দ্বিধাবচনে কবি রফিক আজাদের জন্যে শোক :: শামসেত তাবরেজী

rafiq-azadসেই এক পুরানা জমানায়, আমাদের তখন দ্বিতীয়ার চাঁদের মত গোঁফ উঠছিল, রফিক আজাদ ছিলেন তখন কালের একজন স্টার। স্টার মানে স্টার। সিনেমায় যেমন স্টার থাকেন। একালে কবিরা আপনদোষে প্রান্তিকতাপ্রাপ্ত হলে তারকারা গলে গিয়ে কালো লিকালের চায়ে থিতু হতে থাকে আর কবিরা ট্রেড ইউনিয়নের মত আচরণ শুরু করে। তখনও কবিতার খুন ভুলভ্রান্তিসহ তাজা। সেই সময়, একদিন আমরা জেলখানা রোড ধরে নিরুদ্দেশের দিকে হাঁটতে বেরোই আর তাঁর ‘অসম্ভবের পায়ে’ দাঁড়ানো জীবন-যাপনের গল্প করি। অগোচরে বন্ধুরা সবাই যার-যার মত কামনা করি, যেন এই জীবন আমাদেরও দেহসুদ্ধ উপড়ে ফেলে। তখন আমাদের সেই বয়স যখন আমরা গোপনে শরীর এবং দেহের অর্থ আলাদা করতে শিখছি। আমরা রফিক আজাদের সেই সুমহান দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। কিন্তু দরজা খুলতে ব্যর্থ হই। আমাদের হাতের আঙুল থেকে রক্ত ঝরে। কব্জি ছড়ে যায়।

Continue reading “দ্বিধাবচনে কবি রফিক আজাদের জন্যে শোক :: শামসেত তাবরেজী”

Advertisements

আনবিয়ারেবল্ লাইটনেস্ অফ বিয়িং :: জাহেদ আহমদ

flying-hat

‘অর্থই সকল অনর্থের মূল’ — উদ্ধৃতিচিহ্নিত কৈশোরকালিক নীতিবাক্যটিকেই শিরোনাম ধরে একটা গদ্য দাঁড় করাবার চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল মাথায়। গদ্য বলতে গেরামভারী গবেষকবৃন্দের গগনবিদারী গাণিতিক সমীকরণাকীর্ণ জট্টিল জিনিশ গোছের কিছু নয়, একান্ত আমার খোঁড়া যুক্তির অশ্লীল আমিত্ববহুল লেখা একটা। যাকে বলে প্রবন্ধ বা ওই-রকম কোনোকিছুর ‘প্রকৃষ্টরূপে বন্ধন’ থাকবে না তাতে, থাকবে না সরমা-পরমা খুঁজে দেখিবার কোনো খাঁই, নিকৃষ্ট নর্তনকুর্দন থাকবে কেবল। তবু যদি নিজের কথাগুলো বলা যায়, নিজ বলে কিছুই নাই স্বীকার করে নিয়েও, মন্দ হবে না। গলগণ্ডালঙ্কৃত গবেষক হওনের চাইতে আমি পছন্দ করব গগন হরকরা হতে। ‘আমি কোথায় পাব তারে / আমার মনের মানুষ যে রে’ … আর কিছু চাই না ভাই, পাই তারে যদি। মনের মানুষ বাইরে পাওয়া যায়? কবিতা কখনো পাওয়া যায় কবিতালোচনায়? Continue reading “আনবিয়ারেবল্ লাইটনেস্ অফ বিয়িং :: জাহেদ আহমদ”

কবিতার যুবরাজের জন্মদিনে

10628483_10153317172420229_4156724677632633119_nতখন, সেকালে পদ্যচর্চা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক। ৭০-এর ডাঙর-ডাঙর কবিতে ছেয়ে থাকত ক্যাম্পাস। কিছু বয়স্যজনও আসতেন তখনকার দিনের তরুণ কবিদের আড্ডায়। সেটাকে বলা যেতে পারে ‘রুদ্রকাল’। আজ বলতে বাধা নাই, ঐ সময় এমন কেউ ছিলেন না, যাকে দেখলে মাথা নুয়ে আসে। সকলের স্বরই একরকম। স্বাধীনতার গৌরবগাথাই কবিতার বিষয়বস্তু। টানা চোখের মত কবিতার নয়নে খোলামেলা কবিতার শরীর। এর মাঝখানে গোপনে গোপনে আমার অস্বস্তি তৈরি হতে থাকে। কলিকাতার ৫০/৬০ দের কবিতার বই পড়ি. তবু এক আনন্দ হয়। আম্মা যেমন তাল, লয় সুরে পদ্য পড়ে শোনাতেন, তার নজির সেসময়কার কবিদের থেকে উপে যায়নি। অবশ্য এদিকে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ প্রমুখ খুব অল্প সংখ্যক কবির কবিতাও আমাদের শরীরে-মনে কাজ করে। বিশ্বাস করেন, তবু অশান্তি ছিল মনে। নিজেরও বুঝতে পারার আওকাত হয় নাই, আবার কবিতার মধ্যে যা চাই, তাও পাই না। শুধু জাবির একছাত্র, শুনেছি তিনি সেলিম আল দীনের আত্মীয় ছিলেন, আরও শুনেছি, পরে মানুষিক অসুস্থতায় অনেকদিন কাটিয়ে ইহলোক ছেড়ে চলেও যান। নিজের চোখে সেই প্রথম আমার কবি বা নিউরোটিক মানুষ দেখা। কি তার শক্ত, স্পিং-এর মত মত টান-টান কবিতা, প্রাচীনকালে গ্রিকদেশের দর্শনের মত, এখনও আবছা-আবছা মনে পড়ে, পারমিনেদিয়েসের মত যেন সেসব কথা। তাও আমার অস্বস্তি ঘোচে না। বলতে দ্বিধা নাই, যুদ্ধকালকে আরএফএলের পন্য বানিয়ে ছাড়ছিলেন সে সময়ে কবিতার অনুষ্ঠান।

Continue reading “কবিতার যুবরাজের জন্মদিনে”

অন্ধ অন্তর্চাক্ষিক :: জাহেদ আহমদ

12165772_10207825137296966_901193885_nএটা অন্ধ বিনোদের গল্প। ছোটবেলায় একটা গান শুনতাম  তোমরা দেখো আইয়া রে / মায়ের বিনন খাইল নাগে — এখানে এই গানে বিনোদ হয়েছে বিনন, সিলেটি কথ্য উচ্চারণ। গানটা বেহুলা-লখিন্দরের ঘটনা উপজীব্য করে রচিত, পুরো কাহিনি গানে গানে বর্ণিত, সম্ভবত মালজোড়া বলা হয়ে থাকে এতদঞ্চলে এ-ধারার গানগুলোকে। এই গল্পের বিনোদ আর মাত্র-উক্ত গানের বিনোদ এক ব্যক্তি নয়। এই গল্প অন্ধ বিনোদের, সাপে-কাটা বিনোদ নয়, এটি বিনোদ মুখার্জির গল্প। অন্ধ বিনোদ, অবাক চক্ষুষ্মান বিনোদ, দ্রষ্টা বিনোদ। গল্পে খুব বেশি ডিটেইলিঙের আশা যারা করেন, তারা আহত হবেন, বিশদ বিবরণ গরহাজির এখানে। নেই ক্যারিশম্যাটিক কৌশলে কথাবস্তুর উপস্থাপন, শৈলীর দিক থেকে নেই ইনকন্সিভ্যাব্যল্ কোনো মোচড়, ট্যুইস্ট গরহাজির গল্পান্তিমেও, অন্তত চরিত্র প্রতিষ্ঠাপনে একটা গল্পের তথা গল্পকারের যে-

Continue reading “অন্ধ অন্তর্চাক্ষিক :: জাহেদ আহমদ”

বিস্মরণের বিষ্ণু বিশ্বাস :: নাহার মাওলা

 bishnu-biswasহারিয়ে গেল বিষ্ণু। কেমন করে কোথা থেকে কেন ও হারিয়ে গেল কেউ জানে না। এসব ওই একমাত্র বলতে পারে, কিন্তু সে যে কথা বলে না!

কথা বলে না তা জানতে পারলাম যখন, তখন ওকে খুঁজে পেয়েছি। কেমন করে খুঁজে পেলাম সে এক লম্বা গল্প। অন্য কোথাও বলব তা। কিন্তু ২০১১ তে প্রায় ৩০ বছর পরে যাকে খুঁজে পেলাম, হারিয়েছিলাম তাকে নয়, অন্য বিষ্ণুকে, অন্য মানুষকে।

৮২ বা ৮৩-র গোড়ার দিকে আমি ইউনিভার্সিটিতে ওকে শেষ দেখেছি। ৩০ বছরের পলি পড়েছে ওর মুখে চোখে যেমন, আমারও তেমনি। তবু চিনতে পেরেছে আমাকে, আমাদের! ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে ইচ্ছে হল কিন্তু হেসে বললাম, ‘চিনতে পারিস?’ ও জবাবে এমন করে হাসল যেন অবান্তর প্রশ্ন করেছি! ওকে কথা বলানোর জন্যে আমার নাম ওর মুখ থেকে শুনতে চাইলাম।

Continue reading “বিস্মরণের বিষ্ণু বিশ্বাস :: নাহার মাওলা”

আবুল হাসানের কবিতাঃ অন্ধকার সময়ের অসহায় কণ্ঠস্বর :: ইরফানুর রহমান

10616126_768101653275686_4646282508933623778_n

উৎসর্গ 
সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি
আগুন আর বরফের মতো ঘৃণা করি তোকে…

তবে কি সে মানুষের সাথে সম্পর্কিত ছিল, কোনোদিন 
ভালোবেসেছিল সেও যুবতীর বামহাতে পাঁচটি আঙুল?
ভালোবেসেছিল ফুল, মোমবাতি, শিরস্ত্রাণ, আলোর ইশকুল?”

(আবুল হাসান/ আবুল হাসান)

যে-বছর সাম্প্রদায়িকতার ছুরিতে রূপসী বাংলাকে কেটে দু’টুকরো করা হল, কবি আবুল হাসান জন্ম নিলেন ঠিক সেই বছরে। তাঁর জন্ম হল অজস্র মৃত্যুর মধ্যে, তাই তাঁর কবিতায় যে অসহায়তা চোখে পড়ে তা অনেকটা জন্মদাগের মতো, এই অসহায়তার বোধ হয়তো তাঁকে তাড়া করে ফিরেছে আমৃত্যু। আর এর সমাপ্তি ঘটল স্বাধীনতার ঠিক চার বছর পর।

আবুল হাসানকে ‘বিষণ্নতার কবি’ বা ‘নিঃসঙ্গতার কবি’ হিসেবে চিহ্নিত করার একটি প্রবণতা খেয়াল করেছি, কিন্তু তাঁকে গভীরভাবে রাজনীতিমনস্ক কবি বলেই মনে হয় আমার, যদিও তিনি তাঁর বন্ধু ও বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি নির্মলেন্দু গুণের মতো ‘তার আগে চাই সমাজতন্ত্র’ ধরণের প্রচারণাসর্বস্ব সাহিত্যকর্ম তৈরি করার চেষ্টাও করেননি। সাহিত্য সমালোচনা করার কোনো যোগ্যতাই আমার নেই, তাই এই লেখাটি আবুল হাসানের কবিতার ব্যাপারে একান্তই আমার ব্যক্তিগত চিন্তা হিসেবে দেখার অনুরোধ করছি, কোনো গভীর বিশ্লেষণ এই লেখায় আশা না করাই ভালো। তিনি কবি হিসেবে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু তিনি যেই সময়ের সন্তান সেই সময়টি বাংলাদেশের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তাই তাঁর কবিতাকে তাঁর সময়ের প্রেক্ষিতেই পাঠ করা প্রয়োজন এরকম একটা বিশ্বাস থেকেই এই লেখার অবতারণা।

Continue reading “আবুল হাসানের কবিতাঃ অন্ধকার সময়ের অসহায় কণ্ঠস্বর :: ইরফানুর রহমান”

একটা ফুল এবং একটা বিস্ময়চিহ্ন ও একটা প্রশ্নচিহ্ন :: তোরিফা নাজমিনা

imagesপ্রস্তাবনা: ওশো সম্পর্কে আপনারা প্রায় সবাই কিছু না কিছু জানেন। তবে এই জানাটা একেকজনের কাছে একেক রকম। কেউ যদি-বা তাঁকে মহান গুরু বা ভগবান জ্ঞানে পূজো করেন, তো কেউ-বা তাঁকে ভণ্ড, কামুক এবং একজন বিলাসী জীবন-যাপনকারী মানুষ হিসেবে জানেন। আমার মনে হয় এমন বিতর্কিত একজন মানুষকে বুঝতে গেলে তাঁর কাজের মধ্যে দিয়েই তাঁকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে।

১৯৩১ সালের ১১ ডিসেম্বর ভারতবর্ষের মধ্যপ্রদেশের কুছোয়াড়াতে শ্রী রজনীশ জন্মগ্রহণ করেন, যিনি তাঁর ভক্তদের দেয়া ওশো নামেই বেশি পরিচিত। খুব ছোটবেলা থেকেই তিনি হৃদয়ানুভূতির দিক থেকে বিদ্রোহী, স্বাধীনচেতা ছিলেন। অন্যের কথা শুনে বিশ্বাস করা বা জ্ঞান অর্জন করার চেয়ে তিনি কোন কিছুকে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জানতে আগ্রহী ছিলেন। একুশ বছর বয়সে সিদ্ধিলাভের পর ওশো তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করেন। এবং তারপর বেশ কয়েক বছর জাবলপুর ইউনিভার্সিটিতে দর্শন বিভাগে অধ্যাপনা করেন। ইতোমধ্যে তিনি ভারতবর্ষের নানান এলাকা ঘুরে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। সে সময় গোঁড়া ধার্মিকদের সাথে নানান বিতর্কেও জড়িয়ে পড়েন।

তারপর ১৯৬০ সালের শেষদিক থেকে তিনি তাঁর অনন্য ধ্যান-পদ্ধতিগুলো প্রবর্তন করেন। তিনি বলেন আধুনিক মানুষের উপর এখন তথাকথিত সেকেলে রক্ষণশীলতা আর বর্তমান সময়ের অনিশ্চয়তা, উদ্বেগের ভার। তাই নিজের চিন্তাহীন শিথিল ধ্যানস্থ অবস্থাকে আবিষ্কার করতে হলে মানুষকে অবশ্যই গভীরে বিশোধনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। অসংখ্য ভক্ত সমালোচক রেখে ১৯৯০ সালের ১৯ শে জানুয়ারী ওশো দেহ রাখেন। Continue reading “একটা ফুল এবং একটা বিস্ময়চিহ্ন ও একটা প্রশ্নচিহ্ন :: তোরিফা নাজমিনা”