে পড়ে
অস্ত যায় খালে।
এই সমতলে সেপ্টেম্বর
এমনই সজীব, বসন্তের দক্ষিণ দেশের
মত সবুজ প্রান্তর।
বন্ধুদের ফেলে এসেছি পেছনে,
বুড়ো দেয়ালের খোপে লুকিয়ে রেখেছি হৃৎপিণ্ড
যেন একলা থাকতে পারি, যখন তোমাকে ভাবি।
চাঁদের চেয়েও কত দূরে তুমি
ভোর হয়
পাথরে ঘোড়ার ক্ষুরধ্বনি শোনা যায়।

হয়ত হৃদয়
লেবুঘ্রাণ ডুবে যাবে বৃষ্টিরাতে
বিজলি চমকে ভেঙ্গে যাবে
উল্লাস ও আনন্দ-মুহূর্ত।
বাকি থাকবে কেবল ভোঁতা বোধ,
আবছা কুয়াশা চিরে পাখিদের ধীর উড়ালের মতো
কোন মনে-পড়া ভঙ্গি, কি কোন টুকরো উচ্চারণ।
তবু তুমি, আমার হারানো তুমি, জানি না কীসের
প্রতীক্ষায় থাকো; হয়ত আরম্ভ কী শেষের
সেই চরম মুহূর্ত; সেই একই নিয়তির।
এখানে এখনও কালো ধোঁয়ার আগুনে পুড়ে যায় গলা।
যদি পারো, ভুলে যেও সেই ভয় আর গন্ধকের স্বাদ।
ঘোলা জল থেকে উঠে-আসা আমাদের ক্লান্ত কোলাহল:
হয়ত হৃদয় ছেড়ে গেছে আমাদের, হয়ত হৃদয়।

খোলা তোরণ
ধোঁয়ার গর্জনে পৃথিবীর সন্ধ্যা
ভেঙ্গে খানখান আর প্যাঁচারা চিৎকার
করে কেবল নীরবতার কথা বলে। অন্ধকার উঁচু দ্বীপ
সমুদ্রকে পিষে মারে, রাত নামে সৈকতের ঝিনুক হৃদয়ে।
আর তুমি ভবিষ্যৎ মাপো, যার কোন শুরু নেই
হারিয়ে যাওয়া সময়ের যোগফল ভেঙ্গে অগত্যা প্রস্থান করো ধীরে।
পাথরের গায়ে ফেনা এসে আটকালে তুমি ভুলে যাও
বিকারহীন ধ্বংসের বয়ে চলা।
প্যাঁচাদের বন্ধ গান মৃত্যু জানে না, মৃত্যুর মুহূর্তেও,
ভালবাসার সন্ধানে চারদিক খুঁজে মরে, খোলা তোরণের
নির্মাণে নিবিষ্ট থাকে, উন্মোচন করে নির্জনতা।
হয়ত আসবে কেউ।

স্বর্ণতন্তু থেকে
স্বর্ণতন্তু থেকে ঝুলে থাকে মৃত মাকড়সা

 

 

খোরশেদ আলম
আলম খোরশেদ ।। অনুবাদক

 

salvatore-quasimodo

Advertisements