14520544_10154646860238566_4102971806222032083_nস্থির মানসের কবি ফরিদ কবির। সকলেই কমবেশি জানে, স্থিরতা অর্জন করতে হয়, আদায় করবার বিষয় নয়। এবং তা করতে গেলে একজন ব্যক্তির, বিশেষ করে তিনি যদি কবি হতে চান, ঘামগন্ধের শ্রমে তাকে কবিতার জন্য শব্দ, চিত্রকল্প, উপমা, সর্ব অর্থে কবিতার প্রকরণ-কৌশল, কাব্যবিষয়ের যথাযথ স্থাপত্যের জন্য অর্জন করতে হয়।

সাধারণত আমরা দেখি বা সাধারণ মানুষ কবির জীবনচর্চা বলতে বোঝে, কবি হবেন এলোমেলো গোছের মানুষ, তার যাপন প্রায়শ হবে অসামাজিক। কিন্তু ফরিদের সঙ্গে যখন থেকে আমার পরিচয়, তা প্রায় ৩০ বছরের বেশি তো হলোই, দেখেছি, বুঝেছি ও এক শীলিত পরিচর্যার ভেতর যাপন করে জীবন। ওর সঙ্গরুচি, খাদ্যরুচি, বসনরুচি, শ্রবণরুচি, কথনরুচি এবং পঠনরুচি কেবল তার মতো। এবং যখন থেকে কবিতা নামের এক কঠিন কাজের সঙ্গে জীবনের কোনো এক প্রহরে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিল, আমার মনে হয়, তখন  থেকেই একটা প্রস্তুতি নিয়ে কবিতা লিখতে শুরু করেছিল। ওর কবিতা ওর জীবনচর্যার জ্যামিতি ধারণ করে। আমি ওর কবিতা পড়ে বুঝেছি, দেখেছি, সবকিছুই পরিমিত। অতিরিক্ত কিছু বলবার বা করবার দায় কখনো নেয়নি বা করেনি। ফলে, ওর কবিতার পাঠক বেশি নয়। কারণ, যতটুকু আমি বুঝি, ও কেবল কবিতার দীক্ষিত পাঠকের জন্য কবিতা লেখে। ফরিদ আশাও করে না, কবিতার বোধে অ-ঋদ্ধ পড়ুয়া তার একটি কবিতা পড়ে সুলভ-স্বভাবে বলে উঠুক : ভালো লাগলো।’ হয়তো ফরিদ ওই পাঠককে, অবশ্যই বিনয়মাত্রা ঠিক রেখে প্রশ্ন করতে পারে, ‘কেন ভালো লাগলো।’

কী রকম কবিতা লেখার জন্য তার শ্রমিকতা ব্যয় করে সে-প্রসঙ্গে, প্রায় এক যুগ আগে, মনে পড়ে ‘প্রথম আলো’ আয়োজিত বাংলাদেশের কবিতার হাল-চলাচল বিষয়ক বিশ্লেষণধর্মী এক প্রয়োজনীয় আড্ডায় ফরিদ বলেছিল : একটি বিশেষ ইঙ্গিতকে কবিতার কেন্দ্রে রেখে কবিতাটির পূর্ণ স্থাপত্য দিতে চাই।’ ওই আড্ডার সঞ্চালনার কাজ করেছিল কবি সাজ্জাদ শরিফ ও ব্রাত্য রাইসু। গত শতাব্দীর দশক বিবেচনা করে শামসুর রাহমান (পাঁচ), নির্মলেন্দু গুণ (ছয়), ফরিদ কবির (আট), বায়তুল্লাহ কাদেরী (নয়) এবং আমাকে (সাত) আড্ডার অতিথি করা হয়।

‘আমি কবিতা লেখার কাজটি পূর্ণ সততা নিয়ে করবো এবং যখন মনে হবে কবিতার জন্য যতটুকু করবার প্রয়োজন, আমার বিবেচনায়. যদি ততটুকু করা হয়ে যায়, তার পর থেকে কবিতা আর লিখবো না।’ হতে পারে এইরকম ধনুকভাঙা এক শপথ যখন তখন ফরিদ নিয়ে নিতে পারে। আমি এ-কথা বলবার কারণ, কিছুদিন আগে ফরিদ আমাকে বলেছে, ‘আর কবিতা লিখবো না’। আমি তার কথা শুনে জিজ্ঞেস করি, ‘এটা কি সিদ্ধান্ত নাকি প্রাথমিক ভাবনা?’ আমার প্রশ্নে তার উত্তর ছিল, ‘প্রাথমিক ভাবনা সিদ্ধান্তের দিকে যাচ্ছে।’ আমার পরে মনে হয়েছে, যে-কবি কবিতার বিষয়ে অংকবিদের মতো পরিমিতিপীড়িত, তার চিন্তাচেতনায় ওইরকম ভাবনা আসতেই পারে। বাংলা কবিতায় এর উদাহরণ সমর সেন এবং বিশ্ব-কবিতায় জ্যাঁ আর্তুর র্যাঁবো। অবশ্য এই দুজন কবির কবিতা এখনও আমরা যে-ভাবে পড়ি, সময় গেলে, দশক বা শতাব্দী অতিক্রম করলে, ফরিদের কবিতা কেউ পড়বে, নাকি পড়বে না, সে-কথা জোতিষের ভাব-স্বরে এখনই বলা যাবে না। বলা অসঙ্গত হবে।

ফরিদ বিষয় বিবেচনা করে কবিতা লেখে। মানুষ, প্রেম, প্রকৃতি (বিশেষ করে গাছ), অন্যান্য প্রাণী, মন্ত্র ইত্যাদি বিষয়কে ম্যাসেজের কেন্দ্রে রেখে কবিতা লিখেছে আমাদের এই কবি। সমকালীন রাজনীতি ওকে খুব একটা নাড়া দেয় বলে মনে হয় না। রাজনৈতিক কবিতা লেখা ফরিদের কবিজাত ধাতে নেই বললেই চলে। যখন গাছ নিয়ে কবিতা লিখছিল, পৃথিবীতে অবিবেচকের উল্লাসে মানুষ শুরু করে দিয়েছে জলবায়ুকে ধ্বংস করবার অত্যাচার। যাঁরা ফরিদের কবিতার নিয়মিত পাঠক, খেয়াল করবেন, একটি বিষয় নিয়ে কাব্য-কথা বলা শেষ হয়ে গেলে, ফরিদ চলে গেছে অন্য বিষয়ের সন্ধানে।

উপরের প্রথম দুই বা তিন স্তবকের বাক্যবন্ধনের সমবায়ে যে কথা বলবার চেষ্টা করেছি তার পক্ষে, এখন আমি, ফরিদের একটি বিখ্যাত কবিতা, অনেকবার পড়া আমার একটি প্রিয় কবিতা সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চেষ্টা করবো। এই কবিতাটি পড়বার পরেও কখনো শেষ হয় না। অন্তত আমি পারিনি।

পড়া যাক : যদি ভাবে কেউ

যদি ভাবে কেউ এই রাত্রি যাবে সকালে

এই চন্দ্র শাদা মার্বেল সেজে গড়াবে নীল চাদরে

কালো রাত্রি গিলে খাবে সেই লাল রৌদ্র

           সেটা ঠিক নয়

 

কার নিঃশ্বাস হবে নিঃশেষ

কার দরোজায় কার নিষেধের তালা ঝুলবে

                    কেউ জানে কি?

 

এই নৌকো এই পারাপার আজ বন্ধ

এই বর্ষণ ফিরে যাবে সেই মহাশূন্যে

চিতাবাঘও তার শেষ আশ্রয় ছিঁড়ে বেরোবে

দূর নগরী পরিভ্রমণে!

অসম্ভব বলে সত্যি কোনো কথা নেই

 

এতো ভুল দিন কে যে রাতদিন বোনে মগজে

কে যে কার লোনা জল পান ভুল স্বপ্নে

                    কেউ জানে কি

                    কেউ জানে না

 

কারো ছায়া তার ঘরে ঘুমুবে—  সে ঘুরবে

নাকি ছায়া তার টো টো ঘুরবে

শুধু দেহটা ঘরে ঘুমুবে নিশ্চিন্তে!

অসম্ভব বলে সত্যি কোনো কিছু নেই

যদি ভাবে কেউ এই রাত্রি যাবে সকালে

এই চন্দ্র শাদা মার্বেল সেজে গড়াবে নীল চাদরে

কালো রাত্রি গিলে খাবে সেই লাল রৌদ্র

           সেটা ঠিক নয়

 

কার নিঃশ্বাস হবে নিঃশেষ

কার দরোজায় কার নিষেধের তালা ঝুলবে

                    কেউ জানে কি?

 

এই নৌকো এই পারাপার আজ বন্ধ

এই বর্ষণ ফিরে যাবে সেই মহাশূন্যে

চিতাবাঘও তার শেষ আশ্রয় ছিঁড়ে বেরোবে

দূর নগরী পরিভ্রমণে!

অসম্ভব বলে সত্যি কোনো কথা নেই

 

এতো ভুল দিন কে যে রাতদিন বোনে মগজে

কে যে কার লোনা জল পান ভুল স্বপ্নে

                    কেউ জানে কি

                    কেউ জানে না

 

কারো ছায়া তার ঘরে ঘুমুবে—  সে ঘুরবে

নাকি ছায়া তার টো টো ঘুরবে

শুধু দেহটা ঘরে ঘুমুবে নিশ্চিন্তে!

অসম্ভব বলে সত্যি কোনো কিছু নেই

‘কেউ’, ‘কার’, ‘কে’, ‘সে’, ‘তার’ এই সর্বনামগুলি কি একজন নাকি সমাজের বা রাষ্ট্রের কয়েকজন? আমরা পাঠকরা কয়েকটি ঘোরলাগা অবস্থা বা পরিস্থিতির মধ্যে ওই সর্বনাম ধারকদের যে-কোনো একজনের সঙ্গে ঘুরছি। অথবা সবার মধ্যে একজন হয়ে ঘুরছি। যদিও এই কবিতায় ‘আমি’ সর্বনাম ব্যবহার না করেও পাঠক-আমিকে এই কবিতার মধ্যে কাব্যকৌশলের রহস্যমাত্রায় নিয়ে ফরিদ ব্যক্তিকে কখনো ‘মহাশূন্যে’, কখনো আশার ‘দরোজা’র কাছে নিয়ে যায় এবং ঘোরায় ‘টো টো’ করে। সমকালীন ব্যক্তি-মানুষের অসহায়ত্ব কী প্রবল অথচ শীলিত ভাষায় বলঅ হয়েছে এই কবিতায়।

মাত্রাবৃত্তে লেখা এই কবিতাটি প্রথম যখন প্রথম আমি পড়ি, ভেবেছি, দিক এবং আশ্রয় না পাওয়া চন্দ্রাহত এক মানুষ কখনো স্বপ্নের থাপ্পরে, কখনো বা ‘নিষেধের তালার’ সামনে নিরন্তর ঘুরছে। অনেকবার পড়বার পর, ওই যে ফরিদের বলা ‘ইঙ্গিত’ যা এই কবিতায় শুধু একটিমাত্র ইঙ্গিতের সমবায় নয়, অনেক সহযোগী ইঙ্গিতে কবিতাটি ঋদ্ধ, যদিও কেন্দ্রে ফরিদ রেখেছে মানুষের জীবনচক্র. মনে হয়েছে। কবিতাটি যতদূর বুঝেছি, মরণশীল মানুষের নিয়তি। আমার পাঠের প্রাথমিক অর্থ পাওয়া বারবার ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় জন্যেই এটা বারবার পড়বার মতো একটি উত্তম কবিতা।

কেন কবিতাটি মাত্রাবৃত্তে লেখা হলো? কেন লেখা হলো না অক্ষর বা স্বরবৃত্তে বা মন্দ্রাকান্তায়? মাত্রাবৃত্তে না লিখলে ‘রাত’, ‘ছায়া’, ‘রৌদ্র’ ‘পরিভ্রমণ’, ‘মার্বেল’, ‘চিতাবাঘ’, ‘মহাশূন্য’, ‘পারাপার’, ‘বন্ধ’, ‘আশ্রয়’—  এতসব বৈপরিত্যকে মাত্রায় রেখেও মাত্রাহীন করা যেত না। এবং বোঝার ব্যাপার, কবি আমাদের বলছেন : কেউ জানে কি / কেউ জানে না।’ এবং দুবার ইটালিক ফর্মে বলছেন : অসম্ভব বলে সত্যি কোনো কিছু নেই’। জীবনের যুদ্ধ, হেরে যাবার সংহিতা, সঙ্গ না পাওয়া একাকী মানুষের বেঁচে থাকার কথা বলবার পরেও এক আশার কথা কবি ওই ইটালিক ফর্মে কেন বললেন? আমি যতদূর বুঝেছি, বাঁকা করে সাজানোর ফর্ম বলে দিচ্ছে ‘অসম্ভব’-কে সোজা পথে পাওয়া যাবে না, অনেক বাঁকা পথ ঘুরে কেবল ‘ছায়া’ ঘুমাবে নিশ্চিন্তে। এখানে একটি মৃত্যুবোধ কাজ করছে।

‘যদি কেউ ভাবে’ জীবন ও মৃত্যু বিষয়ক কবিতা। এই জীবনে প্রেম আছে, যদিও কোথাও প্রেম শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। আরও লক্ষ্য করবার ব্যাপার, সারা কবিতায় একটি প্রশ্ন চিহ্ন ও দুটি আশ্চর্য চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে। ‘কেউ জানে কি’ বলা হচ্ছে মৃদু স্বরে। ‘কি’ একটি অব্যয়, সংশয়সূচক প্রশ্নবাচক শব্দ যার উত্তর ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’। ওই পংক্তির শেষে কোনো প্রশ্নচিহ্ন নেই। যেহেতু শব্দটি অব্যয় এবং সংশয়বাচক, বুঝতে হবে, জীবনের সংশয়পূর্ণ অনিশ্চয়তাকেও ধারণ করছে এই ‘কি’। এবং পরের পংক্তি :  কেউ জানে না’। আগের পংক্তিতে হ্যা বা না খুঁজে পরের পংক্তিতে কবি আমাদের বলে দিল উত্তর। এবং এই উত্তরে আস্থা রাখা বোকামি হবে পরের স্তবকে যখন কেউ পড়বে ‘ সে ঘুরবে’।

এবার কবিতার শিরোনাম নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। ‘যদি’ একটি অব্যয়। ‘কেউ’ সর্বনাম এবং ‘ভাবে’ একটি বিশেষ্য, যা একটি মানসিক অভিপ্রায়। ‘যদি’র মধ্যে এক ব্যয়হীন, অনির্দিষ্ট আশা ও নিরাশা জায়মান। ‘কেউ’ এমন এক সর্বনাম যার চোখমুখ, গঠন, জীবনযাপন সম্পর্কে স্থির কিছু আঁকা মুশকিল। এবং ‘ভাবে’ বিশেষ্যটি অনন্তের ধারক। ওই তিনটি শব্দের রহস্যময় বিবাহে  যে আবহের বা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা এমন এক আরশী যার সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, জীবন একটি ‘যদি’, এবং একজন অচেনা ‘কেউ’ এবং শেষহীন ‘ভাব’নার জট।

কোনো পাঠক এই কবিতাটি গভীর মনোযোগে পড়লে নিজের অস্তিত্বকে অচেনা মনে করতে পারেন। আবার কেউ ভাবতে পারেন, এই কবিতায় জীবন নেই, শুধু এক চক্রে ‘পরিভ্রমণ’ বা ‘পারাপার’। সাধারণত দর্শনকে দার্শনিকতার মাত্রায় নেওয়া খুবই কঠিন কাজ। ফরিদ তা দক্ষ যাদুকরের মতো করেছে।

কবিতাটি রহস্যের পূর্ণ এক অভিধান।

যদি আমি ভাবি / জাহিদ হায়দার

নভেম্বর, ২০১৬

_________________________________

ফরিদ কবির- এর কবিতা

সাপ-লুডু

সাপ-লুডু বেশ বিপজ্জনক!
খেলতে গেলেই দেখি, সাপগুলি জ্যান্ত হয়ে যায়
ছোবলের ভয়ে আমি লুডুর এ-ঘর থেকে অন্য ঘরে
ক্রমাগত ছুটতে থাকি!

ওপরে যাওয়ার জন্য মইগুলি খুঁজি
একটু আগেও পড়ে ছিল, যত্রতত্র

কিন্তু তোমাদের মধ্যে কেউ একজন
সিঁড়িগুলি সরিয়ে ফেলেছো

আমি যে ধরবো, নেই তেমন একটা হাতও
অথচ পাশেই ছিলে তুমি
অথবা তোমার মতো অন্য কেউ!

সাপগুলি আস্তে আস্তে ঘিরে ফেলেছে চারপাশ থেকে
আর, আমি ছোবল খাওয়ার জন্য তৈরি হতে থাকি…

বাড়ি

একটি বাড়ির দিকে উঁকি দিল আরেকটি বাড়ি

ভেতরে মানুষ নেই, সিগারেট ঠোঁটে
বসে আছে জানালার কাচ
বুক-শেলফ হেঁটে গেল পয়মন্ত চেয়ারের দিকে
দুলছে চেয়ার

বিছানায় শুয়ে আছে বালিশের প্রেত
জানালার পাট চোখ তুলে
দেখে নিল চন্দ্রের আলোকে
মৌমাছির মতো টেবিলের ওপর উড়ছে ঘুম
ডায়েরির পাতা

কার্নিশে কার্নিশ ছুঁয়ে শাদা বাড়িটিকে
চুমু খেলো দোতলা বাড়িটা

বাড়িতে কেউ কি আছে? সারা রাত জেগে
খুব ভোরে ঘুমিয়ে পড়ল আলনায় ঝুলে থাকা
মুণ্ডুহীন শার্ট
পা কোথায়? হাতের আঙুল?
বাতাসে ডানার গন্ধ, আর
বাড়ির ভেতরে ফিসফিস
হাত-পা আঙুল খুলে আলনায় ঝোলে মুণ্ডুহীন শার্ট
একবার শুধু বুক-শেলফ
হেঁটে গেল পয়মন্ত চেয়ারের দিকে
দুলছে চেয়ার
মৌমাছির মতো
টেবিলের ওপর উড়ছে ঘুম, ডায়েরির পাতা

একটি বাড়ির দিকে হেঁটে এল আরেকটি বাড়ি…

ধান

যে-কোনো সমুদ্র থেকে ধানক্ষেত জেনো—
অধিক তরঙ্গময়
তার নিচে থাকে সন্তরণশীল বীজ

আর, পর্দা খুলে দেখো—বীজের ভিতরে
তোমার জীবন আর স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ বইছে সেখানে
তুমিও নদীর মতো হিংস্র, কিছুটা ভাঙনপ্রিয়
এখন নির্মাণ ফেলে তুমি লিপ্ত মানবসংহারে

শোনো বলি, তোমাদের জন্য নয় উদ্ভিদসকল
ধানের চর্যাই জেনো—তোমার নিয়তি

নদী

নদীকে সরিয়ে দিয়ে তুমি বিছিয়ে দিয়েছো রাস্তা
যত দূর দৃষ্টি যায় মাইল-মাইল ধুধু পথ
গাড়ি চলছে পালতোলা নৌকোর বদলে
এখন খুঁজছো ঢেউ, নদীকুল রাস্তায় রাস্তায়

কে না জানে পথের মহিমা
পথই মানুষকে নিয়ে যেতে পারে যে-কোনো রাস্তায়
এখন পথের সব পৃষ্ঠা বসে বসে মুখস্থ করছো
সন্ধান করছো নদীতীর, ঢেউয়ের আক্ষেপ

রাস্তা চেনে সব পথ, যেতে পারে যে-কোনো ঠিকানায়
নদীর ঠিকানা শুধু জানা নেই তার

এখন রাস্তায় বসে কাঁদো ঢেউয়ের আশায়

ফুল

ঘ্রাণেই সম্পূর্ণ স্নান, তবু খোঁজো তুমি জল-সাবানের ফেনা

কী আছে রোমাঞ্চ স্নানঘরে
চামড়ার নিচে যদি রয়ে যায় অন্ধকার
আর, কালো ময়লার স্তূপ
সহস্র বুদবুদ থেকে ফিরে
কিভাবে নিজেকে ভাবো তুমি শতভাগ পরিষ্কার

যে-কারণে বলি, ফুলই প্রকৃত সমুদ্র
কেননা, তাকেই আমি ঘ্রাণসহ বর্ণিল রেখেছি

কাঁটার সংঘাতে যদি ঝরে কিছু রক্তের গরম
তুমি কাটো সাঁতার গোলাপে
আর, পাপড়ির বর্ণে করো জন্মোৎসব

আজ বলি, ঘ্রাণের জন্যই
এতকাল পুষ্পপূজা নিষিদ্ধ করি নি

ট্রেন

ট্রেন আমাদের নামিয়ে দিয়ে গেল
মাঝপথে, অচেনা স্টেশনে

মানুষ যেখানে যেতে চায় সেটাই কি গন্তব্য?
নাকি, তারা যেখানে নামে?
নাকি, গন্তব্যই খুঁজে নেয় তার নিজস্ব মানুষ!

বিহ্বল স্টেশনে নেমে আমরাও ভাবি—
এখানেই কি নামতে চেয়েছি
নাকি, ট্রেনই নামিয়ে দিয়ে গেছে আমাদের
….             ….   এই ঘন কুয়াশারাত্রিতে!

যেখানে নেমেছি, কিংবা যেখানে যাওয়ার কথা ছিল
কিছুই আসলে সত্য নয়

আমাদের চোখের সামনে শুধু ছবি হয়ে থাকে
…..           ….            ….            ….         …ট্রেনের জানালা
আর, খুব দ্রুত ছুটে চলা যমুনা ব্রিজ…

গণিত

গণিত বড়ই রহস্যময়
শেখায় দুয়ে দুয়ে চার…
কিন্তু বাস্তবে এ হিসাব কখনো মেলে না
দুয়ে দুয়ে ২, ৩ এমনকি
৫ কিংবা ৭ হয়
৪ কিছুতেই নয়

কী কী বর্ণ যোগ অথবা বিয়োগ করলে
অঙ্কটা মিলবে, জানা নাই

আমি দুয়ের সঙ্গে ২ যোগ করি, ৩ যোগ করি
লাল এমনকি নীল যোগ করি

তুমি দুই থেকে দুঃখ বিয়োগ করেও পাও ৫ অথবা ৭
আমি দুয়ের সঙ্গে তোমাকে যোগ করেও ২ অথবা ৩

বিয়োগ করলেও তোমার যোগফল মেলে
আমি যোগ করলেও বিয়োগফল

আমি দুয়ে দুয়ে পাই ২ বা ৩
তুমি ৫, ৭ কিংবা ৯

একথা তো আজ বলতেই পারো
দুয়ে দুয়ে তুমিও চারই চেয়েছিলে
৫, ৭, ৯—কিছুতেই নয়…

সাপ

সাপ এক অসামান্য প্রাণী
ক্ষিপ্র, কিন্তু দারুণ নিরীহ
মানুষের মতো অকারণে
…….             …ছোবল মারে না

আমি থাকি সাপের সঙ্গেই
……        … স্বপ্নে বাস্তবে ডানায়
সে আমাকে কিংবা আমি তাকে
….. . ….      .জড়িয়ে-পেঁচিয়ে

সাপের সমস্যা একটাই
মানুষের মতো অনুকরণ
……    ….     … পছন্দ করে না
আমি খুব নিরাপদে আছি

মানুষেরা অনুকরণপ্রিয়
পশুর হিংস্রতা তারা অবিকল মুখস্থ করেছে
বিনা কারণেও দেখি, কামড় বসায়

শূন্য

এক শূন্য থেকে ঢুকে যাচ্ছি
…        … …অসংখ্য শূন্যের মধ্যে
আর, সরে যাচ্ছি ডান দিকে, ক্রমাগত
মানে, অন্ধকারে…
মানে, কিছুক্ষণ আগেও তুমি যেখানে দাঁড়িয়েছিলে
ফোঁটা ফোঁটা আলোকবৃষ্টিতে…
আদ্যোপান্ত যেন এক বাতাসপ্রতিমা,
ছড়িয়ে চলেছ বর্ণহীন কিংবা
বর্ণিল বুদ্বুদ, চারপাশে

তবু আমি নিঃশ্বাসে তোমাকে নেই
প্রশ্বাসে নিজেকে ছাড়ি

শূন্যে…

পাখি

উড়লেই পতনের ডাক, তবু উড়ে যাও
তুমি পাখি ভাবছো নিজেকে
মাটি দখলের পর রক্তচিহ্ন এখনো ডানায়
আজকে নেমেছো তুমি আকাশ দখলে
শিরোস্ত্রাণে হেসে উঠছে নক্ষত্রমণ্ডলী

আকাশকে পাখিমুক্ত রেখে তুমি কেবল ঘুমোবে
আর, জেগে উঠে প্লাস্টিকের স্বপ্ন সাজাবে টেবিলে
প্রকৃত তোমার স্বপ্ন এতকাল পাখিরাই বহন করেছে

নিজেকে যতই ভাবো দীর্ঘ, আজ বলি—
পাখিদের চোখে তুমি সর্বদাই ছোট
নিজেকে জানার জন্য মাঝে-মধ্যে তোমার বাড়িতে
তাদেরকে নিমন্ত্রণ কোরো

 

14520544_10154646860238566_4102971806222032083_n

Advertisements